এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫
    বাংলা অনুবাদ : সুশান্ত কর

    অলংকরণ: রমিত



    ডফলা পোতা টিলার সেই খরগোশগুলো


    হাতি-মহলের আয়োজন সম্পূর্ণ; পুজোও হয়ে গেছে। মাহুত, ফান্দি—সবাই বনে শিকারে যাবার জন্যে তৈরি। কমিশনার সাহেব এডুইন ব্লেকস্মিথ, ফরেস্টার বড়ো সাহেব ভিক্টর বুল এসে হাতি-মহল সরকারিভাবে উদ্বোধন করে যাবেন। এমং বুড়ো মুখে আগুন বেরোনো সেই দীর্ঘ ল্যাজের জন্তুটির ছবি দেয়ালে এঁকে ট্রি-হাউসের কাজও শেষ করে এনেছে।কলকাতা থেকে সার্ডিন মাছের ডিবে, মাখন, পনির, ডিবাতে ভরানো শূকরের মাংসও এসে গেছে; বিলাতি মদের বোতলের দায়িত্ব নিয়েছেন ঘোষবাবু। ম্যানচেস্টারে তৈরি তাঁবু আছেই; আর আছে সাহেবের কায়দা-কানুন বোঝা ধনিরাম। জামাল রুটিওয়ালার কেক-রুটির জোগাড়ও হয়ে আছে।

    ধনিরাম আর কাতিয়ার সঙ্গে গদাধরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে খারুপেটিয়ার ঘাটে; সাহেব সেখানে ফেরি থেকে নামবেন। মৌসরা থেকে খারুপেটিয়া ঘাটে যেতে পুরো এক দিন লেগে যায়, ফিরে আসতেও এক দিন। ফেরি এসে ঘাটে লাগবে বেলা বারোটায়; মৌসরা এসে পৌঁছাতে রাত নেমেই যাবে। পথে অনেক বিপদ; ডাকাত আছে—সাহেবকে অবশ্য ডাকাতে ধরবে না। বাঘ-ভালুক আছে; বনমালী চৌধুরি ভাবছেন সাহেবদের বলবেন, রাতে না আসতে। মঙ্গলদৈতে রাতে থেকে ভোরসকালে বেরিয়ে গেলে সন্ধ্যের আগে মৌসরা পৌঁছে যাওয়া যাবে।
    চিঁড়ে আর ভাজা চালের গুঁড়ো বেঁধে ধনিরাম একটু আলো ফুটতেই হাতির পিঠে চড়ে বসল। বাঘ যেখানে ঝরনাতে জল খেতে আসে—সেই জায়গাগুলো দিনে দিনে পার করে যেতে হবে; মাছ ধরবার জন্যে ভালুক যেখানে যেখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, সেই জায়গাগুলোও আলো থাকতে থাকতে পেরিয়ে যেতে হবে। রাতটা আবার খারুপেটিয়ার জাহাজঘাটে কাটাতে হবে। জাহাজঘাটে লাগবে দুপুর এগারো-বারোটা নাগাদ; সাহেবদের এনে মঙ্গলদৈতে সরকারি বাংলোতে রেখে আবার রাতভোরে মৌসরার জন্যে রওনা দিতে হবে। সাহেবেরা আবার কী বা লীলা দেখান! যাবার বেলা না-হয় নিজেদের মতেই গেল—ফেরার পথে আসতে হবে সাহেবদের ইচ্ছেমতো। চিঁড়ে, চালের গুঁড়ো, চাল, শাকসবজি, লাকড়ি, বাসন—সঙ্গে কিছু কম জিনিসপত্র বইতে হবে? গতকাল বিকেল থেকে এক মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে ধনদা এইসব জোগাড়যন্তর করেই যাচ্ছে। ধনিরাম কোনো কাজ শেষ মুহূর্তের জন্যে ফেলে রাখে না; সমস্ত কাজ সময়ের আগে করে রাখবে, পরে করবে বলে ফেলে রাখে না। অবশ্য এসব কথা ধনিরাম শিখেছে বনমালী চৌধুরির থেকেই।

    বড়োবাড়ির পুরোনো রীতি, চলে আসা সংস্কার অনুসারে হাতি ঠাকুরঘরের সামনে দাঁড়াল; শুঁড় তুলে প্রণাম জানাল। কিছু অভ্যাসও রীতিতে দাঁড়িয়ে গেছে; সেই রীতি মেনে বাড়ির মানুষজনও এল—সবাই হাত জোড় করে নমস্কার জানাল। বনমালী চৌধুরিও রীতি মেনে গদাধরের গায়ে এক থাপ্পড় বসালেন, শুঁড়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। গদাধরও শুঁড় দিয়ে তাঁর গায়ে সুড়সুড়ি দিল; তিনি হাসলেন, বাকিরাও রীতি মেনে হাসল সঙ্গে। হাতি-তোরণ পার করে গেল।আজ একটা নতুন কাজ শুরু করা হল; বাড়ির ভেতরের নতুন-সুগরিজান থেকে এক কলসি জল এনে গদাধরের পাগুলো ধুইয়ে দেওয়া হল। মাথার ঘোমটা দাঁতে ধরে কাজটা করল মালতী; বাকি জলটুকু গণ্ডূষভরে নিয়ে নিজের মাথায় ছড়িয়ে দিল ধনিরাম। ধনিরামের সঙ্গে বেরিয়েছে কাতিয়া; চলে গেল গদাধর। বড়োবাড়ির লোকজনও কাজকর্মে লেগে গেল। দু-রাতের জন্যে লাট সাহেব এসে এই বাড়িতে কাটাবেন, সে কি কম কথা কিছু? কত শত কাজ; সবার হাতে হাতে কত রকমের কাজ, হাত থেকে যেন কাজ ছুটতেই চায় না!সূর্য উঠতে না উঠতেই ধনিরাম নাগনদী পেরিয়ে গেল। এই পাগলা নদীর কোনো ভরসা নেই। এই বুঝি পায়ের পাতা সমান জল, এই বুঝি দু'কুল প্লাবী জল। জল আসেও বড়ো বড়ো ঢেউ তুলে। একেবারে মাহুত সহ হাতি ডুবিয়ে দিতে পারে। নাগনদী পার করে ধনিরামেরা মূল রাস্তা ধরল। এই পথটাই হল সবচাইতে ভয়ঙ্কর। এখানে বাঘ ঘাপটি মেরে বসে থাকে যেখানে সেখানে। আসলে পথের এই অংশের জঙ্গলে পালে পালে হরিণ চরে বেড়ায়। আকারে প্রকারে ছাগলের মতো হরিণের চরে বেড়াবার জায়গা এটি। বাঘের এরা প্রিয় খাদ্য, তারই লোভে বাঘ এসে বসে থাকে। নদীগুলোর পাড়ে পাড়ে ঘন অরণ্য। কই যে বাঘ ভালুক চুপ করে বসে আছে –বলা তো যায় না।

    ধনিরাম অবশ্যই অকুতভয় মানুষ; কিন্তু তার অশরীরী জীবে বড়ো ভয়। পথটা একটা বাঁক নিতেই পাশের নদী-নালা কমে আসে। এই রাস্তার দুই পাশে একটি নতুন চা-বাগিচা বসানো হয়েছে; মাটি খুঁড়ে একপাশে চা-গাছের চারা লাগানো হয়েছে, আর-একপাশে জঙ্গল কেটে সাফ করা হচ্ছে। এইখানে সাহেবের আনা শ্রমিকদের বসতিতে নদীপাড়গুলো ভরে পড়েছে। চা-বাগান, খেত-খামারে, লোকজনে, পশুপাখিতে জায়গাটি গমগম করতে থাকে; এখানে বাকি জন্তু-জানোয়ারের উপদ্রবও কম।অন্ধকার নামলে পথে প্রচুর খরগোশ বেরোয়; কই বা আছে এদের গর্তগুলো! শ্রমিকদের ফলানো সবজির লোভে সাদা আর হলদেটে খরগোশেরা এখানে এসে ঘোরাফেরা করবেই। দিনে অবশ্য তত বেরোয় না; বেরোলেই কেউ না কেউ লাঠিতে তাড়ায়।ধনিরাম যাদের ভয় করে—এদের বাসস্থান হচ্ছে বাগানটা পেরিয়ে আরও তিনটে নদী পার করে এক টুকরো জনমানবহীন খোলা জায়গা। একেবারেই ফাঁকা; চারদিকে গাছ-গাছালিতে ভরা বন। বাকি জায়গাগুলোতে রোদের আলো তখনও থাকে, এখানে অন্ধকার নেমে পড়ে।পারতপক্ষে লোকে সঙ্গী-সাথিসহ দিনের আলোতে জায়গাটি পার করে যেতে চায়। একটি উঁচু টিলা আছে; টিলাটাও গাছে ঢাকা পুরো, আর গাছগুলোতে অসংখ্য বাদুড় ঝুলে থাকে। কবে থেকে যে আছে—কেউ জানে না। সন্ধ্যা হতেই বাদুড়ের পাখার ঝাপটানিতে জায়গাটা আরও অন্ধকার হয়ে আসে।এই টিলার নিচে বুঝি অনেক মানুষের মৃতদেহ আছে; রাতে যদি কেউ এই পথে গেল, সে বুঝি শুনতে পায়—কেউ গোঙাচ্ছে, কাঁদছে কেউ। কেউ কেউ আবার মটমট করে হাড়গোড় ভাঙারও শব্দ শুনতে পায়; মাঝে মাঝে কেউ কেউ চিৎকার দিয়ে মরণকান্নাও শোনে।

    মাথার ওপর রোদ থাকতেই ধনিরাম সেই জায়গাতে পৌঁছে গেল; জায়গাটার নাম হল ডফলা পোতা টিলা। হাতির বেগ বাড়িয়ে দিল সে। অল্প এগিয়েই বাদুড়-ঝোলা গাছে গিজগিজ করা সেই মানুষ পুঁতে রাখা টিলাটি; লোকে ডফলা পোতা টিলা বলেই চেনে। লোক চলাচল প্রায় করেই না এই টিলাটিতে। এখানে আরও বাস করে প্রচুর খরগোশ; সাদা আর মুগার মতো হলদেটে খরগোশের বিশাল পরিবারে টিলাটি ভরে ফেলেছে। খরগোশের লোভে এই টিলাতে বড়ো বড়ো কেউটে সাপগুলোও চলে আসে; চলে আসে নেকড়ে বাঘও। কেউ কেউ এইসব বাঘকে বুঝি দেখেছেও। ধনিরাম আর কাতিয়ার বেশ খিদেও পেয়েছে; সেই কাকভোরে খেয়ে আসা দু-মুঠো ভাত কবেই হজম হয়ে পেট খালি হয়ে গেছে। আবার ভাত খাওয়া হবে গিয়ে সেই খারুপেটিয়া ঘাটে। উনুন বসাতে হবে, বাসন নামাতে হবে; আগুন ধরিয়ে ভাত ফোটানো মানে কম করে হলেও এক ঘণ্টার কাজ। সঙ্গে দুধে ভিজিয়ে রাখা ভাজাচালের গুঁড়োর করিয়া আছে; আছে ঝোলাগুড়। আধা করিয়া ভাজাচালের গুঁড়ো ইতিমধ্যে শেষ হয়ে এসেছে।এই করিয়াগুলো তৈরি হয় মাকলা বাঁশের এক-দেড় ইঞ্চি, কখনও-বা দুই-আড়াই ইঞ্চি প্রশস্ত কঞ্চিতে; এমন করিয়া বড়োবাড়িতে ষাট-সত্তরটি তৈরি রাখা আছে। এই মাকলা বাঁশগুলোকে এক হাতের মুঠিতে ধরা যায় না—এতটাই বড়ো! ভুটান পাহাড়ে প্রচুর ফলে। এর তেল বের করে মেখে মেখে করিয়াগুলোকে মসৃণ করে ফেলা হয়; এরকম জিনিসপত্র বইতে করিয়াগুলো বেশ সুবিধেজনক। দই-দুধের চুঙা১ আছে, চিঁড়ে আছে, আছে ভিজিয়ে রাখা কোমল চাল২। ধনিরাম আর কাতিয়া কথা না বলে নীরবে এগোচ্ছে; জিহ্বাতে খাবারের স্বাদ। কাতিয়ার ইচ্ছে—ডফলা-পোতা টিলার ধারেকাছে হাতি রেখে খাবার সেরে নেয়; ধনিরামের ওপর রাগও চড়ছে।সেই কবে কানাই বলে একটি লোক মিত্রতা করবার ছলে ডফলাদের ৩এখানে ভোজের নিমন্ত্রণ দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিল। শ্বেতরাজা আসবার আগের কালে এই ডফলারা বুঝি খুব লুঠপাট চালাত; বিশেষ করে এই মৌসরা, বিশুসিঙা আদি এলাকাতে এদের বড়ো বেশি উৎপাত হচ্ছিল। লোকে মাঠের পাকা ধান ঘরে তুলতে পারত না। কানাই করেছিল কি—ডফলাদের এখানে ডেকে এনে স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে মিলে খুব পেটাল। লোকের লাঠির মারে ডফলারা ত্রাহি মধুসূদন করেছিল; ভোজ খাবার জন্যে ডেকে আনা ডফলাদের কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছিল।এর পরে পুকুরসমান গর্ত খুঁড়ে মৃত শবগুলো সেখানে পুঁতে মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছিল। মৃতদেহ মাটিচাপা পড়ে জায়গাটা একটা টিলার মতো হয়ে যায়; পাখিদের বয়ে আনা বীজ পড়ে গাছ-পালায় ভরে পড়ল সেই টিলা। খরগোশেরা কায়েম করল রাজত্ব; ডফলা পোতা টিলা একটি শিহরণ জাগানো ভৌতিক রূপকথাতে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

    খিদে সইতে কষ্ট হয় কাতিয়ার। খিদে যতই বাড়ছিল, ততই ধনিরামের ওপর চড়ছিল রাগ। হাতির পিঠে চড়ে পুরো বন-জঙ্গল চষে বেড়ানো এই ধনিরামের অদৃশ্য আত্মাদের এত ভয়! দিনে-দুপুরে মানুষটির মুখ দিয়ে রা বেরোচ্ছে না। রাগে আর বিরক্তিতে কাতিয়া ওর গুলতিটা বের করল; ওর ঝোলাতে গুলতি আর গুটি থাকেই।হাতি তখন ঠিক ওই ডফলা-পোতা টিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। টিলা থেকে গোটা দুই বুনো মোরগ বেরিয়ে এসে রাস্তা পার করে গেল। তারপরে চার-পাঁচটা খরগোশ লাফ দিতে দিতে বেরিয়ে এসে পথপাশে দুব্বো ঘাস চিবুতে শুরু করল। কাতিয়া আর থাকতে পারল না; গুলতিতে গুটি লাগিয়ে দিল। ঘাটে গিয়ে উনুন বসিয়ে গামলা চাপিয়ে খরগোশের মাংস সে খাবেই! খাবারের লোভে কাতিয়ার খিদেয় শুকিয়ে যাওয়া জিব ভিজে এল।""রাক্ষস একটা! গুলতি রাখ বলছি! রাখ!'' ধনিরামের ধমকে থেমে গেল কাতিয়া।

