এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ
    বাংলা অনুবাদ : সুশান্ত কর

    অলংকরণ: রমিত



    দারুমার চোখের পাতা হয়ে গেল চায়ের গাছ


    সেদিন শিকার করতে গিয়ে দেখা দীপাবলির দৃশ্য বনমালী চৌধুরি কাউকে বললেন না। শুধু ঠাকুরঘরে একটি নতুন আসন বসালেন; এমনিতেও আগের আসনে ঘুনে ধরেছে। আসনটি বানিয়ে তাতে একটি সোনার ফুলও বসাবেন। আসনটি তৈরি করতে বনমালী আজ এমং বুড়োকে ডেকে পাঠিয়েছেন। কাঠের চিন্তা নেই; বড়োবাড়িতে ঝড়ে একটি গামারি গাছ পড়ে গিয়েছিল—শক্তপোক্ত গাছ। কেটে তক্তা করে ভাঁড়ার, মানে গোলার পাশে বেঁধে রাখা আছে।

    এমং বুড়ো হচ্ছে চিনা মিস্ত্রি; বুড়ো হচ্ছে কাঠের জাদুকর। ওর হাতে কাঠের তক্তা এমন সুন্দর সব জিনিসের চেহারা নেয় যে, তাকিয়ে দেখতে থাকলে দেখেই যেতে হয়। আজকাল এমং বুড়ো নিজে করাত-রান্দা এসব ধরতে পারে না; দেখিয়ে বলে বলে যায়। শুধু মিহি ফুলের কাজগুলোই নিজের হাতে করে। এমং বুড়োর বাবা উজান অসমে এসেছিল চিন থেকে চায়ের কাজ করতে; এমঙের জন্ম হয়েছিল শিবসাগরে। সেখান থেকে মরগান সাহেব ওকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। এখানে যখন সে এসেছিল, এক সফল সমর্থ তরুণ; সে যে শুধু এক দক্ষ মিস্ত্রি তাই নয়, এক বিজ্ঞ চা-কর্মীও ছিল। শখ করে হাতে হাতুড়ি-বাটালি তুলে নিয়েছিল। নাচনডুবি বাগান থেকে বেরিয়ে এসে শেষ বয়সের পেশা হিসেবে বেছে নেয় এই কাজ।বাগানের কাজ ছেড়ে বুড়ো মৌজাদারের দেওয়া মাটিতে শেকড় ছড়িয়েছে। চারটি ছেলে, দুটি মেয়ের সঙ্গে ওর শেকড় ভালো করেই নিচে ছড়িয়েছে। একটি ধানের গোলা, উজানের থেকে আনা স্ত্রী প্রমীলা, তার ওপর যোরহাটের চিনামরার থেকে নিয়ে আসা বড়োবউ লতিকা; মেজো আর ছোটো ছেলের নিয়ে আসা বড়ো আর কোচ কনে মাইনা আর পদুমি—শেকড় মাটিতে বজ্রলেপে আঁটসাঁট হয়ে গেঁথে বসেছে।

    বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমং বুড়োর কথা বলা বড়ো বেড়ে গেছে; কিছু কথা যেন ওর জিভে লকলক করতে থাকে। থাকবেই না কেন? বুড়োর ভেতরে যেন শীতে দেখা দেওয়া অসংখ্য নতুন নতুন পথ। এই জীবনে কি বুড়ো কম দেখেছে? এমং বুড়োকে মৌজাদার বিশেষ স্নেহের চোখে দেখেন, ফলে বুড়ো তার কল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে পারে স্বাধীনচিত্তে। চারটে সিংহমূর্তি নিয়ে ঠাকুরঘর, একটি ট্রি-হাউস যেন—ভেতরে একটি প্রশস্ত খাবার ঘর, একটি ময়ূরপঙ্খী খাট, একটি আরামকেদারা—এইসব শুধু এই এমং বুড়োই তৈরি করে দিতে পারে।মৌজাদার বনমালী চৌধুরির একটি গোপন স্বপ্ন আছে; একদিন তিনি একটি চায়ের বাগান খুলবেন। ছোটোখাটো করে হলেও একটি চা-বাগান খুলবার বড়ো স্বপ্ন তিনি বহুদিন ধরেই বুকে ধরে রেখেছেন। কী জানি, হয়তো এই এমং বুড়োর হাতেই একদিন গড়ে উঠবে তাঁর স্বপ্নের সেই চা-বাগানটি—"বনমালী চৌধুরি টি এস্টেট'। চা-বাগান পত্তনের অনেক কাহিনি জানে এই এমং বুড়ো; কিছু সে নিজে দেখেছে, কিছু ওর বাবার থেকে শুনেছে।

    এমং বুড়োর মুখেই বনমালী চৌধুরি শুনেছিলেন—কীভাবে মরগান সাহেব এই উত্তরাঞ্চলে পাহাড়তলাতে বুনো চা গাছ আবিষ্কার করেছিলেন, সেই কাহিনি। মরগান সাহেব এসেছিলেন মাটি জরিপের সরকারি আধিকারিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে। সাহেবের তীক্ষ্ণ নজরে ধরা পড়েছিল যে, এখানকার এক বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়া রোগটা কম হয়; এরা কাছাড়ি বলে পরিচিত—বড়ো শান্ত এই মানুষগুলো, কিন্তু কিছু গোঁয়ার আর সরল-সিধে। গান-বাজনার প্রতি লোকগুলোর রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ; এদের সমস্ত উৎসবে বিচিত্র সঙ্গীতের ব্যবহার হয়। জন্ম-মৃত্যুরও সঙ্গীত আছে; আছে গানের ভেতর দিয়ে বলে যাওয়া নানা রূপকথা-উপকথা। এদের কোনো লিপি নেই, মুখে মুখে ছড়ায় অজস্র গান আর রূপকথা; এই গান আর রূপকথাই জাতিটিকে বেঁধে রেখেছে।শিল্পী জাতিটির ঘরে ঘরে সাহেব একটি বিষয় লক্ষ করলেন। এদের উঠোনে অনবরত জ্বলতে থাকে একটি বড়ো গাছের কাণ্ডের টুকরো; পুষ্ট গাছের কাণ্ডটি একদিক থেকে জ্বলতে জ্বলতে কয়লা হতে থাকে। জ্বলন্ত লাকড়ির ওপরে লোহার শিকে ঝুলতে থাকে একটি কেটলি; তাতে টগবগিয়ে জল ফুটতে থাকে। জলে এক বিশেষ গাছের পাতা; প্রায় মানুষের বাড়ির প্রশস্ত ছড়ানো-ছিটানো বাগিচাতে এই গাছগুলো থাকেই। বৃষ্টি দেবার পর পরই কোমল নতুন কিশলয় তুলে ফেলে। আর্দ্র আবহাওয়া বুঝে নিয়ে পাতাগুলো শুকিয়ে নেয়; তারপর সেগুলো মাটির হাঁড়িতে ভালো করে চাপা দিয়ে রেখে দেয়। তারই এক মুঠো কেটলির জলে দিয়ে উতলে রাখে; যার যখন ইচ্ছে করে, এক টুকরো গুড় নিয়ে সেই লাল পানীয় পান করে—অতিথি-অভ্যাগতকেও দিয়ে থাকে। খেয়ে সবাই শরীরের ক্লান্তি ঝরাত।সাহেব যে শুধু সেই পানীয় পান করেছিলেন তাই নয়, লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাগিচাগুলোতে সেই গাছ দেখেওছিলেন। বীজ থেকে গজিয়ে ওঠা কচি চারাগাছগুলো তিনি পরম যত্নে সংগ্রহ করেছিলেন, সাথে তুলে নিয়েছিলেন কিছু বীজও; তখনই সাহেব বোঝেন, এই পাহাড়ের তলায় সোনা পড়ে আছে। সাহেব সোনা তুলে নিলেন; দেখতে দেখতে সাহেবেরা বেশ কটি বাগান খুলেও ফেললেন।সেই এমং আজ এসেছে বড়োবাড়িতে, সঙ্গে এসেছে কিছু মিস্ত্রি; আসন তৈরির কাজ শুরু করবে। বুড়ো হাতে বাটালি নেবার আগে কাঠের তক্তাগুলোকে প্রণাম করে নিল। আসন তৈরি করবে বলেই না, কাজ শুরু করবার আগে সব সময়েই এমং বুড়ো কাঠগুলোকে একটা প্রণাম করে নেয়। মাঝে মাঝেই বুড়োকে চা দিয়ে যেতে হয়। বুড়ো আজ নিজেই হাতুড়ি-বাটালি ধরেছে; একটি ঠাকুরের আসন তৈরি আর একটি টেবিল তৈরি এক কথা নয়।বুড়োকে চা দিয়ে চলে গেল। চা খাবার ওর নিজের একটি আলাদা বাটি আছে; হাতির পায়ের মতো দেখতে বাটিতে বুড়ো লাল চা খায়। দুধ-চিনি কিছুরই দরকার নেই। গামছা একটিতে বাটি ধরে বড়ো আরামে বুড়ো চাটুকু খায়।

    এমং বুড়োর কাজ দেখতে বনমালী চৌধুরি মৌজা অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখতে চিন্তিত আর ক্লান্ত লাগছিল; সেই সাতসকালে মুহুরির সঙ্গে বসেছিলেন। মৌজা চালানোর কাজটি আর সেই তাঁর বাবার আমলের মতো সহজ হয়ে থাকেনি। সাদা সাহেবেরা যেভাবে বিচিত্র করের বোঝা চাপাচ্ছে, সেসব রায়তেরা আর বইতে পারছে না; অনেকেই বাড়ি-জমি ছেড়ে জঙ্গল কেটে বসতে বসতে পাহাড়ের তলায় গিয়ে পৌঁছেছে। সরকার থেকে ক্রোক করবার আদেশ দেওয়া আছে; কী-ই বা মিলবে এই লোকগুলোর বাড়িতে ক্রোক করে? বাবার আমলের ধনী পেয়াদা আছে। ক্রোক করতে যাবার বেলা পরবার জন্যে সরকার থেকে দেওয়া বেল্টটাও সে সামলে-সুমলে রেখেছে। মৌজাদারের হাতিও আছে; কিন্তু কী আনবে সে গিয়ে করের বোঝাতে নুব্জ এই সব হতদরিদ্র মানুষগুলোর থেকে? বাবার আমলে সরকারকে দেখাবার জন্যে খাজনা দিতে অসমর্থ রায়তের বাড়িতে মিছামিছি ক্রোক করবার নাটক করত। ধনী পেয়াদা সরকারি পোশাকটা পরে নেয়; খাকি হাফপ্যান্ট আর খাকি শার্টে মানুষটি দেখতে এক্কেবারে অন্যরকম হয়ে যায়। পোশাকটি পরবার যে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম আছে—এমন নয়; কিন্তু ধনী পেয়াদা সরকারি বেল্টটা কোমরে না হলেও কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। ধুতি-পাজামার সঙ্গে কি আর সরকারি হল বলেই বেল্ট পরে নিতে পারে? বকলেসটা লাগিয়ে তখন ডান কাঁধে বেল্টটি ঝুলিয়ে নেয়; এমন ধনী পেয়াদাকে দেখেই রায়তেরা সম্ভ্রমে পথে ছেড়ে দেয়।বাবার আমলে সে সরকারকে দেখাতে রায়তের বাড়ি গিয়ে ক্রোক করে কাঁসার বাটি, লোহার কড়াই যা পেত, তাই নিয়ে আসত। সরকারের লোক চলে যেতেই যার বাড়ি থেকে যা নিয়ে আসত, সেসব তাকে ঘুরিয়ে দিত। কৃতজ্ঞচিত্তে মৌজাদারকে নমস্কার জানিয়ে "ক্রোক' করা নিজের নিজের জিনিসপত্র সমঝে নিয়ে রায়তেরা ফিরে চলে যেত। কখনও-বা কৃতজ্ঞতাতে মাথা নুইয়ে থাকা প্রজাকে মৌজাদার বলতেন, ""হবে, যা! একটা হাঁস নইলে মুরগি দিয়ে যাবি গে।''—এভাবেই মৌজা চালাচ্ছিলেন বাবা। বাবার জীবনও ছিল সেরকমই অতি সাধারণ। রায়তের থেকে কী-ই বা ভিন্ন ছিল মৌজাদারের ধরন-ধারণ? ঘর ছিল বাঁশ-খড়ের, খাওয়া-পরাও ছিল অতি সাধারণ। তাঁদের মৌজার খাজনার হিসাব "ক্যাশ-ইন-হ্যান্ড' হত না বললেই চলে। কিন্তু ব্যয় বেড়ে গেছে বনমালী চৌধুরির দিনে। তিনি বাবা-ঠাকুরদার জীবনযাত্রা অনুসরণ করতে রাজি নন। ওদিকে রায়তের উপর দিনে দিনে করের বোঝা বেড়েই চলেছে। আজ মুহুরির সঙ্গে বসে খাজনার হিসাব দেখে বনমালী তাই অল্প চিন্তিত; কিছুটা হলেও খরচাপাতি কমাতে হবে। বাবার মতো হলে চলবে না, কিছু কঠোর হয়ে অনাদায়ি খাজনা তুলে আনতে হবে। বনমালী এসে এমং বুড়ো যেখানে কাজ করছিল, সেখানে দক্ষিণের বারান্দাতে একটা চেয়ার বের করে বসলেন। এমং বুড়ো তাঁকে নমস্কার জানাল। বুড়ো সঙ্গের মিস্ত্রিদের তখন কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিল। বাঁশের খুঁটি পুঁতে তৈরি ফ্রেমে চাপিয়ে তক্তাতে রান্দা মারা হচ্ছে; ঋষ্টপুষ্ট গমারি কাঠ, বড়ো সুন্দর দুধের সরের মতো একটা রং বেরিয়েছে। বুড়ো আজকাল হাতে করাত বা রান্দা ধরে না, বাটালির কাজগুলোই নিজে করে। কানে গুঁজে রাখা পেন্সিলে কাঠে চিহ্ন দিচ্ছিল এমং বুড়ো; বনমালী ওর কাজ মন দিয়ে দেখছিলেন।এক মহিলা এসে বনমালীকে এক কাপ চা দিল, বুড়োকেও দিল। বুড়োর চায়ের ঝামেলা নেই; দুধ-চিনি লাগে না, ছাঁকনিতে চা-পাতা নিয়ে গরম জলে ঢেলে দিলেই হল। ঝামেলা যা থাকার আছে মৌজাদারের চায়ে; দুধ, চিনি, তেজপাতা, আদা দিতেই হবে, পরিমাণ সঠিক হতে হবে। এমন চা তিনি খেতে শিখেছেন "ঘোষ ব্রাদার্স'-এর অরবিন্দ ঘোষের থেকে। যে কাপে তিনি চা খান, সেটি চিনা মাটিতে তৈরি; ঠোকরালে টুং করে বেজে ওঠে, তায় এর কিনার ঘেঁষে সোনালি বর্ডার। এই দামী কাপ সেটটাও অরবিন্দ ঘোষের এনে দেওয়া; জিনিস যা চাই ঠিকই এনে দেয়, কিন্তু দামটাও নেয় সেরকম।চায়ের বাটি নিয়ে এসে এমং বুড়ো মৌজাদারের কাছে মাটিতে বসল। কেউ একজন এসে বুড়োকে একটি পিঁড়ি দিয়ে গেল। চায়ের বাটিতে চুমুক একটা দিয়ে বুড়ো বলল, ""এগুলো নাচনডুবি বাগানের চা-পাতা।'' এই বাগানের চা-পাতা দুবার সেদ্ধ করলেই তেতো হয় না; কথাটা মিথ্যে নয়। কুন্টাং বাজার থেকে এক বিহারি ব্যাপারী চা-পাতাগুলো মৌজাদারের জন্যে এনেছিল। এমং বুড়ো চা গাছের একটা পাতা দেখেই বলে দিতে পারে—জল দেবার সময় হল কি না, গুঁড়ি ছাঁটতে হবে কি না, কলম করবার সময় হল কি না, পাতা তুলবার বেলা হল কি না। হাতে চা গাছের কচি পাতা নিয়ে দলে বলে দিতে পারে, কোন রকমের চা-পাতা থেকে বিলেতে পাঠাবার মতো গোলমরিচের মতো চা-পাতাগুলো হবে; কোনগুলোর রং বেশি হবে, কোনগুলোর বা গন্ধ।

    বুড়ো মেপে কেটে নেওয়া একটা কাঠে খুটখুট করে বাটালি মারতে শুরু করল; বুড়োর মুখ আর বাটালি সমানে চলে। কেউ শোনবার না থাকলে নিজে নিজেই কথা বলতে থাকে; আজও বাটালি আর মুখ সমানে চলছে। এদিককার লোকের সঙ্গে বুড়োর কথা বলবার ধরন খুব একটা মেলে না; আসলে উজানের স্ত্রী প্রমীলার সঙ্গে জীবন কাটাতে গিয়ে ওর কথাবার্তার প্রভাব এমনিতেই বুড়োর উপর পড়ে গেছে। চা খাওয়া শেষ করে বাটিটা সরিয়ে রেখে বুড়ো তৃপ্তির একটা হাসি ছড়িয়ে দিল—
    ""এহ! এখনই তন্দ্রার ভাবটা কাটল। দুপুরে দুপুরে ভাতঘুম দেবার অভ্যাস হয়ে গেছে তো; দারুমার কৃপা থাকা চা ছিল বলেই রক্ষা।''

    বনমালী এমং বুড়োর খসখসে হাত দুটোর দিকে তাকাচ্ছিলেন। ধীরে ধীরে কাঠের টুকরোতে একটি সিংহের মাথার আকৃতি বেরিয়ে আসছে।

    "এই কটি সিংহ আপনার আসনকে মাথাতে ধরে রাখবে। আগের আসনটি কই বানিয়েছিলেন প্রভু?''
    "কী জানি, বাবা বিশুসিঙাতে থাকতেই বানিয়েছিলেন।''

    "বিশুসিঙার থেকে যদি তবে কোচবিহারের সেই কর্মকার পরিবারটিই হবে। কর্মকার মিস্ত্রি বাংলো তৈরির সময় নাচনডুবির থেকে এখানে এসেছিল; বড়ো বাংলো তৈরির বেলা...'' আর উপায় নেই; বলতে গেলে এমং বুড়োর চোখের সামনেই নাচনডুবি বাগানটির প্রসার ঘটেছিল। এই বাগানের কথা উঠলেই বুড়োকে থামানো কঠিন হয়। কাজের মিস্ত্রিরা হালকা খাবার খেয়ে গাছের ছায়াতে বারান্দার কাছে সামান্য বিশ্রাম করতে এল। এমং বুড়োর গল্প শুনতে ধনিরামেরাও বড়ো ভালোবাসে; চোখ কুঁচকে হা-হা করে সদা হাস্যমুখের এমং বুড়োকে এই বড়োবাড়ির সবাই খুব ভালোবাসে, সমীহও করে। সবাই জানে, এমং বুড়োকে মৌজাদার প্রভুও১ স্নেহের চোখে দেখে থাকেন।আজ তিনি এখানে কেবল বুড়োর কাজ দেখতেই আসেননি, যদিও কাজ দেখতেও পছন্দ করেন। বনমালী ভাবছেন, বাড়ির দক্ষিণে যেটুকু জমি পড়ে আছে, সেখানে একটি চা-বাগান শুরু করবেন। এই মাটির আসল মালিক হচ্ছেন শিপাঝাড়ের দিকের একটি সত্রের সত্রাধিকার পঞ্চানন গোস্বামী। ব্রিটিশের দেওয়া দেবোত্তর জমি এমনিই পড়ে আছে; এই বিস্তৃত জমির জন্যে মৌসরা মৌজা এক পয়সাও খাজনা পায় না। প্রায়ই গোয়ালপাড়ার দিক থেকে "প্রজা ধরতে' আসা লোকে খেত করে ফসল ফলায়, আর কাজ ফুরালে চলেও যায়। এরা গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড়ের দিককার মানুষ; এই সব কাছাড়ি মানুষ মৌসরা, সোনাপুর, বিশুসিঙার দিককার কাছাড়িদের থেকে কথায়-কাপড়ে-খাবারের অভ্যাসে আলাদা। এরা খেতের মরসুমে এসে মৌজাদারের থেকে অনুমতি নিয়ে পতিত মাটিতে চাষাবাদ করে আবার ফিরে যায়। খেতের মরসুমে আসা মানুষগুলোকে দেখলে মৌসরার লোকে বলে "প্রজা ধরতে এল।' বনমালী মনে মনে ভাবছেন, এই মাটিতেই গড়ে উঠবে তাঁর স্বপ্নের চা-বাগান—"বনমালী চৌধুরি টি এস্টেট'। এমং বুড়োর সঙ্গে সেই আলাপ করবেন বলেই তিনি এসে এই বারান্দাতে বসেছেন।

    "তুমি কী সব দারুমার কৃপা থাকা চায়ের কথা বলছিলে; কীরকম চা এগুলো?'' বনমালী নিজের কথার দিকে বুড়োকে টেনে ঘোরাতে চাইছেন।

    এমং বুড়ো হাতের বাটালি নামিয়ে রাখল; হাতে নিল আরও এক টুকরো কাঠ। খটখট করে বাটালি চলল, সঙ্গে চলল বুড়োর মুখ। এমন করে কথা বলতে পারলে বুড়োর আজকাল ভালোলাগাটা বেড়েছে; তায় যদি স্বয়ং মৌজাদার প্রভু কিছু জিজ্ঞেস করছেন, বলবে না বুঝি? মনের ভেতরের সংকীর্ণ আঁকাবাঁকা গলিতে এমং বুড়োর অবাধ গতি; আজকাল বুড়ো প্রায়ই সেই সব পথে ভ্রমণ করে সুখ পায়। তাই বলে নিজের গোঁড়াটা বুড়ো ছাড়ে না বা ছাড়তে পারে না; শেকড়হীন লতা কি কোথাও বাড়তে পারে? এমং বুড়োর শেকড় আছে কই? বাবা এসেছিলেন চিন থেকে; মুখে আগুন বেরোতে থাকা ঘড়িয়ালের মতো জীবটির ছবি বাদ দিলে সেই দেশের কথা কিছুই বুড়ো জানে না বললেই চলে। বিহুর দিনে সে স্ত্রী প্রমীলার হাতে তৈরি বড়ো বড়ো ফুলে সাজানো গামছা কাঁধে নিয়ে সে বুদ্ধ মন্দিরে গিয়ে প্রণাম করে আসে; প্রমীলারা যায় মৌসরার নামঘরে। এ কোনো একটা মানুষের শেকড় হতে পারে কি? আসলেই বুড়োর শেকড় ছড়িয়ে পড়েছে চা-বাগানের ভেতরে; এই শেকড় চা গাছের গুঁড়িতে গুঁড়িতে প্যাঁচিয়ে বাঁধা পড়েছে, ছড়িয়ে আছে।আজ দারুমার কথা জিজ্ঞেস করে মৌজাদার এমং বুড়োকে তার পিতৃপুরুষের দেশে ফিরে পাঠালেন—
    "আমাদের দেশে...''

    এমং বুড়োর দেশ কোনটা? যে দেশ সে কখনও দেখেইনি, যে দেশের ভাষা বুড়ো জানেই না—সেটি বুড়োর দেশ হয় কী করে? যে মাটিতে বুড়োর জন্ম হল, যে মাটির মেয়ে বিয়ে করল, যে মাটিতে বুড়োর বাড়িঘর—সেই মাটি বুড়োর দেশ না হয়ে হবে আর কোনটা? প্রশ্নটি সঠিক, এমং বুড়োর আর কোথায় দেশ রয়েছে? সে যাই হোক না কেন, বুড়োর একখানা নিজের দেশ ছিল, নিজের একটি ভাষা ছিল; ওর রক্তে এখনও সেই দেশ রয়েছে। সেই দেশের দারুমার গল্প বলতে যাচ্ছে এমং বুড়ো; গল্পটি সে শুনেছে বাবার থেকে। দারুমা ছিলেন চিনের এক ধর্মগুরু। এক বিশেষ মানস নিয়ে দারুমা বসেছিলেন ধ্যানে; কিন্তু ভাবামতো ধ্যান তিনি করতে পারছিলেন না। তাঁর ধ্যানে বারে বারে নানা বাধা-বিঘ্ন আসছিল; ব্যাঘাতের কারণ ছিল তাঁর ঘুম। ধ্যানের মধ্যে তিনি ঘুমে ঢলে পড়েন, চোখ বুজে আসে; মাঝেমধ্যে এমন হয় যে চোখ মেলতেই পারেন না, চোখের পাতাগুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে আসে। একদিন তিনি নিজের উপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন এবং ধ্যানের মধ্যেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়লেন। যখন জাগলেন, তখন গুরু দারুমার নিজের উপরেই বড়ো রাগ-ক্রোধ জন্মাল, ধিক্কার জন্মাল নিজের উপর। চোখের পাতাগুলো চোখজোড়াকে ঢকে ফেলে; অগত্যা সেই পাতাগুলোকেই কেটে ফেললেন, কেটে পাশের জঙ্গলে দিলেন ফেলে! এখন আর চোখে ঘুম আসে কী করে? এর পরে দিনে-রাতে এই খোলা চোখজোড়া নিয়ে গুরু দারুমা কঠিন সফল সাধনাতে বসলেন; ওদিকে তাঁর কেটে ফেলা সেই চোখের পাতাগুলো থেকে গজাল একটি সবুজ কোমল গাছ—এর পাতাগুলোও চোখের পাতার মতো চোখা আর লম্বাটে। গাছটিতে পাতাও জন্মায় দুটো দুটো করে।

    দারুমার কাহিনি শুনে মৌজাদার মাঝে কথা বললেন, ""তার মানে, সেটাই এই চা গাছ, এই তো?''

    "সেজন্যেই চা খেলে ঘুম ছুটে যায়।'' গল্প বলা শেষ করে বুড়ো বাটালি, হাতুড়ি গুটিয়ে রাখে; বুড়োকে হয়তো ক্লান্তিতেও পেয়েছে।

    বুড়োর ছোটো ছেলে এল; বুড়োকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে। স্ত্রী আর বউরা আজকাল বুড়োকে কোথাও একবেলার বেশি কাজ করতে দেয় না। একবার বুঝি কারও বাড়িতে সে মাথা ঘুরে পড়েছিল; কাজ না করলেও তার চলেই যায়। তবুও বেছে বেছে দুই-এক ঘরের কাজ সে নেয়; বিশেষ করে মৌজাদারে ডাকলে এমং বুড়ো না এসে থাকতে পারে না।

    বুড়ো মৌজাদারকে আরও একবার প্রণাম করে ছেলের পেছন পেছন হাঁটা দিল। যাবার আগে কাজে লেগে থাকা মিস্ত্রিদের কী সব নির্দেশ-পরামর্শ দিয়ে গেল; মাপজোখও আরও একবার ভালো করে দেখে নিল। সিংহের মাথা খোদাই করা কাঠটি বুড়ো বেঁধে সঙ্গে নিল। বাড়ি গিয়ে ভাত খেয়ে উঠোনের কাঁঠাল গাছের ছায়াতে বসে কাঠের টুকরোটিতে বাটালি খটখটাতে থাকবে; মুখখানাও চলতে থাকবে। এমন সময়ে প্রমীলা এসে প্রায়ই বুড়োর পাশে বসে; ঠোঁট-মুখ লাল করে তামোল খেতে খেতে প্রমীলাও বুড়োর কথাতে অংশ নেয়। এই মানুষটির জন্যে যে প্রমীলার বুকে অপার স্নেহ! হামানদিস্তাতে থেঁতলে আনা তামোল একটি পানে দিয়ে এমং বুড়োকে এগিয়ে দেয়; তামোলই ওর ভালোবাসার ভাষা। এমং বুড়ো সেই ভাষা বোঝে; কাঁঠাল গাছের তলায় সেই ভাষা বড়ো মায়াময় হয়ে পড়ে, থেতো তামোলের মতো তাতে রং চড়ে।


    ১। প্রভুঃ অসমিয়াতে "বাবু' শব্দের প্রচলন ছিল না, তার বদলে ছিল প্রভু –ঈশ্বর- দেউতা। দেউতা মানে বাবা। বাবা বাংলাতে বিভ্রান্তি বাড়াবে বলে আমরা "প্রভু' শব্দটি নিলাম। দেউতার বদলে "হুজুর', "মালিক' ও মানাবে না।


    ভরিল কি না ভরিল রাধা তোমার কলসি


    "চলুন, ছোটোপ্রভু!'' মৌজার কর্মচারী রঘু এসে বনমালী চৌধুরির বিছানাঘরের সামনে দাঁড়াল। ছোটোপ্রভুর মুখের দিকে তাকাল সে; কেয়া পাপড়ির মতো রাঙা মুখ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম—তরুণ মুখে এক লজ্জার আভা। রঘুর চোখে-মুখে হাসি; সে বনমালীর সমবয়সী। বনমালী সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে এল।
    "ঘোড়া আমি পথের মোড়ে রেখে এসেছি; না ধনিরামকে ডাকব?'' রঘু ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
    "চল, হেঁটেই চল; গির্জার পাশের রাস্তাটাই ধরব।'' গির্জার টিলাটা পার হলেই আদিগন্ত বিস্তৃত সেই মাঠ; বনমালী আর রঘু সেই পথই ধরল।
    "তুই ঠিকঠাক দেখে এসেছিস তো?''
    "আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি।''
    "ধান কাটতে এল যে?''
    "আরে, মৌজাদারের বাড়ির মেয়ে; ধান কাটতে আসতে যাবে কেন? বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে এসেছে।''
    "মামার বাড়ি কবে এল?''
    "হল আজ তিন-চার দিন। ছোটোপ্রভুকে মেয়ে দেখাতেই তো নিয়ে এসেছে।'' রঘুর চোখে-মুখে আবার দুষ্টুমি ভরা হাসি।

    রঘুর কথাতে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাল না বনমালী। বাবা বনমালীর জন্যে সোনাপুর মৌজার মৌজাদার অরবিন্দ হাজরিকার মেয়ে শান্তিপ্রিয়ার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। বনমালী জানতে পেরেছেন, শান্তিপ্রিয়া শিক্ষিত মেয়ে; ছাত্রবৃত্তি পেয়ে এলপি পাস করেছে। কীর্তন, দশম, নামঘোষা মুখস্থ। এই শান্তিপ্রিয়াকে দেখতে বনমালী চৌধুরি রঘুকে নিয়ে গির্জার পাশের সেই সংকীর্ণ পথটি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

    গির্জার এলাকাটা পার করেই শুরু সেই বিস্তীর্ণ মাঠ। মাঠের মাঝবরাবর নাগনদী বেরিয়ে গেছে গির্জার পাশটা ছুঁয়ে। মাঠের দিগন্তে নীল পাহাড়ের সারি; পাহাড়ের নালা-ঝরনাতে রসাল করে রেখেছে মাটি। ধানের ঝুটা নিজের ভারে নুয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে। অগ্রহায়ণের মাঠ; অনেকটা ধান কাটা হয়ে গেছে। পুরো মাঠ জুড়ে এখানে-ওখানে ধানের আঁটি স্তূপীকৃত করে রাখা রয়েছে। মাঠ জুড়ে পিঁপড়ের মতো দলে দলে মেয়ে-পুরুষে কর্মব্যস্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে; বাতাসে শুধুই পাকা ধানের গন্ধ।

    বনমালী আর রঘু গিয়ে বটগাছটির নিচে গিয়ে দাঁড়াল। কলাপাতায় বাতাবি লেবু ছাড়িয়ে মেখে, হেসে-খেলে নাম১ গাইছে এক তরুণীর দল; ওদের পাশেই ধানের আঁটি স্তূপ করে সাজানো। তরুণীর দলটি বুড়ো বাতাবি লেবুগাছটির নিচে সামান্য উঁচু জায়গা দেখে বসেছে। ওরা জিহ্বাতে চ্চু-চ্চু শব্দ তুলে টক খাচ্ছে আর নাম গাইছে। কেউ একজন গাইছে, বাকিরা দোহার দিচ্ছে…

    ফুল চন্দন তুলসী
    ভরিল কি না ভরিল, রাধা তোমার কলসি,
    উথলিয়া পড়ে হে যমুনার জলসি!
    মাথার উপর উড়িয়া গেল, ফুল-চন্দন-তুলসী,
    মাটির উপর পড়িয়া রইল, সাদা বকের ছায়া হে—
    ফুল-চন্দন-তুলসী…


    এই তরুণী-দলের মাঝে হাতে-বোনা মেখেলা-চাদর পরে একটি মেয়ে রাতের আকাশে তারার ভিড়ে চাঁদের মতো ঝিলমিল করছে। পোশাকটা যেন ওর গায়ে ছোটো হয়ে এসেছে; ওর শরীর পুরোটা ঢাকতে পারেনি। গাইতে গাইতে ওর মেঘবরণ চুলের বাঁধন খুলে গেছে; চুল দিয়ে সে খোঁপাটি বাঁধতে পারেনি, বারে বারে খুলে যাচ্ছিল। মাধবীলতার লাল ঝুটির মতো ফুল যেমন দুপুরের রোদ পেয়ে ফোটে, সেও যেন মাঠের রোদে ফুটে বেরিয়েছে। বনমালীর তরুণ মন সেই মাধবীর সৌরভে ডুব দিল; সে আর কিচ্ছুই দেখছে না, কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। এক অপ্সরার রূপের মাধুরী ওকে গ্রাস করে ফেলেছে।সেই অপ্সরার খোলা চুলগুলো বেঁধে দিতে আরও একটি কন্যা সাহায্য করছে; পরনে ওর মুগার রিহা-মেখেলা২, মুখখানা গম্ভীর। তাকে বনমালী দেখছেই না; কী করে বা দেখে? ওর যে চোখ ঝলসে যাচ্ছে! মেঘবরণ চুলের কন্যা উঠে দাঁড়িয়েছে—ক্ষীণকটি লম্বাটে মেয়ে; বাতাসের ছোঁয়া লেগে উড়ে উড়ে যাচ্ছে ওর চুল। মুগার রিহা-মেখেলা আর গলায় চন্দ্রহার পরা অঘ্রাণের মাঠের বর্ণের মেয়েটি ওর থেকে এক হাত খানিক বেঁটে। ওর বালা-চুড়ি পরা হাতে উড়ন্ত চুলগুলো এক দীর্ঘ বেণীর চেহারা নিল।কেশবতী কন্যার চোখ এবারে সোজা গিয়ে বনমালীর চোখে পড়ে গেল। সে হিঁ হিঁ করে দিল হেসে; সেই হাসির দোলাতে যেন সে বেঁটে মেয়েটির গায়ে হেলে পড়বে—সামাল দেওয়া কঠিন হল। মুগার কাপড় পরা মেয়েটি যেন লজ্জাতে এখনই বেঁকে পড়বে; সে রিহা টেনে মাথায় ওড়না করে নিল

    "দেখলেন তো, ছোটোপ্রভু? ওই মেয়েটিই আমাদের শান্তি মা। ওই যে মুগার…''

    হাসির কোপে কেশবতী কন্যার চুল আবার খুলে গেল; পিচ্ছিল চুল ওর মুখখানা দিল ঢেকে।
    "ওই যে বাতাবি গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে…'' বনমালী চোখ ঘোরাতে পারছে না।
    "হ্যাঁ, ছোটোপ্রভু! তিনিই আমাদের শান্তি মা।''
    "তুই ঠিকঠাক বলছিস তো?''
    "আরে, দাদামশাই যখন মেয়ে দেখতে যান, তখন দেখুন আমিই সঙ্গে গিয়েছিলাম; কনে আমাকে একটি বড়ো ফুলের গামছা দিয়েছিলেন। আগামীকালই তো দাদামশাই আপনাকে তাঁর মামার বাড়ি নিয়ে যাবেন—আপনি নিজেই দেখে নেবেন খন।''

    মেয়েদের বাতাবি লেবুগাছের নিচের আড্ডাটা ভেঙে গেল। মুগার রিহা-মেখেলা পরা মেয়েটিকে নিয়ে এরা চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াল সবাই; যেতে যেতে বিহুর গান ধরেছে—

    ""কাপড় ধুইতে গেছিলাম গো
    বুড়া লুইতের পার,
    মাঝি তখন আইল
    তার বৈঠাতে কী ধার…''


    কেশবতী কন্যা দুহাত তুলে খোঁপা একটা বেঁধে ফেলেছে। সে একা হয়ে পড়েছে; আবার সে ফিরে তাকাল, আবার বনমালীর চোখে চোখ পড়েছে। আবার সেই বিদ্যুৎ ঝলকানোর মতো হাসি! মেয়েদের সঙ্গ ধরতে দ্রুত পা ফেলতেই দেহে ওর ছন্দ খেলেছে।

    "রঘু, এই মেয়েটিই শান্তিপ্রিয়া তো?''
    “হ্যাঁ, ছোটোপ্রভু; এই জনই। সেই যে মুগার রিহা-মেখেলা আর চন্দ্রহারে সেজে এসেছেন। দাদামশাইয়ের নজর আছে বলতে হবে, তাই না?''
    বনমালী তাকিয়েই ছিল; দেখতে দেখতে মেয়ের দল ধানের আঁটির ভিড়ে হারিয়ে গেল।
    "কী বললি তুই, রঘু?'' যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে বাস্তবের মাটিতে ফিরে এল বনমালী।
    "বলছিলাম, দাদামশাইয়ের চোখ বড়ো সেয়ানা। শান্তিপ্রিয়া মায়েদের বাড়িটা কী দেখবেন—ফুলে-ফলে পুরো ভরে আছে; হাতি আছে চারটে…''
    "আমাকে হাতির হিসেব দিচ্ছিস কেন? আমি কি কনের সঙ্গে হাতিও নিয়ে আসতে যাব?''
    "আপনি লাগবে না বললেও মৌজাদার মেয়ের সঙ্গে জিনিসপত্র তো দিয়েই পাঠাবেন।''
    "চল, এখন বাড়ি যাই…''

    মেয়ের দল পাকা ধানের মাঝে মিলিয়ে গেল; সেদিকটায় শেষবার তাকিয়ে বনমালী গির্জার পাশের সেই সংকীর্ণ পথে পা ফেলল।

    বৃদ্ধ মৌজাদার অর্থাৎ বাবা একবার বলেছিলেন ভাবি বউয়ের মামার বাড়ি এক পাক ঘুরে আসতে। মাথা নুয়ে বনমালী বলেছিল, বাবা যখন দেখে-শুনে সব ঠিকই করেছেন, তাঁর আবার যাবার কী দরকার? ছেলের বাবার উপরে এই আস্থা দেখে তিনি বেশ খুশি হয়েছিলেন; বনমালী তুষ্ট ছিল বাবার সেয়ানা দৃষ্টির জন্যে।

    কনেকে যজ্ঞের জায়গাতে নিয়ে আসতেই তাঁর সন্দেহ হয়েছিল—সেই ক্ষীণকটি মেয়েটি কই? পরমুহূর্তেই ভাবল, কনে কেঁদেকুটে ঘোমটা-টোমটা দিয়ে রেখেছে বলে এমন দেখাচ্ছে হয়তো। আরও ক্ষণিক পরেই সে টের পায়—একটা বড়ো ভুল হয়ে গেছে; এই ভুলের আর কোনো সংশোধনী নেই। বিয়ের প্রথম রাতেই মেয়েটি যখন স্বামীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে আসে, সে সচেতনভাবে পায়ের ঝটকা একটা কষিয়েই দেয়। মেয়েটি হুড়মুড়িয়ে পড়েই যেত; কোনোক্রমে পালঙ্কের একটি খুঁটা ধরে নিজেকে সামলে নেয়।

    শান্তিপ্রিয়ার প্রতি সেই যে বিস্বাদ ভাব—এটা আর কমেনি, বেড়েই চলল। বিয়ের এক মাস গেল কি না গেল, বনমালী সেই চঞ্চলা কন্যাটিকে খুঁজে বের করল। গরিব ঘরের মেয়ে, তার ওপর পরিবারটি জাতে নিচু। সোজা হয়ে বসল বনমালী; সেই মেয়েটিকে এ বাড়িতে নিয়ে আসবেই, নইলে দেশান্তরি হবে। মৌজাদার অবশেষে অনুমতি দিলেন; কিন্তু শর্ত বেঁধে দিলেন—চৌধুরি বংশের ছেলে বামন-জেলের উঠোনে যাবে না বর সেজে, নতুন কনে মৌজাদার অরবিন্দ হাজরিকার কন্যার সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবে না, মৌজাদার বাড়ির বাইরে ঘর উঠিয়ে ওকে রাখতে হবে।

    বনমালী এমং মিস্ত্রিকে বড়োবাড়িতে ডেকে পাঠাল। গোলার কাছে একটি পুষ্ট গামারি কাঠ তক্তা করে রাখাই ছিল; মিস্ত্রি সুন্দর একটি পালকি তৈরি করল। সেই পালকির কাঠ আর রঙের গন্ধ শুকোতে না শুকোতেই বামনের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বড়োবাড়ি থেকে পাঠানো পোশাক-গয়নাতে সেজে শাওনি এসে সুগরীজানের পাশে নতুন তৈরি ঘরে এসে ঢুকল।

    যে রাতে বনমালী এই শ্রাবণ-বর্ষার কন্যার জলধারাতে অবগাহন করছিল, সেদিনেই ওর বাবার হাঁপানির টান উঠল। সারা রাত বৃদ্ধ শ্বশুরের পাশে বসে শান্তিপ্রিয়া নামঘোষা, কীর্তন৩ পাঠ করে শুনিয়েছিল। মাঝে-মধ্যে ছোটো হামানদিস্তাতে পিপলি পিষে রস খাওয়াচ্ছিল; ভোরের দিকে বৃদ্ধ মানুষটি একটু আরাম পাচ্ছিলেন। উঠে বসেই তিনি ক্লান্ত বউয়ের মুখের দিকে তাকালেন। কাঁপা হাতে ওর মাথাতে হাত রেখে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন এই বলে, "মা, তোর হাতেই এই বাড়ি, বংশমর্যাদা তুলে দিলাম।'' মানুষটি আবার শুয়ে পড়েছিলেন পর পর।

    শান্তিপ্রিয়ার যমজ ছেলে দুটি একেবারেই কোলের শিশু ছিল; মৃত্যুমুখী মানুষটির সেবাযত্ন করবার ফাঁকে ফাঁকে সে শিশু দুটিরও যত্নআত্তি করছিল। ভোরের দিকে শ্বশুরের গলা থেকে একটা ঘড়ঘড় শব্দ বেরোতে শুরু করে; শান্তিপ্রিয়া তাঁর শিয়রে বসে ঘোষার৪ পদ কিছু পাঠ করে গেল।

    "এ জয় রঘুনন্দন…
    নারায়ণ, নারায়ণ, নারায়ণ।''

    গাল দিয়ে ওর বয়ে পড়ছিল জলের ধারা। বৃদ্ধ মৌজাদারের পাশে দাঁড়িয়ে-বসে যারাই পাহারা দিচ্ছিলেন, সবাই এই ঘোষা-পাঠ শুনেছিলেন। সূর্য উঠি-উঠি করছে, ঠিক সেই সময় মানুষটি চোখ বুজলেন। শ্বশুরের আধবোজা চোখ দুটি সে তুলসী পাতা এনে ঢেকে দিয়েছিল। সবাই বুঝলেন তিনি আর নেই; কান্নার রোল উঠল। বনমালী চৌধুরিও এসে পৌঁছুল। বড়োবাড়ির বাইরে সুগরীজানের পাড়ে সেই নতুন তৈরি ঘরে এখানকার কান্না গিয়ে পৌঁছুতে পারে? কে বা গিয়ে খবর দিল? কে সেই ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিয়ে খবর দিল গিয়ে! বনমালী ভেতরে এসে দাঁড়াল। ওর কাপড়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল লাল সিঁদুরের দাগ। এসে বাবার পায়ে ধরে সে দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলেছিল, আর সেই দু-ফোঁটা চোখের জলের সামনে তুচ্ছ হয়ে পড়ল দুটি দুমাসের শিশুর মায়ের এত দিনের সব কষ্ট।তুচ্ছ হয়ে গেল—রাতের পর রাত জাগার কষ্ট স্বীকার, ওর দুর্বল শরীরের উপর দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া এত কষ্ট, দুই কোলে দুই সন্তানকে নিয়ে এক মৃত্যুমুখী বৃদ্ধকে করা আন্তরিক পরিচর্যার সবটাই; মুখ্য হয়ে পড়ল গায়ে এক নববধূর সিঁদুরের দাগ নিয়ে আসা একটি লোকের দু-ফোঁটা চোখের জল।

    শোকে গদগদ হয়ে লোকটি সেখানে জড়ো লোকজনকে মৃতের শেষকৃত্যে করণীয় নানা কাজের নির্দেশ দিচ্ছিল। দেহটিকে বাইরে বের করে আনতে এই লোকটিও হাত লাগিয়েছিল; কিছুটা শব্দ করেই সে কাঁদছিল। সেই কান্না আবার বাঁধভাঙা জলের মতো চারপাশে জড়ো লোকজনের ভেতরে হুড়হুড় করে বইতে শুরু করল। কেউ-বা বিলাপ জুড়ে দিল, ""প্রভু এমনটা করলেন! আমরা এবারে কার মুখ দেখে বেঁচে থাকব গো!'' কান্নাকাটি আর হুলুস্থুলের মাঝে একটি ক্লান্ত মানুষের অস্তিত্বই যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ভিড়ের মধ্যে তাকে কেউ একটা গুঁতোও দিয়ে দিল; সামান্য মাথা ঘুরে মহিলাটি পড়েও যাচ্ছিল আর-একটু হলে। কীসে বা ধরে সে নিজেকে সামলে নিল?

    সেদিন সে কারও গুঁতো খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিয়েছিল ময়ূরপঙ্খী পালঙ্কের খোদাই করা খুঁটা একটাতে ধরে। লোকটিকে দেখলেই ওর সেই খুঁটাটির কথা মনে পড়ে। বাবা সামনে দাঁড়িয়ে পালঙ্কের এই খুঁটাগুলো খোদাই করিয়েছিলেন; পড়ে যেতে যেতে সেই খুঁটাতে ধরে নিজেকে সামলে নিতে নিতে ওর খুব মনে পড়ছিল বাবাকে। মেয়ের যৌতুকে দেবার জন্যে কাঠের আসবাবপত্র যখন তৈরি হচ্ছিল, হাত দুটো পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবা সেই কাজ দেখে যেতেন—সেই ছবিটি ওর সেদিন বড়ো বেশি মনে পড়ছিল। খুঁটাটিতে ধরে ওর এমন মনে হচ্ছিল যেন বাবা এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন; দুই হাতে বহুক্ষণ সে সেই খুঁটাটি ধরে সেদিন দাঁড়িয়েছিল।

    এমং বুড়োর হাতে সাজানো পালকি দুবার দুই যুবতীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল। আর শান্তিপ্রিয়া? সেই যুবতী বয়সেই ওর চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল; সে প্রায়ই বসে থাকত তাঁতে। বড়োবাড়ির ধনদাকে সঙ্গে নিয়ে রেশম পোকা পোষা শুরু করেছিল সে। রেশম সুতো কেটে চাদর বোনে সে; চাদরে মাঘ মাসের শীতও পালিয়ে বেড়াত।শান্তিপ্রিয়ার ছেলে দুটি উঁচু মেধার পরিচয় রেখে মঙ্গলদৈর স্কুল একটিতে লেখাপড়া করছিল। শান্তিপ্রিয়া কাঠি আর লাল সুতো দিয়ে গামছাতে ছেলেদের নাম লিখে ফেলে; গামছাতে লাল সুতোয় লেখা নাম দুটি জ্বলজ্বল করে—প্রিয়নাথ আর চন্দ্রনাথ। লতা আর ফুলের মাঝখানে বর্ণ ক'টি দেখে সবাই ধন্য ধন্য করেছিল। বহাগবিহুতে ৫ ছেলেদের হাতে গামছা দেবে বলে তৈরি করে গুটিয়ে যত্নে রেখে দেয় সে; সেই ভাঁজ করা গামছার মাঝে রেখে দেয় একটি কেয়া ফুল—ভাঁজটা খুললেই গন্ধ মেলে।আরও একটি কাজের দায়িত্ব শান্তিপ্রিয়া নিজের কাঁধে তুলে নেয়; ঠাকুরঘরের সমস্ত কাজ সে নিজের হাতে তুলে নিল। রোজ ভোরে বাড়ির সবার নজরে পড়ে, অকালে পাকা চুলের একটি মহিলা ঠাকুরঘর ঝাড়পোছ করে লেপে নিচ্ছে, পুথি-পাঁজি যা আছে রোদে দিচ্ছে, সভক্তিতে প্রণাম করে হাতিদাঁতে তৈরি খড়মজোড়া ঝেড়ে-মুছে রাখছে; কাঁসার থালা-বাটিগুলো ছাই আর আমরুল পাতাতে মাজছে, বাটির ভেতরের ছোটো পোঁটলাটি বের করে আবার ঢুকিয়ে রাখতে দুবারই প্রণাম করে নেয়।তারপরে সে এক ডিবা চাল নিয়ে গিয়ে তালগাছ দুটির মাঝে দাঁড়ায় গিয়ে; ঘুঘু, পায়রা, শালিক, চড়াই পাখিরা এসে ওকে ঘিরে ফেলে। এভাবেই মহিলাটি দিনের কাজকর্ম শুরু করে দেয়; সেই সময়টুকুতেই ওর মুখে একটা হাসির রেশ ফুটে ওঠে। সেই হাসিতে যেন মাখানো থাকে ধূপ-ধূনা-চন্দনের গন্ধ; ধীরে ধীরে সেই গন্ধ সুরভিত করে তোলে পুরো বাড়িটাকেই।


    টিকাঃ
    ১। নাম: অসমের বৈষ্ণব সংস্কৃতির অঙ্গ। মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব ও শ্রীশ্রী মাধবদেবের প্রবর্তিত "নামধর্ম'-এর অন্তর্গত ভক্তিগীতি বা প্রার্থনা। এখানে গ্রামের তরুণীরা মাঠে কাজ করতে করতে বা আড্ডার ছলে রাধাকৃষ্ণের লীলা অবলম্বনে যে সুমধুর লোকজ ভক্তিগীতি গাইছিল, তাকেই "নাম' বা "নাম গাওয়া' বলা হয়েছে।
    ২। মুগার রিহা-মেখেলা: আসামের জগদ্বিখ্যাত সোনালি রঙের "মুগা' রেশম সুতো দিয়ে বোনা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। "মেখেলা' হলো কোমরের নিচ থেকে পরা কুঁচি দেওয়া স্কার্টের মতো অংশ এবং "রিহা' হলো শরীরের ওপরের অংশে চাদরের মতো করে জড়িয়ে নেওয়া ধ্রুপদী এক অলঙ্কার।
    ৩। নামঘোষা, কীর্তন: আসামের বৈষ্ণব সমাজের দুটি পরম পবিত্র ও প্রামাণ্য ধর্মগ্রন্থ। "কীর্তন ঘোষা' রচনা করেছিলেন স্বয়ং মহাপুরুষ শংকরদেব এবং "নামঘোষা" রচনা করেছিলেন তাঁর সহযোগী প্রধান শিষ্য মাধবদেব।
    ৪। ঘোষার পদ: "নামঘোষা' গ্রন্থের অন্তর্গত চার চরণের এক-একটি নিটোল ও আধ্যাত্মিক পদ্য বা শ্লোক।
    ৫। বহাগবিহু: আসামের জাতীয় উৎসব তথা বসন্তোৎসব, যা অসমিয়া নববর্ষের (মধ্য এপ্রিল) সূচনালগ্নে উদযাপিত হয়। এই উৎসবের অন্যতম পরম্পরা হল—পরিবারের ছোটোদের বা প্রিয়জনদের হাতে পরম মমতায় ও ভালোবাসায় নিজের তাঁতে বোনা ফুলের কাজ করা ঐতিহ্যবাহী "গামছা' বা "গামোছা' উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া।





    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ
  • ধারাবাহিক | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সুশান্ত | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৫৫743475
  • ধন্যবাদ!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন।