

অলংকরণ: রমিত
… বলছি, এখন আবার চললে কোথায় ধরাচূড়া পড়ে?
… বাগড়া দিলে তো! সত্যি, বলার কিছু নেই।
… কী বলবে? বেরোচ্ছো, তাতো দেখতেই পাচ্ছি।
… তাহলে আর জিগ্যেস করছো কেন?
… জিগ্যেস কি আর সাধে করছি? কিছু হলে সব হ্যাপা তো
এই আমাকেই সামলাতে হবে।
… আবারও কু ডাকলে তো?
… এই কথাটা বললাম, তাতে কু ডাকা হলো?
… হলোনা? আলবৎ হলো। এখানে হ্যাপার কথা এলো কেন?
… এলো কেন মানেটা কি? গেল মাসের কথা মনে নেই ?
… আরে ওটা তো একটা অ্যাক্সিডেন্ট।আমি কি ওটা ইচ্ছে
করে করেছি? ও …ও ..
…ও… ও … করছো কেন? সত্যি বলছি, সেটা ঠিক পছন্দ
হচ্ছে না বুঝি?
… না, তা কেন? সত্যি তো সবসময়ই কড়া হয়। সেতো সবাই..
… সবাই জানে, কেবল তুমি ছাড়া। এসব ব্যাপারে তো দেখি
জ্ঞানের নাড়ি একেবারে টনটনা। যত্তোসব…
… এতোক্ষণে একটা কাজের কথা বলেছো তুমি – জ্ঞানের
নাড়ি টনটনা। এতোগুলো বছর এমনি এমনি তো মাস্টারি
করিনি! জ্ঞানের নাড়ি এতেই এমন পেকে উঠেছে।
… দ্যাখো, তোমার ওই মাস্টারি করা নিয়ে আর আদিখ্যেতা
করো না তো!
… যথা আজ্ঞা দেবী। ওসব বিষয়ে আর কোনো কথা নেই।
এই আমি মুখে কুলুপ আঁটলাম।
… এই এক কায়দা হয়েছে। কিছু একটা বললেই মুখ বুজে
বোবা হয়ে যাওয়া। নতুবা গলা উঁচিয়ে ঝগড়া করা।
সেই থেকে পাশে বসে আছি সে খেয়াল আছে তোমার?
খালি চোখ উল্টে এড়িয়ে যাওয়া।
… এ কি কথা শুনি আজি …. মুখে। তোমাকে এড়িয়ে যাবো
সে সাধ্যি কি আমার আছে? শয়নে স্বপনে জাগরণে আমি
তো তোমার কথাই ভাবছি, তোমার খেয়াল রাখছি দেবী!
… আবার ভড়ংবাজি শুরু হলো। এই যে তোমায় বেরোতে
বারণ করলাম তার কারণ তো একবারও জানতে চাইলে
না। কেমন একা হয়ে যাচ্ছি আমরা সকলে। প্রথম যখন
এখানে এলাম তখন কি সুন্দর ছিল আমাদের দিনগুলো!
তখন তো এতো বাড়িঘরও ছিলোনা এখানে। চারিদিক
কেমন খোলামেলা….
… এ তল্লাটে বাড়ি বলতে ছিল হাতে গোনা। আমরা কাজ
কর্মে বেরিয়ে গেলে বাড়িতে তখন তোমরা মাত্র তিনজন
বাবা, কাকা আর তুমি।
… বিকেল হতে না হতেই কতো মানুষ এসে হাজির হতো
আমাদের বাড়িতে – কুন্ডু কাকু, ননীগোপাল জ্যেঠু,
ভট্টাজ জ্যেঠু, মুখার্জি কাকু ….. এঁরা নিয়মিত আসছেন
দেখে ঘরের কোণায় একলা বসে থাকা বাকি মানুষ
গুলোও গুটিসুটি মেরে হাজির হয়ে যেতেন এখানে।
আসর জমে উঠতে দেরি হতো না। চারটে বাজতে না
বাজতেই সবাই হাজির – কই গো বউমা! সতরঞ্চিখানা
দাও, আমরাই বিছিয়ে বসি।তোমাকে আর কষ্ট করতে
হবে না। আমি তো তার অনেক আগেই সতরঞ্চিখানা
বিছিয়ে, মশা ধূপ জ্বেলে, খানকতক জলের বোতল ভরে
রেখে দিয়েছি…..। খানিকটা সময় গল্প করতে না করতেই
বাবা হাঁক পারতেন – কইরে বৌমা,তোর চায়ের সময়
হলো রে মা? ….. এই রুটিনে কোনো ক্লান্তি আসতো না।
… আমার কথাটাও একটু বলো। বিমলের দোকান থেকে চা
পাতা আর নোনতা বিস্কিট আনতে আনতে আমি তো
রীতিমতো নাজেহাল। শেষে বিমলের কথামতো একবারে
এক এক কিলো করে চা পাতা আনতে শুরু করলাম।
তোমার মতো আমিও যে ক্লান্তিহীন ছিলাম সেকথাও বলো।
… এমনটা না হলে যে সংসার চলেনা। বড়ো বড়ো শিল্পীরা
যেমন যুগলবন্দীর আসরে নিজেদের মেলে ধরেন,
আমাদের সংসার সাধনা যে তেমনটাই। সঙ্গত ঠিকঠাক না
হলে যেমন সঙ্গীত জমেনা এও যে তেমনই এক যৌথসাধনা
একসঙ্গে তরী বেয়ে চলা।
… খুব সুন্দর করে বললে তুমি। যে সময়ের কথা বলছি সেই
সময়টাকে আমরা যে অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। আজ
বাগানে কাজ করতে করতে ভাবছিলাম সেই সব দিনের
কথা। সামনের গ্রিল বেয়ে লতিয়ে ওঠা ওই মধুমঞ্জরি
গাছটা এনে দিয়েছিলেন ননী জ্যেঠু – কতো বছর হয়ে
গেলো তাইনা! এক ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে গন্ধ বিলোচ্ছে।
… ছত্রিশ বছর। … সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে
আমরাই তো কেমন বুড়িয়ে গেলাম। সেই সব পুরনো
মানুষেরা কেমন একে একে হারিয়ে গেলেন – কুণ্ডু কাকু,
ননী জ্যেঠু, চক্রবর্তী বাবু…. মুখার্জি কাকু এখন অশক্ত
শরীর নিয়ে জবুথবু হয়ে আছেন। ওই থাকাটুকুই সম্বল।
অমন দশাসই চেহারাখানা কেমন শুকিয়ে গিয়েছে,দেখলে
বুকের ভেতর কেমন শূন্যতা ভরে ওঠে।
… গাছের পাতাগুলোকে দেখোনা! সবুজ সতেজ পাতাগুলো
একসময় হলুদ হয়ে টুপ করে ঝরে পড়ে। গায়ে গা লাগিয়ে
একইসঙ্গে থাকা অন্য পাতাগুলো টেরই পায়না কখন অন্য
পাতাটা কাউকে কিছু না জানিয়েই টুপ করে খসে পড়ল।
… তখন তোমাকে বেরোতে মানা করেছি বলে তুমি আমার
ওপর রাগ করছিলে, আটকে দিলাম বলেই না এই সন্ধ্যাটা
এমন সময়ের রোমন্থন করে কাটাতে পারলাম। এটাই যে
জীবনের অন্যরকম পাওয়া। আমাদের এই পাড়াটা এখন
ভীষণ একা হয়ে গেছে। সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বুকের
ভেতরে কেমন একটা ঝড় উঠেছে বলে মনে হলো। মণ্ডল
বাড়ি, মুখার্জি মেসোমশাইদের বাড়ি, বাবলাদের বাড়ি সব
বেমালুম লোপাট হয়ে গেছে। বাড়ির সাবেকি ভিতগুলো
মহেঞ্জোদারোর ভগ্নস্তুপের মতো অন্ধকারের কালিমা মেখে
পড়ে আছে। ভয় পেয়ে গেলাম।
… আমরা আরও উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের
ভেতরে এখন এক শ্মশান জেগে উঠেছে। সবকিছুকেই
বাতিলের দলে ফেলে দিতে সামান্যতম দ্বিধা জাগছে না।
আমরাও যেন বাতিলের দলে ঢুকে পড়ছি একটু একটু
করে। পুরনো স্মৃতিগুলো কেমন দ্রুত গতিতে ঝাপসা হয়ে
যাচ্ছে। এমনটাই বোধহয় নিয়ম।আমরা টের পাইনি আগে।
এখন যখন টের পাচ্ছি, তখন দেখি অন্ধকার আরও ঘন
হয়ে উঠেছে।
… বাইরের আলোটা জ্বেলে দাও। আমি সন্ধ্যাটা দেখাই
খানিকটা অন্ধকার কেটে যাবে।
হালকা এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে একটু আগে। বৃষ্টিধোওয়া বাতাস ম ম করতে থাকে মধুমঞ্জরির গন্ধে।