এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ৩৪৪ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ
    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা অসম-এর একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার। "মারিয়াম অস্টিন অথবা হীরা বরুয়া" নামক অসমীয়া ছোট গল্প সংকলনের জন্য তিনি ২০১৪ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। গত শতকের অসমের ইতিহাস ভিত্তিক তার "বাবুই বাসার সোনার সূচ" উপন্যাসটি মূল অসমীয়া থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনসুকিয়া প্রবাসী সুশান্ত কর। এর আগে তার অনূদিত অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতার উপন্যাস 'ফেলানি' সাহিত্য আকাদেমির অনুবাদ পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিল।

    অলংকরণ: রমিত



    অন্য এক দীপাবলি


    কাল শিকারের দিন। সূর্যাস্ত দেখে অ্যালার্ম ঘড়িটা মিলিয়ে রাখা আছে। গণনা করে কালবেলা, বারবেলা এবং যোগিনী দিক নির্ণয় করে মাহেন্দ্রক্ষণ ঠিক করে রাখা আছে। জিনিসপত্র যা নিতে হবে, সেসবও গোছানো হয়ে গেছে। বন্দুক-বারুদও সব ঠিকঠাক। আজ মৌজাদার বনমালী চৌধুরি নারীর ছোঁয়া লাগা বিছানাতে শোবেন না, নারী শরীরও স্পর্শ করবেন না; খাবেন নিরামিষ খাদ্য।

    মৌজাদার এরকম শিকারে অভ্যস্ত; বহুবার গেছেন তিনি। কিন্তু আজকের এই যাত্রা নিয়ে তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে আছেন। এই শিকারযাত্রার সঙ্গী স্বয়ং কমিশনার সাহেব এডুইন ব্লেকস্মিথ। কালকেই কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে এসে কমিশনার সাহেব বড়োবাড়িটিতে রাত কাটিয়েছেন। এই বিদ্বান সাহেবের সব বিষয়েই অপার কৌতূহল; নিমেষে যেন সবকিছু জেনে নেবেন। ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের বহু কথা তিনি জেনে ফেলেছেন। বিভিন্ন প্রজাতির কপৌ ফুল সংগ্রহ করাটা তাঁর বড়ো শখ। মঙ্গলদৈতে তাঁর সরকারি বাসভবনে নানা প্রজাতির কপৌ লাগিয়েছেন; গাছ-গাছালি ভালোবাসেন খুব। বাংলোর চারপাশে বিচিত্র গাছ লাগিয়েছেন। এই মৌসরা অঞ্চলে কোনো পাখি একগাছ থেকে একটা কপৌর শেকড় নিয়ে গিয়ে আর গাছে ফেলেছে কি রমক-ঝমক করে ফুল দেখা দিতে শুরু করে; সাহেবও মন ভরিয়ে কপৌ জোগাড় করে চলেছেন।

    সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ধনিরাম হাতি সাজিয়ে তৈরি করল। গদাধর আর ধনিরাম মাহুত দুজনই শিকারযাত্রাতে অভ্যস্ত। ধনিরাম মাহুত এই বড়োবাড়িতেই বড়ো হয়েছে; তার কাকাও এই বাড়িতে মাহুত ছিল। ধনিরাম বেশ ডরভয়শূন্য শক্তসমর্থ মানুষ; কিন্তু ওর সেই অশরীরীদের নিয়ে বড়ো ভয়। এদের সে বড্ড ভয় করে, কিন্তু তেনাদের গল্প-কাহিনি হলে চেপে ধরে বড়ো আগ্রহ নিয়ে শোনে। প্রচুর গল্প আছেও ওর সংগ্রহে; সেইসব ভূত-পিশাচের গল্প সে সুবিধে পেলে মানুষের সামনে বলে বেড়াতেও ভালোবাসে। এ সম্পর্কে ধনিরামের নিজের কথাগুলোই শুধু শুদ্ধ, অন্যের কথা সে সামান্যও বিশ্বাস করে না।ধনিরাম হাতির উপরে উঠল। ইতিমধ্যে এডুইন সাহেবও এসে হাতির পিঠে চড়েছেন। বনমালী চৌধুরি ঠাকুরঘরে ঢুকে প্রণাম করলেন; তারপর এসে তিনিও হাতির পিঠে উঠলেন। জিনিসপত্র চাপিয়ে মনাই এবং কিনারাম মাদি হাতি সীতামাইকেও তৈরি করল।এডুইন সাহেব লম্বা-চওড়া মানুষ, দুধের মতো গায়ের রং। চুলের রং ঠিক মাঠের থেকে কেটে আনা খড়ের মতন; চোখে যেন কেউ দুটি নীল মার্বেল বলই বসিয়ে রেখেছে। একজোড়া ছাই রঙের কোট-প্যান্ট পরেছেন তিনি; মাথাতে টুপি। সাহেবের সমান না হলেও মৌজাদারও একজন শক্ত-সমর্থ পুরুষ। শরীরের রং ফর্সা; কিন্তু এডুইন সাহেবের মতো নয়। তার সাদা রঙের সঙ্গে হলুদ মিশে যেন সোনার রং ধরেছে।

