এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • অণুগল্প -- ভাসান 

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১২১ বার পঠিত
  • অণুগল্প -ভাসান
     
    রেললাইনের দুপাশে সার দিয়ে থাকা বেশ কিছু শ্রীহীন গরীব চেহারার কুঠুরি। সাধারণ লোকজন অবশ্য এগুলোকে ঝোপড়ি বস্তি বলেই ডাকে। পুজোর আগে আগেই এগুলোকে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেবার কথা হয়েছিল, কি একটা কারণে আপাতত বসতি বিসর্জন পর্বটি বেশ কিছু দিনের জন্য পিছিয়ে গেছে। ভাঙতে তো আর সময় লাগে না। বুলডোজার এনে চালিয়ে দিলেই হলো। নিমেষেই কতো মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু কেড়ে নিয়ে মানুষজনকে আরও অসহায় করে তোলা।
     
    নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুর সামনে এক ফালি ফাঁকা জায়গায় বসে বসে নানান কথা ভাবছিলো টুবলু। এখানে নিজেদের জমি বলে কিছু নেই, সবটাই এজমালি। তাকে ঘিরেই সুখ দুঃখ আর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করা। এবার পুজো বেশ খানিকটা পিছিয়ে এসেছে। টুবলুদের বস্তিতে পুজোর পাট নেই। লাইন পেরিয়ে কিছুটা গিয়ে ঘোষপাড়াতে পুজো হয়। টুবলুর মা শান্তি সেখানেই অঞ্জলি দিতে যায়। পাঁচ বাড়িতে ঠিকে কাজ করে,তাই এই সময় নতুন কাপড় বেশ কয়েকটা জুটে যায়। শান্তি অবশ্য নিজের ইচ্ছেমতো কেনাকাটার জন্য অনেক বাড়ি থেকেই বোনাসের টাকা চেয়ে নেয়। মায়ে পোয়ে একে অপরের অবলম্বন হয়ে দিব্যি বেঁচে আছে লড়াই করে। ঘোষপাড়ার মণ্ডপ থেকে ঘোষণার আওয়াজ ভেসে আসে – আজ মহানবমী। আজ সন্ধ্যায় আমাদের প্যান্ডেলে……। এখান থেকে বেশ শুনতে পায় টুবলু।
     
    সন্ধে উৎরেছে অনেকক্ষণ।৭ টা ২২এর ডাউন বনগাঁ লোকাল শরীর ভর্তি করে মানুষ নিয়ে চলে গেল শিয়ালদার উদ্দেশ্যে। টুবলুদের প্রান্তিক জীবন ট্রেনের আসা যাওয়ার সুরের সঙ্গে বাঁধা। মা শান্তি গেছে বস্তির অন্যান্য মেয়ে বৌদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে। টুবলুকেও বলেছিল সঙ্গে যেতে, ঘর পাহাড়ার বাহানা দেখিয়ে সে এড়িয়ে গেছে।
     
    -এই টুবলু,টুবলু? বাড়ি আছিস্ ?
    - বাবলার গলা না! টুবলু ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
    - কাল দশমী, ঠাকুরের বিসর্জন। যাবি,কাঠাম ধরতে কোম্পানির পুকুরে? তুইতো সাঁতার জানিস। তাই তোকে বলতে এলাম। যাবি কিনা বল? আমরা পাঁচজন যাব। কাঠামগুলো জল থেকে তুলে খড় ছাড়িয়ে পাল পাড়ায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। যাবি কিনা বল? এপাড়ার অনেকেই রাজি।
     
    টুবলু একটু ইতস্তত করে। কাঠাম ধরার কাজ সে কখনো করেনি। মাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে যাওয়াটা….। টুবলু দোটানায় পড়েছে দেখে বাবলা তাড়া দেয়।
    -যাবি কিনা পষ্টাপষ্টি করে বলে দে। বাবলা অধৈর্য হয়ে পড়ে।
    হ্যাঁ আর না এর টানাপোড়েনের জটিলতা কাটিয়ে টুবলু রাজি হয়ে যায়। মৃদু স্বরে বলে – যাব।
     
    আজ দশমী। কোম্পানির পুকুর পাড়ে আজ লোকে লোকারণ্য। এই তল্লাটের সমস্ত প্রতিমার ভাসান এখানেই হয়। আলো দিয়ে জায়গাটাকে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে বাড়ির প্রতিমাদের নিরঞ্জনের পালা। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে সমানে। ঘোষণা অনুযায়ী একে একে সাহা বাড়ি, ঘোষাল বাড়ি,দত্ত বাড়ির একচালা প্রতিমাগুলো জলে পড়ে। দড়িতে বাঁধা আংটা কাঠামোতে আটকে দিলে ওগুলোকে পাড়ের দিকে টেনে আনে বাকিরা। বাবলারা এরমধ্যেই অনেকগুলো কাঠাম ধরে ফেলেছে। লাইনের ওপারের বস্তির গণেশ, ফটিকরাও নেমে পড়েছে কাঠাম ধরার লড়াইয়ে। সপসপে শরীরে পাড়ে বসে একটু জিরিয়ে নেয় টুবলু। জল বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
     
    – টুবলু, অগ্রণী সংঘের ঠাকুরের কাঠামটা ধরতেই হবে। মোটা গরান কাঠের মজবুত কাঠাম। ভালো দাম পাওয়া যাবে। এই রশিটা ধর।ঠাকুর জলে পড়লেই আংটাটা জুড়ে দিবি। আমি পেছন থেকে ঠেলে ঠাকুরগুলোকে জলে ভাসিয়ে দেবো। বুঝলি?-- বাবলার নির্দেশের সবটুকু শোনার অপেক্ষায় না থেকে টুবলু জলে নেমে পড়ে।
     
    পাড়ের ওপর থেকে জয়ধ্বনি ওঠে – বল, দুর্গা মাঈকী জয়। ঢাকীরা বিসর্জনের বাজনা বাজিয়ে সবাইকে তাতিয়ে রাখে। টুবলু একেবারে সামনে সাঁতরে গেছে। পাড়ের ওপরের কাঠের পাটাতনের ওপর থেকে নেমে আসছে অগ্রণী সংঘের প্রতিমা। আসছে, আসছে। ওমা! একি! টাল খেয়ে প্রতিমা ভেঙে পড়ে পাড়ের কাছেই। গেল গেল রব ওঠে চারিদিকে। বিশালদেহী প্রতিমা ভেঙে পড়ে টুবলুর ওপর। কেউই টের পায়না।কোনো রকমে দড়িতে বাঁধা আংটাটা কাঠামোতে আটকায় টুবলু। তারপর তলিয়ে যেতে থাকে কোম্পানি পুকুরের অতলান্ত গভীরতায়।
     
    ঘরের সামনের সেই এক চিলতে জমিতে শান্তি চুপচাপ বসে থাকে টুবলুর অপেক্ষায়। রাতের শেষ আপ বনগাঁ লোকাল হালকা কুয়াশার পর্দা সরিয়ে করুণ সুরে হর্ন বাজাতে বাজাতে রেলগেটের সীমানা পেরিয়ে মৃদু গতিতে পাড়ি জমায় নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে।
     
     
    শুক্লা ত্রয়োদশী।
    ২৩ অক্টোবর,২০২৬।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১২১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ritabrata Gupta | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:২৯743439
  • এটাতে আর মতামত দেওয়া গেলোনা ! মনটা খারাপ হয়ে গেল . ভালো থাকবেন সবাই .
  • Sangita Bhattacharjee | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০743440
  • সত্যি বলতে এই গল্পটা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল ---- তাই যদি টুবলু বেঁচে ফিরে আসত তবে বেশি ভালো লাগতো। " চলে যাওয়া টা বড় সোজা, ফিরে আসে কজন?" যারা অপেক্ষায় থাকে, তারা বেঁচে মরে থাকে।
  • Somnath mukhopadhyay | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৩৪743446
  • @ ঋতব্রত বাবু ও সঙ্গীতা দেবী
    জীবনে সুখ আনন্দ যেমন আছে বিচ্ছেদ বেদনাও যে রয়েছে। একটাকে মেনে নিতে পারলে অন্যটাকেও যে মানতে হবে। পাঠকদের চাহিদা মানতে হলে যে লেখকের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে হয়। দুঃখ ভাগ করে নেবার অনুরোধ রইলো।
  • #+: | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:০৯743449
  • গল্পকার উৎসবের আনন্দের মধ্যে এমন ব্যথা ভরা কাহিনি নিয়ে এসে আমাদের সবার মন ভিজিয়ে দিয়েছেন। কেবলমাত্র গল্পের জন্য লেখক এই কাহিনি লেখেননি, সমাজের প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের জীবন যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। টুবলুরা এখনও লড়াইয়ের ময়দানে আছে।ধন্যবাদ জানাই লেখককে।
  • skm | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪১743454
  • গল্পটা প্রেডিক্টবল। যখন টুবলু কাঠ তুলতে
    গেলো তখন
    বোঝা গেলো যে ও
    আর
    ফিরবে না .
  • Somnath mukhopadhyay | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২২:০৮743492
  • @ SKM
    মতামত জানানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। একটা গল্পের পরিণতি কী হবে তা গল্পকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। গল্পের শেষটা কী হবে তা যে পাঠক আগাম বুঝতে পারেন তিনি সচেতন পাঠক। গল্পকারের সূত্র নিয়ে তিনি কাহিনির পরিণতি খুঁজে নেন। যিনি তা বুঝতে পারেন না তিনি নানান সম্ভাবনা হাতড়ে বেড়ান। অপেক্ষা করেন শেষ পর্যন্ত। দু ধরনের পাঠকদের নিয়েই কাহিনিকারকে চলতে হয়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন।