[আলো জ্বলে ওঠে। ইরাবানের বসবার ঘর। সেখানে দেওয়ালের দিকে কী যেন দেখতে থাকে মিস বৃন্দা । একটু পরে ইরাবান ঢোকে। হাতের ট্রেতে ডিম টোস্ট আর চা]।
ইঃ নিন। এবার বসে আয়েস করে খান। [একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়। নিজে একটা চেয়ারে বসে]
বৃঃ এইসব বই আপনি পড়েছেন?
ইঃ হ্যাঁ। পড়াশোনা করা আমার হবি। আর লিখিও মাঝেসাঝে।
বৃঃ [চেয়ারে এসে বসে] আপনি আউটসাইডার না কীসের যেন কথা বলছিলেন?
ইঃ হ্যাঁ। আলবেয়ার কামু। কামু বলেছেন যে সত্যি যদি কোনও দার্শনিক সমস্যা পৃথিবীতে থেকে থাকে, তবে সেটা হল আত্মহত্যার সমস্যা। [ওরা খেতে শুরু করে]
বৃঃ কিন্তু স্পিনোজা কী বলেছিলেন জানেন?
ইঃ আপনি, আপনি স্পিনোজা জানেন!! [মাথা নাড়ে বৃন্দা ] দারুণ। কেয়াবাৎ। বলুন শুনি।
বৃঃ উনি বলেছিলেন যে একসঙ্গে কেউ যুগপৎ কখনও নিজের ঘাতক এবং বধ্য হতে পারেন না। আসলে আক্ষরিক অর্থে আত্মহত্যা অসম্ভব।
ইঃ কেন?
বৃঃ দেখুন আপনি একদিকে নিজেকে মারছেন ও নিজে মরছেন। মানে ঘাতক আর বধ্য আপনি কিন্তু নিজেই...
ইঃ হ্যাঁ। এটাই তো আত্মহত্যার মজা।
বৃঃ মজা!! আপনি জানেন ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন আর ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে আত্মহত্যা করা অপরাধ বলে ধরা হত। আজ আপনার এই আত্মহত্যা বা আরও অনেক আত্মহত্যা আসলে হ’ল মুনাফামাতাল রাক্ষুসে ধনতন্ত্রের বা একনায়কতন্ত্রের জিত। আমীর খান এই নিয়ে পিপ্লি লাইভ সিনেমা করল। ইশোপনিষদে লেখা আছে যে যারা আত্মহত্যা করে তারা অন্ধ তমসায় প্রবেশ করে। পড়েননি?
ইঃ না। কিন্তু হিন্দু বা বৌদ্ধ বা জৈন ধর্মে তো সেইরকম কিছু বলা নেই ম্যাডাম। যেমন, হিন্দু ধর্মে বলা আছে যে the Hindu’s were already inclined to self destruction under Brahminic rule. বৌদ্ধরা বলেছেন যে Highest bliss of self destruction is nirvana. জৈনরা আবার প্রায়োপবেশনের কথা বলেছেন।
বৃঃ দেখুন [উঠে দাঁড়ায়। সামনে হেঁটে যায়। ফিরে আসে] যে রবীন্দ্রনাথ নিজে তারকার মৃত্যু লিখেছেন, লিখেছেন যে ‘কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করিয়া গেল যে সে মরে নাই’, সেই তিনিই কিন্তু লিখেছেন ‘মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে / মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। তিনি আরও লিখেছেন “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে, মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ” বা ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’। আরও আছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা নুতন যৌবনের দূত।/ আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত। / আমরা বেড়া ভাঙি, আমরা অশোকবনের রাঙা নেশায় রাঙি, / ঝঞ্ঝার বন্ধন ছিন্ন করে দিই, - আমরা বিদ্যুৎ’। তাহলে তাঁর কোন কথাটা ধরবেন? তিনি কিন্তু বেঁচে থাকতেই এইসব বলে গিয়েছেন। নিজের জীবনে কতো শোক যে পেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তবুও কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করেন নি। আপনারও যদি তেমন কোনও শোকসন্তাপ থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করুণ। লড়াই। “হাল ছেড়ো না বন্ধু কণ্ঠ ছাড়ো জোরে...”।
ইঃ কবীর সুমন? [উঠে দাঁড়িয়ে বৃন্দার উল্টোদিকে এসে দাঁড়ায়] আসলে রবীন্দ্রনাথ নিজে হয়ত আত্মহত্যার ব্যাপারে ভীতু ছিলেন বা সৃষ্টির আনন্দে ছিলেন মশগুল। বুঝেছিলেন যে তাঁর মধ্যে যে সমস্ত সৃষ্টির নতুন বীজগুলো আছে সেগুলো আর কেউ তেমন করে উপলব্ধি করতে পারবে না। তাই তিনি যদি হঠাৎ দুম করে আত্মহত্যা করেন তাহলে রয়ে যাবে অনেক অপূর্ণতা।
বৃঃ না। একেবারেই ভুল বলছেন আপনি। রবীন্দ্রনাথ পড়লে মানুষ মনে জোর পায়, তেজ পায়, বাঁচবার মানে খুঁজে পায়। বিপ্লবীদের মধ্যেই শুনেছি কারাগারে তারা নাকি রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েই মনের জোর বজায় রাখতেন। তাছাড়া বাংলাভাগের সময় তিনি যেভাবে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য আনবার জন্য পারে হেঁটে হেঁটে মন্দিরে মসজিদে রাখী পড়াতে গেছিলেন সেটা একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার। নিজেও তো চেয়েছিলেন পলিটিক্সে আসতে, কিন্তু তখনকার অনেক নেতাই বাধা দিয়েছিলেন। ঘরে বাইরে পড়েননি?
ইঃ পড়িনি। দেখেছি। সিনেমা...
বৃঃ তাহলে? সেখানে তিনি একজন জাতীয়তাবাদী নেতার মুখোশ খুলে দেননি?
ইঃ আপনি পড়াশোনা করেছেন কোথায়?
বৃঃ কেন? প্রেসিডেন্সীতে । তারপর যাদবপুরে।
ইঃ ওহ, তাই বলুন। হুম, বাহ ভালোই বললেন। কিন্তু আবার মানিকবাবুর “জীবনের জটিলতা” উপন্যাসের ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদের আরম্ভের লাইনগুলো একবার মনে করুণ। হ্যাঁ, মনে করুন। সেখানে মৃত্যুভয় ও মৃত্যু লালসার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা লিখতে গিয়ে মানিক লিখছেন, “যতখানি বেদনার সঙ্গে নারী মানুষকে পৃথিবীতে আনে, মানুষ বোধহয় ঠিক ততখানি অনিচ্ছার সঙ্গেই পৃথিবীতে আসে। তাই পৃথিবী ছাড়িয়া যাওয়াকে সে এতো ডরায়। অনিচ্ছায় পাওয়া পথিক বৃত্তি মৃত্যুভয়েই ধন্য হইয়া গিয়াছে। ছেলেটা বাস চাপা পড়িয়া মরিয়া তাই জানিয়া গেল ছোট ছোট ব্যার্থতায় জীবনটা ভারাক্রান্ত হইলেও, শক্তি তারও কিছু কম নয়; প্রকৃতির সবচেয়ে প্রবল বন্ধনকে সে জয় করিয়াছে; না মরিবার লাখ লাখ সুযোগের একটা গ্রহণ করিয়াও আত্মরক্ষা করে নাই”। কেমন?
