এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  নাটক

  • যজ্ঞডুমুর

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    নাটক | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫২ বার পঠিত


  • ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    চরিত্রলিপি ও পরিবেশনা
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    একটি ভৌতিক শ্রুতিনাটক। সময়: আনুমানিক ৩৫–৪০ মিনিট। ছয়জন শিল্পী, চারজন পুরুষ, দুজন মহিলা। শিল্পীরা বসে পাঠ করবেন; চোখ স্ক্রিপ্টে, অভিনয় কণ্ঠে।

    চরিত্র

    • সুমন (৩৮): নিমো গ্রামের ছেলে, বহু বছর ব্রুনাইয়ে তেল কোম্পানিতে চাকরি করে, পুজোর সময় দেশে ফেরে। রসিক, একটু বেপরোয়া, ভূতে 'বিশ্বাস করি না, তবে ভয় পাই' গোছের মানুষ। নাটকের কথকও সে।

    • রাজু (৩৮): সুমনের ছোটবেলার বন্ধু। নিমো স্টেশনের পাশে স্টেশনারি দোকান। হাসিখুশি, গলা চড়া, গ্রামে 'সাহসী' বলে নামডাক, কিন্তু একটা রাতের কথা উঠলে চুপ করে যায়।

    • মধু ঠাকুর (৭২): গ্রামের বুড়ো পুরোহিত, সুমনদের বাড়ির পুজো তিন পুরুষ ধরে করছেন। ধীর, খসখসে গলা।

    • হারা (হারাধন) (৫০): গ্রামের কালীসাধক। একা থাকে, শ্মশানের ধারে কুঁড়েঘর। গলা নরম, প্রায় আদুরে, হঠাৎ হঠাৎ পাথরের মত শক্ত। একই শিল্পী গাছের উপরের 'ডান কানের গলা' দেবেন।

    • মিতালি (৩৪): সুমনের স্ত্রী, কলকাতার মেয়ে, প্রথমবার শ্বশুরবাড়ির গ্রামের পুজোয় এসেছে। কৌতূহলী, সাহসী। একই শিল্পী 'বাঁ কানের গলা' দেবেন, খিলখিল হাসি ও হিমেল ফিসফিস, মাইক থেকে একটু সরে গিয়ে।

    • টুনি (৭): লাল ফ্রক, পায়ে রুপোর মল। গলা ফিসফিসে, মিষ্টি, একটু নাকি সুর।

    কম শিল্পী হলে: টুনির কণ্ঠ মিতালির শিল্পী দিতে পারেন (তখন বাঁ কানের গলা আগে থেকে রেকর্ড করে বাজান)। মধু ঠাকুর ও হারা একই শিল্পী করবেন না। দৃশ্য ৪ ও ৭-এ দুজনের গলা আলাদা শোনানো দরকার।

    আবহ (সাউন্ড) তালিকা

    • ট্রেনের শব্দ, হুইসল, স্টেশনের ঘোষণা, দূর থেকে মালগাড়ি

    • ঢাকের বোল (অষ্টমী/নবমী), কাঁসর-ঘণ্টা, শাঁখ

    • ঝিঁঝিঁ পোকা, শেয়ালের ডাক, শুকনো পাতায় পায়ের শব্দ

    • ঝুমঝুমি / রুপোর মলের হালকা শব্দ, নাটকের প্রধান মোটিফ, যতবার টুনি আসবে

    • শানপাথরে লোহা ঘষার শব্দ (ঘষ... ঘষ...): হারার মোটিফ, যতবার খাঁড়ার প্রসঙ্গ আসবে

    • দোকানের লোহার শাটারে টোকা, হ্যারিকেনের দপদপ

    • আগুন দাউদাউ করার শব্দ, সাপের হিসহিস, টুপটাপ ফোঁটা পড়ার শব্দ

    • হোমের আগুন চড়চড় করার শব্দ

    পরিবেশনার টিপস:
    ভয়ের জায়গাগুলোয় তাড়াহুড়ো নয়, নীরবতাই সবচেয়ে বড় আবহ সেখানে।
    ✦ চিহ্ন = অন্তত তিন সেকেন্ডের নীরবতা। দৃশ্য ২-এর ফ্ল্যাশব্যাকে হারার গলা একটু কম বয়সী করুন।

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ১: নিমো স্টেশন, সপ্তমীর সন্ধে
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: ট্রেনের ঝিকঝিক। দূরে হকার, "ঝালমুড়ি... শসা... বাদাম..." শব্দ ধীরে কমে আসবে।]

    সুমন (দর্শকের দিকে, কথকের সুরে): ভূতের গল্প বলতে বসলে সবাই প্রথমেই জিজ্ঞেস করে যে আপনি নিজে দেখেছেন? আমি সাধারণত বলি, ভূতে বিশ্বাস না করলে ভূতের দেখা পাওয়া চাপের। কিন্তু সেবার পুজোয়... যাক, গোড়া থেকেই বলি। সেবারে বিয়ের বছর পর গ্রামের বাড়ির দুর্গাপুজোয় ফিরছি প্রথম বার। সঙ্গে আমার স্ত্রী মিতালি, খাঁটি কলকাতার মেয়ে, জীবনে ধানখেত দেখেছে শুধু ট্রেনের জানলা দিয়ে।

    মিতালি: এই শোনো, তোমাদের গ্রামে নেটওয়ার্ক আছে তো?

    সুমন: নেটওয়ার্ক আছে। টাওয়ারের উপর একটা শকুন বসলে থাকে না, এই যা।

    মিতালি: ইয়ার্কি মেরো না। মা বলছিল পাঁচদিন যদি ফোন না ধরি, পুলিশে খবর দেবে।

    সুমন: দিক না। থানা আমাদের গ্রাম থেকে আঠারো কিলোমিটার। ওসি সাহেব এসে পৌঁছতে পৌঁছতে দশমী হয়ে যাবে, বিসর্জনের মিষ্টি খেয়ে ফিরে যাবেন।

    মিতালি: (হেসে) আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো, তুমি মাঝে এত বছর পুজোতে আসোনি কেন? মানে বিয়ের পর আমি তো প্রথম যাচ্ছিই, তুমিও তো শুনলুম এত বছর পর যাচ্ছ যে নতুনই বলা যেতে পারে!

    সুমন: আসলে কি জানত, ব্রুনাই থেকে পুজোয় ছুটি পাওয়া আর সুলতানের প্রাসাদে নেমন্তন্ন পাওয়া, একই প্রব্যাবিলিটি। তাছাড়া... (একটু থেমে) ছোটবেলায় গ্রামটাকে একটু ভয়ও পেতাম।

    মিতালি: তুমি? যে লোক শুনেছিলাম নাকি তেম্বুরাঙ জঙ্গলে রাতের সাফারিতে গিয়ে জলঢোঁড়া দেখে বোর হয়ে ফিরে এসেছিল?

    সুমন: জলঢোঁড়াকে ভয় পাই না। জলঢোঁড়া তো আমার ছোটবেলার খেলার সাথী। ভয় পাই... অন্য জিনিসকে।

    মিতালি: ওহ্‌ হো! আবার শুরু হল তোমার ব্রুনাইয়ের ভূত। সেই সী-ভিউ হোটেলের সামনে দৌড়নো ছেলেটা।

    সুমন: হাসছ? সেদিন রাতে আমি গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলাম কে বি থেকে বাঙালিদের আড্ডা শেষে। সী-ভিউ হোটেলের সামনে একজ ছেলে হঠাঠ করে রাস্তায় আমার গাড়ির সামনে চলে আসে। ব্রুনাইতে দিনের বেলাতেই রাস্তায় লোক হাঁটতে দেখা যায় না – আর সেদিন অত রাতে! এত কাছে বলে ব্রেক কষার সময় পাই নি ঠিকমত সেদিন। তোমাকে তো বলেছি গাড়িটা ওকে ভেদ করে চলে গিয়েছিল, মিতালি। যেন কুয়াশার ভেতর দিয়ে। রিয়ার ভিউ মিররে দেখি, কেউ নেই।

    মিতালি: (হালকা হাসি – অবিশ্বাসের ভার)

    সুমন: হাসছ তো? তোমাকে তো আমি আগেও বলেছি সেই পানাগার সমুদ্রের ধারে সেই দুটো বাচ্চা দুটোর ব্যাপারটাও, যাদের আমি ছুটতে গিয়ে দেখেছিলাম খেলতে। পরের দিন আমি অফিসে গিয়ে কলিগদের জিজ্ঞেস করি সমুদ্রের ধারে এত ছোট বাচ্ছাদের কিভাবে একা ছেড়ে দেয়! তখনি জানি সেই গা-হিম কর ব্যাপার। একটা কাঠের গুঁড়ি উল্টে চাপা দিয়েছিল আগের বছর দুটো ছোট বাচ্ছাকে। ওখানকার লোকে বলত, ওদের দেখতে পায় শুধু তারাই, যারা ঘটনাটা জানে না। জেনে ফেললে আর কেউ কোনোদিন দেখে না।

    মিতালি: আর তুমি?

    সুমন: ওমানি ভদ্রলোকের মুখে গল্পটা শোনার পর আর দেখিনি।

    মিতালি: ধুর কি যে বল!

    সুমন: আচ্ছা আর একটা ব্যাপার বলি তা হলে। তুমি আমাদের বাঙলোর সামনে ওই ফিলিপিনো ভদ্রমহিলাকে দেখেছো?

    মিতালি: হ্যাঁ মাঝে মাঝে দেখি তো। বাগানে গাছের পরিচর্যা করছে।

    সুমন: কোনদিন কথা বলেছো?

    মিতালি: না – তা বলিনি। কেন?

    সুমন: আর ওকে বাগান ছাড়া অন্য কোন কাজ করতে দেখেছো? বা ওর বরের সাথে কোথাও বেরোতে?

    মিতালি: (একটু ভেবে) তা তো মনে পড়েছে না। তবে ওকে আমি শুধু দেখেছি ঠিক সন্ধ্যে হবার আগে – আমি তো ভাবি যে রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিকেলে বাগান করে!

    সুমন: মুখটা দেখেছো?

    মিতালি: তাও দেখি নি কোনদিন। মাথায় একটা টুপি পরে মুখ নীচু করে কাজ করে যায়। কেন বলো তো?

    সুমন: সে অনেক বড় গল্প। নিমো স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে – পরে একসময় বলব।

    মিতালি: আবার এটা বলো না যে সেটাও ভূত! ✦

    [আবহ: ট্রেনের গতি কমছে। ব্রেকের কিচকিচ। স্টেশনের ঘোষণার ভাঙা গলা। দরজা খোলার শব্দ।]

    সুমন (কথক): নিমো স্টেশন। গত কয়েক বছরে একটুও বদলায়নি, এক কামরার টিকিটঘর, দুটো প্ল্যাটফর্ম, আর আপ প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ মাথায় সেই বুড়ো বেলগাছটা। সন্ধে নামছে। আর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে...

    রাজু (চড়া গলায়, দূর থেকে কাছে আসছে): সুমন! এই সুমন! ব্রুনাইয়ের সাহেব! এত বছর পর মনে পড়ল নিমোর কথা?

    সুমন: রাজু! তুই তো একই রকম আছিস রে। শুধু পেটটা একটু...

    রাজু: পেট না, ওটা অভিজ্ঞতা। (মিতালিকে) নমস্কার বউদি। আমি রাজু। এর ছোটবেলার সব কুকীর্তির একমাত্র জীবিত সাক্ষী।

    মিতালি (হেসে): নমস্কার। শুনেছি আপনার কথা। আপনার দোকানে নাকি ও কলেজের সময় রাত কাটাত?

    রাজু (হঠাৎ একটু থেমে): ... হ্যাঁ। ওই তো, স্টেশনের পাশেই আমার দোকান। খাতা, পেন, মোমবাতি, হজমিগুলি, নিমোর আমাজন বলতে পারেন।

    মিতালি: এই সুমন, দেখো। (গলা নামিয়ে) আপ প্ল্যাটফর্মের ওই শেষ মাথায়। দুটো ছেলেমেয়ে। হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। প্রেমের ব্যাপারে তোমাদের গ্রাম এত মর্ডান সেটা তো আগে বল নি! কিন্তু এই ভরসন্ধেয় ওরা ওদিকে কোথায় যাচ্ছে? ওদিকে তো আর কিছু নেই, শুধু বেলগাছটা।

    সুমন: কোথায়? ... ও হ্যাঁ, দেখেছি। গ্রামে প্রেম করার জায়গা কম, বুঝলে। স্টেশনের শেষ মাথাই ভরসা।

    মিতালি: মেয়েটার শাড়িটা দেখো... ভিজে। জল ঝরছে। বৃষ্টি তো হয়নি আজ।

    [✦ দূরে মালগাড়ির হুইসল।]

    সুমন: ওরা বেলগাছের তলায় পৌঁছল... আর... (থেমে) মিতালি, ওরা কোথায় গেল?

    মিতালি: এই তো ছিল! গাছের ছায়ায় ঢুকল আর... নেই। হাওয়ায় মিলিয়ে গেল যেন।

    রাজু (নিচু গলায়, অন্যরকম স্বরে): তোমরা দুজনেই দেখলে?

    সুমন: রাজু, কী ব্যাপার? কারা ওরা?

    রাজু: চল, আগে প্ল্যাটফর্ম থেকে নামি। এখানে দাঁড়িয়ে ওদের কথা বলতে নেই।

    [আবহ: পায়ের শব্দ, সিঁড়ি দিয়ে নামা। ঝিঁঝিঁ পোকা শুরু।]

    রাজু: তুই তো মাঝে বেশ কিছু বছর আসিস নি। তা সে প্রায় বছর পাঁচেক আগের কথা। শ্রাবণ মাস। পাশের গ্রামের একটা ছেলে, আর আমাদের নিমোর একটা মেয়ে। বাড়ির লোক মানেনি। এক বর্ষার রাতে দুজনে শেষ ট্রেনে পালাবে ঠিক করেছিল। ট্রেন এসেছিল। ওরা ওঠেনি। পরদিন সকালে দুজনকে পাওয়া গেল ওই বেলগাছের তলায়। একসঙ্গে, হাত ধরা অবস্থায়।

    মিতালি (ফিসফিস): ইশ্‌...

    রাজু: তারপর থেকে যারা শেষ ট্রেনে নামে, অনেকেই দেখে, আপ প্ল্যাটফর্ম ধরে দুজন হাত ধরাধরি করে বেলগাছের দিকে হাঁটছে। ডাকলে সাড়া দেয় না। কাছে গেলে মিলিয়ে যায়। (একটু থেমে) তবে একটা মজার ব্যাপার আছে, বউদি। যে একবার গল্পটা শুনে ফেলে, সে আর কোনোদিন ওদের দেখে না।

    মিতালি (সুমনের দিকে ঘুরে): সুমন! ঠিক তোমার ব্রুনাইয়ের মত!

    সুমন (অস্বস্তি নিয়ে): ভূতেরা বোধহয় ইউনিয়ন করে নিয়ম বানিয়েছে। ব্রুনাই থেকে নিমো, এক রুলবুক।

    রাজু: হাসির ব্যাপার নয় বউদি। (গলা আরও নামিয়ে) আর একটা কথা। ওই দুজনের পেছন পেছন নাকি মাঝে মাঝে আরেকজনকেও দেখা যায়। বুড়ো একটা লোক, হাতে কাপড়ে মোড়া লম্বা কিছু। তাকে কিন্তু গল্প শোনার পরেও দেখা যায়। কারণ সে... (থেমে যায়) থাক। চল, টোটো দাঁড়িয়ে আছে।

    [আবহ: টোটোর ইঞ্জিন। ধানখেতের হাওয়া। দূরে ঢাকের বোল।]

    সুমন (কথক): স্টেশন থেকে টোটোয় আধঘণ্টা। ক্যানেলের পাশ দিয়ে মাটির রাস্তা। দুপাশে কোমর পর্যন্ত ধান, সবুজ, ঘন, নিঃশব্দ। আর দূরে, ক্যানেলের ওপারে, একটা ছোট্ট জঙ্গল। ছোটবেলায় ওদিকে তাকাতে বারণ ছিল। আমি নিজের অজান্তেই মুখ ফিরিয়ে নিলাম। মিতালি নিল না।

    মিতালি: ওই জঙ্গলটা কী গো? একটা বড় গাছ আছে দেখো মাঝখানে... আর ওই যে... গাছের নিচে একটা লাল ফ্রক পরা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে... হাত নাড়ছে আমাদের দিকে!

    সুমন (থমকে): কোথায়?

    মিতালি: ওই তো... ওমা, নেই। ধানের আড়ালে চলে গেল বোধহয়।

    [আবহ: খুব হালকা একটা ঝুমঝুমির শব্দ, এক মুহূর্তের জন্য। ✦]

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ২: রাজুর দোকান, সপ্তমীর রাত
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: গভীর রাত। দূরে একটা কুকুর ডাকে। হ্যারিকেনের হালকা শোঁ শোঁ। মাটির ভাঁড়ে চা ঢালার শব্দ।]

    সুমন (কথক): রাতে মিতালিকে বাড়িতে মা-বোনের জিম্মায় রেখে গেলাম রাজুর দোকানে। লোডশেডিং। হ্যারিকেনের আলোয় দোকানের তাকগুলো কেমন ছায়ামানুষের মত লম্বা হয়ে আছে। পেছনের ছোট্ট ঘরটায় সেই তক্তপোষটা এখনও আছে। কলেজের সময় কত রাত কেটেছে এখানে।

    রাজু: নে, চা খা। আর বল, ব্রুনাইয়ে সত্যি সত্যি ভূত দেখেছিস, নাকি বউদিকে ইমপ্রেস করতে গল্প বানাস?

    সুমন: দেখেছি রে। কিন্তু জীবনে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম এই ঘরে। এই তক্তপোষে।

    রাজু (চায়ে চুমুক, তারপর চুপ): ✦ ... সেই অমাবস্যার রাতটা।

    সুমন: তোর মনে আছে?

    রাজু: মনে থাকবে না? আমি বর্ধমানে মাল তুলতে গেছিলাম, রাতে ফেরার ট্রেন পাইনি। তোকে বলেছিলাম দোকানে শুতে। আর তুই, সাহসী ব্রুনাই সাহেব, একা শুতে ভয় পেয়ে হারাকে ডেকে এনেছিলি।

    সুমন: হারা তখন ভালো ছেলে ছিল রে। চুপচাপ, কালীপুজোয় জবার মালা গাঁথত। কে জানত...

    [আবহ: শব্দ ধীরে বদলে যায়। ঝিঁঝিঁ জোরালো। একটা পেঁচা ডাকে। ফ্ল্যাশব্যাক শুরু।]

    সুমন (কথক, ধীর, স্মৃতিমগ্ন): কুড়ি বছর আগের সেই রাত। অমাবস্যা। বাইরে এত অন্ধকার যে হাত বাড়ালে নিজের হাত দেখা যায় না। আমি তক্তপোষে, হারা মেঝেতে মাদুর পেতে। মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে গেল একটা শব্দে।

    [আবহ: ঘষ... ঘষ... ঘষ... শানপাথরে লোহা ঘষার শব্দ। ধীর, ছন্দে।]

    সুমন (ফিসফিস): প্রথমে ভাবলাম ইঁদুর। তারপর চোখ সয়ে এলে দেখলাম, হারা মেঝেতে বসে আছে, আমার দিকে পিঠ করে। কোলে একটা লম্বা, বাঁকানো কিছু। আর একটা পাথরে সেটা ঘষছে। ঘষ... ঘষ...

    হারা (ফ্ল্যাশব্যাক, কম বয়সী গলা, নিচু সুরে মন্ত্রের মত গুনগুন): মা... ও মা... আজ অমাবস্যা মা... তুই তো ভোগ চাইছিস... নিখুঁত ভোগ... খুঁত নেই এমন... ঘষ... ঘষ...

    সুমন: ওটা একটা খাঁড়া। বলির খাঁড়া। আর সেটা বেরিয়েছে, আমি পরে বুঝেছি, আমি যে তক্তপোষে শুয়ে ছিলাম, তারই তলা থেকে।

    হারা (হঠাৎ থেমে, না ঘুরেই): জেগে আছিস সুমন?

    [✦]

    সুমন (কাঁপা গলায়): হ্-হারা... কী করছিস?

    হারা (খুব নরম, আদুরে): কিছু না রে। মায়ের কাজ। তুই ঘুমো। (একটু থেমে) ঘুমোলে লাগবে না।

    সুমন (কথক): তারপর হারা আস্তে আস্তে ঘাড় ঘোরাল। হ্যারিকেনের শেষ আলোয় দেখলাম ওর চোখ দুটো। ওগুলো হারার চোখ ছিল না। ওগুলো... লাল। করমচার মত লাল। আর ও হাসছিল। ✦

    [আবহ: হঠাৎ, দূর থেকে মালগাড়ির তীক্ষ্ণ, লম্বা হুইসল।]

    সুমন: ঠিক তখনই রাতের মালগাড়িটা হুইসল দিল। হারা এক মুহূর্তের জন্য চমকে দরজার দিকে তাকাল, আর আমি এক লাফে তক্তপোষ থেকে নেমে, দরজা খুলে, খালি পায়ে ছুট। প্ল্যাটফর্ম ধরে ছুটতে ছুটতে স্টেশনমাস্টারের ঘর। বাকি রাত ওঁর বেঞ্চে বসে কাটালাম। ভোর পর্যন্ত একবারও চোখের পাতা ফেলিনি।

    [আবহ: ফ্ল্যাশব্যাক শেষ। আবার হ্যারিকেনের শোঁ শোঁ, বর্তমান।]

    রাজু: পরদিন সকালে আমি ফিরে দেখি তুই স্টেশনে বসে কাঁপছিস। দোকানে গিয়ে দেখি হারা মাদুরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, কিচ্ছু মনে নেই। বলল, সারারাত নাকি স্বপ্নে মা-কালীর পায়ের কাছে বসে ছিল। তক্তপোষের তলা খুঁজলাম। কিছু নেই।

    সুমন: আমি তো তখন থেকেই ভাবি, হয়তো আমিই স্বপ্ন দেখেছিলাম।

    রাজু (চুপ করে থাকে, তারপর): তুই স্বপ্ন দেখিসনি সুমন। (উঠে যাওয়ার শব্দ, কাঠের বাক্স খোলার শব্দ) দুই বছর আগে দোকানের মেঝে সারাচ্ছিলাম। তক্তপোষের ঠিক তলায়, মাটির নিচে, এটা পেলাম।

    [আবহ: ভারী লোহার জিনিস কাঠের উপর রাখার ঠক শব্দ।]

    সুমন (ফিসফিস): খাঁড়া...

    রাজু: মরচে ধরা। হাতলে এখনও সিঁদুর লেগে আছে। আর হাতলে খোদাই করা একটা নাম। পড়।

    সুমন (হ্যারিকেন তুলে, থেমে থেমে পড়ে): "ভৈ... র... বা... নন্দ।" ভৈরবানন্দ। এটা কে?

    রাজু: জানি না। গ্রামে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই চুপ করে যায়। মধু জেঠুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি খাঁড়াটা দেখে দুদিন বাড়ি থেকে বেরোননি। (খাঁড়াটা আবার বাক্সে রাখার শব্দ) ফেলেও দিতে পারি না। কেমন যেন মনে হয়, ফেলে দিলে ও ঠিক ফিরে আসবে।

    সুমন: আর তুই? লোকে যে বলে রাজু গ্রামের সবচেয়ে সাহসী ছেলে, তুই নাকি একবার অমাবস্যার রাতে একা শ্মশানে গেছিলি?

    রাজু (দীর্ঘশ্বাস): গ্রামে লোকে বলে আমি নাকি সবচেয়ে সাহসী, অমাবস্যায় একা শ্মশানে গেছিলাম। ওই গল্পটা সবাইকে অর্ধেক বলি। তোকে পুরোটা বলছি। তুই বিদেশ চলে যাওয়ার বছর দুই পরে। সেবার শ্মশানে এক অঘোরী বাবা এসে উঠেছিল। জটা, গায়ে ছাই, হাতে মড়ার খুলির পাত্র। গ্রামে কেউ মরলে সে নিজে থেকে এসে মড়া পোড়াত, কারো কাছে পয়সা নিত না। কেউ তার মুখ ভালো করে দেখেনি।

    [আবহ: ধীরে ধীরে শব্দ বদলায়, রাত, দূরে শেয়াল, হাওয়া।]

    রাজু: এক অমাবস্যার রাতে দেখা গেল, শ্মশানে আগুন জ্বলছে। দাউদাউ করে। অথচ সেদিন গ্রামে কেউ মরেনি। কোনো মড়া যায়নি। গ্রামের লোক জানলা বন্ধ করে বসে রইল। আর আমি, তখন বয়স কম, রক্ত গরম, বললাম, আমি যাব। দেখে আসব কী পোড়ানো হচ্ছে।

    [আবহ: ধানখেতের ভেতর দিয়ে হাঁটার সরসর শব্দ।]

    রাজু (কথকের মত, ক্রমশ শ্বাস দ্রুত): ধানজমির আল ধরে একা গেলাম। যত কাছে যাই, আগুনের তাপ মুখে লাগে। আর একটা গন্ধ। পোড়া পোড়া গন্ধ। কাঠের না। কাঠ পুড়লে ওরকম মিষ্টি-মিষ্টি গন্ধ হয় না সুমন।

    [আবহ: আগুনের দাউদাউ শব্দ, চড়চড়।]

    রাজু: পৌঁছে দেখি, চিতা জ্বলছে। বিশাল চিতা। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। অঘোরী নেই, ডোম নেই, মড়ার খাটিয়া নেই। শুধু আগুন। আমি চিতার চারদিকে একবার ঘুরলাম। আগুনের ভেতরে কী পুড়ছে দেখার চেষ্টা করলাম, দেখা যায় না। শুধু ধোঁয়া। তারপর ভয়টা এল। পেছন ফিরে হাঁটা দিলাম। দশ পা গেছি, কি বারো পা...

    হারা (অঘোরীর গলায়, গম্ভীর, পাথরের মত, খুব কাছ থেকে): যেখানে সেখানে চলে আসবি? ✦ দেখছিস না, আমি সাধনা করছি? আমার কাজে বাধা দিলি... এর দাম দিতে হবে না?

    [✦ আগুনের শব্দ হঠাৎ থেমে যায়।]

    রাজু (হাঁপাতে হাঁপাতে, বর্তমানে ফিরে): আমি পেছনে তাকাইনি। তাকানোর সাহস ছিল না। পড়িমরি করে ছুটলাম। ধানখেতে দুবার আছাড় খেলাম। বাড়ি ফিরে দরজায় খিল দিয়ে জ্বর এল তিনদিন। পরদিন দিনের বেলা গ্রামের দশজন মিলে গেল শ্মশানে। গিয়ে দেখে, কিচ্ছু নেই। না ছাই, না পোড়া কাঠ, না আগুনের একটা দাগ। মাটি ঠান্ডা। যেন সেখানে কোনোদিন আগুন জ্বলেইনি। আর অঘোরী বাবা? সেই রাতের পর থেকে কেউ তাকে দেখেনি।

    সুমন: রাজু... সেই গলাটা...

    রাজু (খুব আস্তে): আমি চিনি, সুমন। কুড়ি বছর ধরে চিনি। ওটা অঘোরীর গলা ছিল না। ওটা...

    [আবহ: হঠাৎ দোকানের লোহার শাটারে জোরে তিনটে টোকা, ঠং! ঠং! ঠং!]

    সুমন ও রাজু (একসঙ্গে চমকে): কে?

    হারা (বাইরে থেকে, নরম, আদুরে গলায়): আমি রে রাজু। হারা। একটা মোমবাতি দিবি? কুঁড়েতে আলো নেই। অমাবস্যা তো নয়, তবু বড্ড অন্ধকার আজ।

    [আবহ: শাটার ওঠানোর ঘড়ঘড় শব্দ।]

    হারা: (একটু থেমে, শ্বাস টানার শব্দ, যেন গন্ধ শুঁকছে) আরে... সুমন না? কতদিন পর। কত বছর? (হাসে) সেই রাতে তুই খালি পায়ে ছুটেছিলি। জুতোটা আমি রেখে দিয়েছি এখনও, জানিস।

    সুমন (গলা শুকনো): হারাদা... ভালো আছ?

    হারা: মা যেমন রাখে। (আবার শ্বাস টানে) তোর গায়ে এখনও সেই গন্ধটা আছে রে। তোদের বাড়ির রক্তের গন্ধ। ঠিক তোর পিসির মত।

    সুমন: পিসি? আমার তো কোনো পিসি নেই হারাদা। বাবা একাই ছিল।

    হারা (খিকখিক করে হাসে): নেই? ... তা হবে। (মোমবাতি নেওয়ার খসখস) কাল অষ্টমী, পরশু নবমী। হোমের জন্য যজ্ঞডুমুরের ডাল আনতে এবার কে যাবে রে? মধুদার তো হাঁটু গেছে। (একটু থেমে) তুই-ই যাস সুমন। তোর বাবা যেত। তুই যাবি না?

    [আবহ: হারার পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়। সেই সঙ্গে খুব হালকা, প্রায় অশ্রুত, ঘষ... ঘষ...]

    রাজু (দীর্ঘ নীরবতার পর): শুনলি?

    সুমন: কী?

    রাজু: ও জানে তুই কাল যাবি। (ফিসফিস) সুমন, তুই যাস না।

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ৩: ঠাকুরদালান, অষ্টমীর রাত
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: ঢাকের বোল ধীরে থামছে। কাঁসর-ঘণ্টার শেষ টুং। তারপর ঝিঁঝিঁ পোকা। দূরে একটা শেয়াল ডাকে।]

    সুমন (কথক): অষ্টমীর সন্ধিপুজো শেষ। ঠাকুরদালানে প্রদীপের আলোয় মা দুর্গার মুখটা কেমন জীবন্ত দেখায়, দালানের সিঁড়িতে বসে মধু ঠাকুর পান চিবোচ্ছেন।

    মধু ঠাকুর: বোসো বউমা, বোসো। কলকাতার মেয়ে, অষ্টমীর উপোস করে রইলে সারাদিন, কষ্ট হয়নি?

    মিতালি: না জেঠু, ভালোই লাগছে। ঢাকের আওয়াজে খিদে কোথায় পালিয়ে গেছে।

    মধু ঠাকুর (সুমনের দিকে): আর তুই? এত বছর পর মনে পড়ল বাড়ির পুজোর কথা? তোর বাবা যতদিন ছিল, একটা বছরও বাদ দেয়নি। (একটু থেমে) কাল নবমী। হোমের কাঠ চাই, যজ্ঞডুমুরের ডাল। আমার হাঁটুর যা অবস্থা, ক্যানেল পেরোনো আর আমার দ্বারা হবে না।

    সুমন (একটু হেসে): জানি জেঠু। হারাদা কাল রাতেই বলে দিয়েছে। আমাকেই যেতে হবে।

    [✦ পান চিবোনোর শব্দ থেমে যায়।]

    মধু ঠাকুর (খুব আস্তে): হারা? হারার সঙ্গে তোর দেখা হয়েছে?

    সুমন: রাজুর দোকানে এসেছিল। মোমবাতি নিতে।

    মধু ঠাকুর (গলা শক্ত): শোন সুমন। এই কদিন হারার সঙ্গে একটাও কথা বলবি না। ও ডাকলে সাড়া দিবি না। ও কিছু দিলে নিবি না। বউমা, তুমিও।

    মিতালি: কেন জেঠু? উনি কে?

    মধু ঠাকুর: কালীসাধক। (একটু থেমে) লোকে তাই বলে। (প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে) হ্যাঁ, যা বলছিলাম, যজ্ঞডুমুর। গ্রামে গাছ একটাই। ক্যানেলের ওপারে, ওই ছোট জঙ্গলটায়।

    মিতালি: যজ্ঞডুমুর? সেটা কী?

    মধু ঠাকুর: ডুমুরেরই এক জাত, মা। শাস্ত্রে বলে, হোমের আগুনে যজ্ঞডুমুরের সমিধ না দিলে দেবতা আহুতি নেন না। গ্রামে গাছ একটাই। ক্যানেলের ওপারে, ওই ছোট জঙ্গলটায়।

    সুমন: পঞ্চমুণ্ডির জঙ্গল।

    মিতালি: পঞ্চ... কী?

    মধু ঠাকুর (গলা নামিয়ে): পঞ্চমুণ্ডি আসন, মা। তন্ত্রমতে বড় শক্তির জিনিস। পাঁচটা মাথা মাটিতে পুঁতে তার উপরে আসন পেতে সাধনা। ও-আসনের পাশে যাওয়াও চাপ, বসা তো দূরের কথা, এলেম লাগে।

    মিতালি: পাঁচটা মাথা? কীসের?

    সুমন (একটু কৌতুক মিশিয়ে, কিন্তু গলা শুকনো): রিভিশন দিয়ে নাও। এক, চণ্ডালের মাথা। দুই, বিষধর সাপের মাথা। তিন, শেয়াল বা বেজির মাথা। চার, হনুমানের মাথা।

    মধু ঠাকুর: আর পাঁচ, অপঘাতে মরা মানুষের মাথা। দুর্ঘটনায়, জলে ডুবে, গলায় দড়ি দিয়ে... যে মরতে চায়নি, অথচ মরেছে।

    মিতালি (একটু হেসে, কিন্তু অস্বস্তি নিয়ে): আপনারা দুজনে মিলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন।

    মধু ঠাকুর: ভয় দেখাব কেন মা? গ্রামে সবাই জানে। ও-আসনে শেষ কে বসেছিল, তাও জানে।

    সুমন: ভৈরবানন্দ?

    [✦ একটা প্রদীপ দপ করে নিভে যাওয়ার শব্দ।]

    মধু ঠাকুর (খুব আস্তে, প্রায় ভয়ে): ... এ নাম তুই কোথায় পেলি?

    সুমন: রাজুর কাছে একটা খাঁড়া আছে। হাতলে খোদাই করা।

    মধু ঠাকুর: ও-আসনে শেষ কে বসেছিল, গ্রামে সবাই জানে। কিন্তু নবমীর আগের রাতে সে-কথা মুখে আনতে নেই। (গলা শক্ত করে) শোন সুমন, কাল তুই যাবি। দুপুরের আগে যাবি, দুপুরের আগে ফিরবি। তিনটে কথা মনে রাখবি।

    সুমন: বলুন।

    মধু ঠাকুর: এক, ডাল ছাড়া ওখান থেকে আর কিচ্ছু আনবি না। মাটিতে কিছু পড়ে থাকলে ছুঁবি না। দুই, কেউ নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিবি না। চেনা গলা হলেও না। তিন... ✦ ... গাছে উঠে পেছন ফিরে তাকাবি না। যা-ই শুনিস।

    সুমন (হালকা করার চেষ্টায়): ঠিক আছে জেঠু। ব্রুনাইয়ের জঙ্গলে রাতে গামবুট পরে হেঁটেছি, আমাদের গ্রামের একটা ডুমুরগাছ আর কী করবে?

    মধু ঠাকুর: ব্রুনাইয়ের জঙ্গল তোকে চেনে না, বাবা। এ জঙ্গল চেনে। তোর ঠাকুরদা ডাল আনত, তারপর তোর বাবা। তারপর... এক নবমীতে তোর বাবা আর যায়নি। সেই থেকে আমিই যেতাম।

    সুমন: বাবা আর যায়নি কেন?

    মধু ঠাকুর (উঠে দাঁড়ানোর শব্দ, হাঁটুতে হাত দিয়ে 'উফ্‌'): রাত হল। বউমা, শুতে যাও। জানলাটা বন্ধ করে শুয়ো, ক্যানেলের দিক থেকে হাওয়া আসে, অষ্টমীর রাতে হাওয়া ভালো নয়।

    [আবহ: খড়মের শব্দ দূরে মিলিয়ে যায়। ঝিঁঝিঁ আবার শুরু।]

    মিতালি: এই, উনি কিছু একটা লুকোলেন।

    সুমন: গ্রামে সবাই কিছু না কিছু লুকোয়। শহরে লুকোয় পাসওয়ার্ড, গ্রামে লুকোয় গল্প।

    মিতালি: তোমার বাবা কোনোদিন কিছু বলেননি?

    সুমন: বাবা খুব কম কথা বলতেন। শুধু প্রতি নবমীর রাতে ঠাকুরদালানের এক কোণে একটা প্রদীপ জ্বালতেন। আলাদা করে। কাউকে ছুঁতে দিতেন না। ছোটবেলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার জন্য বাবা? বাবা বলেছিলেন, "যে অন্ধকারে ভয় পায়, তার জন্য।"

    [✦ দূরে, খুব হালকা, ঝুমঝুমির শব্দ।]

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ৪: জানলার ধারে
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: গভীর রাত। ঝিঁঝিঁ। একটা দেওয়াল ঘড়ি, টিক টিক। সুমনের নাক ডাকার হালকা শব্দ।]

    মিতালি (স্বগত, ফিসফিস করে): বিয়ের এত বছর, এই লোকটার নাক ডাকা এখনও ব্রুনাইয়ের জেনারেটরের মত। (পাশ ফেরার শব্দ) ঘুম আসছে না। জেঠু বললেন জানলা বন্ধ করতে... কিন্তু এত গরম...

    [আবহ: জানলার কাঠের পাল্লা খোলার ক্যাঁচ শব্দ। হাওয়ার শব্দ। তারপর, ঝুমঝুমি। কাছে। খুব কাছে।]

    মিতালি (চমকে): কে? কে ওখানে?

    টুনি (ফিসফিসে): আমি।

    মিতালি: ওমা! এত রাতে তুমি এখানে কী করছ? কাদের বাড়ির মেয়ে তুমি?

    টুনি: এই বাড়ির।

    মিতালি: এই বাড়ির? (একটু হেসে) ও, তুমি নিশ্চয়ই পাশের বাড়ির কারো নাতনি? বিকেলে যে লাল ফ্রক পরে ক্যানেলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে, সেটা তুমি?

    টুনি: হুঁ। আমি রোজ দাঁড়াই। দাদার জন্য।

    মিতালি: দাদা? তোমার দাদা কোথায়?

    টুনি: ওই তো। (একটু থেমে) তোমার পাশে ঘুমোচ্ছে।

    [✦]

    মিতালি (অস্বস্তির হাসি): না সোনা, ও তোমার দাদা না। ও আমার বর। সুমন।

    টুনি: বর? (খিলখিল হাসি, বাচ্চার) দাদার তো বিয়েই হয়নি। দাদা তো বারো বছরের। (হঠাৎ চুপ, তারপর অবাক গলায়) ... ও মা। দাদা এত বড় হয়ে গেছে?

    মিতালি: তুমি... কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না। তোমার নাম কী?

    টুনি: টুনি।

    মিতালি: টুনি। বাঃ, সুন্দর নাম। কিন্তু টুনি, এত রাতে একা বাইরে থাকতে নেই। তোমার মা বকবেন।

    টুনি: মা আর বকে না। মা তো অনেকদিন আগে চলে গেছে। (একটু থেমে) তোমার পায়ে ওটা কী? লাল?

    মিতালি: এটা? আলতা। অষ্টমীতে পরেছি।

    টুনি (উত্তেজিত, ফিসফিস): তোমার পায়ে ওটা কী? লাল? আলতা? আমাকে দেবে? একটু লাল দেবে? আমার পা দুটো খুব সাদা হয়ে গেছে। খুব ঠান্ডা।

    মিতালি: ঠান্ডা? এই গরমে? দাঁড়াও... (ব্যাগ খোলার শব্দ) এই নাও, আমার আলতার শিশি। পুরোটাই নাও।

    [আবহ: ঝুমঝুমি, খুশির, দ্রুত।]

    টুনি: ওরাও আমাকে লাল দিয়েছিল। কপালে। সিঁদুর। কিন্তু সেটা খুব ঠান্ডা ছিল। তোমারটা গরম।

    মিতালি: কারা দিয়েছিল?

    টুনি (গলা নেমে যায়, প্রায় শোনা যায় না): যারা আসনে বসে। ✦ ... আর একজন আছে। সে আসনে বসে না। সে ওদের পা টিপে দেয়। রোজ রাতে আসে। তার হাতে একটা লম্বা জিনিস, কাপড়ে মোড়া। সে-ই আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, "আয় টুনি, তোর দাদা গাছের উপর থেকে ডাকছে।"

    মিতালি (নিজেও ফিসফিস করে): টুনি, তুমি কী বলছ...

    টুনি: শোনো। কাল দাদা ডাল আনতে যাবে, না?

    মিতালি: হ্যাঁ, কিন্তু তুমি কী করে...

    টুনি: দাদা আমাকে বলেছিল নিয়ে যাবে। নবমীর দিন। বলেছিল, "টুনি, তুই গাছের নিচে দাঁড়াবি, আমি উপর থেকে ডাল ফেলব।" তারপর দাদা একা চলে গেল। আমি বাড়িতে ছিলাম। তখন সে এল। বলল দাদা ডাকছে। আমি ওর সঙ্গে গেলাম। ✦ ... দাদা আমাকে দেখতে পায়নি।

    মিতালি: তারপর?

    টুনি: তারপর আমি আর বাড়ি ফিরিনি। (হঠাৎ তাড়াহুড়ো) শোনো, দাদাকে বলবে, গাছে উঠলে দুটো গলা শুনবে। একটা ডানদিকে, মিষ্টি করে বলবে "ওঠ, ওঠ।" সেই গলাটা দাদা চিনবে। একটা বাঁদিকে, হাসবে। ওদের কথা শুনবে না। আর যখন ঘাড়ের কাছে সুড়সুড় করবে, তাকালে যেন আমাকে দেখে। ওদের না।

    মিতালি: টুনি, দাঁড়াও! তুমি...

    [আবহ: ঝুমঝুমির শব্দ দ্রুত দূরে সরে যায়। জানলার পাল্লা আপনি থেকে বন্ধ হওয়ার ধড়াম শব্দ।]

    সুমন (ঘুমজড়ানো গলায়): কী হল? কী পড়ল?

    মিতালি (হাঁপাতে হাঁপাতে): সুমন... একটা বাচ্চা মেয়ে এসেছিল। জানলায়। টুনি। বলল এই বাড়ির মেয়ে।

    সুমন: এই বাড়িতে বাচ্চা মেয়ে কোথায়? ঘুমোও। স্বপ্ন দেখেছ। স্টেশনে ওই গল্প শুনে তোমার মাথাটা গেছে।

    মিতালি: স্বপ্ন না। আমার আলতার শিশিটা ওকে দিলাম।

    সুমন (হাই তুলে): কাল সকালে বিছানার তলায় খুঁজলেই পাবে। ঘুমোও।

    [আবহ: সুমনের নাক ডাকা আবার শুরু। মিতালির দ্রুত শ্বাস। ✦]

    সুমন (কথক, এখন বর্তমান থেকে, শান্ত স্বরে): পরদিন সকালে মিতালি বিছানার তলা, আলমারির পাশ, ব্যাগের প্রতিটা কোণ খুঁজেছিল। আলতার শিশি পাওয়া যায়নি। আর আমি... আমি তখনও হাসছিলাম।

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ৫: নবমীর দুপুর
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: সকালের ঢাক। শাঁখ। ভিড়ের কলরব। তারপর সব ধীরে মিলিয়ে যায়।]

    মিতালি: যেও না সুমন। প্লিজ।

    সুমন: আরে, একটা ডাল আনতে যাচ্ছি। কুরুক্ষেত্রে তো না।

    মিতালি: টুনি বলেছে গাছে উঠলে দুটো গলা শুনবে। ডানদিকের গলাটা তুমি চিনবে। ওদের কথা শুনবে না। আর ঘাড়ের কাছে সুড়সুড় করলে...

    সুমন: ...তাকালে যেন ওকেই দেখি। হ্যাঁ, কাল রাত থেকে চারবার শুনেছি। মিতালি, তুমি একটা স্বপ্নকে এত সিরিয়াসলি নিচ্ছ...

    মিতালি: আর আলতার শিশিটা?

    সুমন: কলকাতায় ফেলে এসেছ। (একটু নরম করে) শোনো। এক ঘণ্টায় ফিরব। তুমি জেঠুর কাছে থাকো। হোমের জোগাড়ে হাত লাগাও। ঠিক আছে?

    সুমন (কথক): বেরোতে বেরোতে বেলা গড়িয়ে গেল। অঞ্জলি, ভোগের লাইন, পাড়ার জেঠিমাদের "ওমা, সুমন না? কত দিন পরে রে!", এসব সামলে যখন ক্যানেলের পাড়ে পৌঁছলাম, দুপুর পেরিয়ে গেছে। মধু জেঠুর প্রথম কথাটাই ভেঙে ফেলেছি। আর ক্যানেলের ধারে, শ্মশানের দিক থেকে আসা পায়ে-চলা পথটায়, টাটকা পায়ের ছাপ। খালি পা। আমার আগে কেউ এদিকে গেছে।

    [আবহ: হাওয়া নেই। ঝিঁঝিঁও নেই। একদম নিস্তব্ধ। শুধু পায়ের শব্দ, ঘাসে, তারপর আলুখেতের নরম মাটিতে।]

    সুমন (কথক, ধীরে): ক্যানেল পেরিয়ে আলুজমি ডিঙিয়ে সেই বনে যখন ঢুকলাম, আশেপাশে কেউ নেই। এখন ধানের সময়, কোমর পর্যন্ত ধানে চারপাশ ঢাকা। জমিতে একটা মানুষও কাজ করছে না। নবমীর দিন, সবাই ঠাকুরতলায়।

    [আবহ: শুকনো পাতায় পা, মচমচ।]

    সুমন: বনে ঢুকেই শুকনো পাতায় পা দিয়ে নির্জনতা ভাঙলাম। আর সামনে... ✦ ... ছড়ানো মাথার খুলি। কয়েকটা ছোট আকারের খুলি, তাতে আবার সিঁদুর মাখানো। টাটকা সিঁদুর। (স্বগত, ফিসফিস) এগুলো এল কোথা থেকে? মৃত্যু, অপমৃত্যু, নাকি কোনো তান্ত্রিকের সিদ্ধিলাভের পথের চিহ্ন?

    [আবহ: একটা হালকা হিমেল হাওয়ার শোঁ শোঁ।]

    সুমন: খুলিগুলোর মাঝে কোনোক্রমে চটি পরা পা রাখলাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল গায়ের উপর দিয়ে একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল। আর খালি মনে হচ্ছে কেউ আমাকে দেখছে। দু'জোড়া চোখ। আমার প্রতিটা পা ফেলা মেপে নিচ্ছে। (নিজেকে সাহস দিয়ে, প্রায় হাসি) ভূত আমার পুত, পেত্নি আমার ঝি... রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছে, করবি আমার কী।

    [আবহ: খুব দূরে একটা খিলখিল হাসি। এক সেকেন্ড। তারপর চুপ।]

    সুমন: যজ্ঞডুমুর গাছটার দিকে এগোতে লাগলাম। গাছের পাতা নড়ছে না। কিন্তু উল্টোদিকের প্রবল হাওয়ার মত কিছু একটা আমাকে এগোতে দিচ্ছে না। গাছের ঝুরি ভেবে উপর থেকে নেমে আসা কিছু একটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলাম...

    [আবহ: হিসসসস্‌, সাপের তীক্ষ্ণ হিসহিস।]

    সুমন (চমকে, হাত ঝাড়ার শব্দ): ...পিছল আর স্যাঁতসেঁতে সেই 'ঝুরি' হিস হিস শব্দ করে আমার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ✦

    সুমন (কথক, এখন দ্রুত শ্বাস): বাইরে দুপুর গড়াচ্ছে, আর এদিকে প্রতিটা পদক্ষেপ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে এক আঁধারি জগতে। ভাবলাম, গাছের উপরে উঠলে হয়তো আবার আলো পাব। গোড়ায় গিয়ে চটি খুলে গুঁড়িতে পা রাখলাম...

    [আবহ: একটা লো-ফ্রিকোয়েন্সি গুমগুম শব্দ, যেন মাটির নিচ থেকে।]

    সুমন: ...মনে হল পায়ের পাতা থেকে চিনচিন করে কী একটা মাথায় উঠে গেল। আমি উঠছি। এক ডাল, দুই ডাল। আর তখনই...

    ডান কানের গলা (হারার শিল্পী, একদম নিচু, মিঠে, আদুরে, প্রায় মাইকে ঠোঁট ছুঁইয়ে): ওঠ না... ওঠ। কিচ্ছু হবে না। আরেকটু। আরেকটু উপরে। ওখানে আলো।

    সুমন (থমকে, ফিসফিস): এই গলা... এই গলা আমি চিনি। অনেক বছর আগে, অমাবস্যার রাতে... "তুই ঘুমো। ঘুমোলে লাগবে না।"

    [আবহ: গাছের গোড়া থেকে, খুব স্পষ্ট, ঘষ... ঘষ... ঘষ... শানপাথরে লোহা।]

    বাঁ কানের গলা (মিতালির শিল্পী, দূর থেকে, হিমেল): হি হি হি হি... লাল রঙ দেখেছিস? হাত দিয়েছিস কোনোদিন?

    ডান কানের গলা: শুনছ? এ তো চুমুক না দিয়েই ছুঁতে চাইছে তোমায়।

    বাঁ কানের গলা: আমার এখানে হাত দাও... এ শীতলতা... এ আঁধার... লাল শোণিত...

    সুমন (দাঁতে দাঁত চেপে): শুনব না। শুনব না। শুধু ডালটা ভাঙব, তারপর নেমে যাব।

    [আবহ: টুপ। টুপ। টুপ। ফোঁটা পড়ার শব্দ, ধীরে ধীরে দ্রুত।]

    সুমন: হঠাৎ দেখি পায়ের নিচের পাতায় টুপ টুপ করে রক্তের ফোঁটা পড়ছে। কোথা থেকে ঝরছে বুঝতে না পেরে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি, আমার নিজের পায়ের পাতায় একটা বেলকাঁটা বিঁধে আছে, আর তার থেকেই রক্ত গড়াচ্ছে। যজ্ঞডুমুর গাছে বেলকাঁটা এল কোথা থেকে? আর আমি যন্ত্রণা টের পাচ্ছি না কেন?

    ডান কানের গলা: ব্যথা নেই তো। দেখলি? কিচ্ছু হয় না। হাতটা ছেড়ে দে। একবার ছেড়ে দে। ✦ হালকা লাগবে। নিচে আমি আছি। আমি ধরে নেব।

    সুমন (কাঁপা গলায়): চারপাশের আলো দ্রুত নিভে আসছে। উপরের ডালটা যে ধরব, নিজের হাতের আঙুলগুলোই দেখতে পাচ্ছি না। খালি টের পাচ্ছি, আঙুলের ফাঁক ভরে যাচ্ছে কেমন এক চ্যাটচ্যাটে তরলে। হাত পা অবশ হয়ে আসছে। এই উঁচু থেকে পড়লে নির্ঘাত মৃত্যু, নিদেনপক্ষে নিদারুণ জখম। বারবার মনে হচ্ছে, একা আসা একদম উচিত হয়নি।

    বাঁ কানের গলা (এবার খুব কাছে): পেছনে কে বলো তো? হি হি... একবার তাকা। একবার।

    [আবহ: খুব হালকা, ঝুমঝুমি। একবার।]

    সুমন: কেবল মাথার কাছটুকু তখনও আবছা দেখা যাচ্ছে। আর ঘাড়ের কাছটা... সুড়সুড় করছে। থেকে থেকেই। যেন কেউ খুব আলতো করে, খুব ঠান্ডা আঙুলে ছুঁয়ে যাচ্ছে। জেঠু বলেছিলেন, পেছন ফিরে তাকাবি না। মিতালি বলেছিল, তাকালে যেন ওকেই দেখি। ✦

    সুমন (ফিসফিস): আর থাকতে না পেরে... মাথা ঘোরালাম।

    [আবহ: সব শব্দ একসঙ্গে থেমে যায়। সম্পূর্ণ নীরবতা, পাঁচ সেকেন্ড।]

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ৬: মধু ঠাকুরের স্বীকারোক্তি
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: ঠাকুরদালান। দূরে ঢাকির বিশ্রামের সময়ের এলোমেলো বোল। কেউ বেলপাতা ঝাড়ছে, খসখস।]

    মিতালি (একই সময়ে, অন্য জায়গায়, তাড়াহুড়োর গলা): জেঠু। জেঠু, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। সত্যি বলবেন।

    মধু ঠাকুর: বলো মা। হোমের ঘি গলাচ্ছি, হাত জোড়া। কী হয়েছে? মুখ এমন সাদা কেন?

    মিতালি: টুনি কে?

    [আবহ: পেতলের কিছু একটা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার ঝনঝন শব্দ। ✦]

    মধু ঠাকুর (খুব আস্তে): ... এ নাম তোমাকে কে বলল?

    মিতালি: সে নিজেই। কাল রাতে। জানলায় এসেছিল। লাল ফ্রক, পায়ে ঝুমঝুমি। আমার আলতার শিশি চেয়ে নিয়ে গেল। বলল সুমন ওর দাদা। বলল একজন ওকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, হাতে কাপড়ে মোড়া লম্বা জিনিস......

    মধু ঠাকুর (দীর্ঘশ্বাস, যেন বহুদিনের চাপা পাথর নামছে): বসো মা। ✦ ... ঊননব্বই সালের কথা। আমার তখন কম বয়স, বাবা বেঁচে, বাবাই পুজো করতেন। সে বছর গ্রামে এক ভৈরব এল, লাল কাপড়, জটা, চোখদুটো করমচার মত লাল। নাম বলত ভৈরবানন্দ। ক্যানেলের ওপারে পঞ্চমুণ্ডি আসনে এসে বসল। এগারো রাত ধরে সাধনা। গ্রামের কেউ ওদিক মাড়াত না। শুধু একটা বছর পনেরোর ছেলে রোজ ওর জল বয়ে দিত, ধুনো জ্বেলে দিত, পা টিপে দিত। গ্রামের কারো কথা শুনত না ছেলেটা।

    গ্রামের কারো কথা শুনত না ছেলেটা।

    মিতালি: কে?

    মধু ঠাকুর: হারা।

    [✦ দূরে খুব হালকা: ঘষ... ঘষ...]

    মিতালি: আর টুনি?

    মধু ঠাকুর: টুনি... সুমনের বাবার ছোট বোন। সুমনের পিসি। সাত বছরের। পায়ে রুপোর মল, হাঁটলে ঝুমঝুম করত। বাড়ির সবাই বলত, টুনি আসছে তো শব্দে টের পাওয়া যায়। (গলা ভাঙে) আর দাদা-অন্ত প্রাণ। সুমনের বাবা, আমরা খোকন বলে ডাকতাম, বারো বছর তার। খোকন যেদিকে, টুনি সেদিকে।

    মিতালি: নবমীর দিন...

    মধু ঠাকুর: নবমীর দিন আমার বাবার হাঁটু ধরেছিল। আমি ঠিক করলাম আমিই ডাল আনব। তারপর... ভৈরবের ভয়ে আমি যাইনি মা। আমি খোকনকে পাঠালাম। বারো বছরের একটা ছেলেকে। খোকন টুনিকে বলে গেল, "তুই বাড়ি থাক।" টুনি বাড়িতেই ছিল। দুপুরে উঠোনে খেলছিল। তারপর কেউ আর ওকে দেখেনি। শুধু পাশের বাড়ির বুড়ি বলেছিল, হারা এসে টুনির হাত ধরে ক্যানেলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বুড়ি ভেবেছিল মেলা দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে।

    [আবহ: খুব দূরে, স্মৃতির মত, ঝুমঝুমি।]

    মধু ঠাকুর: খোকন ডাল নিয়ে ফিরল বিকেলে। সাদা মুখ, সারা গা কাঁপছে। বলল গাছে উঠতেই দুটো গলা শুনেছে কানের কাছে। আর ঘাড়ের কাছে কেউ সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। ও পেছনে তাকায়নি। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ডাল ভেঙে নেমে এসেছে। সন্ধে হল। টুনি ফিরল না। সারা রাত মশাল নিয়ে খোঁজা। ভোরে আসনের পাশে পাওয়া গেল ওর একটা মল। সিঁদুর মাখানো। ✦ ... আর ভৈরব? তার কোনো চিহ্নই নেই। যেন কোনোদিন ছিলই না।

    মিতালি: আর হারা?

    মধু ঠাকুর: হারাকে পাওয়া গেল তিনদিন পর। শ্মশানে। বসে বসে একটা খাঁড়া শান দিচ্ছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু হাসে। একবছর কথা বলেনি। পুলিশ এসেছিল, কিছু প্রমাণ পায়নি, একটা পনেরো বছরের পাগল ছেলে, তার উপর কী কেস দেবে। তারপর থেকে হারা গ্রামেই আছে। কালীসাধক। মাঝে মাঝে ভালোমানুষ। আর প্রতি নবমীর আগে... (থেমে যায়)

    মিতালি (ফিসফিস করে): পঞ্চম মাথা। অপঘাতে মৃত...

    মধু ঠাকুর: চুপ! (তারপর নরম হয়ে) জানি না মা। কেউ জানে না। শুধু জানি, খোকন সারা জীবন ভেবেছে, সেদিন যদি একবার পেছন ফিরে তাকাত, হয়তো টুনিকে দেখতে পেত। হয়তো টুনিই ওর ঘাড়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল, দাদাকে ডাকছিল। আর ও ভয়ে তাকায়নি। সেই থেকে প্রতি নবমীতে একটা প্রদীপ জ্বালত। যে অন্ধকারে ভয় পায়, তার জন্য। মরার আগে আমার হাত ধরে বলেছিল, "ছেলেটাকে এ বোঝা দিও না মধুদা।" আর তাছাড়া... গ্রামে একটা কথা চলে। টুনিকে তারাই দেখে, যারা ওর কথা জানে না।

    [✦]

    মিতালি (হঠাৎ বুঝতে পেরে, আতঙ্কে): স্টেশনের সেই নিয়ম... যারা জানে না, তারাই দেখে। জেঠু! আমি এখন জানি। আমি আর ওকে দেখতে পাব না। কিন্তু সুমন জানে না। সুমন এখন ওই গাছে। আর টুনি বলেছিল, ডানদিকের গলাটা সুমন চিনবে...

    [আবহ: দৌড়ে আসার শব্দ, দরজা ধাক্কা দিয়ে খোলা।]

    রাজু (হাঁপাতে হাঁপাতে): জেঠু! বউদি! সুমন কোথায়?

    মিতালি: ডাল আনতে গেছে। এক ঘণ্টা আগে।

    রাজু: সর্বনাশ! আমি দোকানে ছিলাম। দেখি হারা স্টেশনের পাশ দিয়ে ক্যানেলের দিকে যাচ্ছে। খালি পা। হাতে কাপড়ে মোড়া লম্বা কিছু। দোকানে ফিরে দেখি তক্তপোষের তলা থেকে কী যেন টেনে বার করা হয়েছে...

    মধু ঠাকুর: খাঁড়া। সেই অমাবস্যার পর থেকে ওটা তোর দোকানের মাটির তলাতেই পোঁতা ছিল রে রাজু। নবমীর জন্য রাখা।

    মধু ঠাকুর (উঠে দাঁড়ানোর শব্দ, হাঁটুর যন্ত্রণায় কাতরানি): ওরা আরেকটা মাথা চায়। অপঘাতের। খোকনের রক্তের। সাইত্রিশ বছর আগে যা অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল, গাছ থেকে পড়লে...

    মিতালি: চলুন জেঠু! এখনই! সাইত্রিশ বছর আগে একটা বারো বছরের ছেলেকে একা পাঠিয়েছিলেন জেঠু। আজ আর না।

    রাজু: জেঠু, আমার কাঁধে ভর দিন। (লাঠি তুলে নেওয়ার শব্দ) কুড়ি বছর আগে ওই গলাটা শুনে আমি পেছন ফিরে পালিয়েছিলাম। আজ আর পালাব না।

    [✦ তারপর মধু ঠাকুরের লাঠির ঠকঠক, দ্রুত পায়ের শব্দ। ঢাকের শব্দ পিছনে পড়ে থাকে। আবহ: দৌড়নোর শব্দ, ধানখেতের মধ্যে দিয়ে, সরসর সরসর।]

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    দৃশ্য ৭: ঘাড় ঘোরানো
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

    [আবহ: নীরবতা ভাঙে একটা মাত্র শব্দে, ঝুমঝুমি। খুব কাছে। একদম কানের পাশে।]

    সুমন (ফিসফিস, বিস্ময়ে): আমার ঠিক পেছনের ডালে... একটা বাচ্চা মেয়ে বসে আছে। লাল ফ্রক। পা দুটো ঝুলছে, পায়ের পাতায় টাটকা আলতা। কপালে সিঁদুরের টিপ, লেপ্টে গেছে। আর ওর ছোট্ট দুটো হাত... আমার জামার কলার শক্ত করে ধরে আছে।

    টুনি: দাদা। তুমি তাকালে। এবার তাকালে।

    সুমন: তুমি... তুমি কে?

    টুনি: হাত ছেড়ো না দাদা। আমি ধরে আছি। (ফিসফিস করে) নিচে তাকিও না। ওরা নিচে আছে।

    সুমন (কথক, কাঁপা গলায়): তবু চোখ চলে গেল। গাছের গোড়ায়, অন্ধকারে, দুটো ছায়া। একটা লম্বা, লাল কাপড়, মাথায় জটা, চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মত। আরেকটার কোনো মুখ নেই। শুধু একটা হাসি। হাসিটা আছে, মুখটা নেই। আর ওদের দুজনের পায়ের কাছে, আসনের উপর, একজন মানুষ বসে আছে। পিঠ বাঁকা, খালি গা। কোলে সেই খাঁড়া। হারা। ওপরে আমার দিকে মুখ তুলে হাসছে। আর শানপাথরে ঘষছে... ঘষ... ঘষ...

    হারা (নিচ থেকে, আদুরে, মন্ত্রের মত): নেমে আয় সুমন। লাফিয়ে নেমে আয়। গুরুদেব ডাকছেন। সাইত্রিশ বছর বসে আছেন। পাঁচ নম্বরটা এখনও খালি রে। টুনিকে দিয়ে হল না, মেয়েটা আসনে বসেও দাদার জন্য কাঁদে। তোকে দিয়ে হবে। খোকনের ছেলে। একই রক্ত।

    বাঁ কানের গলা (তীক্ষ্ণ, রাগী): হি হি হি... ছেড়ে দে! ছেড়ে দে ওকে! ও আমাদের! নবমীর মাথা আমাদের!

    ডান কানের গলা (হারার শিল্পী, এবার আরও গম্ভীর, অন্য কারো গলা যেন হারার মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে): টুনি! আবার তুই? সাইত্রিশ বছর তোকে বসিয়ে রেখেছি আসনে, তবু তোর দাদার মায়া গেল না?

    টুনি (প্রথমবার গলায় জোর): আমার দাদা! তোমরা পাবে না! (নরম হয়ে, সুমনকে) দাদা, ডানদিকের ডালটা ধরো। ওইটা। বাবা ওইটাই ভাঙত। ভাঙো। জোরে।

    রাজু (দূর থেকে, ছুটে আসতে আসতে, গর্জন করে): হারা! এই হারা!

    [আবহ: একসঙ্গে, কাঠ ভাঙার জোরালো মড়মড় শব্দ; লোহার খাঁড়া মাটিতে পড়ার ঝনঝন; একটা তীব্র আর্তনাদ, দুটো অশরীরী গলা মিলে, তারপর দূরে সরে যায়, যেন মাটির নিচে ঢুকে গেল।]

    হারা (হঠাৎ গলা বদলে, একটা পনেরো বছরের ছেলের মত, ভাঙা, কান্নাভেজা): আমি... আমি ডেকেছিলাম ওকে... গুরুদেব বলেছিলেন... "যা, মেয়েটাকে নিয়ে আয়, দাদা ডাকছে বলিস"... আমি ওর হাত ধরে নিয়ে গেছিলাম... ও হাসছিল... ওর মল বাজছিল... (হাহাকার) টুনি! টুনি রে!

    [আবহ: হারার খালি পায়ে ছুটে যাওয়ার শব্দ, শুকনো পাতা মাড়িয়ে, ধানখেতে ঢুকে, শ্মশানের দিকে দূরে মিলিয়ে যায়।]

    সুমন (কথক, হাঁপাতে হাঁপাতে): আর যেন কেউ একটা পর্দা সরিয়ে দিল। আলো ফিরে এল। বিকেলের লালচে আলো, পাতার ফাঁক দিয়ে। পাখি ডাকছে। হা তের ডালটা শক্ত করে ধরে আছি, যজ্ঞডুমুর। পায়ের বেলকাঁটাটা? নেই। রক্ত? নেই। শুধু পায়ের পাতায় কয়েকটা লাল দাগ, আলতার মত।

    মিতালি (দূর থেকে, চিৎকার করে): সুমন! সুমন!

    মধু ঠাকুর (দূর থেকে, হাঁপিয়ে): খোকা! নাম ধরে ডাকছি, সাড়া দিস, এ ডাক আমাদের!

    সুমন: এখানে! আমি এখানে! নামছি!

    [আবহ: গাছ থেকে নামার শব্দ। শুকনো পাতা। দৌড়ে আসার শব্দ।]

    রাজু (মাটি থেকে কিছু তোলার শব্দ): খাঁড়াটা। ফেলে পালিয়েছে। (থেমে) সুমন, হাতলটা দেখ। নামটা... নামটা মুছে গেছে। খোদাইটা আর নেই।

    মিতালি (কেঁদে ফেলে): তুমি ঠিক আছ? কিছু হয়নি তো?

    সুমন: আমি ঠিক আছি। মিতালি... একটা বাচ্চা মেয়ে ছিল। গাছে। লাল ফ্রক, পায়ে আলতা। ও আমাকে ধরে রেখেছিল। ও না থাকলে আমি... (থেমে) ওই দেখো! ওই তো! ধানখেতের আলে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে!

    [✦]

    মিতালি (খুব আস্তে): আমি... দেখতে পাচ্ছি না সুমন।

    সুমন: কী বলছ! ওই তো! রাজু, তুই দেখছিস না? জেঠু?

    মধু ঠাকুর (গলা বুজে আসে): না বাবা। আমি দেখি না। কোনোদিন দেখিনি।

    মিতালি: সুমন, শোনো, ও তোমার...

    মধু ঠাকুর (তাড়াতাড়ি, দৃঢ়ভাবে): বোলো না মা! ✦ ... ওকে বোলো না। ও যতদিন না জানে, ততদিন ও দেখবে। খোকন সারাজীবন একবার দেখতে চেয়েছিল। পায়নি। ওর ছেলে অন্তত দেখুক।

    রাজু: (একটু থেমে, গলা নামিয়ে) আমিও কিছু বলব না, সুমন। কোনোদিন না।

    [আবহ: দূরে সন্ধ্যার ঢাক বেজে ওঠে। শাঁখ।]

    ✦ ✦ ✦

    [আবহ: হোমের আগুন, চড়চড় শব্দ। ঘিয়ের ছিটে। মধু ঠাকুরের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ: "ওঁ অগ্নয়ে স্বাহা... ওঁ প্রজাপতয়ে স্বাহা...", মন্ত্র নিচু হয়ে পিছনে বাজতে থাকে।]

    সুমন (কথক, শান্ত, এখন বর্তমান থেকে দর্শককে বলছে): সেবার নবমীর হোম হয়েছিল যজ্ঞডুমুরের কাঠে। আগুন দাউদাউ করে জ্বলেছিল, মধু জেঠু বললেন, এমন আগুন উনি বহু বছর দেখেননি। হোম শেষে জেঠু ঠাকুরদালানের কোণে একটা প্রদীপ জ্বাললেন। বাবার জায়গায়। তারপর, কিছু না বলে, তার পাশে আরেকটা।

    মিতালি: দুটো কেন জেঠু?

    মধু ঠাকুর: একটা যে অন্ধকারে ভয় পায়, তার জন্য। আরেকটা... যে অন্ধকারে সাহস দেখিয়েছিল, তার জন্য।

    সুমন (কথক): আর আমি দেখলাম, প্রদীপ দুটোর পাশে, পা মুড়ে বসে আছে সেই লাল ফ্রক। পায়ে আলতা। আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে, একদম চুপচাপ। একবার ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। মিষ্টি, ফোকলা দাঁতের হাসি।

    [আবহ: ঝুমঝুমি, খুশির, হালকা। ✦]

    ✦ ✦ ✦

    [আবহ: কয়েক মাস পর। টেলিফোনের রিং। ফোন ধরার শব্দ। রাজুর গলা ফোনের ভেতর দিয়ে, একটু ধাতব, দূরের।]

    রাজু (ফোনে): সুমন? ব্রুনাই সাহেব, শুনতে পাচ্ছিস? ... হ্যাঁ, সবাই ভালো। মধু জেঠুর হাঁটু একটু ভালো। শোন, একটা কথা বলার ছিল। হারাকে আর পাওয়া যায়নি। সেই নবমীর পর থেকে কেউ দেখেনি। কুঁড়েঘরটা ফাঁকা। শুধু দেয়ালে সিঁদুর দিয়ে লেখা একটা নাম, "টুনি"। একশো বার। ✦ ... আর গত অমাবস্যায়... শ্মশানে আবার আগুন জ্বলেছিল। দাউদাউ করে। এবার আমি যাইনি।

    সুমন (ফোনে): আর কিছু?

    রাজু (একটু চুপ করে থেকে): হুঁ। শেষ ট্রেনে যারা নামে, তারা বলছে... আপ প্ল্যাটফর্মে এখন তিনজনকে দেখা যায়। দুজন হাত ধরাধরি করে বেলগাছের দিকে হাঁটে। আর পেছন পেছন একটা বুড়ো লোক। খালি গা, খালি পা। কাপড়ে মোড়া লম্বা কিছু নিয়ে। বিড়বিড় করে একটাই নাম বলে... আর গল্প শোনার পরেও লোকে তাকে দেখতে পায়, সুমন। ✦ ... কারণ তার গল্পটা এখনও শেষ হয়নি।

    [আবহ: ফোন কেটে যাওয়ার টু-টু শব্দ। তারপর নীরবতা।]

    সুমন (কথক, দর্শকের দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে): তারপর থেকে প্রতি বছর পুজোয় গ্রামে যাই। আর প্রতি নবমীর রাতে ও জানলায় এসে দাঁড়ায়। আমি ওর নাম জানি না। জিজ্ঞেস করিনি। মিতালি জানে, জেঠু জানেন, রাজু জানে, কিন্তু কেউ বলে না। আমিও জানতে চাই না। ব্রুনাইয়ে শিখেছিলাম, নিমো স্টেশনে আবার শিখলাম, জেনে ফেললে আর দেখা যায় না।

    (একটু থেমে) আর আপনারা? ✦ ... আমার মনে হচ্ছে আপনারা ওর নাম জানেন। হয়তো পুরো গল্পটাই জানেন। ✦ ... দয়া করে আমাকে বলবেন না।

    [আবহ: দীর্ঘ নীরবতা।]

    সুমন (প্রায় ফিসফিস): শুধু একটা কথা আজও রাতে ঘুমোতে দেয় না। সেদিন গাছের গোড়ায় যে দুটো ছায়া দেখেছিলাম... ওরা কিন্তু কোথাও যায়নি। পঞ্চমুণ্ডির আসন এখনও আছে। খুলির সংখ্যা এখনও বাড়ছে। আর চারটে মাথা তো ওদের আছেই... পঞ্চমটার জন্য ওরা প্রতি নবমীতে অপেক্ষা করে। আর কেউ একজন এখনও ওদের পা টিপে দেয়। কাল রাত থেকে আমার ঘাড়ের কাছটা আবার সুড়সুড় করছে। থেকে থেকেই। ✦ ... আর মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে, খাটের তলা থেকে একটা শব্দ আসে। ঘষ... ঘষ... ✦ ... আমি এখনও ঘাড় ঘোরাইনি। কারণ জানি না, এবার পেছনে টুনি আছে... ✦ ... নাকি ওরা...

    [আবহ: হঠাৎ, দর্শকদের পেছন থেকে, বা সব স্পিকার থেকে একসঙ্গে, একটা খিলখিল হাসি। সঙ্গে খুব কাছে: ঘষ... ঘষ... তারপর অন্ধকার। নীরবতা। একেবারে শেষে, খুব আলতো, একবার, ঝুমঝুমি।]

    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
    যবনিকা
    ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • নাটক | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Debanjan | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:৩৪743479
  • অসাধারণ গল্প
  • syandi | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৪৪743480
  • আহ! নিমোর গল্প অনেকদিন পরে এল, এবং যথারীতি ভাল হয়েছে। এই হারা বোধ হয় ঝালমুড়ির ব্যবসায় নেমেছিল। আপনার অন্য টইতে এইরকম পড়েছিলাম বলে মনে হচ্ছে।
  • উ | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৮743488
  • আনপুটডাউনেবল। তবে একটা ব্যাপার, সুমনের বয়স এখন ৩৮। আর সুমনের বাবা যখন যজ্ঞডুমুরের ডাল আনতে গিয়েছিলেন ৩৭ বছর আগে, তখন তাঁর বয়স ১২। কিভাবে?
  • সুকি | ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৯743489
  • ধন্যবাদ দেবাঞ্জন, স্যান্ডি, উ।
     
    স্যান্ডি, আপনার মনে আছে দেখছি! হ্যাঁ, হারা মুড়ি মশলা বিক্রী করত ট্রেনে।
     
    উ - আপনি একদম ঠিক ধরেছেন। লেখার পর পড়ে দেখেছিলাম যে বয়সের হিসেবটা গোলমাল করে ফেলেছি। ঠিক করে নেব। দেখার ইচ্ছে ছিল যে, এই ভুলটা কেউ খেয়াল করেন কিনা!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন।