

অলংকরণ: রমিত
বিশ্ববিখ্যাত চিত্র পরিচালক আন্দ্রে তারকভস্কি সোভিয়েত রাশিয়ার সিনেমাটোগ্রাফি ইন্সটিটিউটে (VGIK) চলচ্চিত্র শিক্ষা লাভ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি তিনটি ছবি পরিচালনা করেন, যথাঃ দ্য কিলার্স, দেয়ার উইল বি নো লিভ টুডে এবং দ্য স্টিমরোলার এন্ড দ্য ভায়োলিন। তৃতীয়টি ছিল তাঁর ডিপ্লোমা ছবি। এই লেখায় প্রথম ও তৃতীয় ছবি দুটি নিয়ে আমরা আলোচনা করব। চলচ্চিত্রে শিল্পীর সমগ্র কাজের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় ছবিটি সাধারণ, তাই সেটা নিয়ে আলাদা করে আলোচনার প্রয়োজন নেই বলেই মনে হয়
দ্য কিলার্স
দ্য কিলার্স ছবিটি ১৯৫৬ সালে নির্মিত। তারকভস্কি ছাড়াও আরও দুজন ছাত্র একত্রে এই ছবিটির পরিচালনা করেন, তাঁরা হলেন আলেকজান্দার গর্ডন এবং মারিকা বেইকু। স্তালিন-পরবর্তি যুগে তখন রাশিয়াতে তথাকথিত উদারীকরণের সময় চলছে। এই সুযোগে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাহিত্য রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পরিচালক লেখকের একটি গল্প ‘দ্য কিলার্স’ চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কিন্তু সাহিত্য থেকে সিনেমা করার ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে ছিলেন। ‘স্কালপটিং ইন টাইম’-এ তিনি লিখছেন, আমাকে এটা বলতেই হচ্ছে যে সব গদ্য সিনেমার পর্দায় রূপান্তরিত করা যায় না। ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’ করার আগে তিনি এই মন্তব্যটি করেছিলেন। গল্পটি রীতিমতো হেমিংওয়ে ঘরানার, অনেকটা গ্যাংস্টার ছবির মতো, যেটা ঠিক তারকভস্কির বিষয় নয়।
শুরুতে একটা কাফে, ভিতরে মালিক জর্জ, যে নিজেই বেয়ারা, আর আছে একজন ক্রেতা, অ্যাডামস। দুজন প্রবেশ করে, কালো ওভারকোট পরা, গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। তাদের কথাবার্তা অমার্জিত, তারা খাবার চায় এবং ওলে অ্যান্ডারসন নামে এক সুইডিশ লোকের খোঁজ করে। তখন ঘড়িতে ৫টা বেজে ৪০ মিনিট, ডিনার হতে আরো ২০ মিনিট বাকি। জর্জ জানাল অ্যান্ডারসন ডিনারের সময় আসে। একজন ক্রেতা রাঁধুনির খোঁজ করে। দেখা যায় সে একজন নিগ্রো, ক্রেতা তাকে এবং অ্যাডামসকে নিয়ে ভিতরে চলে যায়। একটি খুপরিতে চোখ দিয়ে সে কাফের ভিতরে নজর রাখে, তার হাতের বন্দুকের নল ম্লান আলোয় ঝিলিক মারে। এবার তৃতীয় ক্রেতা প্রবেশ করে, তারকভস্কি নিজে এই চরিত্রটি করেছেন। সে বেশ স্ফুর্তিবাজ, সেই সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড গান ‘লালাবি অফ বার্ডল্যান্ড’ হুইসল করে। আরও দুজন ক্রেতা আসে, রাঁধুনি অসুস্থ শুনে বিরক্ত হয়ে চলে যায়। ইতিমধ্যে ছটা বেজে যায় অপেক্ষামান মৃত্যুদুতরা চলে যায়, বলে যায় তারা আবার আসবে।
রাঁধুনি ও অ্যাডামসকে মুক্ত করা হয়। অ্যাডামাস অন্য একটি ঘরে প্রবেশ করে যেখানে অ্যান্ডারসন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। সে তাকে বলে যে দুই ব্যক্তি তাকে খুন করার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে তাকে পালিয়ে যেতে বলে, পুলিশ ডাকতে বলে। সে নির্বিকার। বলে আর কোনও উপায় নেই, মৃত্যু অবধারিত, নিয়তির খেলা। সে শুধু অপেক্ষা করছে কখন ঘর থেকে বেরিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেবে। অ্যাডামস হতভম্ব হয়ে ঘর ছেড়ে চলে যায়।
মাত্র উনিশ মিনিটের ছবি টানটান, চাপা উত্তেজনা, একটা হিমশীতল পরিবেশ। হেমিংওয়ের গল্পের ওপর তৈরি অন্য একটি ছবি মনে পড়িয়ে দেয়ঃ ‘দ্য স্নোস অফ কিলিমাঞ্জারো’। সেখানে দুরারোগ্য ক্ষত নিয়ে হ্যারি (গ্রেগরি পেক) দুর্গম আফ্রিকার বনাঞ্চলে পড়ে আছে, মাথার ওপর শকুন চক্কর মারছে কখন সে মারা যাবে। ওই ছবি তৈরি হয়েছিল ১৯৫২ সালে, একই ধরণের চাপা উত্তেজনা, কী হয়, কী হয় ভাব। বরেণ্য পরিচালক কি ওই ছবি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন? এটা বলা কারণ তাঁর এই প্রথম ছবি রীতিমতো অ-তারকভস্কিয়। গল্পটার বিষয় গার্সিয়া মার্কেসের ‘ক্রনিকল অফ আ ডেথ ফরটোল্ড’ মনে পড়িয়ে দেয়, যেখানে শহরের প্রতিটি লোক, সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ প্রশাসন, জানে, উপন্যাসিকার প্রধান চরিত্র সান্তিয়াগো নাসার, খুন হবে। তবুও কোনও ভাবেই সেই হত্যা রোধ করা যায় না। অ্যান্ডারসনের মতো তারাও নিরুপায়, মৃত্যু অবধারিত, নিয়তি।
দ্য স্টিমরোলার এন্ড দ্য ভায়োলিন
দুই প্রধান চরিত্রের একজন বালক মাশা, যাকে দেখলে ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’-এর ইভান-কে মনে পড়ে। সাশা আরও ছোট, বয়স সাত, তার জন্ম পঞ্চাশের দশকে, বিশ্ব যুদ্ধের বিভীষিকা কাটিয়ে সোভিয়েত রাশিয়া যখন উঠে দাঁড়াচ্ছে। সাশা কল্পনাপ্রবণ, প্রতিবেশী বাচ্চারা তাকে উত্ত্যক্ত করে। রোলার-চালক সের্গেই তাকে রক্ষা করে। সাশা বেহালা বাজান শিখতে যায়, মাঝে রাস্তায় একটি আয়নায় নানা প্রতিবিম্ব দেখে, যার মধ্যে ছড়িয়ে আছে প্রচুর আপেল যা আবার ইভানের বাল্যকালকে মনে পড়ায়। শিক্ষিকার ঘরের বাইরে এক বালিকার সাথে দেখা হয়, যার জন্য সে নিঃশব্দে একটা আপেল টেবিলের ওপর রেখে দেয়। শিক্ষিকা কড়া, সাশাকে সে ড্রিমার বলে অভিহিত করে, বারবার বেহালা বাজান অনুশীলন করতে বলে। ফেরবার পথে সের্গেইয়ের সাথে দেখা, যাকে এক তরুণী ক্রমাগত বিরক্ত করছে। সের্গেই সাশাকে রোলার চালান শেখায়, অন্য বাচ্চারা সেটা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়।
দুজনে একত্রে মধ্যাহ্নভোজন করতে যায়, রাস্তায় সাশা একটা ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে নিগৃহীত হয়। প্রবল বৃষ্টি আসে, সের্গেই তার শরীর ঢেকে দেয়। ছেচল্লিশ মিনিটের ছবিতে সের্গেই তাকে সারাক্ষণ আগলে রাখে, তাকে বড় হয়ে উঠতে সাহায্য করে। সের্গেই যেন আর্সেনি তারকভস্কি, পরিচালকের বাবা। আর্সেনি বিখ্যাত কবি, বরিস পাস্তারনাকের সমসাময়িক, পরিচালকের আত্মজৈবনিক ছবি ‘মিরর’ এ যাঁর কবিতা বারবার ব্যবহার হয়েছে। তারা পরস্পরের থেকে বিদায় নেয়, সন্ধ্যা সাতটায় একটি হলে ‘চাপায়েভ’ (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক রুশ সেনাপতির জীবন ভিত্তিক ছবি) দেখবার জন্য ফিরে আসা মনস্থ করে।
সাশার ফিরে আসা হয় না। তার মা তাকে অনুমতি দেয় না। ছবিতে সাশার মা অনেকটা ‘মিরর’ ছবির মা’য়ের মতো কখনো কাছের, কখনো একেবারেই ছোঁয়া যায় না। সাতটা বেজে যায়। সের্গেই ভগ্ন মনোরথে সেই তরুণীর সাথে হলে ঢুকে যায়। সাশার কল্পনায় দরজা হাট করে খুলে যায়, সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামে এবং কর্দমাক্ত এক প্রশস্ত জায়গা দিয়ে ছুটে যায় দূরে রাখা রোলারটির দিকে। আমরা পরিচালকের প্রধান ছবিগুলির কিছু মৌলিক উপাদান খুঁজে পাই। জল, জলা, কর্দমাক্ত এলাকা, কল্পনার খেলা, যা বারবার তাঁর প্রধান সাতটি ছবিতে ফিরে আসে। এই ছবির প্রভাব তাঁর প্রথম পুরো দৈর্ঘের ফিচার ছবি ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’-এ দেখা যায়। ভাদিম উওসভ ছবিতে তাঁর সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন। তিনি পরবর্তি সময়ে ইভান’স চাইল্ডহুড, আন্দ্রে রুবেলভ এবং সোলারিস ছবিতে পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন।
ছবিটি ১৯৬০ সালে নির্মিত। পরের বছর নিউ ইয়র্ক স্টুডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা ছবি হিসাবে পুরস্কৃত হয়।