

অলংকরণ: রমিত
লোকটার নাম কেউ জানতে চায়নি।
দুপুরের রোদে বাসটা ধুলো উড়িয়ে থামল। রাজপথের দু'ধারে শুকনো ঘাস মাথা নত করে দাঁড়িয়ে। রাস্তার ধারের ছোট্ট চায়ের দোকানটা যেন এই দীর্ঘ পথের একমাত্র বিরতি। টিনের চালের নিচে ফুটছে কালো কেতলি। বেঞ্চে বসে আছে একজন ট্রাকচালক, দু'জন দিনমজুর, একজন সাইকেল মেরামতির কারিগর আর কোণের দিকে এক বৃদ্ধ, যার কাজ যেন শুধু মানুষ দেখা। তিনি খুব কম কথা বলেন। কিন্তু রাজপথে ধুলো উঠলেই মুখ তুলে তাকান, যেন প্রতিটি পথিকের ভেতরে তিনি বহুদিনের হারানো কাউকে খুঁজে বেড়ান।
বাস থেকে নেমে লোকটা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিচু হয়ে মাটিতে হাত ছুঁয়ে কপালে ঠেকাল। এই অচেনা মাটিকেও যেন সে প্রণাম করল।
চায়ের দোকানদার কেতলি নামিয়ে বলল,
—নতুন?
লোকটা মাথা নাড়ল।
—কাজের খোঁজে?
কোনো উত্তর এল না। সে শুধু দূরে চলে যাওয়া বাসটার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন তার জীবনের শেষ পরিচিত জিনিসটাও ধুলোয় মিলিয়ে গেল।
তার কাঁধে একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। হাতে ছোট্ট টিনের বাক্স। জামায় শুকনো ধুলো, জুতোর ফাঁকে জমে থাকা কাদা। মনে হচ্ছিল, সে শুধু পথ পেরিয়ে আসেনি; বহু বছরের ক্লান্তি কাঁধে নিয়ে এসেছে।
বৃদ্ধ আস্তে বললেন,
—বসুন।
লোকটা বসে পড়ল। দোকানদার এক ভাঁড় চা এগিয়ে দিল। সে ভাঁড়টা হাতে নিল, কিন্তু অনেকক্ষণ চুমুক দিল না।
বৃদ্ধ বললেন,
—এই রাজপথে যারা আসে, তারা কেউ নতুন জীবন খুঁজতে আসে না। সবাই হারানো জীবনের বদলি খুঁজতে আসে।
লোকটা ধীরে ধীরে টিনের বাক্স খুলল।
ভেতরে একটি মরচে ধরা চাবি, একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি আর কাপড়ে বাঁধা এক মুঠো শুকনো মাটি।
সে বলল,
—এইটুকুই আমার গ্রাম।
বৃদ্ধ ছবিটা হাতে নিলেন। মাটির বাড়ি, উঠোনে একটা আমগাছ, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা। ছবির রং ফিকে হয়ে গেছে, কিন্তু মুখের স্নেহ এখনও টিকে আছে।
—ঘর নেই, তবু চাবি?
লোকটা মৃদু হেসে বলল,
—মা বলেছিলেন, ঘর হারিয়ে গেলেও চাবিটা ফেলে দিস না। মানুষ যদি কোনোদিন ফিরে আসতে পারে, চাবিও একদিন তার দরজা খুঁজে নেবে।
চায়ের দোকানে নীরবতা নেমে এল।
ট্রাকচালক বলল,
—আমি বিশ বছর ধরে এই রাস্তা দিয়ে মাল টানি। কত গ্রামকে শহর হতে দেখলাম। তারপর দেখলাম, শহর হওয়ার আগেই গ্রামের মানুষগুলো হারিয়ে গেল।
সাইকেল মেরামতির কারিগর হাতের রেঞ্চটা নামিয়ে বলল,
—আমার দোকানও একসময় অন্য জায়গায় ছিল। রাস্তা চওড়া হবে বলে ভেঙে দিল। এখন এইখানে বসি। আবার কোনোদিন উঠতে বলবে।
দিনমজুরদের একজন হেসে বলল,
—আমাদের ঠিকানা বদলায়, মজুরির হিসেব বদলায় না।
আরেকজন যোগ করল,
—নিজের জমিতে আজ অন্যের হয়ে কাজ করি। মাটি চিনে, কিন্তু কাগজ চেনে না।
বৃদ্ধ চুপচাপ শুনলেন। তাঁর মুখে কোনো বিস্ময় নেই। যেন এসব কথা তিনি হাজারবার শুনেছেন।
এমন সময় রাস্তার ওপারে কয়েকজন লোক বাঁশ পুঁতে জমি মাপতে শুরু করল। সাদা রঙের একটি গাড়ি এসে থামল। নীল নকশা খুলে কয়েকজন আলোচনা করছে।
দোকানদার বলল,
—শুনেছি এখানে বড় কারখানা হবে।
কেউ বলল,
—অনেক কাজ হবে।
বৃদ্ধ ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
—কাজ হবে, কিন্তু কার জমিতে?
কথাটা শুনে সবাই চুপ করে গেল। প্রশ্নটা যেন ধুলোয় ভেসে রইল।
লোকটা ভাঁড়ের শেষ চুমুক খেল।
তারপর উঠে দাঁড়াল।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল,
—কোথায় যাবেন?
সে বলল,
—যেখানে মাটি এখনও মানুষের নাম ভুলে যায়নি।
সে রাজপথ ছেড়ে শুকনো নদীর দিকে হাঁটতে লাগল।
নদীটা একসময় নিশ্চয়ই ভরা ছিল। এখন শুধু ফেটে যাওয়া কাদা, সাদা বালু আর ছড়িয়ে থাকা শামুকের খোলস। নদীও যেন উচ্ছেদ হয়েছে, শুধু জায়গাটা রয়ে গেছে।
লোকটা কাপড়ের গিঁট খুলে শুকনো মাটিটা দুই হাতের তালুতে নিল।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তার মনে পড়ল শেষ বিকেলের কথা। গ্রামের মানুষ ঘর ছাড়ছে। কেউ গরু নিয়ে যাচ্ছে, কেউ দেবতার মূর্তি, কেউ শুধু একটা হাঁড়ি। তার মা উঠোন থেকে একমুঠো মাটি তুলে কাপড়ে বেঁধে দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন,
—যেখানেই থাকিস, এই মাটি সঙ্গে রাখিস। মানুষ দেশ হারায়, কিন্তু স্মৃতি হারালে আর কিছুই থাকে না।
সেই কথাই আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সে।
সে ধীরে ধীরে মাটিটা অচেনা নদীর তীরে ছড়িয়ে দিল।
বাতাস উঠল।
দুই মাটির গন্ধ এক হয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, দূরে ধানের শিষ দুলছে। কানে ভেসে এল সন্ধ্যার শঙ্খ, গরুর ঘণ্টা, মায়ের ডাক। মনে হলো, নদীতে আবার জল নেমেছে।
পরের মুহূর্তেই সব মিলিয়ে গেল।
শুধু ধুলো উড়ছে।
বৃদ্ধ দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলেন। তাঁর নিজেরও একসময় নদীর ধারের বাড়ি ছিল। বহু বছর আগে নদী ভেঙে নিয়েছিল। তারপর থেকে তিনি এই রাজপথের ধারে বসে মানুষ দেখেন। তিনি জানেন, উচ্ছেদ শুধু ঘর ভাঙে না, মানুষের ভাষা, উৎসব, গন্ধ, এমনকি স্বপ্নও বদলে দেয়।
দূরে আবার একটি বাস এসে থামল।
নতুন কয়েকজন মানুষ নামল। কারও হাতে বস্তা, কারও কোলে শিশু, কারও চোখে অনিশ্চয়তা। তাদের মুখেও সেই একই ক্লান্তি, যা একটু আগে এই লোকটার মুখে ছিল।
চায়ের দোকানদার আবার কেতলিতে জল চাপাল।
জীবন আবার আগের মতো চলতে লাগল।
বৃদ্ধ খুব আস্তে বললেন,
—রাজাদের গল্প সবাই লেখে। পৃথিবী টিকে থাকে তাদের ওপর, যারা বারবার ঘর হারিয়েও আবার পথে নামে। তাদের নাম ইতিহাসে থাকে না, কিন্তু প্রতিটি রাজপথের ধুলোয় তাদের পদচিহ্ন মিশে থাকে।
লোকটা একবার ফিরে তাকাল।
বৃদ্ধের সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো।
কোনো কথা হলো না।
তবু দু'জনেই বুঝল, তারা একই ভাষার মানুষ—যে ভাষায় ঘর মানে শুধু চারটে দেয়াল নয়, মানুষের স্মৃতি; আর মাটি মানে শুধু জমি নয়, প্রজন্মের জীবন।
রাজপথে আবার ধুলো উঠল।
লোকটার পায়ের ছাপ ধুলো ঢেকে দিল।
তবু কিছু পথ কখনও মুছে যায় না। সেগুলো মানুষের পায়ে নয়, মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। যতদিন পৃথিবীতে মানুষ ঘর হারাবে, ততদিন তারা নতুন পথ ধরবে; আর প্রতিটি নতুন পথের নিচে লুকিয়ে থাকবে কোনো পুরোনো গ্রামের ধুলো, কোনো মায়ের হাতে বাঁধা একমুঠো মাটি, আর ফিরে যাওয়ার অসম্ভব অথচ অবিনাশী স্বপ্ন।