এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো

  • রাষ্ট্র বনাম নদী

    তিস্তা
    গপ্পো | ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী

    অলংকরণ: রমিত



    নদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। সেই সৃষ্টির আদি থেকেই নদী তার আপন গতিতে বয়ে গেছে। তবে সংঘাতটা দেখা দিল সভ্যতা শব্দটা মানুষের অভিধানে ঢুকে পড়ার পর থেকে। সভ্যতা এল, তার হাত ধরে এল আইন। আর চূড়ান্ত বিবাদ শুরু হল তখনই। মানুষ বুঝল, নদী তার জন্ম থেকেই আইন অমান্য করে এসেছে। প্রথমে তারা পাহাড়ের অনুমতি ছাড়া নেমে এসেছে। তারপর জমির মালিকানা মানেনি। পরে সীমান্ত অস্বীকার করেছে। শেষে মানচিত্রকে পর্যন্ত অপমান করেছে।

    রাষ্ট্র বহুদিন এই অরাজকতা সহ্য করেছে। কারণ নদীকে গ্রেপ্তার করা সহজ নয়। সে একসঙ্গে বহু জেলায় থাকে, বহু ভাষায় কথা বলে, একই সঙ্গে মৃত এবং জীবিত থাকে। তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। সমন পাঠাতে গেলেও দেখা যায়, যে ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে, গত বর্ষাতেই সেখান থেকে সরে গেছে নদী। প্রশাসনিক চিঠি ফেরত আসে— 'গ্রাহক স্থান পরিবর্তন করিয়াছেন'।
    কিন্তু একটা সময় এসে প্রশাসনের শীর্ষস্তরে সিদ্ধান্ত হল, না নদীকে আর ছাড় দেওয়া নয়। এখন থেকে আইনের আওতায় আনতেই হবে নদীকে। এতদিন যা হয়েছে হয়েছে। শেষপর্যন্ত জলসম্পদ মন্ত্রক, পরিবেশ মন্ত্রক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, শিল্পোন্নয়ন দপ্তর, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী, জাতীয় মানচিত্র কমিশন এবং তিনটি বহুজাতিক অবকাঠামো সংস্থার যৌথ আবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বনাম নদী শিরোনামে ঐতিহাসিক মামলা দায়ের হল।

    অভিযোগের তালিকাও দীর্ঘ এবং স্পষ্ট।

    রাষ্ট্র অনুমোদিত প্রশাসনিক গতিপথ অমান্য করা। শিল্পাঞ্চলে জল প্রবেশ করিয়ে জাতীয় উৎপাদন ব্যাহত করা। নদীভাঙনের মাধ্যমে সরকারি ও ব্যক্তিগত জমি আত্মসাৎ। সীমান্তের কাঁটাতারকে বারংবার অবৈধভাবে অতিক্রম করে সার্বভৌমত্বকে খাটো করা। বিপুল পরিমাণ অবৈধ পলি ও বালি পরিবহন। শুল্ক বিভাগকে না জানিয়ে অবৈধ ভাবে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে মাছ আমদানি। এবং সবচাইতে গুরুতর অভিযোগ—রাষ্ট্রপ্রদত্ত মানচিত্রের সঙ্গে বাস্তবের ভৌগোলিক অমিল সৃষ্টি করা।

    সরকারি আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বললেন—
    “মাই লর্ড, একটা নদী নিজের ইচ্ছেমতো বয়ে যেতে পারে না। প্রতিটি ফোঁটা জলের ওপর রাষ্ট্রের সার্বভৌম আইনি অধিকার রয়েছে।”

    দুই

    আদালতের ভিতরে নদী ঢুকতে পারবে না—এই মর্মে আগের দিনই একটি বিশেষ প্রশাসনিক সার্কুলার জারি হয়েছিল। কারণ বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ও কাঠামোগত শৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য। নদী নাগরিক নয়, অতএব তার কোনো আইনি বা সাংবিধানিক অধিকার নেই। তবু যদি সে অনধিকার প্রবেশ ক’রে, বেঞ্চের কাজ ব্যাহত করে, তবে তাৎক্ষণিক তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রুজু হবে।'

    সকাল সাড়ে দশটা।

    বেঞ্চে তিনজন বিচারপতি। তাঁদের পিছনে সুউচ্চ রাষ্ট্রচিহ্ন। সামনে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে ঝলমল করছে মামলার শিরোনাম—রাষ্ট্র বনাম নদী। বামদিকে রাষ্ট্রপক্ষ, সরকারি কৌঁসুলি ও করপোরেট উপদেষ্টারা। ডানদিকে নদীপক্ষ।

    নদীপক্ষের টেবিলে কেউ বসেনি। তবু সেখানে থমকে ছিল এক বিষণ্ন ভেজা গন্ধ—যেন বহুকাল রোদ না-পাওয়া স্যাঁতস্যাঁতে কাঠের ভিতর থেকে উঠে আসা এক অচেনা নদীর শ্বাস!
    রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ালেন।

    —মাই লর্ড, অভিযুক্ত ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত।

    আদালত কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর বিচারপতি বললেন,
    —অনুপস্থিতিকে উপস্থিত ধরে নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া চলবে।

    আদালতের ইতিহাসে এই প্রথম অনুপস্থিতিকে উপস্থিত হিসেবে মান্যতা দেওয়া হল।

    প্রথম সাক্ষী: একটি মৃত মাছ।

    মাছটিকে কাচের একটি ফর্মালিনে ভরা স্বচ্ছ পাত্রে বিচারকদের সামনে আনা হয়েছে। ফরেনসিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শ করে শপথ করলেন।
    —যা বলব, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বলব।

    রাষ্ট্রপক্ষ জিজ্ঞেস করল,
    —মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ?

    —অক্সিজেনের তীব্র অভাব।

    —কেন এই ঘাটতি?

    —নদী অন্যায়ভাবে তার পথ বদলে মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

    রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে বিচারকদের দিকে তাকাল।

    কিন্তু জেরা করতে উঠে পরিবেশ কমিশনের এক প্রবীণ আইনজীবী দৃঢ় স্বরে বললেন,
    —অক্সিজেনের ঘাটতি হয়েছিল নদী পথ বদলানোর জন্য, না পাশের চামড়া ও রাসায়নিক কারখানার পরিশোধিত-না-হওয়া বর্জ্যের জন্য?

    ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ফাইলের পাতা উল্টোলেন। ফাইলের সেই বিশেষ অনুচ্ছেদটি কালো মার্কার দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া। সরকারি নথিতে তাকে বলা হয়—জাতীয় স্বার্থ এবং বাণিজ্যিক গোপনীয়তা।

    দ্বিতীয় সাক্ষী: একটি বৃহদাকার ড্রেজিং মেশিন।

    মেশিনের মালিক অবকাঠামো কোম্পানির তরুণ প্রতিনিধি তার হয়ে কথা বললেন। কেননা যন্ত্র মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না। প্রতিনিধি হাসিমুখে বললেন,
    —আমরা সততার সাথে নদী পরিষ্কার করি।

    একজন বিচারপতি জিজ্ঞেস করলেন,
    —কীভাবে?
    —নদীর বুকে জমা অনাকাঙ্ক্ষিত বালি ও পলি তুলে নিই।
    —তারপর?
    —নদী গভীর হয়, নাব্যতা বাড়ে।

    পিছনের সারিতে বসে থাকা এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী আস্তে করে বললেন,
    —নদী নয়, পকেট গভীর হয়।

    আদালতের কর্মচারী সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দিকে তেড়ে গিয়ে তাঁকে চুপ করিয়ে দিল।

    তৃতীয় সাক্ষী: একটি আধুনিক উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট।

    অদ্ভুত ও জটিল সাক্ষী। তার শারীরিক অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই, শূন্যে ভাসছে, অথচ তার তোলা ছবিই আজ আদালতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি। বড় ডিজিটাল স্ক্রিনে তার পেশ করা একের পর এক রঙিন উপগ্রহ-চিত্র ফুটে উঠতে লাগল।

    ১৯৮৪। ১৯৯৬। ২০০৮। ২০১৯। ২০২৫। প্রতিটা ছবিতে নদী একটু একটু করে তার রাষ্ট্র নির্ধারিত রেখা থেকে ডানে অথবা বামে সরে গেছে।

    রাষ্ট্রপক্ষ বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল,
    —স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্ত নদী বারবার রাষ্ট্র অনুমোদিত গতিপথ পরিবর্তন করে বেআইনি অনুপ্রবেশ করেছে।

    স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষক বৈজ্ঞানিক, সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি ছবি স্ক্রিনে আনতে চেয়েছিলেন। যেখানে দেখা যাচ্ছিল—নদীর সরে যাওয়ার আগে সেখানে ভারী কারখানা হয়েছে। কারখানার আগে বিশালাকার জলবিদ্যুৎ বাঁধ। বাঁধের আগে খনি। খনির আগে সবুজ বন কেটে সাফ করা হয়েছে।

    ​কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের তীব্র বিরোধিতায় আদালতে সে ছবি দেখানোর অনুমতি মিলল না।

    চতুর্থ সাক্ষী: নদীভাঙনে হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো জমির দলিল।

    কাগজের অর্ধেক নেই। বাকি অর্ধেকের কালি জলে ধুয়ে গিয়ে অস্পষ্ট। সরকারি কৌঁসুলি কাগজটা উঠিয়ে ধরে বললেন,
    —দেখুন মাই লর্ড, অভিযুক্ত কীরকম বেআইনিভাবে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি গ্রাস করেছে।

    দলিলের অস্পষ্ট লেখার দিকে তাকিয়ে বিচারপতি প্রশ্ন করলেন,
    —এই জমির বর্তমান অবস্থান?

    উপস্থিত রাজস্ব আধিকারিক মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বললেন,
    —জমিটা এখন চরের ওপারে, মূল নদীর তলদেশে।
    —তাহলে এই দলিলটা কার?
    কোর্টরুমে কেউ কোনো উত্তর দিল না। বহু বছরের পুরনো কাগজটি পরম সত্য হয়েও সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন ও মূল্যহীন হয়ে টেবিলে পড়ে রইল।

    পঞ্চম সাক্ষী: একটা পুরোনো কাঠের নৌকা।
    নৌকাটি আদালতের বাইরে রাখা হয়েছে। ভিতরে আনার অনুমতি মেলেনি। ভিডিও কনফারেন্সে তার ছবি দেখানো হল। নৌকার মালিক নেই। মাঝি নেই। নিঃসঙ্গ, ক্ষয়ে যাওয়া কাঠ।
    রাষ্ট্রপক্ষ বলল,
    —এটা পরিত্যক্ত।
    নথিভুক্ত করা হল—
    অকার্যকর জলযান। সাক্ষী হিসেবে গ্রাহ্য নয়।

    শেষ সাক্ষী: নদীর ধারের এক বৃদ্ধ মাঝি।
    তার বয়স জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিচারকের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
    —এই নদীর থেকে কিছুটা ছোট।

    আদালত কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
    —সংখ্যায় বলুন।

    বৃদ্ধ একটু ভেবে মৃদু হেসে বললেন,
    —সংখ্যা প্রতিদিন বদলায়। সময় বদলায়। নদীও তো বদলায়।

    কোর্টরুমে হালকা হাসির ঢেউ উঠল। রাষ্ট্রপক্ষ গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করল,
    —নদী কি নিজের খামখেয়ালি ইচ্ছায় পথ বদলায়?

    বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন,
    —মানুষ নিজের ইচ্ছেমত, প্রয়োজন মতো পাড় গড়ে, পাড় ভাঙে, পাড় বদলায়। নদী শুধু সব মনে রাখে।
    —আপনি কি পরোক্ষভাবে বলতে চাইছেন রাষ্ট্র দোষী?
    —আমি তো কিছু বলিনি হুজুর। আমি সারাজীবন শুধু নদীর কথা শুনেছি। আপনারা যদি নিজের কথা নদীর মুখে শুনে ফেলেন, সেটা আমার দোষ নয়।

    মুহূর্তের মধ্যে পুরো আদালতঘরে এক থমথমে নীরবতা নেমে এল।

    ঠিক সেই সময় আদালতের এক কোণে বসে থাকা স্টেনোগ্রাফার, হঠাৎই চমকে উঠে মাটি থেকে পা দুটো তুলে নিল। তার চকচকে চামড়ার জুতোর তলায় জল। প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না। তারপর দেখা গেল, সাক্ষীদের কাঠগড়ার নীচেও জল আসতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সেই জল বিচারকের এজলাসের দিকে এগিয়ে এল।

    ভবনের কোথাও কোনো পাইপ ফাটেনি, ছাদও সম্পূর্ণ অক্ষত, তবু ধীরে ধীরে সেই জল বেঞ্চের দিকে এগিয়ে এল। আদালতের পালিশ করা মেঝেতে জলের সরু রেখাগুলো মানচিত্রের সীমানা অতিক্রম করতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, কাঠগড়ায় নদী দাঁড়িয়ে নেই—আদালতই ধীরে ধীরে নদীর তলায় তলিয়ে যাচ্ছে।

    আতঙ্কিত প্রধান বিচারপতি তড়িঘড়ি হাতুড়ি ঠুকে এজলাস মুলতবি ঘোষণা করলেন।

    তিন

    পরদিন সকালে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার ঠিক আগে আদালত কক্ষে জাতীয় সংগীত বাজানো হল। তারপর তিনজন বিচারপতি আসনে বসলেন। প্রধান বিচারপতি চশমাটা মুছে নিয়ে লিখিত রায়ের নির্দেশনামা পড়তে শুরু করলেন—
    ‘রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, সর্বসাধারণের স্বার্থ, সীমান্ত নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জাতীয় জ্বালানি নীতি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক স্থিতিশীলতার সুদূরপ্রসারী প্রশ্ন বিবেচনা করে এই আদালত সর্বসম্মতিক্রমে নির্দেশ দিচ্ছে :
    অভিযুক্ত নদী অবিলম্বে রাষ্ট্র অনুমোদিত ভৌগোলিক সরলরেখা অনুসরণ করবে। তার অযাচিত বাঁক নেওয়া, অনিয়ন্ত্রিত পলি বিস্তার, চর সৃষ্টি, তীরভাঙন, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বর্ষাকালীন জলস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত লঙ্ঘন করার প্রবণতাকে ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কার্যকলাপ বলে গণ্য করা হবে। প্রয়োজনে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ প্রশাসনিক প্রকৌশল ও সামরিক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত করা যাবে।

    রায়ের শেষে সশব্দে হাতুড়ি ঠুকে বিচারপতি বললেন,
    —প্রকৃতিও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

    সেদিন সন্ধ্যায় দেশের সমস্ত সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হল—
    ঐতিহাসিক রায়! উন্নয়নের মহাসড়কে আর এক অভূতপূর্ব ধাপ! রাষ্ট্রের আইন মেনেই বয়ে যাবে নদী!

    পরের দিন শেয়ার বাজারে জল অবকাঠামো ও বাঁধ নির্মাণকারী সংস্থাগুলোর শেয়ার সূচক মুহূর্তের মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী হলো। পরিবেশ সূচক তাসের ঘরের মতো নিম্নমুখী হলো। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতিতে পরিবেশ সূচক বিনিয়োগকারীর ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

    যারা প্রতিদিন নদীর ধারে হাঁটতে বেরোয়, পরদিন ভোরে তারা ঘাটে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। খাঁ খাঁ করছে সুবিশাল খাত। হয়তো কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ত ভাবে জল জমা হয়ে আছে, কিন্তু তার সেই চিরচেনা বহমানতা উধাও। একটা আস্ত নদী যেন তার প্রাণটুকু বাদ দিয়ে কেবল কাদা আর পলি ফেলে পালিয়েছে।

    নৌকোগুলো শুকনো মাটিতে কাত হয়ে আছে, ঘাটের সিঁড়িগুলো এক অসীম শূন্যতায় গিয়ে শেষ হয়েছে। শুকিয়ে আসা কাদার মাঝখানে শুয়ে আছে অসংখ্য চকচকে ছোট-বড় মাছ—তাদের ফুলকাগুলো একটু নিঃশ্বাসে জন্য শেষ চেষ্টা করে নড়ছে।

    শিশুরা প্রথমে ভেবেছিল নদীটা বুঝি ছুটিতে গেছে। বড়রা ভারী গলায় বলল, এমন হয় না। তারপর তারা তড়িঘড়ি অফিসের জন্য তৈরি হতে চলে গেল, কারণ সকাল দশটার মধ্যে অফিসে বায়োমেট্রিক পাঞ্চ না করলে একদিনের বেতন কাটা যাবে।

    শহরের স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে কোনো সমস্যাই দেখা দিল না। বোতলজাত পরিশোধিত পানীয় জলের বিক্রি একলাফে চারগুণ বেড়ে গেল, বহুতল ভবনের কল খুললেই পরিষ্কার জল এল, ধনকুবেরদের গল্ফ ক্লাবের সবুজ ঘাস স্বয়ংক্রিয় স্প্রিঙ্কলারে ভিজল, শহরের মোড়ে মোড়ে সাজানো ফোয়ারাগুলো রঙিন আলোয় আগের মতোই চলল। এমনকি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদনও এক মিনিটের জন্য বন্ধ হলো না।

    জরুরি প্রশাসনিক বৈঠক ডাকার মতো কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। জলসম্পদ মন্ত্রক থেকে জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সংবাদপত্রে লেখা হলো—
    “পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কোনো প্রকার গুজব বা অপপ্রচারে কান দেবেন না।”

    সন্ধ্যার টেলিভিশন টকশোতে এক বিশিষ্ট আধুনিক পরিবেশ-বিশেষজ্ঞ বললেন—
    “আসলে মানুষ নদী আর জলকে অহেতুক গুলিয়ে ফেলে। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।” স্টুডিওর সুশীল দর্শকমণ্ডলীর মধ্যে করতালি পড়ল।

    পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সেমিনার আয়োজন করা হলো। সেমিনারের প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়— “আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রে নদীর ধারণার বৈজ্ঞানিক পুনর্বিবেচনা।”

    সেখানে একজন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মূল নিবন্ধ পাঠ করতে উঠে বললেন— “নদী হলো মূলত একটি প্রাক-আধুনিক ও রোমান্টিক ধারণামাত্র। একটি শিল্পোন্নত ও প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য যেকোনো উপায়ে জলসম্পদ প্রাপ্তিই যথেষ্ট।”

    উপস্থিত গবেষকদের অনেকেই এই গভীর তথ্য খাতায় নোট নিলেন। কেউ কোনো প্রশ্ন বা সংশয় প্রকাশ করলেন না।

    শুধু সেই বৃদ্ধ মাঝিটা প্রতিদিন ভোরে একা এসে দাঁড়ায় মেঠো পথ পেরিয়ে, ঠিক যেখানে একদিন নদী ছিল। হাতে তার পুরোনো বৈঠা। বৈঠাটা মাঝেমধ্যে মাটিতে ডুবিয়ে দেখে, তারপর মাথা নাড়ে।

    একদিন কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরল। একজন মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল— “দাদু, আপনার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে কী মনে হয়, নদীটা আসলে কোথায় গেল?”

    বৃদ্ধ অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। শূন্য চোখের দৃষ্টি মেলে বহু দূর পর্যন্ত চেয়ে রইল। তারপর মাটি থেকে কাঠের বৈঠাটা সযত্নে তুলে নিয়ে নিজের কাঁধে রাখল। ধীর গলায় বলল—
    “তোরা জলটাকে কায়দা করে ধরে রেখেছিস। নদীটাকে না।”

    সাংবাদিকেরা একে অন্যের মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল।

    পরদিন থেকে বৃদ্ধ মাঝিটাকেও আর ওই ঘাটের ধারে কোথাও দেখা গেল না। তবে এখনও ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন নিঝুম ভোরে, সেই শুকনো নদীর গভীর খাতের ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে অদৃশ্য কোনো এক বৈঠার দাঁড় ফেলার ছপছপ শব্দ ভেসে আসে…


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী
  • গপ্পো | ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন।