এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - পর্ব ১

    মৌ চক্রবর্তী
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • অলংকরণ: রমিত



    ১।। গুগুলের গোলেমালে


    গুগল ম্যাপ সাফ জানিয়ে দিল, ‘Your destination is on the right.’

    রূপসী গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। কানাইলাল শীলের মতো ঊনবিংশ শতকের এমন প্রাতঃস্মরণীয় বণিকের বাড়ি তবে এখানেই! নামার পরেই শুরু হলো আসল গ্যাঁড়াকল। নিজের ডান আর বাঁ—এই দুটো প্রাথমিক দিক ছোটবেলা থেকেই ওর দারুণ গুলিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামলাতে ও হাত ঘুরিয়ে ফোনটাকে সোজা করতে চাইল, কিন্তু গোলমেলে ম্যাপটা ফপাস করে নিজের মতো আবার ঘুরে গেল! ভূগোলে কাঁচা ও চিরকালের, দিক নির্ণয়ে জ্ঞান পুরো শূন্য। ইদানীং জিপিএস আর গুগল ম্যাপের কল্যাণে জীবনটা কোনোমতে পার হয়ে যাচ্ছে, নইলে যে কী হতো!

    যেমন ঠিক এখনই হচ্ছে। বারবার দিক পাল্টে ম্যাপটা ওকে দিব্যি নাচাচ্ছে। প্রথম ৩০-৪০ সেকেন্ড রূপসী ব্যাপারটা একেবারেই ধরে উঠতে পারল না। তারপর হঠাৎ খেয়াল হতেই নিজের চরম বোকামিতে নিজেই ফিক করে হেসে ফেলল—ও যেদিকে নিজে ঘুরছে, মোবাইলের স্ক্রিনে ম্যাপের নীল তির চিহ্নটাও ঠিক সেদিকেই তাল মিলিয়ে ঘুরে যাচ্ছে!

    ঝটপট বুদ্ধি করে ম্যাপটার একটা স্ক্রিনশট মেরে নিল ও। চশমাটা নাকের ওপর আর একটু ঠেলে তুলে ভালো করে চোখ ছোট করে ফুটপাথের এপাশ-ওপাশ দেখল। কিন্তু দূর! শীলদের মতো পরাক্রান্ত পরিবারের আভিজাত্যের কোনো দেউড়ি বা বিশাল সদর ফটক তো দূরে থাক, নিদেনপক্ষে একটা মরচে ধরা পুরোনো গেটও চোখে পড়ছে না। শুধু নজর যাচ্ছে একটা ছ্যাঁকড়া, সরু গলির দিকে।

    গলিটার পেটে এই সাতসকালেই গাদাগাদি থিকথিকে ভিড়! থরে থরে সাজানো খোপড়ি খোপড়ি চালা দোকান। কাঁচা ঘুম ভেঙে আসা দোকানদারগুলোর মুখ দেখে একেবারেই মনে হচ্ছে না যে এরা কেবল এই সকালে এসেছে। এদের বাড়ি কি এখানেই, নাকি বাইরের লোক? সকালের সব দোকান অবশ্য এখনও খোলেনি। শুধু কিছু চায়ের দোকান আর খদ্দেরে গিজগিজ করা টিফিনের দোকান চালু হয়েছে। কোথাও ফুটন্ত চায়ের হাঁড়ি, কোথাও গরম রুটি-তরকারি আর তাজা ভাজাভুজির মাখোমাখো কারবার। পাশে ছাতুর ঠেলা, তার পাশে... ধুর! এত সব জেনে ও করবেটা কী!

    "নাঃ, এপাশে হবে না," মনে মনে ভেবে রূপসী ফুটপাথ ছেড়ে বড় রাস্তাটা পার হলো।

    হ্যাঁ, রাস্তার ওপারে পসরা আরও বিচিত্র। একদিকে প্লাস্টিকের রঙিন ঝুড়ি আর গামলা নিয়ে বসেছে এক পাইকারি বিক্রেতা, পাশে সার সার ছাতা বিক্রি হচ্ছে। আর তার ঠিক গা ঘেঁষেই একটা চশমার দোকান! না, দোকান বললে ভুল হবে—রাস্তার মোড়ে ঝুলে থাকা আস্ত একটা কাচের শোকেস। জামাকাপড়ের মতো চশমা যে এভাবে ফুটপাথের গায়ে ঝুলিয়ে খোলা আকাশে বিক্রি করা যায়, তা রূপসীর ধারাপাতেও ছিল না!

    পুরো দৃশ্যটা দেখে ওর মনে অদ্ভুত এক খেয়াল এলো—চারপাশের এই সমস্ত হাঁসফাঁস করা দোকানপাট আর ভিড় ঠেলে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো যেন কোনোমতে এই পৃথিবীর গায়ে গা ঘেঁষে ঝুলে কিংবা দাঁড়িয়ে আছে! ভাবনাটা মনে আসতেই রূপসীর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

    তা দেখে ঠিক উলটোদিকের চায়ের দোকানের গোঁফওয়ালা বুড়ো দাদুটি ভাবলেন, এই সাতসকালে এত সুন্দরী একটা মেয়ে বুঝি তাঁকে দেখেই ফিচেল হেসে ফেলল!
    বৃষ্টিটা এখন একটু থেমেছে।

    ফুটপাথের ঝুলন্ত প্লাস্টিকগুলো ঝেড়ে ঝেড়ে জল ফেলছেন দোকানদাররা। সেই জল ছিটকে রাস্তায় পড়ে লাফিয়ে উঠছে, আর ছাঁট লেগে ভিজে যাচ্ছে কালঘাম ছোটানো পথচলতি মানুষের জামাকাপড়। আহা, এটাই তো কলকাতার খাঁটি বর্ষা!

