এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৬

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৫ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫ | বাঙালির লোকায়ত উৎসবঃ ঝুলনযাত্রা | ছাতিমবাগান | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৬
    বাংলা অনুবাদ : সুশান্ত কর

    অলংকরণ: রমিত



    ভর দুপুরে নগ্ন হল মালতী


    মৌজাদারের বড়োবাড়িতে সকাল-সকাল শুরু হয়ে গেল হৈ-হল্লা। ধনিরামের হাতির পিঠে হাওদাতে এডুইন সাহেব, দুটো ঘোড়াতে বার্নার্ড সাহেব আর ভিক্টর সাহেব; তিন-তিনটে মহিষের গাড়ি—একটিতে যদুমণি মুখার্জি আর দামোদর কলিতা, একটিতে চা-বাগানের মালপত্র, আর-একটিতে মাংরা সরদারের বাহিনী। পনেরো জন মানুষ, হাতি-ঘোড়া নিয়ে এসে বড়োবাড়িতে ঢুকল।সাহেব কজন বাদ দিয়ে বাকি সবাই বড়োবাড়ির সুগরিজানে হাত-পা ধুয়ে ভেতরে এসে ঢুকল। ট্রি-হাউসে তৎক্ষণাৎ ব্রেকফাস্টের জোগাড় হয়ে গেল। আগেকার দিনে সাহেবদের সকালে খেতে দেবার জন্যে পাউরুটির ব্যবস্থা করতে বড়ো সমস্যা হত; এবারে সেই চিন্তাও নেই। গুয়াহাটির "জামাল ব্রাদার্স'-এর ভাইপো, সবার পরিচিত "জামাল রুটিওয়ালা' আছে এখন। বড়ো যত্নে পাউরুটি, কেক বানিয়ে এনে জামাল রুটিওয়ালা বড়োবাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। গেলবারে এডুইন সাহেব এসে যাবার পরে মৌজাদার বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে গুয়াহাটির এই "জামাল ব্রাদার্স'-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে মালিকের ভাইপোকে এখানে নিয়ে এসেছেন, মাটি-জমি দিয়ে মৌসরাতে ওকে বসত গড়ে দিয়েছেন। "জামাল রুটিওয়ালা'-র "প্রিন্স অব ওয়েলস' বেকারি দপদপিয়ে চলছে। মৌজাদারও আজকাল সকালে রুটিওয়ালার বেকারির পাউরুটি আর মাখন খান। এক মাখন আসে "ঘোষ ব্রাদার্স' থেকে; কলকাতা থেকে এসে অরবিন্দ ঘোষ এই দোকান বসিয়েছেন। মাঝে মধ্যে মৌজাদার সেখানে যান; কী নেই ওখানে! সেদিন গিয়ে ব্যাঙের আচারের বয়ামও সেখানে দেখে এসেছেন। চা-বাগানের সাহেবরা এই ঘোষ ব্রাদার্সে নিয়মিত আসেন। ঘোষবাবুর আকর্ষণ বড়ো কম নয়; কথায় কথায় তাঁর মুখ দিয়ে বেরোয় "থ্যাঙ্ক ইউ', "প্লিজ'। কিছু একটা উপলক্ষ করে বনমালী চৌধুরিও প্রায়ই ওখানে যান। মাখন এনে রাখা কঠিন; ঘোষবাবুর উপদেশমতো এক গামলা জলে একটা কাঁশার থালাতে মাখন রেখে দিতে হয়। বনমালী আজকাল ব্রেডের সঙ্গে "ঘোষ ব্রাদার্স'-এর চিজ নামের একপ্রকার জিনিসও খেতে শুরু করেছেন; শুরুতে সামান্য গন্ধ লাগত নাকে, এখন ভালো লাগা শুরু হয়েছে।

    ট্রি-হাউস, জামাল রুটিওয়ালার "প্রিন্স অব ওয়েলস'-এর কেক-রুটি, ঘোষবাবুর এনে দেওয়া চিজ, মাখন, জ্যাম—তিন সাহেব খুব খুশি! তিন সাহেবকে সবচাইতে বেশি আনন্দ দিল জামাল রুটিওয়ালার এনে দেওয়া কেক; নিজে গিয়ে গুয়াহাটির "জামাল ব্রাদার্স' থেকে নিয়ে এসেছে। এক কেকে আছে প্রচুর পরিমাণে মাখন, পেস্তা, বাদাম, চেরিফল, কিসমিস আর ডিম।ফুরফুরে গন্ধের কেকটা এডুইন সাহেবই কাটলেন; কাটবার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ট্রি-হাউস ফুরফুরে একটা গন্ধে ভরে গেল। যেমন গন্ধ, তেমনই তার স্বাদ! "ঘোষ ব্রাদার্স' একটা ফুলের জাল আঁকা টি-সেট আনিয়ে দিয়েছিল; নাচনডুবি বাগানের চায়ে এমং বুড়ো আবার চা ঢেলে ভরিয়ে দিল। এই কেক কিছু বাড়িতে নিয়মিত দিয়ে থাকে গুয়াহাটির "জামাল ব্রাদার্স'; এক্কেবারে আঙুলের ডগায় গুনতে পারি বাড়িগুলো। ক্যান্টনমেন্ট এরিয়াতে যে কজন সাহেব থাকেন—এরাই এর মূল গ্রাহক। বড়দিন বা নতুন বছরের প্রথম দিনে এই কেক বেশ কিছু বাড়িতে যায়।জামাল রুটিওয়ালা নিজে গুয়াহাটি গিয়ে বিশেষ অর্ডার দিয়ে এই কেক এনেছে; নিজে কোলে ধরে গুয়াহাটির উজানবাজারের ঘাট থেকে খারুপেটিয়া ঘাট অবধি বয়ে এনেছে। মৌজাদারকে সন্তুষ্ট করে রাখা মানে রুটিওয়ালার অনেক লাভ; মৌসরার মাটিতে রুটিওয়ালা দেখেছে সোনা-রুপোর গাছের বীজ। গুয়াহাটির "বি এন রায়' দোকান থেকে সে দুটি বিলেতি সুরার বোতলও নিয়ে এসেছে; সঙ্গে করে ওই "বি এন রায়'-এর দোকান থেকেই কিছু ইংরেজি কাগজ ও সাময়িক পত্রিকাও এনে দিয়েছে। বনমালী চৌধুরি সেয়ান মানুষ; তিনি বোঝেন যে, এডুইন সাহেবকে খুশি করা যায় এই বই-পত্রিকাতেই। সত্যিই তিনি এই কাগজ-পত্রিকাগুলো পেয়ে তাতেই মজে গেলেন। ভিক্টর সাহেব এই এলাকার ম্যাপ সঙ্গে এনেছেন; বার্নার্ড সাহেব আর ভিক্টর সাহেব এই ম্যাপ নিয়ে বসে গেলেন। তাঁরা দুজনে ম্যাপে দাগ দিয়ে দিয়ে দেখাচ্ছেন এডুইন সাহেবকে; জগৎ-সংসারকে ভুলে এই তিন সাহেব ম্যাপ নিয়ে মজে গেলেন। তাকালেই বোঝা যায়—তাঁদের তিনজনেরই আলোচনা বেশ গভীরে প্রবেশ করেছে।বনমালী চৌধুরি ওখান থেকে সরে এলেন। সাহেবরাই শুধু নন—তাঁর আরও অতিথি আছেন; তিনি গিয়ে তিন মুখার্জি আর দামোদর কলিতার খবর নিলেন। ইতিমধ্যে এরাও খাবার-দাবার সেরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন; সকালবেলা এরা আলুভর্তা, বেগুনপোড়া দিয়ে সেদ্ধ ভাত খেয়ে বিশ্রাম করছেন।নাচনডুবি বাগানের বড়োবাবু দামোদর কলিতার থেকে জানা গেল—তাদের বাগানে শ্রমিকের বড়ো অভাব দেখা দিয়েছে। শ্রমিক লাইনে প্রায় প্রতিদিনই দু-তিনজন করে শ্রমিক মারা যাচ্ছে; বার্নার্ড সাহেব বড়ো চিন্তাতে আছেন। দাদা মরগান লংফেলর হাতে গড়া ছোটো বাগানটিকে বার্নার্ড সাহেব আর লিওনার্ড সাহেব মিলে আজকের এই নাচনডুবি করে ফেলেছেন। মজুর লাইনে ছড়িয়ে পড়া এই রোগটি নিয়ে দুই সাহেব একেবারে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছেন।চিফ মেডিক্যাল সাহেব আদেশ করেছেন—হাসপাতালে ফুল স্টাফ চাই; সে জন্যেই ফার্মাসিস্টের সন্ধানে সাহেব নিজে আজ খারুপেটিয়া ঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এভাবে যদি মজদুরেরা মারা যেতে থাকে, তবে বাগান বন্ধই হয়ে যাবে। এদিকে ভুটান পাহাড় থেকে চা পাতা নিচে নামাবার জন্যে সাহেবেরা রোপওয়ের ব্যবস্থা করেছেন; এত করেও মজুরের অভাবে বাগান এখন বন্ধ হবে! নাচনডুবির আশপাশের এলাকাতে যারা বাস করে—তারা কেন নিজেদের খেত-খামার বাদ দিয়ে বাগানে সাহেবের অধীনে গোলামি করতে যাবে? দামোদর কলিতা পাক্কা খবর পেয়েছেন। সাহেবেরা এক্কেবারে মহারানিকেও চিঠি লিখেছেন—যত পারা যায় খাজনা বাড়াতে হবে; লোকে কর শোধ করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে যাবে আর দলে দলে চা-বাগানের কাজে গিয়ে ঢুকবে। এসব সংবাদ মৌজাদার জানেন; তবুও সাহেবের সঙ্গে সারাক্ষণ ওঠাবসা করেন নাচনডুবি বাগানের এই মুহুরি দামোদর কলিতা। তাঁর সঙ্গে কথা বলে অনেক নতুন ভেতরের খবর পেলেন।বনমালী চৌধুরির নিজের মৌজাতেই রায়তদের মধ্যে হাহাকার লেগেছে; নুন কর, লাঙল কর, লাইসেন্স কর—একশো একটা করের বোঝাতে মানুষ নাজেহাল হয়ে পড়েছে। তার ওপর বনবিভাগ বন-জঙ্গল, খাল-বিল সবেতে কর বসিয়েছে; বনমালীর নিজের মৌজার বহু মানুষ কর দিতে না পেরে জঙ্গলে পালিয়ে গেছে। বনমালী নিজেও এতে ঘোর সংকটে পড়েছেন; শ্বেত সাহেবদের সরকারকে যা দেবার, তা তো দিতেই হবে—না দিলে মৌজা চালাতে দেবে না! মৌজাদার বনমালী চৌধুরি সত্যিই চিন্তায় আছেন। গোয়ালপাড়ার মৌজাদার শান্তিপ্রিয়ার মামা হন; তাঁর থেকেই জেনেছেন—গোয়ালপাড়ার জমিদারেরা খাজনা বাড়াবার এক নতুন পথ ধরেছেন। গোয়ালপাড়া জেলাতে চিরস্থায়ী জমিদারি বন্দোবস্ত আছে; সেখানকার জমিদারেরা নিজ নিজ জমিদারির মাটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে "ভাটিয়া' বসাচ্ছেন। অবশ্য গোয়ালপাড়ার মৌজাদারের সঙ্গে এদিককার ব্যবস্থার একেবারেই মিল নেই। গোয়ালপাড়ার গায়ে লাগা জেলা রংপুর আর ময়মনসিংহ জেলা; সেখান থেকেই জমিদারেরা "ভাটিয়া'-দের আমদানি করছেন। গোয়ালপাড়া জেলার নদীচরগুলোতে দলে দলে এসে এই "ভাটিয়া' কৃষকেরা বসতি বসিয়েছে। এই ভাটিয়ারা চরের মাটি চষে পাটের চাষ শুরু করেছে; জমিদারদের আয়ও বেড়েছে। বনমালী চৌধুরি সেসব কথাও জেনেছেন। কী করবেন না-করবেন ভেবে তিনি বেশ দ্বিধাজর্জরিত। এবারে সাহেবেরা এসেছেন এই এলাকাতে কী কর কীভাবে চাপাবেন—সেসব ঠিক করবার লক্ষ্য নিয়ে। তাঁরা যদি অসন্তুষ্ট হন, তবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মারা যাবেন!বনমালী চৌধুরি এবারে হাতি-ডিপোর থেকেও বেশ কিছু টাকাপয়সা আশা করছেন। আগে জঙ্গলে গিয়ে সাধারণ শিকার বা অঙ্কুর শিকার করলেই চলে যেত; শ্বেতাঙ্গ সাহেবেরা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট খুলবার পর থেকে সেই পথও বন্ধ। সাহেবেরা হাতি-ডিপোতে এমনি আসেননি।দুপুরের খাবারের জোগাড় দেখতে বনমালী চৌধুরি নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে পা ফেললেন। নানারকমের মাছ-মাংস কেটে সাজিয়ে রাখা হয়েছে; সব কিছু ঠিকঠাক চলছে।

    ট্রি-হাউসে আবার চড়তে যাবেন বনমালী, দেখলেন সাহেবরা নেমে আসছেন। পাহাড়তলির মৌসরা গ্রামে এই অক্টোবর মাসে বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়েছে। সকাল নটা বাজছে এখন; কুয়াশা সরে যাচ্ছে। এই পাহাড়ের নিচের এলাকাতে মাঝে মাঝেই একরকমের বৃষ্টি আসে; লোকে একে "ছাগল-খেদা বৃষ্টি' বলে। ঠিক বৃষ্টিও বলা চলে না—চালনি থেকে যেভাবে চালের গুঁড়ো ঝরে পড়ে, ঠিক সেরকম। প্রমিত বাংলাতে একে "ইলশেগুঁড়ি' বৃষ্টিও বলে।আজও যখন কুয়াশা সরে যাচ্ছে, তখন সেই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নেমে এল। কেউ যেন বিশাল চালনিতে চালের গুঁড়ো চালতে শুরু করেছে! ইতিমধ্যে সূর্যও আকাশে অনেক দূর চড়ে এসেছে; রোদের আলোয় জলের কণাগুলো রুপোর গুঁড়োতে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

    বার্নার্ড সাহেব গিয়ে সুগরিজানের পাড়ের মজ মানে, কৃষ্ণ-শিরিষ গাছের ডাল একটা কেটে আনলেন। ডালটি ছেঁটে-কেটে কিছু একটা বানিয়ে ফেললেন। এমনিতেও শ্বেতাঙ্গ সাহেব—তায় এসব কর্মকাণ্ড; বাড়ির সবাই কৌতূহলে পাশে চলে এল—কী বা করছেন! সাহেব দুটো ডাল দু-দিকে পুঁতলেন; একটা ডাল মাটির সমান্তরালে প্রস্থে বসালেন। এর পরে নিচে লাকড়ি দিলেন।ধনিরাম ঠিকই ধরে ফেলল—এর পরে সাহেব ডফলা-পোতা টিলার সেই খরগোশের বস্তাটি চেয়ে বসবেন। ধনিরাম সেটি ঢেঁকিঘরে লুকিয়ে রেখেছিল। সেই অভিশপ্ত খরগোশগুলো এখন পুড়ে খাবেন; তার গন্ধ পুরো বড়োবাড়িতে ছেয়ে যাবে আর সেই মাংস সাহেবরা এখন মদের সঙ্গে খাবেন। সাহেবকে যারা দেবতাজ্ঞান করে, তারাও কি আর না-খেয়ে থাকবে? মৌজাদারের ওপরও রাগ চড়ে গেল ধনিরামের; রাগে সে কাঁপছিল। সাহেবের পা-চাটা লোকটি আর কই এর প্রতিবাদ করবেন?কী করে এখন ধনিরাম? সে দৌড়ে শান্তিপ্রিয়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল। তিনি তাঁতে বসে মাকু চালাচ্ছিলেন; সে গিয়ে তাঁর পা ছুঁল। মাকু, নরাজ সামলে-সুমলে রেখে শান্তিপ্রিয়া ধনিরামের কথাগুলো মন দিয়ে শুনলেন। ওকে বললেন খরগোশের বস্তাটা নিয়ে গিয়ে এক্কেবারে বাঁশবনে ফেলে আসতে; ওকে বুদ্ধি দিলেন রান্নাঘরে ঢুকে ওখানে এনে রাখা মাছ কিছু কেটে-বেছে নুন-হলুদ মেখে তৈরি রাখতে। ওদিকে সামনের উঠোনে হুলস্থুল লেগে গেছে। রাতে নিয়ে আসা খরগোশের বস্তাটি চাইছেন বার্নার্ড সাহেব। বার্নার্ড সাহেব যতই সেই বস্তা চেয়ে পাঠাচ্ছেন, ততই ক্রোধে অস্থির হচ্ছেন মৌজাদার বনমালী; ছোটোখাটো বিষয়েও তাঁর সমস্ত পরিশ্রম এখন অতলে যায়! ধনিরাম কেটে নুন-হলুদে তৈরি মাছগুলো একটা গামলাতে করে নিয়ে গিয়ে সাহেবকে দিল; মাছ নিয়ে যাওয়া দেখে মৌজাদারের ক্রোধ গিয়ে একেবারে মাথাতে চড়ল।ধনিরাম জানাল—রান্নাঘরের বারান্দাতে রাখা ছিল খরগোশের বস্তা, সেটি শেয়ালে টেনে নিয়ে গেছে। সাহেবরাও চুপ হয়ে গেলেন শুনে; ধনিরামের মিথ্যেটা বিশ্বাসযোগ্য শোনাল। বার্নার্ড সাহেব শলাতে মাছ গেঁথে সেগুলোই আগুনে সেঁকতে শুরু করলেন।কী করে কী হচ্ছে—তাকিয়ে দেখছিলেন শান্তিপ্রিয়া। রোজকার মতো মানুষটি কিছু না কিছু কাজ নিয়ে সেদিনও ব্যস্তই ছিলেন; আজ শান্তিপ্রিয়া ঠাকুরঘরের সাঁচিপাতের পুঁথিগুলো বের করে ঝেড়েঝুড়ে রোদে দিয়েছিলেন। পুঁথিগুলো শান্তিপ্রিয়াকে দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর শ্বশুরমশাই। মানের আক্রমণের সময় টিকতে না পেরে শ্বশুরমশাইয়ের ঠাকুরদাদা এই জঙ্গলঘেরা এলাকার বিশুসিঙা ঘন অরণ্যের মাঝখানে জনজাতি গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন; উজান অসম থেকে এসেছিল পরিবারটি। আসবার বেলা এই পুঁথিগুলো নিয়ে এসেছিলেন, আর এনেছিলেন হাতির দাঁতে তৈরি একজোড়া খড়ম—এগুলো বুঝি স্বয়ং গুরু শঙ্করদেব তাঁদের পূর্বপুরুষের হাতে দিয়েছিলেন। সেই থেকে এইসব মহামূল্যবান জিনিসে পরিবারটি কখনও যত্নে-শ্রদ্ধাতে ত্রুটি করেনি। আজও চৌধুরি পরিবার বিশ্বাস করে—এগুলো বুকে আগলে রাখার জন্যেই শত বিপদ-বিপর্যয়ের মধ্যেও কোনো বড়ো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই পরিবারটি টিকে আছে।

    বার্নার্ড সাহেব মাছ সেঁকে চলেছেন। এডুইন সাহেব ঠাকুরঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। শান্তিপ্রিয়া আজ হাতে বোনা সবুজ ছাঁদের মেখেলা-চাদর পরেছেন; সাদা চুল খোঁপা করে বেঁধে রেখেছেন। এডুইন সাহেবকে আগেও দেখেছেন শান্তিপ্রিয়া; মাথার টুপি খুলে সামান্য নুয়ে সাহেব শান্তিপ্রিয়াকে অভিবাদন জানালেন। শান্তিপ্রিয়াও জবাবে মাথা নোয়ালেন।সাহেবরা বড়োবাড়িতে দু-জন মাত্র মহিলার দেখা পেয়েছেন-- শান্তিপ্রিয়া আর ধনদা। অবশ্য মহিলা বলে এই দুই নারীকে ঢেকেঢুকে রাখতে হবে বলে কেউ ভাবে না!

    সাঁচিপাতের পুঁথিগুলো দেখতে চাইলেন এডুইন সাহেব; শান্তিপ্রিয়া স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন—স্নান না করে পুঁথিগুলোতে হাত দেওয়া যাবে না। বাধ্য ছেলের মতো সাহেব স্নান করতে গেলেন।বড়োবাড়িতে অতিথিদের জন্যে মৌজাদার পুবমুখো একটি ঘর তৈরি করেছেন; ঘরটি তৈরিতে সোনাপুরের "ঘোষ ব্রাদার্স'-এর অরবিন্দ ঘোষ অনেক সাহায্য করেছেন। কলকাতা থেকে জাহাজে করে পায়খানা তৈরির সামগ্রী এনে দিয়েছেন, সঙ্গে মিস্ত্রিও। নিজে উদ্যোগ নিয়ে এমন পায়খানা তৈরি করে দিয়েছেন যে, এতে চেন ধরে টানলেই জল বেরিয়ে আসে! মোড়া বা টুলে বসে পায়খানা করতে পারার মতো ব্যবস্থা দেখে মৌজাদার হতবাক হয়ে পড়েছিলেন; কী যে নতুন আদবকায়দা! সাহেব মানে সাহেবই; এদের কথাই আলাদা। এরা না এলে অসম দেশটি শ্মশানের মতো ছাড়াবাড়ি হয়ে পড়ে রইত! এমন সাহেব কি না তাঁর বাড়িতে এখন; বনমালী চৌধুরি নিজের কপালের কথা ভেবে ধন্য ধন্য করেই চলেছেন মনে মনে।কেউ জানে না, দিনে বেশ কবার তিনি ওই পায়খানাতে গিয়ে চেন টেনে পাশের বাক্সটি থেকে জল বেরিয়ে আসা দেখেছেন, দেখে পরম আনন্দ পেয়েছেন। বনমালী নিজেই দরজা খুলে এডুইন সাহেবকে এই বাথরুম-পায়খানা দেখিয়ে দিলেন। এডুইন সাহেব এমনভাবে ঢুকলেন যে, এত সব বিশাল কর্মকাণ্ড আর এমন কী—অতি সামান্য ঘটনা। নিজেকে নিয়েই বনমালী ক্ষণিক হাসলেন; এসব সাহেবেরা রোজ হাতের কাছে পেয়ে থাকেন। তবুও সাহেবের মুখ থেকে একবারের জন্যে হলেও মৌজাদার দুটি প্রশংসাবাক্য শুনতে চাইছিলেন।

    এডুইন সাহেব স্নান সেরে শান্তিপ্রিয়ার কাছে গেলেন। শান্তিপ্রিয়াকে তখন একঝাঁক পায়রা ঘিরে ধরেছিল; আপনমনে তিনি পায়রাকে চাল খাওয়াচ্ছিলেন। অন্যদিনের মতো কয়েকটি ছাগল, হাঁস কতকগুলো, দু-চারটি শালিক, বুলবুলি কিছু, ঘুঘু কয়েকটা এসে মহিলাটির আশপাশে ঘুরঘুর করছিল। তিনিও হাতের ধুচনি থেকে চাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। শান্তিপ্রিয়ার এই পাখিদের চাল দেবার কাজটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলেন এডুইন সাহেব। তারপরে শান্তিপ্রিয়ার কাছে যেতে গেলেই পায়রা, ঘুঘু, শালিক—সবগুলো উড়াল দিল।মহিলা সাহেবের দিকে ফিরে তাকালেন; মানুষটি স্নান করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এসেছেন। শান্তিপ্রিয়া করলেন কী—ঠাকুরঘরের বারান্দাতে গামছাতে বেঁধে রাখা পুঁথিগুলো দেখবার জন্যে সাহেবকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। হাঁটু মুড়ে সাহেব আগে পুঁথিগুলোকে একটা প্রণাম করলেন; পরম কৌতূহলে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে যাবেন কি—মুখ ঝাঁকিয়ে উঠলেন শান্তিপ্রিয়া! হাত গুটিয়ে নিলেন সাহেব।একটি বাঁশের ধারাতে সাহেবকে বসালেন শান্তিপ্রিয়া; আর সুললিত কণ্ঠে একটি পুঁথি এনে এক পৃষ্ঠা, দুই পৃষ্ঠা করে পড়তে শুরু করলেন। দুপুর অবধি সাহেব কেবল শান্তিপ্রিয়ার এই পুঁথিপড়া শুনলেনই শুধু নন—শুনলেন সেই হেলে পড়া রোদের আলোয় শ্বশুর যে বাঘটি দেখেছিলেন, শুনলেন এই কাহিনিও; জলের উৎসটির কথা, সেই উৎস থেকে বেরিয়ে আসা সুগরিজানের গল্প, ঠাকুরঘরের সেই হাতিদাঁতের খড়মটির কথা, আর শুনলেন গুরু শঙ্করদেবের পরিবারকে দেওয়া এই পুঁথিগুলোর পেছনকার কাহিনি। দুপুরের খাবারের ডাক পড়লে পরেই কেবল সাহেব ঠাকুরঘরের বারান্দায় শান্তিপ্রিয়ার বিছিয়ে দেওয়া ধারার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

    দুপুরের দিকে বড়োবাড়ির সামনে তিনটি ঘোড়া, তিনটি মহিষের গাড়ি তৈরি হল। গদাধরকে নিয়ে ধনিরাম বেরিয়ে এল; সবাই নাচনডুবি যাবার জন্যে তৈরি। মাংরা সরদারের লোকেরা ঘোড়া তিনটে সমঝে নিল। কাতিয়া আর ধনিরাম হাতির পিঠে হাড়িমোনা চাপাল; সাহেব তিনজন হাতির পিঠে বসলেন।ভিক্টর সাহেবের হাতে এই এলাকার মানচিত্রের রোল; এবারে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে অঞ্চলটির জরিপ হবে। অঞ্চলটি চা-চাষের জন্যে খুবই অনুকূল। ঠিক পাহাড়ি এলাকা না-হলেও আকারে-প্রকারে এলাকার চরিত্র অনেকটাই পাহাড়ি; এখানকার নদীগুলো দেখলেই বোঝা যায়। সকালে যদি বৃষ্টিতে নদীগুলো উপচে পড়ে, দুপুর হতে না-হতে পায়ের পাতা সমান জল। সেই জলে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কালো-রুপোলি মাছের ঝাঁক, সাদা-হলদেটে পাথরের নুড়ি, সাদা বালিগুলো আবার বেরিয়ে পড়ে।গরমের প্রকোপ এখন কম, গরম থাকে জুলাই মাসে। গরম মানে—এক বা দু-দিন যদি রোদ থাকে, তৃতীয় দিন বৃষ্টি আসবেই আসবে! সোনাপুর থেকেই এলাকাটি ভুটান পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে; মৌসরা গ্রাম থেকে উত্তর দিকে এই চড়াইটি বেশি স্পষ্ট হয়ে পড়ে। বুনো কমলালেবুর গাছগুলো দেখলেও বোঝা যায়—এখানে জল থাকে না। যত উত্তরে চড়া যায়, নদীগুলোর স্রোতের দ্রুতি তত বেড়ে যায়; আর ওই যে বিশেষ গাছের ঝোপ—সেসবও এখানে বেশি বেশি চোখে পড়ে।

    সবাই এলেন; এলেন না এডুইন সাহেব। সাহেব তখনও স্নান করে ঠাকুরঘরের বারান্দাতে বসে আছেন। মণিকূট ১ থেকে শান্তিপ্রিয়া যে হাতিদাঁতের খড়ম বের করে এনেছিলেন—সেটি খুঁটিয়ে দেখছেন। ভোগের বাটি—যাকে ভোগজরা বলে, সেটিও দেখছেন। তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে আসা খাতাতে কীসব লিখে রাখছেন। মৌজাদার শান্তিপ্রিয়াকে দেখছিলেন; এক্কেবারে পেকে সাদা চুলগুলো মেলা। ঠাকুরঘরে ঢোকার আগে তিনি রোজ চুল ভিজিয়ে স্নান করেন, আজও করেছেন। আধা-শুকনো আধা-ভেজা চুল, হাতে বোনা মেখেলা-চাদরে মোড়া রুগ্ন শরীর আর ফাঁকা কপাল। বহুদিন হল শান্তিপ্রিয়া কপালে ফোঁটা, সিঁদুর কিছুই পরেন না; পুরো শরীরে গয়নার চিহ্নমাত্র নেই। মানুষটিকে দেখে বনমালীর শরীরের ধমনি কেঁপে উঠল; রোজকার মতো বিরক্তিতে মন কেমন করে উঠল। এটা মরেও না! কে বলে ওর মাথার ঠিক নেই বলে? মাথার ঠিক না থাকলে এই লন্ডনের আইসিএস পাস কমিশনার সাহেব ওর সঙ্গে কথা বলতেন? সব ওঁর ভণ্ডামি! অত্যন্ত ধূর্ত মানুষ এই মহিলাটি!তাকাবেন না তাকাবেন না বলেও তাঁর দিকে তাকালেন বনমালী। নিজের হাতে বোনা একখানা এড়ি চাদর দিচ্ছেন শান্তিপ্রিয়া; মুখে মৃদু হাসি। লোকে এমন করে হাসে বুঝি? ঠাকুরঘর, পুঁথি, নাম-কীর্তন করতে করতে কি মানুষটি এইসবেরই অংশ হয়ে পড়ল? তিনি ভোগজরা বাটির ভেতর থেকে বালির পুঁটলি বের করে বালি, তেঁতুল, উনুনের ছাই দিয়ে ঘষা-মাজা করে ধুয়ে আবার বাটিতে বালি ভরে রাখেন। মালতী বলেছে—শান্তিপ্রিয়া স্বপ্নে সেই বাঘটিকে দেখেন; বাঘের পিঠে চড়ে একজন মানুষ ওঁর কাছে আসেন, এসে বড়োবাড়িতে ঘোরাফেরা করেন। একদিন বুঝি হাতিদাঁতের খড়ম পরে এক দিব্যকান্তি পুরুষ শান্তিপ্রিয়ার কাছে এসেছিলেন; এসে ওর দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তারপরে এই ঠাকুরঘরে এসে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যান। মহিলাটিকে দেখলেই বনমালীর এসব কথা মনে পড়ে।

    শান্তিপ্রিয়া প্রতিজন সাহেবকে একটা করে এড়ি চাদর দিলেন। তিন মুখার্জি, মাংরা সরদারের বাহিনী—সবাইকে দিয়েছেন একটা করে গামছা। গামছাগুলো দেবার সময় মালতী যেচে এসে তাঁকে সাহায্য করল। হঠাৎ বনমালী চৌধুরির মনে হল—ভিক্টর সাহেব যেন পাটের রিহা-মেখেলা পরা, গা ভরে গয়না পরা মালতীর দিকে একটু বেশি করেই তাকাচ্ছেন।একবার হাতের শরাই২ থেকে শান্তিপ্রিয়াকে গামছা এগিয়ে দিতে গিয়ে গায়ের ওড়নাটা খসে পড়ল। কপালে গাঢ় সিঁদুরের ফোঁটা পরা ওকে একপলক দেখবার জন্যে সমবেত সবাই আর সব কিছু ভুলে ওর দিকেই তাকিয়ে রইল। মৌজাদারও যেন অচেনা মানুষের মতো আজ ওকে প্রথম দেখছেন—এভাবে তাকিয়ে রইলেন। ওর সেই ক্ষীণকটি দেহ যে কখন এভাবে ভরে উঠল, তিনি খেয়ালই করেননি। কখন যে ওর রোদে পোড়া গায়ের রং এত ধবধবে, নজরকাড়া ফর্সা হল! কোমল পাটের পোশাক ওর শরীরের খাঁজগুলোকে একেবারেই লুকোতে পারেনি—দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে ঠোঁট চেপে একটা হাসি দিল। কার হাসির জবাবে বা সে এই হাসি দিল? পথে-ঘাটে এমনি ঘুরে বেড়ানো বাঁধনহীন গ্রাম্য মেয়ে ছিল সে; কই বা সে এভাবে শরীর দেখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল! এমন কথা কোনোদিনই ভেবে দেখেননি বনমালী; আজ ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে। সেই স্বভাব সে আর ছাড়বে কই? ভাবতে ভাবতে বনমালীর শরীর যেন ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। কেন বা সে এই আধাবয়সী মানুষটির কাছে যেচে এসে পড়েছিল? আড়ালের কথাটি বা কী?

    সাহেবেরা ওর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন। মালতীও যখন মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে হ্যান্ডশেক করছে—দেখে বনমালী চৌধুরির রাগটা আরও দ্বিগুণ হচ্ছে। কতক্ষণ ধরে আছেন এই সাহেবেরা? খুব বেশি পাঁচ ঘণ্টা। করবার মধ্যে করলেনটা কী—হাতি-মহলের কর দ্বিগুণ বাড়িয়ে গেলেন! নতুন করের একখানা কাগজও সিলমোহর মেরে দিয়ে গেছেন; সেটি না দেখলেও বুঝে গেছেন, এতে আছেটা কী। মৌজা চালানো এখন সত্যি কঠিন হবে।বাবার দিনে মাটির খাজনা দিতে রায়তেরা আসত ভারে ভারে উপহার নিয়ে; কত কী যে জমা হয়ে যেত, এর বহু কিছুই পচে নষ্ট হত। বনমালীর মনে আছে—বাবা আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন, সমস্ত রায়তকে খালি ভারে কিছু না কিছু দিয়ে পাঠাতে হবে। ভারের জিনিসগুলো গোটাতে বা পালটে তাদের ভারে কিছু তুলে দিতে তিন-চারজন মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ত। খাজনা না-দেওয়া মানুষজনও ছিল কেউ কেউ। কিছু প্রজা তো আফিমের নেশা না করলেও ভাঙ খেতই; এই সব নেশাখোরদের রোদে ঘণ্টাখানেক দাঁড় করিয়ে বাবা পাঠিয়ে দিতেন। কিছুই না আনলেও বড়োবাড়ি থেকে কিছু না কিছু এরা নিয়েই ফিরত। আজকের এই সব ভারের উপহার তো বাদই, নিয়মিত খাজনা দেবার লোকই কমে এসেছে। কেউ জানে না—মাটির নিচে গর্ভঘরের সিন্দুক প্রায় খালি! বিলাতি মাটিতে তৈরি লোহার পাতের ঢাকনা আছে ওই সিন্দুকে। একটি মহিলাই জানে—দিনে দিনে কীভাবে এই সিন্দুক খালি হয়ে আসছে। সিন্দুকের চাবিও বাবা ওর হাতেই দিয়ে গিয়েছিলেন। তুলারামের কন্যাকে বড়োবাড়িতে তোলবার সময় তিনি ছোটো সিন্দুকে হাত দিয়েছিলেন; সেই সিন্দুকের সোনা-গয়নাও কমে এসেছে। বাবার শ্রাদ্ধের পরে সেই সিন্দুকের চাবি শান্তিপ্রিয়া বনমালী চৌধুরির হাতে ফেরত দিয়েছিলেন। সেদিন থেকে বহুবার এই সিন্দুকের তালা খোলা হয়েছে। এবারেই কি কম টাকাপয়সা গেল? ট্রি-হাউস তৈরিতে কি কম টাকা জলে গেল? কে থাকবে ওখানে?ঘোষবাবুর মুখখানা বড়ো মিষ্টি; আসতে-যেতে মৌজাদারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করবেই। কথা বলবে যখন—হাতে হাত কচলে কচলে বলবে, নোয়ানো মাথা যেন ওপরে তুলবেই না! পয়সা কটা নেবার বেলা কিন্তু নিংড়ে নিংড়ে নেবে। আর জামাল রুটিওয়ালা? তিনিই জমি-বাড়ি দিয়ে বসতে দিলেন—তাঁকেই পয়সার জন্যে তাগাদা দিতে থাকে; সেও কি এই ক-দিনে কম টাকা নিল?মৌজাদার ঠিক ধরতে পেরেছেন—ঘোষবাবু, জামাল রুটিওয়ালার সিন্দুকে স্তূপে স্তূপে টাকা জমা পড়েছে। মনটা বনমালীর তেতো হয়ে এল। সবাই বেরিয়ে গেলেন। অচেনা লোকগুলো যাবার পরে বাড়ির লোকজন, জীবজন্তু—সবাই বেরিয়ে এল। ছাগলগুলো ওই পাকা চুলের মহিলাটির পাশ চাপল; পায়রাগুলোও কাছে চলে এল। কী আছে এই আধপাগল মানুষটির মধ্যে? এডুইন সাহেব থেকে এই ঘুঘু, ছাগল অবধি সবাই এত গুরুত্ব দেয়? যে কমিশনার সাহেবকে সবাই ভয় করে—সেই সাহেব এসে এই পাগলি মহিলাটির পাশে ধারা বিছিয়ে বসে কী এত কথা বলে গেলেন!ওকে রাতে স্বপ্নে বাঘে এসে দেখা দেয়, হাতির পিঠে চড়ে দিব্যপুরুষে দেখা দেন! কী আছে এই মহিলাটির? কেন তিনি তাঁর সামনে মাথা তুলে কথা বলতে পারেন না? সাদা ফর্সা মহিলাটি, খালি হয়ে আসা সিন্দুক, মালতীর এই ঠোঁট-চাপা হাসি, সাহেবদের থেকে সই করা খাজনাপাতির কাগজ—সব কিছু যেন তাঁর মাথার ওপরে চড়ে বসল।

    মালতী ঘোমটাটা ভালো করে সামলে-সুমলে বাড়ির বাইরের দিকে ওর ঘরে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছিল। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে সে মানুষটির দিকে তাকাল। ফর্সা মানুষটি রাগে লাল হয়ে পড়েছেন; লাল সুতোগুলো চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল। চেনে সে—এই কটি লাল সুতোকে চেনে, বুঝতে পারে এর অর্থ কী। মানুষটির ভয়ানক রাগ চড়েছে; এখনই এই লাল সুতোর আঁশগুলো আগুনের শিখার মতো জ্বলে উঠবে, সামনে যা পাবে—তাকেই ছারখার করে দেবে!মালতী প্রায় দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে এগোল; ওর মনে হচ্ছিল—এই আগুন ওকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। কী বা ভুল হয়ে গেল? শান্তিপ্রিয়া ধনদাকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছিলেন ওকে সেজেগুঁজে তৈরি থাকতে। কেতকী ফুলের গোছা গোছা পাপড়িতে সুগন্ধি করে রাখা পাটের শাড়িটা পরবার ওর বড়ো ইচ্ছে হচ্ছিল; ইচ্ছে হচ্ছিল অলঙ্কারগুলো গায়ে পরবার। যেচে আসা মেয়ে সে; কোথাও যেতে পারে না, বাড়ির কোনো কাজকর্মে তার ডাক পড়ে না। আজ শান্তিপ্রিয়া সাহেবদের গামছা দেবার কাজে সাহায্য করে দিতে সেজেগুঁজে আসতে বলেছিলেন বলে প্রাণ ভরে সেজেছিল সে। বহুদিন পরে আজ সে সমাজে বেরিয়ে যাবার সুযোগ পেয়েছিল। থরথর করে কাঁপছিল মালতী। ওই এদিকেই আসছেন মৌজাদার; এসে দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি দিনে-দুপুরে এদিকে আসেন না; রাতে এসে ভোররাতে নিজের ঘরে চলে যান। সে পালঙ্কের খুঁটোয় ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ওর হাতে একটা বলিষ্ঠ হাতের চাপ অনুভব করল, ""আমি না বললে আজ থেকে আর কোথাও কখনও বাইরে যাওয়া চলবে না।'' দিনের আলোতে এই ভরদুপুরে ওর গায়ের কাপড় খুলে ফেলছিল হাতটি। সে মানুষটির চোখের দিকে তাকাল—লাল সুতোগুলো সেই কতক্ষণেই মিলিয়ে গেছে! ওর শরীরে এখন শুধুই কয়েকপদ অলঙ্কার; দিনের আলোতে সে যেন এখনই শিউলিফুলের মতো মাটিতে ঝরে পড়বে। পালঙ্কে ওঠবার আগে কেন জানি ওর চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ল; সে নিজেরই চোখজোড়া ঢেকে ফেলল।এত আলো, বাইরে মানুষজনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে—ধনদা কাউকে কিছু বলছে, একটি শিশু চেঁচিয়ে কাঁদছে, বন্ধ ঘরের সামনে দিয়ে কেউ পেরিয়ে গেল, কেউ ওকে ডেকেও গেল। ঘরের সিলিঙে একজোড়া সাদা পায়রাতে বক-বকম করে উঠল।

    বনমালী চৌধুরি যখন মালতীর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন—তখন তিনি একেবারে শান্ত; মনের অস্থিরতা দূর হয়েছে। ধীরে ধীরে তিনি মৌজার অফিসের দিকে পা বাড়ালেন। সাহেবের দেওয়া কাগজপত্রগুলো সেখানে রেখে এসেছেন—সামলে-সুমলে রাখতে হবে। বেশ কজন রায়ত এসেও বসে আছে; দেখলেই বোঝা যায়—খাজনা মাফ চাইতে এসেছে। বড়োফান্দি সহ বেশ কজন মাহুত-ফান্দিও এসে জুটেছে; হাতি-ডিপোর কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। একশো একটা কাজে ডুবে গেলেন বনমালী চৌধুরি।

    সে যে কাপড় হাতের কাছে পেল, সেটিই শরীরে প্যাঁচিয়ে বিছানাতে পড়ে রইল। দিনের আলোয় আজকের ব্যাপারটি একেবারেই আলাদা ছিল; মানুষটির গায়ে যেন আজ জমাট বাঁধা ক্রোধ ছিল—ছিল আক্রোশ! সমস্ত ক্রোধ ওর গায়ে ঢেলে দিতে এসেছিলেন যেন। সত্যিই মানুষটি তাঁর সব কিছু ওর শরীরের ভেতরে ঢেলে দিয়ে চলে গেলেন। এমনটা তো কোনোদিনই করেননি; আদর-স্নেহ নয়—এক দলা বিষ যেন মানুষটি ওর শরীরের ভেতরে ভরিয়ে রেখে গেলেন!

    ওর শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলের ধারাটি আবার সজীব হয়ে এল। ওর গাঁটে গাঁটে ব্যথা; ও কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সে সত্যিই কুঁকিয়ে উঠল; খুব বেশি জ্বরে কাতর হলে যেমন মানুষে কোঁকায়—সেও কাতরে উঠল।


    টিকাঃ
    ১। মণিকূটঃ ঠাকুরের আসন। কিন্তু সেখানে মূর্তি বা প্রতিমা থাকে না। থাকে শঙ্কর-মাধবগুরুর কীর্তন, নামঘোষার মতো পবিত্র গ্রন্থ বা অন্যান্য স্মারক। নামঘর বা গোঁসাই-ঘরের ভেতরে একটি ছোটো গৃহাকারের নির্মাণ। সেখানে দীপ-ধূপ জ্বালানো হয়।
    ২। শরাইঃ দেবতাকে নৈবেদ্য দেবার জন্যে বা অতিথিকে দেবার উপহার রাখার জন্যে, কখনও বা উপহার দেবার জন্যেই ব্যবহৃত কাঁশা বা পেতলে তৈরি এক প্রকার পাত্র।




    দেখে পায় ডর লো...


    সাহেবদের ননৈ নদী পার করিয়ে দিল ধনিরাম। নদীতে এখন জল খুবই কম। মাংরা সরদার লিক ধরে ধরে ঘোড়া পার করিয়ে নিল; মহিষের গাড়িও পেরিয়ে গেল। নদীর এপাড়ে নাচনডুবি থেকে হাতি আসবে। নদীর এপাড়ে এসে ধনিরাম গদাধর আর কাতিয়াকে নদীর জলে খেলতে পাঠিয়ে নিজে একটা পাথরে গিয়ে বসল।

    রোদ যাই-যাই করছে; আজ আর বড়োবাড়ি ফিরে যাওয়া যাবে না। নদীর এপারে কুনটাং বাজার। বিহারি ব্যবসায়ীরা এই বাজারের চেহারাই বদলে দিয়েছে; নাচনডুবি বাগানের জন্যেই এই বাজার এত দপদপিয়ে বেড়ে চলেছে। এমন বড়ো বাগানের এত মানুষের কত কী প্রয়োজন; বাগানের পুরোনো হাটে পেরে উঠছিল না। বিহারি ব্যবসায়ীর পরিবারও ভালো টাকাপয়সা করছে; এদের প্রায় বিশ-পঁচিশটা ঘোড়া আছে। পিঠে মালপত্র নিয়ে বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়ানো "বিহারি ঘোড়া'-র সারি মানুষের কাছে বড়ো কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।

    ধনিরাম গদাধরকে কাতিয়ার হাতে সমঝে দিয়ে নিজে নদীপাড়ের একটি গাছের নিচে বিশ্রাম করছিল; সেই ফাঁকে সামান্য জলখাবারও সেরে নিচ্ছিল। কাতিয়া সেই পালা অনেক আগেই সম্পন্ন করেছে। আজ রাতে মৌজার সেই খাজনা তোলার বাড়িতে থেকে যেতে হবে; কাতিয়া যখন আছে—খাবার-দাবারের জোগাড়ও ভালোই হবে।এই এলাকার প্রায় সব কটা বাজারেই একখানা খাজনা তোলা ঘর আছে; মূল মৌজার অফিসে যাতায়াত করা লোকের পক্ষে বেশ অসুবিধের। এভাবে বাড়ির কাছে খাজনা দিতে পারলে সবার সুবিধে। ধনিরাম নিজেও মুহুরিকে সঙ্গে নিয়ে এমন খাজনা তোলা বাড়িতে রাতে থেকে খাজনা সংগ্রহ করেছে। মৌজাদারের লোক এসেছে খবর পেলেই গাওঁবুড়া১ এসে খবর-টবর নিতে শুরু করে; কাতিয়ার সঙ্গে ইতিমধ্যে হয়তো তাঁর দেখা হয়েই গেছে। ধনিরামের মনটা আজ ভালো না; গতকাল গ্রাম থেকে ভাইপো এসেছিল। খুব ছোটো থাকতে ধনিরাম মৌজাদারের বাড়ি এসে আজ এত বড়ো মাহুত হয়েছে। ওর কাকাই ওকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। বলতে গেলে বাড়ির অবস্থা বেশ ভালো—সচ্ছলই ছিল; মা-বাবা, খুড়ো-জ্যাঠা, দু-জন দাদা, এক দিদি, একটি ছোটো ভাই—পুরো পাড়াতেই এদেরই বংশের আত্মীয়-কুটুম্বের বাস। খেত-খামার তো ছিলই, মূল উপার্জন ছিল মুগার খামার; অনেকখানি জমি জুড়ে সেই মুগার খামার। সেই খামারের আয়েই পরিবারটির চলে যেত। সামান্য এগোলেই একখানা বিল; রাতে সেই বিলে বাঁশে তৈরি চাঁই একটি ফেলে রাখলেই, সকালে বিচিত্র মাছে সেই চাঁই ভরে ওঠে। কে বা এত মাছ খেয়ে মরতে যাবে! ধান আছেই, কলাই আর ডাল-শস্যের খেতও ভালো হয়। পাশের ঝোপঝাড়ে ঢুকলেই শুকনো মরা ডাল-পালার অভাব নেই; শীতকালের জন্যে আগে থাকতে একটি মরা গাছ দেখে রাখা হয়। গোলাঘরের সামনে শুকনো লাকড়ি ভরে পড়ে থাকে; পুরো শীতকাল জুড়ে উঠোনের একপাশে আগুন জ্বলতেই থাকে। কেনার মধ্যে শুধুই নুন; তেলও জুটে যায় বাড়ির শস্য থেকে। সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে শুধু এই ধনিরাম আর ওর মেজো খুড়ো। মেজো খুড়োকে নিয়ে এসেছিলেন মৌজাদার; আর সেই খুড়োর মুখে বড়োবাড়ির কথা, হাতির কথা শুনে শুনে ধনিরাম নিজে এসে হাজির হয়েছিল। মৌজাদারের মাটিতে বাড়ি করে, বিয়ে-থা করে সে এখানেই থেকে গেল। এখন ধনিরামের মন গদাধর আর এই বড়োবাড়িতে শেকড় ছড়িয়ে ফেলেছে; বিয়ে-শ্রাদ্ধে কখনও বাড়িতে যায়, কখনও যেতেই পারে না।বিশেষ করে মায়ের মৃত্যুর পরে বাবা যখন আরও এক মহিলাকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এলেন, তারপরে আর শেষ টানটাও ফুরিয়ে গেল। ধনিরামের ছেলেমেয়েরা তো বলতে গেলে জানেই না যে, বাবার আরও একখানা বাড়ি আছে!

    পথের এত বাধাবিঘ্ন ঠেলে ধনিরামের সন্ধানে ভাইপোটি এমনিই আসেনি। সেই পরিবারের সবাই বড়ো অভাবে দিনকাল কাটাচ্ছে এখন। শ্বেত সাহেবদের চাপানো করের বোঝা সবাইকে আখের মতো নিংড়ে নিচ্ছে! ধনিরাম যদি কিছু টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য না করে, তবে গ্রামের বহু মানুষকে জমি-বাড়ি ছেড়ে পাহাড়ে-জঙ্গলে পালিয়ে যেতে হবে।রায়তের দুর্দশা দেখেছে ধনিরাম; তবুও নিজেরই পরিবারের এমন দশা হবে, সে ভাবেনি। আসলে মৌজাদারের বড়োবাড়ির ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকে ও অভাব-দারিদ্র্যের কথা ভুলেই গিয়েছিল। এমনিতে মাহুতের মাইনে বলে মাসে মাসে মৌজাদার ওকে যে কিছু রুপোর মোহর দিয়ে থাকেন—সেসব কিছু জমা হয়েছে। যেতে হবে একবার; হাতি-ডিপোর কাজ শুরু হলে আর বেরোনো যাবে না।

    হাতিকে স্নান করিয়ে কাতিয়া এল ধনিরামের কাছে। বড়ো আনন্দে সে সংবাদ দিল যে, একটি মৌচাক পেকে উঠেছে। ধনিরামের সত্যিই রাগ চড়ে গেল; এর প্রাণটি আছে পেটের ভেতর! সবসময় জিহ্বা লকলক করতে থাকে, ওর থলেতে কিছু না কিছু খাবার ভরানোই থাকে। আজও থলে ভরা চালতা আছেই; একটা সে খোসা ছাড়িয়ে কেটেছেই, এক টুকরো ধনিরামকেও দিয়েছে। পরম বিতৃষ্ণায় ধনিরাম সেটি ছুঁড়ে ফেলে দিল। মৌজাদার প্রভুকে বাড়ি যাবার কথাটা বলতেই হবে; পারলে সেই মৌজার মৌজাদারের জন্যে একটা চিঠিও লিখিয়ে নিয়ে যেতে হবে—সামান্য হলেও যদি খাজনা মাফ করানো যায়।সন্ধেবেলা কুনটাং বাজারের গাঁওবুড়া এলেন; বিহারি ব্যবসায়ী পরিবারের রামপ্রসাদ বুড়োও এলেন সঙ্গে। গাঁওবুড়ার নিয়ে আসা পায়রার মাংস রান্না করল কাতিয়া; মদের কলসেরও জোগাড় হল। কাতিয়ার মহা উৎসাহ! রামপ্রসাদ গামছাতে বেঁধে বাড়িতে রান্না করা কিছু রুটি-সবজিও নিয়ে এসেছেন। ধনিরামের এসবে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না; তাড়াতাড়ি বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। কাল খুব সকাল-সকাল মৌসরা রওনা দিতে হবে।

    বড়োবাড়িতে পৌঁছেই ধনিরাম গদাধরকে খাইয়ে-দাইয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বাঁশের মাচানে গা এলিয়ে দিল। পুরো মনটা বিস্বাদ ঠেকছে; ডফলা-পোতা টিলার খরগোশগুলোকে মেরে বড়োবাড়িতে নিয়ে আসতেই গা-টা গুলিয়ে যাচ্ছিল—কিছু না কিছু একটা হচ্ছেই! এই বাজে সংবাদটা তো পেয়েই গেল; আর কী বা হয়!সন্ধ্যাবেলা সমস্ত সমস্যার কথা গিয়ে মৌজাদারকে বলল ধনিরাম। ওর গ্রামের মৌজাদারকে একটা কাগজ লিখে দেবার কথাও বলল; জবাবে মৌজাদার যা বললেন—ধনিরাম অবাক হয়ে গেল। মৌজাদার লিখে দিলেও লাভ কিছুই হবে না; শ্বেত সাহেবেরা যা খাজনা ধরে দিয়েছেন, তা দিতেই হবে। কিছু টাকাপয়সা ধারে চাইতে মৌজাদার জানালেন—তাঁর নিজের অবস্থাও আজকাল ভালো যাচ্ছে না; নিজের গাঁটের ধন খরচা করে এই মৌজা কীভাবে আর চালাবেন, নিজেও বুঝতে পারছেন না।ধনিরাম বনমালী চৌধুরির বড়ো পুরোনো বিশ্বাসী মানুষ; কারও সামনে যা বলা যায় না—এই সহজ-সরল মানুষটির সামনে বলবার নয় এমন সব দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠার কথা যেন এই সহজ-সরল মানুষটির সামনে আপনিই বেরিয়ে এল। আশপাশে আর কেউ নেই। আরামকেদারাতে বনমালী চৌধুরি আর পায়ের কাছে মেঝেতে চ্যাপ্টা লেগে বসে আছে ধনিরাম। কেউ একজন এসে গোল চিমনির বাতিটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে; আলো ভালো হয়নি। কেরোসিনটাই নোংরা—ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ল্যাম্পটা নোংরা হয়ে গেছে। বনমালী চৌধুরি বাড়ির ব্যয় কমাতেই দামি "ভিক্টোরিয়া' কেরোসিনের বদলে "সুকুর' কেরোসিন আনতে বলে দিয়েছেন।বড়োবাড়িতে মাসের কেরোসিন দিয়ে যান সোনাপুরের ঘোষবাবু। মাস দুয়েক ধরে "ভিক্টোরিয়া' কেরোসিনের বদলে "সুকুর' কেরোসিন আনতে বলা দেখে ঘোষবাবু নিজেও অবাক হয়েছিলেন; বনমালী চৌধুরিকে বলেছিলেন, ""যিনি সাহেবদের সঙ্গে ওঠবস করেন, তিনি "সুকুর' কেরোসিন কিনবেন—এটা কি মানাচ্ছে?'' "সুকুর' নামটির অর্থও তিনি বলে বুঝিয়েছিলেন; "সুকুর' হচ্ছে গান্ধির যন্ত্রের চক্রটি। ভালো হলে "ভিক্টোরিয়া', মন্দ হলে "ভারতীয়'। মৌজাদারের বাড়িতে "সুকুর' কেরোসিন মানায় না। ঘোষবাবুর মিষ্টি কথাতে তিনি ধরা দেননি। ধোঁয়া বেরোনো ল্যাম্পের আলোয় ধনিরাম আর মৌজাদারকে দুটি ছায়ার মতো দেখাচ্ছিল।

    মৌজাদারের গলার স্বরটি খানিক সরু—সবার চেনা অভ্যস্ত গমগমে গলা নয়, ""ধনিরাম, তোকে আমি গোটা কয়েক রুপোর মোহর দেব; পুরোটা আমার থেকে আশা করবি না।''

    মৌজাদারের পা ছুঁয়ে প্রণাম একটা করল ধনিরাম, ""হবে প্রভু, হবে।''

    ""তুই জলদি আসবি। এবারে কয়েকটা ভালো চারিল ধরতে হবে; তোর ওপরই আমার সব ভরসা।''
    হঠাৎ কী বা হল ধনিরামের; ধপ করে বলে ফেলল, ""প্রভু, কাটলে কাটবেন, মারলেও মারবেন—একটা কথা বলেই ফেলি!''
    কী বা বলে মানুষটি! বনমালী অল্প সচকিত হলেন।
    ""প্রভু, সেদিন সাহেবদের মেরে আনা খরগোশগুলো সীমার বাইরে নিয়ে গিয়ে আমি ফেলে দিয়েছি; বাঘে-শেয়ালে খায়নি।''
    ""বুঝলি ধনিরাম, রাজাকে অসন্তুষ্ট করে আমরা প্রজারা বাঁচতে পারব না। দেখলি না—আমি সাহেবদের পেছনে কতটা টাকা ঢাললাম?'' মৌজাদার সামান্য থামলেন।
    ""খরগোশগুলো তুই সাহেবদের দিলি না কেন?''
    ""ওগুলো ডফলা-পোতার খরগোশ; অভিশপ্ত জীব।''
    ""বুদ্ধিটা তোকে দিল কে? তোর তো মাথায় এত বুদ্ধি নেই!''
    ""শান্তিপ্রিয়া মা দিলেন, প্রভু।''
    বনমালী চুপ করে রইলেন।
    ""প্রভু, তিনি বড়ো পুণ্যময়ী দেবী।''

    বনমালী চৌধুরির হাতে কিছু রুপোর মোহর ছিল; কেউ দিয়ে গিয়েছিল। তারই দু-তিনটে পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেললেন। বিলাতি মাটিতে বাঁধা পাকা মেঝেতে পড়ে মুদ্রাগুলো ঠনঠন করে উঠল।
    ""তুলে নে!'' বনমালী চৌধুরির আগে বসে যাওয়া সেই চাপা কণ্ঠটি আর নেই—চিরপরিচিত গমগমে গলা আবার শোনা গেল।
    ""এত মোহর! এত তো আমার লাগবে না প্রভু!'' দেখে ধনিরাম ভয় পেয়ে গেল।
    ""বুঝলি, হাতির খালি পেটেও এক কলস জল থাকে।''
    রুপোর টাকা আর তামার পয়সাগুলো ছুঁতেই ভয় পাচ্ছিল ধনিরাম।
    ""তোল বলছি না! পয়সাগুলো তোল!'' কঠিন আদেশ।

    পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে পয়সা তোলা দেখে যেন বনমালী চৌধুরির স্নায়ুগুলো শান্ত হয়ে এল। আজ মালতীর ঘরে যাবেন বলে ভাবছিলেন তিনি; ধনদা এসে বলে গেছে—ওর বুঝি শরীর ভালো না, মাথা ঘোরাচ্ছে। এর মানে আরও একটা খরচা বাড়ল— বাইরে বের করা, অন্নপ্রাশন; না করলেও তো নয়, মৌজাদারের রক্ত বলে কথা!শান্তিপ্রিয়ার দিকের যমজ ছেলে দুটি মঙ্গলদৈর হাইস্কুলে পড়াশোনা করছে; কলেজে পড়াতে হবে, কলকাতা পাঠাতে হবে। বাড়ির বাইরে থাকে যে শাওনি—ওর ছেলে জনাথন সাহেবের মিশনে পড়ছে। ভুল হল কি কিছু? ভুলের পরে ভুল হয়েই যাচ্ছে? ধনিরামকে এভাবে এত মোহর দেওয়া ভুল হল; সাহেবদের পেছনে এতগুলো টাকা খরচা করা ভুল হল!এবারে বনমালী চৌধুরি খাজনা দেবার দিনের ঠিক রাখতে পারেননি; এবারেই শুধু নয়—আজ তিন মাস ধরে খাজনার টাকা গাড়িতে, বস্তায় ভরে নিয়ে গিয়ে মঙ্গলদৈতে জমা দিয়ে আসতে পারেননি। এমনিতে বছরে এক বার খাজনা জমা দিলেই হয়; কিন্তু কোনো মৌজাদারই বছরভর দেবার ধন জমা করে রাখেন না, মাসে মাসে জমা দিয়ে থাকেন। দিনে দিনে "ক্যাশ ইন হ্যান্ড', "হাতে জমা বাকি' বেড়েই চলেছে; খাজনার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে! ব্রিটিশ সরকারের কাছে বাবার আমলের চল্লিশ বিঘা জমি জামিন আছে। সব মৌজাদারেরই থাকে। তাঁরও আছে; বনমালী কাল খবর পেয়েছেন—সোনাপুর মৌজার শর্মা মৌজাদারের মৌজা নিলাম হবে, তাঁর পঁয়তাল্লিশ বিঘা জমি জামিনে বাজেয়াপ্ত হবে। এডুইন সাহেব বলে গেছেন—বনমালী ইচ্ছে করলেই সেই মৌজার ডাক দিতে পারেন; সরকারকে যে টাকা দিতে হবে, দিলেই হল।সাহেবকে তিনি বলেন কী করে যে, গর্ভ-সিন্দুক প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে! এই সিন্দুক ঠেসে ভরে রেখে গিয়েছিলেন বাবা; ছোটো সিন্দুকটাও গয়নাগাটিতে ভরে রেখে গিয়েছিলেন। মা এক পদ, দুই পদ করে গয়না গড়িয়েছিলেন; বাবা এগুলোর একটিতেও হাত দেননি। সবই তিনি যেমন ছিল, তেমনই রেখে গেছেন।বনমালী "বুলনি'-তে ১ পায়চারি করতে শুরু করলেন। কীসে হাত দেবেন—ফসলি মাটিতে? সিন্দুকের তলায় পড়ে থাকা মোহরে? ছোটো সিন্দুকে বাকি পড়ে থাকা অলঙ্কারে? তিনি খাজনা জমা দিতে পারেননি; ফলে বন্দোবস্ত অনুসারে খাজনার শতকরা তিরিশভাগের উপার্জনও হয়ে ওঠেনি।

    কেউ একজন বুলনিতে চলে এল; সঙ্গে এল ডিম-ময়দা দিয়ে তৈরি পাউরুটির গন্ধ। ঠিকই ধরেছেন তিনি—জামাল রুটিওয়ালা। ওর একটি ময়দা আর চিনির সরকারি পারমিট চাই; কমিশনার সাহেব ওর বাড়িতে চা-ভাত খেয়ে গেছেন। জামাল বনমালীকে কাকুতি-মিনতি করতে শুরু করল। বনমালী দেখলেন—এই সুযোগ ছাড়া যাবে না।

    ""দেখ জামাল, পারমিট তোমাকে আমি ঠিকই বের করে দেব।''

    জামাল চৌধুরি বনমালী চৌধুরির পাশের চেয়ারে ঘপ করে বসে গেল, ""আপনি করবেন বললে হবেই মালিক!''

    জামালের কানে গুঁজে রাখা আতরে ভেজানো তুলো; এর উগ্র গন্ধে বুলনি ছেয়ে গেছে! বাইরে গাছগুলোতে ফোটা কামিনী, কাঞ্চন, জুঁই ফুলের গন্ধও এর ভারে চাপা পড়ে গেছে।

    ""তুমি আমাকে দিন দুয়েকের জন্যে কিছু টাকা দাও; আমি কাল খাজনা জমা দিতে সদরে যাব। আমার কিছু টাকা কম পড়েছে; পারলে পারমিটের কাজ করেই ফিরব।''

    ""হবে মালিক, আমি আজ রাতেই টাকাগুলো দিয়ে যাব। আপনার কাছে থাকার মানে সিন্দুকে টাকা থাকা; কত লাগবে?''

    ""মুহুরিকে জিজ্ঞেস করতে হবে; তুমিই কথা বলে নাও।''

    বনমালী খেয়ালই করেননি সিঁড়িতে বসেছিল ধনিরাম। তিনি গর্জে উঠলেন, ""তুই কী করছিস এখানে? যা তো, মুহুরিকে বলগে—আমি ডাকছি।'' মুহুরি হরকান্ত বরা দৌড়ে এলেন।
    বনমালীর গলা কিছুটা কাঁপছিল, ""হরকান্ত, তুমি...'' "জামাল রুটিওয়ালা' বলতে গিয়ে খানিক থেমে গেলেন। আবার বললেন, ""জামালকে আমার "ক্যাশ ইন হ্যান্ড' হওয়া খাজনার হিসেবটা একটু বুঝিয়ে দেবে তো।''

    ""হবে প্রভু, আমি এখনই দিচ্ছি।''

    হাত দুটি পেছনে নিয়ে বনমালী দ্রুত নিজের বৈঠকখানার দিকে পা বাড়ালেন; দ্রুত পা চালাচ্ছেন। বোঝাই গেল—তিনি জামাল রুটিওয়ালা, ধনিরাম আর মুহুরির থেকে পালাতে চাইছিলেন।গিয়ে তিনি বিছানাতে পড়লেন; খুব ক্লান্ত লাগছে—যেন বহু দূরের পথ অনেক রোদে পা চালিয়ে এসেছেন! গলা শুকিয়ে গেছে, জিহ্বা জড়িয়ে ধরেছে; অথচ হাতের কাছের ঘটি থেকে জল একটু নিয়ে খাবার শক্তিও যেন তাঁর অবশিষ্ট নেই।

    সত্যিই তৃষ্ণার্ত হয়ে বনমালী চৌধুরি এই ভরসন্ধ্যাবেলা পালঙ্কে পড়ে রইলেন। তেমনই পড়ে থাকতে থাকতে তিনি শরীরে অনুভব করলেন আরও এক তৃষ্ণা। তুলারামের মেয়ে মালতী হচ্ছে "যেচে দেওয়া দই, কেউ বলে টক কেউ বলে খই'—উপযেচে ওর থেকে বিশ-বাইশ বছরের বড়ো আধাবয়সী মানুষটির কাছে এসেছিল। ও আসার আগের সময়টিতেও তাঁর শরীরের আজকের মতো অবস্থা হত। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে ঘরে আনা শাওনির ছেলের মা হওয়া শরীর আর তাঁকে টানতে পারছিল না। শাওনির সব কিছুই জ্যৈষ্ঠের খরায় শুকোনোর মতো শুকিয়ে গিয়েছিল। শান্তিপ্রিয়াকে বিয়ে করবার পরে প্রথম বছরে তিনি দুর্দান্ত হয়ে পড়েছিলেন; দেহে যেন কিছু ভর করেছিল! শাওনিকে বাড়ি ঢোকাতে বাবা যতই মানা করেছিলেন, ততই তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন; অবশেষে শাওনি এসেছিল, বাবা মারা গিয়েছিলেন। শান্তিপ্রিয়ার চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল, নিজের মনে বিড়বিড় করতে শুরু করেছিলেন। শাওনি ফেটে জ্যৈষ্ঠের চৌচির মাঠ হতে না হতেই উপযেচে আসা দই-মেয়েটির স্বাদ তিনি পেয়েছিলেন। আর শান্তিপ্রিয়া? আজ অনেকদিনের পর বনমালী চৌধুরির মনে পড়ল সেই দেহটিকে; বড়ো বেশি কাঁপত সে দেহ! তাঁকে আঁকড়ে ধরেছিল সেই দেহ, ছেড়ে দিতে চাইছিল না; হাত দিলেই কুমোরের মাটির মতো কোমল আর পিচ্ছিল হয়ে পড়েছিল সেই দেহ। সেই দেহটিকে মনে করে আজ তিনি ঘেমে উঠলেন। কেমন বা হয়ে গেল মানুষটি! কেন বা এমন হয়? তাঁর হাতে পড়ে উছল ঝরনার মতো দেহগুলো কেন জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদে ফেটে চৌচির এক-একটা হালের জমি হয়ে ওঠে? যেচে আসা মালতীর গায়েও এখন টক গন্ধ আসতে শুরু করেছে। উঠে তিনি দুয়ারটা বন্ধ করে দিলেন আর পালঙ্কে নিঃশব্দে পড়ে রইলেন। বাড়িভরা লোকের ভিড়ে নিজেকে বড়ো নিঃসঙ্গ বোধ হল; কেউ যেন নেই তাঁর। কারও কথা তাঁর শুনবার ইচ্ছে রইল না। মনে পড়ে গেল সেই মেঠো বরণের কোঁকড়া চুলের মেয়েটিকে; বিয়ের পরেও কিছুদিন সে কত যে কথা বলেছিল কলকল করে! এখন একেবারেই নীরব হয়ে পড়েছে; মালতী, শাওনির সঙ্গেও কথা বলেছে বলে মনেই পড়ে না।এই মেয়েটি কথা বলতে বলতে কখনও-বা দু-এক পদ গানও গাইত; সত্যি, বড়ো মধুর ছিল ওর কণ্ঠ। তাঁর কানে আজ এতদিন পরে স্পষ্ট করে বেজে উঠল সেই কিশোরীর হাততালি দিয়ে দিয়ে মাথা দুলিয়ে গাওয়া একটি গান...

    আই আই ঐ বুড়া কি
    এই গৌরীর বর লো।
    বিয়ার বেলা এয়োর মাঝে
    হৈল দিগম্বর লো।।
    উমার কেশ চামরছটা
    তামার শলা বুড়ার জটা
    তাই বেড়িয়া ফোঁপায় ফণী
    দেখে আসে জ্বর লো।
    বুড়ার দাড়ি শণের লুড়া
    ছারকপালে ছাইকপালে
    দেখে পায় ডর লো... ২


    স্পষ্ট মনে আছে। হাত তালি দিয়ে দিয়ে সে গাইছিল, ‘ এই গৌরীর বর লো’। গাইতে গাইতে মাথা দোলাচ্ছিল,আর টুকটুক করে তালি দিচ্ছিল হাতে।

    ধীরে ধীরে বনমালী চৌধুরির চোখে ঘুম নেমে এল।


    টিকাঃ
    ১। বুলনি—দুটি ঘরের মাঝে ছাদ দেওয়া ছোটো পথ।
    ২। মূল অসমিয়াতে গানটি ছিল—সর্বাঙ্গ সুন্দরী পার্বতী জিউ মোর/ কোনো অঙ্গে নাই খুঁত/ তাইক লাগিয়া দরা মাতি আনিছা।/ ক'র ইটো জংঘলূআ ভূত।/ নিদিও পার্বতীক জটীয়া শিবত/ একো মোর হোআ নাই টান।/ ন বছরীয়া কুমলীয়া জীউ মোর/হেঙার ভাঙি খোআ নাই ধান। শিবদুর্গার বিয়ে নিয়ে মেনকার আক্ষেপ নিয়ে প্রচলিত গান... বাংলা অনুবাদ করবার চাইতে আমরা "অন্নদামঙ্গল' থেকে প্রাসঙ্গিক গান তুলে দেওয়া সঙ্গত বলে মনে করলাম।



    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫ | বাঙালির লোকায়ত উৎসবঃ ঝুলনযাত্রা | ছাতিমবাগান | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৬
  • ধারাবাহিক | ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন।