ভাঙা মন উন্মন……
সুস্থতা বিষয়টি আমার কাছে বেশ গোলমেলে বলে মনে হয়। সেদিন গিয়েছিলাম আমার গৃহ চিকিৎসক মশাইয়ের কাছে। প্রাথমিক নমস্কার, প্রতি নমস্কারের পর্ব মিটতেই ডাক্তারবাবুর প্রথম প্রশ্ন – কেমন আছেন? এর সম্ভাব্য দুটি উত্তর হতে পারে – ভালো আছি অথবা ভালো নেই। এই সময়ের চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে ক্লিনিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে করা হয়, তাই ডাক্তারবাবুর সামনে রিপোর্টগুলো মেলে ধরি। রিপোর্ট দেখে ডাক্তারবাবু মুচকি হেসে বলেন – “বা! ফাইন। বেশ! ভালো আছেন তো! আমিও ঘাড় নাড়ি, অথচ মনের মধ্যে কে যেন সমানে বলতে থাকে তোমার মন ভালো আছে তো? আসলে সুস্থতা মানেতো শুধু শরীরী সুস্থতা নয়, মনের দিক থেকে সুস্থ থাকাটাও যে সমান জরুরি।
মন কী? খুব সহজে একে বুঝিয়ে বলাও বেশ কঠিন কেননা মন হলো পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বিশেষ অবস্থা যা আমাদের বিচিত্র অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ বা অভিব্যক্ত করে। আর এই কারণেই আমাদের মনের চিত্রপট ক্ষণে ক্ষণে যায় বদলে। বর্ষণমুখর মেঘলা দিনের মন আর মেঘ চাদর সরিয়ে উঁকি মারা নীলাকাশ- মন এক হবে কী করে? আমাদের অনুভূতিগুলোর তার যে প্রকৃতি পরিবেশের বিচিত্র সব লীলার সঙ্গে বাঁধা। ওখানে টান পড়লেই উচাটন হয়ে ওঠে আমাদের মন। এ এক বিচিত্র সংযোগ।
এই মুহূর্তে যখন আমাদের পৃথিবী এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন মনের স্বাস্থ্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন কেবলমাত্র আমাদের বাহ্যিক কর্মকান্ডের ওপর প্রভাব ফেলছে তা নয়, আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যও এই কারণে প্রভাবিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বেড়ে যাওয়া উষ্ণতা, বায়ুর দূষণ, বন্যা, বৃষ্টির অভাবে নেমে আসা খরা পরিস্থিতি, দাবানল, ঝড়, সমুদ্র জলস্তরের উঠে আসা, জমির লবণতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া – এসবই উষ্ণায়নের ফল যা আমাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সংকটপূর্ণ করে তুলেছে। এমনই সব পরিস্থিতির সামনে একজন ভুক্তভোগী মানুষের মানসিক স্থিতি কোন অবস্থায় থাকে তা সহজেই অনুমেয়।
বিষয়টিকে কেবলমাত্র সাধারণ পরিস্থিতির নিরিখে বিচার করলে বোধহয় মনের সমস্যাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারা যাবে না, কেননা এই সমস্ত ঘটনাবলির ফলাফল আমাদেরকে
জীবনভর বয়ে নিয়ে যেতে হয়। প্রবল বন্যায় মানুষের ঘর বাড়ি ভেঙে ভেসে গেলে সেই ক্ষতির মাত্রা চোখে পড়ে, কিন্তু মানুষের মনজমিন উজাড় হয়ে যাওয়ার শূন্যতা যে অপরিমেয়। যে শিশুটি আজ ভূমিষ্ঠ হলো বা যেসব শিশু এবং কিশোর কিশোরী এই উল্টেপাল্টে যাওয়া সময়ের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে বড়ো হয়ে উঠছে তারা কোন ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বড়ো হয়ে উঠবে? ডানা ভাঙ্গা পাখি যেমন উড়তে পারে না,ভাঙা মন নিয়ে তেমনই যে হাল হবে আমাদের বিধ্বস্ত ব্যাথাতুর প্রজন্মের ভাবী নাগরিকদের।
বিপর্যয়ের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করতে কতগুলো চেনা মাপনিকে ব্যবহার করেন বিশেষজ্ঞরা। মানসিক শূন্যতা পরিমাপের জন্য এমন কোনো স্কেল নেই আমাদের হাতে। ক্ষয়ক্ষতির স্থূল পরিমাণগত হিসেব নিকেষ যতো সহজে করা সম্ভব, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের তত্বতলাশ করা কখনোই সেভাবে সম্ভব নয়। বিপর্যয়ের কালো ছায়া ভুক্তভোগী মানুষকে বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন। এক অনিশ্চয়তার আঁধার ছেয়ে ফেলে তাদের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ পথচলাকে। তবে মনের ওপর সামগ্রিক পরিস্থিতির সংকটের প্রভাব বিশেষ বিশেষ শ্রেণির মানুষের ওপর ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বিষয়টি অনেকটাই বয়স সাপেক্ষ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। বৃষ্টিহীন কাঠফাটা রৌদ্রদগ্ধ এক দিন। পাড়ার মুদি দোকান থেকে কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়েছি। বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখা হয়ে যায় একদল ছেলের সঙ্গে। অমন প্রাণঘাতী গরমের মধ্যে জনা সাত আট কিশোর মাঠে ফুটবল খেলছে মনের আনন্দে। কমবেশি সকলেই মুখ চেনা। ধমক দিয়ে বললাম – “কিরে! এই রোদের মধ্যে খেলছিস কেন? বাড়ি যা।” ঘামে জবজব করা শরীরে আমার কাছে এসে বললো – “কি করবো দাদু ? বিকেলে টিউশনিতে যেতে হবে, খেলার সময়ই পাইনা।” “তা বলে এই গরমে?” “ও কিছু হবে না। আমাদের সয়ে গেছে। বিকেলে অবসর মিলবে না। তাই এই গরমই সই।” ওদের মতো বয়সে আমরাও হয়তো এমনি করতাম, তবে গরমের দাপট তখন এমন ছিল না।
আসলে একজন শিশুর কাছে গরম বেড়ে যাওয়ায় অর্থ হলো রাতের ঘুম উড়ে যাওয়া, বাইরে ইচ্ছে মতো খেলতে যেতে না পারা, হঠাৎ করেই স্কুলে ছুটি পড়ে যাওয়া। এই বদলের কারণে তাদের মানসিক চাপ বাড়েনা তা হয়তো একদমই নয়, তবে তা ঠিকঠাক প্রকাশ করে উঠতে পারেনা। বেড়ে ওঠা শরীর আর মন এই বদল হয়তো সেভাবে টের পায়না।
এমনই এক সমস্যাঘন পরিস্থিতির কারণে একজন তরুণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে তাঁর ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে - কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে তা চাকরি পাওয়ার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করতে পারে, কর্মের খোঁজে ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে নোঙর ফেলতে হবে, নতুন বাড়ি কোথায় বানালে বা ভাড়া নিলে যাতায়াতের সুবিধা হবে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর পেতে তাঁদের হয়রান হতে হয়।
প্রবীণ মানুষদেরও মানসিক উৎকন্ঠার শেষ নেই। এমনিতেই এই সময়ের প্রবীণরা খুব একটা স্বস্তিতে নেই, তাঁদের জীবনও
এখন নানান সমস্যায় দীর্ণ। চারিদিকের দ্রুত গতিতে বদলে যাওয়া সমাজ ও সংস্কৃতি তাঁদের মধ্যে নতুন নতুন আশঙ্কা বয়ে নিয়ে আসে। ঋতুপর্যায়ের সাবেকি অনুক্রম বদলে যাওয়া, নিজের বাড়ি ছেড়ে ছোট্ট চৌখুপ্পি ফ্ল্যাট বাড়িতে এসে থাকতে বাধ্য হওয়া, নতুন নতুন শারীরিক সমস্যার কারণে একরাশ চিন্তা এসে অনাহুত আগন্তুক হয়ে মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। সিনিয়র সিটিজেনের তকমা বয়ে বেড়াতেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে মন ও শরীর।
পরিবেশ পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য আমাদের পরম্পরাগত অভ্যস্ত জীবনের চেনা ছন্দে এসেছে বড়ো রকমের বদল। এই মুহূর্তে মনে হয় আমাদের আর সুস্থিত নিরাপদ জীবনের আশ্রয়ে ফেরা সম্ভব হবে না। সে জীবন এখন এক কষ্টকল্প স্বপ্নের মতো মনে হয়। উৎকন্ঠা ছাড়া এখন বেঁচে থাকা অসম্ভব।আর তাই প্রতিদিন এই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সবাই। আজ শুখা তো কাল ঝরা, এই বুঝি ঝড় আসে, এই বুঝি বন্যার জল এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বাড়ি ঘর, ক্ষেতের ফসল, চাষের জমি, জীবনের সব নিরাপত্তা। উদ্বেগ আর পিছু ছাড়ে না।
এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সূত্রে জানা গেছে যে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৮৪ জনই বিগত পাঁচ বছরে কোনো না কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে যার পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া পৃথিবীর বাতাবরণ। সাম্প্রতিক নেপালের বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করলেই এই অনিশ্চয়তার বিষয়টি খুব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নানা বয়সের বিপুলসংখ্যক মানুষ এই হ্রদ ভাঙা জলের তাণ্ডবে দিশেহারা, সহায় সম্বলহীন হয়ে গেছে। এদের সবার কাছেই আগামীদিনের স্বপ্ন বলে আর কিছু বেঁচে নেই। প্রবল মানসিক চাপ আর আশঙ্কা নিয়ে শরীরী অবয়বের খোলসে ভরা বাকি জীবনটাকে এভাবেই হয়তো বয়ে নিয়ে যেতে হবে। ‘ক্লাইমেট এংজাইটি’ বা ‘জলবায়ু উৎকণ্ঠা’ এই সময়ের মানুষের জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা। জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্র বা পরিসর এর ফলে যতো অনিশ্চিত বা সংকুচিত হয়ে আসছে ততোই গম্ভীর হচ্ছে মানসিক উৎকন্ঠা আর শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমাদের জীবন এখন পদ্মপাতায় থাকা জলের মতো টলমল করছে। একটু কাৎ হলেই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।
“আলো জ্বালাতে গিয়ে আসগর টের পায় বিজলি চলে গেছে। অন্ধকার হাতড়ে নিজের ঘর ছেড়ে পাশের ঘরে গিয়ে সে নূরজাহানকে ডেকে তোলে। ধড়ফড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে নূরজাহান। এরমধ্যেই হ্যারিকেন ধরিয়ে ফেলেছে আসগর। বাইরে পলায়নপর ভয়ার্ত মানুষের ভেসে আসা কন্ঠস্বর তাকে আরও বিহ্বল করে তোলে। নসরিন সবটা বুঝতে পারে না। তবে আগাম বিপর্যয়ের বিষয়টা বেশ টের পায়। হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাও দ্রুত গতিতে যথাসম্ভব গুছিয়ে নিয়ে ঘরের বাইরে যাবার তোরজোড় করে ওরা। নসরিনও হাত লাগায়। এমন সময় দরজায় টোকা মারার শব্দ শোনা যায়। জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতেই আসগর জবাব দেয় –
কে? দরজায় ধাক্কা দাও কে ?
আমিগো আমি, সোলেমান। বেবাক গুছাইয়া নিছো? পানি আসতেছে,খবর পাইছো নি ?
হ, হ। পাইছি। অগো কথা শুইন্যাই তো টের পাইলাম। তোমাগো গোছান্ হৈছে? হইলে চলো, একলগে যাই। আমি আমার ভ্যানডারে আনছি। মালপত্র তুইলা দাও। হালাগো আর কাম নাই। ক্ষোভে গজগজ করতে থাকে সোলেমান।
হাতে হাতে লটবহর সোলেমানের ভ্যানে তুলে দিয়ে ওরা হাঁটতে থাকে রিলিফ সেন্টারের দিকে। অন্ধকারেই টের পায় বহু আশঙ্কায় মুহ্যমান একদল মানুষের মিছিল চলেছে।
এও এক যাযাবর জীবন মানুষের। প্রকৃতির রোষ বাড়ার ফলে মানুষের থিতু জীবনের চেনা সুরটাই কেটে যাবার জোগাড় হয়
বারংবার। কখনো ঝড় তুফান, কখনো ভূকম্পন, আবার কখনও বা বন্যা – বারবার ঘুরেফিরে ঘটেই চলেছে ক্লান্তিহীনভাবে।” ( আসগর ও বানভাসি মানুষের কথা - বুলবুলভাজা, গুরুচন্ডালি, অক্টোবর,১৩, ২০২৪ )।
ওপরের কথাগুলো কেবল আসগর, নূরজাহান,নসরিন আর সোলেমানের নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত সংখ্যক বিপন্ন মানুষের কথা যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজ এক ভাঙা মন নিয়ে উন্মন হয়ে রয়েছে। এদের মনের গভীরে যে অতলান্ত উদ্বেগ এসে জমা হয়েছে তাকে দূর করবো কীভাবে? এর থেকে মুক্তি নেই।
এখানেই উঠে আসে নতুন প্রশ্ন। কেবলমাত্র চেনা ছকের মাপকাঠিতে সবকিছুকে মাপলে চলবে না। হয়তো আমাদের মেনে নিতে হবে এই পরম সত্যটা, এক নতুন সহাবস্থানের ভাবনাকে ঠাঁই দিতে হবে আমাদের আগামীর জীবন চর্চা ও চর্যায়। বদলে যাওয়া পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই করে সবকিছুর পরিকল্পনা করতে হবে। আগামী প্রজন্মের নাগরিকদের এমন এলোমেলো হয়ে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝবার মতো শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে যাতে উন্মন উৎকন্ঠায় ভরপুর পরিস্থিতি মনের ওপর থাবা বসাতে না পারে। কাজটা কি আদৌ সম্ভব হবে?
জবানবন্দি
দৈনন্দিন জীবনের নানান অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া থেকেই এই লেখার সূত্রপাত। কাজে লেগেছে কিছু প্রতিবেদকের বক্তব্য। নিজের লেখা আসগর ও বানভাসি মানুষের কথা থেকেও বিপর্যস্ত মানুষের ভাঙ্গা মনের হদিস পেতে চেয়েছি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।