    দৃশ্যটা দেখে রূপসীর হুট করে মনে পড়ে গেল উনবিংশ শতকের সেই রেশমি কলকাতার কথা—প্রসিদ্ধ বণিক শ্রীযুক্ত কানাইলাল শীলের আমলের এক অন্য বর্ষার দিন। তখন পলিমাটি আর গাঙুড় নদীর হাওয়ায় ভেজা ছিল এই আস্ত শহর। বাতাসে ভাসত ইট-কাঠের নোনা-ধরা এক চেনা সোঁদা গন্ধ, আর ভাগীরথীর খাঁড়ি ঘেঁষা কাঁচা-পাকা নর্দমা উপচে একটানা বয়ে যেত শ্রাবণের বৃষ্টি। সেই সময়ের কলকাতা যেন ঢেকে থাকত এক অদ্ভুত ঠান্ডা, রুপোলি ধোঁয়াশায়। চিন বা বিলেত থেকে আসা বহুমূল্যের চালানি সুতি আর সিল্কের থান যাতে ভিজে ছারখার না হয়ে যায়, সেই ভয়ে আড়তের উঠোনে হুড়মুড় করে প্রকাণ্ড ত্রিপল টাঙাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন মহাজনরা।

    আর আজ? ক্যালেন্ডারের পাতায় শতক বদলালেও শহরের সেই থিকথিকে, জ্যামজ্যামে জল জমাটা কিন্তু বিন্দুমাত্র বদলায়নি! মোড়ে মোড়ে নীল-সাদা রঙে ‘সৌন্দার্যায়ন’ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওই প্লাস্টিকটুকু ছাদ করে বেঁচে থাকার ছবিটা একই রয়ে গেছে। হ্যাঁ, ইতিহাসের পাতায় শীলদের মতো এদের নাম হয়তো লেখা থাকবে না, কিন্তু রুজিরুটির ম্যাপে এরা ঠিক জায়গা করে নিয়েছে—আজ শীলদের রাজত্বেই ফুটপাথ দখল করে জাঁকিয়ে বসেছে এরা।

    পিঠোপিঠি ছোট ছোট দোকানের কী সাংঘাতিক ভিড়! সাতসকালেই এত কিলবিলে মানুষ? প্লাস্টিকের ডালা, হরেক ঝুড়ি-পাত্রের দোকান, আর তার পাশেই সারি সারি চায়ের সাথে সকালের জলখাবারের দোকান। কাজের চাকা ঘোরার আগেই অসংখ্য মানুষ পথচলতি অবস্থাতেই প্রাতরাশ সেরে নিচ্ছেন। বাইরে কালো করে আসা মেঘলা আকাশ দেখে বোঝার জো নেই যে সকাল হয়ে গেছে বহুক্ষণ।

    মোবাইলটা বের করে একটা ঝটপট এডিট-ছাড়া ছবি তুলে নিল রূপসী। মেঘলা দিনের আলোয় ফুটপাথ, ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড়—ছবিটা এতটুকু কৃত্রিম নয়। দেখলে বোঝার উপায়ই নেই এটা আধুনিক প্রযুক্তির কলকাতা নাকি অনেক কাল আগের কোনো স্মৃতিকথা! এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণামূলক লেখালেখি করতে হবে ওকে। কিন্তু তার আগে শীল-প্রাসাদের সেই ঠাকুরদালান আর মহলের মূল অংশটা খুঁজে বের করা চাই।

    ভারী অদ্ভুত এই পাড়াটা! শহর হিসেবে জায়গাটা কত শত বছরের পুরোনো, কিন্তু রাস্তার এই অস্থায়ী দোকানগুলো নিশ্চয়ই অত পুরোনো নয়। কবে থেকে এদের আনাগোনা? কতশত পরিবার এই চিলতে ফুটপাথে ব্যবসা করে সংসার চালায়?—চিন্তাগুলো ওর মাথায় পোকার মতো গিজগিজ করছিল। কে দেবে এসব অচেনা রহস্যের উত্তর? রূপসী জানে, সঠিক মানুষটিকে একবার খুঁজে পেলেই ব্যস, কেল্লাফতে!

    কলকাতা তো আর একদিনের শহর নয়; ইংরেজরা আসার বহু আগে থেকেই এই প্রাচীন নদী তীরে চলত রমরমা বাণিজ্য। সেই সব হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসই আজকের কলকাতার 'হেরিটেজ ভ্যালু' বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখনও পুরো শহরজুড়ে প্রাচীন প্রাসাদ আর বণিকবাড়ির সন্ধানে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন একদল মানুষ। রূপসীও তাঁদেরই একজন। আর নিজের এই ঐতিহাসিক অভিযানের সূচনাতেই ও বেছে নিয়েছে রূপকথার মতো রহস্যে ঘেরা বউবাজার আর তার আশেপাশের এলাকাকে।

    শীল পরিবারের ইতিহাস তো এই অঞ্চলে প্রবাদপ্রতিম! রূপসীর মাথা এখন উনবিংশ শতকের সেই সোনালী ইতিহাসের ঘূর্ণিপাকে পাক খাচ্ছে।

    তখনকার উত্তর ও মধ্য কলকাতায় শীলদের মতো ধনী আর প্রভাবশালী পরিবার খুব কমই ছিল। সিল্ক আর সুতি বস্ত্রের বিশ্বজোড়া কারবার ছিল তাঁদের—চিন, বিলেত আর দেশের নানা কোনা থেকে সেরা মানের রেশম ও সুতি কাপড় আমদানি-রপ্তানি করে পাইকারি বাজার কাঁপাতেন তাঁরা। আর ছিল জমিজমা, প্রপার্টি ট্রাস্ট আর রিয়েল এস্টেটের বিরাট হাঁকডাক। বউবাজার, শিয়ালদহ, বি. বি. গাঙ্গুলী স্ট্রিট আর পুরো উত্তর কলকাতা জুড়ে অগণিত জমি আর অট্টালিকা বানিয়েছিলেন তাঁরা, যার সিংহভাগই পরবর্তীতে দেবোত্তর ট্রাস্টে দান করে যান। কালক্রমে সেই ঐতিহাসিক ইমারতগুলোর একতলা ভাড়া দেওয়া হয় নানারকম ছোট ব্যবসায়ী আর কারিগরদের। এই কানাইলাল শীলের নাম অনুসারেই তো বউবাজার আর ফিয়ার্স লেন সংলগ্ন রাস্তাটির নাম ‘কানাই শীল স্ট্রিট’।

    "কিন্তু এমন পরাক্রান্ত ধনকুবেরদের আসল বাড়িটা কোনটা?"

    কথাটা মনে মনে আউড়াতে আউড়াতেই গলিটা পার হলো রূপসী। গুগল ম্যাপের দৌড় এবার সত্যিই শেষ! কানাই শীল স্ট্রিটের দূরত্ব দেখাচ্ছে ঠিক শূন্য মিটার। রূপসী একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কিন্তু কই? এখানে তো রাজপ্রাসাদ দূরের কথা, সাধারণ একটা থাকার মতো বাড়িসুদ্ধু চোখে পড়ছে না! থাকলেও হয়তো কালের নিয়মে ভেঙেচুরে কোনো প্রোমোটার বহুতল হাঁকিয়ে দিয়েছে।

    গলির সামনের মুখটার দিকে নজর যেতেই রূপসীর চোখ ছানাবড়া। ২০২৬ সালের কলকাতা—শহরের চেহারাটা কী মারাত্মক বদলে গেছে! দু’পাশের পুরোনো তিন-চার তলার ইমারতগুলো যেন ক্লান্ত হয়ে একে অপরের ঘাড়ে মাথা গুঁজেছে। দেওয়াল ঢেকে প্রকাণ্ড সব বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং একটার ওপর আরেকটা আছড়ে পড়েছে, শুধু ফাটল দিয়ে দেওয়ালের পলেস্তারা উঁকি মারছে।
    রূপসী হাতের পুরোনো নথির কাগজটা আরেকবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে মিলিয়ে নিল—কানাইলাল শীল স্ট্রিট বা কানাই শীল স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০১২। কলকাতা পুরসভার ৪৩ আর ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের একদম সীমানায়, বউবাজার আর জোড়াসাঁকো থানার ঠিক মাঝখানটিতে।

    হ্যাঁ, সেই কাঙ্ক্ষিত রাস্তার ঠিক মধ্যিখানেই ও দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে চোখ ঘোরাতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল—উফ, এত সকালেও কলকাতা ১২-র এই চিলতে, সরু আর আঁকাবাঁকা গলিটার যা রূপ, এককথায় হরেবল! ভেবেছিল ভোরভোর বেরোলে ফুটপাথের দোকানগুলো বন্ধ থাকবে, চারপাশ ফাঁকা থাকলে বাড়িটা খুঁজে পেতে সুবিধে হবে। কিন্তু কোথায় কী!
    দু’পাশে ঘ্যাঁসঘ্যাঁস করে চেপে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন জীর্ণ সব ভবন। একটু ঘাড় তুলে ওপরে তাকালেই পচে খসে পড়া ঝুল-বারান্দাগুলো কঙ্কালের মতো ফোকলা মুখে ভেঙচাচ্ছে। জং-ধরা কাঠের খড়খড়ি জানলাগুলো যেন বিদ্রুপের সুরে বলছে, "কী হে খুকি, হাতের ওই ডিজিটাল বন্দুকটা নিয়ে ইতিহাস শিকার করতে এসেছ?" দেওয়ালের ইট চিরে বেরোনো অশ্বত্থের শেকড়গুলো অবশ্য কংক্রিট ভেঙে এক টুকরো সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে চলেছে।

    আর অনেক নিচে? স্যাঁতসেঁতে গলির মধ্যে একদল মানুষের সকালের খাওয়াদাওয়ার উৎসব চলছে। আর তারও অনেক ওপরে, এই ধূলিমলিন পৃথিবীর কোনো তোয়াক্কা না করেই মেঘলা আকাশটা দূরে বহুদূরে সরে যাচ্ছে।

    ঠিক তখনই আবার এক পশলা ঝুম বৃষ্টি ঝেঁপে নামল! ভিজে একাকার হয়ে রূপসী ভাবল—এবারে ও করবেটা কী?

    বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে গলির ভেতরে একটা মাথার ওপরের টিনের শেড পেয়ে জুত করে দাঁড়াল রূপসী। মহামূল্যবান মোবাইলটা ভিজে সবাড় হওয়ার ভয়ে তড়িঘড়ি চালান করে দিল পকেটে।

    শেডের নিচে দাঁড়ালেই কেমন যেন একটা অদ্ভুত, চেনা-অচেনা গন্ধ নাকে এলো। কেমিক্যাল আর খাঁটি কাঁচ কাটার এক ঝাঁঝালো মিশ্রণ! গন্ধটা পেতেই মনটা একলাফে ফিরে গেল স্কুলের সায়েন্স ল্যাবে। ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেই ওর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করত—ওর চিরকালের পাগলামিতে কখন যে কোনটা ঠাস করে ফেটে বোম হয়ে যাবে!

    তবে এই ঠান্ডা বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে এখন বড্ড "চা-চা" করছে মনটা। এমন হাওয়ায় এক ভাঁড় চড়া লিকারের চা না হলেই নয়! হরির চায়ের কথা মনে পড়ল, কিন্তু ধুর! সেটা তো অন্য পাড়ায়, তার কায়দাই আলাদা। এখন ও এসেছে বউবাজারের এই চিপা গলিতে, যেখানে চায়ের দোকানের সাথে পাশের চায়ের দোকানের বেজায় সখ্যতা।

    পকেটের মোবাইল আবার সাবধানে বের করে গরম গরম ফুটন্ত চায়ের আর ওই ইয়া ইয়া চেহারার দোকানীর একটা ঝটপট ভিডিও তুলে নিল রূপসী। এই মেঘলা ভিজা সকালে এক ভাঁড় গরম চা যেন এক লহমায় ক্লান্তি উধাও করার জাদুকরী টনিক!

