*
নিয়ত ঘোমটা ফেলে হাঁই তোলে আলোর কলোনী,
সাতরঙা উর্বর মাস্তুলে, পালে, হাঁটু-পা ধ্বস্ত
পৃথিবীটা বইতে বইতে, খেঁকশিয়ালের মতো
চাতুরী সারাৎসার; অভিলাষ, চাঁদ, ফুল, মোতি,
রাঙা দেবতার হাত, মুছে যায়; কিন্তু ঘুরে গেলে
অন্যে, ঠেকে ঢেউয়ের দেওয়ালে পিঠ, শেষ খড়কুটো
উগরে দেয় ঢেউ, ধাত্রী কলোনী, আলো,
মনচেরা মস্তি, ঢাক, অনিমেষ রেবেতিকো,
তাকে কখনো শান্ত লাগে, ঢেউচুপ পাণ্ডুর সাগর, কখনো
পেটের ফসলে গর্বিনী, ভুলে যায় ধ্বস্ত নাবিকের অভিমান, প্রার্থনা,
নকল চাঁদের ফাঁদে অস্তিত্বের ছিদ্র পয়সা বাজি ফেলে
ঘোমটাপরা কলোনীতে নামো, সে হঠাৎ যদি সাত সাগরের ক্ষীর
রাঁধে, পাতে তুলে নিতে হবে তার অন্তঃসার, পয়সার মাধুরী!
*
উপর থেকে দেখো, আলোর ধুম,
সন্ন্যাসী ফুল গিলছে আলো ধ্বস্ত মাটির বোঁটায়,
হলুদ, নতুন, চতুর ঢেউয়ে লক্ষ মানুষ
বোবা হাতে, ক্লান্ত হাতে তুলছে ফুল ছাইমাখানো
অস্তিত্বের, উপর থেকে দেখো, বহুর বাহু
জড়িয়ে আছে বিশাল গলা ল্যাম্পপোস্টের, সজির বাজার
দুলছে হাওয়ায়, মরা আমলা, ভুয়ো আমলা
চলছে কড়ির ঝুম-পাতালে, উপর থেকে, উপর থেকে,
দেখো, কেমন আলোর পিঁপড়ে ছুটছে পাগল তারার মতো
কালো গুহায়, একদিন তো ধ্বংস হবে, মৃত্যুপুরী
হবে মাটি, মাটির ছেলে, যোগ্য ছেলে শহর ঘুরে
কবরে শোয়, তা হোক, এখন বিবিধ ডাকাত,
লম্পট আর ব্যংকাররাও ফুল তুলে যাক, যেমন করেই
ফুল তোলো, তা ফুলই থাকে, উপর থেকে
দেখো ফুলের বাগান, প্রাণের বাগান, আলোর গুহা, রঙের পিপে,
দোলনা থেকে কবর অব্দি শিশুই থাকা মলিন শহর,
সন্ন্যাসী ফুল, ধুলোর কড়ি, নীল তেতলা’র উপর থেকে দেখো!
*
শহর, হৃদয়ে যার আমার জলসাঘর,
যার স্বপ্নে আমিই নায়ক, ধূর্ত খুনী,
যে ঘর, দরজা, মোক্ষ; আমি যার সিঁড়িঃ
একদিন সবকিছু কিনে নেবো, সবকিছু!
সূর্য, অমৃত, মধু, পরনারী, তস্কর!
ভুল জালে ঢুকে পড়া মাকড়সা! মানি!
একদিন গিলে খাবো সব সোনারঙা মাছি,
জলসাঘর আর রামধনু আর সিঁড়ি আর চিলেকোঠা!
*
আমার মাতাল ঘাতক, দাপুটে আয়না,
আমার শহর, তুমি মিশে রইলে নুনের মতো
এই উথাল-পাতাল হৃদয়ে, এখন কেউ
আমাকে পাবে না প্রাতঃরাশে, ভিড়ে, হল্লায়,
উৎসবে, আর হাওয়াই মিঠাইয়ে! মাতাল শহর,
আমাকে যে কেউ চামচে তুলে চাখুক, চাটুক,
আর খুঁজে পাক সেই নুন, যা নাকি তুমিই;
আমার মাতাল পাতা, ও পাতা, আমি
তোমার অভাবে শুঁয়োপোকা হতে হতেই ক্লান্ত!
*
যদিও হৃদয় মধুমান, যদিও পৃথিবী
ক্রমাগত শূন্য হয়ে আসে, একে একে
সব নারী স্বপ্ন হয়, স্বপ্নতম; যদিও বিষাদে,
বিচ্ছেদে ভরে সত্তা- তোমার সামনে
তবু কোলাহলই শক্তি, মোক্ষম মাধুরী!
জীবনের মতো জন্মমান, হে শহর, দিকে দিকে
তোমার মুখর বিস্তার, কী অবলীলায়
বিশাল মাছের মতো সাঁতরাও সত্তার এপারে ওপারে!
*
ঝোড়ো বিদ্যুতের হাওয়া! তুমি, আমি,
প্রজাপতি, কস্তরী, একে অন্যের মধু,
সব ঝড় মাটির দলার মতো আমাদের বুকে
ঠেসে টুকরো টুকরো হয়, ছেঁড়া বিদ্যুতের হাওয়া
কতদিন জীর্ণ করবে, চূর্ণ করবে আমাদের?
আমরা জেগেছি একে অন্যের মাস্তুলে, তোমার পিপাসা
আমার সত্তায় তোলে মাদল! আমার স্থান
তোমার স্বচ্ছল বুকে, যে বুক মুখর, আর
অমৃত শহরের মতো জেল্লাভরা!
*
পৃথিবী, যে ব্যাথা আমাদের সেতু,
যে শোক উর্বর, যে বাঁধা সুন্দর,
পৃথিবী, আমরা সবকিছু গিলে খাবো!
যে শহর ছড়ায় নাড়িতে সূর্যালোক,
বিরাট শূন্যের মতো রোদে শুয়ে
চুষে নেয় ফুল, প্রজাপতি, অক্ষর-
পৃথিবী, আমরা ফুল হবো, ঝরে যাবো,
সেই নতুন শাখায়, নতুন মাটিতে
মরে যাবো, মিশে যাবো, তবু থেমে রইবো না!
*
আয়না ভেঙে গেলো, শহর নিভে গেলো,
নিথর জাগরণ জানালো মাদকতা,
হৃদয় মাথা গুঁজে বৃথাই ডামাডোলে
কখনো ঠাঁই খোঁজে, কখনো শূন্যতা!
সাথেই রয়ে গেছো, তুমিই দূরে কাছে
মদির হাওয়া হও, জাগাও প্ররোচনা!
আয়না ভেঙে যাক, শহর নিভে যাক,
তোমাকে চুমো দেবো, দেবোই, থামবো না!
*
আমাকে আশ্বস্ত করো
রুটি, মদ, কস্তরী হতে যেনো বঞ্চিত না হই,
যেনো সবচেয়ে সুন্দর চূড়ায়, শাওয়ারে, মসলিনে
ঠাঁই হয় আমার,
আমাকে আশ্বস্ত করো
যেনো সত্তার অমল তৈজসে সৌম্য রিনিঝিনি
বাজে চিরদিন, আর শ্রান্তিহীন অমর আগুনে
ধুয়ে সাফ হয়ে যায় সকল বৈরিতা
তোমার সঙ্গে আমার, হে শহর, নর্তকী তুমি,
আমিই তোমার নৃত্য,
আমাকে আশ্বস্ত করো যেনো আসরের শেষ নাচে
একে অপরের সঙ্গী হই আমরা,
কাঠুরিয়া আর তার সত্যিকার কুঠারের মতো!
*
আমার স্মৃতির পাখায়
তোমার চপল আসা-যাওয়া, পঙ্খীরাজ, হে মিষ্টি দেবদূত,
হে শতচ্ছিন্ন রামধনু, হে শহর, হে লাজুক শিশুর রূপবতী ইন্দ্রজাল!
আমার স্মৃতির যীশু
তোমার ভয়াল থাবা বুকে পেতে চায়, রক্তাক্ত হতে চায়;
তোমার বেগুনি মেঘমালা আর বৃষ্টি আর উদ্ধত উদ্যান আজ কোথায়?
আমি স্বাস্থ্যের চেয়ে ক্রুশ, রুটির চেয়ে গরল ভালোবাসি।
তোমার নিঃসঙ্গতা, তোমার মুখ,
তোমার স্বপ্ন, তোমার বিষাক্ত স্বপ্ন দেখানোর প্রয়াস-
যখন আমি দূরে, আমার স্মৃতিকে ভরে তোলে মুহুর্মুহু;
আর খালি পেয়ালার মতো পড়ে থাকি আমি, কারণ আমার শেষ চুমুক ছিলে তুমিই!
হে লাজুক পিতা, হে নাচিকেতাগ্নি, হে বিবিধ বিবিক্ত আলো,
তোমার ঘামের গন্ধে পেয়েছি কস্তুরী, তোমার মরা ঘাসে ফুলশয্যা আমার;
আবার স্মৃতির সিঁড়ি ধরে নেমে এসেছো আমার ও তোমার মাঝখানে;
তুমি নিঃশ্বাস নিচ্ছো আর সেই নিঃশ্বাসের শিশির ঝরে পড়ছে আমার বুকে, চোখে, অন্তরে!
ভালোবাসা কী আর সাক্ষ্য দেবে? বোকা, ঠকে-যাওয়া আমি মিসকিন
ভরে উঠছি কমলালেবুর হাসিতে, হে স্মৃতি, হে দানবকন্যা, হে শহর, তোমাকে পেয়েছি
সবকিছু ও সবার কাছে হেরে যাবার পর,
সবকিছু ও সবাই মিলে আমার টুঁটি চেপে ধরবার পর,
বিদুষী জননী রজনীও ঊষার চিতায় আমাকে পুড়িয়ে চলে যাবার পর,
প্রার্থনাবাজ ভিক্ষুকের মতো সহস্র সহস্র কাল দূরে কাটানোর পর, হে রঙিন শামুক, হে ফুল!
আমার স্মৃতিকে হরণ করো, আর এই হৃদয়ভুক হৃদয়
ছাইভস্মে আছে পড়ে, একে ধারণ করো বিশ্বস্ত আলিঙ্গনে!
তোমার আরক্ত স্বপ্ন, নিঃসঙ্গ ঘণ্টাধ্বনি
আমাকে স্পঞ্জের মতো নিচ্ছে শুষে, বিস্ফোরণে কম্পমান আমি,
আমাকে স্মৃতিকে চালিয়ে নিয়ে যাও যেদিকে খুশি যখন খুশি যতো খুশি!
ততক্ষণ কান পেতে থাকি, শুয়ে থাকি
উটের বেদম রক্তস্রোতের মতো স্বপ্ন আর স্বপ্নহীনতার নির্গমনে-
তোমার অনুগ্রহের অপেক্ষায়,
ফুল, জল, লাল ইট, নব-বসন্ত আর ফুলশয্যার অপেক্ষায়, হে ফুল, হে ঘাস!
*
অন্ধের মতোই শ্বাস নিচ্ছি, শুঁকে দেখছি,
অনুভব করছি অপোগণ্ড এই শহরটাকে
রক্তে রক্তে, নিঃশ্বাসের নিঃশ্বাসে-
সে আমার গায়ে মৃদু বাতাস হোক, বা
বুকে বেঁধা ঘাতক বল্লম হোক,
অন্ধ তার আরামের মতোই ভালোবাসে তার ব্যাথাকে,
বারবার জীবন তাকে ঘিরে ফেলে,
যেনো এক কাঠবেকার মানুষ, শহরে নতুন,
আর জীবনও তো একটা শহর, একরকম উদ্ধার,
সবচেয়ে বড়ো উপরওয়ালা!
বড়ো, ভীষণ, সুন্দর শহর থেকে যে দূরে,
যে অন্ধ, যে অতৃপ্ত, যে নিজেই অতীত, নিজেই স্বপ্ন,
সে কি পারবে ইহুদি হতে? পারবে না?
তার জন্যে
জীবনই অপরাধ, জীবনই শাস্তি,
আমার জন্যেও; আমি অনুভব করছি অপ্রচুর একটা শহরকে,
অন্ধ ভিখিরি যেমন ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে তার ভাঙা লাঠিটা
পায়ের কাছেই আছে কিনা!
[রচনাকাল-২০২১]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।