বৃঃ অসাধারণ! আবার গত শতাব্দীর আশির দশকে ভের্নার শ্রয়টার নামের একজন চিন্তককে সাক্ষ্যাতকার কালে মিশেল ফুকোকে কী বলেছিলেন জানেন?
ইঃ না। বলুন শুনি।
বৃঃ উনি বলেছিলেন যে বেশ কিছুকাল হল একটা উপলব্ধি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে আর সেটা হল যে নিজেকে হত্যা করা বেশ শক্ত ব্যাপার। ধরা যাক, ভেবে দেখুন – আত্মহত্যার কত মুষ্টিমেয় সংখ্যক উপায় আমাদের হাতে আছে। আর সেই উপায়গুলির প্রত্যেকটিই একটা অন্যটার থেকে উৎকট রকমের ঘৃনার্হ। যেমন গ্যাসের দ্বারা শ্বাসরোধ করা প্রতিবেশীদের পক্ষে বিপদজনক, ফাঁসি দিয়ে ঝুলে পরাটা পরের দিন সকালে যে আবিষ্কার করবে তার পক্ষে ঝামেলাকর ও অপ্রীতিজনক। জানালা দিয়ে ঝাঁপ দেওয়াটা রাস্তাকে নোংরা করবে অবধারিত। তার চেয়ে বরং লড়াই করে বেঁচে থাকা অনেক মর্যাদার, অনেক পৌরষের। আপনি কি জীবনে ব্যার্থ বলে সুইসাইড করতে চাইছেন?
ইঃ দেখুন মিস বৃন্দা, ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা সফল হয়েও আত্মহত্যা করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন। ক্লিওপেট্রা, মার্ক আন্টনী থেকে শুরু করে রবিন উইলিয়ামস, মেরিলিন মনরো, অ্যালান টুরিং, কুর্ট কোবেইন, ভ্যান গঘ, হেমিংওয়ে, মায়কভ্স্কি, ভার্জিনিয়া উলফ, সিল্ভিয়া প্লাথ, সেনানায়ক রোমেল, হ্যানিবল, গায়ক চেস্টার বেনিংটন, গণিতবিদ এরাস্টোথেনিস, চন্দ্র শেখর আজাদ ...। কত বলবো।
বৃঃ কিন্তু তাদের সফলতার মধ্যেই একটা ব্যার্থতা নিশ্চয়ই কোথাও হয়ত লুকিয়ে ছিল। বা তাদের জীবনে উঁকি দিলে নিশ্চয়ই এমন কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে যে তারা হয়ত আপনার মতো তীব্র হতাশায় ডুবে, আই মিন ডিপ্রেশন ...
ইঃ ছিল তো। তাদের সফলতার মধ্যেই একটা ব্যার্থতা নিশ্চয়ই কোথাও হয়ত লুকিয়ে ছিল। হ্যাঁ। আর সেটা যেন জীবনানন্দ ধরতে পেরেছিলেন। “জানি – তবু জানি / নারীর হৃদয় – প্রেম – শিশু – গৃহ – নয় সবখানি; / অর্থ নয় – কীর্তি নয় – সচ্ছলতা নয় - / আরও এক বিপন্ন বিস্ময় / আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে / খেলা করে; / আমাদের ক্লান্ত করে / ক্লান্ত – ক্লান্ত করে; / লাশকাটা ঘরে / সেই ক্লান্তি নাই”।
বৃঃ বাব্বা। নিজের আত্মহত্যার সপক্ষে অনেক প্রমাণ পত্তর তাহলে জোগাড় যন্ত্র করেছেন দেখছি।
ইঃ এই একটা কাজই যে করে চলেছিলাম। আমার একটা অনুসন্ধিৎসু মন আছে জানেন। আর সে সবসময় খুঁজে বেড়ায়, খুঁড়ে বেড়ায়...
বৃঃ আপনার অনুসন্ধিৎসু মন যখন আছে তখন নিশ্চয়ই জানেন যে ক্লাইভ এবং হিটলারের সঙ্গে অনেক নাজি অফিসারও সুইসাইড করেছিল। অনেক বড় বড় ক্রিমিনালও সুইসাইড করেছে। জীবন কিন্তু অনেক মূল্যবান ইরাবানবাবু। আর তাদের নামও নিশ্চয়ই জানেন যারা অসফল সুইসাইড অ্যাটেম্পট করে শেষে বিখ্যাত হয়েছিলেন?
ইঃ কই? নাতো!
বৃঃ জেনে রাখুন। হয়ত কাজেও দিতে পারে। ক্লার্ক গেবল, নাদিয়া কোমানিচি, লিজ টেলর, ব্রিজিত বার্দো, ওয়াল্ট ডিজনি, ব্রিটনি স্পিয়ার্স। তারপর জিম ক্যারি, জনি ডেপ থেকে শুরু করে এমিনেম, হ্যারিসন ফোর্ড, অ্যানা হ্যাথাওয়ে এরা ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়ে লড়ে দারুণভাবে বেঁচে আছেন বা ছিলেন। জে.কে. রাউলিং তো বলেছেন যে হ্যারি পটার লিখতে গিয়ে এই ডিপ্রেশনই নাকি তাকে সাহায্য করেছে। ডিপ্রেশনের ডার্ক এনার্জী। তাহলে? কী বলবেন? কাকে সত্য ধরবেন?
ইঃ বসুন মিস বৃন্দা, বসুন। বাকি ডিম টোস্টটা খেয়ে নিন। আমি বলছি।
বৃঃ [বৃন্দা বসে খেতে শুরু করে] তারপর আপনি যদি টমাস অ্যাকুইনাসের, মানে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে তিনি যে তিনটি যুক্তি দিয়েছিলেন সেগুলো একবার শোনেন।
ইঃ বেশ বলুন না, শুনছি [খেতে থাকে]
বৃঃ টমাস বলছেন এক, হত্যা মানেই পাপ, তাই আত্মহত্যাও এক ধরণের পাপ। দুই, যে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল একজন ব্যাক্তিমানুষ, আত্মহত্যার দ্বারা সেই সমাজের ক্ষতি করা হয় আর তিন, জীবন আমাদের প্রতি প্রকৃতির এক করুনার দান। আর সেই মহামূল্যবান ও অনেক প্রতিশ্রুতিময় জীবনকে এইভাবে কেটে ছেঁটে ছোটো করে ফেলার অধিকার প্রকৃতি আমাদের দেন নি।
ইঃ একদম দিয়েছেন। আলবাত দিয়েছেন আর এখানেই ড্যুরখাইম তাঁর ‘আত্মহত্যা – একটি সমাজবৈজ্ঞানিক পাঠ’- বইতে লিখেছেন যে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আত্মহত্যার ঘটনা হল তিন প্রকারের। হ্যাঁ, তিন প্রকারের। এক, ব্যাক্তি স্বার্থপর অহংকেন্দ্রিক আত্মহত্যা। দুই, পরার্থপর বহুজনহিতায় আত্মহত্যা। আর তিন, নির্মিয়ম বেমাক্কা আত্মহত্যা। আমি কিন্তু পরের জন্য আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি আর সেটা হবে পরম গৌরবের।
বৃঃ ঠিক আছে বাবা। আপনার পাগলামো নিয়ে আপনি থাকুন। আর আমি তাহলে চলি...
ইঃ যাবেন? যান। কী আর বলবো। তবে অনেকদিন পর না কারুর সঙ্গে কথা বলে খুব আনন্দ পেলাম। ওহ, দেখেছেন, আপনার নামটা কি জানা যায়?
বৃঃ নিশ্চয়ই। অরুন্ধতি বৃন্দা । এম.এ. ফিলসফি আর ডিপ্লোমা ইন মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট।
ইঃ আর ফোন নম্বরটা ...
বৃঃ সেটাও লাগবে?
ইঃ এই যে কটা দিন বেঁচে থাকি। কথা তো বলা যাবে...
বৃঃ নিন।
ইঃ অনেক মানুষের জন্য, তাদের বেঁচে থাকবার সুযোগ করে দিয়ে মরে যাওয়ার কী যে সুখ, সেটা কিন্তু আপনি বুঝতে পারবেন না।
বৃঃ তাই? আপনার এই কথাটার উত্তর আমি যথাসময়ে কিন্তু দেবো।
[আলো নিভে গেল। আলো জ্বলে উঠল। অরুন্ধতির ঘর। সে অস্থিরভাবে পায়চারী করছে]
বৃঃ নাহ। এর একটা বিহিত করতেই হবে। [সে ফোন করে] হ্যালো, হ্যালো, কে গুহকাকু?
গুঃ [নেপথ্যে] হ্যাঁ, কে বৃন্দা?
বৃঃ হ্যাঁ কাকু।
গুঃ [নেপথ্যে] বল।
বৃঃ বলছি যে আজকে অফিসে কাজে রিসাইন দিয়ে চলে এসেছি।
গুঃ [নেপথ্যে] কেন রে? Any problem?
বৃঃ আরে! না, না। আমার কিছু হয় নি। তবে আমাদের ম্যানেজমেন্ট তাদের চ্যানেলের টি.আর.পি. বাড়ানোর জন্য আর প্রোডাক্টের সেল বাড়ানোর জন্য একটা লোককে আত্মহত্যা করতে বা করাতে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে।
গুঃ [নেপথ্যে] হোয়াট?
বৃঃ হ্যাঁ। আমি প্রতিবাদ করাতে ওরা আমাকে রিসাইন করতে বলে। কিন্তু আমি চাই কাকু যে একজন পুলিশের একজন অফিসার হিসেবে এই নারকীয় ব্যাপারটা আপনি বন্ধ করতে আমায় সাহায্য করুণ।
গুঃ [নেপথ্যে] করবো, নিশ্চয়ই করবো। কিন্তু আগে আমায় বল যে তোদের ম্যানেজমেন্ট কি ওকে আত্মহত্যা করতে উস্কাচ্ছে, না ও নিজেই আত্মহত্যা করতে চায়?
বৃঃ ও নিজেই আত্মহত্যা করতে চায়।
গুঃ [নেপথ্যে] সেকীরে!! তাহলে তো আমাদের তরফ থেকে ওকে বোঝানো ছাড়া আর কিছু করার আইনি অধিকার নেই। কাউন্সেলিং, ভালো করে কাউন্সেলিং করতে হবে আর আমি জানি সেটা তুই ভালোই পারিস। তুই লেগে থাক। আর যদি কিছু হেল্প লাগে তো আমায় কল দিস। কেমন?
বৃঃ ওকে। [ফোন কেটে যায়] যাব্বাবা। কী আর করা যায় ... কাকু কাউন্সেসেলিং-এর কথা বললেন। আচ্ছা, দেখি ...
[আলো নিভে যায়। আলো জ্বলে। ইরাবানে ঘর। সেখানে রুবেন, ইপ্সিতা ছাড়াও আরও চারজন মতো আছেন]
ইঃ শুনুন। এই যে ট্রাস্টটার কথা বলছি যেটা আমি আজ কালের মধ্যেই রেজিস্ট্রি করে ফেলবো সেটা বাচ্চাদের, মানে আন্ডার প্রিভিলেজ সেকশনের বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য বিনা সুদে লোন দেবে। মেধাবী বাচ্চা যারা টাকার অভাবে পড়তে পারছে না। কেমন?
রুঃ কিন্তু এইসব তো তুই নিজে রোজগার করেও করতে পারতিস।
ইপ্সিঃ হ্যাঁ। আমার কিন্তু এইসব মোটেও ভালো লাগছে না। ইন ফ্যাক্ট আমি ব্যাপারটা ভাবতেই পারছি না যে তুমি ... [গলায় একটা কান্নার ভাব]
ইঃ এতে ভাব্বার মতো আর কিছু পড়ে নেই। আমি আজ যদি আবার কোথাও কাজকর্ম শুরু করি তবে কোম্পানি যা টাকা দিচ্ছে সেই টাকা জীবনেও রোজগার করতে পারবো না। আর নিজে কাজ করে কজনকেই বা শিক্ষার আলোয় আনতে পারবো বল?
ইপ্সিঃ ওরা তোমাকে বোকা পেয়ে এইসব করাছে।
বৃঃ [এইসময় প্রবেশ করে] একদম ঠিক বলেছেন। এই কথাটাই আমি ইরাবানবাবুকে বুঝিয়ে উঠতে পারছি না।
ইঃ আরে!! আপনি এসেছেন তাহলে? দাঁড়ান, সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি হলেন মিস বৃন্দা, আমাদের এই ট্রাস্টের সেক্রেটারি। খুব এফিসিয়েন্ট।
বৃঃ আগে আপনি উনি যা বলছেন তার উত্তর দিন। কোম্পানি আপনাকে দেখিয়ে মোটা টাকা বাজার থেকে তুলছে, আর আপনাকে দিচ্ছে কত? তার কত পার্সেন্ট?
ইঃ ও, আপনি কি তাহলে টাকার অ্যামাউন্টটা বাড়াতে বলছেন? ঠিক আছে আমি মি. বোসকে বলে দেবো যে আরও চল্লিশ মতো লাগবে। [হাসে]
বৃঃ হাসছেন? আপনার কি বোধবুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেলো নাকি?
রুঃ একটু বোঝান না ম্যাডাম। এই আমরা সবাই বোঝাতে বোঝাতে ফেড আপ হয়ে গেলাম। শোনা অবধি আমার মেয়েটা কাঁদছে। কী পাগলামী করছিস বিলু। শোন ভাই আমার, চুক্তিটা ক্যান্সেল করে বেরিয়ে আয়...
ইঃ সেটা আর সম্ভব নয়। শোন, ইতিহাস যাকে তাকে সময় দেয় না। আমাকে দিয়েছে। একটা ডাক আমি ভিতর থেকে শুনতে পেয়েছি। হ্যাঁ, আর ইরাবান যে সংকল্প নেয়, সেখান থেকে সে ফেরে না।
ইপ্সিঃ [অরুন্ধতিকে] আপনিই একটু বুঝিয়ে দেখুন ভাই। এ পাগলামোর ওষুধ আমাদের জানা নেই। আর, আমরা তাহলে এখন আসি।
ইঃ ওকে। কাল বা পরশু এসে সই সাবুদ করে যাবে, কেমন? [রুবেন, ইপ্সিতা আর বাকি চারজন বেরিয়ে যায়]
বৃঃ আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো...
.
ইঃ দাঁড়ান। ফ্লাস্কে চা করা আছে। সেটা নিয়ে আসি। [ইরাবান স্টেজের বাইরে বেরিয়ে যায়। বৃন্দা আবার বইটইগুলো দেখে। একটু পরেই হাতে দু’কাপ চা নিয়ে ইরাবান প্রবেশ করে] নিন।
বৃঃ কই? যেটা জিজ্ঞাসা করলাম তার উত্তর দিন। আপনার ক্রাইসিস কি টাকা? [ইরাবান চায়ে চুমুক দেয়] যদি টাকাই হয় তাহলে চলুন আপনি, আমি, আপনার আর সব বন্ধুবান্ধব মিলে সবার দোরে দোরে যাই। আমাদের প্রকল্পের কথা সবাইকে বলি ... কী? চুপ করে রইলেন কেন? [বসে ও চা পান করতে শুরু করে]
ইঃ আমার জন্যে আপনি যে এতোটা ভেবেছেন, তাতেই আমি মুগ্ধ। নাহ, আপনাকে তাহলে খুলেই বলি। আমি হলাম বাবা মায়ের এক অপদার্থ সন্তান। তাঁদের বাঁচাতে পারিনি। অকালে তারা আমায় ছেড়ে চলে গেলেন। তারপর আত্মীয়রা এই এজমালি বাড়িটাকে নিয়ে আমায় এফোঁড়ওফোঁড় করে দিলো। আঁচড়ে, কামড়ে..., থানা, পুলিস, মাস্তান, দাদা..., কিছুই বাকি রাখেনি। তারপর যাদের ভালবাসলাম তারাও অপদার্থ অকর্মন্য বলে আমায় লাথি মেরে অন্যের সঙ্গে চলে গেল। এবার বলুন, আর কাদের নিয়ে, কোন আশা, কোন ভরসা নিয়ে আমি বেঁচে থাকবো?
বৃঃ [কিছুটা চা পান করে উঠে দাঁড়ায়] তাহলে আমার জীবনের কথা কিছু আপনাকে যে বলতে হয়।
ইঃ বেশ, বলুন।
বৃঃ যাদবপুর থেকে এম.এ. পাশ করার সময় বেড়াতে গিয়ে এক অ্যাক্সিডেন্টে আমি আমার বাবা-মাকে হারাই। অল্পের জন্য আমি বেঁচে যাই। কাকা আর কাকীমা আমায় অনেক হেল্প করেন। আমি আবার ডিপ্লোমাটা শেষ করি। তবুও মাঝেমধ্যেই মা-বাবার কথা মনে পড়ত। ফিলোজফি পড়লেও অঙ্কের প্রতি আমার একটা দারুণ টান ছিল। আমি অঙ্কের ইতিহাস, বিশেষ করে গণিতে মহিলাদের অবদান নিয়ে পড়াশোনা করতাম।
ইঃ সে তো দারুণ ব্যাপার। বেশ ইন্টারেস্টিং। বলুন না একটু, শুনি।
বৃঃ বলছি। সেখানে চর্চার বিষয় ছিল অ্যাডা লাভলেস, ডিবচ লর্ড বায়রনের পরিতক্ত্যা কন্যা। শুধু পিতা নয়, তাকে ভুলে গিয়েছে আমাদের সমাজ। অথচ ব্যাবেজের অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের জন্য সে কোড লিখেছিল। আবার দেখুন, রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বোন’ উপন্যাসে দিদি শর্মিলা উপহাস করে বোন উর্মিলাকে বলছে যে তোর এইসব ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং করতে ভালো লাগে? অর্থাৎ এইসব যেন পুরুষদের কাজ, মেয়েদের করা সাজে না। ঠিক এইরকম এক অনাসৃষ্টি গণিতের নেশা ছিল হানা নিউম্যানের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিনে তার ইতিহাসবিদ বাবাকে হত্যা করা হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে হানা নিজের হাতে তুলে নেয় সংসারের ভার আর ঝুঁকে পড়ে গণিতে। [ইরাবান উঠে দাঁড়ায়] যদিও পার্থিব প্রাপ্তির হিসেবে বরাবরই তাঁর জীবনে একটা গরমিল থেকে গেছে। ইহুদী বিদ্বেষের আবহে তাকে হারাতে হয়েছে চাকরি। নিজের কাঙ্ক্ষিত মানুষকে বিয়ে পর্যন্ত করতে পারেন নি ইহুদী বলে।
ইঃ সেকী!! এইসব তো জানি না...
বৃঃ তারপর, ডরোথি লুই বার্নস্টাইন। হানার মতো তার জীবনেও ছিল অজস্র কাঁটাতার। ছোটবেলা থেকেই সে দারিদ্রের সঙ্গে লড়ছে। মেয়ে বলে চাকরী জীবনে নানা জায়গায় অপদস্ত হতে হয় তাকে। যদিও আলেকজান্দ্রিয়ার গনিতজ্ঞ থিয়ন কন্যা হাইপেশিয়ার মতো তাঁদেরকে পাথর ছুঁড়ে মারা হয় নি বা খনার মতো কেটে ফেলা হয় নি তাঁদের জিভ।
ইঃ বাপরে!! এ যে ভীষণ ব্যাপার দেখছি ... [ফোন আসে] হ্যাঁ, আচ্ছা, ..., আমি কালকেই ঠিক সময়ে পৌচ্ছে যাব অফিসে..., হ্যাঁ... একদম।
বৃঃ কে ফোন করেছিল? জানতে পারি?
ইঃ বোস সাহেব। কাল থেকে অফিসে আমাকে আট ঘন্টা করে সময় কাটাতে হবে। ওরা আমাকে টেলিকাস্ট করা শুরু করবে। আর সুইসাইডের দিন ঠিক কী বলতে হবে এই ক’দিন চলবে তারই রিহার্সাল।
বৃঃ ও। [টেবিল থেকে ব্যাগ নেয়] তাহলে আর কী। চলি আমি...
ইঃ যাবেন? আপনার কথা শুনতে বড় ভালো লাগছিল। কিন্তু..., ও আচ্ছা, ভালো কথা। পরশু রবিবারে আমার ট্রাস্টের কাগজপত্র সই সাবুদের দিন। যদি বলেন তাহলে আপনার বাড়িতে গিয়েও আমি সই করিয়ে ...
বৃঃ ঠিক আছে।
ইঃ ধন্যবাদ ...
[নেপথ্যে : বাংলার বার্তা। সব খবর প্রথমে জানতে।গেলে চোখ রাখতে হবে আমাদের চ্যানেলে। এখন দেখবেন ৭টার খবর। মিউজিক। শিরোনাম : বিদেশে তেলের দাম কমে গেলেও সরকার দেশে তেলের দাম কমায় নি। ধর্মের নামে ঝুপড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এদিকে কলকাতায় ইরাবান সামন্তকে নিয়ে, তার আত্মহত্যা নিয়ে হইচই শুরু হয়ে গেছে। আমাদের প্রতিনিধি মি. বোসের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন। আজ প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল। কন্ঠস্বর মিলিয়ে যায় ]
[আলো নিভে যায়। মিউজিক বাজে। আলো জ্বলে ওঠে। অরুন্ধতির ঘর। অরুন্ধতী ঘরে বসে বই পড়ছিল। দরজায় বেল বাজে]
বৃঃ যাই। [দরজা খোলে। ইরাবান হাতে একগাদা কাগজ নিয়ে মাথায় হেলমেট পরে ঘরে প্রবেশ করে] ওমা! কে আপানি?
ইঃ আরে, আমি, ইরাবান। সরি, আগের রবিবার আসতে পারিনি। ড্রাফটাই তৈরি করতে পারে নি উকিলে। তাই এক হপ্তা দেরি হয়ে গেল।
বৃঃ হেলমেট পরে আপনাকে কেমন যেন একটা লাগছিল। আর আপনার তো এখন পোয়াবারো তেরো। আপনি তো এখন হট টপিক। এলেন কীসে করে?
ইঃ অনেক লুকিয়ে ম্যাডাম। এই হেলমেটের মধ্যে [হেলমেটটা খোলে] মাথাটাকে লুকিয়ে অ্যাপ ক্যাবে চেপে ...
বৃঃ ড্রাইভার কিছু বলে নি? [হাসে]
ইঃ নাহ। বকশিস দেবো বললাম। রাজী হয়ে গেলো।
বৃঃ সেই। অরণ্যের দিনরাত্রিতে সৌমিত্রের অভিনীত চরিত্রের বলা সেই উক্তিটার কথা মনে পড়ে গেল। তাহলে? আমি এখন একজন স্টারের সঙ্গে কথা বলছি বলুন...
ইঃ কী যে বলেন? আজ আপনার জন্যেই আমি আমার এই কাজে সফল হতে পারছি।
বৃঃ এটা কে আপনি সফলতা বলেন?
ইঃ নয়তো কী? মানুষ তাঁর স্বপ্ন সফল করতেই তো দিনরাত খেটে যাচ্ছে। প্রাণপাত করে যাচ্ছে ...
বৃঃ কিন্তু সেটা নিজে মরে গিয়ে নয়।
ইঃ হ্যাঁ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে তারা বেঁচে আছে বটে। কিন্তু দেখা যায় নিজের সন্তানকে কোনও একটা এম.এন.সি.-এর চিপ স্কেলড লেবার করবার জন্য, দামী চাকর করবার জন্য নিজেরা আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছে। আর আধপেটা খেয়ে রোজ বেঁচে থাকা মানে রোজ অর্ধেক অর্ধেক করে মরে যাওয়া। আমার সঙ্গে তাদের তফাৎ এই যে আমি সম্পুর্ণভাবে মারা যাব এবং একজন সফল মানুষ হিসেবে মারা যাব, যার স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে।
বৃঃ আপনাকে তো আমার জীবনের একটা অধ্যায়ের কথা বলেছি। বলেছি আমার চর্চার কথা। কিন্তু অন্য একটা অধ্যায়ের কথা কিন্তু বলিনি ...
ইঃ বলুন, শুনি।
বৃঃ দাঁড়ান। তার আগে একটু চা জলখাবার আনি।
ইঃ খালি চা আনলেই হবে।
বৃঃ আর ডিম টোস্ট?
ইঃ [হাসে] বেশ।
[অরুন্ধতী স্টেজের বাইরে চলে যায়। ইরাবান টেবিলে পড়ে থাকা একটা বই ওলটায়। মিনিট চারপাঁচ পর অরুন্ধতী ট্রে হাতে ঢোকে]
বৃঃ নিন।
ইঃ ধন্যবাদ। [খাবার নিয়ে খেতে শুরু করে] নিন, আপনার জীবনের বাকী একটা অধ্যায়ের কথা বলছিলেন যে ...
বৃঃ হ্যাঁ। জানেন, আর সব মানুষের মতো আমার জীবনেও কেউ এসেছিল ...
ইঃ সেটাই স্বাভাবিক।
বৃঃ কিন্তু আমাকে ঠকিয়ে সে চলে গেল আরেকজনের সঙ্গে। প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিলাম। এক সময় মনে হয়েছিল বাচ্চাটা থাক। তারপর যখন মনে হল যে বাচ্চাটার গায়েও ওরও বোঁটকা গন্ধ লেগে থাকবে তখন বমি উঠে এলো। আর প্রেগনেন্সির দেড় মাসের মাথায় তৎক্ষণাৎ অ্যাবর্সন করালাম।
ইঃ অ্যাবর্সন!! স্যাড। ভেরি স্যাড।
বৃঃ তারপর থেকে অবশ্য সম্পর্কের ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক ছিলাম। কিন্তু কী যে হল আবার একজনকে ভালোবেসে ফেললাম। কিন্তু পরে জানতে পারলাম যে তার নিজের বউ আছে।
ইঃ তারপর?
বৃঃ তারপর আর কী, তাকেও ছেড়ে চলে এলাম। বছর চার হয়ে গেল আমি একা, একদম একা।
ইঃ আপনি এক কাজ করুন। একজন ভালো দেখে কাউকে, অবশ্যি যাচাই করে নিয়ে, বিয়ে করে ফেলুন বা সম্পর্কে চলে যান। ইয়েস, আপনাকে এখনো অনেকদিন বাঁচতে হবে। তারপর যে কাজের দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি ...
বৃঃ কিন্তু এতোসবের পরেও কই আমার তো মরে যাওয়ার ইচ্ছে হল না।
ইঃ এর উত্তরটা কিন্তু খুব সোজা। হ্যাঁ। কারণ বিপন্ন বিস্ময়ের পাল্লায় আপনি পড়েননি বলে।
বৃঃ ক্যা!!
ইঃ ও আপনি বুঝবেন না।
বৃঃ ওহ, যত বোঝবার দায় কি আপনাকে দেওয়া আছে?
ইঃ কতকটা সেইরকমই বলতে পারেন।
বৃঃ আপনি কি তাহলে ডেটারমাইন্ড?
ইঃ ইস্পাতের মতো ...
বৃঃ কিন্তু ইস্পাতও তো গলে যায় ...
ইঃ তেমন উত্তাপ আজ আর কোথায়? নিন। কাগজে সই করে ফেলুন। আর রুবেন বা ইপ্সিতার নম্বর তো আপনার কাছে আছেই। [উঠে দাঁড়ায়] ও হ্যাঁ। আগামী রবিবার কিন্তু আমি বেশ কিছু আন্ডার প্রিভিলেজ বাচ্চার সঙ্গে দেখা করতে যাবো। যাবেন নাকি?
বৃঃ যাবো।
ইঃ আহ। শান্তি দিলেন ..., পরম শান্তি।
[আলো নিভে গেল। দুই মিনিট পর আলো জ্বলে উঠল। অফিস। সেখানে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে মি. বোস পায়চারী করছেন]
বোঃ দেখেছ? লোকটা আজকে আবার দেরী করছে কেন? ওদিকে রিহার্সাল করানোর লোক এসে বসে আছে। আমি যে..., [ফোন আসে] হ্যালো স্যার, বলুন?
নেপথ্যেঃ চারিদিকে তো হইচই পরে গেছে একদম।
বোঃ ইয়েস স্যার। কী বলেছিলাম আপনাকে। আর আমাদের টিভি চ্যানেলের টি.আর.পি. কতগুণ বেড়ে গেছে স্যার?
নেপথ্যেঃ প্রায় চারগুণ। ওয়েল ডান মি. বোস।
বোঃ হ্যাঁ, শুনলাম নাকি বিজ্ঞাপণদাতারা অন্য চ্যানেল থেকে তাঁদের বিজ্ঞাপণ তুলে নিয়ে আমাদের চ্যানেলে আসছে।
নেপথ্যেঃ একদম। কিন্তু এই মানবাধিকার টাধিকারদের এই ধর্না আর আন্দোলন আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কাগজ থেকে শুরু করে টকশোতে পর্যন্ত ওরা আমাদের ঘৃণ্য ক্রিমিকীট, এমন কী ক্রিমিনাল বলতেও বাকি রাখছে না।
বোঃ জ্বলছে স্যার, সবাই জ্বলছে। আর আমাদের সব রাইভাল চ্যানেলগুলো এর সঙ্গে ইন্ধন যোগাচ্ছে। একটা চ্যানেল আবার আমাদের পার্টানার হবে বলে ফোন করেছিল স্যার।
নেপথ্যেঃ তাই নাকি?
বোঃ আমি এমন একটা দর হেঁকেছি যে হাগা বন্ধ হয়ে গেছে তাদের।
নেপথ্যেঃ হা হা হা। কিন্তু এই মানবাধিকার কর্মীরা যদি কিছু একটা করে বসে?
বোঃ করে বসলেই হল? কোথায় ছিল তারা যখন সামন্তবাবু ওই চল্লিশটা বাচ্চার শিক্ষার দায়িত্ব নিজে একার কাঁধে তুলে নিলেন? কোথায় ছিল তারা যখন সামন্তবাবু আত্মহত্যা করতে গেছিলেন? উনি তো এমনি এমনি দুম করেই মরে যেতেন। কে জানতে যেত তখন? মানবাধিকার সংস্থাগুলো সেকথা জানতেও পারত না। এখন আমরা যখন সেই আত্মহত্যাকে একটা গৌরবজনক ঘটনায় পরিণত করেছি, তখন তারাও নিজেদের পাব্লিসিটির জন্য ক্ষীর খেতে চলে এসেছে স্যার।
নেপথ্যেঃ সেই। দারুণ বলেছেন মি. বোস। আপনার এই কথাটা আমি আমাদের চ্যানেলে ফলাও করে প্রচার করবো।
বোঃ তার আর দরকার হবে না স্যার। কাজটা হয়ে গেলে আমি নিজেই গিয়ে সেটা আমাদের চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে বলবো।
নেপথ্যেঃ আর আমাদের সামন্তের খবর কী?
বোঃ সেতো এখন মেগা কী, সুপার ডুপার স্টার হয়ে গেছে। তাকে লুকিয়ে মানে আন্ডার গ্রাউন্ডে রাখা আছে। সেখানেই খাওয়াদাওয়া থেকে মায় রিহার্সাল পর্যন্ত সব চলছে। শুধু সামনের রবিবার তাকে একটু ছাড়তে হবে। সঙ্গে অবশ্য বাউন্সার থাকবে।
নেপথ্যেঃ যাক। শুনে নিশ্চিন্ত হলাম...
বোঃ আমি কিন্তু স্যার একটু টেনশনে আছি...
নেপথ্যেঃ কেন?
বোঃ মি. সামন্ত আজ আসতে দেখছি দেরী করছে। আসলে আত্মহত্যার স্ক্রিন প্লে আর ডায়লগ কী হবে সেটার জন্য আমি অফিসে স্পেশাল লোক আনিয়ে বসিয়ে রেখেছি। সামন্ত শুধু এখনো এসে পৌছয় নি।
নেপথ্যেঃ ও দেখুন এসে যাবে।
বোঃ আর আপনি স্যার ফরেন ট্যুর থেকে কবে ফিরবেন?
নেপথ্যেঃ খুব শীঘ্রই।
বোঃ ওকে স্যার। [ইরাবান এসে ঢোকে] এই যে, উফ, টেনশনে ফেলে দিয়েছিলেন মশাই।
ইঃ কেন?
বোঃ আরে, আপনাকে সেই বিশেষ দিনের চিত্রনাট্য ও ডায়লগ শেখানোর জন্য একজন সেই কখন থেকে বসে আছে। যান। [যেদিক দিয়ে ইরাবান ঢুকেছিল তার উলটোদিক দিয়ে সে বেরিয়ে যায়]
নেপথ্যেঃ হ্যালো, হ্যালো ... এসেছে?
বোঃ হ্যাঁ স্যার।
নেপথ্যেঃ তাহলে সুইসাইডটা কোথায় করাবেন ঠিক করলেন? পাবলিক প্লেসে?
বোঃ না না স্যার। পুলিস, মানবাধিকার কর্মী বা রাইভাল লোকেরা সমস্যায় ফেলতে পারে। আমরা স্যার একটা স্টুডিও ভাড়া নিয়েছি। শহর থেকে দূরে। সেখানেই ...
নেপথ্যেঃ দারুণ ...
[আলো নিভে যায়। স্টুডিওর রাস্তা। দু একজন লোক হেঁটে চলে গেল পাশ দিয়ে। ইরাবান আর অরুন্ধতী পাশাপাশি বসে]
ইঃ আপনার আজ এখানে আসাতে কী যে ভালো লাগছে কী বলবো। জীবনের বাকী ক’টা দিন এভাবে যে আপনার সঙ্গ পাবো স্বপ্নেও ভাবিনি।
বৃঃ সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে আর একবার কি বিবেচনা করা যায় না?
ইঃ বিবেচনা!!
বৃঃ হ্যাঁ। আজ আপনি কিন্তু বেশ বিখ্যাত একজন মানুষ। কতলোকে আপনাকে চেনে, জানে। কতো মানুষ আজ আপনার সঙ্গে একবার কথা বলে ধন্য, মানে সার্থক করতে চায় তাদের জীবন...
.ইঃ এইসব তো আপনারই করুণা। সেদিন আপনি আমায় না বাঁচালে আজ নিজেকে এই জায়গায় নিয়ে আসতে পারতাম না। আজ আমি যা কিছু সে তো আপনারই জন্যে ...। শুধু দেখবেন যেন আমার অন্তিম ইচ্ছাগুলো বাস্তবে রূপ পায়। ছেলেমেয়েগুলো শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যাতে নিজেদের, নিজেদের বাবা মায়ের আর দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।
বৃঃ আর আপনি?
ইঃ আমি আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে থেকে যাব আপনাদের সবার মধ্যে..., আজীবন। দেখুন, আজ আমাকে নিয়ে এমন অনেকে কথা বলছে যারা একদিন আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, একবার ফিরেও তাকায়নি..., এটা আমার জয় না? আর আমার বিজয়রথের সারথি কিন্তু আপনি ...
বৃঃ কিন্তু কত কথাই তো আর বলা হল না।
ইঃ আপনি না বললেও, আমি ঠিক শুনে নিয়েছি। আমার মনে মনে ...
বৃঃ কিন্তু, [ফোন আসে] হ্যালো...
নেপথ্যেঃ আমি ইপ্সিতা বলছি। বিলুদা কোথায়?
বৃঃ পাশেই আছে।
নেপথ্যেঃ একটু সরে এসো।
অরুন্ধতী: [ ইরাবানের থেকে দূরে সরে যায়] এবার বলো ...
নেপথ্যেঃ শোনো আমি না একটা প্ল্যান করেছি। তুমি এখানে এলে বলবো...
বৃঃ কী প্ল্যান?
নেপথ্যেঃ তোমাকেও কিন্তু থাকতে হবে আমাদের সঙ্গে।
বৃঃ সে তো থাকবই...
নেপথ্যেঃ একদম সামনে থেকে দিতে হবে নেতৃত্ব। পারবে?
বৃঃ ওকে বাঁচানোর জন্য সব করতে আমি রাজি আছি। কিন্তু ও তো বুঝছেই না।
নেপথ্যেঃ ঠিক আছে। এখন বেশি কথা বললে বিলুদা সন্দেহ করবে। তাই চটপট ওর নতুন ফোন নম্বরটা নিয়ে আমাদের এখানে চলে এসো। আমরা ওর স্টুডিওর খুব কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। অ্যাড্রেস তোমায় মেসেজ করে দিচ্ছি।
বৃঃ ওকে। [ফোন কেটে দিয়ে ইরাবানের কাছে চলে আসে] তাহলে বিদায় বন্ধু...
ইঃ এখনই চলে যাবেন? আর একটু বসবেন না? কাল যে আমায় আর [বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে]
বৃঃ আমি শেষবারের মতো অনুরোধ করছি, আপনি আপনার এই পাগলামো বন্ধ করে চলে আসুন আমার সঙ্গে। তারপর একটা প্ল্যান করে না হয় কিছু করা যাবে। উকিল আছেন, গুহ কাকু, রুবেনদা, ইপ্সিতা..., আমরা সবাই আছি ...
ইঃ [দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে] সেটা আর হয় না অরুন্ধতী ...
বৃঃ নাম ধরে বললেন?
ইঃ বললাম। আপনাকে নাম ধরে ডাকতে ইচ্ছে করছিল। আজ তাহলে আসুন। কাল একবার ফোন দেবো আপনাকে। চির বিদায় বন্ধু। [হাত ধরে] আপনার মতো বন্ধু সবার হোক। [স্টেজের ডানদিকে হাঁটতে শুরু করে। বেরনোর আগে থমকায়। ফিরে দেখে। অরুন্ধতী রূমাল দিয়ে তার চোখ মোছে। ইরাবান ভিতরে ঢুকে যায়। আলো নেভে]
নেপথ্যেঃ খবরের বার্তা চ্যানেল থেকে বলছি, আজ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্রীমান ইরাবান সামন্ত তার মহান প্রাণ আহুতি দেবেন। তার এই মহাপ্রয়ানের সাক্ষী থাকবে আপামর জনসাধারণ। সাক্ষী থাকবে এই বার্তার যে ইচ্ছে থাকলে নিজের অমূল্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েও মানুষের সেবা করা যায়। আর তার এই মহান ব্রতে তাকে সাহায্য করতে পেরে আমরাও আজ ধন্য। তাই দর্শক বন্ধুরা কোথাও যাবেন না। ফিরে আসছি একটা ব্রেকের পর।
[আলো জ্বলে ওঠে। স্টেজের বাঁদিকে একটু উঁচুতে হাতে একটা সায়ানাইডের শিশি নিয়ে ইরাবান দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা স্ক্রীন। স্টেজের ডানদিকে বসে আছে মি. বোস এবং আরও একজন অফিশিয়াল। দুটি জায়গার আলো দু’রকমের, এইটা বোঝানোর জন্যে যে জায়গা দুটির মধ্যে একটা দুরত্বের ব্যাবধান আছে]
অঃ আপনি স্টুডিওতে গেলেন না কেন স্যার?
বোঃ আমার আবার কাছ থেকে এইসব দেখলে গা গোলায়। বমি বমি ভাব আসে। মনে হয় যেন অসুস্থ হয়ে যাবো।
অঃ ওর সামনে ওটা কী স্যার?
বোঃ একটা স্ক্রীন। ওখানে নানান চ্যানেল বা লোকজনেরা ওকে প্রশ্ন করতে পারবে। ওদের কথা শোনা যাবে না, কিন্তু লেখা ফুটে উঠবে আর সামন্ত উত্তর দেবে।
অঃ কিন্তু ওদিকে বাকীসব ঠিক আছে তো স্যার?
বোঃ হ্যাঁ হ্যাঁ ... । ওই দেখো কী বলছে
ইঃ বন্ধুগণ, আজ আপনাদের সামনে নিজেকে এমনভাবে তুলে ধরবার জন্য অত্যন্ত গর্ব অনুভব করছি। নিজের মধ্যে সেইসব শহীদ, সেসব মহাপ্রাণদের অনুভব করছি যারা দেশ ও দশের জন্যে নিজেদের প্রাণ আহুতি দিয়েছেন। আজ আমার খুব বাবা মায়ের কথা আর একজনের কথা মনে পড়ছে। বাবা মা আমাকে পৃথিবীর আলো দেখালেও, সেইই আমাকে দেখিয়েছে এই আলোর রাস্তা, এই মহাজীবনের পথ। তাঁকে আমার অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা জানাই ...। কবি তুষার রায়ের একটা কবিতা আজ বলতে বড় ইচ্ছা করছে... ‘বিদায় বন্ধুগণ, গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে এই শিখার রুমাল নাড়া নিভে গেলে, ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কিনা। / এখন আমার কোনও কষ্ট নেই, / কেন না আমি জেনে গিয়েছি দেহ মানে কিছু অনিবার্য পরম্পরা / দেহ কখনও প্রদীপ সলতে ঠাকুর-ঘর / তবু তোমরা তা বিশ্বাস করো নি। / বারবার বুক চিরে দেখিয়েছি প্রেম / বারবার পেশি অ্যানাটমি শিরাতন্তু দেখাতে মশায়, / আমি গেঞ্জি খোলার মতো খুলেছি চামড়া / নিজেরই শরীর থেকে টেনে। তারপর হার মেনে, বিদায় বন্ধুগণ, / গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে এই শিখার রুমাল নাড়ছি/ নিভে গেলে, ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কিনা? [ ফোন আসে]
অঃ দেখুন স্যার, কে যেন ফোন করেছে...
বোঃ এই রে!! ওর নতুন নাম্বারটা পেলো কী করে?
ইঃ হ্যালো ...
নেপথ্যেঃ আমার নাম স্যার সোমনাথ। আমি গত তিনদিন ধরে মায়ের জন্য হন্যে হয়ে রক্ত খুঁজছি। প্লিজ যদি আপনি আমার নম্বর নিয়ে সবাইকে বলে দেন ...।
ইঃ নিশ্চয়ই। আপনার নম্বরটা বলুন। ..., শেষে থ্রী এইট? ওকে। শুনুন ভাইসব, সোমনাথবাবুর মায়ের চার বোতল রক্ত লাগবে। এই নম্বরে যোগাযোগ করুণ। রক্তদাতারাও যোগাযোগ করতে পারেন। [কেটে দেয়। আবার ফোন আসে] হ্যালো
নেপথ্যেঃ আমার নাম গোপাল। এবারের বন্যায় ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসে গেছি। কেউ যদি আমাকে সাহায্য করেন ...
ইঃ নিশ্চয়ই। বন্ধুগণ, গোপালবাবু অকাল বন্যায় তার ভিটেমাটি হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁকে প্লিজ কেউ সাহায্য করুণ। [কেটে দেয়। আবার ফোন আসে] হ্যালো ...
[ইরাবানের দিকে আলো নিভে যায়। মি বোসের দিকের আলো জোরালো হয়]
অঃ কী হচ্ছে এইসব?
বোঃ তাই তো দেখছি। ওখানে একটা জ্যামার লাগালে ভালো হত দেখছি। দাঁড়াও, ফোন করছি ... [ফোন করে] হ্যালো হ্যালো
নেপথ্যেঃ ইয়েস স্যার...
বোঃ বলি ওখানে হচ্ছেটা কী?
নেপথ্যেঃ স্যার উনি ক্যামেরাটাকে ভিতরে রেখে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর আমরাও স্যার মানে মৃত্যু তিত্যু এইভাবে চোখের সামনে দেখে অভ্যস্ত নই তো...
বোঃ রাবিশ। তোমাদের টাকা কাটা যাবে বলে দিলাম। যাও। গিয়ে দরজা খুলতে বলো ...
নেপথ্যেঃ ওকে স্যার যাচ্ছি।
[ইরাবানের দিকে আলো জ্বলে ওঠে। মি বোসের দিকের আলো কম হয়]
ইঃ হ্যালো ...
নেপথ্যেঃ আমাদের এখানে খুব জলকষ্ট চলছে। যদি একটু বলে দেন।
নেপথ্যেঃ আমাদের এখানে কারখানার ময়লায় নদীর জল দুষিত হয়ে যাচ্ছে, যদি একটু বলে দেন।
নেপথ্যেঃ আমরা আজ দশ বছর ধরে বিচার পাচ্ছি না...
নেপথ্যেঃ আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে ...
নেপথ্যেঃ আমাদের চাকরি নেই। চাকরির নিরাপত্তা নেই ...
নেপথ্যেঃ আমাদের কারখানা অনেক দিন ধরে বন্ধ। আমাদের কাজ চাই ...
নেপথ্যেঃ আমরা আরও সবুজ চাই। আরও অক্সিজেন চাই ...
ইঃ হ্যালো... হ্যালো
নেপথ্যেঃ আমি অরুন্ধতী বলছি ...
ইঃ ফোন করলেন তাহলে?
নেপথ্যেঃ [দরজায় ধাক্কানোর আওয়াজ শোনা যায়] দরজা খুলুন সামন্তবাবু, দরজা খুলুন।
নেপথ্যেঃ হ্যাঁ। মনে আছে একদিন বলেছিলে যে অনেক মানুষের জন্য, তাদের বেঁচে থাকবার সুযোগ করে দিয়ে মরে যাওয়ার কী যে সুখ সেটা কিন্তু আপনি বুঝতে পারবেন না। মনে আছে?
ইঃ হ্যাঁ, মনে আছে। আর তুমি বলেছিলে যে একদিন এর উত্তর দেবে ...
নেপথ্যেঃ হ্যাঁ। আজ আমি বলছি যে তোমার এই ভাবনায় গলদ আছে। ফ্যালাসি আছে ...
[ইরাবানের দিকে আলো নিভে যায়। মি বোসের দিকের আলো জোরালো হয়]
বোঃ এহ, একেবারে নদের নিমাই এলেন গো ...। যেন দেশের প্রধান মন্ত্রী। সারা দেশের ঠেকা নিয়ে বসে আছেন। কী হল একবার ফোন করে দেখো তো ...
অঃ দেখছি স্যার। [সে ফোন করে]
[ইরাবানের দিকে আলো জ্বলে ওঠে। মি বোসের দিকের আলো কম হয়]
ইঃ কীসের ফ্যালাসি।
নেপথ্যেঃ অনেক মানুষের জন্য মরে যাওয়ার থেকেও একজন মানুষের জন্য, তার ভালোর জন্য বেঁচে থাকাতে আরও অনেক সুখ, আরও অনেক আনন্দ আছে, কারণ সেটা নিজের চোখে দেখা ও উপলব্ধি করা যায়। মরে গেলে আর কিছুই তো দেখা বা জানা যাবে না।
ইঃ কিন্তু আমি তো ওই চল্লিশটা বাচ্চার চোখে সেই আলো দেখেছি।
নেপথ্যেঃ কিন্তু সেটা তো সাময়িক। অন্যের ওপর ওদের দায়িত্ব দেওয়ার থেকে নিজের ওপর দায়িত্ব নেওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো না?
ইঃ কিন্তু তোমায় তো সব দায়িত্ব আমি দিয়ে এসেছি ...
নেপথ্যেঃ কিন্তু, কিন্তু আমি যে অন্য একজনের দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছি ... [কান্না]
ইঃ কে সে অরুন্ধতি? কে? আরে কাঁদছ কেন?
নেপথ্যেঃ [কান্না]
ইঃ তার নাম কী অরুন্ধতি? আমাকে বল ... তার নাম কি?
নেপথ্যেঃ ইরাবান; ইরাবান সামন্ত। ......, আমি তোমায় ভালবাসি বিলু। ভালবাসি [আরও কেঁদে ফেলে] তুমি প্লিজ ফিরে এসো।
ইঃ সেকী!! এ তো আগে বলতে পারতে। ওকে। আত্মহত্যা ক্যান্সেল ।
[ইরাবানের দিকে আলো নিভে যায়। মি বোসের দিকের আলো জোরালো হয়]
বোঃ কী হল?
অঃ স্যার খুব খারাপ খবর। কারা যেন স্টুডিওতে ঢুকে সব ক্রুদের মারধোর করে সামন্তবাবুকে ছিনতাই করে নিয়ে গেছে।
বোঃ অ্যাঁ!!! বলো কী!! একেবারে সাড়ে সর্বনাশ হয়ে গেলো ... চলো তো একবার দেখি [ওরা বেরিয়ে যায়]
[আলো নিভে গেল। কিছুক্ষণ পোড় আলো জ্বলে ওঠে। একটা ঘর। সেই ঘরে রুবেন, ইপ্সিতা, অরুন্ধতি, আরও বেশ ক’জন। ইরাবান প্রবেশ করে]
রুঃ ইরাবান তুমি যুগ যুগ জিও ...
সবাইঃ যুগ যুগ জিও ... যুগ যুগ জিও ...
রুঃ তুই আমাদের হিরো বুঝলি ...
ইঃ না রে। হিরো বল বা হিরোইন বা সেই মহাপ্রাণ, যাই বল সে হল অরুন্ধতি। ও আমাকে বোঝাতে পেরেছে যে জীবন থাকলে, বেঁচে থাকলে আরও অনেকের জন্য আমি কাজ করতে পারবো। আরও অনেক মানুষের জন্য নিজের সময় উৎসর্গ করতে পারবো আর তাদের সাফল্য, তাদের সেই মায়াভরা হাসি হাসি মুখ দেখতে পারবো নিজের চোখে। আর সেটাই হল স্বর্গসুখ রে, স্বর্গ সুখ ...
ইপ্সিঃ ফাটাফাটি ...
বৃঃ তাহলে সামন্তবাবু ... [চোখ মোছে]
ইঃ পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে এ পথ চেনা ...
বৃঃ হবে জানা হবে চেনা ...
সবাইঃ হবে চেনা ... হবে চেনা ...। পথে এবার নামো সাথী; নামো।
[কলকাতার বা প্রবাস অথবা বিদেশের কোনও প্রফেশনাল থিয়েটার গ্রুপ নাটকটি মঞ্চস্থ করতে চাইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন]
[পর্দা পড়বে]
নাটকঃ ফিরে আসা
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।