এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • রূপান্তর

    সন্দীপন তালুকদার
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ২৫৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • অলংকরণ: রমিত



    ১


    গোলপার্কের মোড় থেকে বালিগঞ্জ রোড ধরে কিছুটা এগোলেই ডান দিকে একটা গলি। আর সেই গলিতে ঢুকলে থমকে দাঁড়াতেই হয় এক অলৌকিক মায়ালোকের সামনে। কাচের স্বয়ংক্রিয় দরজার ওপর গাঢ় নীল আলোর উজ্জ্বল হরফে লেখা—‘অ্যামেজিং অ্যাকুয়াটিক্স’। বৈশাখী সন্ধ্যার ব্যস্ত মহানগরীর কোলাহল যেন সেই কাচে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। ভেতরে পা রাখলেই মনে হয়, এক লহমায় যেন কলকাতার বুক চিরে প্রবেশ করলাম কোনো মৎস্যকন্যার গোপন স্বপ্নরাজ্যে। সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশনিং-এর নিয়ন্ত্রিত আবেশে সার দিয়ে রাখা বিশাল বিশাল অ্যাকোয়ারিয়াম। তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে সাজানো বিশেষ বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারড প্রবাল, রিসাইকেলড্ প্লাস্টিক থেকে তৈরী স্ফটিক আর আশ্চর্য সুন্দর ট্রান্সজেনিক জলজ গাছপালা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে উজ্জ্বল রঙের দ্যুতি। বায়ো-ফিল্টারের একটানা মৃদু সুষম কম্পন আর বাহারি এয়ার পাম্প থেকে ভেসে ওঠা বুদ্বুদের ছন্দময় শব্দে সবসময় এক প্রশান্তি খেলা করে। মনে হয়, এ যেন কোনো সাধারণ রঙিন মাছের দোকান নয়, এক শৌখিন জলজ-স্থপতির কল্পনার স্ফটিক প্রাসাদ।

    এই জলসাম্রাজ্যের অধীশ্বর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বায়ো-টেকনোলজিস্ট ডক্টর অসীম আদিত্য। দোকানে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তাঁর অনন্য সাফল্যচিত্র। ভাসমান থ্রী-ডি হোলোগ্রাফিক ইন্টারঅ্যাকটিভ স্ক্রিনের নীল আলোয় ভেসে উঠছে বিশ্ববন্দিত সব সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা প্রবন্ধ, সাইবারনেটিক মেমেন্টো আর মর্যাদাপূর্ণ সব গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড। পাশেই এক ভার্চুয়াল টাচ স্ক্রিনে ঘুরছে ডক্টর আদিত্যর পেটেন্ট করা বায়ো-ডিজিটাল 'অ্যাকুয়াটিক এইডস' ও অত্যাধুনিক জলজ-গ্যাজেটের থ্রিডি ক্যাটালগ। অ্যানিমেটেড ব্যাকলাইটে ভাসছে তাঁর ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিস্ময়কর জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের হাই-রেজোলিউশন বায়ো-ইমেজ—যাদের উজ্জ্বল রঙ আর আকৃতির বিচিত্র দেখলে তাক লেগে যায়। উন্নত হাই-টেক প্রযুক্তি আর জলজ জীবনের এমন নিখুঁত ও নান্দনিক মেলবন্ধন জীববিজ্ঞানের দুনিয়ায় ডক্টর আদিত্যকে সাফল্যের এক অনন্য চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। তবে মৎস্য বিজ্ঞানের জগতে তাঁর খ্যাতি অদ্ভুত সব ‘কাইমেরিক মাছ’ সৃষ্টির জন্য—যারা আসলে অনেকটা সুকুমার রায়ের ‘বকচ্ছপের’ মত। না দেখলে তাদের অস্তিত্ব বিশ্বাস করা কঠিন। শো-রুমে ঢুকে বাঁ দিকে তাকালেই দেখা যাবে একটা মেগা ট্যাংকে সাঁতরে বেড়াচ্ছে দু-জোড়া ‘রুতেলাই’—যাদের মাথা আর লেজ রুই মাছের মত হলেও দেহাটা তেলাপিয়ার। আর তার পাশের ট্যাংকে ঝাঁক বেঁধে সাঁতরে বেড়াচ্ছে এক দল ক্ষুদি ক্ষুদি ইলিশ। ডক্টর আদিত্য এদের নাম রেখেছেন ‘মা-লিশ’ অর্থাৎ ‘মাইক্রো ইলিশ’। দেখলে যেন মনে হয়, কোনো এক জাদু বলে গ্যালিভারের মত পৌঁছে গেছি লিলিপুটের দেশে।

    ডক্টর আদিত্যর এই সুদীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রার এবং সাফল্যের মুকুটে এক অনন্য পালক যোগ করেছে তাঁর আরেকটি অদ্ভুত সৃষ্টি—দেড় ফুটের এক সিলভার অ্যারোয়ানা, যার নাম তিনি রেখেছেন ‘রূপসী’। সেন্ট্রাল থিম-ট্যাঙ্কের রানি রূপসীর গায়ে বায়ো-টেকনোলজির জাদুতে গজিয়েছিল সাত জোড়া ময়ূরকন্ঠী রঙের ঝালরের মত পাখনা। আর বিজ্ঞানীর তৈরী বিশেষ হেডসেট পরা কোনো ব্যক্তি মনে মনে চাইলেই রূপসী যেন তাঁর মনের কথা বুঝতে পারে। তখন ময়ূরের মত পাখনা মেলে সে নাচতে শুরু করে। সামনের সপ্তাহে এই কলকাতাতেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকুয়াটিক এক্সপো’-য় ডক্টর আদিত্যর শিরোপা জেতার সেরা হাতিয়ার এই রূপসীই। কিন্তু তার এই অনন্য সৌন্দর্য আর বুদ্ধিমত্তার পারদ যত উঠেছে, প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্মগত ক্ষমতা আর আভ্যন্তরীণ জীবনীশক্তিটা যেন ঠিক ততটাই সূক্ষ্মভাবে ম্লান হয়ে এসেছে, যা চোখ এড়ায়নি অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীর।

    তবে এই সাফল্যের মাঝেও অসীমবাবুর বৈজ্ঞানিক মনের কোনায় বিঁধে থাকা একটা কাঁটা ক্রমাগত নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। তিনি মনে করেন, জৈব-প্রযুক্তবিদ্যার আসল সাফল্য প্রাণীর দৈহিক পরিবর্তনে নয়; বরং মাছের মন ও চেতনা নিয়ন্ত্রণ করে দেহের সঙ্গে মনের সম্পর্কের জটিল সমীকরণ সমাধানের মাধ্যমে। মাছের ক্ষণস্থায়ী স্মৃতি আর প্রতিক্রিয়ার গভীরে প্রবেশ করলেই তাদের কুয়াশা ঢাকা অনুভূতির জগৎকে পুনর্গঠন করা যাবে। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গায়ের রঙ বদলোনার ক্ষমতা অনেক জলজ প্রাণীর সহজাত। কিন্তু তিনি শুধু খুঁজে চলেছেন সেই বিশেষ বায়ো-এজেন্টের ফর্মুলা যার প্রয়োগে মাছের মানসিক অবস্থা অনুসারে তার দেহের রঙ পরিবর্তিত হবে।

    কিন্তু এই পথে যতবারই তিনি হাঁটতে শুরু করেছেন, কিছুদূর এগিয়েই ব্যর্থতার ঘন কুয়াশায় পথ হারিয়েছেন। উপলব্ধি করেছেন সমাধান খুব কাছেই, কিন্তু সাফল্য আসেনি। এই ব্যর্থতার করুণ সাক্ষী, সেন্ট্রাল ডিসপ্লে ট্যাংকের তলায় পড়ে থাকা এক মেক্সিকান প্লেকো ক্যাটফিশ—‘কালু’। সাম্প্রতিক অতীতে ডক্টর আদিত্যর ব্যর্থ গবেষণার বলি এই কালু। এক্সপেরিমেন্টের সময় হাই ভোল্টেজের ইলেকট্রিক শক আর নিজের তৈরী বায়ো এজেন্ট, ডক্টর আদিত্য যার নাম দিয়েছিলেন ‘এজেন্ট এক্স’, প্রয়োগের পরেও কালুর শরীরে লাগানো ন্যানো চিপ কার্যকর হয় নি। বার বার ব্যর্থ পরীক্ষার স্ট্রেস নিতে নিতে তার জলপাই সবুজ শরীরটা যেন পুড়ে ‘জেট ব্ল্যাক’ রঙ নিয়েছে। হয়তো নিজের ব্যর্থতা থেকেই অনুপ্রেরণা পাওয়ার আশায় ডক্টর আদিত্য কালুকে ফেলে দেননি, রেখে দিয়েছিলেন তার সহজাত প্রবৃত্তিতে আকোয়ারিয়ামের মেঝের বর্জ্য ও শ্যাওলা পরিষ্কার করার জন্য। আর ‘এজেন্ট এক্স’ এর স্থান হয়েছিল বায়ো সেফটি কেবিনেটের কোনার রিজেক্টেড ড্রয়ারে।

    ২


    বাইরে থেকে শো-রুমের সেন্ট্রাল ডিসপ্লে অ্যাকোয়ারিয়ামটি জীবন আর বিজ্ঞানের এক সুসম মিশ্রণ বলে মনে হলেও, কাচের ওপারের বাসিন্দাদের জীবনেও ছিল প্রতিদিনের টানাপোড়েন, মানুষরা যার নাগাল পেতো না। ফ্লুরোসেন্ট প্রবালের উজ্জ্বল আলোয় রাজকীয় আবেশে ভেসে বেড়াত রূপসী। আর তার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার অন্ধ নেশায় অস্থির হয়ে তার আশেপাশে সাঁতরে বেড়াত দাপুটে সোর্ড টেল ‘হ্যারি’। হ্যারির শরীরের রক্তিম আভায় আর উজ্জ্বল ‘কডাল ফিন’-এর তলোয়ারের ঝলকে ফুটে উঠতো এক আগ্রাসী প্রেমিকের বাসনা। কিন্তু প্রেমিকের কাছে নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন কি রূপসীও চাইতো? সম্ভবত না। রূপসীও তাই হ্যারির আগ্রাসী প্রণয়-প্রস্তাবে পাখনা নাচিয়ে সায় দিত। কিন্তু তার রুপোলি শরীরে রক্তিম আভা ফুটে উঠতে দিত না। হ্যারির পেছনে সারাদিন ছায়ার মতো ঘুরত দুই চাটুকার সুমাত্রান বার্ব—‘বামো’ আর ‘ডানো’। তাদের আবার নজর ছিল রূপসীর ছায়াসঙ্গিনী দুই যমজ ব্ল্যাক মলি—‘ঝুমকি’ আর ‘চুমকি’-র দিকে।