    কিন্তু চায়ে চুমুক দিতে দিতেই রূপসীর চোখ ঘুরে বেড়াল চারপাশের অদ্ভুত বৈপরীত্যের ওপর।

    গুগল ম্যাপ আর আর্কাইভের পুরোনো নথি সাফ বলছে, এই চিলতে গলিটাই কানাইলাল শীল স্ট্রিট। এখানেই উনবিংশ শতকের সেই ধনকুবের বণিকের রাজকীয় বসতবাড়ি। অথচ বাস্তব আর ইতিহাসের মাঝে যেন বিশাল এক রসিকতা লুকিয়ে আছে! এই চিপা গলির ভেতরে একতলায় গজিয়ে উঠেছে হরেক রকমের ঝলমলে সাইনবোর্ডওয়ালা ছোট-বড় চশমার দোকান আর বন্ধ কাচের শোরুম। আর তার পেটের ভেতর খাঁচা বানিয়ে জাঁকিয়ে বসেছে চায়ের ঝুপড়িগুলো। কাঠের বেঞ্চে বসে দেদার চা-সিগারেটের আড্ডা মারছে নানা বয়সের মানুষ—কেউ হাতে চশমার ফ্রেমের প্যাকেট নিয়ে তাড়াহুড়ো করে চুমুক দিচ্ছে, কেউ বা অনবরত লেন্সে স্যানিটাইজার আর কেমিক্যালের স্প্রে ছিটকে দরদাম হাঁকাচ্ছে।

    আর ঠিক উল্টোদিকে খসে পড়া পলেস্তারার সেই বিশাল প্রাচীন ইমারতটা! চুনকাম বহু যুগ আগে বিদায় নিয়েছে, উলঙ্গ লাল ইটগুলো জীর্ণ মুখ বের করে আজকের আধুনিক কলকাতাকে ভেঙচাচ্ছে। ওপরের তলায় কাঠের পুরোনো খড়খড়ি জানলা আর ঝুল-বারান্দাগুলো ভাঙা কোমর নিয়ে ঝুলে আছে।

    আর্কাইভের নথি পড়ে রূপসী জেনে এসেছিল—এই ইমারতের ভেতরে নাকি একসময় ছিল দিগন্তবিস্তৃত এক রাজকীয় ঠাকুরদালান আর বিশাল খোলা উঠোন! আর আজ? সময়ের কী অদ্ভুত পরিহাস!

    কাচের বয়ামে আট-দশ রকমের বিস্কুট সাজানো দোকানটায় একপাশে চেপে দাঁড়াতে গিয়ে রূপসীর হাত থেকে দু-একবার গরম চা ছলকে পড়ল। গলির লোকগুলো যা বেপরোয়াভাবে ধাক্কা মেরে গলে যাচ্ছে! সত্যি সত্যিই রাস্তাটা সরু বলে ধাক্কা লাগছে, নাকি এমন একটা ইয়াং মেয়েকে দেখে ইচ্ছা করেই গায়ের ওপর ঘেঁষে পড়ছে?—ভেবে মনে মনে একটু বিরক্তই হলো ও।
    চায়ের ভাঁড়ে আবার এক চুমুক দিল রূপসী। ধোঁয়া উঠে একমুহূর্তে ঝাপসা হয়ে গেল ওর চশমার কাচটা। চশমাটা পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছতে মুছতেই ভাবল—ঐতিহ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই রহস্যময় পাড়ার মূল মানুষটাকে এবার যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতেই হবে!

    চা শেষ করে থলিয়া থেকে পয়সা মিটিয়ে রাস্তায় নামবে, এমন সময় রূপসীর মনে হলো—পেটে একটু সাড় না দিলে এই প্যাচপ্যাচে সকালে ঘুরে ঘুরে খোঁজাখুঁজি চালানো অসম্ভব।
    দোকানদার ওর ইতস্তত ভাবটা ধরে ফেলে অমায়িক মুখে হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে বলে উঠলেন, "ক্যাঁ লিজিযেগা বেটি? বিস্কুট অউর নাস্তা কিজিযেগা হমারে সাথ?"

    রূপসী একটু হাসল। "একটা বিস্কুট দিন। আর সঙ্গে আরেক কাপ গরম চা।"

    দোকানী অমনি সচ্ছল হাতে ফুটন্ত কেটলি থেকে নতুন করে চড়া লিকারের চা ফোটাতে লাগলেন। থকথকে লিকারের ঝাঁঝালো গন্ধ আর চায়ের ভাঁড়ের গায়ে উপচে পড়া ফেনা দেখে রূপসীর মনে মনে হাসি পেল—ওর মা সঙ্গে থাকলে এখন ‘সেন্স অফ হাইজিন’-এর দোহাই দিয়ে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে বসত! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, চায়ের ভাঁড় থেকে ওঠা এই ধোঁয়া আর উপচে পড়া ফেনাটা এই ঘিঞ্জি গলি আর জীর্ণ বাড়িগুলোর সাথে যেন কী দারুণভাবে মানিয়ে গেছে!

    ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চায়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই রূপসীর চোখ গেল গলির মোড়ে। কয়েকটা পাড়ার ছেলে দামী স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে রাস্তার লাইটপোস্টের মতো নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জীর্ণ ইটের থামে এমন রাজকীয় কায়দায় হেলান দিয়ে আছে, যেন বাপ-ঠাকুরদার জমিদাবিদারি সামলাচ্ছে! কে জানে কতকাল ধরে কলকাতায় এই কায়দায় ফুটপাথ দখলের কালচার চলে আসছে!

    নজরটা জীর্ণ ইটের দেওয়াল থেকে একটু ওপরে তুলতেই রূপসীর মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়—ওরে বাবা! ইলেকট্রিক তারের এ যেন এক প্রকাণ্ড প্রলয়ঙ্করী জঙ্গল! নীল আকাশ বলে কিছু যে ওপরে আছে, তা বোঝার উপায় নেই। কোনোভাবে যদি এখানে একটা শর্ট সার্কিট হয়, আস্ত গলিটা চোখের নিমেষে ছাইয়ের স্তূপ হয়ে যাবে। উটকো ভাবনাচিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে তাড়াতাড়ি চা শেষ করে কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

    কিন্তু সেই মূল ঐতিহ্যবাহী বাড়িটা কোথায়?

    তার মানে বাইরের এই দোকানপাট, বিদ্যুতের তারের জঙ্গল আর নানারকম হাঁকডাকের আড়ালেই কোথাও আত্মগোপন করে আছে সেই সুবিশাল ইতিহাস? রূপসী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কলকাতার হেরিটেজ প্রপার্টিগুলোর দশা কেন যে সবসময় এমন কঙ্সারার মতো হয়! পলেস্তারা খসে গিয়ে নোনা-ধরা লাল ইটগুলো যেন থুপড়ি মেরে বসে থাকা দাদুর মতো ২০২৬-এর আধুনিক কলকাতাকে ফোকলা মুখে ভেঙচাচ্ছে। অথচ রূপসীর আজকের মিশনের মূল কাজই তো এই—বাড়িটি যদি সত্যিই সেই ঐতিহাসিক কানাইলাল শীলের বসতবাড়ি হয়, তবে প্রপার্টি ডিপার্টমেন্টে বিস্তারিত ড্রাফট তৈরি করে পাঠানো।

    রূপসী অধৈর্য হয়ে গলির ভেতরের দিকে হাঁটল। কুড়ি পা। না, কোথায় বাড়ি! সবই ছোট ছোট দোকান আর বন্ধ শোরুম। ও আবার পেছনে ফিরল। বাঁদিকের দেওয়ালে শুধুই কালো তারের জঙ্গল আর ঝুল বারান্দার কঙ্কাল। কোনটা শীলদের বাড়ি? এই তিনতলা দালানটা, নাকি পাশেরটা?

    ডানদিকের একটা খাঁজে ঢুকতেই চোখে পড়ল গুটখার ছাপ মারা আরেকটা জীর্ণ দেওয়াল। ও আবার বাঁয়ে দৌড়াল। পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই দেখল জিপিএস কাঁপছে, নীল ডটটা দিশেহারা হয়ে গোল গোল ঘুরছে! কানাই শীল স্ট্রিটের পেটের মধ্যেই ও দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মূল বাড়িটা যেন ভেলকি দেখিয়ে হাওয়া!

    কপালে ঘাম জমে উঠছে রূপসীর, চশমার কাচ ঝাপসা। টানা তিন-চারবার চিপা গলিটার এ-মাথা থেকে ও-মাথা চষে ফেলল ও। চশমার ট্রের ধাক্কা সামলানো, পার্সেল হাতে কুরিয়ার ছেলেদের দৌড়াদৌড়ি, তার ওপর বাতাসে সেই কাঁচ কাটার অ্যাসিডের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ! মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল রূপসীর। নিঃশ্বাস হাঁসফাঁস করছে, পা দুটো ভারী। ও বড্ড ক্লান্ত।

    আর না পেরে সোজা চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে কাঠের দাগধরা লালচে বেঞ্চটায় ‘ধপ’ করে বসে পড়ল রূপসী। পুরোনো মধ্য-কলকাতার এই অংশে আধুনিক শহরের সাজানো কৃত্রিমতা নেই, আছে শুধু ক্ষয়ে যাওয়া ইট-কাঠের অহংকার!

    সকালের এই ব্যাকুল অনুসন্ধান ওকে একদমই সফল হতে দিল না। তার ওপর হুট করে আসা হাওয়ার দাপটে চায়ের দোকানের পলিথিনের শেডটা একপাশে খুলে গিয়ে হুড়মুড় করে জল পড়তেই সবাই চম্পট দিল। রূপসীও আর না ভেবে পাশের একমাত্র আঁকাবাঁকা গলিটার ভেতরে উঠে গিয়ে আশ্রয় নিল।

    আর অমনি... সেই গলির অন্ধকার চিপা বাতাসে আবার ভেসে এলো সেই বিশেষ, রহস্যময় ল্যাবের গন্ধটা!

    ২। । ডায়মন্ড পেন


    বৃষ্টির সকাল বেড়াতে গেলে যত ভাল, শহরে তত নয়। ওরা একটা বড় চাতালে দাঁড়িয়েছে। অচেনা সব মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রূপসী। বলা যায় আশ্রয় নিয়েছে। শহরের শব্দ এখানে নেই। আর নেটওয়ার্ক?

    ঘুপচি গলিতে এসে ভিজতে থাকলে মেজাজটা খিঁচড়ে একসা হয়ে যায়। শহরের পুরো সাউন্ডট্র্যাকটাই হঠাৎ স্লো-মোশনে চলে গেল। কোনোমতে হাতের কাছে পাওয়া একটা প্রকাণ্ড জীর্ণ চাতালে গিয়ে আশ্রয় নিল। ও কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে, যে নোনা-ধরা পচা সোঁদা গন্ধের উঠোনে ও এসে পা দিয়েছে, ওটাই আসলে উনিশ শতকের সেই লেজেন্ডারি শীল পরিবারের মূল ঠাকুরদালান!

    রূপসীর মোবাইলের স্ক্রিনে ম্যাপের নীল ডটটা কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেয়ে হঠাৎ ধপ করে গায়েব হয়ে গেল—'নো নেটওয়ার্ক'। জিপিএস পুরো ডেড!

    চারপাশটায় কেমন একটা প্যাচপ্যাচে সেঁতসেঁতে অন্ধকার। ওপরে ছাদ থেকে জল পড়ার একটানা শব্দ। আর এই অন্ধকূপের মতো গুমোট ভাবটা পুরো জায়গাটাকে বড্ড ভুতুড়ে বানিয়ে রেখেছে। এক বিটকেল ঝাঁঝালো গন্ধ, কি যে হচ্ছে উফ। স্কুলের ল্যাবের কথা মনে পড়ে গেল রূপসীর। ওপরে তাকাতেই বুঝল লোক থাকে। বারান্দার কাঠের জানলার খাঁজে কিছু আধ-ময়লা গামছা আর ট্রাউজার ভিজছে। "ইশ, কী সোঁদা গন্ধ মাইরি! এখানেও মানুষ থাকে? কোনো কুলি-টুলি হবে হয়তো।"

    ও ভাবছিল, দূর ছাই, শীলদের বাড়িটার যদি আজ হদিশ না মেলে, তবে পুরো সকালটাই জলে যাবে। অনবরত বৃষ্টি ভোগাচ্ছে। যেন তাড়া করেছে ওকে এই শহর থেকে তাড়াতে। আর এই গলিটা যেন একটা ফাঁদ। বিটকেল গন্ধে দাঁড়ান দায়। রূপসীর মোবাইল বন্ধু অচেতন। তাই ও জানতেও পারছে না— যে ধূপ-বৃষ্টি আর সোঁদা গন্ধের চাতালে ও এসে দাঁড়িয়েছে, সেটাই আসলে ঐতিহাসিক বণিকের সেই বহুকাঙ্ক্ষিত কানাইলাল শীলের ঠাকুরদালান আর বিশাল উঠোন!

    যাহহ। নেটওয়ার্কের নীল ডটটা মোবাইলের স্ক্রিনে এতক্ষণ অনবরত পাক খাচ্ছিল। কিন্তু এই চাতালের অন্ধকার খিলানের নিচে ঢুকতেই ফোনের সিগন্যাল একেবারে শূন্য হয়ে গেল।
    ভেতরে ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি। টানা ‘ঝমঝম’ শব্দে ওর হিটলারের ক্যাম্পের কথা মনে পড়ল। বলল, “এখানে মানুষ থাকে কি করে? কোনো কুলি-কামিনরা মাথা গুঁজেছে।”

    গাড়ির আওয়াজগুলো আসছে না। এখানে বৃষ্টির ওই ছাদ থেকে পড়া জল-ই নায়ক। এটাও খুব পুরনো বাড়ি। চুনকাম-খসা, তিনতলা। ইয়া বড়। এই দালানটার শেষ নেই? এক জোড়া বড় বাগান হয়ে যাবে। এর মধ্যে থেকে একটু আলো আসছে। ফিনকি দিয়ে সাদা আলো। যেন দেখাতে চাইছে কেউ আছে, কেউ আছে। দেওয়ায়লগুলোর যা রঙ, টায় এমন কালো আকাষ ভাঙা, তাতে মনে হচ্ছে যে এখানেই শেষ। চোখ সইতে দেখতে পেল, ঘর কতগুলো। ঘরে জ্বলছ আলো। মিটমিটে। আজকালের এলইডি-র যুগে এসব কে জ্বালে ভাই? চোরা কারবারি নয় তো? টাকা ছাপবে??

    বৃষ্টি কেমন যেন অভিশাপের মতো পিছু নিয়েছে। নামা ইস্তক হচ্ছে। এখন তো খুবই অন্ধকার।

    এক বৃদ্ধ টুলে বসে বৃষ্টি দেখছেন। আর মেয়েটিকেও। রূপসী হাসল, উনিও। তারপর আলাপ শুরু হল। আপনি এখানে থাকেন?

    রূপসীই প্রথম কথা পাড়ল, "আপনি কি এখানেই থাকেন? আচ্ছা, ভেতরে অত ছোট ছোট ঘরে ওগুলো কী হচ্ছে বলুন তো? কোনো বেআইনি কাজ নাকি?"

    বৃদ্ধ মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, "না গো দিদিভাই! বেআইনি কেন হতে যাবে? এসব কাচের কারবারি। আপনি তো বাইরের লোক, তাই বুঝতে পারছেন না।"

    রূপসী মোবাইলটা পকেটে রেখে দিল। ওর জানতে চায়, কাচের কারবার? কাচ মানে আয়না। তার জন্যে এখানে কেন? আচ্ছা, হতেও পারে। কিন্তু কাচ মানেই আলো। এত কম আলোতে...? চোখ নষ্ট হয়ে যাবে তো?

    বৃদ্ধ হাসলেন। হ্যাঁ, ঠিকই তো কত চক্ষু যে দান করে চলেছে। সেটা কেউ জানে না।

    রূপসী আরও উৎসুক হল। বৃদ্ধ বলল, আমাদের কাজে আলোর রকম এটাই। দেখবে এসো তবে। ওর তো তর সইছিল না। এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে এই বয়সের তরুণীর যেমন হয় আর কি। উফ, বাঁচলাম। ও বলল। বৃদ্ধ শুনলেন কিনা কে জানে। আরও অন্ধকারে ঢুকতে হচ্ছে।

    হ্যাঁ, ব্যাপারটা বেশ। কলকাতার পুরনো বাড়ি মানে এই অবস্থা। এটাকে নরক বানিয়ে রেখেছে। বাইরে একটা নোটিশ ঝুলছে দেখেছে। কর্পোরেশনের নোটিশ। বিপজ্জনক বাড়ি। তাও এত লোক?

    আশ্চর্য! ওরা কী করছেন?

    একটা ঘর ছোট। অল্প আলো। তাতে ওই কাজের কিছু ছেনি হাতুড়ি, না জানি আর কি কি। চটের উপর সাজানো। না রাখা। চারজন লোক। লুঙ্গি পরা। ঝুঁকে কি যেন করছে। আর কেমন গন্ধ ছাড়ছে। অয়াক। অয়াক।

    সরে এল রূপসী। বৃদ্ধ বলল, এই নাও জল খাও।

    রূপসী বলল, ইম্পসিবল। কিসের গন্ধ ওটা? ওরা থাকেন কি করে? ওরা কারা?

    ওরা তো কাচ ঘষার কলু।

    মানে বুঝলাম না। কে এরা?

    ওরা কাচ ঘষে। চশমার কাচ।

    মানে? এইভাবে? এইসব কাচ দিয়ে চশমা?

    হ্যাঁ, কেন শোননি আগে। এটা তো চশমার বাজার। মানে, কাচের বাজার। এখানেই তো কারবার করে সব দোকান। এখানকারই কাচ চলে দোকানে দোকানে।

    চলে?

    হ্যাঁ, চলে মানে এটা করেই তো ডালভাত খাচ্ছে।

    আমার মনেহয় এই কারণেই ওরা আলো কমিয়ে কাজ করছে। হ্যাঁ, চোরা বাজার।

    না, এটাই আসল বাজার। এখানেরই কাজ চলছে কলকাতায়। তুমি যে চশমা পরে আছ সেটা?

    আমি ব্র্যান্ডেড পরি। আর চশমা কি ইয়ার্কির বিষয় নাকি? যে এখানে-সেখানে তৈরি হবে। আর যেসে করে ফেলবে। রীতিমতো পড়াশোনার ব্যাপার। যাক, এসব জালি কারবার হবে। কি বিশ্রী গন্ধটা। এখনও গোলাচ্ছে।

    বৃদ্ধ তর্ক করলেন না। আবারও জল দিলেন। বললেন, এখানে ঢুকে যখন পড়েছ, তখন বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত অপেক্কাহ করতে হবেই। তাই, বোসো এখানে। টুলে।

    রূপসী বসল। উপায় নেই। এখন বেরোতে পারবে না। এদিকের শেষটা খোলা। নানা ধরনের দোকানের বিজ্ঞাপন দেওয়া পাঁচিলের গা। দেওয়াল এটা। বিশাল দেওয়াল। এখানে এই বাড়িটা শেষ হয়েছে। কিন্তু উপরের দিকে পরপর লোহার ফ্রেম পরের সিলিংয়ে গিয়ে জুড়েছে। যেন ছাদের বাঁধুনি করেছে। হ্যাঁ, রূপসী প্রাচীন বাড়ি নিয়ে কাজ করে দেখেছে এরকম সিলিং বিরল কিছুই না। বরং, মজার হল ওপাশের পর। যেখানে জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো আলো ঢুকে আসছে। আলো একা। এরপাশে ঝুলছে একটা বিরাট প্লাস্টিকের ছাউনি। তার থেকে ঝুলছে কত চশমার ছবি। মারাত্মক তো। রূপসী ভেবেই নিয়েছে একবার বেরোতে পারলে হয়। চোরা কারবারিদের আড্ডায় ঢুকে পড়েছে ও।

    বৃদ্ধ এলেন। হাতে চা। খাও। বৃষ্টিতে ভাল লাগবে।

    রূপসী বলল, থ্যাকংস। আমি এত চা খাই না। আজকে বেশি হয়ে যাচ্ছে। থ্যাংকস।

    বৃদ্ধ বসেছেন আরেকটা টুলে। মাথায় টুপি। এতক্ষণে খেয়াল করেছে রূপসী। এরা তাহলে ... আচ্ছা। নাহ, এসব মাথায় আনা যাবে না।

    কিন্তু বৃষ্টি ধরলেই কাটতে হবে।

    বৃদ্ধ ওকে বললেন। একটা কথা জিজ্ঞেস করব দিদিমণি।

    হ্যাঁ, বলো দাদু।

    তোমার পাওয়ার একটু অড। অন্যরকমের।

    মানে?

    মানে বলছি কারণ, তোমার চোখের ওই কাচটা দেখে। মাইনাস সেভেন পয়েন্ট ফাইভ, তাই তো? সিলিন্ড্রিক্যাল পাওয়ার আছে। কাচটা ম্যানুয়ালি হ্যান্ড-গ্রাইন্ডিং করে কাটানো। ধারের ওই বেভেল বা খাঁজটা দেখে বুঝতে পারছি, কোনো পুরোনো ওস্তাদের হাতে গড়া। আজকাল কম্পিউটারের সিএনসি মেশিনে এই ফিনিশিং আসে না। যে লোকটা তোমার চশমার লেন্স ফিট করে দিয়েছে, সে এই লাইনের অন্তত ষাট বছরের পুরোনো কারিগর।"

    কথাগুলো অবিকল সত্য! ওর দাদুর দেওয়া চশমা। এর লেন্সটা ওর বোসদাদু বউবাজারের এক পুরোনো পারিবারিক চশমার দোকান থেকেই বানিয়েছিল। বলেছিল, না ভারি হোক যাইহোক না কেন এটাই পরবে। ও পরে তাই। চশমাটা জঘন্য নেমে নেমে যায়। বারবার নাকে ঘষে তুলতে হয়।

    বৃদ্ধ বললেন কীভাবে? ও জিজ্ঞেস করল। দাদু তুমি কীভাবে বুঝলে এত কিছু?" ওর অবাক হওয়ার শেষ নেই। উনি বললেন, এই আঙুলের ডগাগুলো ক্ষয়ে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে, চামড়ায় অসংখ্য ছোক-ছোক কাটা দাগ। একটু দেখলেই বুঝবে। এখানে আছি, কত হাজার হাজার জোড়া কাচ যে ঘষেছি। তার কোনও ইয়ত্তা নেই দিদিভাই। তখন তো এই ফাইবার আর প্লাস্টিকের হালকা লেন্সের জামানা ছিল না। কাচের ওপর ডায়মন্ড কাটার কলম চালিয়ে নিখুঁত মাপে কাটতে হত। সামান্য এক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলে পুরো লেন্স বরবাদ!

    তাই, এত কঠিন কাজ তুমি বলছ তুমিই করেছ?

    শুধু তাই নয়, আমাদের ওস্তাদরা বলতেন অন্য কথা। চশমা শুধু চোখের সামনে আঁটা একটুকরো কাচ নয়। ওটা হল অন্য মানুষের চোখ দিয়ে জগতটাকে স্পষ্ট দেখার মাধ্যম। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আর কলকাতায় ব্ল্যাকআউট হল। তখন জানলায় কালো কাগজ। নীল আলোয় লেন্স কাটার কাজ চলত। মজুরি ছিল মাত্র ৮ আনা! সেই গল্প শুনে আমরা এ লাইনে এসেছিলাম...।

    স্তব্ধ হয়ে গেছে রূপসী। আশ্চর্য তো! দাদু তুমি তো অদ্ভুত এক মানুষ।

    কেন গো দিদি। তোমার বয়স এখন কত?

    আমার বয়সের গাছ পাথর নেই। তা হবে তিন-চার কুড়ি।

    না, আরও এক কুড়ি যোগ করে দাও দাদু। দাদু তোমার একটা ছবি নেব। এখানে আলো কম। তুমি এদিকে এসো।

    রূপসী খুবই আগ্রহী। এবারে বলো তো তোমার এই গুণ তো বুঝলাম। এখানে সবাইই কি এরকমই?

    ও বুঝল, ও যা খুঁজছিল, তা ইতিহাস শীল প্রাসাদের অস্তিত্ব। কিন্তু যা পাচ্ছে, সেটা কোনও অ্যাকাডেমিক বইয়ের পাতায় লেখা নেই। সেটা আছে এই গলির এই বাড়িতে। চশমাপট্টি বলে একে। এখানে জীবন ভাসে ধুলো আর কাচের গুঁড়োয়।

    সাংঘাতিক তো।

    তাই?

    তাই নয়।

    তাহলে দিদিমণি শোন। যে গন্ধে তুমি বসতে পারছ না, সেই গন্ধেই কেটেছে আমার জীবনের বছরগুলো। আর আমার পর আমার ছেলের। তার ছেলেরও। কাটছে। এই যে শাঁ-শাঁ করে কাচ ঘষা হয়। তার সূক্ষ্ম গুঁড়োতে আমাদের কষ্ট হয়। একটা পাউডার লাগে আমাদের কাজে, সেটাতে কষ্ট হয়। বলবে মাস্ক পরার কথা। সামর্থ্য নেই। বড় কথা অভ্যাসও নেই। হ্যাঁ শুধু যখন হিরুর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তখন ওকে নিয়ে ছুটে যায় নাতি হাসপাতালে। ঠিক হলে ফের আসে, বসে, কাজ করে। আমাদের পড়ালিখা নেই। তাই, আর কি কাজ পাব?

    বড় বড় চশমার শোরুমের কাজ পাই। লেন্স বানাই, সেগুলো বিক্রি হয় হাজার হাজার টাকায়। বিশ্বেস নাহলে খোঁজ নিয়ে দেখো চারপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস কর। আমাদের এই গণ্ডির জীবন। মহাজন আর দোকানের মালিকের সব লাভ। আমাদের দিকে ক্ষতি।

    তাহলে তোমরা এই কাজটা বন্ধ করে দাও। আন্দোলন কর। তোমাদের ইউনিয়নকে বলো।

    সেকি হয়? না হবে? আমাদের এই কাজের যারা, তারা মুখ গুঁজে চোখ ঠুসে কাজ করে। কাজ না করলে টাকা নেই। আর জিনিসের যা দাম জানোই তো। চলে? আন্দোলন করার মতো আমরা সমর্থ নই। আমাদের পরিবারের কথা ভাবতে হবে তো? নাকি ...। আনন্দ একটাই। আমাদের বানানো চশমা পরে তোমার মতো মানুষ পড়তে পারবে। এটাই পাওনা।

    আপনার ছেলের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি, দাদু? রূপসীর কণ্ঠে প্রথাগত গবেষকের দূরত্বটুকু গলে গিয়ে এক অদ্ভুত আর্দ্রতা তৈরি হয়েছে।

    বৃদ্ধ বললেন, ওই যে বললাম, ওকে গতকাল ভর্তি করেছে। ঠিক হলে চলে আসবে। তাই তো বসে আছি। আমার তো আর যাওয়ার সামর্থ্য নেই। আর নাতি কাজ করছে। সারাদিনের কাজে কত আর পাবে? একটা কাটিং আর পাওয়ার সানাই করলে পাবে পঁচিশ থেকে ত্রিশ টাকা। খুব খাাটলে দিনে দশ-বারোটা লেন্স রেডি করা যাবে। তাহলে দিনশেষে সাড়ে তিনশো বা চারশো টাকা। তাতেই ঘরভাড়া থেকে খাওয়া। তাতেই ছেলের বাপের ওষুধের খরচ, সব ধরা। শরীর খারাপ মানে রোজগার শূন্য। হাসপাতালে বাবাকে দেখতে যাবে ছেলে তাতেও রোজগার শূন্য। তাই আমাদের কাজ করা ছাড়া উপায় নেই।

    রূপসী জিজ্ঞেস করল, তোমার ছেলের মোবাইল নাম্বারটা দাও তো। আমি জিজ্ঞেস করছি।

    বৃদ্ধ বললেন, ওর কাছে তো ফোন নেই মা। ফোন আমার নাতির কাছে। হাসপাতাল থেকে ফোন করলে, তাই রাখা।

    রূপসীর কেমন যেন লাগছে এসব শুনে। বৃদ্ধ বাবা অপেক্ষা করছে ছেলে ক্কখন হাসপাতাল থেকে ফিরবে? তারমধ্যে এই বৃষ্টি। ওর উপায় থাকলে ও ছুটে গিয়ে নিয়ে আসত। কিন্তু বৃষ্টি...।

    বৃদ্ধ বললেন, তুমি মা এত ভেব না। আমাদের এরকম অভ্যেস আছে। সারাদিন বসে থেকেও যদি দেখি সে এল না তখন ঘুমাতে যাব।

    "আপনারা এই কাজের কোনো সরকারি সাহায্য বা স্বাস্থ্যবিমা পান না?" রূপসীর প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধ হেসে উঠল। সে হাসিতে কোনও আনন্দ ছিল না।

    "আমাদের কোনো সংগঠন নেই দিদিভাই। না আমরা কারখানার খাতায় রেজিস্টার করা নাম। না আমাদের কোনও পরিচয়পত্র আছে। আমরা স্রেফ ঠিকে কর্মী। বাইরের লোক আজও। মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ বা বর্ধমান থেকে এসে এই শীল বাড়ির খুপরিগুলোয় পড়ে থাকি। কাজ করতে করতে মরে গেলে অন্য কেউ এসে বসে এই চটের পিঁড়িতে। সেও একই কাজ করবে। চাকার ঘোরাবে।

    বৃষ্টির তেজ আরও বেড়েছে। রূপসীর সন্ধানে কি ছিল। আর ও কি পেল। ও হতম্ভব। জিজ্ঞেস করল এটা কি বাড়ি বললে দাদু?

    দাদু বললেন, মেসবাড়ি। চশমা পট্টির মেসবাড়ি।

    রূপসী থমকে গেছে। চমকে গেছে আজ। যে ইতিবৃত্ত ও লিখতে শুরু করেছিল, তা কোনও পুরোনো জমিদারের সিল্কের ব্যবসার গল্প। সঙ্গে ওর কাছে কি কি চলে এল। এ তো এক সংগ্রামের ইতিহাস। যাদের লড়াই ঘোলাটে কাচ, আর আলো দেখাবার। আর তারা নিজেরা অন্ধকারের মহানাগরিক। যাদের হীরে কাটা কলমের দৃশ্যকাব্য কেউই লেখেনি। ও লিখবে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন।