

চড়িদা গ্রামে একটি ছৌ মুখোশের মিউজিয়াম গড়ে উঠেছে দেখলাম। জিজ্ঞাসা করে জানলাম স্থানীয় মুখোশ শিল্পীদের সংগঠন জাদুঘরটির উদ্যোক্তা। একটি বাড়ির একতলার বড় ঘরে মিউজিয়াম। দশটাকা দিয়ে ওয়াশরুম ব্যবহার করা যায়। পর্যটকদের কাছে এই সুবিধেটুকু অনেক। মিউজিয়াম থেকে মুখোশের ছরকম প্রকারভেদ জানা গেল -
১। বাবু মুখোশ - (কার্তিক, গণেশ, কৃষ্ণ, নারায়ণ, শিবঠাকুর প্রভৃতি দেবতার মুখোশ - এই মুখোশ সুন্দর কমনীয়, কোন দাড়ি গোঁফ থাকেনা।)
২। বীর মুখোশ - (রাবণ, মহিষাসুর, তারকাসুর, শুম্ভ নিশুম্ভ প্রভৃতি রাক্ষস বা অসুরের মুখোশ - এই মুখোশের মোটা পাকানো গোঁফ থাকে। দন্তপাটি বিকশিত আর চোখ থাকে বিস্ফারিত),
৩। নারী মুখোশ (দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, সীতা প্রভৃতি দেবী ও সতীর মুখোশ - বাবু মুখোশের তুলনায় এই মুখোশের আকৃতি অনেকটা গোলাকার, থুতনির দিক পানপাতার মতো নামানো। আর বাবু মুখোশের সঙ্গে পার্থক্য দেখা যায় চুলের স্টাইলে।),
৪। ভূত মুখোশ (শিব ঠাকুরের শ্মশান অনুচর, ভৃঙ্গী প্রভৃতির মুখোশ - এই মুখোশ ভীষণ দর্শন, দাড়ি গোঁফ দুইই থাকে।),
৫। পশু মুখোশ (বাঘ, সিংহ, বরাহ, মহিষ, বালি, সুগ্রীব, বীর হনুমান প্রভৃতির মুখোশ)
৬। পাখি মুখোশ (পেঁচা, ময়ূর, রাজহংস, বক রাক্ষস, জটায়ু প্রভৃতির মুখোশ)
তবে এইগুলি বাদ দিয়ে আর একরকম মুখোশ হয়, তা হল সাঁওতাল নারী ও পুরুষের এক জোড়া মুখোশ। এই মুখোশে কিন্তু কোন জরি চুমকি, রাংতা কিচ্ছু ব্যবহার হয়না। এগুলি মূলত ঘর সাজানোর উপকরণ। বড় প্রমাণ আকারের মানুষের মুখ থেকে শুরু করে একেবারে ক্ষুদ্র আকারেও পাওয়া যায়। অন্যান্য মুখোশ যেগুলি নাচে ব্যবহার হয়, তার চোখের মণি গোল ফুটো করা থাকে। আর ঘর সাজানোর মুখোশ হলে সেখানে চোখ আঁকা থাকে। অনেক বছর আগে প্রথম যখন আমি চড়িদা আসি, তখন প্রমাণ আকারের সাঁওতাল মুখোশ কোনটায় চোখে ফুটো করা, কোনটায় নেই - এরকম কেন শিল্পীদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ওঁরা বলেছিলেন। ড্রইং রুমের দেওয়ালে যখন এই মুখোশ সাজানো থাকবে, চোখে ফুটো থাকলে মানুষ দেখে ভয় পায়।
এই মুখোশ তৈরির উপাদান গুলি স্থানীয় ভাবেই সংগ্রহ করেন শিল্পীরা - যেমন পুরোনো সুতির কাপড়, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো, কলাপাতার মিহি ছাই, কাগজ, ময়দার আঠা, হলুদ আর খড়িমাটির রং, বার্নিশ ইত্যাদি। তবে খবরের কাগজ ব্যবহার করা হয় না। এই মুখোশ নির্মাণের পদ্ধতিটি বেশ চমকপ্রদ এবং কাজের অনেকগুলি ধাপ আছে। প্রথমে কাদা মাটিকে মূর্তি গড়ার উপযুক্ত করে তুলতে হয়, তার পর সেই মাটি দিয়ে কাঠের পাটাতনের ওপর মূর্তি তথা ছ্যাঁচা বা ছাঁচ বানাতে হয়। এই ছাঁচগুলি রোদে আধশুকনো করে নিয়ে এর ওপর মিহি ছাই বা পাউডার ছড়িয়ে একে একে আট / দশ পরতে কাগজ চিটানো হয় আঠা দিয়ে। কাগজের ওপর কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে তার ওপর টুকরো কাপড়ের আস্তরণ দেওয়া হয়। তারপর আবার কাদামাটি লেপে দেওয়া হয়। মাটি একটু শুকোলে কর্নিকের মতো কাঠের সরঞ্জাম ‘থাপি’ দিয়ে মূর্তির চোখ, নাক, কান ইত্যাদি স্পষ্ট করে চাঁছা করা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় এই পদ্ধতিটিকে 'চিকণ করা' বলা হয়। পোড়ামাটির ছাঁচের মধ্যে কাগজ আর কাপড়ের পর পর প্রলেপে তৈরি হয় মুখোশের কাঠামো। এই কাজ মূলত পুরুষ শিল্পীরা করেন। কাঠামো তৈরির পর মুখোশ ছাঁচ থেকে বের করে, রং করে সাজানো হয়। বাড়ির মেয়ে বৌরা, কিশোর কিশোরীরা রং তুলি দিয়ে চোখ মুখ, অন্যান্য সাজসজ্জা এঁকে দেন, তারপর পুঁতি, জরি, চুমকি, ধাতব তার, প্লাস্টিকের ফুল, পাতা, ময়ূর পালক, অন্য পাখির পালক, চুল, দাড়ি, গোঁফ ইত্যাদি যেখানে যেমন দরকার বসিয়ে এক একটি চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন। দক্ষিণ বঙ্গে ঠাকুর গড়ায় মেয়েদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে যেমন বিধিনিষেধ আছে, এখানে তেমন নেই। যদিও মুখোশ শিল্পীরা আদিবাসী নন, ও বি সি সম্প্রদায় ভুক্ত এবং এঁদের বেশিরভাগেরই পদবী সূত্রধর - তবুও দেবদেবীর বা পৌরাণিক চরিত্রের মুখোশ তৈরিতে মহিলাদের এই সহজ যোগদান আদিবাসী মাতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব বলেই মনে হয়। এই সূত্রধর শিল্পীদের আদি নিবাস ছিল বর্ধমানে। স্থানীয় রাজবংশ কোনকালে ঠাকুর গড়ার জন্য বর্ধমান থেকে শিল্পী এনে এখানে বসিয়েছিলেন। আলেকালে ছৌ নাচের চাহিদার প্রভাবে এই শিল্পীরাই মুখোশ তৈরি শুরু করেন। আর চড়িদার মুখোশের জয়যাত্রা শুরু হয়।
অন্ধকার নেমে আসাতে সেদিনের মতো কাজের সমাপ্তি ঘোষণা হল। আবার পরের দিন সকালে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে হবে।
পরের দিন সকাল থেকে শুরু হল ঘরে ঘরে গিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ। সূত্রধরদের বাড়ি আর মুখোশের দোকান একসঙ্গেই রয়েছে। পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি বাড়ি। এইধরণের জনপদকে আমরা বলি নিউক্লিয়েটেড সেটলমেন্ট। কিন্তু "চড়িদা কি লাল" গম্ভীর সিং মুঢ়ার বাড়িটা কোথায়? লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে খোঁজখবর শুরু করলাম। আর তখনই চোখে ভেসে উঠল আর এক নতুন সত্য। সূত্রধরদের বাড়িঘরের পরে চাষজমি। বেশ খানিকটা পরে বনের কাছে আবার একটি ছোট জনপদ, চড়িদার মধ্যেই। আগের জনপদটির চেয়ে আলাদা - একেবারে বন্য পরিবেশ, নিরিবিলি। সূত্রধরদের মতো পাকা দালান কোঠা নয়, বরং কাঁচা বাড়ি, তাও বাড়ির গা মসৃণ নয় - এখানে তো এঁটেল মাটি নেই। লাগোয়া গোয়াল আছে। পথের মোড়ে একটি ছৌ নাচের ক্লাব, আর তার সামনে গম্ভীর সিং মুঢ়ার মূর্তি বসানো। এখানেই মুঢ়া পরিবারগুলির বাস। এঁরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। সূত্রধরেরা ছৌনাচের মুখোশ তৈরি করেন আর মুঢ়ারা নাচেন। একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু বসবাস আলাদা। বাড়ি দেখেই বোঝা যায়, জীবনযাপনেও আকাশ পাতাল পার্থক্য। মনে প্রশ্ন জাগে কেন এই ফারাক?
জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে পর্দা উঠতে থাকে। আসলে সূত্রধর সম্প্রদায়ের দোকান ও বাড়ি ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে গড়ে ওঠা কেবল যে স্থানাভাবের জন্য তা নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা থেকেও চালিত। একই কারিগরি কাজের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য একসঙ্গে রাস্তার ধারে রৈখিক (Linear Settlement) এবং গ্রামের ভেতরের দিকে পুঞ্জীভূত (clustered) বসতি গড়ে তোলে। সূত্রধরদের পাকা দালানকোঠা, পথের ধারে ব্যবসায়িক কেন্দ্র, আর মুঢ়াদের কাঁচা বাড়িগুলি কৃষি জমি পেরিয়ে সেই বনের ধারে - এই ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্য তৈরি হয়েছে মূলত সামাজিক শ্রেণি, জীবিকা এবং জাতিগত বিভেদের কারণে। একই গ্রামের ভেতরে দুই গোষ্ঠীর সামাজিক দূরত্বটাই (Social Distance) ভৌগোলিক স্থানিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়েছে। দাড়িংবাড়িতে গিয়েও আমরা কন্ধ উপজাতি, সাধারণ ওড়িয়া ভাষাভাষী মানুষ এবং উত্তর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এইরকম তীব্র স্থানিক বিভাজন দেখতে পেয়েছিলাম। অথচ ঘেটো বা সামাজিক- স্থানিক দূরত্বের প্রশ্নে আমাদের ছেলেমেয়েরা কেবল উত্তর আমেরিকার উদাহরণ দেয় - যেন আমাদের নিজেদের দেশটা খুব সাধু এবং নির্মল।
১৯৪৯ সালে শেভকি ও বেল (Shevky & Bell) নিয়ে এসেছিলেন Social Area Analysis বা সামাজিক অঞ্চল বিশ্লেষণ - এই তত্ত্বটি দুই সম্প্রদায়ের আবাসন ও সামাজিক স্থানিক বিভাজন বোঝার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। যদিও তত্ত্বটি মূলত বৃহৎ আধুনিক নগরাঞ্চলের ভৌগোলিক স্থানিক বিভাজন (Spatial Segregation) ব্যাখ্যার জন্য তৈরি হয়েছিল, কিন্তু গ্রামীণ বা আধা-গ্রামীণ জনপদে সামাজিক কাঠামোর বিবর্তন এবং গোষ্ঠীগত স্থানিক বৈষম্য বিশ্লেষণেও এটি চমৎকারভাবে প্রয়োগ করা যায়। Social Area Analysis-এর তিনটি প্রধান সামাজিক সূচকের (Social Dimensions) নিরিখে আমাদের পর্যবেক্ষণটি মিলিয়ে দেখা যেতে পারে -
১. অর্থনৈতিক শ্রেণি ও সামাজিক মর্যাদা (Social Rank / Economic Status) - সূত্রধরেদের আর্থিক সঞ্চয় ও গতিশীলতা বেশি। পথের ধারে বাণিজ্যিকভাবে সুবিধাজনক স্থানে আবাসন থাকায় এরা পর্যটন অর্থনীতি থেকেও লাভবান বেশি হয়। কাজেই অর্থনৈতিক মর্যাদা এদের তুলনামূলকভাবে উঁচু। উল্টোদিকে আমরা খুঁজতে না গেলে মুঢ়াদের ঘর দেখতেই পেতামনা। মুঢ়ারা মূল ছৌ নাচের শিল্পী হলেও এই দক্ষতার প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক মালিকানা এদের হাতে নেই। নাচের অর্ডার হবে কিনা তা সংগঠক বা দর্শকের যৌথ ইচ্ছের ওপরে নির্ভর করে।
২. নগরায়ন বা জীবনধারাগত বৈচিত্র্য - এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে সূত্রধরেরা সুবিধেজনক জায়গায় রয়েছে। মুঢ়াদের কিন্তু সুযোগ নেই সরাসরি নিজেকে পর্যটকের সামনে উপস্থিত করার।
৩. জাতিগত ও গোষ্ঠীগত স্বকীয়তা (Segregation / Ethnicity) - এইভাবেও যদি বিচার করি, তবে দেখবো, উৎপাদন ব্যবস্থা (মুখোশ তৈরি) এবং ব্যবহারের মাধ্যম (ছৌ নাচ)—এই দুইয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, উভয় গোষ্ঠীর জাতিগত আচার সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে তেলে জলে মিশ খায়নি।
কথাবার্তা বলে জানতে পারলাম যে, আদিবাসী সমাজের প্রভাবে পড়শি সমাজে মেয়েদের সম্মান বেড়েছে এ কথা সত্যি, কিন্তু তথাকথিত প্রোগ্রেসিভ সমাজের প্রভাবে আদিবাসী সমাজের ক্ষতি হয়েছে বেশি - বিশেষ করে মহিলাদের ওপরে কিছু বিরূপ প্রভাব পড়েছে। শিকার উৎসবে মেয়েদের অংশগ্রহণ চিরকালই বারণ ছিল তবে সমরশিক্ষা বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ বারণ ছিলনা। গ্রামের মানুষদের কাছে শুনলাম, বর্তমানে হুল উৎসব পালনের ঘটা বেড়েছে কিন্তু সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব-এর সঙ্গে উল্লেখ করা হচ্ছে না তাঁদের বোন অসীম সাহসিনী ফুলু, ঝুনুর কথা। এছাড়াও অনাদিবাসী সমাজের অনুকরণে কন্যাপণ-এর বদলে বরপণ, রুপোর বদলে সোনার গয়না - এইসব চালু হয়েছে। অরণ্য মাকে ভুলে অনাদিবাসীদের অনুকরণে গাছ বাঁধানো, গাছ কেটে মন্দির, মূর্তি, প্রণামী, ধর্মব্যবসা, পণ ও বিবাহ-ব্যবসা সবই বাড়ছে। যাই হোক এবার ছৌয়ের প্রসঙ্গে আসা যাক।
চড়িদাতে পথের ধারের মুখোশ বিপণিগুলিতে ছৌনাচের ঐতিহ্যবাহী মুখোশের সংখ্যা কম। বরং দেওয়াল সাজানোর মুখোশের সংখ্যা বেশি। কোনটি নাচের উপযোগী এবং কোনটি ঘরসজ্জার দেখেই বোঝা যায়, কারণ প্রকৃত মুখোশের দুটো চোখ আর নাকের জায়গায় গরম লোহার শিক দিয়ে ফুটো করা হয়, ওয়াল আর্টের জন্য তৈরি মুখোশগুলিতে ফুটো থাকেনা। দোকানে মানুষের মুখের আয়তনের মুখোশ কম, বরং ছোট ছোট মিনিয়েচার মুখোশে দোকান ভরা। জরি পুঁতির পরিবর্তে নিওন পেন্টের ব্যবহার অনেক বেশি। বজরংবলী থেকে স্পাইডারম্যান- সব চরিত্রই মিনিয়েচার ফর্মে হাজির। বোঝাই যাচ্ছে সব বয়সের ক্রেতার মনপসন্দ জিনিস বানাচ্ছেন মুখোশ শিল্পীরা। এমনকি কুঁড়েঘর, গাছ, গাছের নীচে পূর্ণাবয়ব রাধাকৃষ্ণ সবই আছে। অর্থাৎ শুধু নাচের অর্ডারের ওপরে মুখোশ শিল্পীরা বসে নেই। সারা বছরের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জিনিস বানানো তাঁরা করায়ত্ত করেছেন। নিওন পেন্টের কাজ বেশিদিন ভালো থাকে। উল্টো দিকে পুরোন হলেই জরি চুমকির চমক মরে যায়, খাঁজে খাঁজে ধুলো জমে বেশি। তাই ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলি ঘরে বেশিদিন ভালো রাখা মুশকিল হয়ে যায়।
আর একটা জিনিস খেয়াল করলাম মুখোশ ছোট হোক বা বড় আগুন দাম। কোনো জরি চুমকি ছাড়া সাদা রঙের ওপরে করা একটি দেড়ফুট উঁচু দুর্গা মূর্তির দাম সাতহাজার টাকা। আর ছৌনাচের মুখোশ চার হাজার টাকা থেকে শুরু - যত সাজ তত দাম বাড়ে পাল্লা দিয়ে। কুড়িবছর আগে যখন এসেছিলাম, মনে পড়ে বড় প্যাকিং বাক্স বোঝাই মুখোশ কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম সকলকে উপহার দেব বলে - মুখোশের দাম ছিল এতটাই কম। কিন্তু মুখোশের দাম এত বাড়ল কীকরে? শিল্পীরা বলছেন প্লাস্টিকের ফুল, পাতা, তার, চুমকি, পুঁতি এইসবই আসে কলকাতা থেকে। লকডাউনের পর সব উপকরণের দাম বেড়েছে লাগামছাড়া। তাছাড়া ২০১৮ সালে ছৌয়ের মুখোশ জি আই ট্যাগ পাওয়ার পরে আন্তর্জাতিক বাজার পেয়েছে। ঐ বাজারের চাহিদাও দেশীয় বাজারে মুখোশের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে মুখোশ শিল্প যেমন লকডাউনের ধাক্কা সরিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, মুখোশ শিল্পীরাও দুটো পয়সার মুখ দেখতে পেয়েছেন। পুরুলিয়ার বাইরে উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ আর ঝাড়খন্ডের সরাইকেল্লাতেও ছৌনাচ হয়। কিন্তু সেখানে এইধরণের মুখোশের তেমন চল আগে ছিলনা। এখন কিন্তু ঐ দলগুলোও চড়িদা থেকে এসে মুখোশ কিনছে এবং নাচে ব্যবহার করছে। কারণ নাচের জমক ঐ বিশাল তিন চার কেজি ওজনের ঝলমলে মুখোশগুলির ব্যবহারে অনেকটাই বেড়ে যায়। এটাও মুখোশের চাহিদা আর দাম বাড়ার কারণ।
তবে মুখোশ শিল্পের পৌষমাস আসতে চললেও কপাল পুড়েছে নৃত্যশিল্পীদের। এক একটি দলে পোষাকের পিছনেই কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। আগে পুরুলিয়ার গ্রামে গ্রামে দুই থেকে তিনটি করে নাচের দল থাকত। কিন্তু এখন কয়েকটি গ্রাম মিলিয়ে একটি করে নাচের দল থাকে। আবার শুধু ছৌনাচ নেচে পেট চলেনা। প্রত্যেককেই কিছু আলাদা কাজ করে গ্রাসাচ্ছাদন যোগাড় করতে হয়। কেউ করেন চাষাবাদ, কেউ করেন পশুপালন বা পর্যটকদের ড্রাইভারি। সেই কারণে ছৌ নৃত্যশিল্পে আজও পেশাদারিত্ব এলনা। পেশাদার শিল্পী থাকলে নাচেরও উন্নতি হত। যেমন হয়েছিল গম্ভীর সিং মুঢ়ার হাত ধরে। এখন কাহিনীতে নতুনত্ব আসছেনা, মুখোশ ছাড়া বাকি ধুতি ও গায়ের পোশাক মলিন। এক এক সেট পোষাকে বড়জোর তিরিশটি অনুষ্ঠান করা যায়, ছৌনাচের লাফঝাঁপ, ডিগবাজি দিতে দিতে এরপর পোষাকের সেটটি নষ্ট হয়ে যায়। আবার পুরো দলের জন্য কয়েক লাখটাকা খরচ। গাড়ির খরচ কমানোর জন্য অনেক সময়ে শিল্পীরা ছোট গাড়িতে মালপত্র বোঝাই করে বায়নার নাচ করতে যান। কিন্তু গাড়ি ওভারলোড হয়ে দুর্ঘটনা হয়েছে, ছৌশিল্পী মারা গেছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। লকডাউনের আগে ছৌনাচের যত বায়না হত সারাবছর, লকডাউনের পরে সেই পরিমাণ বায়না এখনও হচ্ছে না। কারণ সর্বস্তরের মানুষের হাতে টাকা কমে গেছে। তাছাড়া ছৌয়ের মুখোশ এখন অনলাইনেও কিছু বিক্রি হয়, কিন্তু নৃত্যের তো আর অনলাইন হয়না। একথা অস্বীকারের কোন উপায় নেই যে টাকা আর সচ্ছলতা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। টাকার অভাব, সুযোগ সুবিধের অভাব - সব মিলিয়ে ছৌশিল্পীদের আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়। অনেক জায়গাতেই মলিন পোষাকের আদিবাসী ছৌশিল্পী প্রাপ্য সম্মান পাননা, গ্ল্যামার জগতের আলো যা ত়াঁদের প্রাপ্য ছিল, তা কোনদিনও জোটেনা। অথচ ছৌনাচ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ, অ্যাকশন নির্ভর - এই নাচের লাইভ প্রদর্শনে দর্শক মাতোয়ারা হয়ে যায়।
এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমরা যখন গম্ভীর সিং মুঢ়ার বাড়ির আশেপাশে ছৌনাচ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি, তখন আমাদের তিনটে জীপের মধ্যে একজন চালক বললেন - আপনারা কি ছৌনাচ দেখবেন? শুনে তো আমরা লাফিয়ে উঠেছি। নাচ দেখা কি সম্ভব? ঐ চালক বললেন আমি নিজেই নাচি, আমাদের একটা দল আছে। ছেলেমেয়েদের উৎসাহ দেখে তাঁর চোখে এখন হাজার বাতির আলো। এবারে নাচ কবে কখন হতে পারে, খরচ কত - এসব জানতে চেয়ে ছেলেমেয়েরা যেই হৈ হৈ করে ওনাকে ঘিরে ধরেছে, ভদ্রলোক একটু থমকে গেলেন। আমি ওঁর চোখে চোখ রাখলাম, সে চোখে একটু আগের আলো নিভে গেছে, তার বদলে একটা কিসের দ্বিধা। এই দ্বিধা আমি আগেও দেখেছি বাঁকুড়ার বিকনা গ্রামে ডোকরা শিল্পীদের চোখে, দেখেছি বিষ্ণুপুরে, সোনামুখীতে বালুচরী বা অন্য সিল্ক শাড়ির তাঁতীর চোখে, পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে তসর বোনার তাঁতী পাড়ায় - এই দৃষ্টি আমার চেনা। বলব সবই, বলতে তো হবে। একবার কলেজে ন্যাশনাল লেভেল সেমিনারে প্রথিতযশা বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বাংলার লোকশিল্প নিয়ে নানা তত্ত্বকথা শোনালেন। ভালোই বললেন। আমি সেশন চেয়ার করছিলাম। কনক্লুডিং রিমার্কে বক্তার বক্তব্যের সপক্ষে কিছু উদাহরণ শোনালাম। শ্রোতারা বেশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। বক্তা অবাক হলেন, বোঝা গেল একটু বিরক্ত হয়েছেন। কী যে করি, মাঠের জল ঘাটের জল খাওয়া এই ভৌগোলিকেরা পুঁথি নির্ভর অ্যাকাডেমিয়ার গলার কাঁটা। ভূগোল মানে দেশ আর তার রাজধানী মুখস্থ - তার বেশি কী?
হীরেন সিংহরায় | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৩১742944
kk | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ২১:০০742946