    ""কীই-বা হবে, এই সব জীব তো স্রষ্টা খাবার জন্যেই সৃষ্টি করেছেন।''

    ""খাবার জন্যে সৃষ্টি করেছেন? ক' বছরের পোলা রে তুই? কী জানিস? এই সমস্ত খরগোশ মরা মানুষের হাড় আর মাথার খুলির ভেতরে থাকে; এদের শরীরে সেই ওরা লেগে আছে।''

    ""হাড়-খুলি গলে পচে সেই কবে মাটি হয়ে গেছে!'' রাগে আর হতাশাতেই জোয়ান ছেলে কাতিয়া পালটা জবাব দিল।

    ""প্রণাম কর!'' ধনিরাম কাতিয়াকে নির্দেশ দিয়ে নিজেও হাত জোড় করল। হাতিকেও শুঁড় তুলতে আদেশ দিল—""সেলাম! সেলাম!'' অভিজ্ঞ হাতি গদাধরও শুঁড় তুলে সেলাম দিল।

    হাতি এসে পার্বতী নদী পৌঁছাল। এই অঞ্চল জুড়েও অনেক নদ-নদী; ঝরনা-নালার কথাই নেই। গদাধরও এমন নদ-নদী পার করতে অভ্যস্ত। পার্বতী নদী পৌঁছে গদাধর দাঁড়িয়ে গেল।

    ""বইত!'' ধনিরাম হাতিকে বসিয়ে খাবারের পুঁটলি খুলে ফেলল। হাতির মুখের সামনেও এগিয়ে দিল নুন মাখা এক কড়াই কোমল চাল।
    ""সামাত!'' মাহুতের ভাষাতে হাতিকে মুখে নিয়ে খেতে বলে ধনিরাম নিজের গামছাটা মেলে ধরল।
    ""মাইল!'' হাতিকে দাঁড়াবার আদেশ দিল কাতিয়া।
    ""আগেত!'' হাতিকে এগোতে বলল। কাতিয়ার মুখে হাসি; পেট শান্ত হয়েছে। অমন করে হাতিকে নির্দেশ দিতে ও বেশ ভালোবাসে। কী করে যে এত বড়ো জন্তুটি আদেশগুলো মেনে নেয়! গদাধর ল্যাজ নেড়ে মশা-মাছি তাড়াচ্ছে।
    ""ডুম!'' কাতিয়া ল্যাজ নাড়ানো বন্ধ করবার হুকুম জারি করল। পাকা হাতি গদাধর তৎক্ষণাৎ ল্যাজ নাড়ানো বন্ধ করল; কাতিয়া ওকে পার্বতী নদীতে নামিয়ে দিল। পাহাড়ি নদী—গদাধরের পা ডুবল কি না ডুবল বোঝাই গেল না।
    ""চুপ!'' গদাধরকে জল খাবার নির্দেশ দিল।

    কাতিয়াকে ওখানে রেখে ধনিরাম দেখে নিল হাতির পিঠের "হাড়িমোনা' ঠিকঠাক আছে কি না। পাটের বস্তা সেলাই করে এগুলো তৈরি হয়—আকারে বিশাল; হাতির পিঠে বোঝাই করে এগুলোতে সঙ্গের জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পাদানে পা ঢুকিয়ে ধনিরাম হাতিকে বলল, ""আগেত!''

    তারপরে শুরু হল ধনিরামের শিক্ষা প্রদান; এবারে কাতিয়া ধনিরামের সঙ্গেই শিকারে যাবে। ওর আরও বহু কিছু শেখার আছে। হাতি এগিয়ে যাচ্ছে; বেলা ডোবার আগেই খারুপেটিয়া ঘাটে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। পথে যেতে যেতে চলল অভিজ্ঞ গুরুর আগ্রহী নতুন শিষ্যকে পাঠদান।হাতির আগে আগে দু-তিনটে বুনো মোরগ দৌড়োচ্ছে; কাতিয়া খেয়ালই করেনি।
    ""একটার বেশি মারবি না, দেখবি।''

    কাতিয়ার গুলতির আঘাতে প্রমাণ আকারের লাল পালকের বুনো মোরগ ধরাশায়ী হয়ে গেল! ধরাশায়ী বুনো মোরগ সেই বড়ো ঝোলাতে গিয়ে প্রবেশ করল। হাতি দ্রুত চলতে শুরু করল; ধনিরামের হাতের অঙ্কুশের খোঁচা পড়ল গদাধরের গায়ে। গদাধরও সংকেত বুঝে ফেলল।

    ""দেগ!'' পথের মাঝবরাবর বয়ে চলা ছোটো জলের স্রোতটি লাফ দিয়ে পেরিয়ে যেতে ধনিরাম অভ্যাসবশত গদাধরকে হুকুম দিল। কিন্তু হুকুম শোনার আগেই হাতি সেই ছড়াটি পেরিয়ে গেছে।

    ধনিরাম কাতিয়াকে অঙ্কুশের কথা বলছিল। একটা ভালো অঙ্কুশ বানাতে একটা হৃষ্টপুষ্ট ভালুকা বাঁশের গুঁড়ি কেটে নিতে হবে; দৈর্ঘ্য হবে দেড় বা দুই ফুট। আগাটাকে চোখা করে পুড়িয়ে নিতে হবে।

    কাতিয়া হঠাৎ ডফলা পোতা টিলার খরগোশগুলোর কথা তুলল; কেন বা এদের মারতে নেই, কীই-বা হবে? কথাটা তুলে ও ভয়ও পাচ্ছে—ধনিরাম যদি চটে গিয়ে ধমকে দেয়! না, ধনিরাম রাগ করেনি; তার স্বরটাই যা সামান্য গম্ভীর হয়েছে।

    ""শোন কাতিয়া! কোনো কিছুতেই লোভ করবি না। ওই জায়গাটাতে জালে পড়া মাছের মতো মানুষের আত্মা ছটফটাতে থাকে; সেগুলো এই খরগোশের ভেতরে আছে, বুঝলি? ওগুলো খরগোশ নয়।'' বলে ধনিরাম হাত ওপরে তুলে জোড় করে নমস্কার জানাল। ""ডফলা হোক আর যাই হোক—এরা পুঁতে রাখা মানুষই তো ছিল।''

    হঠাৎ গদাধর দাঁড়িয়ে গেল। পাখি আর বানরে বড়ো কোলাহল শুরু করেছে; ধনিরাম আর কাতিয়া বাতাসে একটা বাজে গন্ধ টের পেল—চেনা দুর্গন্ধ। বাঘের চাপা কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে; ধারেকাছে আছে নিশ্চয়।

    হাতিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকল ধনিরাম। ধীরে ধীরে বাতাসে বয়ে আসা দুর্গন্ধও কমতে শুরু করল। হাতির আগে আগে একটি বুনো মোরগ দৌড়োচ্ছে; কাতিয়া গুলতি বের করল।
    দুপুর নাগাদ হাতি গিয়ে নাইকা নদীর কাছে সোনাপুরে পৌঁছাল। বনে-জঙ্গলে ভরা সোনাপুরেও একটি নতুন বাগিচার কাজ শুরু হয়েছে; রেললাইন বসেছে। রেললাইনের পাশে পাশে লোকের বাড়িঘরও বসেছে। সোনাপুরের মাটির গুণও আছে—এখানে বুনো কমলাগাছও হয়। যেখানে-সেখানে জঙ্গলের ভেতরে বা নদীর পাড়ে পাড়ে ফলে ভরা কমলাগাছ চোখে পড়ে। এখনও কমলা পাকার সময় হয়নি; ছোটো ছোটো বেলের মতো উপরমুখো হয়ে গাছে গাঢ় সবুজ রঙে ঝুলে আছে। সোনাপুরে মৌজাদারেরও কমলাবাগান আছে; এদিকটায় এলে সাধারণত মৌজাদারের বাড়ির লোকে এখানে বিশ্রাম করে। আজ আর ধনিরামেরা থামল না এখানে; সামনে আরও অনেক পথ পড়েই আছে। কাতিয়া গোটা দুই কাঁচা কমলা ছিঁড়ে হাতির পিঠের বস্তাতে ভরে নিল।
    সোনাপুর জায়গাটা একেবারেই পালটে গেছে। কিছুই ছিল না এখানে; নাইকা নদীর পাড়ে পাড়ে কেবলই অরণ্য। যেদিকে যাওয়া যায়, সেদিকেই বিচিত্র জীবজন্তু। কোথাও-বা দু-এক ঘর মানুষ দূরে দূরে হয়তো পরিবার নিয়ে সংসার সাজিয়েছিল। রেললাইন আর এই বাগানের পর থেকে সোনাপুর মৌসরার থেকেও বড়ো হয়ে গেল; দোকান-টোকান, লোকজনে ভরে গেছে একেবারে। নাইকা নদীর পাড়ে পাড়ে পাথর ফেলে একটি পথও তৈরি হয়েছে। নাইকা পার করে ধনিরামেরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রেলপথের কাজ কতটা হচ্ছে দেখল।

    রেলপথের যেখানটায় কাজ হচ্ছে, সেখানে একদল লোক বসে আছে। একটা ড্রামে কাঠের লাকড়ি ভরিয়ে চায়ের জল গরম করছে; নতুন চা-বাগানের তরফে দেওয়া বিনামূল্যের চা। এরা কাজের লোক; ওখানে কাজ চালাবার মতো ঘটি, লোটা যে যা পেয়েছে—তাতেই চা নিয়ে পরমানন্দে পান করছে। সেই না দেখে কাতিয়ারও ঝোঁক উঠল—এক ঘটি চা সেও খাবেই খাবে!চড়ল ধনিরামের রাগ। এই বাচ্চা ছেলেটা—মনে বিন্দুমাত্র বাঁধ নেই! খরগোশ দেখলে খরগোশের মাংসের লোভ, বুনো মোরগ দেখলে তাতেও লোভ; এখন বাগানের দেওয়া বিনামূল্যের চা দেখেছে কি—সেটাও ওকে খেতেই হবে! হাতি দাঁড় করাল ধনিরাম। মহা আনন্দে গিয়ে রেললাইনের শ্রমিকদের থেকে চা খেয়ে এল; তাদের থেকে শেখা ভাষাতে ধনিরামকে বলল, ""বহুত আচ্ছা হায়!'' শুনে ধনিরাম হাসি আটকাতে পারল না; না হেসে বা করে কী?

    সোনাপুর পার করে আবার সেই আঁকাবাঁকা সরু, এবড়ো-থেবড়ো হাতি চলার পথ। নদী-জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া এগুলো কোনো রাস্তা নয়; মানুষ, মহিষে টানা গাড়ি, হাতি-ঘোড়া এবং অরণ্যের জীবজন্তু যাতায়াত করে আপনিই তৈরি হয়ে যাওয়া সংকীর্ণ বন্য পথ।

    ধনিরামের হাতি এগিয়ে যাচ্ছে; খারুপেটিয়া পৌঁছাতে এখনও অনেক বাকি।


    টিকাঃ
    ১। চুঙা: আসামের লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ করে মাকলা বা বরুয়া বাঁশ কেটে তার ভেতরে দই বা দুধ বা রান্না করা
    খাবার ভরে মুখ বন্ধ করে রাখার এক আদিম আরণ্যক পাত্র
    ২। কোমল চাল: আসামের এক পরম ঐতিহ্যবাহী ও অলৌকিক "বোকাসাউল' বা কোমল চাল, যা সেদ্ধ না করে কেবল
    সাধারণ ঠান্ডা জলে বা দুধে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলেই চমৎকার নরম ও খাওয়ার উপযোগী ভাতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
    ৩। ডফলা: অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দা জনজাতি। অতীতে এই নামে পরিচিত হলেও এখন এরা নিশি নামে পরিচিত।


    বালিতে পোতা সেই ঘোরালো খাড়ুটি


    খারুপেটিয়া ঘাটে জাহাজ ভিড়ল এসে বিকেল দুটো নাগাদ। ধনিরাম আর কাতিয়া বুনো মোরগের মাংসের ঝোলে মেখে ভাত খেয়ে একটু ঘুমও দিয়ে দিল। সাহেবদের মঙ্গলদৈর সরকারি বাড়িতে রেখে ফিরে যাবে; সোনাপুরের কমলাবাগানের বাড়িতে রাত কাটিয়ে মৌসরা চলে যাবে। দু-দুটো বুনো মোরগের মাংস কী করে বা খেয়ে শেষ করে? করিয়াতে ভরে রাখা আছে। ঠান্ডার দিন—এত তাড়াতাড়ি নষ্ট হবে না; গামছাতে, কলাপাতায় মুড়ে ভাতও রাখা আছে। চিঁড়ে, ভাজা চালের গুঁড়ো, গুড়, দৈ হাতির পিঠের ঝোলাতে রাখা আছেই। সাহেবদের সরকারি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখলেই ধনিরামদের কাজ শেষ। ওখানে মাথায় পাগড়ি পরা একজন চাকর আছে; বড়ো সাহেবদের মাথায় করে রাখবে। মঙ্গলদৈ থেকে আবার সোনাপুরে হাতি চালিয়ে দেবে। সোনাপুরের কমলাবাগান তদারক করে মোহন কর্মকার, তার বউ নিশা কর্মকার আর এদের তিনটি মেয়ে; বনমালী চৌধুরির বড়োবাড়ির মানুষ বলে তাদের অত্যন্ত যত্নে রাতটা থাকতে দেবে।মোহনের বউ নিশা বড়ো সুন্দর গান করে; মোহন বাজায় তবলা। মেয়ে তিনটেও যোগ দেয়; ঝাল তরকারি, আগুন আর গানে রাতটা ভালোই কেটে যায়। নিশা বুঝি কলকাতাতে—কী যেন বলে—বাঈজি নারী ছিল; মোহনের সঙ্গে পালিয়ে জাহাজে এসে এখানে পৌঁছায়। মেয়েরা শুয়ে পড়ে; মোহন বোতল বের করে, নিশা গ্লাসে সাজিয়ে ধনিরামদের এগিয়ে দেয়। গান জুড়তে না জুড়তে নিশার গায়ের লাল শাড়ির আঁচল খসে পড়ে; গানের তালে তালে দুলতে শুরু করে সুপুষ্ট স্তন। সমস্ত কষ্ট-ক্লান্তি ছুটে পালায়।

    এবারে এডুইন সাহেবের সঙ্গে এসেছেন ভিক্টর বুল সাহেব। ভিক্টর সাহেবের চোখ জোড়া সবুজ; গায়ের সাদা রং রোদে পুড়ে তামার রং ধরেছে। প্রশস্ত কাঁধ, হাতের কবজি বড়ো বড়ো; দেখলেই বোঝা যায় শরীরে মহিষের বল। মানুষটির চোখ জোড়া বড়ো বুদ্ধিদীপ্ত।দুই সাহেবের পোশাক-আশাকও ভিন্ন। এডুইন সাহেব স্যুট-টাই পরেছেন, পায়ে জুতো-মোজা; মাথায় ফেল্ট হ্যাট। ভিক্টর সাহেবের পায়ে হাঁটু পর্যন্ত গামবুট; কাঁধে বন্দুক—যেন এখনই শিকারে যাবেন। তাঁর পোশাকও আলাদা; এডুইন সাহেবের মতো পিচ্ছিল আর কোমল নয়। জোড় আর সেলাইয়ের নমুনাও আলাদা। এবারে এডুইন সাহেব চোখে গোল চশমা এক জোড়াও পরে এসেছেন; বোঝা যায় মানুষটির বয়স হয়েছে।

    এডুইন সাহেব কোথাও এলেই সেই জায়গাটির কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করবেন—জায়গাটার নাম কী করে হল, কীভাবে হল, পেছনের গল্প কী ইত্যাদি। রোজ রাতে বসে বসে সেগুলো তিনি লিখবেন; এডুইন সাহেব মানেই হচ্ছে প্রাচীন কথা ও কাহিনির ভাঁড়ার। বনমালী চৌধুরি এমং বুড়োর হাতে তৈরি একজোড়া টেবিল-চেয়ার এডুইন সাহেবের শোবার ঘরে রেখে দিয়েছেন। নির্দেশ দিয়ে রাখা আছে—সাহেবের টেবিলের কেরোসিন ল্যাম্পটার ফিতে কেটে, চিমনি পরিষ্কার করে ধুয়ে, তেল ভরিয়ে চকচকে করে রাখতে; কেরোসিন হতে হবে "ভিক্টোরিয়া কেরোসিন'।

    ধনিরাম আর কাতিয়া ধুতি-পাঞ্জাবি ভালো করে পরে, মাথায় গামছার পাগড়ি ভালো করে বেঁধে ফেলল। মৌজাদার প্রভু শিখিয়েছেন—সাহেব খালি মাথা আর খালি পা অসভ্য লোকের চিহ্ন বলে মনে করেন। পায়ে ওই স্যাণ্ডেল-জুতো পরতেই ধনিরাম ও কাতিয়া বড়ো অস্বস্তি বোধ করে; ধনিরামের হাত-পা কাঁপছে। এডুইন সাহেবকে আগেও পেয়েছে বটে—কিন্তু সঙ্গে তখন মৌজাদার থাকেন। খুব বেশি সময় নয়, খারুপেটিয়া থেকে সদর শহর মঙ্গলদৈ এক বেলারই পথ; মৌজাদার প্রভু স্বয়ং এসে ঢোল-নাগারা বাজিয়ে সাহেবকে নিয়ে যাবেন।

    দূর থেকে দেখলে খারুপেটিয়ার জাহাজঘাটটিকে মনে হয় যেন একটি পায়ের খাড়ু বালিতে পুঁতে রাখা রয়েছে। বালিতে পুঁতে রাখা খাড়ু—অগত্যা খারুপেটিয়া! জাহাজের ডক থেকেই এডুইন সাহেব চেঁচিয়ে উঠেছেন, ""লুক, ভিক্টর লুক! দ্য ব্যঙ্গল! দ্য ব্যঙ্গল!'' সাহেব ইতিমধ্যে দরঙের রাজা বিজয়নারায়ণের কথাগুলোও সংগ্রহ করেছেন। রাজা বিজয়নারায়ণ নদীঘাটের কাছে "খারঘর'১ অর্থাৎ রাজকীয় বারুদখানা সাজিয়েছিলেন; মানের আক্রমণের সময় মানেরা সেই অস্ত্রশালা তথা বারুদখানা পুঁতে ফেলেছিল বলেও জায়গাটির নাম পড়ে গেল খারুপেটিয়া। এখানে বারুদখানা ছিল—মানেরা সেই বারুদখানা পুঁতে ফেলেছিল। কমিশনার সাহেবের পুরোনো দিনের কথার প্রতি প্রীতির কথা ইতিমধ্যে লোকে জেনেই গেছে; একটি পুরোনো রূপকথা বা কাহিনি নিয়ে সাহেবের কাছে গেলেই তৎক্ষণাৎ আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। সাহেবি ছাপটা না থাকলে সাহেব যখন অসমিয়া বলেন, কোনো বিদেশি বলছেন বলে লোকে ধরতেই পারবে না। দুই সাহেব জাহাজ থেকে নামলেন। খারুপেটিয়া ঘাটে আরও একজন সাহেব ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন—তিনি হলেন "হান্টার সাহেব'। মানুষটির আসল নাম কেউ জানে না; সাহেব হলেন ভুটান পাহাড়ের ঢেউ খেলানো বাগানের বড়ো সাহেব। বাগানের মতোই এই সাহেবের নানা কাহিনি পুরো এলাকাতে ঢেউ খেলিয়ে ছড়িয়ে আছে। "হানাটার সাহেব'-এর হাতে সবসময় থাকে একটি হান্টার; সেটি বুঝি খাঁটি বিলেতি। হানাটার সাহেব বুঝি এককালে আফ্রিকাতে তামাকখেত করেছিলেন; সেখান থেকে এসে এখানে নাচনডুবি চা-বাগানের বড়ো সাহেব হয়েছেন। হানাটার সাহেবের হান্টার যখন-তখন চা-বাগানের শ্রমিক বা নেটিভের গায়ে পড়ে শরীর লাল করে দেয়। যে ভয়ঙ্কর জায়গাতে বাঘ, ভালুক, অজগর আর বুর্বক ভুটিয়াদের সঙ্গে লড়ে এই চা-বাগান বসানো হল—সেই বাগানের মূল মানুষটিই এই "হানাটার সাহেব'। এই বাগানের চা বাক্সে বাক্সে ভরে জাহাজে করে লন্ডন যাওয়া শুরু করেছে; আজও তিনি মহিষের গাড়িতে চাপিয়ে চা পাতার বাক্স জাহাজে তুলে দিতে এসেছেন— সেই চায়ের গন্ধ শুঁকবেন না রংই দেখবেন!