    শিকারযাত্রা দেখতে বড়োবাড়ির সবাই বেরিয়ে এল। এলেন না কেবল শান্তিপ্রিয়া; তিনি পেছনের উঠোনে কবুতরকে চাল খাওয়াচ্ছিলেন। এই মহিলাটি কী করেন না করেন, তা দেখবার মন কারও নেই; নিজ মনে পুরো বাড়িতে তিনি এটা-ওটা করতে থাকেন।বাড়ির পুব দিকে বয়ে চলেছে সুগরীজান। সুগরীজানের পাড়ে পাড়ে অনেক আমলকী গাছ। জান মানে ছড়া, সেই ছড়ার পাড়ে ভেজা স্যাঁতসেঁতে উর্বর মাটিতে গুটি পড়ে পড়ে আমলকী গাছগুলো গজিয়েছে। এই আমলকী খেতে জানের পাড়ে সুগরী আসে; সেই দেখে কেউ জানটির নাম রেখে দিয়েছে সুগরীজান—আর ভাবে বললে হরিণছড়া। ছড়ার ওপারে গুটি কয় ঘর; তারই একটি ঘরে শণের চাল এখনো নতুন রয়েছে। এই ঘরগুলোর সঙ্গে বড়োবাড়িকে যুক্ত করেছে একটি বাঁশে তৈরি মজবুত সাঁকো। দুটি ঘরকে জুড়ে থাকা চালের নিচে খুঁটা একটা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে নতুন বউ। মৌজাদার চৌধুরি সেদিকে একবার তাকালেন; রক্তের চলাচল খানিক দ্রুত হল, শরীরে ছড়িয়ে পড়ল তাপ। বনমালী চৌধুরির কাছে নারী নিজে আসে, তিনি কারও সন্ধানে যান না; সেও নিজেই এসেছিল। এই তরুণীর রোদে-বৃষ্টিতে চকমকে দেহের ছন্দ বনমালীকে এই মাস দুই ধরে মাতাল করে রেখেছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে তিনি সামনের দিকে তাকালেন।

    এই তরুণীটিকে বড়োবাড়িতে এনে তুলবার ইচ্ছে তাঁর ছিল না; বয়সও নেই আর সেরকম। এটি তাঁর তৃতীয় বিয়ে। ওকে বনমালী দেখেছিলেন বহাগবিহুর দিনে। বিহুর সময় মৌজাদারকে প্রণাম জানাতে অনেক লোক আসে, সেও এসেছিল। সে তাঁকে অন্যদের মতো দূর থেকে প্রণাম করেনি; ওর হাতের মোলায়েম ছোঁয়া তাঁর পায়ের পাতাতে লেগেছিল। চোখ নামিয়ে তিনি দেখেছিলেন মেহেন্দি মাখানো একটি তুলতুলে হাতের আঙুল। রংটি ফর্সাও নয়, কালোও নয়। সে যখন দাঁড়াল, দেখা গেল বড়ো খোঁপা বাঁধা একটি ষোড়শীর মতো স্বাভাবিক লম্বাটে তরুণী; খোঁপাতে সে নাগেশ্বরের একটি সাদা ফুল গুঁজে নিয়েছিল।ওকে দেখা হয়েছিল মৌজাদারের বাগিচায় কাজ করা সম্পর্কিত ভাগ্নে একজনের জন্যে। বড়োবাড়ির থেকে আলাপ নিয়ে গিয়েছিল মুহুরি জীবন ডেকা। ওর বাড়ির লোক এককথাতে রাজি হয়েছিল; মৌজাদার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, ভাগ্নের বউ করবেন বলে মেয়ে চাইছেন—না দেবার প্রশ্নই ওঠে না। সে দরজা অবধি বেরিয়ে এসেছিল; মুখখানা লাল হয়ে এসেছিল। নিতম্ব অবধি মেলে ঝুলছিল ওর লম্বা চুল। কাউকে সম্বোধন না করেই কি না সে বলে উঠল, "যাবই যদি মৌজাদারের ঘরে যাব। ভাগ্নের ঘরে কেন?'' বাড়ির সবাই অবাক--, বলে কী সে! সেই মানুষটির বয়স আর ওর বয়স! ওই সেদিন সে পুষ্পিতা হয়েছে; লাউডগার মতো বাড়ছে বলেই এমন কথাও কি সম্ভব? মুহুরি জীবন ডেকা কিচ্ছুটি বলেননি; ওর কথা তলায় তলায় তোলপাড় করে ফেলেছিল বড়োবাড়ি।

    মৌজাদার ওকে বড়োবাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। বনমালী বর সেজে ওর বাড়িতে যাননি; ওকে শাওনির ঘরেও নিয়ে আসা হয়নি। যে পাল্কিতে শাওনি এসেছিল, সেই একই পাল্কিতে চড়ে সে বড়োবাড়ি থেকে দেওয়া পাট-মুগার পোশাক আর গয়নাগাটিতে সেজে এসে এ বাড়িতে প্রবেশ করেছিল। শাওনির ঘরের পাশে ওর জন্যে ঘর তোলা হয়েছিল; মূল বাড়িতে ওর ঠাঁই হয়নি। সে যে তুলারাম দাসের কন্যা!সবার সামনে সবাইকে শুনিয়ে মৌজাদার বলেছিলেন, ""মুখের সামনে এগিয়ে দেওয়া ভাতের থালা ছুঁড়ে ফেলতে নেই।'' এই বয়স্ক মানুষটির কাছে সতেরো বছরের মালতী যেচে এসেছিল। কেউ জানতেই পারেনি, মানুষটিকে সে জীবনের ধ্রুবতারা করে ফেলেছিল। মানুষটিকে সে বিয়ে-থাতে, বিহু-পূজাতে সেই শৈশব থেকে দেখে এসেছে; আর কোনোদিকে সে তাকাতেই শেখেনি। তাকালেই চোখ ঝলসে যায় এমন এক উজ্জ্বল পুরুষের দিকেই শুধু সে তাকাতে শিখেছিল। তাকে আকর্ষণ করেছিল মানুষটির জীবনযাত্রাও। লোকজনে ঠাট্টা-মস্করা করেছিল, "যাচিখাউরি' বলে টিটকারিও করছিল; কিছুই ওকে স্পর্শ করতে পারেনি। যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, সে শিকারের দলটির দিকে তাকিয়েছিল।

    অভিজ্ঞ হাতি গদাধর নাগনদী পার হচ্ছিল। পাহাড়ের তলার এই অঞ্চলটি অসংখ্য খাল-বিল ও নদী-ছড়াতে ভরা। কেন বা নদীর নাম নাগনদী হল? নদীর পাড় অত্যন্ত খাড়া; এই পাড়ের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এমনিতেও এই অঞ্চলের মাটির উর্বরা শক্তি খুব বেশি; বীজ একটা পড়লেই হল, ফুলে-ফলে গাছ বড়ো হয়ে ফলের ভারে নুয়ে পড়ে।নাগনদী বড়ো আঁকাবাঁকা; ঠিক যেন একটি বিশাল সাপ গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই নদীর পাড়ে বুঝি এক বিশাল অজগর সাপও ছিল; লোকে সেই অজগরকে দেবতা বলে মান্য করত। নদীর পাড়ের উঁচু জায়গাটিতে ভুটিয়া রাজার চাংঘর বা মাচাঘর ছিল; সেই মাচাতে থেকে ভুটিয়া রাজা প্রজাদের থেকে কর-রাজস্ব তুলতেন।একদিন গাছে চড়ে রোদ পোহাচ্ছিল সেই অজগর, ভোট রাজার কোনো অনুচর তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলে। নদীতে পড়ে গিয়েছিল সেই সাপ; সেই থেকে বুঝি রাতের বেলা এদিকে এলেই লোকজনে সাপটিকে দেখতে পায়। ক্রমে ক্রমেই সাপটি একটি রূপকথার রূপ নিয়ে নিল; তাতেই হয়তো নদীর নাম নাগনদী হয়ে গেছে। এখনো মনসা পূজার দিনে লোকে এসে এই নাগনদীতে প্রদীপ একটি জ্বালায়।

    নাগনদী পার করল গদাধর। নদীটির পাড়ে পাড়ে অজস্র ভেটুল গাছ; তাতে অগুনতি মৌচাক। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বাদুড়ের ঝাঁক গাছে ঝুলে আছে। সাহেব বড়ো কৌতূহলে গাছগুলোর দিকে তাকালেন। অসমিয়া ভাষা সাহেব খুব ভালো বুঝতে পারেন, বলতেও পারেন; কেবল সাহেবি ধাঁচটা থেকে গেছে। এডুইন সাহেব এই অঞ্চল সম্পর্কে পড়াশোনাও করেছেন; নাগনদী পার করে তিনি আইরিশ বিশপ হার্বাট পার্কারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন।

    আইরিশ বিশপ পার্কার তখন শিবসাগরে কাজ করছিলেন; মিশনের কাজে একবার এদিকে এসেছিলেন। একটা গাড়ি নিয়ে তিনি এই নাগনদী পার করেছিলেন। নদী পার করবার অভিজ্ঞতা লিখে তিনি লন্ডনে একখানা রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন। তাতে এভাবে লিখেছিলেন, ""সে সময় অসমে উত্তর অঞ্চল হাতি, বাঘ, গণ্ডার, ভালুক, ঘড়িয়াল আর সাপে ভরপুর ছিল; চারদিকে জঙ্গল। রাস্তাঘাট বলতে কিছুই ছিল না। এই অবস্থাতে অসমে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এক জায়গা থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত খুবই কষ্টকর ছিল।''হার্বার্ট সাহেব নাগনদী পার হবার একটি অভিজ্ঞতা বেশ রসিয়ে লিখেছিলেন। ফোর্ড গাড়ি একটিতে করে তিনি নদীর পাড়ে এসে পৌঁছান। নদীর পাড় ছিল খুবই খাড়া; তার ওপর কাদায়-জলে এক্কেবারে পিচ্ছিল হয়ে ছিল। রিপোর্টে তিনি লিখেছিলেন, ""নদীর উপরে পুলের কথা তো কল্পনাই করতে পারি না। পাড় খাড়া, খুবই পিচ্ছিল; সেই পাড় দিয়ে ড্রাইভার গাড়ি দিল নামিয়ে। হুরহুরিয়ে নেমে গাড়ি মাঝনদীতে চলে গেল। জলে বসে ছিল দুটি প্রকাণ্ড ভালুক; সেই ভালুকগুলোর পাশ কাটিয়ে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে গেল। গতি বাড়িয়ে অন্য পাড়ে উঠিয়েও দিল। কিন্তু পিচ্ছিল কাদার জন্যে গাড়ি আবার পিছিয়েও এল; আসতে আসতে বসে থাকা ভালুকগুলোকে দিয়ে দিল ধাক্কা। ভয়ে তটস্থ হয়ে সে আবার এমন জোরে গাড়ি সামনে টান দিল যে, একটানে অন্য পাড়ে গিয়ে তুলে দিল। পাড়ের থেকে সবাই তখন তাকিয়ে দেখল দুই ভালুকের মধ্যে চলছে তুমুল যুদ্ধ! যুদ্ধের কারণ হচ্ছে, একটি ভালুককে গাড়ির একজস্ট পাইপ ভালো রকম খোঁচা একটা দিয়েছে; ভালুকটি ভেবে নিল যে, সঙ্গী ভালুকই এই আঘাত দিয়েছে—অগত্যা ওকেই পালটা মার দিতে শুরু করল।'' সেই গল্পটাই এডুইন সাহেব মৌজাদারকে শোনালেন; শুনে মৌজাদারের সঙ্গে ধনিরামও হেসে উঠল।

    শিকারির দলটি নাগনদী পার করতেই এবারেও একটি প্রকাণ্ড কালো ভালুকের দেখা পেল। ভালুকটি একটি সাদা চিকমিক করতে থাকা মাছ মুখে নিয়ে হাতির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। এই নাগনদী এক অদ্ভুত নদী। কর্দমাক্ত পিচ্ছিল দুটি খাড়া পাড়ের মাঝবরাবর বয়ে চলা নদীতে জল বড়ো কম; মাঝে মাঝে কিছু জায়গা বেশ গভীর। সেখানে থাকে কিছু ভেজা অন্যরকম রঙের নুড়িপাথর। কোথাও-বা তিন বা চারটি মুখ করে নদীর স্রোত ভাগ হয়ে যায়; মাঝে মাঝে নাগনদীর খাড়া পাড় ডুবিয়ে পাহাড় থেকে ছলকে ছলকে ফেনিল জল নেমে আসে। আসে আর চলে যায়।

    নাগনদী পার হয়ে কিছুটা দূর গিয়ে মাটি অনেকটা উঁচু অবধি ঢালু। নাগনদীর এই পাড়ে মৌসরা, ওই পাড়ে বিশুসিঙা গ্রাম; আসলে বিষ্ণুসিঙা থেকে মানুষের মুখে মুখে পালটানো তদ্ভব নাম। এই বিশুসিঙা বা বিষ্ণুসিঙার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের কথা জড়িয়ে আছে। একটি উর্বর ভূমিখণ্ড এই গ্রাম; সাদা সাহেবেরা আসবার আগে ভুটান রাজার অধীন ছিল। নাতি অনিরুদ্ধকে বাণ রাজার হাত থেকে উদ্ধার করতে আসবার সময় শ্রীকৃষ্ণ বুঝি দলেবলে এদিকটায় এসেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের সেনাবাহিনী রণসিঙা বাজিয়ে দ্বারকা থেকে এই পথে এসে শোণিতপুর গিয়েছিলেন।এই বিশুসিঙা গ্রাম ছিল বনমালী চৌধুরির পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান। মানের আক্রমণের দিনে উজান অসম থেকে পালিয়ে এসে এই পরিবারটি এই বিশুসিঙা গ্রামে বাসা বেঁধেছিল। চৌধুরি পরিবার ভোট রাজাদের কর সংগ্রহে সাহায্য করে দিত। ব্রিটিশ এসে ভুটান রাজাদের যুদ্ধে হারিয়ে এই এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়; আর পুরো অঞ্চলে সবদিক থেকে বনেদি পরিবার চৌধুরি বংশের হাতে মৌসরা মৌজার দায়িত্ব অর্পণ করে। সেই থেকেই মৌসরা মৌজার দায়িত্ব এই চৌধুরি পরিবারের হাতে। দশ টাকার সমমূল্যের রূপার মুদ্রা দিয়ে বনমালীর দাদু মৌসরা মৌজার দায়িত্ব নেন। ব্রিটিশ ভুটিয়াদের হারিয়ে দেবার পরে চৌধুরি পরিবারের বাকি সবাই আবার উজানের মূল বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল; থেকে গিয়েছিল কেবল বনমালীর দাদুর পরিবারটিই। বনমালী চৌধুরির বাবা মৌজার কাজের সুবিধের জন্যে মৌসরাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

    মৌসরা গ্রামটির নাম নিশ্চয় এসেছে নাগনদীর পাড়ে পাড়ে ভেটুল বা ভেলেউ গাছে ঝুলে থাকা মৌচাকগুলো থেকে; মৌসরা মানে মৌঝরা। আজ মৌজাদারের শিকারের দলটি মৌসরা থেকে নাগনদী পার করে বিশুসিঙার ভেতর দিয়ে সেই বিশেষ জায়গাটির দিকে এগোচ্ছে। প্রকৃতির অদ্ভুত সৃষ্টি সেই জায়গাটির কথা মনে পড়লে বনমালীর মনে এক সমীহের ভাবের উদয় হল।বিশুসিঙা থেকে সোজা পথে সোনাপুর পাবার সামান্য আগে একটি ছোট্ট রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে গেলে সেই জায়গাটিতে পৌঁছানো যায়; বিশুসিঙা আর সোনাপুরের ঠিক মাঝখানে জায়গাটি। বেলা পড়বার আগে আগে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। আগে থেকেই কিছু মানুষ দিয়ে ওখানে কাজকর্ম এগিয়ে রেখেছে; বাকিটা গিয়ে পৌঁছে করা যাবে।সেখানে যেতে হলে মৌসরা থেকে পশ্চিমে যেতে হয়। পথে অনেকগুলো নালা-ছড়া পার করে যেতে হয়; নদীও তিনখানা পার করতে হয়। বনমালী সেখানে শিকার খেলতে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু বড়ো কথা হচ্ছে জেলাধিপতি তাঁর সঙ্গে যাচ্ছেন। বড়ো ভয়ঙ্কর সে জায়গা! সাহেব আবার বনের রাজার সঙ্গে শিকার খেলবেন। সব খবর তিনি সংগ্রহ করেছেন, জলাজমির কথাও জানেন; জলাজমির মাঝে দ্বীপের মতো জায়গাটিতে বাঘের কথাও শুনেছেন।

    মৌসরার থেকে পশ্চিমের দিকে যেতে থাকলে জঙ্গল গভীর হতে শুরু করে। এদিকটায় মানুষের বসতি বড়ো হালকা; বেশিরভাগই হচ্ছে খাজনা দিতে না পেরে জঙ্গল কেটে বসা নতুন মানুষ। জঙ্গল ঘন হয়ে আসে, আঁধার হতে থাকে পথ; দিনেই নামে অন্ধকার। যেতে যেতে আঁধার আবার কমেও আসে; পাক খাওয়া বাতাসের শব্দ ক্রমেই স্পষ্ট হতে শুরু করে। লোকে টের পায়, জায়গাটিতে এসে পৌঁছানো গেছে।হঠাৎই পুরো এলাকা আলোময় হয়ে পড়ে; চোখের সামনে হঠাৎ নিজেকে মেলে ধরে অনাদি-অনন্ত এক জলাশয়। জলাশয়ে কচুরিপানা নেই, কোনো ঝোপঝাড়ও নেই; দূর থেকে দেখলে মনে হয় না জলাশয় বলে—মনে হয় বিশাল সবুজ গালিচা একখানা কেউ পেতে রেখেছে। উঁচু পাড়, পাড়ের মাটি টানটান কঠিন; সবুজ গালিচাতে পা ফেললে মনে হয় যেন কোমল শক্ত উলের কার্পেটে পা পড়েছে। পুরো গালিচা কাঁপতে থাকে; বাঁশের লাঠি দিয়ে যদি কেউ একটা খোঁচা দিল, বেরিয়ে আসে অসম্ভব শীতল জল—সেই জলের রং কাজলা কালো।

    জলাশয়ের মাঝখানটিতে একখণ্ড শক্ত জমি। সেই জমি জুড়ে একটি ঘন বর্ষারণ্য। দিনেই এখানে অন্ধকার নামে। লোকে এখানে পা ফেলেই না। ফেলবে কী করে? তিনদিক ঘিরে আছে সেই কোমল উলের গালিচা। পারে সামান্য দূর অবধি গালিচাতে পা ফেলা যায় বটে। মাঝে গেলেই কালো জলে টেনে নামিয়ে নেয় নিচে। সেই অরণ্যে বাস করে বনের রাজার একটি সুখী পরিবার। একেবারে নিশ্চিন্ত আর নিরুপদ্রব। সেই জলাশয়ের পারে একটি উঁচু টিলাতে গিয়ে শিকারের দলটি দুদিনের জন্যে শিবির ফেলবে। সমস্ত যোগাড়যন্ত্র হাতির পীঠে বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে। ম্যানচেস্টারে তৈরি তাঁবু নিয়ে আসা হয়েছে। সোনাপুরের "ঘোষ ব্রাদার্সে'-র অরবিন্দ ঘোষ এটা এনে দিয়েছেন। অরবিন্দ ঘোষ হচ্ছেন বনমালী চৌধুরির ডান হাত। কিছু একটার দরকার পড়লে তাঁকে বললেই হল, এসে যাবে। টাকা ক'টা নেবার বেলা কিন্তু পাই পাই করে হিসেব করে নেয়। তাঁবুর ভেতরেই একভাগে পায়খানা ও স্নানের ঘর আছে। আর ভাগে দুটি শোবার ঘর। ছড়ানো-গোটানো সম্ভব এমন বিছানা-চেয়ার-টেবল আনা হয়েছে। বড়োবাড়ির থেকে মনাই আর কিনারাম এসেছে। ওরা দুজনে জিনিসপত্রগুলো সীতামাইর পীঠে তুলে গদাধরের পেছন পেছন আসছে। সীতামাই বড়ো শান্ত আর বাধ্য মাদী হাতি। সেও শিকার খেলাতে অভ্যস্ত। জলাশয়ের পারের এই উঁচু টিলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বিষখাইতি নদী। বিষখাইতি বা বিহখাতি নদীর পাড়ে পাড়ে ভোমরার মধু আরে আমলকি খেতে চিত্রল হরিণগুলো আসে। টিলার থেকেই হঠাৎ হঠাৎ এই হরিণ পালের দৌড় দেখা যায়। নদীতে জল খেতে আসা অন্যান্য জন্তু জানোয়ারও এই টিলার থেকে নজরে পড়ে। কখনও বা চোখে পড়ে গুরুগম্ভীর ছন্দে হলদে শরীরে কালো আঁচ থাকা দুই একটি বাঘও এগিয়ে আসছে। এই বিষখাইতি নদীর পারে মাচা তোলা হয়েছে। নদীর পাড়ে গায়ে লাগা দুটি শিরিশ ও সিজু গাছ রয়েছে। দুটিতে একটি মাচা হয়েই যায়। তাতে বাঁশ কাঠ বাঁধা হয়েছে। উঁচু টিলার থেকে জলাশয়ের পারে পারে নেমে গেলেই বিষখাইতি নদীর পাড়ে বাঁধা জায়গাটি রয়েছে।

    বেলা থাকতেই গদাধর, সীতামাই বিশুসিঙা থেকে সোনাপুরের দিকে আসা সংক্ষিপ্ত পথ ধরে এসে এখানে পৌঁছাল। পথ আর কী, হাতি আসতে পারার মতো একটি গোপন রাস্তা। পুরো পথে এরা হাতির আগে-পরে অসংখ্য বনমোরগ দেখেছিল; দুটো পাখি মেরেও এনেছে। ধনিরাম, মনাই, কিনারাম কাজে লেগে গেল; উঁচু টিলার মতো জায়গাটিতে তাঁবু ফেলা হল। টিলার থেকে জলাশয়ের অনেকখানি দেখা যায়; তাঁবুর থেকে নিরন্তর বিষখাইতি নদীর শব্দ শোনা যায়। মাঝে-মধ্যে জলাশয় থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে বাতাস ছুটে আসে—মনে হয় যেন কোনো মানুষ কাঁদছে।টিলা থেকে সামান্য নেমে গেলেই বিষখাইতি নদীর পাড় মেলে; সেখানে মাচা বাঁধা হয়েছে। মাচার নিচে একটি ছাগল; মাচার জায়গা ঘিরে ঝোপ বেঁধে গাছপালা। সবুজের সে কী যে বাহার! এই গাছের পাতা যদি টিয়ার মতো, তবে সেই গাছের পাতা ঘন সবুজ; এই লতার সবুজের সঙ্গে যদি হলদে মেশানো, তবে সেই লতার সঙ্গে নীল। বেলা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে অরণ্যে অন্ধকার নেমে আসে; কিন্তু জলাশয়টিতে বহু সময় ধরে একটি হালকা আলোর আভা থাকে।

    বেলা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে আঁধারে অরণ্য ঘিরে ফেলল; কিছু পরে জলাশয়টিকেও অন্ধকারে ছেয়ে ফেলল। মৌজাদার, ধনিরাম ও সাহেব—সবাই মাচার ওখানে যাবার জন্যে তৈরি হল; বন্দুক-বারুদ সব তৈরি। বিশাল জলাশয়ে অন্ধকার, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার! অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে অসংখ্য জোনাকি পোকা। সোনালি জরির চিকন কাজ করা দাঁড় কাকের পালকের মতো রঙের কাপড় একটির মতো আঁধার পুরো জলাশয় ছেয়ে গেছে; গুটি গুটি জরির ফুলে ভরা চাদরটিতে থেকে থেকে ঢেউ উঠছে। সোনালি জোনাকিগুলো ওঠে আর নামে, চাদরটিও ওঠে কেঁপে।

    বড়ো সাবধানে হাতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধনিরাম। টিলার থেকে নেমে জলাশয়ের কাছাকাছি কিছুদূর গেলেই বিষখাইতি নদীর পাড়ে সেই মাচা বাঁধা জায়গাটি মেলে। জলাশয়ের পাড়ের মাটি কটকটে শক্ত; কিন্তু সামান্য এদিক-ওদিক হলেই উলের নরম গালিচাটি সবকিছু জলাশয়ের গর্ভে টেনে নেবে। শক্ত মাটির পাড়ের পাশেই চুপচাপ ছড়িয়ে-মেলে পড়ে থাকে সেই গালিচাটি; গালিচার নিচে অতল রহস্য! হাত দিলেই শিরশিরিয়ে ওঠে অদ্ভুত রকমের ঠাণ্ডা জল। মানুষের মুখে মুখে জায়গাটি নিয়ে কত যে কাহিনি! ঘোর আঁধারে ঢাকা অমাবস্যার রাতে বুঝি জলাশয়ের গর্ভের শীতল জল থেকে উঠে আসে একটি সোনার নৌকা। নৌকার মাঝিকে কেউ দেখতে পায় না; নৌকার সামনে বুঝি বাঁধা থাকে একটি ধপধপ করে জ্বলন্ত মশাল। কখনও ঘোরালো পথে, কখনও সোজা পথে সামনে মশাল নিয়ে নৌকাটি জলাশয়ে ঘোরাফেরা করে—লোকে দেখতে পায়। পাড় থেকে লোকে প্রণাম করে; কেউ কেউ বলে, এই জলাশয়ের এক অদ্ভুত মহিমা আছে। কারও বাড়িতে যদি কোনো শুভানুষ্ঠান আছে, জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে ধূপ-ধূনা জ্বালিয়ে প্রণাম করে মানত করলেই হল; পরদিন সাতসকালেই সেখানে ভেসে ওঠে অনুষ্ঠানাদি আয়োজন করবার হাঁড়ি-কড়াই-বাসন-বর্তন—যা যা চাই। ব্যবহার করে শুধু ভালো রকম ধুয়ে-থুয়ে সেগুলো আবার জায়গা মতো রেখে আসতে হবে। কলাপাতার আগা একটি কেটে তাতে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রণাম করে জিনিসগুলো ভক্তিভরে রেখে আসতে হবে—এমনটাই চলে আসছিল। কেউ বুঝি একবার না ধুয়ে এঁটো বাসন ওখানে রেখে এসেছিল; এরপর থেকে আর হাজার মিনতিতেও সেসব মেলা ভার হল। কেউ বা আবার সন্ধ্যাবেলা বিষখাইতি নদী থেকে যদি মাছ মেরে ফিরছে—দেখতে পায় অশ্বত্থডালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে তিন মুক্তকেশী কন্যা। পুরো জলাজমি জুড়ে এমন কত যে কেচ্ছা, কত যে কাহিনি!

    ধনিরাম হাতির পিঠে বসিয়ে সাহেব আর মৌজাদারকে নিয়ে যাচ্ছে জলাশয়ের পাড়ে পাড়ে। সাহেব অবাক হয়ে জোনাকির ঝাঁক দেখছিলেন; হঠাৎ এই অনাদি-অনন্ত চাদরে আগুন দেখা দিল। আগুন কি সেই, যা লোকের মুখে মুখে শোনা যায় নৌকার গল্প—সেই নৌকার মশাল? অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কেবলই চলন্ত আগুন! আগুন দেখে ধনিরাম হাতজোড় করল। এই তো আগুন চার টুকরো হয়ে গেল; নীল আর কমলা রং মিশে আগুনটি নাচতে শুরু করল। আগুন বাড়তে শুরু করল; চার টুকরোর জায়গায় সাত টুকরো, সাতের জায়গায় দশ, দশের জায়গায় পনেরো, পনেরোর জায়গায় বাইশ! চোখের সামনে অন্ধকার জলাজমি আলোতে ভরে পড়ল। উত্তরে বাতাস বইছে; বাতাসের যত গতি বাড়ছে, ততই আলোর উৎসবের তেজ বাড়ছে। আলোকিত হয়ে পড়েছে অন্ধকার অরণ্য। কিছুই পরোয়া না করে হাতি "কট' করে একটি হাঁক ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল; সে আর এক পাও এগোবে না। ধনিরাম কীর্তনের একটি পদ গাইবার চেষ্টা করল; সাহেব বুকে ক্রস আঁকছেন, বনমালী চৌধুরি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কী ভয়াবহ অথচ সুন্দর এই দীপাবলি! স্পষ্ট বাঘের গর্জন ভেসে এল; শব্দটি ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এল। হাতি সামনেও যায় না, পেছনেও আসে না। ধনিরাম দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ""প্রভু মহারাজ! চলুন, ফিরে যাই। জলের তলা থেকে এঁরা সবাই বেরিয়ে এসেছেন; সাত সাগর তেরো নদীর পার হয়ে আসা মানুষটিকে এখানে এনে এভাবে মরতে দিতে পারি না।'' গদাধরের গায়ে অঙ্কুশ লাগিয়েছিল ধনিরাম; বাঘের গর্জনের শব্দ আরও ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। ""বনের রাজাও খাবার ছেড়ে চলে গেছেন''—আর কারও আদেশের অপেক্ষা করেনি ধনিরাম।

    হাতি ফিরে আসছিল; ক্যাম্প পৌঁছাতে রাতের আরও কয়েক প্রহর বাকি ছিল। পেটে পেটে বেশ চিন্তায় পড়লেন মৌজাদার; শিকার করতে না পেরে যদি সাহেব রাগ করেন! সাহেব রাগ করলে মৌজা চালাতে নানান বাধা-বিঘ্ন এসে পড়বে। সাহেব আর তাঁর নিচের কর্মচারীরা এসেছে মাটি জরিপের কাজে; কী বা নতুন কর-টর বসিয়ে দেয়! কানাঘুষো শোনা গেছে, এবারে করের বোঝা যা রায়তে বইবে, সেটা বেশ কঠিন হতে যাচ্ছে।তাঁবুর নিচে ধনিরাম আগুন ধরাল। চা, বিস্কুট, কেকের জোগাড় ভালোই করা হয়েছিল। সাহেব আগুনের পাশে বসে নিজের দেশের আলেয়ার গল্প শুরু করলেন; কালো কুচকুচে পিশাচে যে মুখের উপরে ল্যাম্প নিয়ে ঘুরে—তার গল্প। মদের খরচ বের করবে বলে জ্যাক মাতাল তাঁর আত্মাটি বিক্রি করে দিয়েছিল নরকের শয়তানের কাছে; শালগম একটি কুরে সেটি পোড়াবে বলে কীভাবে তাতে আংঠা রেখে দিয়েছিল—সেই গল্প। সাহেব নিজের দেশের আলেয়ার আগুনের গল্পে মজে গিয়েছিলেন; এরকম আগুন বুঝি আমেরিকাতে নতুন পাতানো রেলপথে বড়ো বেশি দেখা মেলে। রেললাইন বসাতে গিয়ে শ্রমিকেরা সেগুলোকে মৃত মানুষের অতৃপ্ত আত্মা বলে ভেবেছিল। এরকম আগুন দেখলেই রেলশ্রমিকেরা হয় গায়ের জামা খুলে উলটে পরে নেয়, নইলে টুপি খুলে উলটো পরে; নইলে হাতের ছোরার চোখা ডগাটা ওপরের দিকে দিয়ে উলটো করে মাটিতে পুঁতে দেয়।

    ধনিরামও ওর কুকরিটা বের করে ডগাটা উপরমুখো করে মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। ওর কাজ দেখে সাহেব এবং মৌজাদার দুজনেই হেসে ফেলেছিলেন। ভেতরে ভেতরে মৌজাদার আশ্বস্ত হয়েছিলেন; সাহেব রাগ করেননি তবে। খাবার সময় সাহেব বিশেষ পোশাক পরে বসেন; সাহেবের নিজের দেশের সার্ডিন মাছ ছিল খাবারে। ধনিরাম গরম করে এনে দিলে মাছে কাঁটাচামচ ছুঁইয়ে সাহেব বনমালী চৌধুরির দিকে তাকিয়ে খানিক হাসি ছুঁড়ে দিলেন। মনে মনে বনমালী অরবিন্দ ঘোষকে ধন্যবাদ জানালেন। সাহেব এবারে শোবার পোশাক পরলেন; কাঁটায় কাঁটায় কাজ চলে, শোয়া-খাওয়া সব কাজ ঘড়ির সঙ্গে সঙ্গে।

    সাহেবের কায়দাকানুন, পোশাক-পাতির সামনে মৌজাদারের নিজেকে বড়ো খাটো মনে হল। কী-ই বা ছিল এই দেশে? সাহেবরা না এলে এই দেশ অন্ধকারে ডুবে থাকত। কিছু লোকে আবার এই সাহেবদের তাড়াবার কথা বলে; এরা বুঝি আবার দেশ চালাবে! মৌজাদার বনমালী চৌধুরি নিজের মধ্যে এক প্রবল উত্তেজনা অনুভব করলেন। সাহেবের উন্নত সভ্যতা তাঁকে হাত তুলে ডেকে পাঠাচ্ছে; ছেড়ে দেবেন, তিনি যত সব জঙ্গলি রীতিনীতি সব ছেড়ে দেবেন। সভ্য দেশের সাহেবরা সাত সাগর তেরো নদীর পার থেকে যা কিছু উন্নত রীতি-রেওয়াজ নিয়ে এসেছেন, সেগুলো গ্রহণ করবেন—একেবারে মন বেঁধে ফেললেন তিনি। অরবিন্দ ঘোষকে বলে কলকাতার দর্জির হাতে একজোড়া সাহেবি পোশাক সেলাই করিয়ে আনবেন; সাহেবের মতো টুপি-জুতো সব আনাবেন। ধীরে ধীরে তাঁর মনটা শান্ত হয়ে এল।

    বনমালী টিলার ঢালু ধরে সামান্য নেমে গেলেন। নদী থেকে আসা শীতল বায়ু সামান্য আগে উত্তপ্ত হওয়া তাঁর মুখ-কান ঠান্ডা করে দিল। কলকল শব্দে বয়ে চলা বিষখাইতি নদীর দিকে তিনি তাকিয়ে রইলেন। পরিষ্কার জলে আকাশের চাঁদের রং লেগেছে; নদীতে যেন চাঁদটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে মিশে গেছে। বনমালী কান খাড়া করে নদীর শব্দ শোনার চেষ্টা করলেন; লোকে বলে, এই বিষখাইতি নদীর জলের স্রোতে মেয়েমানুষের কান্নার স্বর মিশে থাকে। কাছাড়ি রাজা দেবধারণের অত্যন্ত রূপসী রানি ককিয়ে কাঁদতে থাকেন; এই কান্না বুকে বেঁধে বেড়ায় এই নদী। মৌজাদার এবারে টিলার পুব দিকে গেলেন; কিছু পাথরের টুকরো পড়ে আছে—এখানে বুঝি একটি মন্দির ছিল। এই মন্দিরে আত্মগোপন করেছিলেন দেবধারণ রাজার রূপসী রানি।

    কাছাড়ি রাজা দেবধারণ এই নদীর পাড়ে, এই টিলাতে এক গৌরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতি বছরে রাজা ধুমধাম করে বৈশাগুর আয়োজন করতেন; বৈশাগুতে অংশ নিতেন রাজার রানিও। ওদিকে ভুটানের রাজাও কাছাড়ি রানির রূপের কথা শুনে তাঁকে পাবার বাসনা পোষতে শুরু করলেন। সেজন্যে একবার বৈশাগু চলা অবস্থাতেই ভুটিয়া রাজা কাছাড়ি রাজাকে এসে ধমকে দিলেন—ভুটিয়া রাজার দখলের মাটিতে বৈশাগু আয়োজন করে কাছাড়ি রাজা বড়ো অপরাধ করেছেন; অগত্যা হয় কাছাড়ি রাজা যুদ্ধ করুন, নইলে আত্মসমর্পণ করুন।কাছাড়ি রাজা যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। যুদ্ধে ভুটিয়া রাজা হারলেন, কিন্তু রাজা দেবধারণের সেনাপতিকে বন্দি করে নিয়ে গেলেন। সেনাপতিকে মুক্ত করে দেবার শর্ত দিলেন এই যে, তিনি দেবধারণের রানিকে গিয়ে বলতে হবে যে যুদ্ধে রাজার মৃত্যু হয়েছে; রানিকে ভুটিয়া রাজার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে, নইলে সেনাপতিরও মৃত্যু অনিবার্য। প্রাণের মায়াতে সেনাপতি তাই-ই করল; রানিকে গিয়ে মিছেই জানাল যে যুদ্ধে দেবধারণের মৃত্যু হয়েছে এবং রানিকে নিয়ে যেতে ভুটিয়া রাজা ঢাক-ঢোল বাজিয়ে আসছেন। এই কথা শোনা মাত্র রানি করলেন কি, মন্দিরের পুরোহিতের কাছে দুই কন্যাকে সমঝে দিয়ে নিজে বিষ পান করে মন্দিরের তলার নদীতে ঝাঁপ দিলেন। যুদ্ধের সময় রানি এই মন্দিরেই দুই কন্যাসহ আত্মগোপন করে ছিলেন। রূপসী রানিকে নদী নিজের কোলে টেনে নিল; সেই নদী হল বিষখাইতি—নিজের সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে শুরু করল সেই রানির কান্না।

    টিলার পুব দিকে গিয়ে মন্দিরের খসে পড়া দেয়ালের ছাদের পাথরগুলো একবার দেখে এলেন মৌজাদার। তিনি দেখলেন, সাহেবও উঠে এগিয়ে আসছেন; হয়তো মৌজাদারকে তাঁবুতে না দেখেই তিনি উঠে এসেছেন। দুজনেই জলাশয়টির দিকে তাকালেন—কিছুই নেই, আগুনের শিখাগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। হঠাৎ দুজনের চোখে পড়ল, দুই টুকরো আলো জলাশয়ের মধ্যে ভেসে উঠল; এদের ভাসার ধরন এমন, যেন মনে হচ্ছিল দুটি পাখি পাখা মেলে আকাশে উড়ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন, দুটি আলো আসলে চারটি আলোর খণ্ড; চার টুকরো আলো আগু-পিছু করতে করতে এদিকটাতেই আসছে। আলোগুলো আসতে আসতে মন্দিরের ভগ্নাবশেষের মধ্যে পড়ল; এদের উজ্জ্বলতা কমে এল, কিন্তু একেবারেই হারিয়ে গেল না। ধীরে ধীরে পাথরগুলোর কাছাকাছি একটি ঝুরিবটে আসতে আসতে এরা নিভে গেল। হাতের টর্চ জ্বালিয়ে সাহেব বটগাছটির দিকে ভালো করে তাকালেন; উজ্জ্বল আলোতে ঝিলিক দিয়ে উঠল একজোড়া বড়ো প্যাঁচা। চোখগুলো গোল গোল; ভয় পেয়ে প্যাঁচার জোড়া উড়ে গেল। আবার অন্ধকারে ঝলকে উঠল চার টুকরো চাঁদ!

    সাহেব উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন—এই দেশে কত কী আছে! আজ এই একদিনেই কত কী দেখলেন! এই প্যাঁচার কথা বুঝি সাহেব পড়েছেন। এদের পাখাতে এমন এক জিনিস আছে যে, এগুলো আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়। বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাতে এই প্যাঁচারা উড়ে যদি, তবে আলোর টুকরো হয়ে পড়ে; পাখা মেলে উড়লে মনে হয় যেন দুটি চাঁদ নাচছে। বনমালীরও মনে পড়ল, বাবার মুখে এই প্যাঁচাদের কথা শুনেছিলেন। লোকে বুঝি বিশুসিঙাতে, মৌসরাতে পাখাতে আলোর ঝালর নিয়ে উড়ন্ত প্যাঁচাদের দেখেই থাকে; অলক্ষুণে বলে প্যাঁচাগুলো দেখলেই লোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মেরে ফেলে। ধীরে ধীরে এই প্রজাতির প্যাঁচা এই অঞ্চলে না-দেখা হয়ে গেল।

    সাহেব বনমালীকে ধন্যবাদ জানালেন; বনমালী চৌধুরি সিদ্ধান্ত নিলেন—কালই সাহেবকে মন্দিরের পাথরগুলো ভালো করে দেখাবেন। বিষখাইতি নদীর কথা, রূপসী রানির কথা সবকিছু ভালো করে তাঁকে বলবেন; সাহেবের বড়ো ভালো লাগবে। সাহেবের ভালো লাগবে, এমন সব কাজই তিনি করবেন—নিশ্চয়ই করবেন।



    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ
  • ধারাবাহিক | ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ৩৪৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৩৫743404
  • বাঃ
    সুশান্ত কর মশাইকে ধন্যবাদ-- বিখ্যাত অসমিয়া উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদের জন্যে।
    গুরুচণ্ডালি কর্তৃপক্ষকে --এটিকে আমাদের পড়ার সহজ সুযোগ করে দেবার জন্যে।
    চলুক!
  • সুশান্ত কর | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৫৮743414
  • অনেক ধন্যবাদ,এটি প্রকাশ করবার জন্যে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন।