

আলেকজান্দার ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী হলেন ২০১৪ সালে। বছরের পর বছর স্বাধীন প্রফেশনাল মিডিয়ার স্থান সঙ্কুচিত এবং সরকারের প্রচার প্রোপাগান্ডা বিস্তারিত হতে থাকে। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভেলের মিডিয়া অ্যানালিস্ট নেদিম সাইদেনোভিচ বলেছিলেন ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র, টেলিভিশন রেডিও - দেশের সমস্ত মিডিয়াকে কঠিন হাতে কন্ট্রোলে আনাটা সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টির মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়।

আলেকজান্দার ভুচিচ
সকল মিডিয়া আউটলেটকে সত্বর জানিয়ে দেওয়া হয় যদি তারা সদা সর্বদা সরকারের সমর্থন করে, কোন প্রকারের কটূক্তি থেকে বিরত থাকে তাহলে রাজকোষের দরজা এবং সস্নেহ সরকারি সমর্থনের জানলা দুটোই খোলা থাকবে। পেহলে পয়সা পিছে দেশ – প্রভুর ইচ্ছেমত চললেই যদি করদাতার অঢেল অর্থ মেলে তাহলে এ ধনের থলিতে পদাঘাত করার শুভ বাসনা জাগে কার? তবুও যদি কিছু মিডিয়া মালিকের সুপ্ত বিবেক জেগে থাকে তার মোকাবিলা করার ব্যবস্থা হলো; বেয়াড়া টি ভি বা সংবাদপত্রকে অধিক মূল্যে কিনে নেবার পালা শুরু হয়; যেমন গড ফাদার বলেছিলেন, আই উইল মেক অ্যান অফার হি ক্যান নট রিফিউজ! অর্থের এবং সরকারি শক্তির সামনে তাঁরা মাথা নিচু করেছেন, সেই সব মিডিয়ার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে, সরকারের লাইন তাঁদের লাইন।
আমাদের যুবা বয়সে শোনা চিনের শিন হুয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসের মতন ইউগোস্লাভ নিউজ এজেন্সি তানইউগ নামটি খুবই প্রচলিত ছিল, যদিও আমরা তানযুগ বলতাম। কমিউনিজমের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সে নাম কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। ভুচিচের দাক্ষিণ্যে তানইউগ পুনর্জীবিত হল, সার্বিয়ান লাইসেন্সিং সংস্থা সে নামের অধিকার দিলেন রাদোইকা মিলোস্লাভলিয়েভিচ নাম্নী এক মহিলাকে। রাদোইকা আরেক ধনাঢ্য মন্ত্রী ব্রাতিস্লাভ গরিচের সঙ্গে মিলে বেয়াড়া টি ভি বা সংবাদ পত্র কেনা আরম্ভ করলেন; ভয়ভোদিনার নোভি সাদে একটি আঞ্চলিক টি ভি আউটলেটকে ঢাকি ও বাদ্যি সহ কেনা হল।
মিডিয়ার অকুণ্ঠ আনুগত্য কেনার জন্য ভুচিচের শাসনকালে কম করে করদাতার থেকে আদায় করে পনেরো কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে। চ্যানেল মালিকরা জানতেন তাঁদের কাজ দিন জুড়ে সংবাদ চিত্রমালা, বিকেল সন্ধ্যেয় সেই সংবাদের ওপরে প্রশ্নহীন ডিবেট চালানো। দিবারাত্রি এক দেশ এক মত এক নেতার ছবি, তাঁর বাণী ছাপতে হবে, তাহলেই টাকার কল খোলা থাকবে। মনে রাখতে হবে নেতা কখনো কোন ভুল করেন না, তাঁর সমালোচনা অনাবশ্যক অতএব সেটি অমার্জনীয় অপরাধ।
সংবাদ সংস্থার বিকল্প পৃষ্ঠ পোষকের নাম প্রাইভেট কর্পোরেট। তাঁরাও খুব শিগগির বুঝলেন ভুচিচের নকশে কদমে না চললে সরকারি কোন প্রোজেক্ট পাবেন না, সে দরোজা বন্ধ অধিকন্তু বাড়া ভাতে ছাই দেবার সরকারি প্রচেষ্টার সম্ভাবনা ব্যাপক। অতএব তাঁরাও কোন দুর্বিনীত নিরপেক্ষ প্রিন্ট, টি ভি বা ডিজিটাল সংবাদ সংস্থাকে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে বিরত রইলেন।
সাইদেনোভিচ বলেছেন গত বারো বছরে সার্বিয়ার নব্বুই শতাংশ মিডিয়া সরকারি দখলে চলে আসে, কমিনিউজমের আমলে সেটা ছিল একশো শতাংশ।
সাম্যবাদী প্রেস আর পুঁজিবাদী মুক্ত মিডিয়ার কন্ট্রোলের তফাৎ মাত্র টেন পারসেন্ট! ]

আমার দেখা স্বাধীনতা স্কোয়ার নোভি সাদ
ফির সুবহ হুই?
রবিবার ২৬শে অক্টোবর সন্ধ্যেয় নির্বাচনের একজিট পোল বেরুনোর বেশ কয়েক ঘণ্টা বাদে বেলগ্রেডের রিপাবলিক স্কোয়ারে জনসমুদ্রের লাইভ ছবি নয়, রেকর্ডেড ফুটেজ দেখিয়ে জাতীয় টেলিভিশন আর টি ভির সঞ্চালক গোরান এরর বললেন, ‘আগের দিনের উত্তাল সমাবেশের কোন ছবি না দেখানোর জন্য আমরা লজ্জিত', এর পরে তিনি লাইভ টিভিতে এই বিবৃতি পাঠ করেন-
‘বিগত বহু বছর যাবত সার্বিয়ার জাতীয় টি ভি এবং সংবাদ পরিবেশক মানুষের কাছে নিরপেক্ষ খবর পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। খবর হয় দাবিয়ে রাখা হয়েছে অথবা একপেষে বক্তব্যকে আসল খবর হিসেবে পরিবেশন করা হয়েছে। আমরা অথরিটিকে সঠিক কেন, কোন প্রশ্নই করিনি আমাদের দর্শকের কাছে আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাই।'
নির্বাচনে ভুচিচের হার স্বীকার করার দু ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় টেলিভিশনের এডিটর ইন চিফ নেনাদ কাচিচ পদত্যাগ করলেন, নতুন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নিযুক্ত হলেন।
আকস্মিক হৃদয় পরিবর্তন?
নোভি সাদের স্টেশনের ছাদ ভেঙ্গে যাওয়ার পর থেকেই সরকারি দুর্নীতির নিন্দা না করার জন্য সার্বিয়ান জাতীয় টি ভির কর্মী ইউনিয়ন এডিটর ইন চিফ কাচিচের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন কিন্তু তাঁদের সমস্যা ছিল ভুচিচ রাখি না বিবেক রাখি?
সার্বিয়াতে দু বছরের ছাত্র আন্দোলনে কোন সরকারি সম্পত্তির ভাঙচুর হয় নি, কারো প্রাণহানি হয় নি, কোন পুলিস বা সরকারের প্রতিভূর গায়ে আঁচড়টি অবধি পড়ে নি। কিন্তু এতদিনের পুষে রাখা রাগ সামলাতে না পেরে ভুচিচের পতনের পরে জনা বিশেক ছাত্র ছাত্রী বেলগ্রেডের ইনফরমার নামক টেলিভিশন স্টুডিওতে চড়াও হয়েছিলেন – বারো বছর ধরে বিরোধী দলের বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলনের নামে বিদ্বেষ উদ্গারকারি ভুচিচ পূজক এডিটর দ্রাগান ভুচিচেভিচ তখন তাঁর নামি সব অ্যাংকর পরিবৃত হয়ে ক্যামেরার সামনে অধিষ্ঠিত। ভীত হয়ে দ্রাগান পুলিসকে ফোন করলে অটোমেটিক ভয়েস তাঁকে অপেক্ষা করতে বলে, এবার তিনি স্টুডেন্ট লিস্টের স্রাদানোভিচকে ফোন করেন – স্রাদানোভিচ তাঁকে বলেন এতদিন আপনি আমাদের নামে কেবল মিথ্যে রটিয়েছেন, আজ কেন হঠাৎ ফোন করছেন? এই বলে তিনি লাইন কেটে দেন।

নির্বাক টিভি এডিটর দ্রাগান ভুচিচেভিচ
দ্রাগান ভুচিচেভিচের টি ভি বছরের পর বছর ছাত্র আন্দোলনের নামে অপবাদ রটিয়েছে, এমনকি তাদের নাৎসি সংগঠন উস্তাশের সঙ্গে তুলনা করেছে, বিদেশি শক্তির প্রক্সি বলেছে; কিছু ইন্টারনেট সূত্র বাদে কোন সংবাদ সংস্থা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায় নি। আজ দ্রাগান ভুচিচেভিচের সামনে ক্ষিপ্ত দুর্বিনীত ছাত্ররা তাদের পুষে রাখা রাগ উগরে দিয়েছে কিন্তু টেলিভিশন স্টুডিওর কোন ক্ষতি করে নি। দ্রাগান পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে সব কথা শুনেছেন, একটিও কথা বলেন নি; তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে স্টুডিওর বাইরে নিয়ে যান। পুলিসে এসে ছাত্রদের চলে যাবার অনুরোধ করলে তাঁরা তৎক্ষণাৎ স্থান পরিত্যাগ করেছেন; প্রতিশোধের আগুন জ্বালানো নয়, যা বলার ছিল বলা হয়ে গেছে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর উদ্বেল জনতা
পুনশ্চ:
মায়ার কল্যাণে অনুদিত যে সব সার্বিয়ান এজেন্সি রিপোর্ট পাচ্ছি তাতে একটা জিনিস খুবই চোখে পড়ে। হাঙ্গেরি থেকে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী লিখেছেন
‘স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে যে বাঁচিয়ে রাখা যায় সেটা আমরা প্রমাণ করেছি ষোলো বছরের অরবান শাসনের উচ্ছেদ করে, তোমরা বারো বছরের ডিকটেটর ভুচিচকে বিদায় দিলে’।
এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে গেল দ্বার?