

অলংকরণ: রমিত
আমি দেখেছি যে কখনো কখনো সবচেয়ে দামী জিনিষগুলো এমন এমন জায়গা থেকে পাওয়া যায় যার কথা কেউ আগে থেকে ভাবতেই পারবেনা! তার মানে অবশ্য এ নয় যে আমি লোকটা অনেক "দামী জিনিষ"এর খোঁজ পেয়েছে এমন কেউ! তবু, কথাটা সত্যি তাতে সন্দেহ নেই। না'হলে কি আর অমন চমৎকার ছবিটা আমি চিলেকোঠার ঘরের মধ্যে খুঁজে পেতাম? দুনিয়ার আর সব জায়গা বাদ দিয়ে শেষে কিনা চিলেকোঠা, অ্যাঁ? যে ঘরটা বাড়ির মধ্যে আমার সবচেয়ে অপছন্দ?
না, এমনিতে চিলেকোঠা ঘরটাকে অপছন্দ করার কিছু নেই। কিন্তু ছোটবেলায় কেউ একজন আমাকে বলেছিলো যে রাক্ষসরা দিনের আলোয় বাইরে বেরোতে পারেনা, তাই সেই সময় ওরা চিলেকোঠার ঘুপচি অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে। মনে হয় ধুলো, ঝুল আর ডাঁই করা জিনিষপত্রের মধ্যে যাতে খেলতে না চলে যাই সেই জন্যই ঐ 'কেউ একজন' আমাকে এমনটা বুঝিয়েছিলো। কিন্তু মুশকিল হলো যে রাক্ষসের ভয় জিনিষটা আবার বেশ জেদী ধরণের একটা ব্যাপার। এ আমাদের মনের ভেতর বেশ গেড়ে বসে, যুক্তি খেয়ে খেয়ে মোটা তাজা হয়। আর বড় হবার পরেও সেখান থেকে নড়ার নামটি করেনা। বয়সের সঙ্গে ওর চেহারাটা বদলে যায় খালি।
এটা অবশ্য রাক্ষসের গল্প নয়। বলছিলাম তো ছবির কথা। কিম্বা তারও আগে, চিলেকোঠার কথা। তো চিলেকোঠায় সেদিন আমি কিছু পুরোনো জিনিষপত্র হাতড়াচ্ছিলাম। ভ্যাপসা গরম, ধুলোয় ভর্তি, চিমসে মতো গন্ধ আর সেই ঘুপচি অন্ধকার। তারই মধ্যে কিসের একটা গায়ে আমার পায়ের বুড়ো আঙুলটা বেজায় জোরে ঠুকে গেলো! গালাগালি করে তার সাতপুরুষ উদ্ধার করে দিয়ে পর দেখি জিনিষটা একটা সিন্দুক। পুরোনো, ভারী আর যথারীতি তার চাবির কোনো খোঁজ নেই! নাও, এবার এটা খুলি কী করে?! এক মুহুর্তের জন্য আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত কিলবিল নেমে গেলো। এই বাক্সের মধ্যেই যদি সে রাক্ষসটা লুকিয়ে থাকে? সঙ্গেসঙ্গে আমার মনের অন্য আমিটা বিরক্ত গলায় বলে উঠলো -- "কী যা তা বকছো! রাক্ষসের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই সিন্দুকের ভেতর লুকোতে যাবে? তাছাড়া ভয়ের থেকে কৌতুহল অনেক বেশি জোরালো সেটা তোমার মত গবেট ছাড়া সবাই জানে।" আরে গবেট টবেট অত সাত সতেরো বলার কী আছে! আমিই কী আর জানতে চাইনা এর ভেতরে কী আছে? কিন্তু চাবি ছাড়া খুলি কী করে?
এইবার কথা হচ্ছে যে বাস্তব ব্যাপার স্যাপারগুলো, যেমন চাবি দিয়ে তালা খোলা টোলা, এরা এমনিতে বেশ গোঁয়ার গোছের হয়; কিন্তু যদি কোনোভাবে এর মধ্যে কোনো ভাবে কয়েক ফোঁটা ম্যাজিক কিম্বা ফ্যান্টাসি ঢেলে দেওয়া যায় তাহলেই বাস্তব এমন বদলান বদলে যাবে যে আপনি ধারণাও করতে পারবেন না! আমিও পারিনি। কিন্তু আমার চোখের সামনেই সত্যি করে সেদিন বদলটা ঘটলো তো! আমি কী ভাবতে পেরেছিলাম যে অমন জগদ্দল চেহারার সিন্দুকের ডালাটা অমনি করে খুলে যাবে, শুদ্ধু আমি তালাটায় দুটো আঙুল বুলিয়ে দিয়েছি বলে? পরে অবশ্য জেনেছিলাম যে শুধু আঙুল বোলানো ছাড়াও আরো ব্যাপার ছিলো। কিন্তু সে ...পরে।
ঢাকনা খোলার সঙ্গেসঙ্গে ভেতর থেকে এক ঝলক বেগুনী ধোঁয়া বেরিয়ে এলো? কী? বেগুনী ধোঁয়া নয়? আচ্ছা তাহলে সোনালী এক আলোর স্রোত? কিম্বা এক ঝাঁক নীলচে ঝিকমিকে পরী বললে কি বেশি ভালো শোনাবে? আচ্ছা আচ্ছা, এসব কিছুই হয়নি। হলো তো? আমি বানিয়ে বলছিলাম। ভাবলাম একটু নাটকীয় ভাবে বললে বেশ লাগবে শুনতে! নাঃ, আলো টালো কিচ্ছু না। তবে একটা শব্দ শুনতে পেলাম। ভারী নরম কোনো দীর্ঘশ্বাসের মত। যেন একটা কাঁচের ঘন্টা জলের অনেক তলায় কোথাও বেজে উঠেই থেমে গেলো। সেই যে কিছু কিছু শব্দ থাকে, বোঝা যায়না তাদের কানে শুনেছি না মনেমনে? এখানেও, আমি বুঝে উঠতে পারলামনা এ কি সত্যি কোনো শব্দ ছিলো, না শব্দের স্বপ্ন!
ভেতরটায় উঁকি মেরে তো মোটে কিছু দেখতে পেলামনা। এমনিতেই ঘরটা বেশ ঘুটঘুটে। আমার পুঁচকে টর্চের আলোয় অন্ধকার কমবে কী, যেন আরো বেশি ঘনিয়ে উঠেছে! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোতে চুলকোতে মনে মনে আবার একটা যুক্তি আর ভয়ের বাদানুবাদের জন্য তৈরী হচ্ছি, এমন সময় কে যেন নরম গলায় বললো -- "তোমাকে ওর মধ্যে হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।"
অ্যাঁ! কী? কে বললো কথাটা?!
--"আমি বহু পুরনো একজন ম্যাজিক। তোমার চিন্তা তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে কথা বলছি। সিন্দুকের ভেতরে হাত বাড়িয়ে দাও। কোনো ভয় নেই। এ যদি তুমি না হয়ে অন্য কেউ হতো তো সিন্দুকটা তার সামনে খুলতোই না।"
--"বলেন কী? আপনি 'ম্যাজিক'? ম্যাজিক আবার কথা বলতে পারে নাকি? কোথায় লুকিয়ে বসে এসব করছেন বলুন দেখি! কেউ প্ল্যান করে কোনো মশকরা করছে নিশ্চয়ই!"
--"ম্যাজিক অনেক কিছুই করতে পারে যা তুমি হাজার কল্পনাতেও ভাবতে পারবেনা! আমি কোথাও লুকিয়ে নেই। আমি শুধু 'থাকি'। একজিস্ট করি। আমাকে দেখা যায়না।"
-- "আরি বাপ! ঘন্টা খানেক আগে আমি একটা জয়েন্টে গোটা কতক টান দিয়েছিলাম বটে! কিন্তু সে তো এত কিছু কড়া নয় যে তার ঘোরে এমন সব চক্কর লাগবে!"
--"এটা কোনো 'চক্কর লাগা' নয়। মশকরাও নয়। সবকিছুই সত্যিসত্যি ঘটছে। বাস্তব। আচ্ছা, তোমায় বুঝিয়ে বলি -- এই যে সিন্দুকটা দেখছো, এটা যেমন তেমন সিন্দুক নয়। তোমাদের জগতেরও নয়। এর মধ্যে খুব দামী একটা জিনিষ লুকোনো আছে। দুনিয়ার সব রকম বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করার জন্য তাকে এই বিশেষ সিন্দুকটায় রেখে, খুব জটিল এক প্রাচীন ম্যাজিক দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। সেই ম্যাজিক হলাম আমি। এবার যার হাতে এই সিন্দুক খোলার কথা, একমাত্র সে এসে তালাটা হাত দিয়ে ছুঁলে তবেই এই জাদুমন্ত্র মিলিয়ে যাবে আর বাক্সের ডালা খুলে যাবে। বাকি আর কেউই, কোনো ভাবেই একে খুলতে পারবে না। এবার বুঝেছো?"
--"হ্যাঁ, বুঝলাম বৈকি! আপনি হলেন গিয়ে খোদ ভেরোনিকা গোর্লয়সেন! কিন্তু এসবের মধ্যে আমি আসছি কী করে? ঐ "শুধুমাত্র যার হাতে তালা খোলার কথা" এইসব আব্জিগুব্জি কথা তো মানতে পারা যাচ্ছেনা!"
-- "ওঃ! এই মানুষ জাতটা! এত কম জানে! এত কম বোঝে! এত অনুন্নত কল্পনাশক্তি!"
--"আরে দাঁড়ান দাঁড়ান! অতগুলো কড়া কথা বলাটাই বা কেমন হলো? এটা তো মানবেন যে এইটুকু সময়ের মধ্যে 'কথা বলা ম্যাজিক' আর 'অন্য গ্রহের প্রাণীদের পাঠানো সিন্দুক' এসব শুনলে যে কেউ ভড়কে যাবে? তার ওপর এই আমিই যে এক ‘দৈবপ্রেরিত মসীহা না পয়গম্বর’ সেটাও তো কোনোদিন জানতাম না! তো এতগুলো অবিশ্বাস্য জিনিষ বিশ্বাস করতেও তো মাথাটার একটু সময় লাগবে, নাকি?"
--"আমি "দৈবপ্রেরিত" বা "মসীহা" এইসব কিছুই বলিনি। এরকম অতি নাটকীয় শব্দ শুধু তোমরা মানুষরাই ব্যবহার করো। আমি কোনো অন্য গ্রহের প্রাণীর কথাও বলিনি। এই সিন্দুক এই গ্রহেরই জিনিষ। কিন্তু অন্য এক মাত্রার। অন্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের। তাই তোমাদের মাত্রার কেউ একে দেখতে পায়না। শুধু কোটিতে গুটিক মানুষ, যাদের মস্তিষ্কে দুটো একটা বাড়তি ভাঁজ আছে, তারা অন্য তরঙ্গের ঘটনা দেখতে, শুনতে কিম্বা অনুভব করতে পারে। বোঝা গেলো?"
--"হ্যাঁ হ্যাঁ, জলের মত। মানে তো এই যে 'ইন্টারস্টেলার' শুধু সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ নয় আর আমি এমন এক খলিফা যে কলকেতে দম না দিয়েই টং হয়ে থাকতে পারে! এ আর না বোঝার কী আছে? শুধু এটুকুই বুঝতে পারছি না যে এ হেন এক শিরোপার জন্য ধন্যবাদটা কার পাওনা, আপনার না রডরিগেজের!"
-- "রডরিগেজ লোকটি এর মধ্যে কী করে আসছে? সে আদৌ কে?"
--"সে আদৌ একটি লোক যে পুরিয়া বিক্কিরি করে।পুরিয়া বোঝেন তো? উইড। পট।"
--"আর তোমার এই রকম বলার সুর, এটা কি ... দাঁড়াও মানেটা দেখে নিই ... হ্যাঁ, ব্যঙ্গোক্তি?"
--"হায়, মামু গো! মানুষের সাধারণ একটা কথার ভাব বুঝতে আপনাকে ডিকশনারী দেখতে হয় ম্যাজিকা দেবী?"
--"তোমার মামা এখানে .... যাক গে! তোমাদের ভাব আর ভাষা দুইই আমাদের থেকে অনেক আলাদা। আমাদের ভাষায় কোনো শব্দ নেই। 'ভাব'ও না। তবে সেসব কথা থাক। তুমি এখন সিন্দুকের মধ্যে হাত বাড়িয়ে দেখো কী হয়।"
অগত্যা,আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। দেখি সিন্দুকের অন্ধকারের ভেতরে কী যেন একটা জ্বলজ্বলে জিনিষ হয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিচাঁদের রাতে অনেক নীল তারার আলো একসাথে জুড়লে যেমন দেখাবে, তেমনি। আলোটা আস্তে আস্তে একটা আকার নিতে লাগলো। আমার মনে হলো চৌকো ফ্রেমের মত কিছু একটা। ঝুঁকে তার নাগাল ধরতে যাবো, তো জিনিষটাই ভাসতে ভাসতে উঠে আমার হাতে এসে ঠেকলো। আমি ভেবেছিলাম ঠাণ্ডা একটা স্পর্শ পাবো। মনে হয় ঐ নীলচে ঠাণ্ডা আলোর জন্যই এমন ধারণা হয়েছিলো। কিন্তু হাতে লাগতেই দেখি সেটা গরম! ঠিক জীবন্ত প্রাণীর মত! শুনেই কেমন গা শিউরে ওঠে, না? কিন্তু সেইদিন, ততক্ষণে আমি সব শিউরানোর বাইরে চলে গেছি। তখন আর কোনো কিছুতেই আমার চমক লাগতে পারতো বলে মনে হয়না!
এইবার বুঝতে পারলাম যে জিনিষটা একটা বড়্সড় বাঁধানো ছবি। ছবির ভেতরে থেকে একজন মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। লাল পোশাক, কালো চুল, সম্ভ্রান্ত চেহারা। এটা কি কোনো রাণীর ছবি নাকি? নাকি পুরাণের কোনো দেবী? আমি অবাক হয়ে দেখতে থাকি। অদ্ভুত একটা ব্যক্তিত্ব ঠিকরে আসছে। যেন দৃঢ়তা আর কোমলতা, ক্ষমতা আর করুণা, শক্তি আর মমতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে! পুরো একটা মিনিট আমি বাক্যিহারা হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ... মহিলাটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন!
এইবার এইখানে আপনি কি আশা করবেন বলুন? ঐ এতক্ষণ যিনি বকবক করে আমাকে ব্যোমকে দিচ্ছিলেন সেই মিস ম্যাজিকা মিস্টিরিয়াস এসে আমার সাথে এই রহস্যময়ী নারীর আলাপ করিয়ে দেবেন, তাই তো? তাই না তাই! আর তাঁর সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না! অগত্যা নিজেই ভারী গুছিয়ে আলাপ পরিচয় করার জন্য তৈরী হলাম -- "ইয়ে, এই যে আমি, ধুৎ কী বলছি !আমি না আমি না ...আপ্্ মানে আপনি ... ইয়ে, আপনি কে সেটা তো..."
উনি আবার হাসলেন। হাসির মধ্যে অনেক খানি প্রশ্রয় -- "আমি রক্ষকদের একজন।"
অ্যাঁ? রক্ষক? কিসের রক্ষা? আর ইনি রক্ষকদের 'একজন'? তার মানে আরো রক্ষক রয়েছেন? তাঁরা কারা? তাঁরা কোথায়? আমার মনের মধ্যে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঝাঁক বেঁধে হুড়মুড় করে ঢুকে আসছে!
-- "এটা তুমি জেনেই গেছো যে আমি অন্য তরঙ্গের এক জগতের বাসিন্দা। আমি ছাড়াও আরো চারজন আছেন। উপাধিটা শুনেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে আমরা 'রক্ষা' করি।"
-- "হ্যাঁ, কিন্তু কী রক্ষা করেন?"
-- "সভ্যতা, প্রাণ, গ্রহ, এইসব। তুমি কি জানো এই মহাবিশ্বে এমন অনেক শক্তি আছে যা চোখের নিমেষে সবকিছু ধুলো করে দিতে পারে?"
-- "অন্য আরো আছে নাকি? আমি তো ভাবতাম আমরাই বেশ পরিপাটি করে সেই কাজটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।"
উনি খিলখিল করে হেসে উঠলেন। আমার মনে হলো দমকা হাওয়ায় অনেকগুলো রূপোর ঘণ্টা একসাথে বেজে উঠলো।
-- "হ্যাঁ, তোমরাও করছো ঠিকই। তবে তোমাদের এখনও কিছু সময় লাগবে। এমন অনেকে আছে যাদের তাড়া আরো বেশি। সব প্রাণ মুছে ফেলে গ্রহটা নিজেদের কাজে লাগানোর জন্য নিয়ে নিতে ওদের তর সইছেনা। মানুষ, তোমরা এখনও বুঝতেই পারোনি যে তোমাদের এই পৃথিবীটার দাম কত বেশি।"
-- "ওরে বাবা! এ তো স্টার ওয়র্সের মত বলছেন! এরা কী করবে? এই এলিয়েনরা? আগুনের গোলা ছুঁড়ে মারবে, বিশাল বিধ্বংসী সব ভূমিকম্প ডেকে আনবে, এইসব? আমাদের সব মেরে ফেলবে সেটা তো বুঝতেই পেরে গেছি!"
-- "উঁহু, ব্যাপারটা অত মোটাদাগের নয়। ঐসব শুধু ঐ 'স্টার ওয়র্সেই' হয়। ওরা এমন কিছু করবেনা যাতে পৃথিবী গ্রহটার কোনো ক্ষতি হয়। এর সব পাথর, মাটি, এর খনিজ, জল, ধাতূ এইসব জিনিষের প্রচুর দাম।"
-- "ওহো, তাহলে বায়োলজিক্যাল ওয়েপন? এমন কোনো ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়া ছড়িয়ে দেবে যাতে মড়ক লেগে কিম্বা দুর্ভিক্ষ হয়ে সব মরেঝরে এক শা?"
-- নাঃ, অত কিছু করারই বা কী দরকার? আরো অনেক সহজেই তো কাজ হতে পারে। মনে করো তোমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে সামান্য এমন কিছু অদল-বদল করে দেওয়া হলো যার ফলে তোমাদের মধ্যে আর আনন্দ, খুশি, ভালোলাগা, ভালোবাসা এই অনুভূতি গুলো আর থাকবেনা। তখন প্রত্যেক দিন তোমরা এমন একটা জগতে জেগে উঠবে যেখানে শুধু দুঃখ, যন্ত্রনা, রাগ আর হতাশা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। এমন জীবন কে বাঁচতে চাইবে? মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেরাই নিজেদের মেরে ফেলবে। কোনো যুদ্ধ হলোনা, কিছু ধ্বংস করতে হলোনা, প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো ক্ষতি হলোনা। অথ্চ গ্রহটা ওদের দখলে চলে গেলো। এটা অনেক সহজ উপায় না?"
-- "কী সাংঘাতিক! এ তো ভয়ানক ব্যাপার!"
--"হ্যাঁ, আর এটা শুধু একটা উপায়। এমন আরো অনেক আছে। আরো চিন্তার কথা হলো যে আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। ওরা এর মধ্যেই এই কাজ শুরু করে দিয়েছে। সেটা হয়তো তোমরা কিছুটা অনুভবও করো, কারণটা ধরতে পারোনা যদিও। সময় খুব কম। খুব কম।"
উনি নিজের বাঁ হাতের পাতাটা উল্টে আমাকে দেখালেন। সেখানে একটা লিলি ফুলের ছবি আঁকা আছে। জলছবি কিম্বা উল্কি নয়। ছবিটা যেন ওঁর শরীরের, ওঁর অস্তিত্বেরই একটা অংশ। আমি দেখলাম ফুলটার পাঁচটা পাপড়ির মধ্যে তিনটে কালো রঙের। পুড়ে গেলে যেমন হয়। বাকি দুটো লাল।
-- "এই ফুলটা দেখছো? এটা হলো আমার অস্তিত্বের চিহ্ন। আমাকে একটা কাজের ভার দেওয়া হয়েছে। একটা বিশেষ অশুভ শক্তি যাতে মানুষ জাতিটাকে নিজেদের স্বার্থের জন্য বদলে ফেলতে না পারে সেই কাজ। এই যে পাপড়িগুলো কালো হয়ে যাচ্ছে, এর মানে ওরা জিতছে। যেদিন ওদের কাজ শেষ হবে, পাঁচটা পাপড়িই সেদিন কুচকুচে কালো হয়ে যাবে। আর সেই মূহুর্তেই আমি শেষ হয়ে যাবো।"
-- "শেষ হয়ে যাবেন! সে কী কথা! আপনি .... মরে যাবেন?"
-- "মরা, বাঁচা, এই জিনিষগুলো আমাদের ধারণায় নেই। আমি একজন রক্ষক। আমার যা কাজ তা করতে যদি আমি ব্যর্থ হই, তাহলে আমার অস্তিত্বের কোনো মানে থাকবেনা। তাই তখন আমি বিলুপ্ত হয়ে যাবো।"
-- "আপনি আসলেই একজন দেবী, তাই না? দেখুন আমি এতদিন এসব অবিশ্বাস করে এসেছি। কিন্তু এটাই তো দেবতার কনসেপ্ট, তাই নয়? সেই পুরাকাল থেকে তিন বা নয় বা যতগুলোই হোক দুনিয়াকে তাঁরা রক্ষা করেন!"
-- "তোমাদের কাল আর স্থানের ধারণা আমাদের সাথে ঠিক এক নয়। তাই ঐ যে বললে 'পুরাকাল', সেটা আমার কাছে কোনো মানেই বোঝায়না। আর 'দেবতা' বলতে তোমরা ঠিক কী বোঝো সেটাও আমার জানা নেই। হতে পারে তোমাদেরই কেউ কোনো সময়ে আমাদের এমন কোনো নাম দিয়েছে। যে জিনিষ সম্পর্কে লোকে স্পষ্ট ধারণা করতে পারেনা, তাকে এরকম কোনো রহস্যময় পরিচয় দেওয়া, এটা তো হয়েই থাকে।তবে আমি একজন রক্ষক ছাড়া আর কিছুই নই।" -- বলে উনি আবারও হাসলেন। আমার কেন যেন মনে হলো এই হাসিটার মধ্যে অনেকখানি চোখের জলের রং মিশে আছে!
মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেলো। ঠিক কী কারণে সেটা বুঝতে পারছিলামনা। সত্যি বলতে কী, অনেক কিছুই তো বুঝতে পারছিলামনা। মাথার মধ্যে খুঁজছিলাম -- উত্তর না ব্যাখ্যা না অন্য কিছু সে আমি নিজেই জানিনা।
উনিই আমার হয়ে কথা বললেন -- "এর কিন্তু একটা কারণ আছে। এই যে সিন্দুকটা দেখছো, এটা আমাদের একটা খুব সুক্ষ্ম যন্ত্র। এ হিসেব কষে এই জায়গাটার অবস্থান খুঁজে বার করেছে, তারপর আমি সমেত নিজেকে এইখানে নিয়ে এসেছে।এখানেই একজনের থাকার কথা যার এই যুদ্ধে একটা বড় ভূমিকা আছে। অমন করে তাকাচ্ছো কী? সে তুমিই।"
-- "তা কেমন করে হবে? আপনাদের কেমন যুদ্ধ, কারা আপনাদের শত্রুপক্ষ, যন্ত্র-সিন্দুক, আরো কী সব কঠিন অঙ্ক না রকেটসায়েন্স না কী জিনিষ খোদায় মালুম বললেন, সেসবের বিন্দু বিসর্গও তো আমি জানিনা! আপনাদের এই যন্ত্রটা খারাপ টারাপ হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। ভুল জায়গায় এসে নেমেছে!"
-- "আমাদের কোনো যন্ত্রের অঙ্ক কখনো ভুল হয়না। তুমিই সেই লোক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা ভুলে যেওনা যে তোমার মস্তিষ্কে ঐ কতগুলো বাড়তি ভাঁজ আছে। তুমি এমন অনেক কিছু দেখতে পাও যা অন্যরা পায়না। অনেক কিছু টের পাও যা অন্যদের অনুভূতিতে ধরা পড়েনা। এটা সত্যি যে আমি নিজেও বলতে পারবোনা ঠিক কীভাবে তুমি এই লড়াই লড়বে। কিন্তু মানুষ, তুমি কি একবার চেষ্টা করেও দেখবে না?"
এখন এই রকম পরিস্থিতিতে, এই রকম একজন যদি আপনাকে এই রকম প্রশ্ন করেন, আপনি কী বলবেন? "অবশ্যই! আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো" ছাড়া? কাজেই আমি ওঁকে বললাম -- "অবশ্যই! আমি তো যাকে বলে একেবারে আপ্রাণ চেষ্টা করবো।" এইবারে কথা হচ্ছে যে সুন্দরী নারী বা সুন্দর পুরুষের (যেমন আপনার পছন্দ) অনুরোধে বেশির ভাগ লোকেই বোকার মত এমন কিছু প্রতিজ্ঞা করে বসে পরে যার জন্য আফশোষের অন্ত থাকেনা। সেটা নতুন নয়। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে এই প্রতিজ্ঞাটা করার ফলে আমাকে তারও দশগুণ বেশি আফশোষ করতে হবে। বাঁচি কি মরি, প্রতিজ্ঞা তো আমি কিছুতেই ভাঙতে পারবোনা! কিন্তু এই প্রতিজ্ঞা রাখার জন্য কী যে ছাই করতে হবে তার মাথা-মুণ্ডু-অগ্র-পশ্চাতের কানাকড়িও আমার জানা নেই! অপ্রাণ চেষ্টা তো করবে বলেই খালাস। কিসের যে চেষ্টা তার কি কোনই ধারণা তোমার আছে? গবেট চন্দ্র!
-- "তুমি শুধু চোখ-কান খোলা রাখো। যখন সময় আসবে তখন হয়তো নিজেই বুঝতে পারবে কী করতে হবে।"
-- "আহা, কী ভালো পরামর্শই না দিলেন, লেডি স্কারলেট!"
--"ওটা তো আমার নাম নয়" -- উনি আবার হাসলেন -- "তবে তাতে কিছু আসে যায়্না। আমার আসল নাম তুমি উচ্চারণও করতে পারবেনা। এখন মন দিয়ে শোনো। আমি কিন্তু তোমার ওপরে অনেক ভরসা রাখছি। আর সময় যে বেশি নেই তাও তুমি জানো। যখনই কোনো কিছুর সন্ধান পাবে, এক মূহুর্তও দেরী না করে আমাকে খবর দেবে।"
--" আরে দাঁড়ান মশাই! কিসের যে খোঁজ করতে হবে তা'ই বুঝলাম না, কোথায়, কখন, কীভাবে তার কোনো ছাইমাথা জানা নেই! তার ওপর আপনাকে "এক মূহুর্ত দেরী না করে" খবর দেবটা কেমন করে? আপনার সেলফোন নাম্বার বা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে সেটা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করতে বলেন না?"
--" ওঃ, ভুলেই গেছিলাম যে তোমরা এখনও আদ্যিকালের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পড়ে আছো। এদিকে এসো।"
আমার ডান হাতের তালুতে উনি একটা আঙুল বুলিয়ে দিলেন। কী অদ্ভুত একটা অনুভূতি! মনে হলো যে অনেকগুলো বরফের কুচি আমার তালুর ওপর নাচ জুড়ে দিয়েছে। যদিও তখনো অবাক হবার ক্ষমতা আর বিশেষ বাকি ছিলো না, তবু অবাক হয়ে দেখলাম আমার হাতের ওখানটায় একটা আয়না আঁকা হয়ে গেছে। ছোট্ট এত টুকুন আয়না, কিন্তু কী সুক্ষ্ম তার কারুকাজ!
--"এটা আমার চিহ্ন। যতদিন আমি থাকবো, ততদিন ঐ আয়না তোমার হাতে আঁকা থাকবে। যেদিন এই লিলিফুল পুরোপুরি কালো হয়ে যাবে, সেদিন ঐ চিহ্নও তোমার হাত থেকে উধাও হয়ে যাবে। যখনই আমাকে ডাকার দরকার হবে, আয়নাটার মাঝখানে আঙুল ছুঁইয়ো। আমি চলে আসবো।"
"তুমি ডেকো, আমি আসবো" শুনতে খুবই রোমান্টিক লাগে! কিন্তু দেখুন, রোমান্স টোমান্স মাথায় থাক, এখানে আমার গ্রহকে বাঁচানোর মত গুরুতর কথা হচ্ছে; কিসের থেকে, কাদের থেকে বাঁচানো তার পাত্তা কিছু বুঝতে পারি আর নাই পারি!
স্কারলেট অবশ্য আমাকে কিছু ক্লু দিয়েছিলেন -- "যাদের কথা বলছি তারা অসম্ভব শক্তিশালী প্রাণী। আর তেমনি নিষ্ঠুর। এই কাঁটালো জিভওয়ালা অপলক শয়তান গুলোকে এমনকি আমরা রক্ষকরাও পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি।ওদের সবথেকে বড় ক্ষমতা হলো ওরা নানা রকম চোখের ধাঁধা তৈরী করতে পারে। ইলিউশন। তুমি হয়তো দেখে বুঝতেই পারবেনা যে তোমার আশেপাশের মানুষদের মধ্যেই ওরা মিশে আছে। এও বুঝতে পারবেনা যে ঠিক কী ভাবে কী ধরণের কাজ ওরা করছে। তবে নিজেদের মধ্যে ওরা নানা রকম সংকেত চালাচালি করে। আমার কাছে একটাই সংকেতের খবর আছে। যেদিন দুটো সাপ সূর্য্যটাকে গিলে নেবে সেদিন জানবে ওদের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। তখন মহাধ্বংসের শুরু হবে। কোনোভাবে, কিছু উপায়েই তাকে আর থামানো যাবেনা। সংকেতটা মনে রেখো, দুটো সাপ, সূর্য্য। মহাপ্রলয়ের প্রতীক।"
দুটো সাপ আর সূর্য্য.... কথাটা আমার মনের মধ্যে টংটং করে উঠলো। আরে, এত চেনা লাগছে কেন এ জিনিষটা? কোথায় শুনেছি...নাকি দেখেছি কোথাও? আমি চোখ বন্ধ করে প্রাণপণে মনে করতে চেষ্টা করি। নাঃ, কিচ্ছুই মনে পড়ছেনা! কিছুতেই না।
যখন চোখ খুললাম, সামনে কেউ নেই। নীলচে আলো জ্বলা ফ্রেমের ছবি, লাল পোশাকের রহস্যময়ী রক্ষক, জগদ্দল একখানা সিন্দুক কিচ্ছুই না। গুমোট গরম আর ঘুপচি অন্ধকারে শুধু আমি একলা দাঁড়িয়ে আছি। শুধু আমি, আর আমার কাঁধের ওপর এক অজানা কাজের বোঝা, যার ওজন এই পৃথিবীটার সমান!