    অ্যাকোয়ারিয়ামের ওপরের জল স্তরে যখন প্রবাল-নীল আলোয় পাখনা মেলে হ্যারি আর রূপসী অনুরাগের বিলাসী খেলায় মেতে উঠত, ঠিক তখনই ট্যাঙ্কের একদম নিচের তলায় শ্যাওলা আর পাঁকের মধ্যে শুয়ে নিস্পন্দ চোখে তা দেখে যেত কালু। রূপসীর রূপের ছটা তার পোড়া মিসকালো বুকেও প্রেমের জোয়ার আনত। কিন্তু তার খবর রাখতো শুধু ট্যাংকের প্রাচীনতম অধিবাসী, বৃদ্ধ কচ্ছপ হরিপদ। দোকানে আসা অনুরাগীদের মনের ইচ্ছে বুঝে রূপসী যখন পাখনা মেলে নাচতো, তখন কালুর দুটো গভীর মিসকালো চোখে উপচে পড়ত অদ্ভুত মুগ্ধতা। ইচ্ছে করত এক লাফে ট্যাংকের বাইরে গিয়ে দুপেয়েটার মাথার হেডসেটটা কেড়ে নিতে। কারো মনের সঙ্গে যদি রূপসীর মনের যোগাযোগ হয়, তবে তা হোক শুধু আর শুদ্ধু তার সঙ্গেই।

    কিন্তু কালুর চোখের এই মুগ্ধ দৃষ্টির আড়ালে লুকোনো প্রেমের উষ্ণতার আভাস পেত হ্যারি। রেগে গা-পিত্তি জ্বলে উঠতো তার। রূপসীর পাশাপাশি প্রবাল পাথরের গা ঘেঁষে সাঁতার কাটার সময় হঠাৎ নিচে নজর পড়লেই হ্যারি ফুঁসে উঠত, "এই ব্যাটা ছাঁটাই ক্যাটফিশ! নোংরা পরিষ্কার করা ছেড়ে তলায় বসে বসে চোখ বড় বড় করে কী দেখছিস রে? তোর মোটা কালো মাথার উপরে পিঁপড়ের ডিমের মত চোখ দুটো যদি খুঁজে পেতাম, তাহলে কবেই সেটা আমার তালোয়ারের খোঁচায় উপরে নিতাম।" রূপসীও হ্যারির গায়ে আরও একটু গা ঘেঁষে তাচ্ছিল্যের চটুল হেসে আস্কারা দিত, "ছাড়ো তো হ্যারি! কাদার পোকা তো কাদাতেই পড়ে থাকবে, ও আলোর মূল্য কী বুঝবে? ওর ওই কুতকুতে চোখের ম্যাদামারা চাউনি দেখলে আমার মুডটাই নষ্ট হয়ে যায়।" বামো-ডানো আর ঝুমকি-চুমকি জোড়ায় জোড়ায় হেসে উঠে ওদের সুরে সুর মেলাত।

    আর পাথরের খাঁজে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলত হরিপদ। সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করার সময় থেকেই সে অসীমবাবুর কাছে আছে। এক মেধাবী ছাত্রের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানীর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার আশ্চর্য যাত্রাপথের প্রতিটি বাঁকের সাক্ষী সে। কালুর নাম একদিন ছিল সজীব। যেদিন এক উঠতি বিজ্ঞানীর রহস্যময় আবিষ্কারের ছোঁয়ায় কিছুক্ষনের জন্য সজীবের মনের সঙ্গে দেহের সংযোগ তৈরী হয়েছিল, সেদিন এই সজীবকে নিয়েও তিনি ব্যবসার ছক কষেছিলেন। আর এখন সজীব হয়েছে কালু, আর তার জায়গা নিয়েছে রূপসী। কিন্তু এই কথা কালুকে সে কেমন করে বোঝাবে? কালুর ওই খাঁজকাটা কুৎসিত চেহারার গভীরে কী পরিমাণ বায়ো-ইলেকট্রিক শক্তির আগ্নেয়গিরি চাপা পড়ে আছে, তা কি অসীমেরও মনে আছে?

    ৩


    দিন তিনেক পরের কথা। আগামী কাল সায়েন্স সিটিতে হবে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকুয়াটিক এক্সপোর ‘সেন্সেশনাল স্পেসিমেন’ ইভেন্ট। এখন রাত্রি ন’টা। ডক্টর আদিত্য তাঁর রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম সিক্রেটরি ডক্টর পৃথা নন্দীকে কালকের সেলস্ টার্গেট বুঝিয়ে দিয়ে যেই মাত্র উঠতে যাবেন, কড়্ কড়্ শব্দে খুব কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। সন্ধ্যার কিছুটা আগে থেকেই ঘেমো গায়ে ধুলো মেখে একটা আস্ত মহানগরী যে কালবৈশাখীর অপেক্ষা করছিল, সে খবর মায়াপুরীর কন্ডিশনড্ পরিবেশে থাকা লোকেদের জানার কথা নয়। শো-রুমে তখন অবশ্য কোনো ক্লায়েন্ট ছিল না। ডক্টর আদিত্য কাঁচের দরজার এপার থেকে বৈশাখী ধারায় ভেসে যাওয়া ফুটপাতের দিকে তাকালেন। আর ঠিক তক্ষুনি সামনের রাস্তার ওপারের ট্রান্সফর্মারে বাজটা পড়ল। একটা আলোর ঝলকানি, আর তার পর বিকট শব্দে কাঁচের দরজাটাও কেঁপে উঠল। এই অবস্থায় পাওয়ারকাট হওয়া কলকাতায় মামুলি ব্যাপার। কিন্তু সমস্যা করল ডক্টর আদিত্যর হাই পারফরমেন্স পাওয়ার ব্যাক আপ সিস্টেম। লাইট গুলো দপ্ দপ্ করে নিভে যেতেই পুরো দোকানটা জুড়ে ফুটে উঠল এক মায়াবী বায়ো-লুমেনেসেন্ট দীপ্তি। এন্টপ্রিনর ডক্টর আদিত্যর মনের কোনায় ঘাপটি মেরে থাকা সেই বৈজ্ঞানিক স্বত্তা অনেক দিন পরে আবার উপলব্ধি করল নিজের জলসাম্রাজ্যের আপার্থিব রূপ। কিন্তু সেই উপলব্ধি উপভোগ করার আগেই ব্যাপাররটা খেয়াল করলেন পৃথা, “সেন্ট্রাল ট্যাংকের ব্যাকআপ অক্সিজেন পাম্প কাজ করছে ন, স্যার”! ডক্টর আদিত্য তাড়াতাড়ি সেন্ট্রাল ট্যাংকের দিকে পা বাড়াতেই, গোটা কলকাতা শহর কেঁপে উঠল ৫.৮ রিখটার স্কেলের কম্পনে। মাত্র দশ সেকেন্ড, কিন্তু তাতেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেল। পৃথা ছিলেন বায়োসেফটি কেবিনেটের পাশেই। টাল সামলাতে না পেরে কেবিনেটের হাটলটা ধরতে যেতেই বিপত্তি—ডান দিকের ড্রয়ার টা খুলে গিয়ে বেশ কিছু কেমিক্যাল আর বায়ো-এনজইম ছিটকে পড়ল ভিট্রিফায়েড ফ্লোরে। আর প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গেই আরো একটা তীব্র ঝাকুনি। ল্যাবের রিএনফোর্সড বায়োসেফটি র‍্যাকটাই এবার মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। এর পর পরই বেশ কয়েকটা অ্যাকোয়ারিয়াম ভেঙে পড়ার শব্দ হতেই ডক্টর আদিত্য পৃথাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বৃষ্টিটা ততক্ষনে ভালো মতোই শুরু হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই ডক্টর আদিত্য দেখতে পেলেন ‘অ্যামেজিং অ্যাকুয়াটিক্স’-এর কাঁচের দরজা ভেদ করে বিচ্ছুরিত হচ্ছে নানান রঙের বায়ো-লুমেনেসেন্ট আভা।

    ৪


    এরেটর পাম্পের নিরন্তর বুদ্বুদের প্রবাহ বন্ধ হতেই খটকা লেগেছিল হরিপদর। কালু তখন একমনে ট্যাংকের তলার রঙীন পাথরের খাঁজ থেকে শ্যাওলা চেঁছে চলেছে। প্রেমিক যুগল আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা ট্যাংকের উপরের তলায় ব্যস্ত দৈনন্দিন সান্ধ্যবিলাসে। ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্যাংকের সমস্ত বৈদ্যুতিক আলো একবার কেঁপে উঠেই একসঙ্গে নিভে গেল। হরিপদ চঞ্চল হয়ে উঠল। ততক্ষনে অস্থিরতার ছোঁয়া পৌঁছেছে ট্যাংকের উপরের তলায়, রূপসীর পাখনার আলোড়ন থেমে গেছে। হ্যারি কেন জানি শান্ত স্থবির রূপসীকে ঘিরে গোল গোল চক্কর কাটছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্যাংকের জল চঞ্চল হয়ে উঠল। সামনের প্রবাল পাহাড়ের বেগুনি আভা দুলছে, সবজে শৈবালের বনে লেগেছে অস্থির ঢেউ এর ধাক্কা। হরিপদর পাথরের গুহার সামনে দিয়ে ছুটে পালালো বামো-ডানো আর ঝুমকি-চুমকি; আশ্রয় নিল প্রবাল পাহাড়ের পেছনের শৈবালের বনে। গলা উঁচু করে উপরের দিকে তাকাতেই হরিপদ দেখল, হ্যারির শরীরের লালচে আভা রূপসীর রুপালি শরীর থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছে। হরিপদর কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছে ততক্ষনে, রূপসীর বিশাল শরীরের আনাচে কানাচে বাসা বাঁধছে এক অলস স্থবিরতা। কালু কৈ, কালু? উদ্দাম তরঙ্গ স্রোত উপেক্ষা করে বৃদ্ধ হরিপদ তার ভারী খোলোকের ভরসায় এগিয়ে চলল কালুর দিকে। কালু তখন শ্যাওলা চোষা ছেড়ে অবাক হয়ে রূপসীকে দেখছিল। "কালু! আর চুপ করে থাকার সময় নেই! তুই ছাড়া আজ আর কেউ নেই যে রূপসীকে বাঁচাতে পারে। তুই তো আসলে সজীব, কিন্তু রূপসীর আজ কালুকেই দরকার।" রূপসীর অবসন্ন শরীর ততক্ষনে অনেকটা নীচে নেমে এসেছে। কালু এগিয়ে যায় রূপসীর দিকে। হালকা বগুনী জলে সেই পরিচিত গন্ধ। প্রবাল পাথর ডিঙিয়ে একটু এগোতেই নাগাল পেল রূপসীর, তার রুপালি শরীরে তখন নীলচে আভা। নিজের মিসকালো শরীর দিয়ে সে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তার স্বপ্নের রূপসীকে। দুটি শরীরের তীব্র ঘর্ষণে জলে ব্লু-স্পার্ক ফুটে উঠল। স্নায়ু সংবেদন ছড়িয়ে পড়ল এক শরীর থেকে অন্য শরীরে। কালু তার শেষ জীবনশক্তি নিংড়ে স্পন্দিত করল রূপসীর আচ্ছন্ন শরীর।

    ৫


    রাস্তার ফুটপাতে এসে দাঁড়াতেই আকস্মিক দুর্ঘটনার উদ্বেগ আর উত্তেজনার তীব্রতা অনেকটা স্তিমিত হয়ে এল। ক্ষয় ক্ষতি হয়তো ততটা হয় নি। স্ট্রিট লাইট যদিও জ্বলছে না, আশেপাশের দোকানগুলো অনেকক্ষণ বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু পাশের রেসিডেন্সিয়াল এপার্টমেন্টের আলোয় বৃষ্টিভেজা রাস্তাটা ভাসছে। আশেপাশে বেশ কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই রাস্তায় নেমে এসেছে ভূমিকম্পের আফটারশকের আশঙ্কায়। তারা নিজেদের মধ্যে জটলা পাকাচ্ছে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই দোকানের ইলেকট্রিসিয়ান কাম সিকিউরিটি গার্ড পবন কুমার, আফটারশকের পরোয়া না করেই ইমার্জেন্সি পাওয়ার ব্যাকআপ সিস্টেমটা চালু করতে পারল। সেন্টাল ট্যাংকের উপরে লাগানো রিয়েল টাইম ওয়াটার অ্যানালাইজারের ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড তখন জানান দিচ্ছে, সেই ট্যাংকের অধিবাসীদের জন্য পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু আর চিন্তা নাই, এয়ার পাম্প চালু করা গেছে। দোকানের সবকটা আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠতেই খটকা লাগলো ডক্টর আদিত্যর। হালকা বেগুনি ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা পরেছে তার স্বপ্নপূরী। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা কেমিক্যাল আর সল্যুশন গুলোর দিকে তাকাতেই, চোখ আটকে গেল ‘এজেন্ট এক্স’ এর ভাঙা শিশির দিকে। বায়ো-সেফটি কেবিনেটের পেছনের দেওয়ালের জলের পাইপ লাইনে চোরা ফাটল ধরে পুরো দেওয়ালটাকেই দুর্বল করে দিয়েছিল, তাই হয়তো এই দুর্ঘটনা। সারা দেওয়াল জুড়ে ইন্টেরিয়র বোর্ডপ্যানেল করা থাকায় এতদিন ধরা পরে নি। আর বায়োসেফটি কেবিনেট ভেঙে পড়ার জন্যই তার তলায় রাখা দুটো ডিসপ্লে গ্লাস ট্যাংকও ভেঙেছে। জলের স্পর্শে ‘এজেন্ট এক্স’ থেকেই উঠছে সেই বেগুনি ধোঁয়া। ধোঁয়া বের করার পোর্টেবল ফিউম হুডের এক্সহোস্ট প্যানেল চালু করেই ডক্টর আদিত্য ছুটে গেলেন সেন্ট্রাল ডিসপ্লে ট্যাংকের দিকে। রূপসীকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ট্যাংকের বেশ কিছু প্রবাল আর স্ফটিক এলোমেলো হয়ে পরে আছে, আর ট্যাংকের উপরের একটা অংশে ফাটল ধরেছে। সেখান দিয়ে হয়তো বেগুনি ধোঁয়া ট্যাংকের জলেও মিশেছে, তাই হয়তো ট্যাংকের ওয়াটার কোয়ালিটির এতো তাড়াতাড়ি অবনতি হয়েছে। ওয়াটার এক্সচেঞ্জ সিস্টেম চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই পৃথার গলা পাওয়া গেল, “স্যার, একবার এদিকে আসুন...”। ট্যাংকের একেবারে পেছনে সেই প্লেকো ক্যাটফিশটার পাশেই পরে আছে রূপসী, কিন্তু সে জীবিত। তার কানকো দুটো আস্তে আস্তে নড়ছে।
    পৃথা আর পবন এর সাহায্যে তাড়াতাড়ি রূপসীকে আইসোলেশন ট্যাংক এ নিয়ে এলেন ডক্টর আদিত্য। কিন্তু তার মনের খটকাটা এখন ধীরে ধীরে এক ভীতি মিশ্রিত সন্দেহে পরিণত হচ্ছে। কারণটা ‘এজেন্ট এক্স’। তাঁর মনে পরে যাচ্ছে, প্লেকো ক্যাটফিশটার উপর এই নিউরাল রিমডেলিং এজেন্ট-এর আশ্চর্য প্রভাবের কথা। পবন ততক্ষনে তাঁর মায়াপূরীকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে। পৃথা ও পবনকে বাড়ি যেতে বলে ডক্টর আদিত্য তাঁর অবজার্ভেশন চেয়ারটায় বসে রূপসীকে দেখছিলেন। আজ রাতটা তিনি এখানেই কাটাবেন। রূপসীর শরীরে লাগানো ন্যানো চিপ জানান দিচ্ছে তাঁর ভাইটাল প্যারামিটারগুলো ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। এইতো মাছটা আবার জলে ময়ূরকন্ঠী নিশান উড়িয়ে সাঁতরাতে শুরু করল। তার গায়ের আঁশ গুলোয় যেন আজ হীরের দ্যুতি! সত্যি কি তাই? না সবটাই তার চোখের ভুল। কালকের ইভেন্টটা তাঁর জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। গালফ কান্ট্রি থেকে বেশ বড় একটা অর্ডার আসতে পারে। ‘রুতেলাই’ আর ‘মা-লিশ’ এর জন্য টু পয়েন্ট ফাইভ মিলিয়ন ইউ. এস. ডলার পর্যন্ত অফার করেছে মালয়েশিয়ার একটি ফার্ম। কিন্তু ডক্টর আদিত্যর প্লানটা একটু আলাদা। তিনি চান এই ব্যবসায় একা কুম্ভ হতে। পুরো হোম অ্যাকোয়ারিস্ট ইন্ডাস্ট্রিতে তিনিই হবেন এই সমস্ত অদ্ভুত মাছদের একমাত্র সাপ্লায়ার। আর তখন এদের দাম হবে, তিনি যত চাইবেন, ঠিক তত। তাঁর রূপসীও কাল সকলকে তাক লাগিয়ে দেবে।

    চেয়ারে বসে এসব ভাবতে ভাবতেই হয়তো তন্দ্রা এসে গেছিল। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ অথচ মিহি শব্দ এল আইসোলেশন ট্যাংক থেকে। এয়ার পাম্পের মিহি শব্দের ছন্দময় আবেশে সম্বিৎ ফিরতে খানিকটা সময় লাগল। রূপসীর গায়ে লাগানো ন্যানো চিপ কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ করেছে। ডক্টর আদিত্য ঝুঁকে পড়লেন ট্যাংকের উপর। মাছটার শরীর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে অপার্থিব লালচে আলোর দ্যুতি! চোখের ভুল নয়। তাড়াতাড়ি সেই বিশেষ হেড সেটটা মাথায় পরে তিনি মনে মনে ভাবলেন, রূপসী কি আগের মত তার চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেচে উঠবে? এক একটা করে সেকেন্ড পার হতে এক ঘন্টারও বেশি সময় লাগছিল। একবার, দুবার, তিনবার...না। সমস্যাটা হেডসেটের কিনা দেখার জন্য সেটাকে মাথা থেকে খুলেতেই আবার সেই ন্যানো চিপের অ্যাটেনশন সাউন্ড। এবার রূপসীর পরিবর্তনটা নিজের চোখের সামনেই ঘটতে দেখেন ডক্টর আদিত্য। মাছটা জলের উপরের স্তরে ভেসে উঠলো লালচে হয়ে, আর যখন আবার একটা আলতো চক্কর কেটে নিচের দিকে নেমে এল, তখন একটা একটা করে আঁশের রঙ বদলে গেল সেকেন্ডের ভগ্নাংসে। একটা সোনালি রঙের তরঙ্গ খেলে গেল মাছটার মাথা থেকে লেজের দিকে। রূপসীর শরীরের রঙ এখন পাকা সোনার মত। ডক্টর আদিত্যর ঠোঁট দুটো উত্তেজনায় কাঁপছে। মাছটা রঙ বদলাচ্ছে, কিন্তু কেন? এর মধ্যে জলের কোনো প্যারামিটারের বিশেষ পরিবর্তন হয় নি। শুধু ন্যানো চিপের ডেটা ডিসপ্লে প্যানেল অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে মাছের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক বিভব। তাহলে কী...তখন মাছটার চিন্তার ক্ষেত্র পরিবর্তন হচ্ছে? আর তাতেই পরিবর্তিত হচ্ছে মাছের রঙ? আর তখনি তাঁর মনে পরে গেল ‘এজেন্ট এক্স’ এর কথা। তবে কী তাঁর গবেষণা এত দিনে সফল হলো? মাছের মনের সঙ্গে তার দেহের এক যোগসূত্র তৈরী হয়েছে? কিন্তু কিভাবে? তবে সমস্যা হচ্ছে, হেড সেটটা ঠিক থাকলেও রূপসী কিন্তু আর তাঁর মনের কথা বুঝে নেচে উঠছে না। মাছটা কী এবার নিজেই নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে? মাছের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপিত বিশেষ নিউরাল সার্কিট আর তার কার্যকলাপকে প্রভাবিত করতে পারছে না?

    প্রায় ঘন্টা দু’য়েক কেটে গেছে। রূপসীর রঙের পরিবর্তনের একটা প্যাটার্ন তিনি লক্ষ করেছেন। এই রঙ পরিবর্তন পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকার জন্য যে নয়, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। তবে মাছটার শরীরে ‘অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল’ কমলে রংটা হচ্ছে লালচে, আর বাড়লে সোনালি। জলে দ্রবিভূত অক্সিজেনের মাত্রা ইচ্ছে করে পরিবর্তন করিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। হটাৎ কী মনে করে তিনি রূপসীর জন্য বানানো বিশেষ খাওয়ারের গুলিগুলো ট্যাংকে ফেললেন। এখন ওর খাওয়ার সময় নয়। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন মাছটা ছুটে এসে সেই দানা গুলো খেতে শুরু করল। আর ধীরে ধীরে মাছটা হয়ে গেল ময়ূরকন্ঠী রঙের। ন্যানো চিপ জানান দিচ্ছে মাছের শরীরে ‘আইসোটোসিন্’ হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বেড়েছে। এই হরমোন মাছের ‘হ্যাপি হরমোন’। তবে কি মাছেদের জগতে আনন্দের রঙ ময়ূরকন্ঠী?

    ৬


    সাইন্স সিটির সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামে ডক্টর আদিত্যর প্রেজেন্টেশন এই মাত্র শেষ হলো— “কানেকটিং মাইন্ড টু বডি কালার : অ্যান অ্যামেজিং বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারড অ্যারওয়ানা!” পুরো হলটা গম্ গম্ করে উঠল সমবেত হাত তালির শব্দে। আয়োজকদের তরফ থেকে বিশ্ববিখ্যাত জার্মান অ্যাকুয়াটিক বায়োলজিস্ট প্রফেসর ইভিন রবেনস্টাইন ডক্টর আদিত্যর গবেষণার বেশ প্রশংসা করলেন। তার সঙ্গেই তাঁর সাফল্যের জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে, সারা পৃথিবীর বিশেষজ্ঞ বিচারকদের মতে রূপসীকে এ’বছরের ‘সেন্সেশনাল স্পেসিমেন’ বলে ঘোষণা করলেন। আর কিছুক্ষন পরেই বিশেষভাবে নির্মিত অ্যাকুয়াটিক প্যাভিলিয়ানে রূপসীকে সারা পৃথিবীর সাংবাদিক ও মৎস্যপ্রেমীদের সামনে আনা হবে, তাও জানিয়ে দিলেন। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে থেকে চীনা বৈজ্ঞানিক ডক্টর জিং সেঙ পি ও ব্রিটিশ বায়ো-টেকনোলজিস্ট ডক্টর রবার্ট বিয়িংহাম ডক্টর আদিত্যকে গবেষণার কর্মপদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু প্যাঁচালো প্রশ্ন করলেন। এরা দুজনেই তাঁর কেমব্রিজের পূর্বতন সহকর্মী এবং বর্তমানের প্রধান প্রতিদ্বন্ধী। কিন্তু মনের কোনায় জমে থাকা অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশাকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখে ফুটে উঠতে না দিয়ে তিনি ল্যাব সিক্রেটের দোহাই দিয়ে তখনকার মত পাশ কাটিয়ে বাঁচলেন।

    কিন্তু রূপসীর মনের অবস্থার সুস্পষ্ট প্রকাশক হিসেবে তার শরীরের রঙ যখন আপনা থেকেই পরিবর্তন হতে শুরু করল, তখন সারা পৃথিবীর বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। ইতিমধ্যেই ফ্লোরিডার বিখ্যাত হবি হোমের মালিক মিস্টার জন অ্যাটকিনসন্, ডক্টর আদিত্যকে তিন মিলিয়ন ইউ. এস. ডলার অফার করেছেন রূপসীর জন্য। আদিত্য যে মিষ্টি হেঁসে সেই অফার শুধু প্রত্যাখ্যান করেছেন তাই নয়, তাঁর হাত এড়াতে খানিকটা ইচ্ছে করেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

    ছন্দপতনটা হলো আকস্মিক! পৃথার ফোন এল –“রূপসী ইস ডুইং সামথিং ক্রেজি! একবার আসুন স্যার।” প্যাভিলিয়ানে পৌঁছে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন— রূপসীর রঙ ঘোলাটে। আলো ঝলমলে অ্যাকুয়াটিক প্যাভিলিয়ানের বিশাল ট্যাংকের একদম তলার পাথর আর বালির মধ্যে সে মুখ লুকাচ্ছে। একটা স্বস্তি এই যে, প্যাভিলিয়নের পাশে তখন দর্শক আর বিশেষ কেউ নেই। ন্যানো সেন্সরের ডেটা জানাচ্ছে এই মুহূর্তে রূপসীর শরীরে ‘আইসোটোসিন্’ এর মাত্রা অবিশ্বাস্য ভাবে কম। পৃথার দেওয়া তার পছন্দের খাওয়ারের দানার দিকে রূপসী ফিরেও তাকালো না। সে যেন এক গভীর আতঙ্ক নিয়ে অন্ধকার খুঁজছে।

    পৃথাকে এদিকের সবটা সামলাতে বলে রূপসীকে নিজের তৈরি বিশেষ ট্রানপোর্টেশন ট্যাংকে ভরে ডক্টর আদিত্য ঝড়ের গতিতে গাড়ি ছোটালেন বালিগঞ্জ রোড এর দিকে। রাস্তায় আসতে আসতে প্রতি সেকেন্ডে রূপসীর গায়ের রঙ এক পোচ করে কালো হয়েছে। তাঁর মনের খটকাটা এখন পুরোপুরি সন্দেহে পরিণত হয়েছে। রূপসীর মনের সঙ্গে গায়ের রঙের সংবন্ধন হয়তো ‘এজেন্ট এক্স’ এর কারসাজি। কিন্তু যা মনে হচ্ছে, এই পরিবর্তনটা কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র।

    ৭


    ঠিক তখনই, নির্জন ‘অ্যামেজিং অ্যাকুয়াটিক্স’-এর সেন্ট্রাল ট্যাঙ্কের নিচের পাথরের খাঁজে পরে থাকা প্লেকো ক্যাটফিশের শরীরটা কেঁপে উঠল। কিছুক্ষনের নীরবতা, তারপর আবার কাঁপতে শুরু করল তার কাঁটাদার পাখনাগুলো। আর সেই সময়ই নিজের পাথরের গুহার ফাঁক থেকে ব্যাপারটা নজরে পড়ল হরিপদর। আবার কম্পন। হরিপদ অবাক হয়ে দেখল শ্যাওলা মাখা পাথরের খাঁজে কেঁপে কেঁপে উঠছে যে পরিচিত শরীরটা—তার রঙ এখন পাকা জলপাই এর মত। হরিপদ ঠিক করতে পারছে না; সে এখন তার এই দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীকে কী নামে ডাকবে—‘কালু’ না ‘সজীব’?

    জলপাই রঙের শরীরে তখন ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে জীবনের দীপ্তি। ওই তো, একবার পাখনা ঝাপ্টে উপরের দিকে উঠে যেতেও চেষ্টা করল; কিন্তু পারল না। ট্যাংকের উপরের দিকে, ঠিক তার মাথার উপর দিয়েই সাঁতরে যাচ্ছিল ব্ল্যাক মলিদের দুই যমজ বোন। একটা কণ্ঠ স্বর শুনতে পেল হরিপদ। সেটা আসছে তার দীর্ঘ দিনের প্রতিবেশীর কাছ থেকেই। কিন্তু কথা বলার ভঙ্গিতে প্রকট হচ্ছে এক প্রচ্ছন্ন অহমিকা, "এই চুমকি... চুমকি! দূর ছাই, একটু ধর তো আমাকে। এই পচা কাদার ভেতর আমার চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। তোরা আমাকে টেনে তুলতে পারছিস না?"
    চুমকি মুখ বাকিয়ে ডানোর পেছনে গিয়ে লুকাল। আর তীব্র ঘৃণায় ছিটকে সরে গিয়ে ঝুমকি চেঁচিয়ে উঠল, "দূর হ বিচ্ছিরি কাদাখোঁচা ক্যাটফিশ! ব্যাটা শ্যাওলাখেঁকো আজ আবার আমাদের নাম ধরে ডাকছে! তোর গায়ের পচাকাদার গন্ধে বমি আসছে আমার!"

    চুমকিও উদ্ধত ভঙ্গিতে বলে উঠল, "আজ রূপসীদি নেই বলে কি কাদার পোকার ডানা গজালো? আমরা তোর খিদমত্গারী করবো? রূপসীদিকে একবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরে আসতে দে!"
    বামো লেজের পাখনাটাকে চাবুকের মত ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল, “নেহাত হ্যারি ভাই, এখন রূপসীদিকে ওয়েলকাম করার জন্য স্পেশাল ড্যান্স মুভ প্রাকটিস করেছে। না হলে, তলোয়ারের এক খোঁচায় তোর ওই পোস্তদানার মত চোখ গুলো উপরে ফেলতে বসের তিন সেকেন্ডও লাগত না।"

    ওই পোস্তদানার মত চোখগুলো দিয়েই কিন্তু পুরনো প্রতিবেশীর মনটায় উঁকি মারতে চাইছিল হরিপদ। চেনা শরীরে বাসা বেঁধেছে অচেনা মন। আর সেই মনের মালিক কি সজীব, না কালু? না ও অন্য কেউ...হয়ত নতুন কেউ? গত কাল রাতে শেষ পর্যন্ত ম্যাজিক দেখিয়েছে ‘এজেন্ট এক্স’। দুই শরীরের বায়ো-ইলেকট্রিক বিভবের কোয়ান্টাম ঘর্ষণে মাছের চেতনা স্থানান্তরের সেই না মেলা অঙ্কটার উত্তর মিলে গেছে। কিন্তু দুটি শরীরে দুই ভিন্ন মন প্রবেশ করলেও জমাট বাঁধতে পেরেছে কি ?

    কাঁচের দরজা খুলে উদ্ভ্রান্তের মত সেন্ট্রাল ট্যাংকের দিকে ছুটে আসছে অসীম। হরিপদ কি দামী সুট পরা মাঝবয়েসী সফল ব্যবসায়ীর পরিচয়ের অতলে লুকিয়ে থাকা বছর পঁচিশের উদীয়মান বৈজ্ঞানিক মনটাকে খুঁজে পাচ্ছে?


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ২৫৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • SAIKAT BANDYAPADHYAY | ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:০৪743225
  • সন্দীপন তালুকদারের "রূপান্তর' পড়লাম। মুগ্ধ হলাম। পাঠক হিসেবে এ লেখকের আগামী লেখা পড়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় রইলাম - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
  • Somnath Dhali | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:০৫743258
  • খুব ভালো লাগলো সন্দীপন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন।