এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতা প্রসঙ্গে 

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ৫২ বার পঠিত
  • আবু সয়ীদ আইয়ুবের আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে কবি অরুণ কুমার সরকারের সঙ্গে আয়ুবের একটি ঘোরতর বিতর্ক স্থান পেয়েছিল। সেখানে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল অমঙ্গল বোধ (sense of evil)। অরুণকুমার সরকার মূলত বোদলেয়ারের কবিতাকে সামনে রেখে বলেছিলেন যে এই অমঙ্গলবোধ না থাকার কারণে রবীন্দ্রনাথ কবি হিসেবে আধুনিক নন। প্রবল আস্তিক্যবোধে স্পৃষ্ট থাকার কারণে তিনি জানেন, আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফুটবেই। শেষ পনের বছরে বেছে নেওয়া চিত্রকলা মাধ্যমেই কেবল তাঁর ভয়,উদবেগ,আশংকা পরিত্রাণহীন ভাবে জেগে থেকেছে। ফলে সেখানে তিনি আধুনিক। কবি হিসেবে নন। মোটামুটি এরকমই ছিল অরুণ কুমার সরকারের বক্তব্য।

    সম্প্রতি কাছাড় উপত্যকার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক দেবাশিস তরফদারের একটি প্রবন্ধ সংকলনের ‘বীজ সংরক্ষণের কাল' গ্রন্থশীর্ষক লেখায় একটা অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি দেখলাম। দেবাশিস তত্ত্বগতভাবে আধুনিকতা বলতে আমরা অনেকে যে একটা বিশেষ ধরন বুঝি তার বিরোধী। কিন্তু তার লেখাতে আধুনিকতার মধ্যে একটা শিবির বিভাজন আছে। বোদলেয়ারের কবিতা তাঁরও রেফারেন্স পয়েন্ট। কিন্তু সেখানে নিছক অমঙ্গল চেতনাই তিনি দেখেন না। তিনি দেখেন সেই অমঙ্গল থেকে উদ্ধারের আর্তি। সেখানে কবি অনুভব করেন আত্মার শুশ্রূষার প্রয়োজন। ফলে দেবাশিস একে মহত্ত্বের অভিধা দিতে পিছপা নন। তিনি মনে করেন শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিকতার পদার্পণ,প্রকৃতি ও আত্মস্বভাব থেকে বিচ্ছেদ কবি বা সাহিত্যিকের সংবেদনশীল মনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল তাই সৎ সাহিত্য।

    কিন্তু পরবর্তীতে শিল্পবিপ্লব উত্তর যে সমাজ অন্য রকম এক আধুনিকতার বোধ জন্ম দেয় দেবাশিস তার বিরুদ্ধে। সেখানে আধুনিকতার এই বিচ্ছেদ নিয়ে কোনো বেদনা নেই,উদযাপন আছে। দেবাশিস বলেন নি,কিন্তু মার্কসবাদীরা এটাকেই বোধহয় বলতেন অবক্ষয়ী আধুনিকতা। আমাদের এখানেও পাঁচের দশকের শেষ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দীব্যাপী নেশা এবং যৌনতাকে গরিমায়িত করা এক আধুনিকতার খুব দাপট ছিল। আমাদের আধুনিকতাকেও দুইভাগে ভাগ করতে চান দেবাশিস। যেটাকে আমরা নবজাগরণ বলি ( উনি বলতে চান না,এরকম একটা নাম দেওয়ার কোনো দরকার নেই বলেন) সেই সময় থেকে বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ বাহিত যে আধুনিকতা, যা পাশ্চাত্যের ভালো জিনিস গ্রহণ করতে গিয়েও স্বদেশিয়ানার হাত ছাড়ে না, যা তিনি জীবনানন্দের মধ্যেও পান। কারণ দেবাশিস মনে করেন, ‘আত্মার স্বাস্থ্যকে গৌণ করে কাব্যচর্চা একটা অকিঞ্চিৎকর কাজ। একটা বয়স ছিল যখন কাব্যপ্রতিভাকে ক্রীড়াপ্রতিভার সগোত্র মনে হত। পরে বুঝতে পেরেছি সেটা যুগলক্ষণ। আমাদের যুগ আত্মাকে নিয়ে ভাবিত নয়।’
    যে কবিতায় বা গদ্যসাহিত্যে পীড়িত আত্মার চিৎকারের প্রকাশ আছে সেটা দেবাশিসের মতে শক্তিশালী সাহিত্য।

    ‘প্রকৃত অসুখ তখনই শুরু হ'ল যখন এই চীৎকারের প্রবলতা ও আন্তরিকতা স্তিমিত হয়ে এল।

    প্রবলতর ক্ষতি হ'ল যখন আত্মার শক্তি- হাসবার, কাঁদবার, সংগ্রাম করবার, সাধনা করবার, হাহাকার করবার শক্তিগুলি দুর্বল হ'তে থাকল।

    অর্থাৎ, কাব্যরচনা আর আত্মিক স্তরে রইল না। কী থাকল তখন? ইন্দ্রিয়ের, বিবশ হবার ক্ষমতা আর বুদ্ধির, ক্রীড়া করার ক্ষমতা। আর, চিন্তার অভিশাপ।

    আরেকটি বড় ঘটনা ঘটল নতুন যুগে। প্রকৃতি থেকে, প্রকৃতির অনন্তধর্মিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। আত্মার শুকিয়ে আসার সে এক প্রধান কারণ। যন্ত্রবুদ্ধিকে মাত্রাছাড়া গুরুত্ব দেওয়ার একটি নবার্জিত সংস্কার আমাদের সূক্ষ্মতাকে নষ্ট ক'রে দিল।

    এই রচনায় শিল্পবিপ্লবোত্তর ইয়োরোপকেই, হয়ত একটু সংকীর্ণ অর্থে আধুনিক যুগ বলা হচ্ছে। তার আগের তিন শতাব্দীকে রেনেসাঁস যুগ বলাই শ্রেয় দুটি কারণে। প্রথমত, এই যুগে ধ্রুপদী গ্রীক-রোমান সভ্যতার সঙ্গে একটি পুনরাবিষ্কৃত আত্মীয়তা হেতু ধ্রুপদী সভ্যতার স্বাস্থ্যলক্ষণগুলিকে আত্মস্থ করা গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, যদিও বিজ্ঞান ও সংযোগ, এই যুগের নতুন চালিকা শক্তি বিজ্ঞানসাধনা একমেব হয়ে ওঠেনি এবং আত্মিক সাধনাকে উৎপাটিত করে নি। একজন নিউটন বা একজন গ্যেটে এই ভারসাম্যের সন্তান। রেনেসাঁস যুগ ও আধুনিক যুগের আত্মা ঠিক এক নয়।’

    এই খানেই দেবাশিস পার্থক্যটা রাখতে চেয়েছেন। এবার এইটেকে সামনে রেখে উনি বাংলা কবিতা কিভাবে ইওরোপের মননদাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারে তাই নিয়ে আলোচনা করেছেন।

    তবে,এই নিয়ে অনেক আলোচনাই হতে পারে।ধরা যাক,কাম্যুর আউটসাইডার। সেখানে তো আত্মবিচ্ছেদ নিয়ে নায়কের কোনো হাহাকার নেই। সে ওই আত্মবিচ্ছেদেরই ফসল। তাই নিয়ে আলাদা করে কোনো উদযাপনও নেই তার। কিন্তু লেখক নিজেই যে তার জীবনদর্শনকে সমর্থন করছেন এমনটা তো নয়। যুদ্ধোত্তর সমাজের এক নৃশংস সমালোচনা হিসেবেও তো ভাবা যেতে পারে উপন্যাসটিকে।আমরা যারা সেই আত্মবিচ্ছেদের তীব্রতা অতটা অনুভব করিনি,তারাও তো পাশ্চাত্যের তৎকালীন সমাজকে চিনে বিমূঢ় হই উপন্যাসটি পড়ে। মেরসোর উদাসীনতা অন্তত একশ বছরের নি:সঙ্গতা পেরিয়েই অর্গলমুক্ত হতে পেরেছে।


     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন।