এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  ইতিহাস  ইস্পেশাল

  • আগুনে গড়া হাজার বছর ১

    সুকান্ত ঘোষ
    আলোচনা | ইতিহাস | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৯৮ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ

    সঙ্গের ছবিগুলি : সুকান্ত ঘোষ



    ভারতের লোহা-ইস্পাতের গল্প - প্রথম পর্ব: জন্ম ও গৌরব


    শুরুর কথা


    আমরা ভারতীয়রা গর্ব করতে ভালোবাসি আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে। তবে সেই গর্ব করার সীমারেখা মাঝে মাঝেই বিষয়বস্তুর কারণে ধোঁয়াটে হয়ে যায়। ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ খুললেই আজকাল বেশী বেশী চোখে পড়ে যে প্রাচীন ভারতে নাকি উড়োজাহাজ উড়ত, ঋষিরা নাকি টেস্ট-টিউব বেবি বানিয়ে ফেলেছিলেন, বেদে নাকি লুকোনো ছিল পরমাণু অস্ত্রের নকশা ইত্যাদি ইত্যাদি! শুনতে বেশ লাগে, অনেকে বুকটা ফুলিয়েও ফেলেন। কিন্তু ইতিহাসের কষ্টিপাথরে ঘষলে এসব দাবির বেশিরভাগেরই রং চটে যায়, কারণ প্রমাণ তেমন কিছু নেই, শুধু গল্প। অথচ মজার ব্যাপার কী জানেন? ঠিক যে-জিনিসটা নিয়ে আমরা হাতে প্রমাণ নিয়ে মাথা উঁচু করে গর্ব করতে পারতাম, সেই জিনিসটার আসল গল্পই বেশিরভাগ মানুষ কোনোদিন শোনেননি। সেই গল্পটাই বলব এই দুই পর্বে - ভারতের লোহা আর ইস্পাতের গল্প।

    এ এমন এক ধাতুর গল্প, যার প্রথমে কোনো নামই ছিল না। যাকে একদিন ডাকা হল “অন্ধকারের ধাতু” বলে, যা দিয়ে গড়া তলোয়ারের জন্য রোম-গ্রিস-পারস্যের রাজারা হাঁ করে বসে থাকতেন, যা দিয়ে ভারতীয় শল্যচিকিৎসকরা কেটে-ফেলা নাক আবার জুড়ে দিতেন - আর শেষে, যে গৌরব আমরা নিজেরাই যত্ন না করে হারিয়ে ফেললাম। এর একটা শব্দও বানানো নয়, বরং প্রতিটি ধাপ আমাদের ভারতে লিখিত ইতিহাস, গ্রিক-রোমান ইতিহাস, আরবি পুঁথি, ঔপনিবেশিক নথি আর আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণে বাঁধা। প্রথম পর্বে থাকবে জন্ম আর উত্থানের গল্প; দ্বিতীয় পর্বে থাকবে কারিগরদের গল্প, ভারতেই ইস্পাত শিল্প কোথায় উঠেছিল তার কিছু উদাহরণ এবং সবশেষে ফিরে দেখব কেন এবং কিভাবে আমরা সেই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেললাম। চলুন তাহলে, শুরু করা যাক একেবারে গোড়া থেকে।

    লোহা মানে কী, আর কেন এত কঠিন


    শুরুতেই একটা ভুল ভাঙিয়ে দিই। প্রাচীন যুগে লোহা গড়া মানে কিন্তু লোহা গলানো নয়। লোহা গলতে লাগে প্রায় সাড়ে পনেরোশো ডিগ্রি সেলসিয়াস যে তাপ আয়ত্ত করা প্রাচীন চুল্লির সাধ্যের বাইরে ছিল। তাহলে হত কী? আকরিক আর কাঠকয়লা একসঙ্গে পুড়িয়ে কঠিন অবস্থাতেই লোহাকে আকরিক থেকে আলাদা করা হত - জন্ম নিত স্পঞ্জের মতো ফুটোফাটা এক তাল, যাকে বলে “ব্লুম”, তার সঙ্গে লেগে থাকত গলিত পাথর বা স্ল্যাগ। সেই গরম তালকে হাতুড়ি পিটিয়ে স্ল্যাগ বার করে দিলে পড়ে থাকত পেটা লোহা। এই গোটা পদ্ধতির নাম ব্লুমারি – হাজার হাজার বছর ধরে দুনিয়াজুড়ে লোহা এভাবেই গড়া হয়েছে।

    চুল্লিটা কেমন ছিল, একটু তলিয়ে দেখা যাক। মাটি দিয়ে গড়া ছোট এক খাড়া চুল্লি, তাতে স্তরে স্তরে সাজানো আকরিক আর কাঠকয়লা। নিচের দিকে একটা বা দুটো নল দিয়ে হাপর চেপে ঢোকানো হত হাওয়া, যাতে আগুন পায় বাড়তি অক্সিজেন আর তাপ ওঠে চড়চড় করে। কাঠকয়লা পুড়ে তৈরি হত কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস, আর সেই গ্যাসই আকরিক থেকে অক্সিজেন কেড়ে নিয়ে বার করে আনত বিশুদ্ধ লোহা। রসায়নের ভাষায় একে বলে বিজারণ বা রিডাকশন, কিন্তু যে কামার এ কাজ করতেন, তিনি সূত্র জানতেন না, জানতেন শুধু হাতের কাজ। গোটা ব্যাপারটা ছিল বিজ্ঞান আর কারিগরির এক নিখুঁত মেলবন্ধন, বইয়ের পাতা ছাড়াই।

    আর ইস্পাত? ইস্পাত আসলে লোহা আর সামান্য কার্বনের মেলবন্ধন। এক চিমটি কার্বন মিশলেই লোহা হয়ে ওঠে অনেক শক্ত, ধারালো, স্প্রিং-এর মতো নমনীয়। কতটা কার্বন, কীভাবে মিশছে, কত ধীরে ঠান্ডা হচ্ছে - এই সূক্ষ্ম হিসেবের ওপরেই নির্ভর করে ধাতুটা তরবারি হবে নাকি ভেঙে টুকরো হবে। কথাটা মনে রাখবেন কিন্তু কারণ একটু পরেই আসবে উওৎজ ইস্পাতের গল্প, যেখানে ভারত এক অসাধ্যসাধন করে ফেলবে।

    একটু গুছিয়ে বলি, কারণ শব্দ তিনটে বারবার ফিরে আসবে। কার্বন প্রায় নেই বললেই চলে এমন নরম, সহজে-বাঁকানো লোহাকে বলে পেটা লোহা (রট আয়রন)। উলটোদিকে, কার্বন যদি অনেকটা (মোটামুটি দুই শতাংশের বেশি) মিশে যায়, লোহা হয় খুব শক্ত অথচ ভঙ্গুর, জোরে ঠুকলে কাচের মতো ভেঙে যায়, তাকে বলে ঢালাই লোহা (কাস্ট আয়রন)। আর ঠিক মাঝামাঝি, সামান্য (মোটামুটি শতকরা এক ভাগের নিচে) কার্বন মিশিয়ে যে-ধাতু পাওয়া যায়, শক্ত অথচ নমনীয়, ধারালো অথচ দৃঢ়, তারই নাম ইস্পাত। এই সরু দড়ির ওপর দিয়ে নিখুঁতভাবে হাঁটার খেলাটাই ধাতুবিদ্যার আসল শিল্প, আর এখানেই ভারতীয় কারিগররা ছিলেন বিশ্বের সেরা ওস্তাদদের অন্যতম।

    প্রথম লোহা অবশ্য মানুষ পেয়েছিল আকাশ থেকে, উল্কার লোহা। মিশরের বালক-রাজা তুতানখামুনের সমাধিতে পাওয়া ছোরাটির ফলা তৈরি সেই উল্কা-লোহায়, যাতে নিকেলের পরিমাণ প্রায় এগারো শতাংশ যা নিঃসন্দেহে মহাকাশ থেকে পড়া ধাতু। সেকালে লোহা এত দুর্লভ ছিল যে খ্রিস্টপূর্ব তেরো শতকে হিট্টাইট (Hittite) রাজা তৃতীয় হাত্তুসিলি (Hattusili III) আসিরিয়ার রাজার কাছে লেখা একটি ঐতিহাসিক চিঠিতে লোহা সরবরাহ করতে না পারার জন্য কার্যত দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চেয়েছিলেন। ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে লেখা এই চিঠিটি ইতিহাসে অত্যন্ত বিখ্যাত। আসলে হয়েছিল কি, আসিরিয়ার রাজা হিট্টাইট রাজার কাছে উপহার হিসেবে ভালো মানের লোহা চেয়েছিলেন। এর জবাবে রাজা তৃতীয় হাত্তুসিলি চিঠি লিখে জানান, “আপনি যে ভালো লোহার কথা লিখেছেন, তা এই মুহূর্তে কিজুয়াতনা (Kizzuwadna)-র আমার রাজকীয় গুদামে মজুত নেই। আমি আপনাকে আগেই জানিয়েছি যে, এখন লোহা তৈরির জন্য একদমই ভালো সময় নয়। তারা ভালো লোহা তৈরি করবে বটে, তবে তা এখনো শেষ করতে পারেনি। যখনই কাজ শেষ হবে, আমি তা আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব। আপাতত আমি আপনাকে উপহার হিসেবে একটি লোহার খঞ্জর (ছুরি) পাঠাচ্ছি”। এই বিখ্যাত কূটনৈতিক চিঠিটি (যা কীলকাকার বা কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা কাদামাটির ট্যাবলেট KBo I 14 নামে পরিচিত) প্রাচীন বিশ্বে লোহার উৎপাদন ও তার গুরুত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল।

    প্রথাগত হিসেবে লৌহযুগের শুরু ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব বারোশো সাল নাগাদ, আনাতোলিয়ার হিট্টাইটদের হাত ধরে। মজার ব্যাপার হল বহু প্রাচীন সভ্যতায় লোহার আদি নামটাই ছিল “আকাশের ধাতু” বা “স্বর্গের ধাতু” কারণ মানুষ প্রথম লোহা হাতে পেয়েছিল উল্কা থেকেই, মাটি খুঁড়ে নয়। আকরিক থেকে লোহা বার করার কৌশল রপ্ত হতে লেগেছিল আরও বহু শতাব্দী। প্রশ্ন উঠতেই পারে এত ঝামেলা সত্ত্বেও লোহা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন? কারণ, একবার কৌশলটা রপ্ত হয়ে গেলে লোহা হয়ে দাঁড়ায় একদম গরিবের ধাতু যাকে বলে। ব্রোঞ্জ বানাতে লাগে তামা আর টিন, আর টিন মেলে বহু দূরে - তাই ব্রোঞ্জ ছিল দামি, রাজা-রাজড়ার জিনিস। কিন্তু লোহার আকরিক ছড়িয়ে আছে প্রায় সবখানে। কাজেই লোহা গড়া শিখে যাওয়ার পর তা সস্তায় সবার হাতে পৌঁছল - চাষির লাঙল থেকে সৈনিকের তরবারি, সবেতেই। এই সহজলভ্যতাই লৌহযুগকে সত্যিকারের যুগান্তকারী করে তুলেছিল।

    এখানে একটা মজার হেঁয়ালি আছে। লোহার মজুত পৃথিবীতে তামার চেয়ে ঢের বেশি, আর লোহার হাতিয়ার তামা-ব্রোঞ্জের চেয়ে শক্তও বটে, তবু মানুষ কিন্তু আগে শিখল তামা-ব্রোঞ্জ গড়া, লোহা এল অনেক পরে। কেন? কারণটা সেই তাপ। তামা গলে যায় মোটামুটি হাজার ডিগ্রির একটু ওপরে, যা প্রাচীন চুল্লিতেও কষ্টেসৃষ্টে তোলা যেত। কিন্তু লোহাকে কাজে লাগানোর মতো গরম করতে দরকার আরও অনেক বেশি তাপ, আর দরকার সেই কঠিন-অবস্থায় আকরিক থেকে ধাতু বার করার সূক্ষ্ম কায়দা। অর্থাৎ কাঁচামাল বেশি থাকলেই হয় না, তাকে বশ করার কৌশলটাও জানা চাই। এই কৌশল রপ্ত করতেই মানবসভ্যতার লেগেছিল বাড়তি হাজার-দেড় হাজার বছর, আর একবার তা রপ্ত হতেই খুলে গেল এক নতুন যুগের দরজা।

    লোহার নাম ছিল ‘অন্ধকার’


    আচ্ছা, আমাদের পূর্বপুরুষরা লোহাকে ঠিক কী নামে ডাকতেন বলুন তো? “আয়রন” তো নয়ই, এমনকি প্রথম দিকে “লোহা”-ও নয়। সবচেয়ে পুরনো গ্রন্থ ঋগ্বেদে ধাতু বোঝাতে একটা শব্দ ছিল “অয়স” (না না, “আয়ুষ” নয়)। কিন্তু গবেষকদের বড় অংশ মনে করেন, ঋগ্বেদের ওই অয়স আসলে লোহা নয়, সম্ভবত তামা বা ব্রোঞ্জ, কিংবা ধাতু-মাত্র। সেকালে সোনাকে বলা হত “হিরণ্য”, রুপোকে “রজত”, কিন্তু লোহার আলাদা কোনো পরিচিতি তখনও তৈরি হয়নি। লোহা যেন তখনও ভারতের ঘরে ভালো করে ঢোকেনি।

    লোহা তার নিজের নাম পেল আরও পরে, পরবর্তী বৈদিক যুগে। শুক্ল যজুর্বেদ আর অথর্ববেদে গিয়ে লোহাকে বলা হল “শ্যাম-অয়স” বা “কৃষ্ণ-অয়স”, অর্থাৎ কালো বা গাঢ় ধাতু; আর তামাকে “লোহিত-অয়স”, লাল ধাতু। অথর্ববেদের যে অংশে প্রথম স্পষ্ট লোহার উল্লেখ, তা মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ১১৫০ সাল নাগাদ। ভাবুন, একটা গোটা সভ্যতা লোহাকে চিনল “অন্ধকারের ধাতু” বলে যে নামটার মধ্যেই যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। পরে অবশ্য “লোহ” বা “লোহা” শব্দটাই চালু হয়ে গেল, দিল্লির সেই বিখ্যাত মরচেহীন থামকে তো আজও বলি “লোহে-কি-লাট”। দিল্লীর লৌহ স্তম্ভ নিয়ে আমি আগে আলাদা করে লিখেছি, তাই এই লেখায় তাকে বেশি ঘাঁটাব না, সেই গল্প থাক তার নিজের জায়গায়।

    ঋগ্বেদেই আবার ধাতু-নিষ্কাশনের একটা ছবি পাওয়া যায়, যা পড়লে মনে হয় যেন সাহিত্য করা হচ্ছে - “ঝলমলে পাথর” (মানে আকরিক), “ঔষধি গাছপালা” (মানে জ্বালানির কাঠকয়লা), আর “রাজহাঁসের পালকের পাখা” (মানে হাপর) দিয়ে গলানো হচ্ছে ধাতু। প্রযুক্তির বর্ণনাও বড় সুন্দর হতে পারে লিখতে জানলে! এই ব্যাপার থাকেই বোঝা যায়, ধাতু গড়া প্রাচীন ভারতের কাছে নিছক কারিগরি ছিল না, ছিল জীবন আর ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে-থাকা এক ব্যাপার।

    সময়ের সঙ্গে “লোহ” বা “লোহা” শব্দটাই দাঁড়িয়ে গেল ধাতুর সাধারণ নাম হিসেবে, আর লোহার আলাদা আলাদা রূপকে চিনতে জন্ম নিল আরও অনেক শব্দ। অনেক পরে, মধ্যযুগের রসশাস্ত্রের (আয়ুর্বেদীয় রসায়ন) গ্রন্থগুলোতে লোহাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল - মুণ্ড, তীক্ষ্ণ আর কান্ত। এর মধ্যে “তীক্ষ্ণ” শব্দটা মোটামুটি ইস্পাতের কাছাকাছি এক ধারালো রূপকেই বোঝাত। অর্থাৎ ভারতীয়রা যে লোহা আর ইস্পাতের ফারাক ভালোই বুঝতেন, আর প্রতিটি রূপকে আলাদা নাম দিয়েছিলেন তার ছাপ ভাষাতেই গেঁথে আছে।

    গঙ্গার তীরে, খ্রিস্টের বহু আগে


    ভারতে লোহা ঠিক কবে এল, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা আর তর্ক আছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ রাকেশ তিওয়ারি উত্তরপ্রদেশের মলহর, রাজা নালা-কা-টিলা, লহুরাদেওয়ার মতো জায়গায় খুঁড়ে দেখিয়েছেন, গাঙ্গেয় উপত্যকায় লোহার ব্যবহার খ্রিস্টপূর্ব আঠারোশো থেকে হাজার সালের মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। দক্ষিণেও হাল্লুর, আদিচানাল্লুরের মতো জায়গায় প্রায় হাজার খ্রিস্টপূর্বের লোহা মিলেছে। মানে, বুদ্ধেরও বহু আগে এদেশের মানুষ লোহা গড়তে জানত, রোজকার কাজে লাগাত।

    এখানে একটা কথা মজার - এই লোহাগুলোর বয়স বার করা হয় সাধারণত সঙ্গে-পাওয়া কাঠকয়লা বা মৃৎপাত্রের রেডিওকার্বন-তারিখ থেকে, আর গাঙ্গেয় উপত্যকায় লোহা প্রায়ই মেলে সেই বিখ্যাত “চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র” সংস্কৃতির স্তরে। অর্থাৎ এ শুধু দু-চারটে মরচে-পড়া টুকরো নয়, বরং একটা গোটা সমাজের স্তরে স্তরে গেঁথে-থাকা প্রমাণ - পেরেক, ছুরি, তিরের ফলা, কুড়ুল, বাটালি, সাঁড়াশি। সেইজন্যই তারিখগুলোকে হেলাফেলা করা যায় না।

    আরেকটা কথা বলা দরকার, এই তারিখগুলো কিন্তু হঠাৎ আসেনি, ধাপে ধাপে পিছিয়েছে যত প্রমাণ জমেছে। বিশ শতকের মাঝামাঝি পণ্ডিতেরা ভারতে লোহার শুরু ধরতেন খ্রিস্টপূর্ব সাতশো সাল নাগাদ; পরে নতুন খোঁড়াখুঁড়ি আর রেডিওকার্বন পদ্ধতি মিলে তারিখটা ঠেলে নিয়ে গেল প্রথমে বারোশো, তারপর আঠারোশো খ্রিস্টপূর্বের দিকে। বিজ্ঞান এভাবেই চলে - নতুন সাক্ষ্য এলে পুরনো ধারণা রদবদল হয়। কাজেই আজকের ছবিটাও হয়ত শেষ কথা নয়, আরও পিছনে সরতে পারে, আবার থিতুও হতে পারে।

    লোহা ভারতে বাইরে থেকে এল, নাকি এখানেই স্বাধীনভাবে জন্ম নিল, এ নিয়ে দুটো মত। কেউ বলেন হিট্টাইটদের হাত ধরে ছড়িয়ে-পড়া প্রযুক্তি। কেউ (যেমন বিভা ত্রিপাঠী, বা এ. কে. বিশ্বাস) যুক্তি দেন, ভারতের নানা প্রান্তে লোহা স্বাধীনভাবেই আবিষ্কৃত হয়েছিল, বাইরে থেকে ধার করা নয়। বিষয়টায় খানিক রাজনীতির রংও লেগেছে, তাই আমি কোনো একদিকে ঝুঁকে না গিয়ে বলি, সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে, ভারত লৌহপ্রযুক্তির খুব আদি এক কেন্দ্র, হয়তো প্রাচীনতমদের একটি, যদিও একেবারে গোড়ার আবিষ্কারে আনাতোলিয়া কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে। আর দেশের বাইরে ভারতীয় লোহার আদি উল্লেখগুলোর একটি গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের কলমে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালের যুদ্ধে পারস্যের সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সৈন্যদের তিরের ফলা ছিল লোহার, এমনটা তিনি লিখে গেছেন।



    এটাও মনে রাখা দরকার যে লোহা কিন্তু ভারতের কোনো একটেরে জিনিস ছিল না, ছড়িয়ে ছিল গোটা উপমহাদেশে। উত্তরে গাঙ্গেয় সমতলে যেমন সেই “চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র” সংস্কৃতির সঙ্গে লোহা মিলছে, তেমনই দক্ষিণ ভারতের বিরাট বিরাট পাথরের সমাধি বা মেগালিথের ভেতর থেকেও বেরিয়েছে অজস্র লোহার জিনিস - তলোয়ার, ছোরা, কাস্তে, তিরের ফলা। মানে, একই সময়ে দেশের নানা প্রান্তে আলাদা আলাদা সমাজ নিজেদের মতো করে লোহা গড়ছিল, ব্যবহার করছিল। এই বিস্তারই বলে দেয়, প্রযুক্তিটা ভারতে কত গভীরে শিকড় গেড়েছিল।

    তামিলনাড়ুর টাটকা হইচই


    ইদানিং কালের একটা টাটকা খবরে বেশ তোলপাড় হয়েছিল ভারতে ধাতু বিদ্যার জগতে। ২০২৫ সালের শুরুতে তামিলনাড়ু রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব দপ্তর দাবি করেছে, শিবগালাই, মায়িলাডুম্পারাই, আদিচানাল্লুরের মতো জায়গায় পাওয়া লোহার বয়স নাকি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার সাল, অর্থাৎ এ যাবৎ জানা যেকোনো তারিখের চেয়ে পুরনো। তারিখ বার করা হয়েছে এ-এম-এস আর ওএসএল-এর মতো আধুনিক পদ্ধতিতে, আর দশজন বিশেষজ্ঞ (রাকেশ তিওয়ারি-সহ) নাকি একে সমর্থন করেছেন।

    খবরটা রোমাঞ্চকর, সন্দেহ নেই। কিন্তু সৎ থাকতে হলে কয়েকটা কথা মাথায় রাখা দরকার। প্রতিবেদনটি মূলত রাজ্য দপ্তরের নিজস্ব প্রকাশনা, স্বাধীন আন্তর্জাতিক যাচাই এখনও বাকি। পৃথিবীর আর কোনো জায়গায় খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার সালের আগের লোহা এখনও নিশ্চিতভাবে মেলেনি। ওদিকে নমুনার প্রেক্ষাপট-সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নও আছে, তার ওপর আছে আঞ্চলিক রাজনীতির মাত্রা। কাজেই ব্যাপারটা উত্তেজক, নজরে রাখার মতো - কিন্তু এখনই একে শেষ কথা বলে ধরে নেওয়াটা তাড়াহুড়ো হবে। ইতিহাস প্রমাণে চলে, উত্তেজনায় নয়। সত্যি হলে দারুণ, কিন্তু সেটা প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতেই পারি।

    লোহায় বদলে যাওয়া সমাজ


    লোহা শুধু হাতিয়ার গড়েনি, সমাজটাকেই খানিক নতুন করে গড়েছিল। বহু ইতিহাসবিদের ধারণা (আর. এস. শর্মা এই যুক্তি জোরালো ভাবে তুলেছেন), সস্তা লোহার কুড়ুল আর লাঙলের ফলাই গঙ্গা উপত্যকার ঘন জঙ্গল কেটে চাষের জমি বার করতে সাহায্য করেছিল। ভারী, আঠালো মাটিতে লোহার লাঙল চালিয়ে শুরু হয় ধান চাষ। ফসলে উদ্বৃত্ত এল, উদ্বৃত্ত থেকে এল নগর, রাজ্য, রাজকর। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, আধুনিক কালের বেশ কিছু ঐতিহাসিক যেমন এ. ডি. ঘোষ বা ভৈরব প্রসাদ সাহু এই তত্ত্বের কিছুটা সমালোচনা করে বলেছেন যে, কেবল লোহার ব্যবহারই নয়, বরং পুড়িয়ে জঙ্গল সাফ করা এবং তামা-পাথরের যুগের কৃষি কৌশলেরও এতে বড় ভূমিকা ছিল।

    খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে গঙ্গাতীরে যে “দ্বিতীয় নগরায়ণ”, ষোড়শ মহাজনপদের উত্থান, আর সবাইকে ছাপিয়ে মগধের বাড়বাড়ন্ত - তার পিছনে লোহার হাত কম নয়। এই সেই যুগ, যখন গৌতম বুদ্ধ আর মহাবীর হাঁটছেন গাঙ্গেয় সমতলে, বড় বড় নগর গড়ে উঠছে, বাণিজ্যপথ খুলছে। অনেকেই মনে করেন, এই গোটা বদলের নিচে চুপিসারে কাজ করছিল লোহার লাঙল আর কুড়ুল। অবশ্য এ নিয়েও তর্ক আছে, কেউ বলেন লোহার ভূমিকা এতটা একচেটিয়া নয়, জলবায়ু-বাণিজ্য-রাজনীতিরও ভাগ আছে। তাই “একমাত্র কারণ” না বলে “বড় এক কারণ” বলাই নিরাপদ।

    রাষ্ট্রও এই ধাতুর গুরুত্ব বুঝত ভালোই। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে খনি আর ধাতুর দেখভালের জন্য আলাদা অধ্যক্ষের কথা আছে - খনির জন্য আকরাধ্যক্ষ, ধাতুর জন্য লোহাধ্যক্ষ। অর্থাৎ ধাতু-উৎপাদন তখন নিছক কারিগরের ব্যাপার নয়, রীতিমতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ, তার ওপর চলত কড়া নজরদারি। যে-জিনিস দিয়ে অস্ত্র আর হাতিয়ার দুটোই তৈরি হয়, রাজা তার ওপর নজর রাখবেন না, তা কি হয়?

    উকু থেকে উওৎজ - ভারতের গোপন ইস্পাত


    এবার আসি সেই জিনিসে, যার জন্য ভারতের নাম ছড়িয়েছিল দুনিয়াজুড়ে - উওৎজ ইস্পাত। কন্নড় আর তেলুগু ভাষায় ইস্পাতকে বলে “উক্কু”; সেই “উক্কু” শব্দটাই সাহেবদের মুখে ঘুরেফিরে দাঁড়াল “উওৎজ”-এ। দক্ষিণ ভারতের মাটিতে, মানে আজকের তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, তেলঙ্গানায় জন্ম নেওয়া এই ইস্পাত ছিল অতি-উচ্চ কার্বনের এক আশ্চর্য ধাতু, যাকে ঘিরে দুই হাজার বছর ধরে চলেছে মুগ্ধতা আর রহস্য।

    কী ছিল এর বিশেষত্ব? সাধারণ লোহার তলোয়ার হয় ধারালো, নয়তো শক্ত - দুটো গুণ একসঙ্গে পাওয়া ভারি কঠিন। বেশি শক্ত করলে ভঙ্গুর হয়ে ভেঙে যায়, বেশি নরম করলে বেঁকে যায়। উওৎজ ছিল সেই বিরল ব্যতিক্রম - ক্ষুরের মতো ধার, অথচ ঢালে সজোরে ঠুকলেও ভাঙত না, বরং সামান্য বেঁকে ফের সোজা হয়ে যেত। আর তার গায়ে ফুটে উঠত এক আশ্চর্য নকশা, জল-রেশমের মতো বয়ে-যাওয়া ঢেউ, যেন ধাতুর ভেতরে কেউ নদীর স্রোত এঁকে দিয়েছে। এই নকশা নকল করা যেত না, রং দিয়ে আঁকা যেত না, শুধু ওই বিশেষ ইস্পাতেই তা আপনা থেকে ফুটত। কীভাবে গড়া হত এই জাদু, সে গল্প তুলে রাখলাম দ্বিতীয় পর্বের জন্য।

    এই ইস্পাত গড়ার নামী কেন্দ্রগুলো ছড়িয়ে ছিল গোটা দাক্ষিণাত্য জুড়ে - অন্ধ্রের গোলকোন্ডা, কর্ণাটকের চিত্রদুর্গ ও মহীশূর অঞ্চল, তামিলনাড়ুর সালেম। নানা মুলুকে এর নাম হয়েছিল নানা রকম, কোথাও “হিন্দওয়ানি” (ভারতীয়), কোথাও তেলঙ্গানার নামে “তেলিং”, আবার রোমান প্লিনির কলমে সম্ভবত “সেরিক”। নাম যা-ই হোক, গোড়ার সেই ঝলমলে ইস্পাত-পিণ্ডটা গড়ে উঠত এই দক্ষিণী কামারশালাতেই, তারপর ছড়িয়ে পড়ত দুনিয়াময়।

    এই ঐতিহ্য যে কত পুরনো, তা-ও প্রমাণে বাঁধা। তামিলনাড়ুর কোডুমানালের মতো প্রত্নস্থলে খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতকের ইস্পাত-তৈরির চিহ্ন মিলেছে। অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতে ক্রুসিবল-ইস্পাত গড়ার শিকড় অন্তত দু-হাজার বছরেরও পুরনো, আর তা টিকেছিল প্রায় ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত। ভাবুন, একটা প্রযুক্তি প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে বংশপরম্পরায় বেঁচে রইল, বই ছাড়া, স্কুল ছাড়া, শুধু হাত থেকে হাতে। মানব-ইতিহাসে এমন দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন কারিগরি-ধারা প্রায় বিরল।



    ভাবুন, যে যুগে যুদ্ধ মানে হাতে-হাতে তরবারির লড়াই, সে যুগে এমন একটা ফলা ছিল কার্যত জীবন-মরণের ফারাক। যার তলোয়ার শত্রুর ফলা কেটে দু-টুকরো করে অথচ নিজে অক্ষত থাকে, যুদ্ধে তার পাল্লা ভারী। তাই ভালো ইস্পাত ছিল রাজার অস্ত্রাগারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, কার্যত সাম্রাজ্যের ভাগ্য-নির্ধারক। আর সেই সেরা ইস্পাতের নাম ছিল একটাই - ভারতের উওৎজ।

    রোমান বাজারে ভারতীয় ইস্পাত


    এই তলোয়ারের নাম কত আগে ছড়িয়েছিল, ভাবলে অবাক হতে হয়। খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় পাঁচশো বছর আগে, পারস্যের রাজদরবারে কর্মরত এক গ্রিক চিকিৎসক-লেখক তেসিয়াস লিখে গেছেন যে ভারতীয় কারিগরদের হাতে গড়া তলোয়ার, সেরা ইস্পাতে তৈরি, তখনই সারা প্রাচীন দুনিয়ায় বিখ্যাত।

    সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটা আলেকজান্ডারকে ঘিরে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে ঝিলম নদীর তীরে পুরু রাজার (গ্রিকরা যাঁকে বলত “পোরাস”) সঙ্গে তাঁর সেই বিখ্যাত যুদ্ধ। যুদ্ধশেষে সন্ধির সময় পুরু আলেকজান্ডারকে উপহার দিলেন সোনা নয়, মণিমুক্তো নয়, একখণ্ড মহামূল্য ইস্পাত (রোমান ঐতিহাসিক কুইন্টাস কার্টিয়াস অন্তত তেমনই লিখেছেন; পরিমাণ নিয়ে প্রাচীন সূত্রে হেরফের আছে)। ভাবুন একবার সেকালে যে-ধাতুকে সোনার চেয়েও দামি উপহার বলে গণ্য করা হত, বিশ্বজয়ী সম্রাটও যা পেয়ে ধন্য হতেন, সেটা ছিল ভারতের ইস্পাত।
    কিন্তু আসল সিলমোহরটা মেরে গেছে খোদ রোম। প্রথম শতকে রোমের সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্বকোষকার প্লিনি দ্য এল্ডার তাঁর বিশাল গ্রন্থ “ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া”-য় পরিষ্কার লিখেছেন যে দুনিয়ার সমস্ত রকম লোহার মধ্যে সেরার শিরোপা পায় “সেরিক” লোহা। এই “সেরিক লোহা” নিয়ে পণ্ডিতমহলে খানিক তর্ক আছে। পুরনো ধারণায় কেউ কেউ একে চিনের সঙ্গে জুড়তেন, কিন্তু আধুনিক গবেষকদের একটা বড় অংশ এখন মনে করেন, প্লিনির প্রশংসিত সেই ইস্পাত আসলে দক্ষিণ ভারতের চের রাজ্যের ক্রুসিবল ইস্পাত। প্রাচীন রোমানরা এই লোহা বা ইস্পাত ‘সেরেস’ (Seres) নামক একটি জাতির কাছ থেকে আমদানি করত। অনেক সময় এই 'সেরেস' বলতে প্রাচীন চীন বা মধ্য এশিয়ার সিল্ক রুটের ব্যবসায়ীদের বোঝানো হতো, তবে লোহাটি মূলত ভারত থেকেই উৎপন্ন হয়ে তাদের মাধ্যমে রোমে পৌঁছাত। ভাবুন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষটি গোটা দুনিয়ার লোহাকে টেক্কা দিয়ে যাকে এক নম্বর বলেছেন, সেটি সম্ভবত ভারতের।

    এ নিছক দু-একটা তলোয়ারের গল্প নয়। প্রথম শতকের নাবিক-নির্দেশিকা “পেরিপ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি”-তে ভারত থেকে রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্পষ্ট লেখা যে ভারতীয় লোহা আর ইস্পাত। দক্ষিণ ভারতের বন্দর থেকে জাহাজ বোঝাই হয়ে ইস্পাতের চাকতি যেত পারস্য, আরব, ভূমধ্যসাগরের দিকে। সেখানে, বিশেষত সিরিয়ার দামাস্কাসে, কামাররা সেই ইস্পাত পিটিয়ে গড়ত ঝলমলে নকশাদার তলোয়ার, ইতিহাসে যার নাম “দামাস্কাস স্টিল”। নামটা সিরিয়ার, কিন্তু কাঁচামাল, সেই ইস্পাতের গোড়ার তালটা বহু ক্ষেত্রেই আসত ভারত থেকেই।
    এই বাণিজ্য যে কত জমজমাট ছিল, তার সাক্ষী মাটির নিচেই লুকিয়ে। দক্ষিণ ভারতের নানা জায়গায় পাওয়া গেছে রোমান সোনা-রুপোর মুদ্রার ভাণ্ডার, কেরালার প্রাচীন বন্দর মুজিরিস ছিল ইন্দো-রোমান বাণিজ্যের এক ব্যস্ত কেন্দ্র। রোম থেকে আসত সোনা, ফিরে যেত গোলমরিচ, মসলা, মিহি কাপড়, আর সেই সঙ্গে ভারতের লোহা-ইস্পাত। রোমান লেখকরা এমনকি আক্ষেপ করতেন, প্রাচ্যের বিলাসপণ্য কিনতে গিয়ে রোমের কোষাগার থেকে সোনা বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই “প্রাচ্যের পণ্য”-এর তালিকায় ভারতের ইস্পাতও ছিল এক গর্বের নাম।

    আরব-ফারসি দুনিয়াতেও ভারতীয় ইস্পাতের কদর ছিল আকাশছোঁয়া। নবম শতকে দার্শনিক আল-কিন্দি খলিফার অনুরোধে তরবারি নিয়ে একটি আস্ত পুঁথি লেখেন, যেখানে ভারত মহাসাগর ধরে ইস্পাত-চাকতির বাণিজ্যের কথাও আছে। দ্বাদশ শতকে ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসি লিখেছেন, “হিন্দওয়ানি” অর্থাৎ ভারতীয় ইস্পাতই দুনিয়ার সেরা। এমনকি ফারসিতে একটা মুখের কথাই চালু হয়ে গিয়েছিল যে কাউকে “ভারতীয় জবাব” দেওয়া, মানে ভারতীয় তরবারির এক কোপ! বাণিজ্যের বহরও ছোট ছিল না, সতেরো শতকের শেষেও করমণ্ডল উপকূল থেকে বছরে হাজার হাজার ইস্পাত-চাকতি জাহাজে চেপে পারস্যে যেত।

    এই গৌরব যে কেবল সুদূর অতীতের, তা-ও নয়। আঠারো শতকের শেষেও মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের অস্ত্রাগারে ছিল উওৎজে গড়া তলোয়ার, আর সেই ধারালো ফলা ইংরেজ সেনাদের কম ঘাম ঝরায়নি। ওই সময়েই স্কটিশ পর্যটক ফ্রান্সিস বুকানন দক্ষিণ ভারতে ঘুরে নিজের চোখে দেখেছিলেন কীভাবে ছোট মাটির পাত্রে এই আশ্চর্য ইস্পাত গলানো হচ্ছে, আর বিশদে লিখে রেখে গিয়েছিলেন। এমনকি ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতেও ভারতীয় ইস্পাতের তলোয়ার-ছোরা দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছিলেন ফলার গুণে।

    এই মুগ্ধতা নিছক তলোয়ারবাজদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিজ্ঞানীরাও নড়েচড়ে বসেছিলেন। আঠারো শতকের শেষে ভারত থেকে উওৎজের নমুনা পৌঁছয় লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে। সাথে সাথে ইউরোপের রসায়নবিদরা মাথা ঘামাতে শুরু করেন যে এই ধাতুর ভেতরে এমন কী আছে, যা একে এত অসাধারণ করে তোলে? বলা যায়, ভারতীয় ইস্পাতের রহস্য ভাঙার সেই চেষ্টা থেকেই আধুনিক ধাতুবিজ্ঞানের একটা বড় অংশের জন্ম। প্রাচ্যের এক কামারশালার জিনিস এভাবেই ধাক্কা দিয়েছিল পশ্চিমের বিজ্ঞানকে - এ-ও এক গর্বের কথা, যা আমরা প্রায় ভুলেই গেছি।

    বাতাসে গড়া ইস্পাত


    এই অঞ্চলের আরেকটা কীর্তির কথা না বললেই নয়। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায় প্রত্নতত্ত্ববিদ গিল জুলেফ ১৯৯৬ সালে বিখ্যাত “নেচার” পত্রিকায় দেখিয়েছিলেন যে সেখানকার কারিগররা পাহাড়ের পশ্চিমমুখী ঢালে চুল্লি বসাতেন, আর হাপরের বদলে কাজে লাগাতেন মৌসুমি বাতাসকেই। বাতাস নিজেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে আগুনকে জোগাত দরকারি অক্সিজেন। যন্ত্র নয়, বিদ্যুৎ নয়, নিছক মনসুনের হাওয়া দিয়ে শিল্প-মাপের ইস্পাত গড়া। আর মনে রাখবেন, এই সবই হচ্ছে কোনো লেখা-পড়া বিজ্ঞানের বই ছাড়াই - নিছক পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা আর হাতে-কলমে শেখা বিদ্যায়। প্রকৃতিকে এত নিখুঁতভাবে পড়তে পারলে তবেই এমন কাজ সম্ভব।

    ফিরে দেখা প্রথম পর্বে


    তাহলে সব মিলিয়ে বিশ্বের সাপেক্ষে ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল? সৎ উত্তরটা এই যে একেবারে গোড়ায়, লোহা বানানোর কৌশল আবিষ্কারে আনাতোলিয়া হয়তো কিছুটা এগিয়ে ছিল, আর ভারত সেই দৌড়ে প্রথম না হলেও খুব আদিকালের এক স্বাধীন খেলোয়াড়। কিন্তু ইস্পাতের জগতে, বিশেষত ওই উচ্চ-কার্বন ক্রুসিবল ইস্পাতে, ভারত (আর প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা) হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন - গুণে, খ্যাতিতে, রপ্তানিতে। কাজেই আসল গর্বের কথাটা “আমরাই লোহা আবিষ্কার করেছি” নয়; বরং “আমরা ইস্পাতকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলাম, আর তাকে দুনিয়ার পণ্য বানিয়েছিলাম, যা বহু শতাব্দী কেউ ছুঁতে পারেনি”। এই দাবিটা অতিরঞ্জন নয়, প্রমাণ ভিত্তিক। সবচেয়ে সুন্দর কথা হল, এই গর্বের জন্য আমাদের একটাও কল্পিত গল্প ফাঁদতে হয় না - গ্রিক ঐতিহাসিক থেকে রোমান বিশ্বকোষ, আরব ভূগোলবিদ থেকে ব্রিটিশ পর্যটক, সবাই নিজেদের চোখে দেখে লিখে গেছেন।

    কিন্তু এত সুন্দর এই ইস্পাত গড়া হত কীভাবে? কারা গড়তেন? সবচেয়ে অবাক করা কথা যে ধাতু দিয়ে তরবারি গড়ে মানুষ মারা হত, সেই ধাতু দিয়েই কীভাবে মানুষ বাঁচানো হত? আর শেষে, এমন এক গৌরব আমরা কেমন করে হারিয়ে ফেললাম? সেই গল্প, আর সেই দীর্ঘ সন্ধ্যার গল্প, রইল দ্বিতীয় পর্বে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ
  • আলোচনা | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৯৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৬743336
  • দুবার পড়লাম l অসাধারণ তথ্য ও संतुलित বিশ্লেষণ l
    লেখাটি গুরুর পাতায় একটি সম্পদ বলে গণ্য হবে l
  • b | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:২৬743338
  • চলুক চলুক। মেমারী গ্যালপিং -এর মতো।
  • kk | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০০:৩১743339
  • অত্যন্ত ভালো লাগলো। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা লোহা-ইস্পাত শিল্পাঞ্চলে। খুব ছোটবেলা থেকেই স্টীলপ্ল্যান্টে যাওয়া, লোহা গলানো আর রোলিং মিলে লোহার মস্ত বারকে শেপ দেওয়া এসবে অভ্যস্ত। কিন্তু সেই লোহা আর ইস্পাতের মনের কথা, প্রাণের কথা এভাবে তো জানতামনা! চলুক সিরিজটা। উওৎজ লোহার জাদু নক্সার গল্পটা পড়ার জন্য তর সইছেনা। সুকি হোমগ্রাউন্ডে খেলতে নেমেই তিন ছক্কা হাঁকিয়েছেন। সেঞ্চুরী দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
  • skm | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৪৭743343
  • ভালো . Aamir ধাতুবিদ . তাই আরো ভালো লাগলো . আমাদের বাড়ি Gangpur স্টেশন এর কাছে
  • kk | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৪২743345
  • ও, আমি একটু ভুল লিখেছি! আমি লোহা গলানো, শেপ দেওয়া এইসব দেখতে অভ্যস্ত। নিজে করতে নয় অবশ্যই!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন।