

এবারের দুর্গাপুজো অন্যরকম পুজো। এবারের দুর্গাপুজোয় প্রথম মিছিলে হাঁটতে হয়েছে অনেককেই। তাও আবার বইয়ের স্টলের জন্য। গত ৩০ বছরে মনে পড়ে না, কোনও একটা দুর্গাপুজোতেও এইরকম কোনও মিছিলে হেঁটেছি তার উদাহরণ মনে পড়ে না। এতদিনে অনেকেই হয়ত জেনে গিয়েছেন, কী বিষয়ে লিখছি। ছাত্রাবস্থা থেকে শুরু করে এই ২০২৬ সাল অবধি প্রতিবার পুজোর সময়ে আমাদের মধ্যে বহু মানুষ পুজোর সময়ে বইয়ের স্টলে বসেছি। প্রথমদিকে প্রকাশকের ঘর থেকে বই আনা থেকে শুরু করে, তার হিসেব রাখা, স্টলের পুলিশী অনুমতি নেওয়া এবং নিয়ম করে তা দু’বেলা খোলা সব করেছি। পুজোর পরে হিসেব করে বই ফেরত দিয়ে তবে দায়িত্ব থেকে মুক্তি। পরে অন্য কম বয়সী ছাত্রছাত্রীরা সেই দায়িত্ব নিয়েছে, এই ভাবেই পুজোর সময়ে বইয়ের স্টল চলেছে।
কিন্তু ২০২৬ সালে সমস্ত কিছু কেমন যেন বদলে গেল। যে বইয়ের স্টল মানুষের মনে পুজোয় খুব বেশী জায়গা পেত না, বিভিন্ন পুজোর অঞ্চলে কিছু মানুষ বসতেন বই নিয়ে সেইগুলোই এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এল। যে কোনও প্রচার তা সে যতই ঋণাত্মক হোক না কেন, তা আসলে প্রচারই দেয়। এবারের পুজোয় বামেদের বুক স্টল সেই প্রচারটাই পেল। শুরুটা হয়েছিল, বিধানসভায় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে পাশে বসিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্যে দিয়ে। বলা হয়েছিল, এবারের পুজোয় বামেদের বইয়ের স্টল করতে দেওয়া হবে না। কারণ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, বামেরা যেহেতু ঘোষিতভাবে নাস্তিক, তাঁদের সঙ্গে ধর্মের কোনও সংস্পর্শ নেই, তাই তাঁরা যদি তাঁদের বইয়ের স্টলে, ‘শুভ দুর্গাপুজো’ না লেখেন এবং পরিবর্তে ‘শারদীয়ার শুভেচ্ছা’ এইরকম শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁদের বইয়ের স্টলের অনুমতি দেওয়া হবে না।
সদ্য সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপির বেশ কিছু নীচু স্তরের নেতাকর্মীরাও মুখ্যমন্ত্রীর এই হুঙ্কারকে সমর্থন করে আরো একধাপ এগিয়ে ঘোষণা করে ছিলেন, যে তাঁরা এবার ‘বামবধ’ করবে। কোনোভাবেই তাঁদের পুজোর আশেপাশে বামেদের বইয়ের স্টল দিতে দেওয়া হবে না। অনেকেই ভেবেছিলেন বিষয়টা শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকবে, কিন্তু দেখা গেল, শুধু বিজেপির নেতা কর্মীরা নন, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী বুলডোজার নিয়ে, কর্পোরেশনের ময়লা ফেলার গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালাতে উদ্যত হয়েছেন। নানান জায়গায় আক্রমণ করা হল বাম কর্মী ও নেতাদের। কোথাও কোথাও স্টল ভাঙচুর করা হল, বই ছুঁড়ে ফেলা হল রাস্তায়, এমনকি পোড়ানোও হল।
তবে এই সমস্ত আক্রমণ কিন্তু একেবারেই বিনা বাধায় হয়নি, উল্টে নানান জায়গায় ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের ভয়ঙ্কর প্রতিরোধের মুখে পড়েছে সরকারের পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। ভগৎ সিংয়ের বই হাতে বুলডোজারকে ফিরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য সারা পৃথিবী দেখেছে এবং চরম নিন্দিত হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর পুলিশ বাহিনী। ঘটনাচক্রে যখন এই বুলডোজার নিয়ে কলকাতা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী যাদবপুরে বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙতে এগোচ্ছে, ঠিক তার কিছুক্ষণ আগে চোরবাগানে ঘটে গেছে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় এবং দুর্ঘটনা। পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন বেশ কিছু মানুষ। বিভিন্ন খবরের চ্যানেল থেকে শুরু করে নানান মহল থেকে খবর আসছে, ঐ ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ নেই, উদ্ধার করার জন্য অ্যাম্বুলেন্স অপ্রতুল, ঠিক সেই সময়েই যাদবপুরে রাস্তা বন্ধ করে, আশেপাশের দোকানের আলো নিভিয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এবং কলকাতা পুলিশের অতিসক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ। সেখানেও বিষয়টা থামেনি, প্রাথমিকভাবে পিছু হটলেও সেইদিন অর্থাৎ সপ্তমীর রাতে আবার কেন্দ্রীয় বাহিনী হাজির হয় যাদবপুরে বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙতে। সিপিআইএম এবং আইসা’র স্টলের মানুষ যৌথভাবে রুখে দাঁড়ায় ফলে তাঁদের স্টলগুলো রক্ষা করা গেলেও, আশেপাশের এপিডিআর এবং এসইউসিআইয়ের স্টলগুলো তাঁরা ভেঙে দিয়ে যায়। যদিও পরেরদিন সকাল থেকে সমস্ত দল এবং মানুষ যৌথভাবে রাস্তায় নেমে আবারও ঐ স্টলগুলো দাঁড় করান।

এই সমস্ত কিছু ঘটে যাওয়ার পরে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশুগুপ্ত, বিজেপির রাজ্য সভাপতি এবং আরএসএসের পক্ষে জিষ্ণু বসু এই ঘটনাগুলোর নিন্দে করেন। নানান মহল থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যর্থতা এবং গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্র নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। মাননীয় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত মহাশয়ের মাথা নাকি নত হয়ে গেছে। মাথা নত হলে কি শিরদাঁড়াও নত হয়ে যায়? মাননীয় অর্থমন্ত্রী কি জানেন না যে কারা এই কাজগুলো করেছে? যদি জানেন তাহলে পুলিশ প্রশাসনকে বলে কেন দুষ্কৃতিকারীদের উপর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? শমীক ভট্টাচার্য তো ফাটা রেকর্ডের মতো একই কথা বলে চলেছেন। তার দল বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙ্গার সমর্থন করে না। তাহলে শমীকবাবু তো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে কিংবা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশ মন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে পারেন যে যারা এটা করাচ্ছে তাদেরকে ইমিডিয়েটলি গ্রেফতার করতে হবে? কিন্তু সেটা কি করা হয়েছে?
ঢাকুরিয়াতে সি পি আই এম এল এর স্টল যারা ভেঙেছে তাদের নামে তো এফআইআর অব্দি করা আছে লেক থানাতে। শমীক বাবু কিংবা স্বপন বাবু কি লেক থানার ওই এফ আই আর নিয়ে একটু মুভ করবেন? বাবুন চ্যাটার্জিকে যারা মারল কিংবা ৮৯ বছরের অমলেন্দু চৌধুরীর গায়ে যারা হাত তুলল তাদের নামে এফ আই আর হল কিন্তু কোন কাজ হলো না তাহলে মাথা নত না করে মাথা উঁচু করে ওই লেক থানার যে অফিসাররা পরদিন সকালে ঢাকুরিয়া তে স্টল খুলতে দিলেন না তাদেরকে ডেকে প্রশ্ন করুন কেন খুলতে দিলেন না? তবে তো বোঝা যাবে স্বপনবাবুর শিরদাঁড়ার উপরের শিরটি নত না উন্নত?
নতুন নতুন ভিডিও এসেছে। সুভাষ বসুর প্রতিষ্ঠিত ফরওয়ার্ড ব্লকের বইয়ের স্টল ভেঙেছে কারা তাদের তো মুখ তো দেখা যাচ্ছিল। তবে শমীক বাবু কিংবা স্বপন বাবু তো এদেরকে গ্রেফতারের কথা বলতে পারেন? সেই সব না করে এসব কথাবার্তা কিন্তু আর মানুষ সহ্য করছে না। মানুষজন বলছেন, কী প্রয়োজন ছিল পুজোর সময়ে ঐ বইয়ের স্টল আক্রমণের? অনেকে বলছেন, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে এই কাজ করানো মানুষ কিন্তু সবটাই দেখছে সবটাই বুঝছে। যারা শরৎচন্দ্রকে অপমান করে যারা সুভাষকে অপমান করে তারাই যে বিজেপি তারাই যে আরএসএস সেটা কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে। শমীক বাবু যতই দুদিনের বিজেপি আর দুর্দিনের বিজেপির তফাৎ করার চেষ্টা করুন না কেন, মানুষ কিন্তু ফারাক করছে না।
স্বপন দাশগুপ্ত কিংবা শমীকবাবু যাই বলুন না কেন মুখ্যমন্ত্রী আছেন নিজের মেজাজেই। এত কিছুর পরেও তাঁকে এক জায়গায় দেখা গেল বলতে, বামপন্থীদের বই বিক্রি করার দরকার কি পুজোর সময়ে? ওরা তো ধর্ম মানেনা তাহলে ধর্মকে উপলক্ষ করে ওরা কেন বই বিক্রি করবে? তিনি আরো যুক্ত করলেন বামপন্থীদের উচিত নিজেদের পার্টি অফিস গুলোতে বইয়ের লাইব্রেরী বানানো, যদি কারো প্রয়োজন হয় ওই মার্কসীয় তত্ত্ব জানার তাহলে তিনি ঐ লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়ে নেবেন। সঙ্গে অবশ্যই আরো যুক্ত করেন এগুলো তো বিদেশী তত্ত্ব সুতরাং না জানলেও চলবে। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটা ধন্যবাদ দিতে হয়। তিনি না থাকলে, অনেকেই হয়তো এবার বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল গুলো হয়েছে সেগুলোর দিকে ঘুরেও তাকাতেন না, এবার আসছেন এবং বই কিনছেন। যেমন এসেছিলেন টালিগঞ্জ থেকে দুই বোন সুস্মিতা আর সোমা, হিন্দু বাঙালি গৃহবধু। মুখ্যমন্ত্রীর জ্ঞাতার্থে জানানো দরকার এই দু'জন মহিলা মতো অত বেদ, উপনিষদ পড়েননি, কিন্তু তাঁরা বাড়িতে পুজো করেন। তাঁরা হিন্দু মধ্যবিত্ত মহিলা, তাঁরা একসময়ে তৃণমূলের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু এখন মুখ্যমন্ত্রীর আচরণে বীতশ্রদ্ধ।

যে বামপন্ন্থীদের মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিহ্ন করতে চাইছেন, সেই বামপন্থীরা কিন্তু এবার পুরো পুজোটা জুড়ে মানুষের আলোচনার মধ্যে থাকলেন। অবশ্য তিনিও ছিলেন মানুষের আলোচনার মধ্যে সেটা তাঁর পুজো পরিচালনা করার ব্যর্থতার জন্য। রাস্তাঘাটে কান পাতলে শুনতে পারবেন যে চোরবাগানে মানুষ মারা যাবার জন্য তাঁকেই কিন্তু দায়ী করছে মানুষজন। তিনি ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন বলে, যতই ভাষ্য চেঞ্জ করার চেষ্টা করুন না কেন, লোকজন কিন্তু তাঁকেই অপয়া বলছে। লোকজন কিন্তু বলছেন মুখ্যমন্ত্রীর প্রায়োরিটির সমস্যা আছে। শুধু সুস্মিতা আর সোমারা নয়, বহু মানুষই মনে করছেন বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে বেশি সনাতনী বেশি চিরায়ত বেশি হিন্দুত্বে পরিণত করতে গিয়ে উৎসবের আমেজটাকেই তিনি নষ্ট করে দিয়েছেন। বামপন্থীদের বইয়ের স্টলকে কখনো নিজের দলের ক্যাডার কিংবা কখনো পুলিশ পাঠিয়ে ভাঙতে গিয়ে তিনি অজান্তেই বামপন্থীদের হয়ে কাজ করে ফেলেছেন। তাঁদেরকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন।

যে কাজটা অনেকেই করতে পারছিলেন না যে সমস্ত বামপন্থী দলকে ঐক্যবদ্ধ আহ্বান দিলেও হচ্ছিল না, তা তাঁর একটি হুমকি কিন্তু সেটা করে দিল। তিনি চালিয়ে যান। এইভাবে চালিয়ে গেলেই বামপন্থীদের শেষ বিচারে সুবিধাই হবে। একটা সময়ে পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরী ছিল, বামপন্থীরা যদি সত্যিই মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব মেনে নিয়ে নিজেদের পার্টি অফিসগুলোকে পড়ার জায়গা, আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত করতে পারেন এবং সেখান থেকে মানুষের সঙ্গে সংযোগের কাজ শুরু করেন, তাহলে আখেরে কিন্তু লাভই হবে। শুধু একজন বয়স্ক বামপন্থীর ভিডিও বা শুধুমাত্র কোথায় কোন স্টলে কত টাকার বিক্রি হল, সেটার পরিবর্তে এই কাজটা কিন্তু কঠিন। বামপন্থীরা কিন্তু এই কাজটা শুরু করতেই পারেন। এই লেখা যখন শেষ করছি, তখন আরো একটা খবর পাওয়া গেল, খোদ কলকাতার বুকে বামপন্থীদের পরিচালিত একটি রক্তদান শিবির বন্ধ করে দিয়েছে কলকাতা পুলিশ। শোনা গেছে বেনিয়াটোলা থানার ওসি বলেছেন, রক্তের প্রয়োজন হলে যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বোঝাই যাচ্ছে, যে কাজটা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময়ে করতেন, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সেখান থেকেই শুরু করেছেন। পুলিশ-প্রশাসনকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং তাঁদের সাহায্যেই কিছু আঞ্চলিক নেতা তৈরি করা এবং বিরোধীদের সংগঠিত না হতে দেওয়া। তবে এই সময়টা উল্টোদিকে বামপন্থীদের জন্যেও কিন্তু সুযোগ তৈরী করতে পারে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের দরজা যদি, বই, সিনেমা, নাটক করার জায়গা এবং অন্যান্য সামাজিক কাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যায়, তবে সেই দরজা দিয়ে কিন্তু নতুন বাতাসও ঢুকতে পারে, তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু বামপন্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছেন এখন বামেরা তা নিতে পারেন কি না সেটাই দেখার। শুধু বামপন্থীদের জন্যেই নয়, সমস্ত বিরোধীদলকে একজায়গায় এসে বিরোধিতার নতুন পরিসর কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নিজেই খুলে দিচ্ছেন।
হীরেন সিংহরায় | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:২৮743438
তরমুজ | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৫৪743462