এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  ইতিহাস  ইস্পেশাল

  • আগুনে গড়া হাজার বছর ২

    সুকান্ত ঘোষ
    আলোচনা | ইতিহাস | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০২ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি

    সঙ্গের ছবিগুলি : সুকান্ত ঘোষ



    ভারতের লোহা-ইস্পাতের গল্প - দ্বিতীয় পর্ব: কারিগর ও সেই দীর্ঘ সন্ধ্যা


    আগের পর্বের সূত্র ধরে


    প্রথম পর্বে দেখেছিলাম, দক্ষিণ ভারতের কামারশালায় জন্ম নেওয়া উওৎজ ইস্পাতের জন্য গ্রিস-রোম-পারস্য কীভাবে হাঁ করে বসে থাকত। রোমের বিশ্বকোষকার প্লিনি একে বলেছিলেন দুনিয়ার সেরা লোহা। কিন্তু এত সুন্দর এই ইস্পাত গড়া হত কীভাবে, কারা গড়তেন, আর তা দিয়ে কী কী আশ্চর্য কাজ হত - সেই গল্প এবার। এবং শেষে দেখবো যে কী করে এমন এক গৌরব আমরা প্রায় নিঃশব্দে হারিয়ে ফেললাম।

    যেভাবে গড়া হত সেই জাদু


    গোপনটা রহস্যটা লুকিয়ে ছিল আগুনে আর ধৈর্যে। প্রাচীন যুগে সাধারণ লোহা কখনো গলানো যেত না, লোহা গলতে লাগে প্রায় সাড়ে পনেরোশো ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেই তাপ ছিল নাগালের বাইরে। কামাররা তাই লোহার তালকে শুধু লালচে গরম করে হাতুড়ি পিটিয়ে আকার দিতেন। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের কারিগররা ধরেছিলেন এক অন্য পথ। ছোট মাটির পাত্রে (ক্রুসিবল) তাঁরা ভরতেন লোহা, সঙ্গে কাঠকয়লা কিংবা বিশেষ কিছু গাছের পাতা-ডাল, যেগুলো কার্বনের জোগান। তারপর পাত্রের মুখ মাটি দিয়ে সিল করে ঢুকিয়ে দিতেন প্রচণ্ড আঁচের চুল্লিতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।



    এই বন্ধ পাত্রের ভেতরে আশ্চর্য কাণ্ড ঘটত। বাইরের বাতাস ঢুকতে পারত না বলে লোহা পুড়ে ছাই হত না, বরং ধীরে ধীরে কাঠকয়লা থেকে কার্বন টেনে নিত; আর কার্বন মিশতে মিশতে লোহার গলনাঙ্ক নেমে আসত, ফলে বন্ধ পাত্রেই লোহা সত্যিই গলে যেত। জমে উঠত অতি-উচ্চ কার্বনের ইস্পাতের এক ছোট্ট, ভারী পিণ্ড - যাকে বলে “কেক”। ইউরোপ এই “ক্রুসিবল স্টিল”-এর কৌশল রপ্ত করবে আরও হাজার বছরেরও বেশি পরে, অষ্টাদশ শতকে গিয়ে, বেঞ্জামিন হান্টসম্যানের হাত ধরে। ততদিনে ভারত এই কাজ করছে বহু শতাব্দী।

    গোটা কাজটা ছিল আসলে ধৈর্যের পরীক্ষা। একেকটা ক্রুসিবল চুল্লিতে বসিয়ে রাখতে হত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো কখনো প্রায় সারা দিন; তারপর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে দেওয়া হত, যাতে ভেতরের গঠন ঠিকঠাক জমে। শেষে পাত্রটা ভেঙে বেরিয়ে আসত ছোট্ট, চ্যাপ্টা এক ইস্পাত-চাকতি বা “কেক” - ওজনে হয়তো এক-দেড় কিলো। এই কাঁচা চাকতিগুলোই তারপর বস্তাবন্দি হয়ে জাহাজে চেপে পাড়ি দিত পারস্য-আরবের বাজারে, যেখানে স্থানীয় কামাররা তা পিটিয়ে গড়ত তলোয়ার। অর্থাৎ ভারত ছিল যেন গোটা প্রাচীন দুনিয়ার ইস্পাত-কারখানা, তার পণ্য গড়ে উঠত সুদূর বিদেশের হাতে।

    আসল ম্যাজিক অবশ্য ঘটত ঠান্ডা হওয়ার সময়। ধীরে ধীরে জমতে জমতে ইস্পাতের ভেতরে কার্বন সাজিয়ে ফেলত সারি সারি অতি-সূক্ষ্ম কার্বাইডের স্তর; সেই স্তরই ফলার গায়ে ভেসে উঠত জল-রেশমের ঢেউ হয়ে। এখানেই ছিল আসল কারিগরি, কামার জানতেন, ফলা গড়ার সময় ধাতুকে বেশি গরম করা চলবে না; বেশি তাপে ওই সূক্ষ্ম নকশা মুছে যায়। তাই তুলনায় কম তাপে, ধৈর্য ধরে পিটিয়ে গড়তে হত, যাতে নকশাটা অক্ষত থাকে। কামার হয়তো জীবনে “কার্বাইড” শব্দটাই শোনেননি, কিন্তু তিনি শুধু জানতেন কোন আকরিক নিতে হবে, কতক্ষণ পোড়াতে হবে, আগুনের রং কেমন হলে থামতে হবে।

    আধুনিক গবেষণায় ধরা পড়েছে, উওৎজের মতো অতি-উচ্চ-কার্বন ইস্পাত আশ্চর্যরকম নমনীয় করে গড়া যায় (বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন “সুপারপ্লাস্টিসিটি”) - যে গুণটা আজকের ধাতুবিজ্ঞানেও মহার্ঘ। অর্থাৎ যাকে আমরা নিছক পুরনো কামারের কাজ ভাবি, তা আসলে ছিল ভয়ানক সূক্ষ্ম এক প্রযুক্তি। তবে সব যে সবসময় নিখুঁত হত, তা-ও নয়। তেলঙ্গানার কোনাসমুদ্রমের মতো জায়গায় পাওয়া কিছু ভাঙা ক্রুসিবলে দেখা গেছে, চেষ্টা সফল হয়নি - ভুল আঁচে জন্মেছে ভঙ্গুর সাদা কাস্ট আয়রন। কৃতিত্বটা তাই আরও বড়, কারণ এই ব্যর্থতার ঝুঁকি সামলেই তাঁরা বারবার নিখুঁত ইস্পাত গড়তেন, কোনো মাপযন্ত্র ছাড়াই, নিছক অভিজ্ঞতার জোরে।

    কারা গড়তেন এই লোহা


    এবার একটু সেই মানুষগুলোর কথা, যাঁদের নাম ইতিহাস বেশিরভাগ সময় মনে রাখেনি। মধ্য আর পূর্ব ভারতের অগরিয়া, অসুর, লোহার, বিরজিয়া, কোল, হো - এমন নানা জনজাতির হাতেই বংশপরম্পরায় গড়ে উঠত লোহা। তাঁদের কাছে লোহা-গলানো নিছক পেশা ছিল না, ছিল প্রায় এক পবিত্র আচার। চুল্লিকে ভাবা হত মায়ের গর্ভের মতো যেখান থেকে জন্ম নেয় ধাতু। চুল্লি বসানোর আগে হত পুজো-বলি, মেনে চলা হত নানা নিয়ম-নিষেধ; কারণ গোটা ব্যাপারটাকে দেখা হত জন্মের এক রূপক হিসেবে।

    যন্ত্রপাতির যুগের বহু আগে, এঁরা প্রকৃতিকে পড়তেন নিছক ইন্দ্রিয় দিয়ে। আগুনের রং দেখে বুঝতেন তাপ কতটা; আকরিকের চেহারা-ওজন হাতে নিয়ে বুঝতেন মান; হাওয়ার টান, ধোঁয়ার গন্ধ, সবই ছিল তাঁদের যন্ত্র। কোনো থার্মোমিটার নেই, কোনো বইয়ে লেখা সূত্র নেই, শুধু বাবার হাত থেকে ছেলের হাতে চলে-আসা এক নিঃশব্দ শিক্ষা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যে ইস্পাত একদিন রোম-পারস্যের বাজার মাতিয়েছিল, তার পিছনে ছিল এই নাম-না-জানা মানুষগুলোর ঘাম আর ইন্দ্রিয়-জ্ঞান।

    শেখার পথটাও ছিল কঠিন আর দীর্ঘ। ছোটবেলা থেকেই ছেলেরা বাবা-কাকার পাশে বসে হাপর টানত, কাঠকয়লা ভাঙত, চুল্লির যত্ন নিত; বছরের পর বছর দেখতে দেখতে, হাত পোড়াতে পোড়াতে তবে আয়ত্ত হত আসল কাজ। কোনো লিখিত পরীক্ষা ছিল না, ছিল শুধু আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করা। এই গোটা জীবনটা জড়িয়ে থাকত গান, গল্প আর বিশ্বাসের সঙ্গে - চুল্লির প্রতিটি ধাপের জন্য ছিল আলাদা সুর, আলাদা মন্ত্র। কাজ আর সংস্কৃতি এখানে আলাদা ছিল না, মিশে ছিল একই আগুনে।



    এই কারিগরদের কথা যে একেবারে হারিয়ে যায়নি, তার জন্য আমরা একজনের কাছে অসম্ভব ঋণী। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ভেরিয়ার এলউইন ১৯৪২ সালে মধ্য ভারতের অগরিয়া সম্প্রদায়ের লোহা-গলানো নিয়ে একটি অসামান্য বই লেখেন যার নাম “দ্য অগরিয়া”। বইটি তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন শিল্পপতি জে. আর. ডি. টাটা, এবং বইটি উৎসর্গও করা হয় তাঁকেই। কী চমৎকার এক বৃত্ত ভাবুন, যে আধুনিক টাটা-গোষ্ঠী ভারতে ইস্পাত-শিল্প ফিরিয়ে আনবে, তারাই যত্ন করে লিখিয়ে রাখল সেই আদিম কারিগরদের কথা, যাঁরা হাজার বছর ধরে চুপচাপ লোহা গড়ে গেছেন। এলউইন লিখেছিলেন, এঁদের জীবনে লোহা আর কিংবদন্তি এমনভাবে জড়িয়ে যে চুল্লির প্রতিটি ধাপের সঙ্গে বাঁধা আছে একটি করে গান, একটি করে গল্প।
    আজ আমরা তলোয়ার বা থামের গল্প করি, কিন্তু যাঁদের হাতে সেসব গড়া, সেই কারিগরদের নাম প্রায় কেউ জানি না। ইতিহাস বইয়ে রাজা-বাদশার নাম থাকে, যুদ্ধের তারিখ থাকে; কিন্তু যে অগরিয়া বা অসুর মানুষটি সারা রাত জেগে চুল্লির আগুন সামলেছেন, তাঁর নাম কোথাও লেখা থাকে না। অথচ তাঁদের সেই নীরব শ্রম আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের জমানো জ্ঞান ছাড়া এই গোটা গৌরবের গল্পটাই অসম্ভব ছিল। তাই এই লেখায় অন্তত তাঁদের একটুখানি মনে করে রাখি - গৌরবের আসল কারিগর তো তাঁরাই।

    লোহা দিয়ে নিরাময় - অস্ত্র নয়, অস্ত্রোপচার


    এবার গল্পের সবচেয়ে গর্বের দিকটায় একটু নজর দেওয়া যাক। লোহা মানেই তো শুধু যুদ্ধ-অস্ত্র নয়। ভারত এই ধাতুকে এমন নিখুঁতভাবে গড়তে শিখেছিল যে, তা দিয়ে বানানো হল শল্যচিকিৎসার যন্ত্র। আয়ুর্বেদের দুই মহাগ্রন্থ হল চরক সংহিতা (মূলত ওষুধ-চিকিৎসা) আর সুশ্রুত সংহিতা (শল্যচিকিৎসা)। চরক সংহিতাতেই আছে তিনশোরও বেশি উদ্ভিদ, শতাধিক প্রাণিজ আর ষাটেরও বেশি খনিজ উপাদানের এক বিরাট ভেষজ-ভাণ্ডার - সে-যুগের হিসেবে রীতিমতো বিস্ময়কর। আয়ুর্বেদকে ভাগ করা হত আটটি শাখায় (অষ্টাঙ্গ), যার একটি ছিল সরাসরি শল্যচিকিৎসা, “শল্যতন্ত্র”।

    চরকের ব্যবস্থাটা ছিল আশ্চর্যরকম আধুনিক মেজাজের। রোগ সারানোর চেয়ে রোগ ঠেকানোয় জোর, খাদ্য-জীবনযাত্রা-ঋতু অনুযায়ী পথ্যের বিধান, রোগ নির্ণয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ - এসবই সেখানে বিশদে লেখা। এ কোনো গ্রন্থাগারের কোণে চুপচাপ পড়ে থাকা পুঁথি ছিল না, বরং শত শত বছর ধরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় এই বিদ্যা পড়ানো হয়েছে, রোগীর শয্যাপাশে প্রয়োগ হয়েছে, বারবার সংশোধিত-পরিমার্জিত হয়েছে। বিদ্যা মানে এখানে ছিল জীবন্ত এক ধারা, নিছক পুরনো কাগজ নয়।

    সুশ্রুতকে আজ বিশ্বজুড়ে বলা হয় “শল্যচিকিৎসার জনক”। তাঁর গ্রন্থে বর্ণিত আছে তিনশোরও বেশি অস্ত্রোপচার, আট রকম শল্যকর্ম (ছেদন, ভেদন, লেখন বা আঁচড় কাটা, বেধন বা ফুটো করা, অনুসন্ধান, আহরণ বা নিষ্কাশন, রক্তমোক্ষণ, আর সীবন বা সেলাই), আর একশো একুশ রকমের যন্ত্র - একশো একটি ভোঁতা (যন্ত্র) আর কুড়িটি ধারালো (শস্ত্র)। তিনি বলতেন, সব যন্ত্রের সেরা যন্ত্র আসলে শল্যচিকিৎসকের নিজের হাত; হাত ছাড়া বাকি সব যন্ত্রই অচল। ধারালো যন্ত্রের ধার নাকি হতে হবে এমন, যাতে চামড়ার ওপর একটা চুলকে চিরে দুই-ফালি করা যায়! বহু যন্ত্রের আকার ছিল আবার পাখি আর পশুর ঠোঁট বা চোয়ালের মতো যা দিয়ে শরীর থেকে টেনে বার করা হত বিঁধে থাকা তীর বা কাঁটা।



    যন্ত্র গড়ার উপকরণ নিয়েও সুশ্রুতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল। বেশিরভাগ ধারালো যন্ত্র হত ভালো লোহা বা ইস্পাতের, কিছু আবার গড়া হত “পঞ্চলোহ” অর্থাৎ পাঁচ ধাতুর সংকর দিয়ে। ধার ঠিক আছে কি না, তা পরখ করার নিয়মও ছিল। কেউ কেউ বলতেন, ফলা এমন ধারালো হবে যে ভাসমান চুল ফুঁ দিয়ে ধরলে কেটে যায়। প্রতিটি যন্ত্রের মাপ, হাতল, ব্যবহার - সব খুঁটিয়ে লেখা। এ যেন এক পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল-নির্দেশিকা, শুধু সেতু বা যন্ত্রের নয়, মানুষের শরীর সারানোর হাতিয়ারের।

    এমন চুলচেরা ধারালো ফলা তো এমনি এমনি হয় না! এখানেই ভারতের ধাতুবিদ্যার আসল কেরামতি। কামাররা লোহাকে কাঠকয়লার সরাসরি সংস্পর্শে বারবার গরম করে, পিটিয়ে, আবার গরম করে ফলার গায়ে বসিয়ে দিতেন এক পাতলা ইস্পাতের আস্তরণ - সেই শক্ত, ধারালো প্রান্তই একটা যন্ত্রকে করে তুলত অস্ত্রোপচারের যোগ্য। সুশ্রুত স্পষ্ট বলেছেন, দক্ষ কামার দিয়ে ভালো লোহা বা ইস্পাতেই এই যন্ত্র বানাতে হবে। অর্থাৎ ভারতের ধাতুবিদ্যা আর চিকিৎসাবিদ্যা এগিয়েছিল হাত ধরাধরি করে - একটা ছাড়া অন্যটা অসম্ভব ছিল।

    সুশ্রুত শুধু ধারেই থামেননি, জোর দিতেন পরিচ্ছন্নতায়। যন্ত্র রাখতে হবে ঝকঝকে, আর অস্ত্রোপচারের ঘর শুদ্ধ করতে হবে ধোঁয়ায় (ধূপন) - সরষে, লবণ, ঘি পুড়িয়ে বাতাস পরিষ্কার। জীবাণুর কথা মানুষ জানার বহু হাজার বছর আগে, এ ছিল এক ধরনের অ্যান্টিসেপসিস। শরীরের ভেতরটা চিনতে তিনি শবদেহের অনুশীলনেও জোর দিতেন - একটা মৃতদেহকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে দিয়ে স্তরে স্তরে শরীরের গঠন দেখা, সে যুগে এ ছিল অসাধারণ এক পদ্ধতি। শেখানোর সময় ছাত্রদের প্রথমে লাউ, মোম, মরা পশুর গায়ে হাত পাকাতে হত; জ্যান্ত রোগীর শরীরে ছুরি চালানোর অনুমতি মিলত বহু অভ্যাসের পরে।

    তাঁর সবচেয়ে চমকপ্রদ কীর্তি ছিল কেটে-ফেলা নাক আবার জুড়ে দেওয়া, যাকে বলে রাইনোপ্লাস্টি। কপালের চামড়া থেকে এক টুকরো মাংস নিয়ে সেই কাটা নাক নতুন করে গড়ার “ফোরহেড ফ্ল্যাপ” পদ্ধতি আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারিতেও আজও ব্যবহৃত। ছানি কাটার অস্ত্রোপচারও তাঁর গ্রন্থে বর্ণিত। মধ্যযুগে আরব পণ্ডিতরা চরক-সুশ্রুতের গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করেন, আর সেই সূত্রে ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম এশিয়া হয়ে ইউরোপে। ভারতের ইস্পাত-ফলা আর ভারতের চিকিৎসা - দুটোই যাত্রা করেছিল একই বাণিজ্যপথ ধরে।

    এবার শুনুন এমন এক সত্যি ঘটনা, যা রূপকথাকেও হার মানায়। ১৭৯৪ সালে কাওয়াসজি নামের এক গরুর গাড়ির চালকের নাক কেটে নেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় এক কারিগর-চিকিৎসক সেই প্রাচীন কপাল-ফ্ল্যাপ পদ্ধতিতে তাঁর নাক নতুন করে গড়ে দেন। ঘটনাটা স্বচক্ষে দেখেন কয়েকজন ব্রিটিশ শল্যচিকিৎসক, আর তার বিবরণ ছাপা হয় সেকালের এক পত্রিকায়। সেই লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে ইংল্যান্ডের সার্জন জোসেফ কার্পিউ ১৮১৪ সালে সেই “হিন্দু পদ্ধতি” নিজে প্রয়োগ করেন আর সেখান থেকেই পশ্চিমে আধুনিক নাক-গড়ার শল্যচিকিৎসার সূত্রপাত। ভাবুন একবার যে ভারতের কালো ধাতুর ফলায় জন্ম নেওয়া এক কৌশল, শতাব্দী পেরিয়ে পৌঁছে গেল গোটা দুনিয়ার অপারেশন থিয়েটারে।

    এই গল্পটায় একটা কথা ভেবে দেখার মতো। জ্ঞান কখনো একমুখী নয়। ভারত একদিন গ্রিস-রোম-আরবকে ইস্পাত জুগিয়েছে, চিকিৎসার পাঠ দিয়েছে; আবার পরের যুগে ভারত পশ্চিমের কাছ থেকে শিখেছে আধুনিক বিজ্ঞান, কারখানার প্রযুক্তি, নতুন যন্ত্রপাতি। সভ্যতা এভাবেই এগোয় - দেওয়া-নেওয়ার এক নিরন্তর স্রোতে, যেখানে কেউ চিরকালের গুরু নয়, কেউ চিরকালের ছাত্র নয়। তাই “আমরাই সব আবিষ্কার করেছি” বলে বুক ফোলানোরও দরকার নেই, আবার নিজেদের সত্যিকারের কীর্তিকে হেলাফেলা করে ভুলে যাওয়ারও কোনো কারণ নেই। দরকার শুধু সত্যিটা জানা, সেই সত্যির মর্যাদা দেওয়া, আর পরের প্রজন্মের হাতে তা তুলে দেওয়া।

    শুধু দিল্লি নয় - আরও থাম, আরও বিস্ময়


    লোহা গড়ায় ভারতের দক্ষতার সবচেয়ে বিখ্যাত সাক্ষী অবশ্যই দিল্লির সেই মরচেহীন লৌহ স্তম্ভ। কিন্তু তাকে নিয়ে আমি আগেই আলাদা করে লিখেছি, তাই এখানে শুধু ছুঁয়ে পাশ কাটিয়ে যাই। কারণ কম বিখ্যাত, অথচ সমান বিস্ময়কর আরও কিছু থাম-কড়িকাঠ ছড়িয়ে আছে এদেশে, যাদের কথা আমরা প্রায় জানিই না।

    মধ্যপ্রদেশের ধার শহরে পড়ে আছে এক বিশাল লোহার থাম — এখন তিন টুকরোয় ভাঙা, চতুর্থ একটি অংশ নিখোঁজ বলেই ধরা হয়। টুকরোগুলো জুড়লে উচ্চতা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তেরো মিটার, ওজন সাত হাজার কিলোরও বেশি, মানে খাড়া থাকলে এ থাম দিল্লিরটার প্রায় দ্বিগুণ উঁচু হত! আইআইটি কানপুরের ধাতুবিদ আর. বালসুব্রহ্মণ্যমের গবেষণা বলছে, এটিও বহু গরম লোহার তাল ফোর্জ-ওয়েল্ডিং করে (পিটিয়ে জোড়া দিয়ে) গড়া, আর দিল্লির থামের মতোই মরচে-প্রতিরোধী। খাড়া থাকাকালীন এটিই সম্ভবত ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ফোর্জ-ওয়েল্ডেড লোহার থাম।



    থামটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই, তাই এর নির্মাতা আর তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। স্থানীয় প্রবাদ একে জোড়ে একাদশ শতকের পরমার রাজা ভোজের নামে যিনি নিজে ধাতুবিদ্যায় আগ্রহী ছিলেন, লিখেছিলেন “যুক্তিকল্পতরু” নামের গ্রন্থ। ঔপনিবেশিক যুগে প্রত্নতত্ত্ববিদ হেনরি কাজিন্স ১৯০২-০৩ সালে ভাঙা টুকরোগুলো মেপে দেখেছিলেন। বলা হয়, মুঘল আমলে থামটিকে সরানোর চেষ্টাতেই তা ভেঙে যায়। পরে ১৯৮০ সালে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ একে শুইয়ে রাখে একটি চাতালে। এমন এক বিস্ময়কে নিয়ে আমরা কত কমই না জানি!
    ওড়িশার কোনার্কের সূর্যমন্দিরে (ত্রয়োদশ শতক) আবার ব্যবহার হয়েছিল আরও বড় মাপের পেটা-লোহার কড়িকাঠ। পাথরের ভারী গাঁথনি ধরে রাখতে লোহার বিম, যা সে যুগের প্রকৌশলের এক বিস্ময়, আর আশ্চর্যরকম মরচে-প্রতিরোধীও বটে। কর্ণাটকের কোদাচাদ্রি পাহাড়ে মূকাম্বিকা মন্দিরের কাছেও দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি প্রাচীন লোহার থাম। এই ছড়িয়ে-থাকা সাক্ষ্যগুলো একসঙ্গে যা বলে, তা হল যে বড় মাপের, মরচেহীন লোহা গড়া দিল্লির থাম কোনো বিচ্ছিন্ন অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং ছিল প্রাচীন ভারতের এক আয়ত্ত-করা, বহুস্থানে-ছড়ানো দক্ষতা।



    কিন্তু প্রশ্ন জাগে যে লোহা তো মরচে ধরে ক্ষয়ে যায়, তবে এই থামগুলো হাজার-দেড় হাজার বছর অক্ষত রইল কী করে? আধুনিক গবেষণা বলছে, এর পিছনে কোনো জাদু নেই, আছে রসায়ন। এই নিয়েও দিল্লীর লৌহ স্তম্ভের লেখায় বিস্তারিত লিখেছিলাম - এই লোহায় ফসফরাসের পরিমাণ আজকের ইস্পাতের চেয়ে অনেক বেশি, ম্যাঙ্গানিজ কার্যত নেই, সালফারও সামান্য। ফলে থামের গায়ে ধীরে ধীরে জমে ওঠে এক পাতলা, ঘন প্রতিরক্ষা-স্তর (একধরনের অক্সাইড-ফিল্ম), যা ভেতরের লোহাকে বাতাস-জলের হাত থেকে আগলে রাখে। মজার কথা, এই গুণ কামাররা হিসেব কষে আনেননি; তাঁদের আকরিক আর পদ্ধতির স্বাভাবিক ফলেই তা এসেছিল। অজান্তেই তাঁরা গড়ে ফেলেছিলেন এমন লোহা, যা সময়কে বুড়ো আঙুল দেখায়।

    হারানো শিল্প


    এবার আসি সেই রহস্যে, যা আজও বিজ্ঞানীদের ভাবায়। আধুনিক ধাতুবিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন যে উওৎজের ঢেউ-নকশা নিখুঁতভাবে ফোটার পিছনে বড় ভূমিকা ছিল কিছু বিশেষ ভারতীয় আকরিকে মিশে থাকা অতি-সামান্য মৌলের (যেমন ভ্যানাডিয়াম)। এত সামান্য যে চোখে ধরা পড়ে না, অথচ সেটুকুই ছিল নকশার চাবিকাঠি। একদিন যখন সেই বিশেষ খনির আকরিক ফুরিয়ে এল, আর মুখে-মুখে চলা রেসিপির খুঁটিনাটিও হারিয়ে গেল, তখন বহু চেষ্টাতেও সেই হুবহু নকশা আর ফেরানো গেল না। জাদুটা যেন ধোঁয়া হয়ে উবে গেল।

    এই হারানো জাদুর পিছনে ইউরোপ রীতিমতো ছুটেছিল। বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে পর্যন্ত ১৮১৯ সাল নাগাদ এই ভারতীয় ইস্পাত নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিলেন, নানা ধাতু মিশিয়ে এর রহস্য ধরার চেষ্টায় - আর সেই পরীক্ষাগুলোই পরে আধুনিক “অ্যালয় স্টিল” বা সংকর ইস্পাতের বিজ্ঞানের বীজ বুনে দেয়। সুদূর রাশিয়ায় জলাতুস্ত অস্ত্র-কারখানার ধাতুবিদ পাভেল আনোসভ প্রায় দশ বছর অজস্র পরীক্ষা চালিয়ে ১৮৩৩ সালে সেই ঢেউ-নকশার ইস্পাত নতুন করে গড়তে সফল হন; ইস্পাতের ভেতরের গঠন বুঝতে তিনিই সম্ভবত প্রথম অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাজে লাগান। অনেক পরে, বিশ শতকের শেষে আমেরিকান বিজ্ঞানী জন ভেরহোভেন আর কামার-শিল্পী আলফ্রেড পেন্ড্রে মিলে অবশেষে সেই আসল উওৎজ-নকশা গবেষণাগারে হুবহু ফিরিয়ে আনতে পারেন।

    ভাবলে অবাক লাগে, একটা প্রাচ্যের কামারশালার হারানো কৌশল ভাঙার জন্য প্রায় দুশো বছর ধরে পশ্চিমের সেরা মাথারা কী পরিশ্রমই না করেছেন - প্যারিস থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ, লন্ডন থেকে শেফিল্ড, নানা গবেষণাগারে চলেছে নকল করার চেষ্টা, ঘোষণা হয়েছে পুরস্কার। কেউ কাছাকাছি পৌঁছেছেন, কেউ হাল ছেড়েছেন। এই গোটা দৌড়টাই আসলে ভারতীয় কারিগরদের প্রতি এক নীরব সম্মান। যা তাঁরা নিছক হাতের অভিজ্ঞতায় গড়তেন, তা ফেরাতে দুনিয়ার তাবড় বিজ্ঞানীদের লেগেছিল দুই শতাব্দী।

    কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর কৌতুকটা এখানেই - ঠিক যে-সময়ে ইউরোপ এই ইস্পাতের গোপন সূত্র ভাঙার জন্য দিনরাত এক করছে, ঠিক তখনই ভারতের মাটিতে জীবন্ত ঐতিহ্যটা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরছিল। যা আমরা নিজেরা বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না, বিদেশিরা তা নিয়ে গবেষণা করে খ্যাতি কুড়োল - এর চেয়ে বড় আক্ষেপ আর কী হতে পারে।

    তারপর নেমে এল সন্ধ্যা


    সেই মৃত্যু আসলে এগিয়ে এসেছিল দুই দিক থেকে। এক, ঔপনিবেশিক দমননীতি। বন-আইন করে কামারদের কাঠকয়লা আর আকরিকের নাগাল কেড়ে নেওয়া হল (গোটা প্রক্রিয়াটাই তো চলত জঙ্গলের কাঠকয়লায়)। ওদিকে বসল চুল্লির ওপর কর, বিলেত থেকে সস্তায় তৈরি কারখানার লোহা-ইস্পাত বাজার ছেয়ে ফেলল। অগরিয়া, অসুর, লোহারদের বহু প্রজন্মের বিদ্যা আর রুটিরুজি এক প্রজন্মেই মুছে গেল।

    অর্থনীতির অঙ্কটাও ছিল নিষ্ঠুর। উনিশ শতকে ভারতে রেললাইন পাতা হল, শহর গড়ল, সেতু বাঁধা হল, কিন্তু সেসবের লোহা-ইস্পাতের সিংহভাগই এল বিলেত থেকে জাহাজে চেপে। যে-দেশের কামাররা একদিন দুনিয়াকে ইস্পাত জুগিয়েছেন, সে-দেশ এখন নিজের রেললাইনের জন্যও তাকিয়ে আছে বিদেশের কারখানার দিকে তার চেয়ে বড় বিদ্রূপ আর কী হতে পারে। সস্তায় আমদানি-করা ইস্পাতের সঙ্গে দেশি কামারের ছোট চুল্লি এঁটে উঠবে কী করে? একটা গোটা শিল্প এভাবেই ধুঁকতে ধুঁকতে বসে গেল।

    এর একটা মানবিক দিকও ছিল, যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। এই কারিগররা কেবল একটা পেশা হারাননি; হারিয়েছিলেন তাঁদের পরিচয়, মর্যাদা, বাপ-ঠাকুরদার শেখানো এক গোটা জীবনধারা। যে-দেশ একদিন তিন মহাদেশে ইস্পাত রপ্তানি করত, সে-ই ধীরে ধীরে হয়ে দাঁড়াল ইস্পাতের খদ্দের — ইতিহাসে যাকে বলে বিশিল্পায়ন বা ডিইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন। হাজার বছরের এক দক্ষতা কয়েক দশকেই কার্যত নিভে গেল।

    দুই, প্রযুক্তির ঢেউ। উনিশ শতকে ইউরোপে এল কোক-জ্বালানির ব্লাস্ট ফার্নেস, আর ১৮৫৬ সালে হেনরি বেসেমারের সেই আবিষ্কার, যা দিয়ে সস্তায়, বিপুল পরিমাণে ইস্পাত ঢালাই করা গেল। এখানে একটা চালু ভুল শুধরে দিই, বেসেমার কিন্তু লোহা বা ইস্পাত “আবিষ্কার” করেননি; মানুষ তো তিন হাজার বছর ধরেই তা গড়ছিল, ভারত-সহ। বেসেমার যা করলেন, তা হল সস্তায় গণ-উৎপাদনের পথ খুলে দেওয়া, যা গোটা দুনিয়ার শিল্পের চেহারা পাল্টে দিল। তবে এর মধ্যে একটা বাস্তব ব্যাপারও আছে। আধুনিক সভ্যতার সাথে তাল মেলাতে গেলে যে পরিমাণে ইস্পাত প্রয়োজন হত, সেই পরিমাণ ইস্পাত গ্রামীণ চুল্লিতে উৎপাদন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই বিদেশী সস্তা ইস্পাতকে গাল দিয়েও বেশী লাভ নেই!

    সেই ঢেউটাই ভারত ধরতে দেরি করল - খানিক ঔপনিবেশিক দমনে, খানিক কয়লা-কোক-ভিত্তিক আধুনিক শিল্পে দেরিতে পা রাখায়। এখানে সৎ থাকা জরুরি: পুরো দোষ শুধু বিদেশি শাসকের ঘাড়ে চাপালে যেমন সত্যের অপলাপ হয়, তেমনি সেই দমননীতিকে অস্বীকার করাও অন্যায্য - সত্যিটা এই দুইয়ে মেশানো। সেই সন্ধ্যা নেমেছিল প্রায় নিঃশব্দে। শিল্প-ইতিহাসবিদ আনন্দ কুমারস্বামী ১৯০৩-০৪ সালে শ্রীলঙ্কার এক গ্রামে ঐতিহ্যবাহী ক্রুসিবল-ইস্পাত গড়া নিজের চোখে দেখে, ছবি তুলে, বিশদে লিখে রাখেন। আর সেটাই কার্যত দুই হাজার বছরের পুরনো এই কৌশলের শেষ নথিভুক্ত সাক্ষ্য। যে ইস্পাত একদিন আলেকজান্ডারের উপহার হয়েছে, প্লিনির প্রশংসা কুড়িয়েছে, দামাস্কাসের বাজার মাতিয়েছে তার শেষ চুল্লিটা নিভে গেল কোনো এক অখ্যাত গ্রামের কোণে, প্রায় বিনা বিদায়ে।

    ছাই থেকে আবার — শেষ কথা


    তবে গল্পটা একেবারে অন্ধকারে শেষ হয় না। বিশ শতকের গোড়ায় শিল্পপতি জামশেদজি টাটার স্বপ্ন আর জেদের হাত ধরে গড়ে ওঠে টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠা, আর ১৯১২ সালে সাকচিতে (আজকের জামশেদপুর) ঢালাই হয় প্রথম ইস্পাত। লোহা-আকরিক আর কয়লার কাছাকাছি জায়গা বেছে গড়া সেই কারখানা যেন ছাই থেকে আবার জ্বালিয়ে দিল পুরনো আগুন।

    জামশেদপুর ধীরে ধীরে হয়ে উঠল ভারতের শিল্প-পুনর্জন্মের প্রতীক - এক আস্ত শহর, যা গড়ে উঠল ইস্পাতকে ঘিরে। এ ছিল ঠিক সেই সময়, যখন দেশ পরাধীন, নিজের হাতে বড় কিছু গড়ার স্বপ্ন দেখাটাও ছিল সাহসের কাজ। জামশেদজি নিজে সেই কারখানা চালু হতে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর স্বপ্নটা সত্যি হয়েছিল ঠিকই। প্রাচীন কামারের নেভা চুল্লি থেকে আধুনিক ব্লাস্ট ফার্নেস - মাঝখানে দীর্ঘ এক সন্ধ্যা পেরিয়ে ভারত যেন আবার ফিরে পেল তার পুরনো পরিচয়।

    আজ ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত-উৎপাদক দেশ। বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় নয় শতাংশ আসে এখান থেকে (বাই দি ওয়ে, প্রায় বাহান্ন শতাংশ আসে চীন থেকে)। যে-ধাতুকে একদিন আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম, তাকেই আবার নতুন করে গড়ছি - যদিও ভিন্ন পথে, ভিন্ন যুগে, ভিন্ন প্রযুক্তিতে। মনে আছে তো, সেই অগরিয়া কারিগরদের কথা যাঁদের গল্প টাটারাই লিখিয়ে রেখেছিলেন? ইতিহাসের বৃত্তটা যেন কোথাও একটা জুড়ে যায়।

    উওৎজের সৌন্দর্য জন্মেছিল তার ভেতরের অতি-সূক্ষ্ম কার্বনের নকশা থেকে। দিল্লি বা ধারের থাম টিকে আছে তার ভেতরের ফসফরাস আর নানা খাদ-অপদ্রব্যের গুণে। অর্থাৎ যাকে আমরা প্রায়ই “খাদ” বলে অবজ্ঞা করি, সেই খাদই কখনো কখনো শক্তির উৎস, স্থায়িত্বের রহস্য। মানুষের বেলাতেও কথাটা বোধহয় একেবারে মিথ্যা নয়, আমাদের ভেতরের অপূর্ণতাগুলোই কখনো কখনো আমাদের আসল জোর, আমাদের টিকে থাকার রহস্য। হাজার বছর আগের এক অখ্যাত কামার হয়তো এ কথা জানতেন না, কিন্তু তাঁর গড়া থাম আজও নিঃশব্দে সেই সত্যিটা বলে চলেছে।

    আর তাই, বানানো গর্বের আমাদের দরকার নেই। সত্যিকারের গর্বটা অনেক বড়, এবং প্রতিটি কথা প্রমাণসহ লেখা আছে - সুশ্রুত সংহিতায়, গ্রিক-রোমান ইতিহাসে, আরবি পুঁথিতে, আধুনিক বিজ্ঞানের জার্নালে, এমনকি আঠারো শতকের এক ব্রিটিশ পত্রিকায়। আমাদের পূর্বপুরুষরা লোহাকে চিনেছিলেন “অন্ধকারের ধাতু” বলে, তাকে বশ করেছিলেন এমন নিপুণভাবে যে সেই ধাতু দিয়ে তাঁরা একসঙ্গে মানুষ মেরেছেন আর মানুষ বাঁচিয়েছেন, দুনিয়া শাসন করেছেন আর দুনিয়াকে শিখিয়েছেন। কল্পনার উড়োজাহাজের দরকার পড়ে না, যখন হাতে থাকে কৃষ্ণ-অয়সের এমন জ্বলজ্বলে সত্যি।

    লোহা নিয়ে মূল এখানেই শেষ করেছিলাম। তারপর ভাবলাম, পুজো সংখ্যার জন্য এটা লিখছি, তা ভারতে পুজো পার্বণ, ঠাকুর-দেবতা, পুরাণ ইত্যাদিতে লোহার ব্যবহার নিয়ে দুকথা লেখা যাক। লোহা তো শুধু ইতিহাস বইয়ের জিনিস নয়, একটু খেয়াল করলেই দেখবেন লোহা মিশে আছে আমাদের পুজো-পার্বণের একেবারে ভেতরে, রীতিনীতির ভাঁজে ভাঁজে। তাহলে আসুন, সেই লুকোনো আত্মীয়তাটা একটু খুঁজে দেখি।

    দেবীর হাতে ইস্পাত


    দুর্গাপ্রতিমার দিকে একবার তাকান। দশ হাতে দশ অস্ত্র - ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, গদা, তির-ধনুক। পুরাণ বলছে, এই অস্ত্রগুলো দেবী নিজে বানাননি; মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের আগে নানা দেবতা তাঁকে অস্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। শিব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, ইন্দ্র দিলেন বজ্র। দেবীমাহাত্ম্য (চণ্ডী) অনুসারে, দেবতাদের শিল্পী বিশ্বকর্মা দেবীকে দিলেন এক ধারালো কুঠার আর দুর্ভেদ্য বর্ম। অর্থাৎ যে অস্ত্রে অসুর বধ হল, তা আসলে দেবতাদের কামারশালায় গড়া, এক অর্থে, স্বর্গীয় ধাতুবিদ্যার ফসল। প্রতি শরতে আমরা তাই আসলে হাতে-অস্ত্র-ঝলমল এক দেবীর সামনে মাথা নত করি।

    অস্ত্রপুজো - যন্ত্রকেও প্রণাম


    এবার এমন এক পুজোর কথা বলি, যার নাম অনেক বাঙালিই হয়তো শোনেননি - অস্ত্রপুজো বা আয়ুধ পুজো (কোথাও শস্ত্রপুজো নামেও পরিচিত)। নবরাত্রির নবমীতে, বিশেষত দক্ষিণ ভারতে, শুধু অস্ত্র নয়, রোজকার যন্ত্রপাতিকেও পুজো করা হয় - তলোয়ার থেকে লাঙল, গাড়ি থেকে কারখানার মেশিন, মিস্ত্রির যন্ত্র থেকে সৈনিকের বন্দুক, আজকাল এমনকি কম্পিউটারও। ফুল-চন্দন-কলাপাতায় সাজিয়ে যন্ত্রগুলোকে প্রণাম করা হয়, সেদিন সেগুলো আর ব্যবহার করা হয় না; পরদিন বিজয়াদশমীতে আবার নতুন করে কাজে লাগানো হয়।

    এই পুজোর পিছনের গল্প দুটো, আর দুটোই পুজোর সঙ্গেই জড়ানো। একটি হল দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার পর তাঁর অস্ত্রগুলো নামিয়ে রাখেন, আর দেবতারা সেই অস্ত্রকেই পুজো করেন। অন্যটি মহাভারত থেকে যেখানে পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় নিজেদের অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলেন এক গাছে। বিজয়াদশমীর দিন সেই অস্ত্র ফিরে পেয়ে, পুজো করে তবে যুদ্ধে নেমেছিলেন। মহীশূরের রাজারা একে রাজকীয় আচারে পরিণত করেছিলেন। এর মূল সুরটা কিন্তু ভারি সুন্দর - হাতিয়ার, যার বেশিরভাগই লোহা-ইস্পাতের, এখানে পূজ্য; কাজ করাটাই যেন এক ধরনের উপাসনা।

    বিশ্বকর্মা - কামারের ঠাকুর


    দুর্গাপুজোর ঠিক ক-দিন আগেই তো বাংলায় বিশ্বকর্মা পুজো। এই বিশ্বকর্মা কে? তিনি দেবতাদের স্থপতি আর শিল্পী, বৈদিক “ত্বষ্টা” বা স্বর্গীয় কামারের সঙ্গে যাঁর রূপ মিলেমিশে গেছে। দেবতাদের অস্ত্র তো তাঁরই গড়া - শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, ইন্দ্রের বজ্র, আর সেই যে বললাম, দুর্গার কুঠার। তাঁর পুজোর দিনে কামার, মিস্ত্রি, ইঞ্জিনিয়ার, কারখানা-রেল-জুটমিলের শ্রমিকরা কাজ থামিয়ে নিজেদের যন্ত্রপাতি আর মেশিন ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে পুজো করেন। যে কারিগর-সম্প্রদায় হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের লোহা গড়ে এসেছেন, কামার, স্বর্ণকার, ভাস্করদের সেই বিশ্বকর্মা (পঞ্চাল) গোষ্ঠী, তাঁরা নিজেদের বিশ্বকর্মারই বংশধর বলে মানেন। পুজোর গোটা মরসুমটাই যেন শুরু হয় লোহা আর লোহার কারিগরদের প্রণাম জানিয়ে।

    আগুনের পুজো, চুল্লির গর্ভ


    আরও একটু পিছিয়ে যাই একেবারে লোহা-গলানো কারিগরদের কাছে। আগেই বলেছিলাম, ভারতের আদিবাসী কামার-সম্প্রদায়, যেমন আগরিয়া বা অসুর, লোহা-গলানোকে দেখতেন প্রায় এক পবিত্র আচার হিসেবে। চুল্লিকে ভাবা হত মায়ের গর্ভের মতো যেখান থেকে জন্ম নেয় ধাতু; আগুন ধরানোর আগে হত পুজো-বলি, মানা হত নানা নিয়ম। নৃতত্ত্ববিদ ভেরিয়ার এলউইন এঁদের চুল্লি ঘিরে গান আর আচার-অনুষ্ঠানের কথা বিশদে লিখে গেছেন। এঁদের কাছে লোহা গড়াটাই ছিল একরকম উপাসনা। কামারশালা আর মন্দিরের মাঝের দেয়ালটা এখানে বরাবরই বড় পাতলা।

    বধূর হাতে নোয়া


    আর সবশেষে, সবচেয়ে ঘরোয়া, সবচেয়ে বাঙালি যোগসূত্রটা। প্রতিটি বিবাহিতা বাঙালি হিন্দু নারীর বাঁ হাতে থাকে একটি সাদামাটা লোহার বালা, লোহা বা নোয়া, সাদা শাঁখা আর লাল পলার পাশে। বিয়ের সময় শাশুড়ি বা সধবারা মিলে এটি পরিয়ে দেন এই বিশ্বাসে যে এই লোহা অশুভ শক্তি ঠেকায়, স্বামীর মঙ্গল করে, আর দাম্পত্যকে করে লোহার মতোই দৃঢ়, অটুট। মেয়েরা সারাজীবন এটি পরে থাকেন। ভাবুন একবার, সোনা-রুপো-শঙ্খ-প্রবাল, এত কিছু থাকতে বাংলা বেছে নিল সেই নম্র লোহাকেই, আজীবন অটুট বন্ধনের প্রতীক হিসেবে। এই পুজোতেও অসংখ্য হাতে ঝলসে উঠবে সেই নোয়া, প্যান্ডেলের আলোয়।

    তাই এবারের পুজোয়, ঢাক আর ধুনুচির মাঝে, একটু খেয়াল করে দেখবেন লোহাকে - দেবীর হাতের অস্ত্রে, অস্ত্রপুজোর যন্ত্রে, বিশ্বকর্মার আশীর্বাদে, আর বধূর নোয়ায়। আমাদের গর্ব করার জন্য বানানো গল্পের দরকার নেই; লোহার সঙ্গে আমাদের পার্বণের এই আত্মীয়তা তো সত্যি, নথিভুক্ত, আর ছড়িয়ে আছে চারপাশেই - শুধু চোখ মেলে দেখার অপেক্ষা।
    সবাইকে শারদীয়ার আন্তরিক শুভেচ্ছা।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি
  • আলোচনা | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৩৭743359
  • দুটো পর্ব মিলিয়্যে অসম্ভব ভালো লাগলো।
  • kk | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৩১743366
  • হ্যাঁ, দুটো পর্বই দারুণ।
  • Sara Man | ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৫৩743380
  • দুটো পর্ব পড়ে মুগ্ধতা কাটছেনা। গা শিরশির করছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন।