এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  বাকিসব  মোচ্ছব

  • অঞ্জলি 

    Saswati Basu লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত
  •  
    • হ্যালো মিঃ রয়, হ্যালো, আলতো করে পুজুর কাঁধটা স্পর্শ করে নার্স কেটি। কিন্তু বৃথা। পুজু গভীর ঘুমে মগ্ন। কেটি আর একবার চেষ্টা করতেই ধড়মড় করে উঠে বসে পুজু। নার্স কেটি জানাতে এসেছিলেন যে বারবারার জ্ঞান ফিরেছে। চোখ মেলেই সে প্রথমেই পুজুর নাম করেছে।

    তড়িৎ গতিতে উঠে পুজু রওয়ানা দেয় বারবারার ওয়ার্ডের দিকে।কী যে সব স্বপ্ন দেখছিল সে। মুখের ভেতরটা তেতো হয়ে রয়েছে। চোখও জ্বালা করছে। খুব খাটুনি গেছে তার গতকাল সারা দিন সারা রাত। সারাদিনে কী খেয়েছে মনে করতে পারলো না সে। আসলে খাবার কথা তার মনেও হয় নি। ফোনে বারবারার ছেলেমেয়েদের ধরতে তার সারাদিন গেছে। আর ঘন ঘন ডাক্তারের সাথে কথা বলতে।

    সকালের দিকে এমারজেন্সিতে ভর্তি করেছিলো পুজু বারবারাকে। ওঁর জ্ঞান ফেরে নি সারাদিনেও। বারবারার বয়েস সাতানব্বই। তারপর রাতের দিকে বারাবারার অবস্থা আরও খারাপ হয়। পুজুর বাড়ি ফেরা হয়নি গতকাল। হসপিটালে বসেই ছিল। আশা করেছিলো বারবারা হয়তো যে কোন সময়ে চোখ মেলে তাকাবে।

    দুর্গাপূজোর ষষ্টি ছিল গতকাল।দক্ষিণ গোলার্ধের এই দেশে সপ্তাহান্তে ছুটির দিনই পূজো হয় সচরাচর। সকাল সকাল গেছিল পুজোমণ্ডপে যাতে অঞ্জলিটা দিতে পারে। মনে মনে হাসে পুজু । কলকাতায় কোনোদিন কি অঞ্জলি দিতে গেছে ও। রাত জাগত বন্ধুদের সাথে হই হই করে। দেরি করে উঠত মার তাড়া খেয়ে। আর এখানে? নিয়ম করে অঞ্জলি দেয়। একা একা বিদেশে বসে তার দিন কাটছে।এই একার জীবন তাকে অনেক বদলে দিয়েছে। কে যেন বলেছিলেন ……অপ্রবাসী যে - সেই সুখী। এখন কথাটার অর্থ সে ভালই বুঝতে পারে … ঠিক তখনই মণ্ডপে ঢুকতে যেতেই বারবারার ফোনটা পেয়েছিল পুজু। খুব ক্ষীণ স্বরে বারবারা বলেছিল তার এখনই হেল্প দরকার।পুজু ছুটেছিল তক্ষুনি।পুজো, অঞ্জলি টঞ্জলি সব ফেলে।

    বারবারার ছেলেমেয়েরা সবাই বিদেশে থাকে।পুজু মাঝে মাঝে ফোনে বারবারার খবর নেয় দরকার মত। বারবারা ওকে স্নেহ করেন সন্তানের মত। দুর্গা পুজো যেই স্কুলবাড়িতে হয় এখানে, তার গায়েই বারবারার বাড়ি। বারবারাকে দুর্গাপূজোর সময় তার বারান্দায় বসে থাকতে দেখেছে কয়েকবার। একলা। চুপচাপ। পুজোর আনন্দ থেকে অনেক অনেক দূরে। পুজুর খারাপ লাগত দেখে।

    গত বার পুজোর সময় একদিন সে নিজেই বারবারার সঙ্গে আলাপ করেছিলো গিয়ে। কোন অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে গেছিলো তা সে নিজেই জানে না। কিম্বা হয়ত বারবারার মধ্যে পুজু তার নিজের একাকিত্বের ছবিও দেখতে পেয়েছিল।

    বারবারা একাই থাকে। বারবারাকে অনেকবার ছেলেমেয়েরা বলেছে ওদের সঙ্গে থাকতে। কিন্তু বারবারার সেটা মনপুত নয়।
    • ওদেরও তো স্পেস দরকার বলো ? উল কাঁটায় হাই-নেক জাম্পারের গলা তুলতে তুলতে বারবারা যেন বেশি মনযোগী হয়ে পড়েছিল । তারপরেই বলেছিল
    • অবশ্য আমারও দরকার।
    বারবারা সেলাই করে। নিপুণ ঘর সাজায়। নিজেই পর্দা বানায় জানলার দু তিন লেয়ারের। পোষ্য আছে। তার ব্লাঙ্কেট, বিছানা জামাকাপড় বানায়। সে আর্মি-উইডো ক্লাবের সক্রিয় সদস্য। জামাকাপড় বানিয়ে সে ক্লাবকে ডোনেট করে।
    বারবারা এবার গত রাতে ঘুমের মধ্যে খাট থেকে পড়ে গেছে হটাৎ । উঠতে চেষ্টা করেছিল। পারে নি। কোমরের অসহ্য ব্যথাতে সে নড়তে পারছিলো না। সারারাত সকাল একটু একটু করে সরে সরে সে তার মোবাইলের নাগাল পেয়েছিল। পুজুকে ফোন সে সময়।

    এমারজেন্সিতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে বারবারাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পুজু তারপর সারাদিন কাটিয়েছে বারবারার খবরটা ওঁর ছেলেমেয়েকে জানানোর জন্য। তারপর অনেক রাতেও যখন বারবারা অজ্ঞান তখন নার্সের দেওয়া একটা শোবার জায়গা জোগাড় করে শুয়ে পড়েছিল।

    আজ বারবারার যখন জ্ঞান ফিরেছে তখন এই দক্ষিণ গোলার্ধে সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ। কিন্তু বহু বহু দূরে উত্তর গোলার্ধে একটি গ্রামে তখন সবে ভোর হচ্ছে। পুজুর পৈত্রিকবাড়ির পুজোতে মা দুর্গা বেদিতে উঠছেন। পুজু তখন বারবারার বেডের সামনে। পুজুকে দেখেই বারবারা শীর্ণ একটি হাত তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। পুজু বারবারার হাতটি দুহাতের অঞ্জলিতে পরম মমতায় ভরে নেয়। বুকের কাছে ধরে। যেন অঞ্জলির ফুল।বারবারার চোখ বেয়ে জল তার শীর্ণ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। পুজু চোখ বন্ধ করে সে হাত ধরে।
     
    চেতনায় বাজতে থাকে
    “......হর রোগং, হর ক্ষোভং, হর মারীং, হরপ্রিয়ে...” – যেন পুজু অঞ্জলি দিচ্ছে।

    আজ দুর্গাপুজোর সপ্তমী।

     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন।