

ছবি: ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক
বাসে খিদিরপুরের জ্যাম পেরতে পেরতে, বাসকিউল ব্রিজটার কথা ভাবছিল পায়েল দিদিমণি। মাঝখান থেকে দু-ভাগ হয়ে গিয়ে জাহাজকে পথ করে দেওয়া আজব একটা সেতু! খুলে আসা সে হেলা ব্রীজের ঢাল দেখে ছোটোবেলায় আলিবাবার গুহার কথা মনে পড়েছিল পায়েলের।
দুনিয়ার সব খাজানা সকলের হবে। এমন একটা আদর্শ থেকেই তো এনজিওতে কাজ করতে আসা পায়েল দিদিমণির! ক্ল্যাচারে চুলের প্রপাত জড়ো করে তোলা। আকাশী-সাদা ফুলে ছেয়ে আছে সিন্থেটিক সালোয়ার। বাঁ কাঁধের ব্যাগ থেকে নেভী ছাতার হ্যান্ডেল উঁকি মারছে। রিক্সা থেকে নেমে, এখনো প্রায় মিনিট পনেরর পথ হেঁটে যেতে হবে তাকে। নিজের চটির হালকা একটা খসরমসর আওয়াজ শুনতে শুনতে হাঁটে সে। এসময়টা সব একা মানুষের মতো তারও এক অদ্ভুত আরাম লাগে।
আপাতত বস্তির একেবারে নাড়িভুঁড়ি ঠেলে, দিনের বেলাতেও নিঝুম গলিটা বেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল পায়েল। এইভাবে কখনো একসময় হয়তো গিয়ে পৌঁছবে সে সরু সাপের মত কাচগাড়িটার কাছে। যেটা টিংকু বলে ছেলেটি চালিয়ে আনে, ক্যাম্পসাইটের কাজ হয়ে গেলে ফের নিয়ে যায়।
ডালিমরঙা গাড়িটার গায়ে চাঁদ-তারার আলো আঁকা। দেখতে ভিনদেশী আর উজ্জ্বল কাচগাড়িটা যেন একটা প্রবাল-পাঁচিল, মাথা গলিয়ে দিলেই হলো; এলাকায় ঢুকে পড়েছে ঠিকই কিন্তু ব্যাকে ছাড়া বেরনো প্রায় অসম্ভব।
গলির অজস্র কাটাকুটি পেরিয়ে পায়েল দিদিমণির সে মাথা অবধি পৌঁছতে এখনো অন্তত সাড়ে আট মিনিট মতো দেরি আছে। এ পথে খানিক চললেই বোঝা যাবে - খোলা ড্রেইন, অস্থায়ী ঝুপড়ি আর প্লাস্টিক পোড়ানোতে সিদ্ধহস্ত এ মহল্লা। তার ছাইমাখা শিরা-ধমনীর মধ্যে দিয়ে রঙীন কাচগাড়িটার এমন এসে পড়া - ধূমকেতু পতনের মত একটা অবাক ঘটনা বৈকী!
পায়েল দিদিমণি ফাইনালি সুঁড়ি গলিটায় নামলো যখন, মনটা রীতিমতো কু ডাকছিল তার। লোকজন কেমনধারা যেন। দেয়ালে হেলান দিয়ে ঢুলছে। কোনোমতে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। গলির সাথে মানানসই সরু কয়েকটা বেঞ্চ পাতা আছে কিছুদূর ছাড়া ছাড়া। তাতে একজন, দুইজন, তিনজন করে বসে আছে সব। কেন কে জানে!
ছিপছিপে, রোগা, ক্ষয়াটে চেহারা তাদের। দেখে মনে হয় কমবয়সীই হবে! পাঁশুটে শুকনো চোখ, দড়ির মতো পাকানো হাত-পা। সকলকে একরকম লাগে। বেলা থাকতে থাকতে লোকগুলো যেন গলিটায় মজা দেখতে বসেছে। যেন এই ঘুপচি রাস্তায়, ঝুপড়ির দেয়ালে দেয়ালে কোনো নিষিদ্ধ থ্রিডি শো চলছে। আর সে চিচিংফাঁক যতটা সম্ভব দেখে নিতে হবে, ঠিক করে নিয়েছে তারা।
পায়েল দিদিমণির একবার মনে হল, এখান থেকে জ্যান্ত, গোটাগুটি বেরিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে পারবে তো সে? সন্দেহ আছে। পিছিয়ে আসতেও আঁতে ঘা লাগছে। সে না দিদিমণি? স্কুলে, রাস্তায়, বস্তিতে কত সুনাম তার! না হোক সে এখানকার। তবু এ কলকাতারই একচিলতে কোথাও, কিছু মানুষ তো তাকে এখনো ভরসা করে! আগ বাড়িয়ে এসে বাচ্চার আঙুলটুকু ধরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়! নাহ্, ভয় পেলে চলবে না।
সবে সিকিভাগ এগিয়েছে সে গলিটায়। হঠাৎই চোখে পড়ল ডানদিকে একজন খোঁচাদাড়ি লোক, ন্যাড়ামাথা চা দোকানীর হাত থেকে কী যেন একটা নিয়ে স্যাট করে ঢুকিয়ে নিল প্যান্টের পকেটে। লোকটার হাবেভাবে মালুম হলো বস্তুটা গোপনীয়। বিস্ফারিত চোখে সে একবার তাকালো পায়েল দিদিমনির দিকে। তারপর চোখের পাতা একবারও না ফেলে তাকালো আশপাশের আরো দু-চারজনের দিকে। যেন সে তাকানোর কোনো বিশেষ মানে আছে।
সেই দু-চারজনের কেউ এবার সোজাসুজি, কেউ আড়চোখে তাকায়। যারা এতক্ষণ কেউ তাস খেলছিল, ধোঁয়া খাচ্ছিল, সরু জানালায় ঝোলা গামছার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বসেছিল - তারাই। পায়েলের মনে হয়, সে একটা ইঁদুর-ধরা কলে আটকে পড়েছে বোধহয়।
মোট পাঁচজন। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিল তারা। সামনের জন আধ-খেঁকুরে হাসি হেসে গলির শেষের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, 'সোওজা - ওইদিকে চলে যান'। মন বেঁকে বসল, তবু স্তম্ভিত হয়ে পায়েল দেখল, নির্দেশটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে সে। গলিটা কিছুদূর গিয়ে ঘুরে গেছে ডানদিকে। হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবল আচ্ছা, এইবার কি দৌড়নো উচিত হবে? কিন্তু পা-দুটো তার কোন এক দুঃসাহসে নাকি বাধ্যতায় দৌড়তে রাজি হল না, কে জানে! ঘামছে সে। লোকগুলো আসছে পিছু পিছু। নিঃশব্দে।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পায়েল, এখন আর লোকটা হাসছেও না। পাথরের মত সিরিয়াস মুখ সবার। এমন সময় গলির ওদিকে ফিরে সে হঠাৎ শিউলির লাল স্কুটিটা দেখতে পেল। নিজেকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে অল্প দৌড়ে গেল সে স্কুটিটার দিকে। শিউলি মহল্লার মেয়ে। ওকে তো সবাই চেনে এখানে! চেনে না?
শিউলির কাছে পৌঁছে দেখা গেল, আরেকটু ওদিকে একদম শেষমাথায় দাঁড়িয়ে আছে ঝলমলে কাচগাড়িটা। বাইরে গনগন করছে রঙ। চেনা গাড়িটা দেখে মূহুর্তের মধ্যে নার্ভ শান্ত হলো তার কিছুটা। কারন দরজা স্লাইড করালে, ভেতরের যত পুরনো ও নতুন বইয়ের গন্ধ - তা ওর চেনা। ডানদিকের জানালায় কমলা মাছের ঝাঁক এখন দূর থেকে মিহি পরাগের মতো দেখাচ্ছে। লোকগুলো এখান থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে ওকে, ওদের।
শিউলি, পায়েল দিদিমনিকে দেখে একগাল হাসে। বলে,‘আমি এতবার ফোন করছি আপনাকে! কিছুতেই লাগছে না। এভাবে খুঁজে খুঁজে আসতে খুব মুশকিল হল না আপনার’? দুদিকে ঘাড় নেড়ে শুকনো মুখে হাসে দিদিমনি। গলা শুকিয়ে গিয়েছে। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। যতটা সম্ভব গা ঘেঁষে দাঁড়ায় সে কাচগাড়িটার।
অবশ্য কয়েক মুহূর্তেই সামলে নেয়। বলে, 'বাচ্চাগুলো আসবে না?' বাচ্চাগুলোর জন্যই তো এতকিছু! তারা না এলে এ প্রজেক্টটার কোনো দরকার পড়বে না। অবশ্যি তখন পায়েল দিদিমণির কক্ট্রাক্টটাও থাকবে না আর। সেক্ষেত্রে একটাই লাভ। প্রাণ হাতে করে এমন উজিয়ে আসা ফেস করতে হবে না।
শিউলি বলে, 'কুচোগুলো এখন হোটেলে, গ্যারেজে। রোজের কাজ সামলে আরেকটু বেলা করে আসবে। তবে, এর মাঝে পারলে একটা পেরেন্ট-মিটিং করে নিতে পারি আমরা। বাপমা-রা রাজি হলে তবেই না পাঠাবে বাচ্চাগুলোকে! তবে একটা কথা দিদি,' চশমাটা খুলে ওড়নায় কাচ মুছতে মুছতে, গলা নামিয়ে বলে শিউলি, 'অনেকদিন তো দেখছি,আজকাল সবাই টাকা চায়। শিক্ষা আর কে চায়? ফ্রিতে হলেও!'
পায়েল ঘাড় নাড়ে। ঠিকই তো! বলে, 'পেরেন্টদের সাথে কথা বলতে কি বাড়ি বাড়ি যেতে হবে?' শিউলি বলে ওঠে, ‘না না! ওই তো! ওদের বাবারা রেডি; সব বলে রেখেছি, কথা বলে নিলেই হল!' পায়েল আঁতকে উঠে দেখে পাঁচজনের যে দলটা ওর পিছনে আসছিল সেটা এখন আর পাঁচে থেমে নেই - এ মুহূর্তে সেটা তের-চোদ্দ। সবার চেহারাই প্রায় এক রকম। কর্কশ, নেশাড়ু। চোখ তুরীয়। এরা বাপ? বাহ! এমনটা তো তার মাথায় আসেনি!
দুজন এগিয়ে আসে। একজন বলে, 'দিদিমণি, আমাদের বাচ্চাগুলোকে পড়াশোনা করিয়ে দিন।' অন্যজন বলে, 'ওরা যেন আমাদের কারো মতো না হয়, আপনি খালি সেইটা নজর করবেন'। 'হ্যাঁ, আমাদের যা হওয়ার হয়েছে কিন্তু ওরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়' - পেডলারগুলি মনে মনে সক্কলে এই এক কথা বলে। পায়েল স্পষ্ট পড়ে নিতে পারে মানুষগুলির শামুক হাত বাড়িয়ে দেওয়া – নিভুনিভু চোখের অশেষ মিনতি।
পায়েল দিদিমনি যখন সব ফাইলপত্র, ডেটা গুছিয়ে গলিটা থেকে বেরোবার মুখে, তখন ন্যাড়ামাথা সে চা দোকানী হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে ওর সামনে হাতজোড় করে বলে ওঠে, 'পাড়া ভালো নয় জানি, কিন্তু আবার আসবেন। আপনারা ছাড়া আর কে আছে বলুন আমাদের?'
সে বছর দিদিমনির কাচগাড়ির ক্লাসে প্রথমে তিনটি ছেলে ও দুটি মেয়ে ভর্তি হয়েছিল। বাড়তে বাড়তে সেটা এ বছর সতের জনে এসে ঠেকেছে। ছাত্রছাত্রীরা গল্প করতে করতে দিদিমনিকে গলির মুখ অবধি এগিয়ে দিয়ে যায় একেকদিন। হুট করে তখন কখনো কখনো প্রথম দিনের কথাটা মনে পড়ে গেলে চুপ করে যান দিদিমণি। গলিটা তখন একই সাথে খুব চেনা আর অচেনা লাগে।
Am | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৫743310
kk | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৭743322