এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আঁধার দহের নাবিক

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ মে ২০২৬ | ৬৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • পর্ব ১
    নৈঋতের স্নানঘরটির সৌন্দর্য বরাবরই অপরূপ। ক্রিম রঙের মার্বেলের অবস্থান ছাড়াও তার দেয়ালজোড়া পূর্ণদৈর্ঘ‍্যের বেলজিয়াম কাঁচের আয়নাগুলিও অনেকাংশে দায়ী তার নার্সিসিজমের জন‍্য। আজকের মনোভাব অবশ‍্য তার অন‍্যদিনগুলির মতো নয়।  তাই ল‍্যাভেন্ডার সুরভিত পরিবেশে নৈঋত অন‍্যান‍্য দিনগুলির মতো আজ মুগ্ধ হয়ে নিজেকে পরিদর্শন করলো না। বরং তার গভীর চোখের গহন খাতে তীক্ষ্ণ হয়েছে দৃষ্টি নিজেকে পর্যবেক্ষণ করার জন‍্য। তাই নিজের তিন চারটি প্রতিবিম্ব একসঙ্গেই রহস‍্যহাস‍্যে তাকে উত্তর দেয়,  "সময় রয়েছে বাকি / সময়েরে দিতে ফাঁকি / ভাবনা রেখো না মনে কোনো।" 
    যতোবার নিজেকে প্রশ্ন করলো প্রতিবিম্বের মধ‍্যে দিয়ে, তার যুক্তি-সচেতন মন ততোবারই উত্তর দিলো, "না, না,না।"
    নৈঋতকে কোনো আঙ্গিকেই মধ‍্য-চল্লিশের ঘেরাটোপে ফেলা যায় না। এর একটা কারণ হতে পারে, তথাকথিত পুরুষালি সৌন্দর্য বা পেশীবহুলতা যাকে বলা হয়, তা কোনোদিনই ওর ছিলো না। পরিবর্তে এক ছন্দময় আরক্তিম লাবণ‍্যময়তা তাকে ঘিরে আছে। সেটাই সম্ভবত তার বয়স নামক দৈত‍্যের সামনে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে বলেছে,  "এখানে তোমার স্থান নেই।"   কলেজ জীবনের থেকে বেশী সমস‍্যায় তাকে পড়তে হয়েছে স্কুলবেলায় এই 'কুন্দশুভ্র নগ্নকান্তি' থুড়ি রক্তিম শুভ্র গাত্রবর্ণ নিয়ে। আর অতি উচ্চতার সমস‍্যা তো ছিলোই। অনেক বন্ধুবান্ধবের মায়েরা শুনিয়েই বলতেন,  'যাই বলো ভাই, ব‍্যাটাছেলেদের অ‍্যাতো ফর্সা হলে ভালো দেখায় না। পুরুষের বর্ণ হবে শ‍্যামল।"   কয়েকপা পিছিয়ে গিয়ে নিজের মনেই হাসলো নৈঋত। কারা কবে এসব ঠিক করেছিলো কে জানে !  পুরুষ মানাবে শ‍্যামল হলে, আর মেয়েদের হতেই হবে লক্ষ্মী প্রিতিমের মতো ফর্সা। অবশ‍্য সাধারণ লোকের কথা আর কি, স্বয়ং কবি লিখেছেন, "এসো শ‍্যামল সুন্দর...." 
    তাহলে কি তার  সঙ্গসুধা তৃষাহরা মনোমুগ্ধকর নয় ?
    অথচ এই পরিত‍্যক্ত পটভূমিকার এক নায়িকা তো আকন্ঠ ডুবে যেতো তার এই তথাকথিত 'মেয়েলি' পৌরুষেই। কতোবার নৈঋত তীব্রস্বরে বলেছে,   "ওহে মঁপাসার ছাত্রী,  এবার মুক্তি দাও! আচ্ছা, তোমার কি আশ মেটে না?"
     
    ডিভানে হেলান দিয়ে সে বলে উঠতো,
         " না, সুন্দর। 
    রায় কহে, আমি করী      তুমি কমলিনীশ্বরী
           বাঁধো মোরে মৃণালভুজপাশে
    আমি চাঁদ পড়ি ভূমি       ফুল্ল কুমুদিনী তুমি
             উঠো মম হৃদয়-আকাশে।"
     
    -- "কী মরতে আমি বাংলার স্কলারকে পড়াচ্ছি !  কপাল আমার !" নৈঋত তখনও আয়নার সামনে দাঁড়াতো অবিকল অ‍্যাপোলোর ভঙ্গিমায়। 
       সে হয়তো ডিভান ছেড়ে অবিন‍্যাস্ত পোশাক গোছাতে ব‍্যস্ত। বলতো,   "রায়, লজ্জা তো বিদ‍্যার পাওয়ার কথা !  তুমি যে 'বিপরীত'  শব্দটা সত‍্যি করলে!"
    --"অবিদ‍্যা লজ্জা পায় না তাই !  আর ভারতচন্দ্র কবি হলো কবে?"
        -  "হোয়াট ?? পেঁড়ো-ভুরশুটের ক্ষণজন্মা সন্তানকে তুমি কবি বলে মানো না?  তবে পড়াও কেন অন্নদামঙ্গল?"
     
    -- "আহা, অন্নদামঙ্গলের একটা আর্থ-সামাজিক পারস্পেক্টিভ আছে। তার তুলনায় এটা কী?  জাষ্ট কৃষ্ণচন্দ্রকে তোষণ করতে এই অতিরিক্ত বর্ণনা.... যত্তো বুর্জোয়া...ওটা আবার কী হচ্ছে?"
        কলকন্ঠে ধ্বনিত হতো তানসেন রচিত কিছু পঙতি,
                "দিপত কামিনী দূরকারে
                মুখ সুধাকর বনহারে
             কুটিল দৃট্র কটাক্ষ সংযূত..."
       
    টেবিলে এসে বসতেই নৈঋতের ফোনটা ঝংকার দিয়ে বেজে উঠলো। ওপ্রান্তে মিসেস মুখার্জীর উত্তেজিত কন্ঠ,
     
        -- "রায়, আর ইউ নট ইন ক‍্যালকাটা?"
    -- "ইয়েস ম‍্যাম, বাট ফর হোয়াট?"  কৌতুহলী কন্ঠে প্রশ্ন করে নৈঋত। আর যাই হোক, এইচ ও ডি-কে মিথ‍্যে বলতে নেই। আর মুখার্জী ম‍্যাডাম অতি অভিজ্ঞ অধ‍্যাপিকা উপরন্তু দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। একবার কোনোক্রমে মুখোমুখি হলে আর রক্ষে নেই।  তাছাড়া পুরো তিনসপ্তাহ ডিপার্টমেন্টে অনুপস্থিত থাকলে আর কী কৈফিয়ত দেওয়ার মতো থাকতে পারে? 
    -- "ইকোনমিক্সের চৌহান স‍্যার বলছিলেন তোমাকে কাল ন‍্যাশানাল লাইব্রেরীতে দেখেছেন। অবশ‍্য  হতেও পারে তোমার মতো কাউকে! " ড. মুখার্জীর কন্ঠে আলতো কৌতুক।
     
    কফির কাপটা নিঃশেষ করে সরিয়ে রেখে,  "অ‍্যাকচুয়ালি ম‍্যাম, আয়াম ফেসিং সাম পার্সোনাল প্রবলেমস্। হ‍্যাঁ জানি, পঠনপাঠনে গাফিলতি অনুচিত, আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। অফিসিয়াল ইমেল যথাসময়ে পাঠিয়ে দেবো।"
    ড. মুখার্জীকে আর প্রশ্ন তোলার অবকাশ না দিয়ে ফোনটা অকস্মাৎ রেখে দেয় নৈঋত। ভারী নীল পর্দাটা ঠেলে সরিয়ে দেয় সে। একঝলক জলীয় হাওয়া ছুঁয়ে গেলো তার মুখ, কপাল, চুল ও চোখের পাতা। আজকেও আকাশের বুকে মহিষ রঙের মেঘের আনাগোনা। দুপুরের দিকেই হয়তো নামবে ঝমঝমিয়ে। জানালার কাঁচে দুটি আঙুল চেপে ধরে চোখ নামিয়ে আনলো সে। একইরকম ঈষৎ রক্তাভ আভা তার আঙুলে, করতলে রক্তাভ শুভ্রতা। লজ্জা বা রাগে কপোল ধারণ করে তেমনই রক্তিমবর্ণ। প্রিয় পারফিউম স্নানের পর একপ্রস্থ ব‍্যবহার হয়ে গেছে ইতিমধ‍্যে। ধূমপানে রুচি নেই কোনোদিন নৈঋতের, সুমিষ্ট গন্ধের এই আবহই তাকে ঘিরে থাকে সারাদিন। সত‍্যিই পারফিউমের জন‍্য খরচটা অতিরিক্ত নৈঋতের। ফ্রান্স মানে ফ্রান্সই। এক মাসতুতো দিদি দুবাই থেকে কয়েকটি সুগন্ধি গিফ্ট হিসাবে পাঠানোয় আত্মীয়তার খাতিরে বিগলিত হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সবকটা অব‍্যবহৃত পড়ে আছে ওয়ার্ডরোবের কোণায়। পছন্দ হয়নি একটাও। অবশ‍্য তাতে সমস‍্যার প্রশ্ন নেই। তার ড্রেসিং টেবিলে যে পরিমাণ ফরাসী উপনিবেশ গড়ে উঠেছে তাতে কিছুমাস দুবাইয়ের চিন্তা না করলেও চলবে। বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ করে। আবছা নীল পাঞ্জাবী এই আবহাওয়ার সবচেয়ে উপযোগী। একবার আলমারির সামনে দাঁড়িয়েও সরে এলো সে। কী ভেবে ঘরের মধ‍্যে পায়চারি করতে লাগলো কয়েকবার। অবশ‍্য ভাবার বিষয় কীই বা আছে এখন আর? রুচিকা ছাড়া?  
    জানালার স্লাইডিং সরিয়ে মেঘভারনম্র আকাশের দিকে তাকিয়ে একবার সে উচ্চারণ করে,  "কেন? কেন? "
    কলিংবেলের শব্দটাও অন‍্যমনস্কতার বশে খেয়াল করেনি। তার মনোজগতে তখন একটি ফড়িংয়ের ডানার গুঞ্জন যুদ্ধবিমানের তীব্রতা সৃষ্টি করছে। কতোবার কলিংবেলটা বেজেছে কে জানে ! ধীরপায়ে দরজার দিকে এগোতে গিয়ে থমকে গেলো নৈঋত। পিপহোলে চোখ রেখে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করলো পরপর দুবার। তারপর চাপা কন্ঠে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই শুনলো নম্র নির্দেশ, "রায়, দরজা খোলো। অযথা সিন ক্রিয়েট কোরো না।"

    (চলবে)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন