অণুগল্প -ভাসান
রেললাইনের দুপাশে সার দিয়ে থাকা বেশ কিছু শ্রীহীন গরীব চেহারার কুঠুরি। সাধারণ লোকজন অবশ্য এগুলোকে ঝোপড়ি বস্তি বলেই ডাকে। পুজোর আগে আগেই এগুলোকে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেবার কথা হয়েছিল, কি একটা কারণে আপাতত বসতি বিসর্জন পর্বটি বেশ কিছু দিনের জন্য পিছিয়ে গেছে। ভাঙতে তো আর সময় লাগে না। বুলডোজার এনে চালিয়ে দিলেই হলো। নিমেষেই কতো মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু কেড়ে নিয়ে মানুষজনকে আরও অসহায় করে তোলা।
নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুর সামনে এক ফালি ফাঁকা জায়গায় বসে বসে নানান কথা ভাবছিলো টুবলু। এখানে নিজেদের জমি বলে কিছু নেই, সবটাই এজমালি। তাকে ঘিরেই সুখ দুঃখ আর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করা। এবার পুজো বেশ খানিকটা পিছিয়ে এসেছে। টুবলুদের বস্তিতে পুজোর পাট নেই। লাইন পেরিয়ে কিছুটা গিয়ে ঘোষপাড়াতে পুজো হয়। টুবলুর মা শান্তি সেখানেই অঞ্জলি দিতে যায়। পাঁচ বাড়িতে ঠিকে কাজ করে,তাই এই সময় নতুন কাপড় বেশ কয়েকটা জুটে যায়। শান্তি অবশ্য নিজের ইচ্ছেমতো কেনাকাটার জন্য অনেক বাড়ি থেকেই বোনাসের টাকা চেয়ে নেয়। মায়ে পোয়ে একে অপরের অবলম্বন হয়ে দিব্যি বেঁচে আছে লড়াই করে। ঘোষপাড়ার মণ্ডপ থেকে ঘোষণার আওয়াজ ভেসে আসে – আজ মহানবমী। আজ সন্ধ্যায় আমাদের প্যান্ডেলে……। এখান থেকে বেশ শুনতে পায় টুবলু।
সন্ধে উৎরেছে অনেকক্ষণ।৭ টা ২২এর ডাউন বনগাঁ লোকাল শরীর ভর্তি করে মানুষ নিয়ে চলে গেল শিয়ালদার উদ্দেশ্যে। টুবলুদের প্রান্তিক জীবন ট্রেনের আসা যাওয়ার সুরের সঙ্গে বাঁধা। মা শান্তি গেছে বস্তির অন্যান্য মেয়ে বৌদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে। টুবলুকেও বলেছিল সঙ্গে যেতে, ঘর পাহাড়ার বাহানা দেখিয়ে সে এড়িয়ে গেছে।
-এই টুবলু,টুবলু? বাড়ি আছিস্ ?
- বাবলার গলা না! টুবলু ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
- কাল দশমী, ঠাকুরের বিসর্জন। যাবি,কাঠাম ধরতে কোম্পানির পুকুরে? তুইতো সাঁতার জানিস। তাই তোকে বলতে এলাম। যাবি কিনা বল? আমরা পাঁচজন যাব। কাঠামগুলো জল থেকে তুলে খড় ছাড়িয়ে পাল পাড়ায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। যাবি কিনা বল? এপাড়ার অনেকেই রাজি।
টুবলু একটু ইতস্তত করে। কাঠাম ধরার কাজ সে কখনো করেনি। মাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে যাওয়াটা….। টুবলু দোটানায় পড়েছে দেখে বাবলা তাড়া দেয়।
-যাবি কিনা পষ্টাপষ্টি করে বলে দে। বাবলা অধৈর্য হয়ে পড়ে।
হ্যাঁ আর না এর টানাপোড়েনের জটিলতা কাটিয়ে টুবলু রাজি হয়ে যায়। মৃদু স্বরে বলে – যাব।
আজ দশমী। কোম্পানির পুকুর পাড়ে আজ লোকে লোকারণ্য। এই তল্লাটের সমস্ত প্রতিমার ভাসান এখানেই হয়। আলো দিয়ে জায়গাটাকে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে বাড়ির প্রতিমাদের নিরঞ্জনের পালা। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে সমানে। ঘোষণা অনুযায়ী একে একে সাহা বাড়ি, ঘোষাল বাড়ি,দত্ত বাড়ির একচালা প্রতিমাগুলো জলে পড়ে। দড়িতে বাঁধা আংটা কাঠামোতে আটকে দিলে ওগুলোকে পাড়ের দিকে টেনে আনে বাকিরা। বাবলারা এরমধ্যেই অনেকগুলো কাঠাম ধরে ফেলেছে। লাইনের ওপারের বস্তির গণেশ, ফটিকরাও নেমে পড়েছে কাঠাম ধরার লড়াইয়ে। সপসপে শরীরে পাড়ে বসে একটু জিরিয়ে নেয় টুবলু। জল বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
– টুবলু, অগ্রণী সংঘের ঠাকুরের কাঠামটা ধরতেই হবে। মোটা গরান কাঠের মজবুত কাঠাম। ভালো দাম পাওয়া যাবে। এই রশিটা ধর।ঠাকুর জলে পড়লেই আংটাটা জুড়ে দিবি। আমি পেছন থেকে ঠেলে ঠাকুরগুলোকে জলে ভাসিয়ে দেবো। বুঝলি?-- বাবলার নির্দেশের সবটুকু শোনার অপেক্ষায় না থেকে টুবলু জলে নেমে পড়ে।
পাড়ের ওপর থেকে জয়ধ্বনি ওঠে – বল, দুর্গা মাঈকী জয়। ঢাকীরা বিসর্জনের বাজনা বাজিয়ে সবাইকে তাতিয়ে রাখে। টুবলু একেবারে সামনে সাঁতরে গেছে। পাড়ের ওপরের কাঠের পাটাতনের ওপর থেকে নেমে আসছে অগ্রণী সংঘের প্রতিমা। আসছে, আসছে। ওমা! একি! টাল খেয়ে প্রতিমা ভেঙে পড়ে পাড়ের কাছেই। গেল গেল রব ওঠে চারিদিকে। বিশালদেহী প্রতিমা ভেঙে পড়ে টুবলুর ওপর। কেউই টের পায়না।কোনো রকমে দড়িতে বাঁধা আংটাটা কাঠামোতে আটকায় টুবলু। তারপর তলিয়ে যেতে থাকে কোম্পানি পুকুরের অতলান্ত গভীরতায়।
ঘরের সামনের সেই এক চিলতে জমিতে শান্তি চুপচাপ বসে থাকে টুবলুর অপেক্ষায়। রাতের শেষ আপ বনগাঁ লোকাল হালকা কুয়াশার পর্দা সরিয়ে করুণ সুরে হর্ন বাজাতে বাজাতে রেলগেটের সীমানা পেরিয়ে মৃদু গতিতে পাড়ি জমায় নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে।
শুক্লা ত্রয়োদশী।
২৩ অক্টোবর,২০২৬।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।