

ছবি : লেখক
- আপনার ঘুমের পরীক্ষা করাতে হবে।
আজকাল মাঝে মাঝে আচমকা ভোররাতে ঘুম ভেঙে যাবার পর যেন গলা দিয়ে লোহার পেরেকের মত কিছু নেমে যাচ্ছে, এরকম মনে হয়। শুনে ডাক্তার যখন পরীক্ষার কথা বলল, আমি হাসি চাপতে পারিনি। কিন্তু ডাক্তার গম্ভীর।
- পলিসমনোগ্রাফি। পরীক্ষাটার নাম। ঘুমের ল্যাব আছে হাসপাতালের অন্য একটা ফ্লোরে। সেখানে সারা রাত ধরে আপনাকে বিছানায় শুয়ে সাধারণ ঘুমের চেষ্টা করতে হবে। কয়েকটা জিনিস সবসময় মনিটর হবে। ব্যাথার কোনো ব্যাপারই নেই। পারলে আজকেই করিয়ে নিন।
ভাবছিলাম। এখান থেকে বাড়ি দেড়ঘন্টা। করে একবারে সকালে গেলেই হয়। পাখিও রাজি। শুধু শুধু আরেকদিন আসার মানে হয়না।
সন্ধেবেলা হাসপাতাল ফাঁকা হয়ে এসেছে। স্ক্রিনে আঙ্গুল ছুঁইয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টাকা দেওয়ার জন্য এদিক ওদিক বড় বড় লম্বাটে ট্যাবলেট বসানো। ওপরের তলায় লম্বা করিডোরের ছাদে নানা রকম রঙিন নক্ষত্রমন্ডলীর ছবি। সম্ভবত চাকা লাগানো স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা রোগীদের আবছা চোখে একের পর এক দেখে যাবার জন্য। সেসব ফ্রেমে নানারকম নেবুলা জন্মাচ্ছে। পিলার্স অফ ক্রিয়েশন। আকাশগঙ্গা। এ হাসপাতাল না মানমন্দির বোঝা দায়। সেসব পেরিয়ে এককোণে ঘুমের কন্ট্রোল রুম। ভেতরে একজন কিছু মনিটরের সামনে বসে। দরজার কাঁচ ঠকঠকাতে বেরিয়ে এল। ঘরের মধ্যে আরেকটা অন্ধকার ঘর। সেখানে কেউ ইতিমধ্যেই ঘুমোচ্ছে।
- আরে লুল্লু না ?
- না স্যার আমি তো ঘুমের কারিগর। স্লিপ টেকনিশিয়ান।
লুল্লুর কথা ভুলেই গেছিলাম। ঘুমের পরীক্ষা করাতে এসে এই লোকটিকে দেখে আমার হঠাৎ লুল্লুর কথা মনে পড়ল!! অবিকল এক রকম দেখতে। কিন্তু অস্বীকার করছে। লুল্লুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল প্রায় একবছর হতে চলল।
- পাশের ঘরে গিয়ে বসুন। আসছি।
পাশের ঘরের ভারী দরজার বাইরে লেখা স্লিপ ল্যাব ১। ভালো বাংলায় ঘুমঘর। দরজায় লক নেই। কাঠের মেঝে। ভারী অন্ধকার পর্দা টানা জানলায় কালো ফিল্ম সাঁটানো। তার পাশে নকল বাদামি চামড়ার সোফা, নকল কাঠের ছোট গোল কফি টেবিল, ওয়ার্ডরোব। ঘরের মাঝে প্যারামাউন্ট বিছানা। এককোণে পাখির মত অতিরিক্ত আরেকজন কেউ সারারাত থাকতে চাইলে তার ঘুমোনোর জন্য আলাদা বিছানা, সাদা চাদরের ওপর উটরঙা কম্বল। মাথার ওপর ছাদে একজায়গায় সিসি ক্যামেরা। অর্থাৎ এখানে নিভৃত বলে কিছু নেই।
আলো পাখা ইত্যাদির সুইচগুলো টিপলে কোনো শব্দ নেই। বাথরুমে ফ্লাশের শব্দ নেই। বোঝা যায় ঘরের ভেতর ঘুম গাঢ় করার জন্য ইচ্ছাকৃত শব্দ কম করার ব্যবস্থা। পাখি ঘুরে ঘুরে সব দেখছিল।
মোবাইলে টুং শব্দ হল। ফ্রিজ থেকে মেসেজ এসেছে - “বুনিপ তুমি কী জানো আমার ভেতরে তিনদিনের পুরোনো গাজর ক্যাপসিকামের প্লাস্টিকের গায়ে জল জমছে। এবার কিন্তু পচে যাবে।”
হ্যাঁ আমার ফ্রিজ চালাক ফ্রিজ। ইন্টারনেটে আমাকে মেসেজ করে। আমার দরজার লকও তাই। এখানে বসেই আমি মোবাইলে বাড়ির চালাক দরজা খুলে দিতে পারি। চাবির কোনো দরকারই নেই। আলো পাখা সব রিমোটে। আমার ওয়াশিং মেশিনের এক আজব রোগ শুরু হয়েছে - শীতকাল এলে বন্ধ হয়ে যায়। একবার ডাক্তার দেখানোর পর থেকে শুধু শীতকালে তার ওপরের ঢাকনা খুলে কিছুক্ষণ রোদে রাখতে হয়, তারপর চলে।
ঘুমের কারিগর দশমিনিট বাদে এল। একটা কাগজ দিল পাখিকে। হাসপাতালের ফাইল চাইল।
কাগজটায় নানারকম প্রশ্ন আছে। যেমন বই পড়তে পড়তে ঘুম পেয়ে যায়? দিনের বেলা গাড়িতে যানজটের মাঝে ঘুম পায়? টিভি দেখতে দেখতে বা অন্য লোকজনের কথা বলার মাঝখানে? সেই হিসেবে ঘুমের মাত্রার ওপর শূন্য থেকে চার পর্যন্ত নাম্বার দিতে হবে। একবারও না হলে শূন্য আর প্রায় প্রতি দিনই হতে থাকলে চার। সব প্রশ্ন যোগ করে অস্বাভাবিক এইসব ঘুম মাপার স্কেল দশের ওপর হওয়া মানে ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। আমার সীমান্তরেখায় এল। এগারো। সর্বোচ্চ চব্বিশ না কত অবধি উঠতে পারে, তার পাশে লেখা আছে "বিপজ্জনক পরিস্থিতি"।
আমার মাথার চামড়ার ওপরে, কপালে, হাতে পায়ে কোমরে অনেক জায়গায় সাদা আঠা লাগিয়ে ছোট ছোট ট্রান্সডিউসার লাগাল ঘুমের কারিগর। নাকের ভেতর দুটো নল। হাতের আঙুলের ডগায় অক্সিমিটার ধরনের। তারপর প্যারামাউন্ট বিছানার পাশে একটা কন্ট্রোলে সব তার জুড়ল। কন্ট্রোলের স্ক্রিনে সময় দেখাচ্ছে শুধু।
- আপনার অস্বস্তি হচ্ছে?
- না। ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ করা যাবে ?
- যাবে। মাঝরাতে টয়লেট পেলে ম্যাডামের কাছে নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। উনি যেন ফোন করে আমাকে ডাকেন। এসে কন্ট্রোল খুলে দিলে তারপর যাবেন।
পাখিকে বলল -"ম্যাডাম মোবাইলে শব্দ করবেন না।" তারপর সব আলো নিভিয়ে মাথার কাছে হালকা এক হলুদ আলো জ্বালিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।
এক বছর আগে সেই পুরোনো শুঁড়িখানা। যেখানে ফাঁকা দুপুরের জলে ঘাই মারে চৌকো ময়লা আয়নায় আটকে থাকা বাইরের বিকেলের ঘোলাটে আকাশ। মালিকের পোষা বিড়াল মাতালদের টেবিলের পায়ে পায়ে ঘোরে। দূরের কোনায় চেয়ারে এলিয়ে থাকে ওয়েটাররা। তিন চারজন ছোট টিলার মত আদা আর শশা কুচি করতে ব্যস্ত। টেবিলে সবুজ ধনেপাতার কাত্থ। গোলাপি ভিনিগার জলে ভেজানো ছোট ছোট আস্ত ঝাঁঝহীন পেঁয়াজ। টিভিতে পুরোনো সত্তরের হিন্দি সিনেমার ভুলে যাওয়া নায়ক নায়িকাদের গাড়ি চালাতে চালাতে বকবক।
মাথা ঝিম ধরার পর সেখানেই লুল্লু টেবিলে এসেছিল। তার এগিয়ে দেওয়া চৌকো প্রফেশনাল কার্ডে লেখা - “এত হাঁউ মাউ করার কী আছে? ডেলুলুই ইজ দ্য নতুন সলুলু। চিল করুন ও করান। কার্ডে দেওয়া কিউ আর স্ক্যান করুন। সহজে গল্প সাপ্লাই করা হয়।”
বেসিক্যালি কিছুক্ষণ ভজ ভজ করে একটা অ্যাপ গছাতে চাইল। আজকাল আবার চারিদিকে ঘাপলা, যেখানে সেখানে কিউ আর কোড স্ক্যান করলেই টাকা মেরে দেয় বলে প্রথমে গা করিনি। তারপরও ঘ্যানঘ্যান। নাহ পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই। এমনকি এই দুই গ্লাস খেয়ে বিড়ি ধরানোর সময়েও না। এ গল্পদাদুর আসর বেচেই ছাড়বে।
- আসলে বুঝলেন স্যার, আমি তো কতদিন ধরে বেচুবাবু। এদ্দিন নানা অ্যাস্পিরেশন বেচেছি। ভালো বাংলায় যাকে বলে উচ্চাকাঙ্খা। এই ধরুন মেঘছোঁয়া ফ্ল্যাট, চারচাকা খেলাগাড়ি। এখন তো প্রাচুর্যের যুগ এসে গেছে তাই এসব অ্যাস্পিরেশনাল প্রোডাক্ট আর লোকে বিশেষ খাচ্ছে না। এখন কনটেন্ট বেচি। গল্পওয়ালা লুল্লু। অবশ্যই এটা আমার আসল নাম নয়। ব্র্যান্ড নাম। যাই হোক, অ্যাপটা ইন্স্টল করে নিয়েছেন? সারা বছরে মোটে একশো টাকা সাবস্ক্রিপশন। ভাবুন একবার, এক থালা বিরিয়ানির থেকেও কম দাম। তারপর ইচ্ছে না হলে রিনিউ করবেন না। কয়েকদিন বাদে বাদে এক একটা গপ্পো দেব। শুনবেন। গা ছমছম করবে। তাড়াতাড়ি ঘুম পেয়ে যাবে। গপ্পোগুলো খিল্লি ভেবে উড়িয়ে দেবেন না স্যার। অধুনা খিল্লিই জীবন। গপ্পো একটা আয়না মনে রাখবেন। যেখানে পাঠক নিজেকে দেখতে পায়।
টিভি চ্যানেল বদলে গেছে। এখন ক্রিকেট। ছক্কা হাঁকাচ্ছে কেউ। পরের বলেই আউট।
বাঁদিকে পাশ ফিরে দেখি পাখি দূরে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ওর মোবাইলের স্ক্রিন আবার রাত দশটার পর সমস্ত রং চলে গিয়ে সাদাকালো হয়ে যায়। ঘুম আনার জন্য ভাল। এছাড়াও ওর ব্যাগে সবসময় একটা কালো রঙের ঠুলি থাকে। বাড়িতেও রাতে ঘুমোতে যাবার আগে চোখে পরে নেয়। ওতে নাকি ঘুম ভাঙলেও চারিদিক অন্ধকার মনে হয়, ফের ঘুম আসতে অসুবিধা হয় না।
পাখি রেসবুক লাইভ করে ঝুটো পাথরের গয়না বিক্রি করে। আর প্রায়দিন পরেরদিন সকাল হলেই তামাদি হয়ে যাওয়া ভিডিও লগ বানায়। সেখানেও দেখানোর আর কী আছে। হয় হোম ট্যুর নাহলে ত্বকযত্নর রুটিন। নাহলে সারাদিন কী কী খাওয়া হল।
- হ্যালো সবাইকে। ওয়েলকাম অর ওয়েলকাম ব্যাক টু আরেকটা ব্র্যান্ড নিউ ভ্লগ। আজকের দিনটা শুরু করছি জবাফুলের চা খেয়ে। আমাদের ফিন্সটা আর ভিউটিউব ফ্যামিলি থেকে অনেকে ডিএম করে বলছ অনেকদিন লাইভে আসো নি তোমরা। আসব গো শিগগিরি। কাল সারাটাদিন আমরা খুব ফান করলাম। সেটা নিয়ে আরেকটা ভিডিও আমি বানাচ্ছি তোমাদের জন্য অবশ্যই চেকআউট কোরো।…এই দেখো আমাদের কাকাতুয়া প্লড সকালবেলা রোদে এসে বসে আছে। ওর তাকে ছোলা, জল সব রাখা থাকে। ইচ্ছে হলে খায়। বাকি সময় দাঁড়ে বসে দোল খায় আর কটকট করে কথা বলে। এই দেখো আমাদের কুকুরের নাম বিড়াল-জিপিটি। ও বুনিপের পায়ের কাছে বসে আছে। বুনিপ ওকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছে।…এই দেখো আমাদের বাড়ির দরজার গায়ে লেখা - গুড ভাইবস ওনলি। এই দেখো…
তবে শুনব শুনব করে লুল্লুর অ্যাপ তারপর আর খোলা হয়নি। একবছরের সাবস্ক্রিপশন শেষ হতে চলল। তার আগেই শুনে ফেলা উচিত।
কী ভাগ্যিস এই ঘরে কোনো টিভি নেই। আসল জিনিসটাই খেয়াল করিনি এতক্ষণ। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে আমার বত্রিশ ইঞ্চির চালাক টিভিটা চালিয়ে এই ভোররাতে বসে যেতাম। ওই চার হাজার রঙ ছিটকে আসা টিভিতে ভিউটিউব দেখলে আর মোবাইলে কিছু দেখতে ইচ্ছে করে না। চ্যানেলে চ্যানেলে শব্দবাজি আর জ্বলন্ত আগুন টিভির মধ্যে দিয়ে ছুটে যায়। কোথায় যেন আইনসভায় সবুজ গ্যাস ছড়াল কেউ। জঙ্গলের মাঝে হোটেলে ধনকুবেরদের বিয়ের আসর বসল। কোথাও মাটি খুঁড়ে বের করে আনা হল আটকে পড়া টানেলকর্মীদের। কোথাও জমিতে নুনজল ঢুকিয়ে দেওয়া হল আর মেয়েদের মিহিদানা বানাতে ডাকা হল ভরদুপুরবেলা। কোথাও কলরব উঠল দফা এক দাবি এক। কোথাও শোলার শিরদাঁড়া নিয়ে মিছিল হল শহরের রাস্তায়। কোথাও এক ঘন্টায় শত্রুবন্দর দখল হয়ে গেল। স্ক্রিনে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য শুনে বুঝলাম, এই সবই মাস্টারস্ট্রোক। জলজ্যান্ত লোককে পেলোডারে করে আকাশে ছুঁড়ে দেওয়ার নতুন নাম দেওয়া হল পুশব্যাক। কোথাও কলেজে গাড়ির চাকার তলায় ছাত্রকে পিষে দেবার অভিযোগ উঠল তো কোথাও পাওয়া গেল যন্তর মন্তর ঘর। চারিদিকে ভীষণ কুশাসন, থিকথিক করছে।
এই সমস্ত দাউদাউ রেজবেইট। এইসব দেখেই আমার ঘুম বিষিয়ে যাচ্ছে কীনা কে জানে। এই যে এখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুয়ে এতসব ভাবছি পাশের ঘরের মনিটরে দেখা যাবে, রিপোর্টে আসবে মনে হয়। সে ভালোই হবে।
রিপোর্ট দুদিন বাদে পাওয়া গেল। নানারকম লেখচিত্রে ভরা।
- বেশিরভাগ সময় আপনার রেম স্লিপ - মানে খুব পাতলা ঘুম। আর অল্প অ্যাপনিয়া আছে। সেজন্য ঘুমের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে এলে ওরকম লোহার পেরেক গলা দিয়ে নেমে যাচ্ছে বলে মনে হয় আর ঘুম ভেঙে যায়। তবে গুরুতর কিছু না। কিছু ওষুধ লাগবে না।
ওদিকে পারিবারিক বাড়ি যেতেও অস্বস্তি লাগে আজকাল। মার বারবার অভিযোগ - ইদানিং বাজার করে এসে বাবা ঘরের কোণে চেয়ার টেবিল নিয়ে বসে। টেবিলে চায়ের কাপ আর মাথা ঝুঁকিয়ে বাবা ডুমস্ক্রোল করে যায়। মার সন্দেহ বাবার ক্রমশ মগজ পচে যাচ্ছে। আর পিছনের বাড়িতে কে গরু পুষছে আর পাড়ার কোন পুরোনো বাড়ি কিনে নিল চুন সুরকির ব্যবসা করা হিন্দুস্তানী লোক। এইসব।
নিজের বাড়ি ফিরে শোবার ঘরে একটা টকটকে লাল আলো জ্বালিয়ে রাখি। বেনিআসহকলাকে বর্জন করে সাদাকালো মোবাইল স্ক্রিনের দিকে যাই। কিন্তু ঘুম মাঝে মাঝে ভাঙবেই। এদিক ওদিক করে ফের চালাক টিভি খুলি। ভোটার তালিকার জন্য দিকে দিকে লম্বা লাইন। নাকি ডেমোগ্রাফি বদলে যাচ্ছে, শহরের বস্তি ফাঁকা করে সীমান্তে লাখে লাখে ঘুসপেটিয়া মিছিল। কোথাও একরাতে বিনা রক্তপাতে শব্দবোমায় কোনো দেশ দখল হয়ে গেল তো কোথাও বছরভর যুদ্ধ চলছে তো চলছেই। সেজন্য তেলের আকালে দেশজুড়ে রান্নার গ্যাসের সংকট। বন্ধ বহু মিষ্টির দোকান, বিয়েবাড়ি ভন্ডুল। কোনো কারখানায় পুড়ে খাক হয়ে গেল কিছু লোক। কোনো শুঁড়িখানায় খাসি বলে খাইয়ে দেওয়া হল গোমাতা। ফুটবলার দেখতে এসে কেউ টিকিটের দশহাজার টাকা ফেরত পাবে না বলে ঘাসের কার্পেট তুলে নিয়ে চলে গেল নিজের বাড়ি।
এইসব অনেক কিছু দিনের পর দিন ক্রোনোলজি মেনে স্ক্রিনে দেখায়। দেখাতে থাকে। লুল্লু থাকলে হয়ত বলত - “বুঝলেন না? এইটা স্যার উত্তর সত্যের যুগ। যাকে ভালো বাংলায় বলা হয় পোস্ট ট্রুথ।” আর তার ফাঁক দিয়ে জীবন এমনভাবে চলে যায় যেন দেড়গুণ করে দেওয়া পাখির বাংলা দৈনিক ভ্লগ, ডুমস্ক্রোল করে যাওয়া বাবার চোখ বা হাসপাতালে সিলিংয়ের সেই রঙিন নক্ষত্ররা। অন্ধ কালো সাপের সবুজ ব্যাং গিলে রাস্তার ধারে অসহায় পড়ে থাকার মত গপাগপ গেলে লোকে যেন অনেকদিন খেতে পায়নি। ওঘরে পাখি দিব্যি চোখে ঠুলি পরে নাক ডেকে ঘুমোয়।
নাঃ গল্পগুলো এবার শুনে ফেলতেই হবে। চালাক টিভি বন্ধ করে কানে হেডফোন লাগাই। লুল্লুর একের পর এক বোকা গল্প শুনতে শুনতে আমাকে ওই সব কিছুই আর স্পর্শ করে না। আমার গল্পের নেশা হয়ে যায়। ছোটবেলায় সকালে স্কুল থেকে ফিরে কাগজে দেখা সেই ছবি মনে পড়ে - দুখানা আকাশছোঁয়া মিনারের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে প্লেনেরা। আর হুড়মুড়িয়ে সবসুদ্ধ ধ্বসে পড়ছে। পঁচিশ বছর হতে চলল মনে হয়। এখন আমি নিজেই তো ওরকম মিনারে দিনরাত থাকি। অকুতোভয়। বাইরে মেঘছোঁয়া বারান্দার রাতভোরের আলোয় প্লড দাঁড়ে ঝিমোয়। বিড়াল-জিপিটি আমার পায়ের কাছে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। টিভির সামনে বেঞ্চিতে রাখা টবে জন্মানো এবং বেড়ে ওঠা পাথরকুচি, অ্যালোভেরা, সাপগাছের মত ঘরোয়া উদ্ভিদের শাখাপাতা অল্প অল্প করে আলোর দিকে বেঁকে যায়। চালাক ফ্রিজের ভেতরে জলজমা সবজির প্যাকেট আর ফেলা হয় না। শুধু নেটে ঘুরতে ঘুরতে কবেকার দেখা সেই মেমেটি মনে পড়ে। চতুর্দিকে লেলিহান কমলা আগুনের মধ্যে নিশ্চিন্তে চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা এক কার্টুন বলে উঠছে - "এই বেশ আছি"। ব্যাস, আগুনের তাপ আমাকে আর স্পর্শ করে না। ভাবি ভবিষ্যৎ বাতলে দেবার জন্য কাল থেকে রাস্তার ধারে প্লডকে নিয়ে বসলেই হয়। তখন আমার হেডফোনের মধ্যে দিয়ে উড়ে যায় বোমারু বিমান আর ক্ষেপণাস্ত্র। আচমকা কেঁপে ওঠে বহুতল। পাখি ঘুম ভেঙে জানলা দিয়ে উড়ে চলে যায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে আমি উঠে দাঁড়াই এবং বিড়াল-জিপিটিকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে যাই। ভবিষ্যতের দিকে।
kk | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৩৪743358
দীপাঞ্জন | ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৪৬743377