

ছবি: রমিত
প্রাক কথন
জার্মান শিক্ষার ক্লাসে হাবুডুবু খাচ্ছি। সেটা আমার শিক্ষিকার নজর এড়ায়নি।
গোয়েথে ইনসটিটুটের জার্মান ক্লাসে অন্য ভাষায় কথা বলা নিষিদ্ধ; লাঞ্চ ব্রেকে ফ্রাউ ব্রিগিটে লেনহার্ড আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এবারের ক্লাসে আপনি একমাত্র ভারতীয়; খানিক সংস্কৃত শেখেননি স্কুলে? জার্মান আর সংস্কৃত তো একই ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর সদস্য!
কী করে বলি পণ্ডিত সারের ক্লাসে ফাঁকি দিয়েছি; তবু অসীম করুণায় তিনি ক্লাস নাইনের শেষ পরীক্ষায় ৩৬ নম্বর দিয়েছিলেন যেটি আমার হায়ার সেকেন্ডারির মার্কশিটে শোভা পায়। বরং তর্কবাগীশ বাঙালি সুলভ স্পর্ধায় বলেছিলাম, আমাদের স্কুলের সংস্কৃত চর্চা হয়তো ইউরোপীয় ছেলে মেয়েদের ল্যাটিন বিদ্যের মতন। সিলেবাসে থাকে, সেটা শেখার নয় শুধু পরীক্ষা পাসের ব্যাপার।
নর নরৌ নরাঃ-র বেশি মনে নেই। ঈশ্বর ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম, তাঁর সম্মান করিনি। এমনকি মাঝারি দরের সংস্কৃত ব্যাকরণটুকু মনে না রাখার শাস্তি জুটল এতদিন বাদে, ইজারলোনে এসে। জানি আজকাল আমাদের দেশে বিশেষ কেউ জার্মান পাড়া মাড়াতে চান না; হয়তো ফুটবলের কারণে স্প্যানিশ এবং কৃষ্টির কারণে ফরাসির চল বেশি। তবু বলে রাখি, যদি কারো জার্মান শেখার বিন্দুমাত্র বাসনা থেকে থাকে, সংস্কৃত ব্যাকরণ কাজটা অনেক সহজ করে দেয়; জার্মানে সমাসের ছড়াছড়ি, শব্দের তিনটি জেন্ডার, আপনি তুমি আছে, কারক বিভক্তির কাঁটা আছে। সন্ধি নেই কিন্তু চার পাঁচটা শব্দকে একসঙ্গে জুড়ে দেবার একটা অদম্য প্রবণতা আছে।
ব্রিগিটে লেনহার্ডকে বলা কথাটা বুমেরাঙের মতন ফিরে এলো বিশ বছর বাদে। ল্যাটিন ক্লাসে ফাঁকি দেবার কারণে হ্যাম্পস্টেডের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুলের প্রথম বছরে পুত্র ইন্দ্রনীলের শিক্ষক ডক্টর লুইস তাকে দিয়েছিলেন নিম্নতম গ্রেড - ই ১! শুধু তাই নয় ইন্দ্রনীলের ভুলগুলি ক্লাসের বালকদের সামনে পড়ে শুনিয়ে তাকে সাতিশয় লজ্জায় ফেলেছিলেন। শিক্ষক ও পিতা মাতাদের ত্রৈমাসিক মিটিঙে মাথা নিচু করে ডক্টর লুইসের কঠিন সমালোচনা শুনতে হয়েছিল। বাড়ি ফিরে ছেলেকে বকাবকির পরে সেই প্রথম ল্যাটিন শিক্ষার বইয়ের পাতা উলটে মনে হল ব্যাকরণ বিশেষ বুঝিনি কিন্তু ইংরেজির সূত্রে বেশ কিছু শব্দকে চেনা মনে হয়। রং চেহারা একটু অন্য রকমের কিন্তু পুরনো সেই গানের মতন, হম তুমসে মিল চুকে হ্যাঁয়, সুরত বদল বদলকে।
প্রসঙ্গত ইন্দ্রনীল শেষ পরীক্ষায় ল্যাটিনে উচ্চতম গ্রেড ই ৫ পেয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করে।
আরও পনেরো বছর বাদে কনিষ্ঠা কন্যা মায়া যখন তার স্কুলে খানিক ল্যাটিন চর্চা শুরু করে তাকে ইন্দ্রনীলের কাহিনী শুনিয়ে বললাম, তোমার শিক্ষকদের সামনে এহেন বিড়ম্বনায় ফেলো না! মায়া বললে, ডু নট প্যানিক। রোমানিয়ান জানি, সেটা ভালগার ল্যাটিনের ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়। ব্যাকরণ প্রায় এক। ভোক্যাব (শব্দ সম্ভার, ভোকাবুলারি) চেনা নিয়ে কথা।
জানলাম ল্যাটিন দ্বিবিধ, ভদ্র বা ক্লাসিকাল এবং ভালগার! ভুলগারিস বা কথ্য ভাষার নাম ভালগার ল্যাটিন, যা থেকে এসেছে আজকের বহুল প্রচলিত পাঁচটি ভাষা রোমানিয়ান, ইতালিয়ান, ফরাসি, পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ এবং স্বল্প খ্যাত দেড় ডজন যেমন সারদিনিয়ান, সিসিলিয়ান, স্পেনের কাতালান, সুইজারল্যান্ডের অন্যতম স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা রোমানশ, গ্যালিসিয়ান, লাদিন, দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রভাঁসাল। পাঁচ প্রধানকে একসঙ্গে বলা হয় রোমানস (ল্যাটিন রোমানিস থেকে, রোমান ঢঙে) ভাষাগোষ্ঠী। এই পাঁচটির মধ্যে রোমানিয়ান খুব কাছের, তারপরেই ইতালিয়ান। ফরাসি সবচেয়ে দূরের কিন্তু ল্যাটিন তাদের সকলের মাতা।
দু’হাজার বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়া প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলের পানে চেয়ে একদিন জুলিয়াস সিজার মিশরের রানি ক্লেওপাত্রাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন গ্রিক ভাষায়, ‘সে আ গা পো, তোমায় আমি ভালোবাসি’, ল্যাটিনে নয়। কোইনে গ্রিক ক্লেওপাত্রার প্রথম ভাষা এবং উচ্চ বর্গের রোমান সমাজ গ্রিকে আলাপ আলোচনা করতেন, এই যেমন আজকের শিক্ষিত বাঙালি পরস্পরের সঙ্গে বাংলা নয়, ইংরেজিতে বাক্যালাপ পছন্দ করেন; কেতা দুরুস্ত ইংরেজ যেমন কথার মাঝে সে লা ভি, আ লা কারত, গুরমে কুইজিন, ইত্যাদি ফরাসি শব্দ, বাক্যাংশ জুড়ে দিয়ে তৃপ্তি বোধ করে থাকেন, তেমনি আলেকজান্দারের তিনশো বছর পরেও রোমান রাজত্বে সভ্য ভদ্র মানুষের দার্শনিক আলোচনা, প্রেমের কথার লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ছিল ল্যাটিন নয়, গ্রিক। যদিও সেনেটে তর্ক বিতর্ক হতো ল্যাটিনে, সম্রাট অগাস্টাস তাঁর স্টেট অফ দি এম্পায়ার মেসেজ দিয়েছেন রাজোচিত গ্রিক ভাষায়। তা রাজা-রাজরা-সেনেটররা যা বলেন বলুন, সিজার বা মার্ক অ্যান্টনি গ্রিকে যতোই ভাব ভালোবাসা জাহির করুন, পুবে রোমানিয়া হতে পশ্চিমে পর্তুগাল, উত্তরে রাইন থেকে দক্ষিণে আজকের মরক্কো টিউনিসিয়া সহ ভূমধ্যসাগরীয় উপনিবেশের উলুখাগড়ার মতন সাধারণ মানুষ কাজ কারবার, পর নিন্দা পর চর্চা আলাপ আলোচনা করলেন হাটুরে ল্যাটিনে, যেটা তাঁরা শিখেছিলেন ইশকুলে নয়, রোমান পুলিস পেয়াদা, সেঞ্চুরিয়ানের মুখে। যেমনটা ইংরেজির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল প্রভুদের শ্রীমুখ নিঃসৃত বাক্যি থেকে, কানের ভিতর দিয়া তাহা পশিয়াছিল, কেতাবে পড়িয়া নহে।
ভি এস নাইপালের অ্যান এরিয়া অফ ডার্কনেস বইয়ের ফ্লাইট অফ ফ্যান্সি অধ্যায়টি মনে পড়ে। কাশ্মীরে ডাল লেকের শিকারা বাওয়া মানুষের মুখে ভুল গ্রামারে স্বচ্ছন্দ ব্রিটিশ/আমেরিকান ইংরেজি উচ্চারণ শুনে তিনি অবাক হয়েছেন, বলেছেন সেই অ্যাকসেন্ট এসেছে তাদের ওরাল/ভারবাল মেমরি থেকে। সেই পাল্লা বওয়া মানুষ ইংরেজি শিখেছেন বই পড়ে বা স্কুলে নয়, ব্রিটিশ, আমেরিকান টুরিস্টের বচন কানে শুনে।
রোমান সাম্রাজ্যে শিক্ষা ব্যাপারটা ছিল প্রাইভেটাইজড। আপামর জনগণকে অক্ষর পরিচয় করানো, লেখাপড়া শেখানোর জন্য কোনো প্রাইমারি বা সেকেন্ডারি বোর্ড অফ এডুকেশন বা নিট পরীক্ষা নেবার ব্যবস্থা ছিল না, সেই খাতে কোন সরকারি অর্থব্যয় করা হতো না। রিপাবলিকের অন্ত হলে সম্রাটরা একদিন বুঝলেন রোমান বর্জিত গঞ্জে গাঁয়ে রাজকার্য চালানোর জন্য কেবলমাত্র এক্সপ্যাট্রিয়েট ভাতা বেতন, ভিলা আর চাকরের লোভ দেখালেই যোগ্য লোক মেলে না, চাই স্থানীয় মানুষ (যেমন আমাদের সেই আই এ এস প্রথা)। তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার ট্রেনিং ইন্সটিটিউট খোলা হলে সরকার তাদের কর মকুব করলেন, সে মাত্র সামান্য কিছু মানুষের জন্য। রাজ্যের ছুতোর মুচি জেলে মুদির জন্যে ল্যাটিনের বর্ণ পরিচয়, সহজ পাঠ লেখা হয়নি। প্রজারা যেখানে যেমন খুশি ওই কানে শোনা প্রভুর ভাষা আউড়ে কাজ চালালেন। কলকাতার চিনে বাজারে জুতোর দোকানদার একদিন বলেছেন, সায়েব টেক টেক, নো টেক নো টেক, একবার তো সি! নিউ আমস্টারডামের, আজকের নিউ ইয়র্কের, পথে ডাচ তাঁর আপন জুবানে জানতে চাইলেন, কি ব্যাপার? হো কম? তা থেকে আমেরিকান ইংরেজিতে এলো বহুল প্রচলিত হাউ কাম।
একদিন রোমান সাম্রাজ্যের পতন হলো, অশিক্ষিত গুন্ডা বদমাইশরা রোমের তখত লন্ড ভণ্ড করল, অরাজকতার চূড়ান্ত। ক্রমশ চর্চার অভাবে দাঁড়ি কমা ফুল স্টপ বিহীন একটানা বড়ো অক্ষরে লেখা উচ্চাঙ্গের ল্যাটিন নির্বাসিত হলো বাঁধানো কেতাবে, গিরজেয়, ভ্যাটিকানে পুরুতের পুঁথিতে। ভাষার বিধান দেবার জন্য কোন অক্সফোর্ড ডন বা শান্তিপুরী পণ্ডিত ছিলেন না, কোন কেন্দ্রীয় কমিটি তো নয়ই। ভালগার ল্যাটিনের মৌখিক রূপ ইউরোপের যেখানে যেমন পারলো পাড়ার রক পথ ঘাট বন্দর বাজার দখল করে নিলো, ভৌগোলিক কারণে একে অপর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ব্যাকরণ থেকে গেলো একটা অপশনাল বোঝা। পর্তুগিজ স্প্যানিশ ফরাসি ইতালিয়ান মানল মূল ব্যাকরণ, শব্দের নারী পুরুষের স্বতন্ত্র পরিচিতি কিন্তু বাহুল্যবোধে বর্জন করলো কর্তা কর্ম করণ অপাদান সুলভ কারকের উৎপাত। রোমানিয়ান, সারদিনিয়ান সেটিকে ধরে রাখল।
কয়েকশ বছর বাদে কালিদাসের দুশ্মন্ত শকুন্তলাকে দেব ভাষায় সম্বোধন করলেন ‘হে শকুন্তলে’। পাণিনির ‘সংস্কৃত’ ভাষার অনেক নিয়ম কানুনকে অবহেলা করে কালিদাস যা লিখলেন সেখানে মহর্ষি কণ্ব, মারীচ রাজা দুশ্মন্ত, রাজা রানি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় সেই দেবভাষায় কথা বলেন। কিন্তু শকুন্তলার সখী সহ অন্দর মহলের দাস দাসী, হাট বাজারের দোকানি বলেন প্রাকৃত। অনসূয়া প্রিয়ম্বদা তাদের সখীকে ডাকলেন ‘হলা শকুন্তলা’ অথবা হলা সাউন্তলা বলে। এঁদের জন্য কালিদাস মেঘদূত লেখেননি। তাঁর পাঠক পাঠিকে উচ্চবর্ণের মানুষ, তাঁরা সংস্কৃত জানেন, প্রাকৃত বুলি একটু কষ্ট করে হলেও বুঝে নিতে পারতেন। উল্টোটা প্রশ্নাতীত, নিচের তলার মানুষদের সংস্কৃত শেখার অধিকার অবধি ছিলো না। কালে কালে সেই শুদ্ধ পবিত্র দেবতার ভাষা সংস্কৃত থেকে গেল পণ্ডিতের, পুরুতের মুখে, পুঁথিতে। হাটে বাজারে বাড়ল মৈথিলী বাংলা হিন্দি ভোজপুরি! সেই মুখের বুলি একদিন আমাদের ভাষা হলো, গান হলো, চর্যা পদ মঙ্গল কাব্য হলো, রবীন্দ্রনাথের কবিতা হলো।
একই ইতিহাস।
তারপর একদিন ইউরোপের সভ্য সমাজের বৈঠক খানায় শোভা পেলো ভালগার ল্যাটিনের দূরতম কন্যা, ফরাসি। ইউরোপের জার্মান, চেক, পোলিশ চাষা বলে তাদের বুলি। ফরাসি বলেন উচ্চ বর্গের মানুষ। ফ্রাঙ্কফুর্টে আমার বস ইওয়াখিম ফন ভাঙ্গেনহাইম গল্প করেছিলেন, তাঁর এক ঊর্ধ্বতন পুরুষ, ভাইমারের কাছাকাছি ভাঙ্গেনহাইম জমিদারির মালিক, একদিন প্রাশিয়ান সম্রাট ফ্রিডরিখের সঙ্গে বাক্যালাপ করেছেন, জার্মানে নয় ফরাসিতে, যদিও দুজনেরই মাতৃভাষা জার্মান।
এখনো ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রস্তাবিত নতুন আইন অনুমোদনের সময়ে দেশের রাজা/রানি বলেন না, ইয়েস, আই অ্যাপ্রুভ; বলেন উই, ল্য রোয়া/ল্য রেইন ল্য ভয়লত (হ্যাঁ, রাজা/রানি এমত ইচ্ছা করেন)। ইউরোপের প্রায় সব পাসপোর্টে সে দেশের ভাষার পরেই দ্বিতীয় স্থানটি ফরাসির।
উঁচু নিচু শ্রেণির দুই ভাষার টানা পোড়েনের একটি বিচিত্র ডকুমেন্ট টলস্টয়ের ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ উপন্যাস। উনবিংশ শতাব্দীতে সেন্ট পিটারসবুর্গের এলিট সম্প্রদায়ের পিয়ের বজুকভ, নাতাশা রোসটোভা, প্রিন্স বলকনসকি নিজেদের মধ্যে ফরাসি বলেন কারণ সেটাই সামাজিক কেতা; অথচ সেই সব পরিশীলিত সংলাপ বাদে বাকি বইটি রাশিয়ানে লেখা। এই দুটো ভাষা যারা জানেন না তাঁদের জন্য টলস্টয় যুদ্ধ ও শান্তি (ভায়না ই মির) উপন্যাস লেখেননি। ওয়ার অ্যান্ড পীসের ইংরেজি অনুবাদক পাঠককে অবশ্য এই সঙ্কটে ফেলেননি, পুরোটাই ইংরেজিতে পড়া যায়। তার দ্বিভাষিক চেহারাটি আমাদের অচেনা থাকে।
একই রচনায় সংক্ষিপ্ত ভাবে দ্বিভাষিক প্রয়োগের নমুনা আমাদের হাতের কাছেই আছে। দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশী নাটকে নিমচাঁদ দত্ত থেকে থেকে মোক্ষম ইংরেজি নাটক এবং কবিতার লাইন আওড়ান; একটি দৃশ্যে ইংরেজ সার্জেন বাদে অন্য কোন চরিত্র নিমে দত্তের ইংরেজি বক্তিমে বুঝে ওঠেন বলে মনে হয় না; যেমন দরওয়ান অযোধ্যা সিংকে বলছেন So sweet was never so fatal. I must weep! But they are cruel tears *
তার প্রসঙ্গ বা অর্থ বোঝেন দীনবন্ধু মিত্রের কতিপয় পাঠক ও সম্ভবত নাটকের কিছু দর্শক।
প্রসঙ্গত, জানালা হইতে বোতল ইত্যাদি বস্তু বাহিরে নিক্ষেপ করিবেন না এই সতর্কতাবাণী এককালে পূর্ব জার্মানির ট্রেনে চারটে ভাষায় লেখা দেখেছি – জার্মান, রাশিয়ান, ফরাসি এবং ইতালিয়ান, যে যেটা খুশি বুঝে নিন। ইংরেজি অবশ্য সেখানে বাদ, সেটি অবক্ষয়ী মার্কিন পুঁজিবাদীদের ভাষা।
বাংলা লেখার মধ্যে অন্য ভাষার কোন মন্তব্য বা উদ্ধৃতি থাকলে হয় ব্র্যাকেটে নয়, পাদটীকায় তার তর্জমা দেওয়ার রীতি চালু হয়েছে অনেকদিন। টলস্টয়ের মতন আজকের লেখক ধরে নেন না যে তাঁর পাঠক বাংলার সঙ্গে আরও চারটে ভাষাও জানবেন।
বাংলা লেখায় বিদেশি শব্দের ব্যবহারে আমার গুরু মুজতবা আলী নিঃসন্দেহে পথ প্রদর্শক; আলী সায়েব তাঁর লেখায় আরবি, ফারসি, জার্মান, ফরাসি নজম, শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং তৎক্ষণাৎ তার সুরম্য শোভন অনুবাদ পেশ করেছেন। সেই সুযোগে আমাদের, পাঠকের, কিছু নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়।
প্রসঙ্গ ল্যাটিন
গ্রিকরা কত অজানারের সঙ্গে মোকাবিলার মানসে গিয়েছিলেন প্রথমত পুবে এশিয়া মাইনর ( তুরস্ক) হয়ে ভারতের পশ্চিম প্রান্ত অবধি; ফেরার পথে মিশর ইজরায়েলে ঢুঁ মেরেছেন। রোমানরা কম্পাসের কাঁটা ঘুরিয়ে গেলেন রোমের পশ্চিমে, দক্ষিণে। বহু বছর নানা অসভ্য বর্বর জাতির ওপরে প্রথমে তরবারি পরে ছড়ি ঘোরালেন; বানালেন পাকা রাস্তা, জলের এবং পথের ওপরে অজস্র সেতু, দূরান্তর হতে জল বয়ে আনার খোলা পাথরের প্রণালী, প্রাসাদ, চত্বর, ফোরাম। দিলেন ইউরোপের প্রথম লিখিত আইনের শাসন, শিল্প, আর্ট, স্থাপত্য যার অনেকটা আজও আছে বহাল তবিয়তে। রোমান রথের, পথের প্রস্থের মাপে একদিন চলেছে স্বতশ্চলশকট।
তারপর একদিন উত্তর থেকে আগত গুন্ডা বদমাইশের দৌরাত্ম্যে রাজপাট বিপন্ন হলে তাঁরা ভাবলেন অসভ্য বর্বরদের অনেক শিখিয়েছি, আমাদের কাজ শেষ, এবার প্রজারা নিজের পথ নিজেই দেখুক (বাবা বিরক্ত হয়ে বলতেন, এবারে বুঝে কর গে), এই বলে ক্লান্ত রোমানরা তাঁদের রথ (কুরুস) থেকে নেমে ঝকমকে টোগা খুলে ফেলে বেশ বদল করে স্নানগৃহে বসলেন, পাস্তা পিতসা বানানোয় মন দিলেন, শ্বেত বা রক্তিম মদ্যের পেয়ালায় খুঁজলেন গুড লাইফ, লা দলচে ভিতা।
প্রায় তিন হাজার বছর আগে রোমুলাস রোম শহরের পত্তনের সঙ্গে সেখানকার আদিবাসী লাটিনি উপজাতির যে ভাষাকে গ্রহণ করলেন, তার নাম লাটিন। রাজ্য ও সভ্যতা বিস্তারের সাথে রোমানরা প্রায় গোটা ইউরোপকে দিয়ে গেলেন তার প্রথম সার্বজনীন বর্ণমালা (২৩টি বর্ণ) এবং ভাষা, ল্যাটিন (কিছু ইউরোপীয় ভাষা তার ওপরে খোদকারি করে অনেক বর্ণ জুড়েছে, যেমন চেকের আছে ৪২ হাঙ্গেরিয়ানের ৪৪ – কিন্তু বর্ণমালার রুট ল্যাটিন)।
কোনো কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানের অভাবে যতিবিহীন একটানা লেখা ক্লাসিকাল চেহারা একদিন হারিয়ে গেল কিন্তু তার মেঠো সুরটি রয়ে গেল পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে; বিজয়ী রোমান সেনার সঙ্গে খাল বা চ্যানেল পেরিয়ে একদিন পৌঁছুল ইংল্যান্ড নামক একটি ছোট দ্বীপে, যার আদি ভাষা কেলটিক। রোমানরা দেশটা দখল করে যখন আপন ভাষায় রাজকার্য চালালেন তার কতোটা আম জনতা বুঝত কে জানে। তবে ইতিহাস বলে রোমানদের উপদ্রবে অনেক মানুষ তাদের মুখের ভাষাটি নিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডে বাসা বাঁধেন (যেমন ফ্রান্সের ব্রিটানি)। তারপরে খাল পেরিয়ে যে স্যাক্সন জাতি সে দ্বীপে এলেন তাঁদের মুখের ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয়, আজকের ইংরেজির প্রথম প্রকাশ; সেটি প্রাচীন জার্মানের দৌহিত্রী, সহজ সরল ফোনেটিক, আপনি তুমির চলন ছিল। কয়েকশ বছর বাদে উত্তর থেকে এলো ভাইকিং। ষাণ্মাসিক বা বার্ষিক লুট পাট, তোলাবাজির শেষে দ্যাশে না ফিরে বেশ কিছু মানুষ রয়ে গেলেন, বিয়ে শাদি করে সংসার পাতলেন,এমনকি আইন বানালেন (ডেন ল বা ডেনিশ ল আজও মান্য হয়)। তাঁদের রাজা ছিলেন ক্যানিউট, আসলে Knut কিন্তু সে উচ্চারণ শিবের এবং ইংরেজের অসাধ্য। তাঁরা দিয়ে গেলেন অনেক মনোসিলেবিক শব্দ – এগ, হ্যাম, নাইফ, স্কাই, ডাই, কল, লিফট, সর্বনাম দে, দেম, কিছু ক্রিয়াপদ যেমন গেট, টেক।
বখতিয়ার খিলজি সপ্তদশ অশ্বারোহীর বলে বঙ্গ বিজয় করেছিলেন কিনা সেটি বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু মাত্র দশ হাজার সৈন্য নিয়ে গিওম (উইলিয়াম) চ্যানেল পেরিয়ে হেসটিংসের যুদ্ধ জিতে যে ইংল্যান্ড দখল করেছিলেন সেটি ঐতিহাসিক সত্য। এই সৈন্যবলে উইলিয়াম দেশটা কেবল কবজা করলেন না, নতুন উপনিবেশের কুড়ি লক্ষ প্রজার মুখের ভাষা অনেকটাই বদলে দিলেন। আজকের ইংরেজিতে পাওয়া যায় বিজয়ী নরমানদের ওল্ড ফ্রেঞ্চ (অন্তত পঁচিশ শতাংশ, যেমন ম্যানসন, বিউটি, মাটন, জাজ, জুরি, প্রেয়ার; ইংরেজের মুখে ঝামা ঘষে দেবার জন্য বোধহয় ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাকরোঁ এটি মনে করিয়ে দিলেন গত সপ্তাহে -সেপ্টেম্বর,২০২৬- ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দেওয়া বক্তৃতায়), জার্মানিক ওল্ড ইংলিশ প্রায় সমতুল (হ্যান্ড, ফিট, ফ্রেন্ড, হাউস, হেয়ার, আর্ম, গ্লাস, গ্রাস ইত্যাদি দৈনিক ব্যবহৃত সকল মনো সিলেবিক শব্দ, কেবল বানান আলাদা) কিছু গ্রিক এবং প্রায় তিরিশ শতাংশ সরাসরি ল্যাটিন শব্দ যার সঙ্গে তদ্ভব ওল্ড ফ্রেঞ্চ জুড়লে ইংরেজিতে ল্যাটিন মূলের শব্দসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সত্তর শতাংশে।
মায়ার এক বান্ধবী লোরেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ভয়ানক কঠিন সব কাজ করে; বেশ কিছুকাল আগে তার কাছেই জেনেছিলাম কোনো শেক্সপিরিয়ান নাটকের একাধিক ম্যানুস্ক্রিপ্ট পাওয়া যায়– প্লে হাউস বা নাট্যশালায় অভিনয়ের সময়ে কখনো স্মৃতি প্রবঞ্চনা করেছে, কখনো তাদের টেক্সট বদলে গেছে। সেই সব টেক্সটের নাম কোয়ারতো। স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যাপক সুশীল মুখার্জি যে জুলিয়াস সিজার পড়িয়েছিলেন সেটি নানান পাণ্ডুলিপি থেকে সর্বজনগ্রাহ্য একটি ফরম্যাট, কোনমতেই একক বা ইউনিক নয়।
উদাহরণ হিসেবে লোরেন বলে, হ্যামলেটের বিখ্যাত সলিলকি, টু বি অর নট টু বি; তার একটিকে বলা হয় ব্যাড কোয়ারতো, সেখানে চরিত্রের নাম এমনকি সংলাপ বদলে গেছে **। লরেন সকৌতুকে বলেছিল, আমরা চেনার চেষ্টা করি না বলে জানি না যে ইংরেজির ভাঁড়ার ঘর ভরে আছে ল্যাটিনে যা শুধু ওল্ড ফ্রেঞ্চ নয়, এসেছে আরও অনেক কায়া ধরে- রোমান রাজা, তার পেয়াদা, সেঞ্চুরিয়ন, নরমান সেপাই, ক্যাথলিক পুরুত, বাইবেল, চার্চের রকমারি পূজা অর্চনা থেকেও। তার গ্রামার আলাদা, উচ্চারণ ইংরেজির দশ ক্রোশ দূরের তবে সেই সব শব্দের এজমালি ব্যবহারের কারণে ইতালিয়ান ফরাসি ইত্যাদির পরে ইংরেজিকে স্বচ্ছন্দে দ্বিতীয় শ্রেণির রোমানস ভাষার আখ্যা দেওয়া যায়।
রোমানস ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস টু?
চমকাতে হয়েছিল! বরানগরে সুনীলদার ক্লাসে বসে জেনেছি বাংলা ভাষার সকল শব্দের উৎস চারটি – তৎসম, তদ্ভব, দেশী ও বিদেশি, যেখানে তৎ অর্থ সংস্কৃত। তাহলে কি ইংরেজির অনেক শব্দের ক্ষেত্রেও একই থিওরি খাটে, ল্যাটিনসম বা ল্যাটিন হতে উদ্ভূত, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে চোরাই শব্দ (যেমন জঙ্গল, ভেরানডা, লুট, পাঞ্চ, শ্যাম্পু) যার ভদ্র নাম লোন ওয়ার্ডস?
অর্থনীতি পড়েছি। চার দশক অর্থের কারবার করেছি কিন্তু ভাষাতত্ত্ব রয়ে গেছে আমার হবি। তা নিয়ে পড়াশোনা করিনি বটে কিন্তু আর্মচেয়ার ফিলোলজিস্ট হওয়া থেকে আমাকে ঠেকায় কে? তাই শুধু কানে শুনে চোখে দেখে অল্প বিদ্যাকে ভয়ঙ্কররূপে প্রয়োগ করে চলেছি আমার আজকের অখণ্ড অবসরে।
লোরেনের উসকানিতে ছেলে মেয়ের ঘর থেকে ধূলি ধূসরিত কিছু ল্যাটিন শিক্ষার বই উদ্ধার করে তার পাতা ওলটানোর আগ্রহ জেগে উঠছিল অনিবার্য ভাবেই।
অশিক্ষিত কৌতূহলে কেবলই জানতে চাই এটা কেন ওটা কী। উত্তর অনেক দূরের কথা, হয়তো সব প্রশ্নই জানি না। অতএব পাঠক নিঃশঙ্ক থাকুন। এ কোন পণ্ডিতি আখড়া নয়, ল্যাটিনের ক্লাস নয়, অলস বেলায় এক অর্বাচীনের অ্যামেচার শব্দজব্দ অথবা বর্ণমালার লুকোচুরি খেলা।
পথে ঘাটে
তাঁদের রাজত্বকালে রোমানরা কুল্লে পঞ্চাশ হাজার মাইল রাস্তা বানিয়েছিলেন, যার বেশির ভাগ শক্ত পোক্ত, পাথুরে, তাতে কখনো গাড্ডা ছিল না আজও নেই। গত বছর রিমিনিতে দেখে এলাম দু’হাজার বছর আগে সম্রাট অগাস্টাসের আমলের রাস্তা করসো আগুসতো, তিবেরিউস সেতু – প্রায় তেমনই নিখুঁত যেমনটি সম্রাট উদ্বোধনের দিনে দেখেছিলেন। রোমানরা দিয়ে গেলেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ( ইনফ্রা – তলায়, স্ত্রুকটুরা- ব্যবস্থা, গঠন ) জল চালানোর বা বইয়ে দেবার আকুয়াডাকট ( আকুয়া – জল, ডুকেরে -পরিচালনা ), ওভারব্রিজ বা ভিয়াডাকট ( পথ- ভিয়া তার ওপরে চালিত পথ ), শান বাঁধানো চত্বর ফোরাম, কনকোর্স, কনডুইট (কনডুকেরে থেকে, একত্র নিয়ে আসা) স্যানিটেশন (স্বাস্থ্য – সানিটাস, থেকে)।

রিমিনির ফোরামে দাঁড়িয়ে জুলিয়াস সিজার বললেন, রুবিকন পেরিয়ে সিজার তাঁর সৈন্যদের নিয়ে এইখানে এই ফোরামে দাঁড়িয়ে গৃহযুদ্ধের সূচনা করলেন
CAESAR DICT RUBICONE SV PERATO CIVILI BEL COMMILIT SVOS HIC IN FORD
যতিবিহীন ক্লাসিকাল ল্যাটিন লেখা
ভালগার ল্যাটিন ক্রিয়াপদ ট্রাগিনারে মানে টানা, তা থেকে এসেছে ট্রেন। রাজা রানিরা এমন লম্বা ড্রেস পরতেন তার পেছনের অংশটা ধুলো ঝেঁটিয়ে চলত বলে তার নাম ট্রেন ( যেমন ট্রেন অফ এ ড্রেস)। একটার পিছনে একটা কিছু চলতে থাকলে সেটা ট্রেন - যেমন খচ্চরের সারিকে বলে ট্রেন অফ মিউল, তেমনই ট্রেন অফ থট, তারও অনেক পরে যখন কু ঝিক ঝিক ইঞ্জিন কিছু টানতে থাকল তার নাম হল ট্রেন।
জায়গা জমি জরিপের রোমান দেবতার নাম টেরমিনিউস; বাড়ি তৈরির সময় তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ বরাবর এবং কোণায় সেই দেবতার নাম লিখে পাথর বসানো হতো, সেটাই বাড়ির সীমানা। অতএব কোনো রথ গাড়ি বা ট্রেন যেখানে গিয়ে থামে সেটি তার সরহদ। অতএব এটি টেরমিনিউস, ইংরেজি উচ্চারণে টারমিনাস, বহু বচনে টারমিনি ( যেমন রোমের সদর স্টেশন রোমা টারমিনি )। যে রোগে আক্রান্ত হলে জীবন মরণের সীমানা নির্ধারিত হয়ে যায় তাকে বলে টারমিনাল ব্যাধি।
সরকারে, রাজদ্বারে
রোমানরা শৌখিন মানুষ, কেতা দুরুস্ত পোশাক আসাক পরতেন। নির্বাচনী প্রচারের সময়ে পথচলতি জনতার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সেনেটররা তাঁদের পরনের টোগার ওপরে সাদা চক খড়ি ঘষে তাকে আরও চকমকে করে তুলতেন, তাকে বলা হতো কানডিডুস, ঝলমলে সাদা ( আমাদের বাল্যকালে টিনোপালের বিজ্ঞাপন মনে পড়ে – ঝকঝকে সাদা, দুধের মতো সাদা -টিনোপাল ) যারা পরতেন তাঁদের বলা হতো কানডিডাটেস যা থেকে আমরা পেলাম আজকের ক্যানডিডেট, স্বচ্ছতা অর্থে ক্যানডিড।
সেনেটে জরুরি বিষয়ে ভোটাভুটি হচ্ছে কিন্তু কোনো সেনেটর সেখানে গরহাজির, তখন তাঁর খোঁজ পড়ে যেতো। রাস্তায় তাঁর দর্শন পেলে কর্তব্যে অবহেলা হেতু অপমানিত করার জন্য পেয়াদা তাঁর গায়ে দড়ি জড়িয়ে দিতো, যা থেকে আমরা পেয়েছি রোপ সাম ওয়ান ইন। এটি আজকের পরিভাষায় হুইপ, মানে লোকসভা বা বিধানসভায় সত্বর হাজিরা দেবার নির্দেশ।
সেনেটে বিল পাস হতো মেজরিটি ভোটে কিন্তু রোমান কনসালদের ছিল একটি বিশেষ অধিকার তাঁরা আপত্তি জানালে সে বিল নাকচ। নিষেধ করার ল্যাটিন ক্রিয়া পদ ভেটারে (vetare), প্রথম পুরুষে তার ক্রিয়ারূপ ভেটো। কনসাল যখন বলতেন veto (আমি আপত্তি জানাচ্ছি - ল্যাটিনে আমি বাহুল্য ), সেই বিল আটকে যেতো।
শুনতে এক রকম হলেও ভোট এবং ভেটো সম্পূর্ণ অনাত্মীয় শব্দ – ল্যাটিনে সুফরাগিউম ফেরো মানে আমি ভোট দিচ্ছি।
সেনেটে বিলের ওপরে আলোচনার সময়ে প্রত্যেককে দাঁড়িয়ে জানাতে হতো তিনি কার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিচ্ছেন, সিক্রেট ব্যালটের স্থান ছিল না – তাই বলা হয়ে থাকে স্ট্যানড আপ অ্যান্ড বি কাউনটেড, হোয়ের ডু ইউ স্ট্যানড। হাউস অফ কমনস টিভিতে দেখা যায় কারো বক্তিমে শেষ হলেই কয়েক জন মেম্বার অফ পার্লামেন্ট প্রায় একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, তাঁরা কিছু বলতে চান।
রোমে বিচারকদের ক্ষমতা ছিল অবাধ (ব্রিটেনের নতুন অধীশ্বর নরমানরা জুরি প্রথা চালু করেন মাত্র ১৩শ শতাব্দীতে), কখনো আদালত ছিল সচল, মোবাইল। বিচারক হেঁটে বেড়াতেন শহরে, অভিযোগ শুনতেন, রায় দিতেন তৎক্ষণাৎ, এমনকি মৃত্যুদণ্ড। বিচারকের মুহুরিরা তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতেন লাল দড়ি দিয়ে বাঁধা একগোছা লাঠি বা ছড়ি এবং একটি কুড়ুল নিয়ে, তাকে বলা হতো ফাসিস (fasces)। বিচারকের আদেশ অনুযায়ী সেই দড়ি খুলে নিয়ে কাউকে লাঠিপেটা করা হতো, কারো মাথাটি পড়তো কাটা। আইনি কাগজে এই সিম্বল এখনো সমান প্রচলিত।

রোমান ফাসিস
দু’হাজার বছর বাদে ইউরোপে এক নেতার নতুন দলের প্রতীক হলো ফাসিস, দলের নাম ফাসিস্ট। নেতার নাম বেনিতো মুসোলিনি।

মুসোলিনির পার্টি প্রতীক
আদালতের ভেতরে একদিকে বিচারক বসেন, উকিলরা পক্ষে বিপক্ষে তর্ক বিতর্ক করেন। অন্যদিকে বসেন দর্শক, তাঁদের মাঝে একটি ঝরোখা, পাথরের স্ক্রিন, রেলিং - কানকেলি (Canceli)। এই কানকেলি বরাবর, ঠিক মাঝখানে বসতেন একজন- এই মধ্যমণি দু পক্ষেই নজর রেখে পুরো ব্যাপারটার বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকতেন। কালে কালে এই পজিশনে বসা সর্বজ্ঞ মানুষটির ভূমিকা রাজ দরবারে জরুরি বিবেচিত হলো, রাজা তাকে বিশেষ মান্যতা দিলেন, চ্যানসেলর নামে তিনি একদিন আখ্যাত হলেন, জারমানে কানতসেলার। কানকেলির সৌজন্যে আদালতে আমরা পাই কাউনসেল (পুরনো বাংলায় কৌঁসুলি ), ভালো উপদেশকে বলি গুড কাউনসিল, পৌরসভা কাউন্সিল হাউস, টাউন কাউনসিল, সেখানে বসেন কাউনসিলর।
রোমের রাস্তায় পুলিসের চেয়ে চোর বেশি; পেছন থেকে এসে সে আপনাকে জাপটে ধরে সর্বস্ব অপহরণের চেষ্টা করতে পারে। এ থেকে বাঁচার উপায় কী? পরুন একটি আলখাল্লা (cape) যার কোন বোতাম নেই, পিছন বা পাশ থেকে টান পড়লেই বুঝবেন চোরের পাল্লায় পড়েছেন, তৎক্ষণাৎ মাথা টপকে আলখাল্লাটি ত্যাগ (ex) করে দৌড়ুতে থাকুন। টাকা রইল আপনার ট্যাঁকে, চোরের হাতে রইল সেই কেপ, আপনি করলেন Escape (ex, cape)।
রোল করা বা গুটিয়ে নেওয়ার ল্যাটিন ক্রিয়াপদ ভোলভারে (যা থেকে এসেছে আজকের ভোলভো গাড়ির নাম- এরা প্রথমে গাড়ি নয়, বল বেয়ারিং বানাতেন, যেটি রোল করে, গড়িয়ে যায়) – সে আমলের দফতরি একটি পুঁথিকে রোল করে ফিতে দিয়ে বাঁধতেন। ভোলভারে থেকে তার নাম হলো ভলিউম, প্রথম পুঁথির নম্বর ভলিউম এক, দুই ইত্যাদি।
আজকে ভলিউমের আরেক অর্থ, শব্দের মাত্রা, ডেসিবেল। সেটাও এসেছে ভোলভারে থেকে। সেই যে সব ভলিউমকে প্যাক করা হতো বাকসোয় তাদের কোনোটা বড়ো কোনোটা ছোটো, বড়ো বাকসো খোলার সময়ে দফতরিকে অনেকক্ষণ বাগ্মিতা করে জানাতে হতো সেখানে কী কী আছে, কখনো তার স্বর উঁচুতেও উঠতো, তা থেকে আমরা পেলাম শব্দব্রহ্ম - ভলিউম।
অর্থমনর্থ
শনির কন্যা, দেবরাজ জুপিটারের পত্নী জুনো রোমের রক্ষা করেন, রোমানদের সুপরামর্শ দেন। গল জাতির আক্রমণ থেকে বাঁচার পর কৃতজ্ঞ রোম তাঁর সম্মানে যে মন্দির বানায় তার নাম হল জুনো মোনেতা (পরামর্শদাত্রী জুনো)- মোনেতা -মুদ্রা - থেকে আমরা পেলাম মানি, মনিটর। মন্দিরের পাশেই স্থাপিত হল প্রথম টাঁকশাল যাকে আমরা বলি মিন্ট।
কাগজের মূল্যহীন টাকা নয়, রোমান মুদ্রা ধাতুর, মূলত রূপো। নরম ধাতুর ওপরে রাজার মুখ এবং মুদ্রার মূল্য নির্দেশ জ্ঞাপক একটি কীলকের (ল্যাটিন cuneus) ছাপ পড়তো সেই কুনেউস থেকে আমরা পেয়েছি কয়েন, কারেন্সি।
Caput/capita অর্থ মাথা, পাড়া মহল্লা দেশের প্রদেশের মাথা, তাঁকে কয়েন এবং কারেন্সি যে শক্তি দেয় তার নাম ক্যাপিটাল।
Capsa (কাপসা) মানে বাকসো, তা থেকে পাই জিনিস আনা নেওয়ার কেস (case) যেমন সুটকেস, ব্রিফিং বা কাগজপত্রের ব্রিফকেস, খুব ছোট বাকসোকে বলে কাপসুল, কিছুর মধ্যে ভরে ফেলা এনকেস, বাড়িকে বলি কাসা, যেখানে চোরা গোপ্তা জুয়ো চলে তার নাম কাসিনো।
কাপসার মধ্যে যেটি সবচেয়ে জরুরি, আপনার অর্থ – সেই ক্যাশ কথাটি এসেছে কাপসা থেকেই!
কাপেরে (capere) অর্থ নিরাপত্তার জন্য কাপসার ভেতরে কিছু ভরে রাখা, তা থেকে এসেছে ক্যাপচার, ক্যাপটিভ।
আমাদের মৃত্যুর দেবতা যমরাজ, রোমানদের দেবী মরতা (Morta), ফরাসিতে মরত, আমাদের মৃত্যু। যে ঋণের সীমা কারো মৃত্যু অবধি আবদ্ধ, তার নাম মর্টগেজ। এটি ফরাসির হাত ধরে ইংরেজিতে এসেছে বলে উচ্চারণ ‘মরগেজ’, ট উহ্য।
আমরা জিনিস বিক্রি করি, বদলে পাই অর্থ। ল্যাটিনে ওয়েনিও (venio, ল্যাটিনে V এর উচ্চারণ ডব্লিউ ) মানে আসা। মনে করুন সিজারের সেই বিখ্যাত উক্তি - আসিলাম দেখিলাম জয় করিলাম; রসভঙ্গ করে জানাতে হয় তিনি আসলে বলেছিলেন, ওয়েনি ওয়েডি ওয়েকি, ভেনি ভেডি ভেসি নয়!
Venio র সঙ্গে ফেরার প্রতিশব্দ রে (re) জুড়লে পাই আজকের রেভেনিউ, আক্ষরিক অর্থে ফিরে আসা, জিনিস বিক্রির দাম পাওয়া।
মেরকিস (mercis) মানে জিনিসপত্র পণ্য সামগ্রী; যেখানে কেনা বেচা চলে সেটি মার্কেট, যারা এই ব্যবসায় লিপ্ত তারা মার্চেন্ট, এই সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডকে বলি মারকেনটাইল। যারা দ্রব্যের বিনিময়ে লড়াই করে তারা মারসেনারি। একাধিক লোক নিজেদের মধ্যে দ্রব্য বা বস্তু বেচা কেনা করলে যোগ হয় কম (com), আমরা পাই কমার্স (com+mercis)। এখানে অবশ্যই লক্ষণীয় ইংরেজি কেমন ভাবে আত্মসাৎ করেছে ল্যাটিন শব্দ তার অক্ষর, কিন্তু উচ্চারণ করেছে তার ইচ্ছামত। মেরকিস থেকে এলো মার্কেট কিন্তু তার সঙ্গে এলো মার্চেন্ট অথচ মারকেনটাইল!
কনজুমো অর্থ খাওয়া, তা থেকে এসেছে কনজিউম, যিনি ভোজন করেন তিনি কনজিউমার।
সমাজের অত্যন্ত জরুরি দ্রব্যের সামগ্রিক নাম কমুনিস (communis) যা থেকে আমরা পেয়েছি কমন। কার্ল মার্ক্স কি সকল বস্তু সমাজের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেবার কথা ভেবে কমিউনিজম শব্দটি চয়ন করেন?
আজ এ অবধি।
শনিবারের সকালবেলা এইরূপ আকস্মিক মানসিক অত্যাচারের প্রতিবাদে যদি গুরুর পাঠক সরব না হয়ে ওঠেন, তাহলে আবার বসা যাবে।
পরিশিষ্ট
* ওথেলোর হাতে ঘুমন্ত ডেসদিমোনার অকালমৃত্যু আসন্ন; তাঁর শয্যার পাশে বসা ওথেলোর সলিলকির
অংশ বিশেষ। এটি আমাদের অনেকেরই চেনা (আমি অন্তত সুচিত্রা উত্তমের সপ্তপদী ছবিতে সেটি
শুনেছি, উৎপল দত্তের কণ্ঠে )
It is the cause, it is the cause, my soul
Let me not name it to you, you chaste stars.
It is the cause. Yet I’ll not shed her blood.
Yet she must die
So sweet was never so fatal. I must weep.
But they are cruel tears. This sorrow is heavenly.
Othello Act V Scene 2
**হ্যামলেটের চার নম্বর কোয়ারতোয় এই সলিলকি পাওয়া যায় –
To be or not to be, I there’s the point,
To Die to sleepe, is that all? I all:
No, to sleepe to dreame I mary there it goes,
For in that dream of death, when wee awake
And borne before an evelasting Judge
From whence no passenger ever returned.
আমরা পড়েছি
To be, or not to be that is the question:
Whether ‘tis nobler in the mind to suffer
The slings and arrows of outrageous fortune
Or to take arms against a sea of troubles
And by opposing end them,
To die-to sleep
Hamlet Act III Scene 1
Amit Chatterjee | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:০৮742940
আশীষ সিংহ রায়। | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:১৮742942
পাঠক | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:০৬742943
kk | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ২১:১৩742948
Debanjan | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৪৬742949
ar | ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৩৯742950
হীরেন সিংহরায় | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০০:৪২742952
হীরেন সিংহরায় | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০১:২৯742953
হীরেন সিংহরায় | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৫৫742955