

অলংকরণ: রমিত
বহুদিন আগে দেখা একটি টেলিভিশন নাটক, যার নামটি পর্যন্ত মনে নেই। এমনকি পাত্রপাত্রী কারা ছিলেন সেটাও ভুলে গেছি। কেবল তার একটুকরো সংলাপ এখনো স্মৃতির গা ঘেষে ঘন হয়ে বসে আছে। সংলাপটি ছিল প্রবাসী কোনো চরিত্রের মুখে: ‘প্রবাসে সব আছে, কেবল মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর গোলাপের সুবাস নেই।’ তখনো প্রবাসী জীবন শুরু হয়নি বলে কি না জানি না, অতটা হেলদোল হয়নি। অথচ স্মৃতি কেমন যত্ন করে তুলে রেখেছে সেটিকে! যার সত্যতা আজ হাড়েহাড়ে টের পাই। এই সংলাপের পাশে দিব্যি আমরা যে যার মতো করে বসিয়ে নিয়ে পারি, যা কিছু প্রবাসজীবনে পাই না। যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন, মা-বাবা এবং স্বদেশ ছাড়া আর কী কী অভাববোধ আমার মনে দুঃখ হয়ে দোলে? আমি নির্দ্ধিধায় বলবো: সোঁদা মাটির গন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, অমর একুশের বইমেলা ছাড়াও দেশের যে জিনিসটির জন্য আমার মন পোড়ে, সেটি হলো রিকশা!
এদেশের রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা সারিসারি রং-বেরঙের গাড়িঘোড়ার ভিড়ে, আমার চোখ একটা সামান্য তিনচাকার যানের খোঁজে প্রায়ই হন্য হয়ে ওঠে। অথচ দেশের রাস্তায় যানজট পাকানোয় সে ভালোই পারদর্শী। যেকারণে ঢাকার অনেক রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বছর কয়েক আগে ওয়াশিংটনের রাস্তায় একটা রিকশার দেখা পেয়েছিলাম। সম্ভবত কোনো আমেরিকান সেটা চালাচ্ছিলেন। অনেকটা দূরত্বে থাকায় আর কিছু জানা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ওই সামান্য সময়ের জন্য রিকশার দেখা পেয়ে মনটা আনন্দে ভরে উঠেছিল। রিকশা ভ্রমণের কত অম্ল-মধুর স্মৃতি এসে ভিড় করেছিল সেই মুহূর্তে। আমাদের মতো মধ্যবিত্তের কাছে রিকশায় যাতায়াত অনেক সময়ই ব্যয় সাপেক্ষ। তবে বাসের ভিড়ভাট্টার অস্বস্তি এড়িয়ে আর সামর্থ্যে কুলালে রিকশাই ছিল গন্তব্যে পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্য বাহন।
রিকশা কেবল মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য নির্ভরযোগ্য বাহন নয়, একই সঙ্গে এটি যেন একটি শহরের আত্মপরিচয় বহনের এক চলন্ত ক্যানভাস। এই তিনচক্রযানটি যখন কোনো শহরের রাস্তায় ঘন্টা বাজিয়ে চলতে শুরু করে, তখন যেন গোটা শহরই তার সাওয়ারি হয়ে ওঠে। তিন চাকার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে চলতে থাকে একটা শহর। রিকশাকে স্রেফ একটি বাহন ভেবে নিলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি শহরের সংস্কৃতি, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজারও শ্রমিকের ঘাম, স্বপ্ন এবং অবশ্যই রিকশার ক্রমবিকাশের ঠিকুজি। এই মাধ্যমের ইতিহাস এবং শিল্প হিসেবে তার বিকাশ পর্বটি বেশ আগ্রহোদ্দীপক। রিকশার ইতিহাস বহুস্তরীয়, সামান্য বিতর্কে ভরা, আর বিস্ময়করভাবে আন্তঃমহাদেশীয়। এর আবিষ্কারের পেছনে কী বির্তক রয়েছে সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা বরং জেনে নেই রিকশা শব্দের উৎপত্তি কীভাবে হলো। রিকশা মূলত একটি জাপানি শব্দ। আদি শব্দটি হলো জিনরিকিশা (jinrikisha)। শব্দটিকে ভাঙলে দাঁড়ায়: jin-মানুষ, riki-শক্তি, sha-যান। অর্থাৎ “মানবশক্তিচালিত যান”। এই শব্দটিই পরে ইংরেজিতে rickshaw হিসেবে রূপ নেয়। বাংলায় সেটি আত্তীকরণ হয়ে আমাদের কাছে “রিকশা” হিসেবে পরিচিতি পায়।
kk | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫০743456
হীরেন সিংহরায় | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:০৫743465