    "হানাটার সাহেব'-এর আসল নাম হচ্ছে বার্নার্ড লংফেল। এই নাম কি আর মনে থাকে? কার মুখেই বা এই নাম ফোটে? "হানাটার সাহেব'-ই লোকের মুখে থেকে গেল। আজ বার্নার্ড লংফেল অথবা "হানাটার সাহেব' এসেছেন আরও এক কারণে—কলকাতা থেকে একজন বাঙালি কম্পাউন্ডার আসবার কথা, তিনি এলেন কি না দেখতে।বার্নার্ড সাহেব বেশ একটা সংকটে পড়েছেন—বিপদই বলতে পারি। বাগানে ম্যালেরিয়া হচ্ছে; এত সাধ্য-সাধনা করে নিয়ে আসা শ্রমিকেরা রোগে ভুগে দিনে দিনে মারা যাচ্ছে। বাগানের হাসপাতালে একজন কম্পাউন্ডার আর একজন দেরেসি২ দরকার। দেরেসির কাজ না-হয় চালিয়ে নেওয়া গেল; কম্পাউন্ডার তো না হলেই নয়। কোম্পানি এই এলাকাতে ইতিমধ্যে পাঁচখানা বাগান বসিয়েছে; পাঁচখানা বাগানের মেডিক্যাল অফিসার হচ্ছেন ফোর্ড উইলিয়াম সাহেব। লন্ডন থেকে এমডি, এফআরসিএস নিয়ে এসেছেন।ফোর্ড উইলিয়াম সাহেবের কড়া নির্দেশ—বাগানের হাসপাতালে "ফুল স্টাফ' থাকতেই হবে; তাঁর মুখের একটাই কথা, ""ইফ পেশেন্ট ডাইজ হোয়াট এবাউট ইউজ অফ দিস ব্লাডি মেডিক্যাল সায়েন্স?'' কোনো মানুষ মরতে পারবে না! বার্নার্ড সাহেবকে ইতিমধ্যে লাইনে হওয়া কিছু মৃত্যু লুকিয়ে দিতে হয়েছে; ফোর্ড উইলিয়াম যদি জানতে পারেন, সোজা ওপরে রিপোর্ট যাবে।বার্নার্ড সাহেব জানতে পেরেছেন—সোনাপুরের রেললাইনের কাজে আসা অ্যাকাউন্টেন্ট মুখার্জি বাবুর এক ফার্মাসিস্ট ভাইপো আজ কলকাতা থেকে এই জাহাজে এসে পৌঁছাবে। ওই যে জাহাজ থেকে এডুইন সাহেব আর ভিক্টর সাহেব নেমে আসবার পেছনে পেছনেই দুই বাঙালি ছেলে নামছে; এদের একজন প্রাণনাথ মুখার্জি—সে কলকাতাতে ফার্মাসিস্টের কোর্স পড়ে ডিগ্রি নিয়েছে। দ্বিতীয়জন তারই সম্পর্কিত ভাই যদুনাথ মুখার্জি।

    ওই বার্নার্ড সাহেব একলাফে এগিয়ে গিয়ে দুই বাঙালি নবযুবককে ধরে ফেললেন। শুরু হল জেরা করা। সোনাপুর থেকে ভাইপোকে নিয়ে যেতে এসেছেন যদুমণি মুখার্জি; তিনি তো দেখেশুনে হতভম্ব। "হানাটার সাহেব'-এর কর্মকাণ্ড তিনি শুনেছেন। বার্নার্ড সাহেব মুখার্জি বাবুর ভাইপোকে সোজা ঘোড়াতে তুলে ফেললেন; নম্রমুখী যদুনাথকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করলেন।
    ""ক্যা তুম কুইনাইন জানতা হায়? পেলুড্রিন ক্যা চিজ হে? মেক্সাড্রিন জানতা হায়?'' দাদা ফার্মাসিস্ট—তরুণটি শুদ্ধ উত্তর দিল।সাহেব প্রাণনাথকেও ধরলেন, ""গাম একেসিয়া বনানা আতা হ্যায়? ইস মে ক্যা অয়েল দিতা হ্যায়?'' ভয়ে ভয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকেই প্রাণনাথ জবাব দিল, ""কড লিভার অয়েল।''

    ব্যস, ইন্টারভিউ হয়ে গেল। ভুটান পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা ঢেউ খেলানো বাগান নাচনডুবিতে প্রাণনাথ-যদুনাথ—দুজনেরই চাকরি পাকা হয়ে গেল। কাকা যদুমণি মুখার্জি তাকিয়ে রইলেন; তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মাসে তিরিশ টাকা মাইনেতে দুটি বাংলোবাড়িসহ দুই ভাইপো চাকরি পেয়ে গেল। ভালো লাগল কি মন্দ লাগল বুঝে উঠতে উঠতেই বার্নার্ড সাহেব তাঁর পিঠ চাপড়ে বলে গেলেন—তাঁর নেফিউরা আরামে থাকবে; তাঁকে একদিন নাচনডুবিতে নিমন্ত্রণও দিয়ে গেলেন। তিন দিন পর ডাক্তার ফোর্ড উইলিয়াম সাহেব নাচনডুবি বাগানের হাসপাতাল পরিদর্শনে আসবেন; ফার্মাসিস্টদের পেয়ে সাহেব যেন স্বর্গের মুক্তো হাতে পেলেন। প্রাণনাথকে তিনি ঘোড়াতে তুলে নিলেন; সাহেবের সঙ্গে এসেছিলেন দামোদর কলিতা, তাঁর ঘোড়াতে যদুনাথের ওঠার ব্যবস্থা হল। প্রাণনাথের মুখ ম্লান হয়ে পড়েছে, যদুনাথ তো কাঁদতেই আরম্ভ করেছে! সাহেব যেভাবে ভাইপোদের ধরে নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে যদুমণি মুখার্জির মুখে কথাই বেরোচ্ছিল না।তিনি দামোদর কলিতার সঙ্গে গিয়ে চা পাতা নামিয়ে খালি হওয়া মহিষের গাড়িতে চেপে গেলেন। বাগানের বড়োবাবু দামোদর কলিতা নিজের ঘোড়াটি সঙ্গে আসা মাংরা সরদারকে সমঝে দিলেন; নিজে ক্রন্দনরত যদুনাথকে আর কাকা যদুমণিকেও সঙ্গে নিয়ে সেই মহিষের গাড়িতে চড়ে বসলেন। নাচনডুবির বড়োবাবু দামোদর কলিতাকে কাছে পেয়ে যদুমণি মুখার্জি সামান্য স্বস্তি বোধ করলেন; চাকরি হল বলেই ছেলেদুটিকে এভাবে তো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

    বার্নার্ড সাহেব ইতিমধ্যে গিয়ে এডুইন সাহেব আর ভিক্টর সাহেবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে নিজেদের ভাষাতে কথা বলে আলাপ-পরিচয় সেরে ফেলেছেন। ধনিরাম সাহেবদের জন্যে গদাধরের পিঠে হাওদা বেঁধে সাজিয়ে ফেলেছে; হাতি বইত করাল। এডুইন সাহেব উঠে হাওদার আসনে বসলেন; তাঁর মুখ সামান্য ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ভিক্টর সাহেব আসেনইনি বার্নার্ড সাহেবের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত।এবারে এই জাহাজে নাচনডুবি বাগানের জন্যে মেশিন আনা হয়েছে; বার্নার্ড সাহেব ও ভিক্টর সাহেব দুজনে মিলে সেই মেশিন নামানোর কাজ তদারকিও করছেন, হাতও লাগালেন যেখানে দরকার। মেশিন ভালোরকম করেই মহিষের গাড়িতে উঠল; একটা উল্লাসের ধ্বনি খানিক্ষণের জন্যে খারুপেটিয়া জাহাজঘাট কাঁপিয়ে তুলল।ধনিরাম আর কত হাতি বইত করে রাখে? চটি একখানা পেতে নিজে মাহুতের আসনে বসেছে, তারই অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। ধনিরাম ফিরে এডুইন সাহেবের দিকে তাকাল; সাহেবকে সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। তাঁকে কি করিয়াতে ভরে আনা সামান্য কোমল চাল, দই, গুড় খেতে দেবে? সাহেব খাবেন তো? কেন জানি এই এডুইন সাহেবের জন্যে ধনিরামের মনে বড়ো মায়া জাগে; এত মায়াময় তাঁর কথাবার্তা, এই দেশের সকল কথা জানবার কী আন্তরিক ইচ্ছা তাঁর! ওর মতো হাতি-মাহুতের কথাও কত যে মন দিয়ে শোনেন! নীরবে ধনিরাম করল কী—সাহেবের জন্যে দই-গুড়, চাল সামান্য বের করে আনল। সাহেবদের খাবার জন্যে সঙ্গে করে দুটি চিনামাটির বাটি এনেছে। দেবে কি? চামচ একটিসহ বাটিটি সাহেবের দিকে এগিয়ে দিল। "থ্যাঙ্ক ইউ' বলে সাহেব পুরো দই-বাটি হাতে নিয়ে খালি করে ফেললেন। ধনিরাম এবারে আরও একটু দই কোমল চালের সঙ্গে দিয়ে সাহেবকে এগিয়ে দিল; সেগুলোও সাহেব এক চামচ, দুই চামচ করে খেয়ে ফেললেন। ধনিরাম হাওদাতে পেতে দেওয়া গদি সামান্য ঠিকঠাক করে দিল। এবারে সাহেব চশমাজোড়া খুলে সত্যিই ঘুম দিলেন।

    ""কান খোল!'' গদাধরকে আদেশ দিয়ে কাতিয়া শুঁড়ে পা দিয়ে হাতিতে চড়ছে। ভিক্টর সাহেবকে এগিয়ে আসতে দেখে ধনিরাম হাতিকে বইত করতে চেয়েছিল; চোখের সামনে কাতিয়ার দেখাদেখি ভিক্টর সাহেবও শুঁড় বেয়ে তিরতির করে চড়ে গেলেন! অচেনা লোক দেখে হাতি সামান্য গাইগুঁই করেছিল; কিন্তু ভিক্টর সাহেবের উঠে আসা দেখে হাতি বাদ যাক—ধনিরামের মুখ দিয়েই টু শব্দটি বেরুল না।

    বার্নার্ড সাহেব ইতিমধ্যে গিয়ে উত্তরমুখী করে তিনটি মহিষের গাড়ি, চারটি ঘোড়ার সারি সোজা করে দাঁড় করালেন। ধনিরামও হাতিকে পশ্চিমমুখী করে ঘুরিয়ে দিল। বেলা অনেক হয়ে গেছে; রাত না-হতেই সাহেবদের মঙ্গলদৈর সরকারি বাড়িতে নামিয়ে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ। বার্নার্ড সাহেবের মহিষের গাড়ির ঘণ্টা বাজতে শুরু করল; ধনিরামও হাতি আগেত করাল। হাতি পশ্চিমমুখী হয়ে খারুপেটিয়া ঘাট থেকে এগোতে শুরু করল। ভিক্টর সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, ""ফলো দেম! ফলো দেম!'' ধনিরাম কিছুই বুঝতে পারল না; ভিক্টর সাহেব গলা ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছেন। এডুইন সাহেব ধনিরামকে বুঝিয়ে বললেন—বার্নার্ড সাহেবের সঙ্গে হাতি চালাতে হবে। বার্নার্ড সাহেবরা সারা রাত চলেও নাচনডুবি পৌঁছাতে পারবেন না; ঘাট থেকে দু-দিন লাগবে ওখানে পৌঁছাতে। মৌসরা পার করে নাচনডুবি আরও এক দিনের পথ। ধনিরাম কাঁপতে শুরু করল—এখন করেটা কী? বার্নার্ড সাহেবের তিন নম্বর মহিষের গাড়িও এতক্ষণে রাস্তাতে উঠে গেছে। খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা করতে পারে না ধনিরাম; মৌজাদার যেটুকু বলেন, সেটুকুই করে।মহিষের গাড়ি থেকে মুখার্জিবাবু ধনিরামকে আসতে বললেন; বার্নার্ড সাহেবও হাত নেড়ে ডাক দিলেন। হাতির পিঠ থেকে দুই সাহেবও আদেশ দিলেন; সবার সামনে বার্নার্ড সাহেবের ঘোড়া। বেলা নামবার আগেই এই শোভাযাত্রা সোনাপুরের রাস্তাতে চড়ল। সোনাপুরের নদীর পাড়ে বার্নার্ড সাহেব তাঁবু লাগালেন; অভিজ্ঞ মাংরা সরদার গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে খাবার সাজিয়ে ফেলল—ভাত আর খারুপেটিয়া ঘাট থেকে নিয়ে আসা মাছের তরকারি। ফোল্ডিং চেয়ার-টেবিল পেতে ডিনার সাজিয়ে দেওয়া হল; বিলাতি মদের বোতল খোলা হল। জাহাজঘাটের থেকে বার্নার্ড সাহেব বিলেত থেকে আসা বেশ কয়েক পেটি মদও আজ মেশিনের সঙ্গে মহিষের গাড়িতে তুলে এনেছেন।

    কাতিয়াকে ধনিরাম চোখে-চোখে রাখছে; মাংরা সরদারের সঙ্গে পড়ে যদি এক ঢোক গিলে ফেলে আর নেশায় ধরে, তবে এই রাতে হাতি চালাবে কী করে? মনে মনে সে ভিক্টর সাহেবের ওপর অগ্নিশর্মা হয়ে আছে। সোনাপুর অবধি না-হয় যেমন-তেমন চলে যাওয়া যাবে; এর পরে যে পার করতে হবে সেই ডফলা পোতা টিলা!রাতে বুঝি এই ডফলা পোতা টিলার খরগোশগুলোর পুরো ঝাঁক গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে রক্তপান করবার জন্যে বসে থাকে; এদের ঝাঁকের মধ্য দিয়ে হাতি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ধনিরামের তো ভেবেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে; আজ বড়ো বিপদের দিন!

    সোনাপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার যাত্রা শুরু হল। এবারে একেবারে সামনে মশাল হাতে মাংরা সরদার, ওর পেছনে বার্নার্ড সাহেব; সাহেবের হাতেও আগুন ধরানো।

    গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে আঁকা-বাঁকা পথ ধরে মহিষের গাড়ি, হাতি, ঘোড়ার শোভাযাত্রা এগিয়ে যেতে থাকল। সেদিন ছিল অমানিশার রাত; হাতি, মহিষের গাড়ি—সব কিছুই অদৃশ্য ছিল। কেবল ঝলমলে করছিল মাংরা সরদার আর বার্নার্ড সাহেবের হাতের মশাল দুটি। মাঝে মধ্যে ভিক্টর সাহেবও হাতের টর্চটা জ্বালছিলেন; আলোতে দেখা যাচ্ছিল কেবলই আদি-অন্তহীন অরণ্য আর অরণ্য! সেই অরণ্যে মহিষের গাড়ির ঘণ্টার ঝুনঝুনি গর্জনের মতো শোনাচ্ছিল। মহিষের গাড়ির ছৈয়ের নিচে তিন মুখার্জি আর জমাদার বাবু তন্দ্রাতে ঢুলছিলেন; হঠাৎ বন্দুকের শব্দে সবাই চমকে উঠল। গদাধর দাঁড়িয়ে গেল; দাঁড়িয়ে গেল মহিষের গাড়ির তিন জোড়া মহিষ। বার্নার্ড সাহেবের বন্দুক দু-বার গর্জে উঠল। একা একটি হাতি দাঁড়িয়েছিল; বার্নার্ড সাহেব ভালো বোঝেন—সাহান থেকে বিতাড়িত হয়ে একা চরে বেড়ানো এমন এক নিঃসঙ্গ হাতি বড়ো গুণ্ডা হয়, হয় বড়ো বিপজ্জনক! ভিক্টর সাহেব এবং বার্নার্ড সাহেবের টর্চের আলোতে দেখা গেল—একটি "ডায়া গণেশ', অর্থাৎ ডানদিকে দাঁত থাকা একটি পুরুষ হাতি ঝোপঝাড় কাঁপিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    চলতে চলতে শোভাযাত্রাটি ডফলা-পোতা টিলায় গিয়ে পৌঁছে গেল। হাত জোড় করল ধনিরাম। ধনিরামের এই অবস্থার সঙ্গে পরিচিত এডুইন সাহেব; শিকারে গিয়ে দীপাবলি দেখা ধনিরামের ভয়টা সাহেবের মনে আছে। সাহেব একবার জিজ্ঞেস করতেই ধনিরামের পেট থেকে সব কথা বেরিয়ে গেল—টিলাতে পুঁতে রাখা ডফলা মানুষের স্তূপ, প্রায় রাতে লোকেদের দেখা মানুষের ছায়াশরীর, আর সেখানে বাস করা সেই খরগোশের দল।ডফলা-পোতা টিলার কাছে গিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। বার্নার্ড সাহেব কাউকে দাঁড়াতে দিতে রাজি ছিলেন না; তিনটে বনবেড়াল সামনে দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে চলে গেল, ছোটো বুনো শুয়োর হয়তো হবে গোটা সাতেক, সাপও দেখা গেল বেশ কটা। বাঘের হাই তোলার উৎকট দুর্গন্ধ বেশ কবার নাকে লাগল। কিছুই পরোয়া না করে বার্নার্ড সাহেব একহাতে মশাল আর অন্যহাতে বন্দুক নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলেন; কিন্তু এক্কেবারে টিলার কাছে পৌঁছে তিনি রয়ে গেলেন। বাকিরাও দাঁড়িয়ে গেলেন। কোন ফাঁকে যে হাতির শুঁড় বেয়ে ভিক্টর সাহেব নেমে গেলেন, ধনিরাম টেরই পেল না। এমন দুরন্ত মানুষ এই সাহেব! কী বা হল? হাতির পিঠ থেকেই ধনিরাম দেখতে পেল—পুরো ডফলা-পোতা টিলা জুড়ে, টিলার আশপাশে পুরো এলাকা জুড়ে জোড়া জোড়া নীল আলো জ্বলছিল যেন। সাহেবদের টর্চের আলোতে সেই আলোগুলোকে দেখাচ্ছিল নীলচে। এগুলো সেই অভিশপ্ত খরগোশের দল; গলা শুকিয়ে গেল ধনিরামের।হাতের বড়ো বিলেতি টর্চের আলো আরও বেশি করে এই সব কিলবিল করে বেড়ানো খরগোশদের চোখের ওপর ছুঁড়ছেন। খরগোশেরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হতভম্ব হয়ে গেল; কেউ বা দুই পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, কেউ একদৃষ্টে লাইটের দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার সামান্য আগুপিছু করছে। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া খরগোশের বেশ কটাকে ভিক্টর সাহেব গুলি করে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। একটি ঝোলাতে সেগুলো ভরে নিল মাংরা সরদার।ভিক্টর সাহেবকে সেই মৃত খরগোশের বস্তা কাঁধে তুলে নিতে দেখে ধনিরাম সাহেব-সোহেবের মর্যাদা ভুলে গেল; গমগমে গলাতে আদেশ দিল, ""এই কুলক্ষুণে জিনিস নিয়ে হাতিতে উঠলে আমি কিন্তু নেমে যাব।''এডুইন সাহেব ভিক্টরকে বার্নার্ডের সঙ্গে ঘোড়াতে উঠতে বললেন। ধনিরামকে বললেন একটা হাতির গান ধরতে। কেন জানি এই সাহেবের কথা ধনিরাম ফেলতে পারে না; মানুষটির নীল চোখ জোড়ার চাউনি, ধীর-স্থির কথা শুনে বড়ো মায়া লাগে। হাতি আগেত করে গান জুড়ল ধনিরাম, কাতিয়া ওর করতালজোড়া বের করল।


    ""আগেত যা রে বেটা
    আস্তে আস্তে আগেত যা
    পাহাড়ে ছিলি রে বেটা
    খেয়ে লতা-পাতা
    তলায় এসে পড়লি বেটা দড়ির বান্ধে বাঁধা
    লাল রে লাল দুগাপুরি লাল
    তুই হবি মহাজনের মাল
    ভালো হাতির ভালো কাম
    শিখে বুঝে লবি নাম
    শিখিলি বেটা তুই শিখিলি
    সব কাম শিখিলি ভাই
    আর তো কুছ বাকি নাই।৩


    গদাধর আগুপিছু করছিল। বার্নার্ড আর ভিক্টর সাহেবের ঘোড়া গেল দাঁড়িয়ে; বার্নার্ড সাহেবের ঘোড়ার আগে আগে একটি সজারু যাচ্ছে। ওর শরীরের কাঁটা থেকে একটা শব্দও বেরুচ্ছে; পশুটি ডানে-বায়েও যাচ্ছে না, এক্কেবারে মাঝবরাবর এগোচ্ছে ধীর গতিতে। একে এড়িয়ে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়াও কঠিন; গেলেও শিশুদের মতো পা ফেলে ফেলে অতি ধীর গতিতে এগোতে হবে। ভিক্টর সাহেব গুলি করতেই যাচ্ছিলেন—বার্নার্ড সাহেব মানা করলেন; সজারু মারলে গায়ের থেকে কাঁটা ছিটকে পড়লে সেগুলো আবার হাতিকে বিপদে ফেলবে। আসলে পশুটি আলোতে কানা হয়ে পড়েছিল। মাংরা সরদার সাহেবদের আলো নেভাতে বলল, মশালগুলো সামান্য নামিয়ে দিল। পশুটি পাশে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। জোর কদমে ঘোড়া ছুটল, ছুটল মহিষের গাড়ি—চলল হাতিও। ধনিরাম আবার গান জুড়লঃ
    “ঘস ঘস না রে ভাই,
    ঘস ঘস না
    গদি-হাওদা
    তোর গহনা
    ফাঁদি মাহুতে সাজবে
    তোর বহনা।”
    ধনিরামের গান শেষ হবার পরেও বহুক্ষণ করতাল বাজিয়েই গেল কাতিয়া।



    টিকাঃ
    ১। খারঘর < কাঁড়ঘর; কাঁড় < তির। তির তথা অস্ত্র রাখার ঘর; অস্ত্রশালা।
    ২। দেরেসি= যিনি হাসপাতালে কাটাছেঁড়ার পরে বা আহতদের "ড্রেস' করান।
    ৩। গানটি প্রায় মূলেই রাখা হয়েছে। কেবল কিছু বাংলার অনুরূপ বর্ণান্তর করা হয়েছে, দুই একটি শব্দ পালটানো হয়েছে।




    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫
  • ধারাবাহিক | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন।