এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা  ইতিহাস

  • নোয়াখালী দাঙ্গা 

    দীপ
    আলোচনা | ইতিহাস | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৬৪ বার পঠিত
  • ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে, রামগঞ্জ থানা এলাকায় (বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলা) একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ত্র্যম্বকানন্দ নামে এক হিন্দু সন্ন্যাসী স্থানীয় হিন্দু জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে এসেছেন। গুজব অনুযায়ী, তিনি নাকি ঘোষণা দেন যে, পূজার জন্য ছাগলের পরিবর্তে এবার দেবীকে তুষ্ট করতে “মুসলমানদের রক্ত” উৎসর্গ করা হবে। এই গুজব দ্রুত আশপাশের এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।

    নিকটবর্তী শ্যামপুর দয়ার শরীফে স্থানীয় এক পীর গুলাম সরওয়ার হোসেন ওই ঘোষণার বিষয়ে অবগত হন এবং ১০ অক্টোবরের সকালে বিষয়টির সত্যতা জানতে রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর কাছে একটি চিঠি পাঠান। কোনো উত্তর না পেয়ে তিনি সাহাপুর বাজারে একটি জনসভা আহ্বান করেন। সেখানে তিনি স্থানীয় মুসলমানদের ওই গুজবের কথা জানান এবং হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। সভার পরপরই একদল লোক সাহাপুর বাজারে হিন্দুদের মালিকানাধীন দোকানপাটে হামলা চালায়, লুটপাট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।

    পরদিন সকালে, ১১ অক্টোবর ১৯৪৬, সহিংস জনতা চৌধুরীর বাড়িতে অগ্রসর হয়, তাকে হত্যা করে এবং তার কর্তিত মস্তক একটি সিলভারের থালায় করে গুলাম সরওয়ার হোসেনের কাছে উপস্থাপন করা হয়। এর পরপরই নোয়াখালীতে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

    যখন কলকাতায় দাঙ্গা চলতে থাকে তখন নোয়াখালীতে কোন সহিংসতা না হলেও সেই সময় থেকেই আবহাওয়া গরম হতে শুরু করে। কলকাতা দাঙ্গার এক সপ্তাহের মধ্যে এবং নোয়াখালীতে দাঙ্গার ছয় সপ্তাহ পূর্বে কলকাতায় অবস্থিত ইস্টার্ন কম্যান্ড হেডকোয়ার্টার এমন কিছু রিপোর্ট হাতে পায় যেখানে বলা হয়েছিল চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর গ্রাম এলাকায় মুসলিমরা উত্তেজিত অবস্থায় আছে এবং গ্রামের মুসলিমেরা হিন্দু বিদ্বেষ ছড়ানোর লক্ষ্যে নানা ধরেনর ছড়া, পালা, জারিগান, ছন্দবদ্ধ স্লোগান তৈরি করেছে যেগুলো বিভিন্ন হাট-বাজারে গান গেয়ে ও আবৃত্তি করে প্রচার করা হচ্ছে।পাশাপাশি মসজিদ গুলোতে জাতিবিদ্বেষ মূলক বিভিন্ন ছড়া, প্রবচন তৈরি করে প্রচার শুরু করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বক্তৃতা, সমাবেশে উস্কানি ছড়িয়ে হত্যাযজ্ঞের মঞ্চ প্রস্তুত করতে শুরু করে গোলাম সরোয়ার ও তার অনুসারীরা।

    বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চল প্রচুর খালবিল-নদী অধ্যুষিত থাকায় এটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত এক এলাকা ছিল। দাঙ্গা শুরু হলে পরিকল্পিত ভাবে গ্রামের খাল গুলোর বাঁশের সাকো ভেঙ্গে ফেলা হয় ও রাস্তা খুঁড়ে চলাচল অযোগ্য করা হয় এবং মুসলিম মাঝিরা হিন্দু যাত্রীদের তাদের নৌকায় পারাপারে অস্বীকৃতি জানায়।
    ১৯৪৬ সালের ২৯ আগস্ট ছিল ঈদ-উল-ফিতরের দিন। সেদিন থেকেই নোয়াখালীর মানুষের মনে আশঙ্কা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। পরিকল্পিত ভাবে একটি গুজব ছড়িয়ে দেয়া হল যে, হিন্দু এবং শিখ সম্প্রদায় অস্ত্র হাতে জড়ো হচ্ছে। ফেনী নদীতে মাছ ধরার সময় কিছু হিন্দু জেলে ও মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একজন মারা যায় আর আরও দুজন মারত্মক আহত হয়। মুসলিমরা মারণাস্ত্র নিয়ে চর উড়িয়াতে নয়জন হিন্দু জেলেকে আক্রমণ করে। তাদের বেশির ভাগ মারাত্মক জখম হয়। সাত জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

    রামগঞ্জ থানার আওতাধীন বাবুপুর গ্রামের কংগ্রেস নেতার পুত্র দেবীপ্রসন্ন গুহকে মুসলিমরা হত্যা করে। দেবীপ্রসন্নের আরেক ভাই এবং তাদের কর্মচারীকে মারাত্মক ভাবে আহত করে তারা। দেবীপ্রসন্নের বাড়ির সামনে থাকা কংগ্রেস অফিস আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। জামালপুরের কাছে মনপুরার চন্দ্রকুমার কর্মকারকে ও ঘোষবাগের হোটেল কর্মচারী যামিনী দে কে হত্যা করা হয়। চর পার্বতীর তাজুমিয়ার হাটে দেবীসিংহপুরের অশু সেনকে নৃশংস ভাবে পেটানো হয়। বাঁশপাড়ার রাজকুমার চৌধুরীকে তার বাড়িতে যাবার পথে মারাত্মক ভাবে পিটিয়ে জখম করে ফেলে রাখা হয়।

    ১৯৩৭ সালে মুসলিম পীর পরিবারের বংশধর গোলাম সরোয়ার হুসেইনী কৃষক-প্রজা পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে বঙ্গীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। যদিও ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগ দলের প্রার্থীর নিকট পরাজিত হন। গোলাম সরোয়ারের পিতা এবং পিতামহ খুবই ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এলাকায় এবং কঠোর ভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলতেন। তারা বংশানুক্রমিক ভাবে শ্যামপুরের দিয়ারা শরীফের খাদিম ছিল। দিয়ারা শরীফ ওই এলাকার হিন্দু-মুসলিম সবার কাছেই খুব পবিত্র স্থান হিসেবে গন্য হত। কোলকাতা দাঙ্গার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পর থেকেই হুসেনি উস্কানি মুলক বক্তব্য দেয়া শুরু করে এবং মুসলিমদেরকে হিন্দু নিধনে উৎসাহিত করতে থাকে। কিছু এলাকায় মুসলিমরা হিন্দু দোকান-পাট থেকে দ্রব্যাদি কেনা থেকে বিরত থাকে। রামগঞ্জ ও বেগমগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন এলাকার নৌকার মুসলিম মাঝিরা হিন্দু যাত্রীদেরকে পারাপার করতে অস্বীকৃতি জানায়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুসলিমরা সাহাপুরের হিন্দু দোকানপাট লুট করে। কোলকাতা থেকে যে সকল হিন্দু তাদের গ্রামে দুর্গা পূজার ছুটি কাটাতে এসেছিল তারা স্থানীয় মুসলিমদের নিকট হয়রানি, নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হন। মুসলিমরা অক্টোবরের ২ তারিখ থেকে সুযোগ পেলেই হিন্দুদের সম্পদ লুট, হিন্দুদেরকে হত্যা ও নির্যাতন শুরু করে দেয়।

    খুব দ্রুত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। গোলাম সরোয়ার হুসেনির বক্তব্যের পর রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন বাজারের হিন্দু দোকান মুসলিমরা লুট করে। মুসলিমরা নোয়াখালী বারের সভাপতি এবং হিন্দু মহাসভার নেতা সুরেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজন্দ্রলাল চৌধুরীর বসত-বাড়ি আক্রমণ করে।

    ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসের ১০ তারিখ কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার দিন। নোয়াখালীর হিন্দুরা বাড়িতে পূজার আয়োজনে ব্যস্ত। অন্যদিকে মুসলিম লীগ নেতা-কর্মীরা প্রচার করে যে, শিখ সম্প্রদায় দিয়ারা শরীফ আক্রমণ করেছে। গুজবের ফলে আশে পাশের এলাকার মুসলিমরা দলে দলে দিয়ারা শরিফে জড় হয়। গোলাম সরোয়ার হুসেনি সমবেত মুসলিমদেরকে সাহাপুর বাজার আক্রমণ করতে নির্দেশ দেয়। কাশেম নামের আরেকজন মুসলিম লীগ নেতাও তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে সাহাপুর বাজারে পোঁছায়, যাদেরকে কাশেমের ফৌজ বলা হত।

    কাশেমের ফৌজ নারায়ণপুর থেকে সুরেন্দ্রনাথ বসুর ‘জামিনদার অফিসের’ দিকে এগিয়ে যায়। কল্যাণনগর থেকে আসা আরেকদল দাঙ্গাবাজ মুসলিম দল কাশেমের ফৌজের সাথে যোগ দেয়। এদের সাথে আরও অনেক ভাড়া করে আনা মুসলিম গুণ্ডারা জামিনদার অফিসে আক্রমণ করে। সামান্য প্রতিরোধের পরই সুরেন্দ্রনাথ বসু ধারাল অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মক ভাবে আহত হন। মুসলিম জনতা হাত-পা বেধে তাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। সুরেন্দ্রনাথ বসুকে মুসলিমরা আক্রমণ করেছে শুনতে পেয়ে পাশের পাঁচঘরিয়া গ্রামের ডাক্তার রাজকুমার পাল তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে মুসলিম দুর্বৃত্তরা ছুরিকাহত করে।

    নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত সোনাচাকা গ্রামের অধিবাসী রায়পুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের হেড পণ্ডিত শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী ঠাকুর(কাব্যতীর্থ) একটি হলফনামায় উল্লেখ করেন, ১০ অক্টোবর রায়পুর ও রামগঞ্জে লুণ্ঠন, হত্যা, অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। ১৪ অক্টোবরে রায়গঞ্জ বাজার সংলগ্ন গ্রামগুলোতে অগ্নিকাণ্ড দেখতে পেয়ে প্রায় দুইশত নরনারী স্থানীয় থানায় আশ্রয় নেয়। সংগঠিত মুসলিম জনতা এসময় রায়পুরের সকল দেবদেবীর বিগ্রহ ভেঙ্গে ফেলে, মন্দিরগুলো ধ্বংস করে এবং হিন্দু দোকান-বাড়িঘর লুটকরে থানায় প্রবেশ করে। থানার মুসলিম দারোগা সব হিন্দু পুরুষকে থানা থেকে জোর করে বের করে দেয়। উন্মত্ত মুসলিম জনতা এসময় তাদেরকে তীব্রভাবে প্রহার করে স্থানীয় বড় মসজিদে নিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে এবং গো-মাংস খেতে বাধ্য করে। স্থানীয় খ্যাতনামা ব্যবসায়ী নবদ্বীপচন্দ্র নাথ থানা থেকে বের হতে শেষ পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানালে, মুসলিমরা তাকে থানার ভিতর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায়। তাকে সেখানেই প্রকাশ্যে নৃশংস ভাবে প্রহার ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে এবং মৃতদেহ রশিতে বেঁধে টানতে টানতে উত্তর দিকে নিয়ে যায়।

    অক্টোবর মাসের ১১ তারিখে গোলাম সরোয়ারের ব্যক্তিগত বাহিনী ‘মিঞার ফৌজ’ নোয়াখালী বার এ্যাসোসিয়েশন ও জেলা হিন্দু মহাসভার সভাপতি রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর বসতবাড়িতে আক্রমণ করে। সে সময়ে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের স্বামী ত্রম্বকানন্দ তাঁর বাড়িতে অতিথি হিসেবে ছিলেন। রাজেন্দ্রলাল পুরোটা দিন তার বাড়ির ছাদ থেকে রাইফেল নিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করেন। রাত নেমে আসার পর যখন দাঙ্গাবাজেরা ফিরে গেল তখন রাজেন্দ্রলাল স্বামী ত্রম্বকানন্দ এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেন। পরের দিন আবার মুসলিম দাঙ্গাকারীরা সংগঠিত হয়ে রাজেন্দ্রলালের বাড়িতে আক্রমণ করে। তারা বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে। রাজেন্দ্রলাল, তার অগ্রজ চিন্তাচরণ এবং অনুজ সতীশসহ পরিবারের ২২ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়।রাজেন্দ্রলাল রায় চৌধুরীর শরীর থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে মুসলিমরা। এরপর সে ছিন্নমস্তক একটি থালায় করে গোলাম সরোয়ার হুসেনির নিকট নিয়ে আসে তার বাহিনী। রাজেন্দ্রলালের বাড়ি থেকে তার দুই মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে আসে হুসেনির বাহিনী যাদেরকে হুসেনি তার দুই বিশ্বস্ত অনুচরকে গনিমতের মাল হিসেবে দেয়।

    কংগ্রেস সভাপতি আচার্য্য কৃপালনির স্ত্রী সুচেতা কৃপালনির মতে, রাজেন্দ্রলাল শিবাজি এবং গুরুগোবিন্দের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এবং তাঁর পরিবারের সম্মান ও নিজের বিশ্বাসকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হন। গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলনের একনিষ্ঠ অনুসারী আচার্য কৃপালিনী মনে করেন, রাজেন্দ্রলাল আর তার পরিবার নিজেদের রক্ষা করতে সম্পূর্ণ অহিংস পন্থা বেছে নিয়েছিলেন। তিনমাস পরে নোয়াখালী পরিদর্শনের সময় মহাত্মা গান্ধী লুটপাট আর ধ্বংসকৃত রাজেন্দ্রলালের বাড়িতে যান। ১৯৪৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজেন্দ্রলালের গলিত শব আজিমপুরের জলা থেকে তুলে লামচর হাইস্কুলে গান্ধীজীর প্রার্থনা সভাতে নিয়ে আসা হয়। প্রার্থনার পরে রাজেন্দ্রলালের মস্তকবিহীন শরীর হিন্দুরীতিতে দাহ করা হয়।

    রামগঞ্জ পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন সোমপাড়া বাজারের কাছে গোপাইরবাগে দাস পরিবারের উপর কাশেমের নিজস্ব বাহিনী আক্রমণ করে। দাস পরিবার ছিল কাশেমের নিকটতম প্রতিবেশী। আক্রমণকারী বাহিনী দাস পরিবারের ১৯ জন সদস্যকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। হত্যার পূর্বে বাড়ির নারীদের ধর্ষণ করা হয়। মুসলিমরা রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন নোয়াখোলা গ্রামের চৌধুরী পরিবারের উপর হামলা চালায় বর্বর দাঙ্গাকারীরা। হামলাকারীরা উন্মত্তের মত হত্যার তাণ্ডব চালায়, লুটপাট করে এবং আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই বাড়ির মোট ৮ জন পুরুষ সদস্যের সবাইকে হত্যা করা হয়। বাড়ির মহিলাদের টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসম্মুখে গণধর্ষণ করা হয়।

    মুসলিমদের আরেকটি দল রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের গোবিন্দপুরের যশোদা পাল ও ভরত ভূঁইয়ার বাড়িতে আক্রমণ করে। তারা পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে দড়ি দিয়ে বেধে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। বাড়ির মহিলাদের উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়। আমিশাপাড়া এবং সাতঘরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকার ভৌমিক এবং পাল পরিবারের সবাইকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই বানানো হয়। এই দুই পরিবারের সদস্যকে হত্যা করে মুসলিমরা। বাড়ির নারীদের সম্মানহানি করা হয়। গোলাম সরোয়ারের নিজস্ব বাহিনী নন্দীগ্রামের নাগ পরিবারের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে শুধু ক্ষান্ত হয়নি, রমনীকান্ত নাগের প্রতিষ্ঠিত পোস্ট অফিস ও বিদ্যালয় ভবনও পুড়িয়ে দেয়। আশেপাশের হিন্দু পরিবার গুলো নাগ পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং প্রথম দিকে পুলিশ বাহিনীও তাদেরকে নিরাপত্তা দেয়। যখন গোলাম সরোয়ারের বাহিনী নাগ পরিবারের বাড়িতে আক্রমণ করে, পুলিশ তাদের হটিয়ে দেয়।পরবর্তীতে আক্রমণকারী মুসলিম জনতা সুসংগঠিত হয়ে সমস্ত গ্রাম জুড়ে নির্বিচারে লুটপাটের তাণ্ডব চালায়। কুঞ্জ কুমার নামে বৃদ্ধকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করে দাঙ্গাকারীরা।

    ১৩ অক্টোবর দুপুর ১২টার সময় মারাত্মক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত ২০০-২৫০ জনের মুসলিমদের একটি দল চাঙ্গিরগাঁও এর হিন্দুদের উপর হামলে পড়ে। তারা হিন্দুদের ১,৫০০ মণ ধান পুড়িয়ে ভস্মে পরিণত করে দেয়। এলাকার সমস্ত মন্দির গুড়িয়ে দেয়া হয়। তারা সকল হিন্দু মহিলাদের শাঁখা ভেঙ্গে ফেলে, সিঁথির সিঁদুর মুছে দেয় আর হিন্দু পুরুষদের নামাজ পড়তে বাধ্য করে। অক্টোবরের ১২ তারিখে রাইপুর থানার অন্তর্গত শায়েস্তাগঞ্জের চিত্তরঞ্জন দত্ত রায়চৌধুরীর বাড়িতে একদল মুসলিম হামলা করে। তিনি তার পরিবারের সকল সদস্যদেরকে বাড়ির ছাদে তুলে দেন এবং নিজে ছাদ থেকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে আত্মরক্ষার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেন; কিন্তু আক্রমণ কারীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি অপরদিকে তার গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন তিনি প্রতিরোধের জন্য আক্রমণকারীদের উপর জল কামান ব্যবহার করেন। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তিনি তার বৃদ্ধ মা এবং বাচ্চাদেরকে নিজহাতে গুলি করেন এবং সব শেষে নিজে আত্মহত্যা করেন। রামগঞ্জ পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন সোমপাড়া বাজারের কাছে গোপাইরবাগে দাস পরিবারের উপর কাশেমের নিজস্ব বাহিনী আক্রমণ করে। দাস পরিবার ছিল কাশেমের নিকটতম প্রতিবেশী। আক্রমণকারী বাহিনী দাস পরিবারের ১৯ জন সদস্যকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। হত্যার পূর্বে বাড়ির নারীদের ধর্ষণ করা হয়। 

    মুসলিমরা রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন নোয়াখোলা গ্রামের চৌধুরী পরিবারের উপর হামলা চালায় বর্বর দাঙ্গাকারীরা। হামলাকারীরা উন্মত্তের মত হত্যার তাণ্ডব চালায়, লুটপাট করে এবং আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই বাড়ির মোট ৮ জন পুরুষ সদস্যের সবাইকে হত্যা করা হয়। বাড়ির মহিলাদের টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসম্মুখে গণধর্ষণ করা হয়। মুসলিমদের আরেকটি দল রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের গোবিন্দপুরের যশোদা পাল ও ভরত ভূঁইয়ার বাড়িতে আক্রমণ করে। তারা পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে দড়ি দিয়ে বেধে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। বাড়ির মহিলাদের উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়। আমিশাপাড়া এবং সাতঘরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকার ভৌমিক এবং পাল পরিবারের সবাইকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই বানানো হয়। এই দুই পরিবারের সদস্যকে হত্যা করে মুসলিমরা। বাড়ির নারীদের সম্মানহানি করা হয়।গোলাম সরোয়ারের নিজস্ব বাহিনী নন্দীগ্রামের নাগপরিবারের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে শুধু ক্ষান্ত হয়নি, রমনীকান্ত নাগের প্রতিষ্ঠিত পোস্ট অফিস ও বিদ্যালয় ভবনও পুড়িয়ে দেয়। আশেপাশের হিন্দু পরিবার গুলো নাগ পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং প্রথম দিকে পুলিশ বাহিনীও তাদেরকে নিরাপত্তা দেয়। যখন গোলাম সরোয়ারের বাহিনী নাগ পরিবারের বাড়িতে আক্রমণ করে, পুলিশ তাদের হটিয়ে দেয়।পরবর্তীতে আক্রমণকারী মুসলিম জনতা সুসংগঠিত হয়ে সমস্ত গ্রাম জুড়ে নির্বিচারে লুটপাটের তাণ্ডব চালায়। কুঞ্জ কুমার নামে বৃদ্ধকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করে দাঙ্গাকারীরা।

    ১৩ অক্টোবর দুপুর ১২টার সময় মারাত্মক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত ২০০-২৫০ জনের মুসলিমদের একটি দল চাঙ্গিরগাঁও এর হিন্দুদের উপর হামলে পড়ে। তারা হিন্দুদের ১,৫০০ মণ ধান পুড়িয়ে ভস্মে পরিণত করে দেয়। এলাকার সমস্ত মন্দির গুড়িয়ে দেয়া হয়। তারা সকল হিন্দু মহিলাদের শাঁখা ভেঙ্গে ফেলে, সিঁথির সিঁদুর মুছে দেয় আর হিন্দু পুরুষদের নামাজ পড়তে বাধ্য করে। ত্রিপুরার (ত্রিপুরা জেলা ছিল কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে) চাঁদপুর থেকে যোগেন্দ্র চন্দ্র দাস (এম.এল.এ.) অক্টোবরের ১৪ তারিখে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নিকট চিঠিতে লেখেন, নোয়াখালীর রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হাজার হাজার নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের উপর নির্যাতন করে মুসলিমরা। তাদের বাড়িঘর লুটপাট করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় বসত ভিটা আর তাদেরকে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরকরণের মত ঘৃণ্য কাজ করে তারা।
    প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্য অনুসারে, আক্রমণকারীরা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পেট্রোল ব্যবহার করত। প্রত্যন্ত দ্বীপ সন্দ্বীপে মোটর গাড়ি বা পেট্রল ছিল না তাই হিন্দুদের বাড়িঘর পোড়ানোর জন্য মূল ভূখণ্ড থেকে পেট্রোল নিয়ে আসা হত। এ'প্রসঙ্গে রাকেশ বটব্যাল বলেন, পেট্রোল এবং কেরোসিনের এমন ব্যবহার দেখে বোঝা যায় হিন্দুদের উপর এই বর্বর আক্রমণ পূর্বপরিকল্পিত এবং খুবই সুসংগঠিত। সন্দীপে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী লালমোহন সেন হিন্দুদের রক্ষার চেষ্টা কালে মুসলিম জনতা তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।

    ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসের ১০ তারিখ থেকেই নোয়াখালী জেলার উত্তরের রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা গুলোতে নৃশংসতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এই লেলিয়ে দেয়া নৃশংসতাকে বর্ণনা করা হয়, ‘মুসলিম জনতার সংগঠিত হিংস্রতা (the organized fury of the Muslim mob)’। দ্রুত এই হিংস্রতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আশেপাশের নোয়াখালী জেলাধীন রায়পুর পুলিশ স্টেশন, লক্ষ্মীপুর, বেগমগঞ্জ, সন্দ্বীপ এবং ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত ফরিদ্গঞ্জ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর, লাকসাম ও চৌদ্দগ্রামে।
    এই সহিংসতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ ছিল মাত্রাহীন নিষ্ঠুরতা। তখনকার এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এখনও পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন পরিসংখ্যানগুলো থেকে নিশ্চিত করে এ সম্পর্কে ধারণা করা যায় না। যদি হিন্দু পত্রিকা গুলো মৃতের সংখ্যা এক হাজার বলত তাহলে মুসলিম লীগের পত্রিকা গুলো ভিন্ন সংখ্যা প্রকাশ করত এমনকি কোন হতাহতের সংবাদ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বসত। গান্ধীবাদী অশোক গুপ্ত মহাত্মা গান্ধীর সাথে গনহত্যা সংগঠনের এলাকা গুলো পরিদর্শন করে বলেন, কমপক্ষে ২,০০০ হিন্দুকে জোরপূর্বক মুসলমান করা হয়েছে। তিনি অন্তত ছয় জনকে দেখেছেন যাঁদের জোর করে বিয়ে করেছে মুসলিমরা এবং আত্মীয় খুন হয়েছে পাশবিক ভাবে। দাঙ্গার সময় নোয়াখালী নউরির জমিদার যশোদা রঞ্জন দাসকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। নিরাপত্তার জন্য তিনি তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়ে দিয়ে ভাইয়ের সাথে নোয়াখালী ছিলেন। কয়েক মাস পর মহত্মা গান্ধীর প্রচেষ্টায় তাঁর গলিত দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

    দাঙ্গা কবলিত গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে হিন্দুদেরকে জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার মত ঘৃণ্য পাশবিকতায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে মুসলিমরা।হিন্দু পুরুষদেরকে মাথায় টুপি এবং মুখে দাঁড়ি রাখা বাধ্যতামুলক করা হয়। মহিলাদের হাতের শাঁখা ভেঙ্গে ফেলে এবং কপালের সিঁদুর মুছে দেয় মুসলিমরা। তাদেরকে কলেমা পড়ে ইসলামে ধর্মান্তকরন করা হয়। সেখানে হিন্দু মহিলাদের মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে মুসলিম লীগের গুণ্ডারা পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়ে হাতের শাঁখা ভেঙ্গে তাদের স্বামী ও পুত্র ও শিশুকন্যাদের হত্যা করে ওই হিন্দু মহিলাদের জোর করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে বিয়ে করত। মুসলিমরা তাঁদের বাড়ি টহল দেয়া শুরু করে এবং গ্রামের মৌলবিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইসলামিক শিক্ষা নিতে বাধ্য করতে থাকে। হিন্দু পুরুষদেরকে মুসলিমরা জোর করে মসজিদে নিয়ে নামাজ পড়াত। হিন্দুদেরকে জোর করে গরুর মাংস খেতে বাধ্য করা হয় কারণ হিন্দুধর্মানুসারে গরু তাদের কাছে পবিত্র প্রাণী বিধায় এর মাংস তারা খায় না। হিন্দু মেয়ে এবং মহিলাদের মুসলিমরা জোর করে বিয়ে করে। ধর্মান্তরিত হিন্দুদের আরবী নামে নতুন নামকরণ করা হয়। মুসলিম নেতারা উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের নামের টাইটেল যেমন চৌধুরী, ঠাকুর প্রভৃতি নামের শেষে যুক্ত করতে অনুমতি দেয়।

    অশোকা গুপ্তর স্বামী চট্টগ্রামের একজন বিচারক ছিলেন। তিনি সেই সব মানুষদের মধ্যে একজন যাঁরা সর্বপ্রথম নোয়াখালীতে দুর্গতদের সাহায্যের জন্য এসেছিলেন। তিনি একজন দুর্ভাগা মহিলার কথা জানতেন, যাঁর স্বামী তাঁদের কাছে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন। প্রতি রাতে গ্রামের মুসলিমরা ওই মহিলাকে ধরে নিয়ে যেত এবং ধর্ষণ করত। কিন্তু তারা গ্রাম থেকে পালাতেও পারত না। অশোকা গুপ্ত বলেন, তাঁরা পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেন। কিন্তু ওই দুর্ভাগাদের সাহায্যের জন্য কেউ ছিল না। নোয়াখালী জেলার পাঁচঘরিয়া গ্রামের অনন্তকুমার রায়ের মেয়ে আরতীপ্রভা শূররায়ের বয়ান থেকে জানা যায়,গ্রামের রাজকুমার পালকে মুণ্ডচ্ছেদ করার পর গ্রামবাসীরা জিল্লুর রহমান ওরফে কাদিরের সাথে আরতীকে বিয়ে দেয়ার জন্য তার পরিবারকে হুমকি দেয়। কিন্তু তাঁর পরিবার রাজি না হওয়ায় তাকে অপহরণ করে নিয়ে আসে এবং মুসলিম বানিয়ে বিয়ে দেয়া হয়। এরপর জোরপূর্বক তাঁকে ধর্ষণ করতে থাকে তারা। আরতি নিজের ইচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছেন এই মর্মে একটি লেখা তাঁর কাছ থেকে জোর করে লিখিয়ে নেয় সেখানকার পুলিশের একজন এসপি।অপহরণের পনের দিন পরে তার বাবা,কাকা একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। ম্যুরিয়েল লেস্টার নামক একজন ম্যাজিস্ট্রেট নোয়াখালীর হিন্দু নারীদের অবর্ণনীয় নির্যাতন সম্পর্কে লেখেন যে,সেখানে মেয়েদের অবস্থা নিকৃষ্টতম।  তাঁদের অনেকেই নিজেদের স্বামীকে খুন হতে দেখেছেন এবং স্বামীর হত্যাকারীরাই তাঁদেরকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছে।ঐ সব নারীরা জীবন্মৃত অবস্থায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরকে হত্যা করে নারীদেরকে বিভিন্নজনের কাছে ভাগ করে দিত ঐ এলাকার মৌলভী ও মুরব্বিরা।মুসলিম পরিবারের নারীরাও এসব অপহৃত ভাগ্যহত হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করতে ও লুকিয়ে রাখতে সমানভাবে সাহায্য করত পুরুষ সদস্যদেরকে।

    সুচেতা কৃপালনি জেলাপ্রশাসক ম্যাক্লেন্নারীকে নিয়ে একটি মেয়েকে উদ্ধারে গেলে ভীতসন্ত্রস্ত মেয়েটি প্রথমে জানায়, সে স্বেচ্ছায় এসেছে।কিন্তু সুচেতার অনুরোধে ম্যাক্লেন্নারী একান্তে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতেই সে তাকে উদ্ধার করতে আর্তনাদ করে ওঠে।

    অশোকা গুপ্ত লেখেন,স্বেচ্ছাসেবীরা যে পথে যাতায়াত করত সে পথে মুসলিমরা দলবেঁধে মলমূত্র ত্যাগ করত। এছাড়া আবর্জনা,কাঁচের টুকরো বিছিয়ে রেখে দিত। ধর্মান্তরিতদের চলাচল ছিল মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণাধীন।কখনও গ্রামের বাইরে যেতে হলে স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অনুমতি নিতে হত। রামগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত খালিশপাড়াতে মুসলিমরা ধর্মান্তরিত হিন্দুদের কাছ থেকে জোর করে লিখিত আদায় করে।
    যখন এই পাশবিক হিন্দু নিধন আর ন্যক্কারজনক ধর্মান্তকরনের খবর বিভিন্ন সংবাদ পত্রে প্রকাশ হতে শুরু করে আশ্চর্যজনক ভাবে মুসলিম লীগ পরিচালিত সংবাদপত্র দি স্টার অফ ইণ্ডিয়া(The Star of India) জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের ঘটনা অস্বীকার করে বসল।
    যদিও এসেম্বেলিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রশ্নের উত্তরে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী বলেন শুধুমাত্র ত্রিপুরা জেলাতে ৯,৮৯৫ টি ধর্মান্তকরনের ঘটনা ঘটেছে। যদিও এটিত মূল সংখ্যার তুলনায় হয়ত খুবই নগন্য।
    নোয়াখালীতে কতগুলো ধর্মান্তকরনের ঘটনা ঘটেছে তার হিসাব হয়নি কিন্তু সহজে বোঝা যায় তার সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। এডওয়ার্ড স্কিনার সিম্পসন তার রিপোর্টে কেবলমাত্র ত্রিপুরা জেলার তিনটি পুলিশ স্টেশন যথা ফরিদ্গঞ্জ,চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত এলাকাতেই ২২,৫৫০ টি ধর্মান্তকরনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেন। ডঃ তাজ-উল-ইসলাম হাশমী মনে করেন, নোয়াখালী গণহত্যায় যে পরিমান হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে তার কয়েকগুন বেশি হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণ এবং ধর্মান্তকরন করা হয়েছে। এম.এ.খান এর মতে, নোয়াখালীর ৯৫ ভাগ হিন্দুদেরই জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তকরন করেছিল মুসলিমরা। বিচারপতি জি.ডি. খোসলা মনে করেন, নোয়াখালীর সমগ্র হিন্দু জনগোষ্ঠীর সর্বস্ব লুট করে নেয়া হয়েছিল এবং তাদের কে জোরপূর্বক মুসলমান বানানো হয়েছিল। 
    কংগ্রেস সভাপতি আচার্য্য কৃপালনির স্ত্রী সুচেতা কৃপালনি নোয়াখালীতে নারী উদ্ধার করতে যান। দাঙ্গার নায়ক গোলাম সরোয়ার ফতোয়া দেয়, যে সুচেতাকে ধর্ষণ করতে পারবে তাকে বহু টাকা দেওয়া হবে এবং গাজী উপাধিতে ভূষিত করা হবে। সুচেতা সবসময় পটাশিয়াম সাইনাইড ক্যাপসুল গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন। বেঁচে যাওয়া হিন্দুরা দুই ধাপে নোয়াখালী ও ত্রিপুরা(বর্তমান কুমিল্লা) ছেড়েছিল। গনহত্যা,ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরন শুরুর হওয়ার সাথে সাথেই প্রথম পর্যায়ে হিন্দুরা কলকাতা পালিয়ে বেঁচেছিল। কলকাতায় দুর্গত আশ্রয় প্রার্থীদের আসার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে এসেছিল যখন সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন নোয়াখালী ও কুমিল্লাতে ত্রান বিতরনের ঘোষণা দিল। ১৯৪৭ সালে কোন বিকল্প হাতে না পেয়ে অবশেষে কংগ্রেস যখন ভারতবর্ষের বিভাজন মেনে নেয় তখন ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দাঙ্গায় পীড়িত ও আর্ত সহায় সম্বলহীন হিন্দুরা ত্রিপুরা,আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভন্ন জায়গাতে চলে আসে যে জায়গা গুলো ভারতের ভিতর পড়েছিল। শুধু মাত্র আসামের রাজধানী গৌহাটিতেই ৫০,০০০ উপরের রিফিউজিদের অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

    ইতিহাসবিদরা মূলত তিনটি কারণে নোয়াখালীর হত্যাযজ্ঞকে ভারতের অন্যান্য জায়গার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সাথে তুলনা করতে চান না।
    প্রথমত, এখানে দুই পক্ষের শক্তি সমান ছিল না, যেমনটি দেখা গিয়েছিল কলকাতা দাঙ্গার সময়। এখানে মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠী হামলার শিকার হন।
    দ্বিতীয়ত, ঐ হত্যাযজ্ঞের সময় এবং পরে বহু হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করা হয়। 
    তৃতীয়ত, হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষদের জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। যাদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল তাদের কাছ থেকে লিখিয়ে নেয়া হয়েছিল যে তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

    ১৯৪৬ নোয়াখালীর দাঙ্গার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিহারে দাঙ্গার সুত্রপাত হয়। ৩০ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বরের মধ্যকার সংগঠিত বিহার দাঙ্গার ফলে ভারতবিভাজন ত্বরান্বিত হয়। ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে বিহারের ছাপরা এবং শরণ জেলায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পরে। শীঘ্রই পাটনা, মুঙ্গের, ভাগলপুরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সরকারের পক্ষে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিত স্বাভাবিক রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে এবং ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট দাঙ্গার নারকীয় বীভৎসতা দেখে গান্ধী-নেহেরু তথা কংগ্রেস নেতৃত্ব জিন্নাহের নেতৃত্বে থাকা মুসলিম লীগের ভারত ভাগের দাবী মেনে নেন। ফলে ভারত বিভাগের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামে নতুন দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন।