এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • ধান তোলার মরশুম

    সুরশ্রী ঘোষ সাহা
    ইস্পেশাল | উৎসব | ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ৯ বার পঠিত
  • ছবি: ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    বহু বছর বাদে আজ আবার তাঁকে দেখতে পেলাম। বেশ কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়েই বুঝলাম, হ্যাঁ, তিনিই। আমার কৈশোর কাল থেকেই তাঁকে এমন পথেঘাটে দেখে আসছি। চেনা অথচ চেনা নয়। বরাবর দুজনেই তাকিয়েছি একে অপরের মুখের দিকে। কখনো সখনো চোখাচোখিও হয়ে গেছে। আবার নিজেরাই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি। দেখলাম বিরাট কিছু বদল হয়নি তাঁর চেহারায়। চুলে পাক ধরেছে হাল্কা। শরীর এখনও আগের মতো টানটান-সুন্দর-সুপুরুষ। আমি বরং ফড়িংয়ের পাখনার মতো সেই আগের চেহারা ছেড়ে এসেছি বহুকাল হল। মাঝখান দিয়ে গলে গেছে বেশ অনেকগুলো বছর। ষাটের দোরগোড়ায় পৌঁছেছি। তিনিও নিশ্চয়ই এই বয়সেই হাঁটছেন। যেদিন তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম সেদিন তিনিও ছিলেন কিশোর। দেখলেই আমার ধমনীতে শিরশিরানি বয়ে যেত। খুব ভালো লাগা তৈরি হত মনের মধ্যে। যেন কত জন্মের চেনা। তবু কেউই যেচে আলাপ করিনি কখনো। পথে দেখা, পথেই ফেলে রেখেছি একে অপরকে। আজ তিনিও আমার দিকে তাকালেন বলে মনে হল। খেয়াল করলাম চশমার ওপার থেকে চোখ মেললেন সেই পুরনো মায়াবী দৃষ্টিতে। তারপর দুজনেই একই মেট্রোর দুটি দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম।

    আমার সঙ্গে রয়েছে আমার একমাত্র ছেলে বিজয়। ওর একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। সেই মেয়েকেই আমরা দেখতে যাচ্ছি। বিজয়ের যাওয়ার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না। সমানে বলে আসছে বিয়ে করতে চাই না। বেশ আছি। বিয়ে করে কে কবে ভালো থেকেছে। বিয়ে মানেই চূড়ান্ত পরাধীন জীবন। বৌয়ের ‘হ্যাঁ’তে ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’তে ‘না’ মিলিয়ে চলা। মেলাতে না পারলেই ডিভোর্স। শুধুমুধু জীবনে ঝঞ্ঝাট ডেকে আনা। আমি বলেছি, দেখতে গেলেই কি বিয়ে হয়ে যায়, রে! দেখতে চল্। পছন্দ না হয় করবি না। এইভাবে গোটা শিক্ষিত জেনারেশন বিয়ে থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। কী খারাপ ফলটা হবে বুঝছিস! চিন্তা করে দ্যাখ তো, একটা সময়ে গোটা দেশ যে অশিক্ষিতে ভরে যাবে। কারণ শিক্ষিতরা হয় বিয়ে করছে না, নয়তো বাচ্চা নিচ্ছে না। অন্যদিকে শিক্ষার আলো পৌঁছয় না এমন ঘরে বিয়ে আর রাশি রাশি বাচ্চা হতেই থাকছে। কতটা মারাত্মক ভাবনার বিষয়। ছেলে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, আমাকে এসব বলছ কেন, আমি একা কটা বিয়েই-বা করতে পারি? চটে গিয়ে বললাম, একটা করেই উদ্ধার কর, বাপ! সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, শোনো, কবি বলেছেন, ‘তোমার উপরে নাহি জগতের ভার।’ রেগেমেগে বললাম, তোদের সঙ্গে কথা বলাই মুশকিল, জানিস তো? তারপর খানিক ইমোশনাল কথা বলতে বাধ্য হলাম। আমিও তো একা মানুষ। কতক্ষণই-বা তুই ঘরে থাকিস। তুই বিয়ে করলে আমারও তো একটা কথা বলার সঙ্গী হয়, রে। এই একটা জায়গায় ছেলেটা আমার একেবারে চুপ হয়ে গেল। কারণ ও আমায় আর কোনরকম ভাবে দুঃখিত দেখতে চায় না।‌ ছোটবেলা থেকেই তো আমাকে লড়াই-কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাতে দেখেছে। কীভাবে আমি খুশি থাকব এখন শুধু সেই চেষ্টা করে। বিজয়ের ছোট থেকে একজনই মাত্র অভিভাবক। আর সেটা আমি। অনিচ্ছা নিয়েই প্রায় অফিস বাতিল করে আমার সঙ্গে মেয়ে দেখতে চলেছে তাই। যদিও মুখে বলেছে, মনে রেখো, এই ফার্স্ট ও এই লাস্ট।

    বসার একটা সিট পেয়েছি আমি। বিজয় পায়নি। হঠাৎ দেখি অন্য দরজা দিয়ে উঠলেও সেই ভদ্রলোক সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চোখাচোখি হতেই হাসলেন। আমি যারপরনাই অবাক হয়ে হাসতে ভুলে গেলাম। এর ওর তার আড়াল টপকে তাকিয়ে রইলাম শুধু। হঠাৎ দেখি অপরদিকে একজন সিট ছেড়ে উঠতেই একটা মেয়ে সেই ভদ্রলোককে বলল, বাবা, তুমি বসো।

    তুই বস, আমার অসুবিধা হচ্ছে না।
    না, না। তুমি বসো তো।
    আরে বস তুই। নইলে ছেড়ে দে, অন্য কেউ বসুক। আমার দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালো লাগছে।
    শেষমেশ মেয়েটাই বসে পড়ল সিটে। তারপর বাবার কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজের কোলে রাখল।

    আমি এতক্ষণ খেয়ালই করিনি মানুষটার সঙ্গে আর কেউ আছে। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। ঠিক যেন পিতৃমুখী কন্যা। দেখলেই মনে হয় ঘরোয়া প্রকৃতির। হয়তো আমার বিজয়েরই বয়সী। কিংবা আরো খানিক ছোটই হবে।

    বুঝতে পারি, মানুষটি ঘুরে ফিরে আমার দিকেই তাকাচ্ছেন বারবার। চোখাচোখি হতে এবার আমি হাসলাম। জড়তা কাটিয়ে একদিকে ঘাড় কাত করে খানিক ইশারায় জানতে চাইলাম, ভালো তো?

    তিনিও একদিকে ঘাড় কাত করে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ঐ একপ্রকার ভালোই।

    হঠাৎ আমার পাশে বসে থাকা ভদ্রমহিলা সিট ছেড়ে উঠে যেতে ঐ মানুষটি তাড়াতাড়ি এসে আমার পাশে বসে পড়লেন।

    কিশোরী বয়সের মতো শরীরে আমার শিহরণ খেলে গেল হঠাৎ। তাঁর শরীরের তাপ অনুভব করে আমি আড়ষ্ট হতে শুরু করি। কতকাল পর এমন অনুভূতি খুঁজে পাই নিজের ভিতরে, নিজেই জানি না। এত ভালো লাগতো মানুষটাকে? অথচ কয়লার মধ্যে চাপা থেকে গেছে সেই ভালো লাগা হীরের টুকরো! নিজেকে অচেনা লাগে খুব। এ কেমন অদ্ভুত খেলা শুরু হয়েছে আমার মধ্যে। কোথায় জমিয়ে রাখা ছিল এত আনন্দ রস!

    অপরদিকে একটা সিট পেয়ে বিজয় গিয়ে বসে পড়ে।
    ভদ্রলোক জানতে চান, পুত্র?
    আমি উপর নিচে মাথা দোলাই।
    ভদ্রলোক আবার বলেন, একটাই ছেলে?
    এবার মুখ খুলে বলি, হ্যাঁ।
    তিনি নিজের থেকেই বলেন, আমারও একটাই মেয়ে।
    বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে যায়। ট্রেন প্লাটফর্মে ঢোকে আর ছেড়ে বেরিয়ে যায় দ্রুত।
    কোথায় নামবেন?
    বুঝতে পারি, ভদ্রলোক কথা খুঁজতে ব্যস্ত।
    ঐ একটু এসপ্ল্যানেড যাচ্ছি। তারপর…
    আচ্ছা, ব’লে তিনি তারপরটুকু শুনতে আর আগ্ৰহ দেখান না।
    আমিও চুপ করে যাই। মনে মনে উত্তর খুঁজি, টালিগঞ্জ থেকে উঠলেন যেহেতু, উনিও নিশ্চয়ই আমাদের ওখানকারই বাসিন্দা। সেকারণেই আগে পথেঘাটে দেখেছি বহুবার। মনের ভিতরে নাড়া দিয়ে গেছেন, তবু কেউ কাউকে সাড়া দিইনি কখনো।
    যেচেই বলি, আমার বাবার বাড়ি টালিগঞ্জে। আপনিও নিশ্চয়ই ওখানকার?
    স্বল্প মাথা নেড়ে বলেন, হ্যাঁ।
    জানতে চাই, মেয়ে কি পড়াশোনা করছে?
    না, না। ওর পড়াশোনা শেষ। ঐ সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোয় বসছে।
    চাকরির যা অবস্থা!
    তা যা বলেছেন! কী যে করবে এত এত ছেলে-মেয়ে!
    আমার ছেলে তো ইঞ্জিনিয়ারিং করে একটা প্রাইভেট ফার্মে ঢুকেছে। খুব প্রেসার কাজের। তার উপর বাবা - মা তুলে গালিগালাজ শুনে কাজ করতে হয়।
    হ্যাঁ, সব জানি। সেকারণেই মেয়েটা প্রাইভেটে কোথাও কাজে ঢুকুক চাই না। জানি না কী হবে আল্টিমেট!
    হঠাৎ ভদ্রলোক বলে ওঠেন, দেখেছেন, আমার নামটাই তো বলা হয়নি। আমি শতরূপ মজুমদার। আপনি?
    আমি মধুছন্দা।
    আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগলো। ভালো থাকবেন। ব’লে আরো কিছু হয়তো বলতে যাচ্ছিলেন তিনি…
    বিজয় সিট থেকে উঠে কাছে এসে বলে, মা, উঠে পড়ো, পরের স্টপেজে নামব।
    আমি তাঁর মুখের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে বলি, আপনিও ভালো থাকবেন খুব। আজ আসি।

    ২


    অনেক দিন পর আজ তোমাকে দেখে আনন্দ পেলাম, মধুছন্দা। তুমি বুড়ি হয়ে গেছ দেখে অবাকও হলাম খুব। প্রেমও আবার বুড়ো হয় নাকি? আমি তো এতকাল জেনে এসেছি, প্রেম চিরযৌবনা। আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম তুমি জানতেই পারলে না কখনো। তুমি মধুছন্দা বোস, ৩৪/এ সর্বপল্লিতে থাকো, বাবার একমাত্র মেয়ে, দারুণ ভালো সেতার বাজাতে পারো, এই সব কিছুই আমি জানতাম বরাবর। আরও অনেক কিছুই জানতাম, যে খবর আর কেউ কখনো রাখেনি কিংবা রাখতে চায়নি। অথচ আমি সে’সব বুকে আগলেই বাঁচতে চেয়েছি বরাবর। একটা সময় তোমার নাড়ি নক্ষত্র আমি হৃদয় - মগজে নিয়ে ঘুরতাম। ধনী ঘরের মেয়ে তাই প্রেমের কথা বলতে ভয় পেয়েছি বড্ড। যদি তৎক্ষণাৎ ‘না’ বলে দাও! যদি তোমার বাবা জানতে পেরে অপমান করেন? হাজার যদি জড়ো হয়ে আমায় বোবা বানিয়ে রাখলো। কখনো কখনো ভাবি, একদিকে ভালোই হয়েছে। সেসব কিছু হলে আমার প্রেমটা সেদিন মরেই যেত অকালে। তুমি কোনদিন জানতে পারলে না ঠিকই, তবু বুকের অলিন্দে বেঁচে থাকা প্রেমটা যে জীবিত, সেটা আমি টের পেলাম আজ প্রাণভরে। তোমাকে দেখতে পেয়েই প্রেম উঁকি মারল। আবার এত বছর পর। বসন্ত পার হয়ে যাওয়া বাতাসে ফিরে পেলাম সেই পুরনো ধুকপুকানি। সেই অল্প বয়সের উত্তেজনা। মেট্রোয় ঠিক তোমার পাশটাতে বসে তিরতির করে কাঁপতে শুরু করলাম ভিতরে ভিতরে। শরীর সাড়া দিচ্ছিল, ঘুম ভাঙা ঘোরে বলছিল, বেঁচে আছি। এখনো মরিনি আমি।

    অল্প বয়সের সেই প্রেম হারানো দিনগুলোয় যে আফসোস হয়নি তা কিন্তু একেবারেই নয়। যেদিন ‘ভালোবাসি’ কথাটুকু বলে ওঠার আগেই তোমার মাথায় সিঁদুর উঠে গেছে দেখলাম, খুব কষ্ট পেয়ে ছিলাম। প্রথমবার দেখে থমকে তাকিয়ে ছিলাম বহুক্ষণ। লাল সিঁদুরে তোমার রূপ যেন বিকেলের রাঙা আকাশের মতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।

    কিন্তু খুব সামান্য দিনের জন্য সিঁদুর তোমায় রাঙিয়ে রেখেছিল। কিছু মাস নাকি বছর পরেই তুমি আবার ফিরে এলে বাপের বাড়ি। পাকাপাকি ভাবে। ‌দেখলাম সিঁদুরটাও উবে গেছে আচমকা। সিঁদুর তো নয়, যেন কর্পূর! হাতে নোয়া - শাঁখা - পলার জায়গায় কটা ইমিটেশন ঢুকে পড়েছে ততদিনে। ছেলে নিয়ে বড় ব্যস্ত দেখাতে নিজেকে পথেঘাটে। বুঝতে দিতে চাইতে না কাউকে কতটা নিম্নচাপ ঘনিয়েছে ভিতরে ভিতরে। জৌলুসটাও কমতে গিয়ে কমছিল না। নাছোড়বান্দা বাচ্চার মতো গেট ধরে ঝুলে আটকে রইল শরীর জুড়ে। যৌবনের প্রান্তিক স্টেশন আসতে তখনো যে অনেক দেরি। খবরটা পেয়েছিলাম সুব্রতর মুখে। ও তখন আমার মনের অলিতে-গলিতে হাঁটাচলা করত রোজ। টের পেত সবকিছু। যে সুব্রত একদিন খবর দিয়েছিল, যা, তোর প্রেমিকার বিয়ের জন্য তাদের বাড়িটা কী ব্যাপক সাজিয়েছে, একবার চোখ ভরে দেখে আয়। সেই সুব্রতই। গেছিলাম। চোখ ধাঁধানো আলোয় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম পথের ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। কনে সাজে তোমাকে দেখার ইচ্ছে ছিল না এতটুকু, এমন মিথ্যে বলব না। তবে, দেখতে পাওয়ার কথা ছিল না কোনো। আমি দেখতে গেছিলাম শুধু আমার প্রথম প্রেমের মৃত্যু।

    সুব্রতর মুখেই পরে একদিন শুনলাম, তোমার স্বামী লোকটার চরিত্র ভালো ছিল না। আরো কোথায় নাকি সুখের সংসার ছিল তার। সেসব জানতে পেরেই ছেলে নিয়ে চলে এসেছিলে বাড়ি। আর ফিরে যাওনি। কী অপরূপ সুন্দর রূপ ছিল তোমার, মধুছন্দা। কত আলো‌ সেই রূপের। অথচ সেই তোমার স্বামীই কিনা ঐ রূপে ভুলল না! কী চায় পুরুষ? জানতে চেয়েছিলে কখনো? সেদিনও খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, জানো? আমি যদিও তখন নিজেই জানি না আমার কীসের দুঃখ! কোন্ আদিম রহস্য পিঠে নিয়ে পানকৌড়ি খেলা করছে আমার মানস সরোবরে! কী চায় সে? আমি যাকে ভালোবাসি, সে এ জীবনে পুরোপুরি অন্য কারো হতে পারেনি, এটা জেনে আমার তো আনন্দ পাওয়া উচিত ছিল, তাই নয় কি! অথচ হল না তা। উল্টে বিষাদ জমল মনে। মুখ ভার করে ঘুরতাম। দাড়ি কাটতাম না। বাবার ব্যবসায় বসা ছেড়ে সামান্য চাকরি নিয়ে এই শহর ছেড়ে চলে গেলাম বহু দূরে। তোমার চোখের আড়ালে। বলা ভালো তোমাকে চোখের আড়াল করব বলে।

    আর আজ, এত বছর পর দেখি কিনা তোমার সোনার দিন হারিয়ে গেছে আমি আড়ালে সরতেই। বয়স এসে থাবা বসিয়েছে যেন তোমার উপর আরো তাড়াতাড়ি। কে জানে, হয়তো এমনটাই হবার ছিল! আসলে আমিও আজ তোমার মতোই বুড়ো। আয়না মিছে কথা বলে আমাকে রোজ রোজ। কিন্তু তোমার গা থেকে সেই চোখ ধাঁধানো রূপ এত তাড়াতাড়ি খসে পড়ল কেন, মধুছন্দা? তুমিও কিনা বাকিদের মতো ছেলে মানুষ করতে করতে, কাপড় কাচতে কাচতে, রাঁধতে বাড়তে, বাপের বাড়িতে বড়ি দিতে দিতে, সেলাইয়ের ফোঁড় তুলতে তুলতে হারিয়ে ফেললে নিজেকে? তোমার তো এমন জীবন পাবার কথা ছিল না! নাকি ঐ যে কথায় বলে প্রত্যেকের জীবনের দরজার বাইরে পঞ্চাশ শতাংশ সুখ আর পঞ্চাশ শতাংশ দুঃখ দাঁড়িয়ে থাকে চুপিচুপি, তোমার সেই সুখ অনেক আগেই পাওয়া হয়ে গেছিল। আজ সব উত্তরই অজানা। জানো তো, জন্ম থেকেই এত ধনী হওয়াও ভালো নয় কখনো। জীবনের আনাচে কানাচে কিছু অভাব ছড়িয়ে থাকা দরকার। এক সময়ে যা চেয়েছ তাই পেয়েছিলে। আর এক সময়ে যেটুকু পাওনা সেটুকুও জুটল না কপালে। বড় ভুল জায়গায় তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল তোমার বাবা। পয়সা থাকলেই কি সব সুখ মেলে? জানি, অর্থই সম্পদ, কিন্তু আবার অর্থই যে অনর্থের মূল, সে কথা কি জানতেন না তিনি!

    মাঝখান থেকে আমি সুখী হতে পারলাম না এক জীবনে। যাকে বিয়ে করলাম, তাকে সেভাবে ভালোবাসতেও শিখলাম না। জানো, দায়িত্ব - কর্তব্যে ফাঁকি রাখিনি কোনো। তবু জীবনে যেন কোথায় বিরাট বড় ফাঁকি থেকে গেল। মঞ্জিরা, আমার স্ত্রী, আমার থেকে দশ বছরের ছোট, খুব ভালো মানুষ ছিল। তেমন কিছু রূপবতী না হলেও তার গুণের অভাব ছিল না। আমাদের মেয়েটাকে তো ও-ই একা হাতে মানুষ করেছে। কোথাও কখনো কিছু অভিযোগ জমা রাখেনি কোনো। আমার সঙ্গে তাকে মানাত না এতটুকু, এই ব্যথাই আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে চিরকাল। মানুষের মন যে কী চায়! ওকে কোথাও নিয়ে যেতাম না আমি। বন্ধুদের আড্ডায় ওকে নিয়ে যাওয়াটা বড় বেমানান বলে মনে হত। প্রথম প্রথম দুঃখ পেত বুঝতাম। তারপর দেখতাম লোকজনকে বলছে, আমারই যেতে ইচ্ছে করে না। শতরূপ আমাকে কত করে বলেছে, চলো, ঘরে কেন বসে থাকবে, তোমারও ভালো লাগবে গিয়ে। কিন্তু আমিই যাই না কখনো।

    আস্তে আস্তে মঞ্জিরার শরীরে অসুখ দানা বাঁধল। ওর মধ্যে যেন কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ তৈরি হল না কিছু। ঠিকঠাক ওষুধ খেত না। সময় মতো স্নান খাওয়া সারত না। বিশ্রামের সময়ে কাজ করত। আর কাজের সময়ে বিশ্রাম। বাড়িতে একটাও কাজের লোক টিকতে পারত না ওর জ্বালাতনে। কী যে ভালোবাসে আর কী যে অপছন্দ নিজেই বুঝত না ঠিকঠাক। আমি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকতাম তখন। বাড়িতে আমার একটা নিজস্ব জগত। আর মা-মেয়ের একটা আলাদা জগত। একের অন্যের জগতে প্রবেশ নিষেধ।

    এভাবেই চলেছিল বেশ কিছু বছর। তারপর সব সুতো ছিঁড়ে মঞ্জিরা একদিন অন্য লোকে পাড়ি জমালো। যখন চলে গেল তখন বুঝতে পারলাম, আমি কী হারালাম। মধুছন্দা, জানো তো, আমরা আসলে হাঁটি, চলি, কথা বলি, বেঁচে থাকি অবসরে আফসোস করব বলে।

    এই যে দেখো, এখন আমি তারা ভরা আকাশের নিচে বসে আছি আরাম-কেদারায়। আর কল্পনায় পুরনো কাঁথার মতো এফোঁড় ওফোঁড় বাঁধা জীবনের স্মৃতিতে ভেসে চলেছি শুধু। যেন হলুদ, ঝাপসা, ধূসর হয়ে আসা ইতিহাস বইয়ের পাতা। বহুবার পড়ে পড়ে ছিঁড়ে এসেছে খানিক। কিছুক্ষণ আগে আমার মেয়ে এসে কোলেস্টেরলের ওষুধটা খাইয়ে দিয়ে গেল। বলল, ওষুধটা আজও খেতে ভুলে গেছ, বাবা? ওঠো, হিম পড়ছে। যাও, ঘরে শুতে যাও। আর এখানে বসে থেকো না বেশিক্ষণ।

    মেয়ের কথা বলা শুনতে পেয়েছিলে, মধুছন্দা? আজ তো তুমি সারাদিনটাই আমার সঙ্গে ছিলে। এমনটা থাকোনি কখনো আগে। জানি না শুনেছ কিনা! তবে তুমি শুনলে বড় ভালো লাগতো আমার। মেয়েটাই তো আগলে রেখেছে আমাকে। এখন ওর জন্যই তো বাঁচা। মনির একটা ভালো ঘরে বিয়ে দিতে পারলে আমি শান্তিতে মরতে পারব, বুঝলে! কিন্তু বিয়ের কথা পাড়লেই এড়িয়ে যায় সে। বলে বিয়ে করবে না। এই প্রজন্ম ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না এতটুকু। কী যে করি আমি!

    আকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে একটু একটু করে। পাখির দল পূব আকাশ থেকে দিকচক্রবাল ধরে পশ্চিমে চলেছে। আমি ঘরে যাইনি এখনো। যেতে মন লাগছে না এতটুকু। আমার তো এখন ভরা হেমন্তকাল। ধান তোলার মরশুম। আমার কি আর সামান্য হিমে ভয় পেলে চলে?


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন।