এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৭ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩
    বাংলা অনুবাদ : সুশান্ত কর

    অলংকরণ: রমিত



    রেভারেন্ড জনাথন সাহেব আর শ্বেতী বেদেদের চার দিন উপোসের ইতিকথা


    বনমালী চৌধুরির জন্মের বছরখানেক পরে পাড়ে পাকা গির্জাঘরটি তৈরি করবার কাজ শুরু হয়েছিল। নাগনদীর পাড়ে খড়-বাঁশের ঘর একটিতে বাস করেন জনাথন সাহেব। তাঁকে নাচনডুবির বাগিচার সবাই চেনে; কাজলা রঙের একটি ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ান। এখানকার সবার এটি একটি চেনা দৃশ্য। তাঁর আরও একটি নাম হচ্ছে "গামিনি বুরাই'; তার মানে গাঁয়ের বুড়ো। কাছাড়ি লোকেরা জনাথন সাহেবকে এই নামটি দিয়েছে। মানুষের অসুখে-বিসুখে, বিপদে-আপদে তিনি এই ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান।তাঁর বাড়ির পাশেই গির্জা তৈরির কাজটি শুরু হয়েছিল। বনমালী চৌধুরির বাবাও প্রায়ই ঘোড়ায় চড়ে সেই গির্জার কাজ দেখতে যেতেন। এই গির্জাটিই ছিল এই এলাকার প্রথম পাকা বাড়ি; লোকে অবাক হয়ে দেখত সেই বাড়ি তৈরির কাজ। পুরো আট বছর লেগেছিল কাজটি শেষ করতে। গির্জার চূড়ায় লাগানো হয়েছিল নীল-লাল-হলুদ রঙের কাচ; রোদের আলো পড়ে সেই কাচ থেকে ছিটকে বেরোত বর্ণচ্ছটা। সেই গির্জার পাদরি ছিলেন এই জনাথন সাহেব অথবা গামিনি বুরাই—গ্রামের বুড়ো। বয়সে তরুণ তখন, আদর করে নাম দিয়েছিল লোকে গ্রামের বুড়ো; সত্যি, লোকে তাঁকে খুব ভালোবাসত।

    জনাথন সাহেবের গায়ে ছায়ার মতো লেগে থাকত শ্বেতী বেদেরা। বেদেরা ছিল মৌসরা মৌজারই নিসিলামারি গ্রামের ঘিনাই দৈমারির ছেলে, মায়ের পেটের শেষ ছেলে। ধীরে ধীরে ওর শরীরে সেই শ্বেতী রোগটি দেখা দিতে শুরু করে। শুরুতে শুধু পায়ে, পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে; সতেরো-আঠারো বছর বয়সে সেই রোগ মুখেও ছড়িয়ে পড়ল। গাঁয়ের লোকে ভাবতে শুরু করল—এই সব পাপের ফল; ঘেন্না করতে শুরু করল। আসলে লোকে ভয় পাচ্ছিল, যদি তাদের গায়েও রোগটি ছড়িয়ে পড়ে! নিজের বাড়িতেও ওর ঠাঁই হল না। বাড়ির কুকুরটিও একমুঠো ভাত পেত খেতে, শোবার জন্যে ছেঁড়া কাপড় পেত—কিন্তু শ্বেতী বেদেরা বাড়ির চার সীমাতে পা ফেলতে পারত না। ওকে দেখলেই বড়ো দাদারা আর ভাইরা তাড়া দিয়ে আসত; কেউ যদি দয়া করে কিছু দিলও, তবে উপর থেকে ছুঁড়ে দিত। ক্রমে ক্রমে বেদেরা একটি জন্তু হয়ে পড়েছিল। লোকের আগুন পোহানো শেষে পড়ে থাকা ছাইয়ের পাশে সে কুকুরের মতো, কুকুরের সঙ্গে শরীর বাঁকা করে শুয়ে থাকত; বিড়ালের সঙ্গে ফেলে দেওয়া এঁটো ভাগ করে খেত, গরুর সঙ্গে মাঠের কাঁচা ধান খেত। লোকালয় থেকে দূরে ও বাস করত; বেশির ভাগ সময়েই সে থাকত বটগাছের বড়ো কোটরে। গাছের কোটরে সে খড়, শুকনো পাতা ঢুকিয়ে থাকার মতো করে নিয়েছিল; শীতকালে আগুন জ্বেলে নিত, গরমকালে ছায়ার সন্ধান করে বেড়াত। বেশির ভাগ সময়েই সে নাগনদীতে মাছ ধরে সেই মাছ পুড়ে খেত। পরনে ওর একটি ছেঁড়া কাপড়—এককালে সেটি একটি গামছা ছিল; মা ওকে চুপচাপ এসে দিয়ে গেছিল। কখনও একটি গামছা, কখনও ছেঁড়া চাদর, কখনও-বা নিজেরই একখানা রেশম বা এরি চাদর।শ্বেতী বেদেরা একটি কাজ করত; চরে বেড়ানো গরুর পালে ভিড়ে যেত। কেউ না দেখবার সুযোগে দুধের বাটে মুখ দিয়ে দুধ খেয়ে নিত; একদিন এক রাখালের নজরে পড়ে গেল। রাখালটি ওকে বেশ করে মার দিল। ওর চুলগুলো বেড়ে গেছিল, গায়ে বাসা বেঁধেছে উকুন; যেদিকে যায় সেদিকেও দুর্গন্ধ। কখনও-বা সে মাঝরাতে বাড়ি গিয়ে বাগিচার কোণে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সেই কোণে এক মহিলা আসত সেই মাঝরাতেই, তার হাতে থাকত একটি পোঁটলা। সেই পোঁটলাতে কখনও থাকত তিনটি আঁটি কলা, কখনও একমুঠো চিঁড়ে, কখনও-বা কিছু চালের গুঁড়ো ভাজা, ক্বচিৎ কখনও এক বাটি ভাতের সঙ্গে একটি সেদ্ধ ডিম।সেই মহিলা বেদেরার মা। বহুদিন মাকে হাতের পোঁটলা বাড়ির পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে ফিরে আসতে হত; বাড়ির লোকে দেখে ফেলে বলে ভয়ে অস্থির থাকত শ্বেতী বেদেরার মা।

    শ্বেতী বেদেরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল একদিন। বনে-বাদাড়ে পেটের ব্যথাতে পড়ে যখন সে ছটফটাচ্ছিল—কত বা বয়স হয়েছিল ওর? বাইশ বা তেইশ—খুব বেশি। জনাথন সাহেব ঘোড়ায় করে এই গ্রামে ওই গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন; এমনি এক গ্রাম পরিক্রমার দিনে ওকে একটি মাঠে পড়ে থাকতে দেখলেন। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল; সে জন্যেই তিনি ওকে গির্জাতে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। নইলে মানুষজন দেখলেই সে যেন বাঘ এসেছে—ভয়ে দৌড়ে পালাত। সেই বেদেরাকে ভালো করে স্নানটান করিয়ে গায়ের উকুন বেছে ঝেড়ে মানুষ করে তুলেছিলেন। আড়ালে-আবডালে সবাই দেখত সাহেবের শরীরে শ্বেতরোগ দেখা দিয়েছে কি না।শ্বেতী বেদেরাকে তিনি ছায়াসঙ্গী করে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন। তাঁর গায়ে শ্বেতী রোগ দেখা দিল না; সাহেব যখন লোকজনকে বলে বেড়ালেন রোগটি ছোঁয়াচে নয়—লোকে বিশ্বাস করতে শুরু করল। আসলে তো এটি কোনো রোগই নয়, শরীরের রংই শুধু পাল্টায়; মানুষটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় না। সাহেব আর বেদেরা মিলে গির্জার চারপাশটা এমন সাজিয়ে তুললেন যে, তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। জারুল, অমলতাস, হরিতকী, আম, জাম, গামারি, আগর—যে গাছেরই চারার সন্ধান পেতেন, তাকেই যত্ন করে বাড়িয়ে তুলতেন; বেদেরার হাতে একটা চারাও মরতে পেত না। গ্রীষ্মকালে গির্জার উঠোনে গিয়ে ঢোকা মাত্র শরীর জুড়িয়ে যেত।নিজের উপাধি সাহেব বেদেরাকে দিয়েছিলেন; শ্বেতী বেদেরা হয়েছিল বেদেরা স্কট। সাহেবের থেকে বেদেরা শিখেছিল লেখাপড়া; মৌসরা মৌজাতে প্রথম ধর্মান্তরিত ব্যক্তিটিই হল এই শ্বেতী বেদেরা। একদিন ছোটোছেলের সঙ্গে দেখা করে মা যখন বাড়ি ফিরছিল—ছেলেরা তাঁকে বাড়ি ঢুকতে দিল না। ছেলেদের তাড়া খেয়ে গোধূলিবেলায় মা গির্জাতেই ফিরে আসছিল। নাগনদীর পাড়ে পাড়ে যখন সে ফিরছিল—এক জায়গাতে বসেছিল একটি চিতাবাঘ। সেই বাঘের মুখে পড়ে সেদিন বেদেরার মা স্মরণ করেছিল সেই একটি কাঠে পেরেক ঠুকে ঝুলিয়ে রাখা সাহেবের ভগবানকে। ঠিক স্মরণ করেনি, মেয়েমানুষটির মনে সেদিন গির্জার সেই ভগবানের ছবিটি আপনিই ভেসে উঠেছিল; কোথাও যেন জনাথন সাহেব আর সোনালি চুল ও নীল চোখের সেই ভগবান মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিলেন।মহিলাটিও জনাথন সাহেবের ধর্ম বরণ করে নিল; ওকেও সাহেব নিজের উপাধি দিয়ে দেন। সরল-সিধে কিন্তু জেদি শ্বেতী বেদেরার মা হল গিয়ে এলিজা স্কট। সরল-সিধে মহিলাটির মানুষকে সেবা করবার দক্ষতা দেখে সাহেব স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন; এলিজার সঙ্গে আরও তিনটি মেয়েমানুষ এসেছিল। তিনজনই সমাজের তাড়া খাওয়া মহিলা। বড়োদিনের দিনে এলিজা এদের নিয়ে ভেজে ফেলেছিল এক টুকরি তিলপিঠে, এক কড়াই নারকেলের নাড়ু।

    জনাথন সাহেব একদিন বনমালী চৌধুরির বাবার কাছে বড়োবাড়িতে এসেছিলেন; বনমালীর বয়স তখন ছয়-সাত বছর হবে—বাড়িতে বসেই লেখাপড়া শুরু করেছে। বনমালীদের বাড়িটি ছিল প্রায় বারো-তেরোটি খড়-বাঁশের ঘরের সমষ্টি; মাঝখানে একটি প্রশস্ত উঠোন। উঠোনের চারপাশে ছোটো ছোটো ঘর; চারপাশের ঘরগুলোতে বাড়ির লোকজন থাকেন। সামান্য তফাত রেখে মাহুত, চাষা, বাঁধা মজুরদের ঘরের সারি।মূল পথ থেকে বেশ কিছু দূর ভেতরে ঢুকে যেতে হয়; বাড়িতে ঢোকার পথের দু-পাশে তালগাছের সারি। বেশি দিন হয়নি লাগানো হয়েছে; বড়ো হয়ে আকাশ ছুঁতে তখনও অনেক বাকি। বাড়ির একপাশে তিনটি হাতি বাঁধা আছে; জনাথন স্কট সাহেবের ঘোড়া আসছে—এই খবর বাড়ির ভেতরে পৌঁছে গেছিল। বনমালীর বাবা তাঁকে বাইরের ঘরে বসালেন—মৌজার কাজে আসা লোকজন যে ঘরে বসেন; ভিন্ন ধর্মের একটি মানুষকে ভেতরবাড়িতে যেতে দেওয়া যায় না।

    জনাথন সাহেবের ছায়া বেদেরা বাইরের উঠোনে বসে রইল। মৌজাদার উঁকি দিয়ে ওকে ডাকলেন, ""আয়, ভেতরে আয়।'' শ্বেতী বেদেরা বলে ডাকতে গিয়েও তিনি মুখে এনেও গিলে ফেললেন। বেদেরা ভেতরে এসেও কী করবে না করবে ভেবে না পেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখন ভেতরবাড়ি থেকে কাঁসার বানবাটিতে ১ দুধ-কলা দেওয়া চিঁড়ে নিয়ে সাত বছরের বনমালী এসে ঢুকল। হলদে মাখা যেন উজ্জ্বল স্বাস্থ্যবান ছটফটে ছেলেটিকে সাহেব কোলে তুলে নিলেন। বেদেরা কোনো একফাঁকে কোনো এক কোণে গিয়ে কলাপাতা একটি কেটে নিয়ে এল; এনে মৌজাদারের ছেলের হাতে নিজের পাতাতে চিঁড়েগুলো ঢালিয়ে নিল।জনাথন সাহেব তখন মৌজাদারের সঙ্গে তাঁর ছেলে বনমালীর লেখাপড়া নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। এই বিষয়টি নিয়ে মৌজাদার বড়ো চিন্তিত ছিলেন। ছেলেকে পড়াতে হলে মঙ্গলদৈ না হলে তেজপুর, না হলে যোরহাট বা গুয়াহাটিতে পাঠাতে হবে। মৌসরা মৌজা থেকে মঙ্গলদৈ গিয়ে পৌঁছানোই অনেক কঠিন—বাঘে-ভালুকে ভরা ঘন অরণ্য; নদী-নালা আর ঝরনা পার করে এখান থেকে ওখানে যাওয়াটাই অনেক বড়ো কথা। ছোটো ছেলেটিকে কই বা পাঠান, কী পড়ান, রাখেনই বা কই? দেখতে দেখতে ছেলের বয়স ছয় পার করে সাতে পড়ে গেছে; ফলে মৌজাদার বেশ চিন্তায় আছেন। সাহেব যখন স্কুলের কথা পাড়লেন, তিনি বেশ মন দিয়ে কথাগুলো শুনলেন। জমি সামান্য দেওয়া এমন কী কঠিন কথা? কত ফেলে রাখা মাটি পড়ে আছে! এক কথাতে মৌজাদার রাজি হয়ে গেলেন।

    মৌজাদারের অনাবাদি জমিতে গড়ে উঠল উত্তরাঞ্চলের প্রথম বিদ্যালয়। মৌজাদারের ছেলে বনমালীকে ধরে মোট ছাত্র সাতজন; ব্রিটিশ সরকার জনাথন সাহেবকে কিছু টাকা-পয়সাও দিলেন। জনাথন সাহেব বিলেত থেকে তাঁর বোন মরিয়মকেও নিয়ে এলেন। সাতটি ছেলে তাঁদের কাছে ইংরেজি তো শিখছিলই, আর শিখছিল একটি লাজুক ছেলে—সে ছিল শ্বেতী বেদেরা। কেউ জানতে পারেনি, মাঝরাতে আরও একজন মানুষ ছেলের বইপত্র নিয়ে লেখালেখি দেখে ইংরেজি শিখছিলেন; তিনি স্বয়ং মৌজাদার।

    জনাথন সাহেবের গির্জার চারপাশে একটি সুশোভিত বাগান গড়ে উঠেছিল; আর গির্জাকে কেন্দ্র করে দেখা দিচ্ছিল বিচিত্র কাজ। জনাথন সাহেব আর মরিয়ম মেম মৌসরা মৌজার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছিলেন। মিশনের কাজকর্ম বেড়েই চলেছিল; নগাঁও মিশন থেকে সাহেব যোশেফকে ডেকে পাঠান। সে আসবার পরে মিশনের কাজ আরও বেড়ে চলে। বাঘে-ভালুকে ভরা দুর্গম পথ দিয়ে যাতায়াত করতে করতে জনাথন সাহেব আর যোশেফ গ্রামের পরে গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছেন; সঙ্গে ছিল শ্বেতী বেদেরা। সাহেব গিয়ে এই সব জঙ্গলঘেরা গ্রামগুলোতে যিশুর বাণী ছড়াতেন; আর এভাবে প্রচুর লোক সাহেবের ধর্ম নিল। সাহেবের ধর্মে চলে যাওয়া মানুষগুলো এক আলাদা গ্রাম করে বসতে শুরু করল। লোকে যে কত কী বিচিত্র কারণে এই ধর্ম গ্রহণ করেছিল!

    গজেন বড়োর ছেলেমেয়ে জন্মেই মারা পড়ে; প্রতিবারেই মৃত শিশুর নীলচে বিবর্ণ মুখ দেখতে হয়। জনাথন সাহেব একবার করলেন কি, সন্তান জন্মের সময় এগিয়ে আসতেই ওর স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিলেন তেজপুরের মিশনে; সঙ্গে গেল গজেন বড়ো। তেজপুর মিশন থেকে কোলে স্বাস্থ্যবান পুত্রসন্তান নিয়ে দম্পতি ফিরে এল। কোনোদিনও যে সম্মান, আদর-যত্ন এখানে পায়নি, তেজপুর মিশনে সেসব পেয়ে এরা দুজনে সেখানেই খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে নিল। নিসিলামারি গ্রামের ফাল্গুনি এমন মেয়ে যে, একবার যদি একটা কথা শুনেছে—আর ভুলত না সে; ওকে তিনি নার্সের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসেন। ফাল্গুনিকে ওর বর ছেলেমেয়ে হয় না বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল।

    এসব ছাড়াও সাহেবের ধর্ম গ্রহণ করা লোকগুলো নানা সুযোগ-সুবিধেই পেয়েছিল; ফলে যারা বাথৌ পুজো করত, তাদের থেকে খ্রিষ্টধর্ম নেওয়া মানুষগুলো একবারে নাড়ির সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছিল। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে একবারে আগুন-জল অচল সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল; এই জনগোষ্ঠী ক্রমে ক্রমে দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল। বিয়ে-থার সম্পর্কও নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল; উৎসব-পার্বণাদিও হয়ে পড়েছিল ভিন্ন।

    নতুন বিদ্যালয়ে দু-বছরের মতো পড়িয়ে মৌজাদার বনমালী চৌধুরিকে মঙ্গলদৈ পাঠিয়ে দেন। বনমালী চৌধুরি যে বছর মঙ্গলদৈ স্কুল থেকে পাস করে, সে বছরেরই কথা—নাগনদীতে বান এসেছিল। একেবারে ন-ভূত ন-শ্রুত কথা! পাহাড়ে কোথাও বুঝি পাথর খসে নদীতে বাঁধ তৈরি হয়ে গিয়েছিল; তাতে ওখানে জল জমে গিয়েছিল। একসময় জমা জলের ঠেলাতে বাঁধ ভেঙে হুড়হুড় করে নেমে এল। নেমে এল মানে একেবারেই কালান্তক মূর্তি ধরে। যেদিনেই এসেছিল, একেবারে ভেঙে-গুঁড়িয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। উপড়ানো গাছ-গাছালি ভেসে আসছিল, ভেসে আসছিল ভাঙা ঘর-গেরস্থালি; নাগনদীর এই করাল রূপ দেখে মানুষজন কথা হারিয়ে ফেলেছিল। ধুম-ধাম করে ভাঙছিল নদীর পাড়; চাষাবাদের জমি, বাড়িঘর এক ধার থেকে ধুয়ে-মুছে নিয়ে চলে যাচ্ছিল।গির্জার কাছে গিয়ে নদীর একটি ভাঁজ ছিল—বহুদিনের ভাঁজ। ভাঁজটা এমন ছিল যে মনে হত বাড়ির বাগিচার পাশের পুকুর যেন; সেই ভাঁজে ছিল গির্জার সবার কাপড় ধোয়া, স্নান করবার ঘাট। এমনভাবে নদীটা বইত, মাঝে-মধ্যে কিছু বাড়তি জল আসত—গড়িয়ে আসা সেই জল এই এলাকার মানুষের আজন্ম পরিচিত। দূর থেকে দেখা যায় সাদা সাদা কিছু বড়ো ঢেউ বয়ে আসে; যেমন আসে তেমনি বয়ে চলেও যায়। কিন্তু এই যে পাড় ধসানো, গাছে-আবর্জনাতে-কচুরিপানাতে ভরা ঘোলা জলের পাক তুলে ছুটে আসা নাগনদী—সে কারও চেনা নদী ছিলই না; সত্যিই এক ভয়ঙ্কর রূপ ধরেছিল সেবারে নদী।

    ভাঁজটির পাশেই নদীপাড়ে ধস নেমেছিল। ওখানে বেদেরা একটি শাকসবজির বাগান সাজিয়েছিল; গির্জার সবার দরকারে সবজি এখান থেকেই জুটে যেত। বাগিচাটিতে জল লাগত না, কেননা নদীর ঢালু পাড়ে ছিল সেটি। তেজপুর মিশন থেকে ফাদার যোশেফ কিছু বীজ পাঠিয়েছিলেন; সেই বীজ থেকে বেদেরা আর এলিজারা কপি আর বিলাতি বেগুনের চাষ করেছিল। গ্রামের লোকে এই খেত দেখতে আসত। বীজ পড়ে বছরে বছরে এমনিই গজিয়ে ওঠা বিলাতি বেগুন লোকে দেখেছে; কিন্তু বেদেরার হাতে জন্মানো এই গোল গোল বড়ো বড়ো বিলাতি বেগুন বা টমেটো কখনও দেখেনি এর আগে।নাগনদীর পাড়ের এই সব টমেটো দেখতে মাঝে-মধ্যে বনমালী চৌধুরির বাবাও আসতেন। শ্বেতী বেদেরার দেওয়া চারা নিয়ে গিয়ে তিনি বড়োবাড়িতেও গোল গোল লাল বিলাতি বেগুন লাগিয়েছিলেন; বেদেরাও মাঝে-মধ্যে মৌজাদারের বড়োবাড়িতে এসে সেই গাছগুলো দেখে পরামর্শাদি দিয়ে যেত। দেখতে দেখতে বেদেরা সমাজের ভেতরে চলে এসেছিল; তখন অবধি বেদেরার পুরো শরীর সাদা হয়ে গিয়েছিল। টুপি আর হাফপ্যান্ট পরা বেদেরাকে অনেকেই বেদেরা সাহেব বলতে শুরু করে দিয়েছিল।

    নাগনদী বেদেরার বাগিচার অর্ধেককেও নিজের ভেতরে টেনে নিয়েছিল। গির্জার দিকে নদী যেন তেড়ে আসছিল; গির্জাঘরটাকেই ধসিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। মৌজাদারের বড়োবাড়ির যেদিকটা এই নাগনদীর দিকে ছিল, তারও অনেকখানি জমি নদী টেনে নেয়। গির্জার দিকের নদীর ভাঁজ বেড়ে আসছিল; আর-একটু হলেই গির্জা নদীতে ভেসেই যাচ্ছিল।

    জনাথন সাহেব বুকে ক্রুস জড়িয়ে ধরেছিলেন, কোলে বাইবেল; গির্জার বেদির পাশে তিনি এঁটে বসে পড়েছিলেন। জল এক ফোঁটাও মুখে নেওয়া ছেড়ে দিলেন; পাদরি সাহেব ধ্যানে বসলেন। একদিন গেল, এক রাত গেল; সাহেব কিছুই মুখে দেননি, সঙ্গে বসে পড়ল বেদেরা। বেদেরাও সাহেবের মতো বুকে জড়িয়ে ধরেছে ক্রুস, হাতে বাইবেল। গির্জার বাকিরাও সেদিন সাহেব আর বেদেরার সঙ্গে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে রইল; কিন্তু এক সময় আর পারল না। আর কিছু না হলেও সবাই জল একটু গলাতে ঢেলেই নিল।দু-দিন গেল, দু-রাত গেল; মৌসরা থেকে নাচনডুবি পর্যন্ত, একেবারে তেজপুর মিশন অবধি হুলস্থুল লেগে গেল—গির্জাকে নদীর থেকে বাঁচাতে পাদরি সাহেব আর তাঁর শিষ্য বেদেরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করছেন। লোকে দেখতে এল; মৌজাদারও এসে কয়েকবার সাহেব আর বেদেরাকে দেখে গেলেন। ইতিমধ্যে নাগনদীর জলের স্রোত কমেছে; ক্রমেই সেই পাহাড়ের বুকে পাথর খসে যে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি হয়েছিল, সেটির চিহ্ন মুছে গেছে। নাগনদীও স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসতে শুরু করেছে; পাদরি সাহেব জনাথন আর বেদেরা সেই একই ভঙ্গিতে বসে রয়েছেন। তিন দিন, তিন রাত পার হল; দুজনেই বড়ো দুর্বল হয়ে পড়লেন। রাত আসতে আসতে সাহেব নিজের মাথাটা বেদেরার কাঁধে ফেলে দিলেন; বাকি রাতটুকু বেদেরা নিজের কাঁধে সাহেবের মাথাটি ধরে রাখল। পা টনটন করছিল, কাঁধে-মেরুদণ্ডে ব্যথা করছিল; তবু বেদেরা এতটুকু নড়েনি। চার দিনের দিনে সবাই গিয়ে সাহেব আর বেদেরাকে বলল, নাগনদী শুকিয়ে গেছে, জল নেমে গেছে, আর কোনো ভয় নেই; গির্জার থেকে নদী দূরে সরে গেছে, নাগনদী আবার আগেরই মতো হয়ে গেছে। এলিজার তৈরি এক গ্লাস লেবুর শরবত খেয়ে সাহেব আর বেদেরা নিজেদের ধ্যান ভাঙলেন।

    সেদিন গির্জাতে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল; গির্জার চারপাশে এলিজারা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। দিকে দিকে রটে গেল—পাদরি সাহেব আর শ্বেতী বেদেরা অন্নজল ত্যাগ করে প্রার্থনায় বসে নাগনদীর পথ পালটে দিলেন; গির্জা রক্ষা করে ফেললেন। এই ঘটনার পরে আরও বেশ কিছু পরিবারের লোকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করল।


    টিকাঃ
    ১। বানবাটি: এটি অসমের এক ঐতিহ্যবাহী কাঁসার বাটি, যার নিচে একটি শক্তপোক্ত স্ট্যান্ড বা পায়া যুক্ত থাকে। আসামের জনজাতি ও বৈঞ্চব পরিবারগুলোতে ভক্তিভরে প্রসাদ বা জলখাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং অতিথি আপ্যায়নে এই "পায়াযুক্ত' বাটিটি এক বিশেষ আভিজাত্যের প্রতীক।


    সুগরীজান এসে পৌঁছাল পেছনের উঠোনে


    সেপ্টেম্বর এসে পড়ল। বনমালী চৌধুরির বড়োবাড়ি বারোমাস কাজকর্ম আর কোলাহলে প্রাণচঞ্চল হয়ে থাকে; তবুও হাতি-মহল শুরু হবার আগে পুরো বাড়ি সেজেগুজে নতুন বউ হয়ে পড়ে। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস অবধি হাতি-মহল চলে। হাতি কারবারি লোকজন সবাই এসে তখন এই বড়োবাড়িতেই ওঠেন। সবচাইতে বিশেষ দিনটি হল, যেদিন সাদা সাহেব প্রশাসকের সামনে বুনো হাতিকে পুরো প্রশিক্ষণ দিয়ে পালিত করে দেশ-বিদেশে চালানের জন্যে এনে দাঁড় করানো হয়। সেদিন স্বয়ং ডিসি সাহেব এসে বনমালী চৌধুরির বড়োবাড়ির অতিথি হন। কখনও ডিসি সাহেব আসতে না পারলে তাঁর কোনো সহকারী প্রতিনিধি আসেন; যিনিই আসেন, তিনিই এই বড়োবাড়িতে রাতটা থাকেন। ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধির সামনে হাতির দাম ঠিক হয়, টাকা-পয়সার লেনদেন হয়। সদর মঙ্গলদৈ থেকে যেতে-আসতে পুরো একটা দিন লাগে; রাতে ফিরে যাওয়া মানে বাঘ-ভালুকের ভয়, আর ডাকাতের ভয় তো লেগেই থাকে। রাজপ্রতিনিধিকে মৌসরাতে এক রাতের অতিথি হতেই হবে; এটা বনমালী চৌধুরির জন্যে নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ দিন।

    এবারে আগস্ট আসতেই সেই দিনটির জন্যে বনমালী চৌধুরি কোমরে গামছা বেঁধে নিয়েছেন। এবারের কমিশনার এডুইন ব্লেকস্মিথ সাহেবের সঙ্গে ইতিমধ্যে তাঁর একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অরণ্যের জন্তু-জানোয়ার, গাছপালা, ফুললতা বলতে পাগল এই সাহেব হাতির মহলে আসবেনই আসবেন। বনমালী এমং বুড়োর সঙ্গে কথা বলেই রেখেছেন; অশ্বত্থ আর বটগাছ দুটির পাশে একটি ঘর তৈরি করবে—সেই যে মাচাটি দেখে সাহেব কেমন ""ট্রি-হাউস, ট্রি-হাউস'' বলে উল্লাস ব্যক্ত করেছিলেন।

    মাচা ঘর তৈরিতে বনমালী এমনটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে, একজন স্ত্রীরও খবর নেবার সময় হয়ে উঠছিল না। সমগ্র এলাকাতে জানাজানি হয়ে গেল যে, মৌজাদার বনমালী চৌধুরি গাছের উপর মানুষ থাকার মতো করে টঙ্গি ঘর তৈরি করছেন। বড়োবাড়ির পাশের ছোটো নদীর পাড়েই রয়েছে অশ্বত্থ গাছ দুটি; সেই কবেকার গাছ কেউ জানে না। ছোটো নদীটির দিকে রয়েছে, সেদিকটা বাড়ির পশ্চিম দিক। ফলে গাছ দুটি বাড়ির কোনো ক্ষতি তো করেই না, উলটে পশ্চিমের রোদের তাপ থেকে বাড়িটিকে রক্ষা করে। আজ অবধি কেউ গাছ দুটিতে দা-কুঠার ছোঁয়াবার দরকার মনে করেনি; সেখানে এমং বুড়োর নির্দেশনাতে ছোটো ঘর তৈরি করা হচ্ছে। চালটা হবে খড়ের, দেয়াল বাঁশে তৈরি হবে; একটা কোঠার সঙ্গে থাকবে একটি খোলা বারান্দা। বাকি জোগাড়যন্ত্র সবই হয়ে গেছে। এই সাহেবকে রাখার বিশেষ কোনো সমস্যা নেই; তিনি ওই গাছ-গাছালি, ফুল-লতা—এইসবই দেখবেন, সেসবের প্রতিই তাঁর যত আকর্ষণ। আর কোনো জিনিস দিতে হয় না, দুই-চারটে কপৌ১ ফুল দিলেই তিনি তুষ্ট। সাহেবের কেবলই চাই রূপকথার গল্প, আগেকার দিনের গল্প-উপকথা চাই। সাঁচিপাতের২ পুথিগুলোর দেখা-টেকা চাই, আর চাই লোকজনের সঙ্গে কথা বলবার অপার সুযোগ। এত কম সময়ের মধ্যেই তিনি অসমিয়া ভাষাটি শিখে ফেলেছেন; সাহাবি ধাঁচটা আছে, এসব বাদ দিলে ভালো অসমিয়া বলতে পারেন। শুধু যে হাতি কেনাবেচাতেই তিনি ব্যস্ত থাকবেন—এমনটা নয়; খবর দিয়ে পাঠিয়েছেন—তিনি হাতিশালটিও কাছে থেকে দেখবেন। তিনি বনমালী চৌধুরির প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকবেন; হাতিশালের কাজ শুরু হবে, আর সেখানে স্বয়ং কমিশনার সাহেব এসে অতিথি হবেন। বনমালী সত্যিই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

    সেপ্টেম্বর আসতেই ভুটান পাহাড়ের তলার অরণ্যে ঘেরা এই মৌসরাতে শীত ভালো করেই পড়তে শুরু করল। কুয়াশা প্রায় রোজ সকালেই চারদিকটা একবারে ঢেকে ফেলে। ভোরের সূর্য উঠতেই গাছ-গাছালির শিশির ঝরে ঝরে গ্রামখানি ভরিয়ে ফেলে; গাছ-গাছালির কোলে খড়ের ঘরগুলো শুয়ে থাকে। কোথাও কোথাও কুয়াশার সাদা আস্তরণ ভেদ করে ধোঁয়া বেরোয়। শীতের কাঁপুনিতে কাতর কোনো বৃদ্ধ হয়তো কোথাও আগুন জ্বালবার চেষ্টায় নিমগ্ন, অথবা কর্মব্যস্ত বাড়ির বউ জল গরম করে চায়ের ব্যবস্থা করতে চুলোতে আগুন দেয়। কুয়াশার সঙ্গে একটা মৃদু সুগন্ধ মাখানো থাকে। শিশির ঝরার টুপ-টুপ শব্দ আর মৃদু সুগন্ধ মাখা কুয়াশার মাঝে গ্রামটি শুয়ে থাকে। পুরো গ্রাম জুড়ে যত ফুল রয়েছে, রয়েছে গাছপালা—সেসব কিছুর গন্ধ নিজের ভেতরে টেনে নেয় কুয়াশা; চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সুগন্ধি কুয়াশা। মৌসরার উত্তর দিকে ভুটানের পর্বতমালার সারি এই সময়টিতে ময়ূর-পালকের রং ধরে। কুয়াশার চাদর সরে যায় আর বেরিয়ে আসে পাহাড়ের সারি; আজও বেরিয়ে এসেছে। গ্রাম থেকে যেদিকেই তাকানো যায়, সেদিকেই চোখে পড়ে পাহাড়ের বুকে নীলের মাঝে মাঝে সাদা রং নজরে পড়ে। আজও রোদের আলোয় মুক্তোর মতো সাদা বিন্দু এখানে-ওখানে চিকমিক করে উঠেছে। গাঁয়ের লোকে ভাবতে থাকে, জীবনে একবার না-হয় আর-বার ভাবেই—এই সাদা জায়গাগুলো কীই-বা? কী আছে ওখানে? পাথর? বরফ? বাড়িঘর?

    ভেজা কাপড়ে সূর্য প্রণাম করতে করতে বনমালীও ময়ূর-বরণ এই পাহাড়সারির মাঝে সাদা সাদা টুকরোগুলো দেখে ভাবলেন—কী আছে ওখানে? একবার যদি গিয়ে আসা যেত! কতবার যে গদাধরের পিঠে চড়ে পাহাড়তলিতে গেছেন তিনি, কতবার যে পাহাড়ের বুকে গিয়ে চড়েছেন; একবার যদি গিয়ে কাছ থেকে দেখে আসতে পারতেন। আর কিছুদিন বাদেই ভোটেরা আসবে; বনমালীর বিশাল বড়োবাড়ির এককোণে ওদের জন্যে একটি জায়গা রাখাই আছে তো, ঘরও আছে। পাহাড় থেকে নেমেই এরা সেখানে খুঁটা পুঁতবে। ওদের পিঠে পিঠে আসবে কত কী জিনিসের তল্পিতল্পা, বস্তা; সেইসব রাখার জন্যেও একটি প্রশস্ত মাচা তৈরি আছে। এখানে মাসখানেক থেকে এরা আবার সমতলের জিনিসপত্র সেই বস্তাগুলোতে ভরে ফিরে যাবে। ওদেরকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।আরও একটা কথা, এবারে ওদের থেকে একজোড়া কুকুরশাবক রাখতে হবে। লম্বাতে এরা ডিম দেওয়া মুরগি একটারও সমান হয় কি না হয়—রোমে কান-ঢাকা কুকুর দুটো রাখবেন। ও বহুদিন ধরে বলে আসছে, একটা কুকুর চাই; কেনই বা ওর কুকুর চাই এখন? লালন-পালন করবে বলে? দেবে কি ওকে খেলা করবার জন্যে একটি নাদুস-নুদুস শিশু? এখন এই বয়সে বাড়িতে শিশুর কান্না মানাবে? না-হয় সে থাকে বাড়ির সদর থেকে সামান্য দূরেই, তবু এই বাড়িরই তো বাসিন্দা। আজ বেশ কিছু রাত ওর কাছে যাওয়া হয়নি; কমিশনার সাহেব, ট্রি-হাউস আর এমং বুড়োকে নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে আছেন যে, বাকি সমস্ত কথাই তলায় পড়ে গেছে।

    ""আয়, আহ, আহ, আহ!'' নারীকণ্ঠের শব্দে বনমালী কিছু শঙ্কিত হলেন। কোঁকড়ানো পাকা চুল মেলে শান্তিপ্রিয়া পায়রা পাখিদের চাল খেতে দিচ্ছেন; সেই শান্তিপ্রিয়া। সবুজ ছাদের মেখেলা-চাদর একজোড়া পরে মেয়েমানুষটি পায়রাদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ হাঁসের ঘর, ছাগলের ঘর খুলে দিয়েছে; একঝাঁক হাঁসও প্যাঁক-প্যাঁক করতে করতে কবুতরের মাঝে এসে ভিড়ে গেল। ছাগল কটি এসেও আশেপাশে ঘুরঘুর করছে; চাদরের আঁচল থেকে কিছু একটা বের করে শান্তিপ্রিয়া তাদেরও দিলেন।পায়রাদের ভিড়ে মানুষটিকে দেখে বনমালীর শরীরটা কেমন যেন শিউরে উঠল; কেমন যেন লাগছে ওঁকে। এই মানুষটিই কি সেই মানুষ? ওঁর চুলগুলো কেন এমন পেকে সাদা হয়ে গেল? কতটা বয়স হলে পরে এক মহিলার চুল এমন পেকে ধবধবে সাদা হয়ে পড়তে পারে? কত বা বয়স হয়েছে? ঢোল-বাদ্য বাজিয়ে এই বড়োবাড়িতে যখন এসে সে ঢোকে, বয়স তখন ছিল বড়ো জোর পনেরো বা ষোলো; আর বনমালীর? পাকাপাকি পঁচিশ। তাঁর থেকে দশ বছরের ছোটো মেয়েমানুষ; কখনোই মানুষটি মোটা-গাট্টা ছিল না, আর এখন আরও শুকিয়ে গেছে।এই মহিলাটিকে দেখলেই তাঁর হাত উঠে যায়, মুখে গোটাকয় বাজে শব্দ বেরিয়ে আসতে চায়—""সর বলছি না! সর আমার সামনে থেকে!'' সেই মেয়েমানুষটি এদিকে ঘুরে তাকাচ্ছে; পুরুষটির চোখে চোখ পড়েছে। কুকুরের সামনে পড়া ঘুঘুর মতো ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে সে; দ্রুত পায়ে পাশ থেকে সরে গেল সে।

    সেখান থেকে চলে এলেন বনমালীও। দাঁতন ঘষতে ঘষতে বারান্দায় রাখা লোটাটা নেবার জন্যে হাত বাড়ালেন। এমং বুড়োর তৈরি টুলের উপরে একটি কাঁসার গামলা আর একটি লোটা রাখা আছে; আমরুল, লেবু আর ছাই দিয়ে মেজে ধুয়ে সোনার মতো করে রাখা আছে। বারান্দার তারে ঝোলানো আছে একটি পরিষ্কার গামছা। চাকর-বাকর বা কাজের দিদিরা নিজেরা দেখে-শুনে গামছাটি বদল করে থাকে, গামলা-ঘটি মাজে। আবহাওয়া বুঝে ঘটিতে মুখ ধোবার জন্যে গরম অথবা ঠান্ডা জল ভরে রাখে; আজ লোটাতে গরম জল থাকার কথা। তিনি মুখ ধোবার সঙ্গে করে পা দুটিও ধুয়ে নেন। এর পরে কুয়োর পাড়ে স্নান সেরে নিয়ে ঠাকুরঘরে পূজা-প্রার্থনা সারেন, চা-জলপান সারেন; তারপরে দিনের কাজে হাত দেন।দাঁতন ফেলে দিয়ে তিনি ঘটিটা হাতে নিলেন; হালকা ঘটি যেন আপনিই উঠে চলে এল। খালি ঘটি হাতে নিয়ে গর্জে উঠলেন বনমালী। আসলে আজ তিনি সময়ের থেকে আগে উঠেছেন; চুলোয় আগুন জ্বলছেই, ডেকচিতে জল উতলাচ্ছেও। ঠান্ডা জল মিশিয়ে হালকা গরম রেখে লোটাতে ভরানোটুকুই শুধু বাকি ছিল। তাঁর তর্জন-গর্জনের অর্থ সবাই ঠিকই বুঝতে পারল; কোন দিক থেকে জল এল, গামছা এল—কেউ ধরতেই পারল না। এসে সবাই মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে রইল; রাগে মানুষটি পুরো লাল।কেউ একজন ঈষদুষ্ণ জলের ঘটি হাতে এগিয়ে দিলে ছিটকে ফেলে দিলেন; অন্য কারও গায়ে গিয়ে পড়ল সেই গরম জল। খালি গায়ে লেগে থাকা ধুতির আঁচল বাতাসে কাঁপছে, না যিনি পরেছেন তাঁর দেহের কাঁপনের ঠেলায় কাঁপছে? খানিকক্ষণ সবাই এমন মৌন হয়ে রইল যেন মাথায় বাজ পড়েছে। টুলের উপর থেকে গামলাটা টেনে তিনি উঠোনে ছুঁড়ে মারলেন; ছিটকে ছুঁড়ে ফেললেন কাঠের টুলটি। সারা বাড়ির সবাই শুনতে পেল মৌজাদার মালিকের কণ্ঠ বজ্রনিনাদ করছে।

    "দা-কোদাল নিয়ে তোরা এদিকটায় আয় সবাই, আমার সঙ্গে!''

    মৌজাদার বনমালী বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঠাকুরঘর পার করে বাগিচাতে প্রবেশ করেছেন। অল্প গিয়েই বাগিচাটি একটু ঢালু হয়ে পড়েছে; সেখানে চারটি আমলকী গাছ আছে। প্রায়ই সেখানে হরিণ আসে আমলকী খাবে বলে; আজও একদল চিত্রল হরিণ একমনে আমলকী খাচ্ছিল। মানুষের সাড়া পেয়েই এরা দৌড়ে বাগিচার আরও ভেতরে চলে গেল। ঢালু জমি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন বনমালী; খানিক দূরেই যেখানে টাল খেয়েছে, তার কাছে বয়ে গেছে ছোটো নদীটি। ফুটফুটে পরিচ্ছন্ন জল; নিচের মাছকেও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। রূপালি শরীরে লাল লাল ছোপ থাকা মাছগুলো ছোটো নদীর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে বসে আছে। মাছগুলো ভোরসকালে যখন আকাশ লাল হয়ে ওঠে, তখনই বেরিয়ে আসে; গর্তগুলোতে মাগুর, বামি, তোরা মাছ ভরে ভরে পড়ে থাকে।টালের এপারেও ছোটো নদীর পাড়েই গায়ে লাগানো দুটি আমলকী গাছ আছে; তার নিচেও একদল হরিণ। মানুষের সাড়া পেয়ে এরাও আরও ভেতরে দৌড় দিল। মৌজাদারের বড়োবাড়ির বাগিচা মানে একটি বড়ো অরণ্য; কত কী গাছ-গাছালি, বাঁশ, তৃণ, লতাতে ভরে পড়ে আছে! বাগিচার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তো সাধারণত কারও যাওয়াই হয় না; সেখানে অরণ্য আরও অনেক গভীর, সেখানে মনে হয় বাঘই ঢুকে বসে থাকে। হরিণগুলো থাকে এদিকটাতে; মানুষের আশপাশে নিজেদের নিরাপদ মনে করে। বাঘগুলো সবসময় মানুষের চোখে পড়ে না, যদিও মাঝে-মধ্যেই ছোটো নদীটিতে জল খেতে অনেকেই দেখেছে; কখনও-বা মৃত হরিণ আর শাবক সঙ্গে নিয়ে বাঘকে বসে থাকতেও কেউ কেউ দেখেছে।বাগিচার গায়ে লাগানো গোয়ালঘরে ভর্তি গরু; আজ অবধি একটাও ষাঁড় বা গরুর কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এই ছোটো নদীটির উৎস হচ্ছে মৌজাদারের ধানের খেতের ভেতরের একটি প্রকাণ্ড জলকুণ্ড; বনমালীর বাবা সেই জলকুণ্ড থেকে বেরিয়ে আসা এই ফুটফুটে জলের নালাটি দেখে এর পাশে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন।

    সাতসকালে আজ বনমালী সেই ছোটো নদীটির দিকে হাঁটা দিলেন। পেছনে পেছনে বড়োবাড়ির সবাই তাঁকে অনুসরণ করছে। মেয়েরাই কেবল যায়নি; সবাই দরজায় দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছে। শুধু ধনদা কাজের লোকগুলোর সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। ধনদার সব দিকে নজর; দুপুরের খাবারদাবার সারবার পরে সবাই মহিলাটিকে ঘিরে ধরে বসবে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করবে—কী হল, কীভাবে হল, কোথায় হল, কী হবে। ধনদা না হলে বড়োবাড়ির মেয়েমানুষগুলো নির্জন দ্বীপে বন্দি।পুরুষমানুষগুলোর সমানে সমানে পা চালাচ্ছে ধনদা। ধনদা শক্তপোক্ত স্বাস্থ্যবতী মেয়েমানুষ; ওর হাতের কবজির হাড়ের গঠন বহু পুরুষমানুষেরও নেই, কাঁধও বেশ প্রশস্ত। কিন্তু ওর পেশি স্থূল নয়, আঁটানো; ক্ষীণকটি, স্তন-নিতম্ব তাই খানিক বেশিই স্পষ্ট নজরে পড়ে। মেয়েমানুষের যেমন থাকে সচরাচর—তত লাজলজ্জা ধনদার একেবারেই নেই; কথাবার্তা চালচলনেও বিশেষ আড়ষ্টতা নেই। তাই মনে হয়, পুরুষের ভিড়ে ওর উপস্থিতিকে সবাই সহজভাবে নেয়। সেই ধনদা; কোমরে চাদর প্যাঁচিয়ে বনমালীর সঙ্গে হাঁটা দিতে দেখে কেউ অপ্রস্তুত হয়নি। আগে-পরে ওর কেউ নেই; বড়োবাড়িতেই বেড়ে উঠে ধনদা এখন ভরযুবতী।কোনো দিনে তখন হয়তো বড়োবাড়িতে একটিও পুরুষমানুষ নেই; খেত-মাঠে এদিকে-ওদিকে কাজকর্মে বেরিয়ে গেছে। বেরোল না একটা কুচকুচে কালো দাঁড়াশ সাপ! ওই ঢুকছে, প্রকাণ্ড এক দাঁড়াশ বাড়ির ভেতরে চলে আসছে। কী ভয়, কী চিন্তা! আছে না ধনদা! কিছু একটা বুদ্ধি করে সাপ তাড়াবেই। সেই ধনদা এখন বনমালীর বাড়ির কাজের লোকগুলোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হনহনিয়ে ছোটো নদীটির দিকে যাচ্ছে।বনমালীর হাতে একটি লাঠি। লাঠিটা বনমালীর বাবার দিনের। গামারি কাঠে তৈরি, মাথায় একটা সিংহের মুখ। লাঠি দিয়ে সামনের ঝোপঝাড়কে কোপাতে কোবাতে তিনি ছোটো নদীটির দিকে এগুচ্ছেন। তাঁর পেছনে পেছনে দা কোদাল নিয়ে বাড়ির মানুষগুলো। কারও মুখে কোনো কথা নেই।তাল গাছটির ফাঁক দিয়ে ভোরের রোদ উঁকি দিচ্ছে। চারদিকে এক রাঙা আভা ছড়িয়ে পড়ছে। সমস্ত মানুষগুলো চুপচাপ, কারও মুখে কোনো কথা নেই।

    "মৌজাদার প্রভু, আজ এত ভোরে যাচ্ছেন কই?'' গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্নটি শুনে সবাই ঘুরে তাকাল; বড়োফান্দি এসেছে। বড়োফান্দি শিপাঝাড়ের দিকের মানুষ—মাঝবয়সী মানুষটি প্রতিটি হাতি-মহলের সময় মৌসরাতে আসেন। বড়োফান্দি না হলে হাতি-মহলই শূন্য; শুধুই কি শূন্য? আসলে বড়োফান্দি না হলে হাতি-মহল চলেই না। তাঁর আসল নাম নরেন মেধি; সেই নাম কেউ জানে না, বড়োফান্দি বললে সবাই চেনে। ফাঁদে ফেলে হাতি শিকার করা তাঁর কাজ—তাই এই নাম। মাস ছয় মৌসরার হাতি-মহলে থাকবেন বলে তিনি আজই এখানে এসেছেন।বনমালীর বাড়িতে তাঁর জন্যে একটা ঘর আছে—দক্ষিণের কদম গাছটার নিচে। আজ বেশ কিছু বছর ধরে বড়োফান্দি এসে এই ঘরে থাকেন; ঘরটিতে ব্যবস্থাদি সব করে রাখা আছে। ইতিমধ্যে লেপে-মুছে, ঝেড়ে-ঝুড়ে সব ঠিক করে রাখা হয়েছে। তাঁর বাকি পরিবার শিপাঝাড়ের কাছে গ্রামের বাড়িতে থাকে; মেধিপাড়ার সবাই তাঁরই আত্মীয়-পরিজন। প্রতি শীতকালে তিনি এই মৌসরাতে এসে মাস ছয়েক থাকেন; এবারেও এসে কদমতলার ঘরটিতে নিজের তল্পিতল্পা রেখে এখন এখানে এসে পৌঁছেছেন।এসে দেখেন, বাড়ির দুয়ারে দুয়ারে শুধু মহিলারাই দাঁড়িয়ে আছে; পুরুষমানুষ একজনও নেই। ওদিকে এই সময়টায় পুরো বাড়ি কাজকর্মে প্রাণচঞ্চল হয়ে থাকে। কোনো এক মহিলা আঙুল উঁচিয়ে ওই ছোটো নদীটির দিকে দেখিয়ে দিল।বড়োফান্দি যতক্ষণে গিয়ে মানুষগুলোর নাগাল পেলেন এরা ততক্ষণে ছোটো নদীর কাছ চেপেছেন।কলকল শব্দে ছোটো নদীটি বয়ে চলেছে। লোকে এই নদীকে সুগরীজান বলেই চেনে এসেছে। নদীর পাড়ে পাড়ে আমলকি গাছ কয়েকটিতে যখন ফল আসে সেই ঋতুতে প্রায়ই হরিণের ঝাঁক দেখা যায়। সুগরী মানে হরিণ, জান ছোটো নদী বা ছড়া। সুগরিজান হরিণছড়া। সেই থেকে মনে হয় এই নাম। নদীর জল অত্যন্ত পরিষ্কার, বারোমাস জল একই রকম থাকে।

    মৌজাদারের বড়োবাড়ি থেকে সামান্য দূরে থাকা জলের কুণ্ড একটার থেকেই এই নদীটি বেরিয়েছে; সেখান থেকে গিয়ে নাগনদীতে গিয়ে মিলেছে। সুগরীজানটি একরকম বড়োবাড়ির সম্পত্তির মতোই হয়ে গেছে। সুগরীজানের পাশে পাশেই বিস্তৃত হয়ে আছে চৌধুরি পরিবারের বাড়ি আর বাগিচা। জলের কুণ্ডটি থেকেই আসলে চৌধুরিদের বড়োবাড়ির ঝোপঝাড়ে ঢাকা বাগিচাটি শুরু হয়েছে। মৌসরার লোকে খুব দরকার না পড়লে এই নদী ব্যবহার করে না; নাগনদী থেকে এতে ঝাঁকে ঝাঁকে ঢোকে মাছ—সুগরীজানের সেই মাছেতেও হাত দেয় না।
    সুগরীজানের পাড়ে দাঁড়িয়ে জোর গলায় চৌধুরি আদেশ দিলেন, "তোদের যে কাজটি করতে হবে—এই সুগরীজানকে বাড়ির ভেতর দিয়ে বইয়ে দিতে হবে।'' কী বলেন মৌজাদার প্রভু! ভগবানের দেওয়া জিনিস একটাকে কী করে বাড়ির ভেতরে টেনে নিয়ে যায়? ভার বেঁধে, পোঁটলা করে, না চাঙে তুলে? সবাই মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

    "কী হল তোদের? কারও মুখে রা নেই যে!''

    না, কারও মুখ থেকে একটা টু শব্দ বেরুল না।

    "আর কদিন পরে বাড়ির সামনের উঠোনে হাতি-মহলের ডাক হবে; নারায়ণ বরুআ এসে পড়েছেন। আসবে, সবাই আসবে।'' মৌজাদার ঘোষণা দিলেন।

    "গোয়ালপাড়ার জমিদার আসবেন; ধুবড়ির জমিদার আসবেন; নলবাড়ি, লক্ষীমপুরের মহলাদার আসবেন। নংপোর মহলাদারও আসবেন। ''

    কথাগুলো শুনেই সবাই ফিরে বড়োফান্দিকে দেখতে পেল; বড়োফান্দি এসে গেছেন তাহলে। গতকাল তাঁর ঘর ঝাড়ামোছা করতে সবাই দেখেছিল; হাতি-মহলের দিনও এসে গেছে। মানুষটিকে দেখে সবার কথাগুলো মনে পড়ল। চৌধুরিও ঘুরে তাকালেন,""বড়োফান্দি, তুমি এসে গেছ? ব্যবস্থা সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে তো?''

    "কেন হবে না মৌজাদার প্রভু? এই বাড়িতে একটা ফড়িঙের জন্যেও ব্যবস্থা করে রাখা থাকে।'' চৌধুরিকে দণ্ডবৎ করলেন বড়োফান্দি।

    চৌধুরি গর্জে উঠলেন,""এই বাড়িতে সকালে উঠে দেখবে এক লোটা জলও থাকে না! এত এত অতিথি আসবেন; হাত-পা ধুতে এক ফোঁটা জল পাবেন না। এই সব অলস অকর্মণ্যের দল আমি এমনি এমনি পালছি!'' ক্ষণিক থামলেন; ফর্সা মানুষটি লাল হয়ে গেছেন, গলার স্বর আরও দৃঢ়। ""এই গদাধর যেখান দিয়ে ঢোকে, সেই তোরণের পাশ দিয়ে তোরা এই সুগরীজানকে টেনে বইয়ে দে; সবাই সেই জলে হাত-পা ধুয়ে বড়োবাড়িতে ঢুকবে।''

    "এ তো আর ব্রহ্মপুত্র নয়, সুগরীজান; বইয়ে দেওয়া যাবে না কেন?'' নারীকণ্ঠ শুনে কেউ ফিরে তাকাল না; সবাই জানে এ ধনদা বলছে। ধনদা ব্রহ্মপুত্র নদী দেখেনি, এর কথা শুনেছে মাত্র; বড়ো মাহুতের কাছে শুনেছে, ব্রহ্মপুত্র বুঝি এত বড়ো নদী যার এপার-ওপার দেখাই যায় না।

    ধনদার নরম স্বরে যেন বনমালীর গর্জনের থেকেও বেশি জোর ছিল; সবাই সম্মতি জানাল, "তাই তো, না পারবার কী আছে?'' বড়োফান্দি গিয়ে সুগরীজানের পাড়ে দাঁড়িয়ে মাটি একটু এক কোপে খুঁড়েই ফেললেন। বেশি কথা বলিয়ে লোকই নন, কাজের মানুষ এই বড়োফান্দি; হৈ-হৈ করে কাজে নেমেই পড়লেন। কথাটি রাষ্ট্র হতে বেশি সময় লাগল না; সর্বত্র হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেল—মৌজাদার বাড়ির উঠোনে নিয়ে আসছেন সুগরীজানকে। গাঁয়ের লোকও দুই-চারজন এসে গেল; সবাই হাতে-কাজে নেমে পড়ল।দুপুরের দিকে সুগরীজানের স্রোত এসে ঠাকুরঘর ছুঁয়ে ফেলল প্রায়। বড়ো বড়ো পিতলের গামলা নামানো হল, গামলায় গামলায় চিঁড়ে ভেজানো হল; গাছ থেকে পাড়া নারকেল গোটানো ছিলই, সেগুলো বের করে আনা হল। কুরিয়ে কুরিয়ে কড়াইয়ের পর কড়াইতে কলাপাতায় ঢেকে রাখা হল; রান্নাঘর থেকে গুড়ের কলসি নামানো হল। বড়োফান্দি কেটে ফেলে দিয়েছিলেন কিছু আঁটি কলার গাছ; তার খোলাতে ডোঙ্গা তৈরি হল। ভুটিয়ারা এসে থাকে যে ঘরটায়, তার পাশের মাটিতে কখনও-বা ধান শুকোনো হয়; সেখানে কলকাতা থেকে নিয়ে আসা ক্যানভাসের খাকি রঙের তেরপাল ফেলে দেওয়া হল। তাতেও সবাইকে ধরল না।সবাই এই হালকা জলপান সেরে উঠতে না উঠতেই সুগরীজানের ছোটো ধারাটি এসে হাতি-তোরণ ছুঁয়ে পেছনের উঠোন অবধি পৌঁছেই গেল; এর পরের কাজগুলো জলের ধারা নিজেই করে গেল। পেছনের উঠোন থেকে আবার সুগরীজানের দিকে একটা ঢালু জমি আছে; সেই জমি দিয়ে জলের ধারা এমনি এমনি নেমে গেল। কাজের লোকে সঙ্গে সঙ্গে মাটি কুপিয়ে খুঁড়ে গেল মাত্র। ওই পথে রাখা ছিল মাংস কাটবার জন্যে কটি কাঠের গুঁড়ি; কেউ কখনও এই পেছনের উঠোনে শালগাছের গুঁড়িটা পুঁতে রেখেছিল, কেউ খেয়াল করেনি। গুঁড়িটা আছে; প্রায়ই এই বাড়িতে হরিণ বা খাসি কাটতে হলে এখানেই ফেলে কাটা হয়। মাংস কাটতে কাটতে গুঁড়িটা মসৃণ হয়ে পড়েছে।মৌজাদার সেই ভোরসকাল থেকে উপোসই আছেন, এক কাপড়ে আছেন; পায়ে নেই পাদুকা, এমনকি এক ফোঁটা জলও মুখে দেননি, ভেতরে ভেতরে তখনও কাঁপছেন। কী করলেন তিনি? পবিত্র জলের ধারাতে হাত দিয়ে দিলেন! একটা কুয়োও তো খুঁড়তে পারতেন, অথবা একটা ছোটো পুকুরও খুঁড়তে পারতেন; নদীটায় হাত দিতে গেলেন কেন? তার চোখের সামনে আসা-যাওয়া করছে একটি ডোরাকাটা বাঘ; দিনভর তার সঙ্গ ছাড়েনি সেই বাঘ।

    মানের আক্রমণের দিনে উজানের বহু পরিবার এই ভাটির দিকে এসেছিল। গোলাঘাটের থুকুবিল অঞ্চল থেকে একটি পরিবার সমস্ত পুথি-পাঁজি নিয়ে নৌকায় করে গুয়াহাটির উজানবাজারে পৌঁছেছিল; সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেছিল থুকুবুলীয়া নামঘর। সেরকমই মানের ভয়ে গুরুদেবের দেওয়া হাতিদাঁতের পাদুকা, সাঁচিপাতের পুথি-পাঁজি বুকে ধরে উজান থেকে এই উত্তরাঞ্চলে পালিয়ে এসেছিল চৌধুরি বংশের একটি শাখা। এই অঞ্চলেই বাসা করে তারা বসবাস শুরু করেছিল; শীঘ্রই এই চৌধুরি পরিবার এলাকাতে একটি সম্মানের জায়গা করে ফেলল।ভুটিয়া রাজাকে কর-রাজস্ব তুলে দেবার কাজকারবার করত পরিবারটি। এর পরে সাদা সাহেবেরা এসে ভুটিয়াদের এখান থেকে দিল তাড়িয়ে; নাচনডুবি থেকে একেবারে সোনাপুর অবধি এলাকা শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের ছেড়ে দিয়েছিল ভুটিয়ারা। পুরো অঞ্চলের মাটি ছিল খুব উর্বর; পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী-নালা পুরো এলাকাটিকে উর্বর করে রাখে, জল কোথাও জমা হয় না। উর্বর মাটিতে একটা বীজগুটি পড়লেই তার থেকে চারা গজায়; বিশেষ করে জংলি কমলা এখানটায় খুব ফলে।তার ওপর এখানকার জনজাতি মানুষজনের বাগিচাতে ঝাড়ের মতো এক রকমের গাছ থাকে; সেই ঝোপের মতো গাছের সবুজ পাতা শুকিয়ে লোকগুলো গরম জলে সেদ্ধ করে পান করে। এখানকার লোকজনের ম্যালেরিয়া হত খুবই কম; পরে সাহেবরা এসে আবিষ্কার করে—এই গাছগুলো চা-গাছ ভিন্ন আর কিছুই নয়। শ্বেত সাহেবেরা এলাকাটির মৌজাদারের দায়িত্ব তুলে দেয় তখন এই পরিবারটির হাতে; বনমালী চৌধুরির বাবাকে ব্রিটিশ সরকার মৌসরার মৌজাদার পদে নিয়োগ করে। সাহেবরা বড়ো সেয়ানা; তারা ঠিক বুঝেছিল অঞ্চলটি একটি সোনার খনি। মঙ্গলদৈর সরকারি দপ্তর থেকে মৌজার কাগজপত্র সমঝে নিয়েছিলেন বনমালীর বাবা; মৌসরা গ্রামে তাঁকে মৌজাদারের কার্যালয় বসাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

    মঙ্গলদৈর সরকারি কার্যালয়ের কাগজপত্র সমঝে নেবার পরেই বনমালীর বাবা এই মৌসরাতে এসেছিলেন। ভোরে ভোরে মঙ্গলদৈ থেকে বেরিয়ে এই মৌসরাতে পৌঁছাতে তাঁর বিকেল হয়ে গিয়েছিল; এখানেই বিশ্রাম করছিলেন। এখানেই তো থাকতে হবে; দু-একটা বাড়িঘর কোনো-বা ফাঁকে এখানে-ওখানে চোখে পড়ছিল, তার মাঝখানে চাষের মাঠ। উর্বর এলাকা জুড়ে চারদিকে কেবলই জঙ্গল আর জঙ্গল; নাগনদীর পাড়ে পাড়ে অতি সামান্য লোকবসতি। শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে প্রকাণ্ড হয়ে পড়া একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে হাতি রেখে বিশ্রাম করতে করতে তিনি চারদিকে তাকাচ্ছিলেন। মৌজা চালাতে হলে এখানে থাকতে হবে—কোথাও একটা বাড়িঘর বসাতে হবে, পরিবারের বাকি লোকজনকে এনে রাখতে হবে।হাতির পিঠে বসেই তিনি নাগনদীর পাড়ে পাড়ে গড়ে ওঠা গ্রামটির দিকে তাকালেন। না, হবে না; এই গ্রামে তাঁর বাড়ি করা হবে না। লোকালয় থেকে মৌজাদারের বাড়ি কিছু দূরে হতে হবে। হাতির পিঠে বসেই তিনি চারদিকে তাকাচ্ছিলেন; উঁচু হাতির ওপর থেকে গ্রামের বহুদূর অবধি নজরে পড়ে। পেছনে ময়ূর-পালকের রঙের দেখতে ভুটান পর্বতমালা; যতদূর চোখ যায়—বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে মাঝে নাগনদী। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে এখানে একটু ওখানে একটু উঁকি দিয়ে জলের স্রোত আঁকাবাঁকা পথে এসে এই নাগনদীতে পড়ছে। ছোটো নদীর স্বচ্ছ জল আর নাগনদীর ঘোলা জলের তফাতটা ভালো ধরা যায়।ঝপ করে শব্দ একটা শুনে তিনি চমকে উঠেছিলেন; হাতে বন্দুক তুলে নিলেন। একটি প্রকাণ্ড ডোরাকাটা বাঘ কোত্থেকে এই ছোটো নদীতে চলে এল! হাতির পিঠেই তিনি স্থির হয়ে গেছিলেন। ভুটান পাহাড় অবধি এক গভীর অরণ্য এই মৌসরা থেকে ছড়িয়ে আছে; অসংখ্য নদী-নালা এখানে। যাওয়া-আসার পথে এখানে বাঘের সামনে পড়াটা একেবারেই সাধারণ কথা। যদিও বাঘে আজ অবধি কোনো মানুষের কোনো অপকার করেছে বলে শোনা যায়নি। বনমালীর বাবাও অনেক বাঘ দেখেছেন; কিন্তু এই বাঘকে কেউ কখনও দেখেছে কি না তিনি জানেন না। শরীরের হলদে অংশটি থেকে যেন একটা দ্যুতি ছিটকে বেরুচ্ছে; হলুদের মাঝে মাঝে কালো কালো ডোরা অদ্ভুত সুন্দর ঝিলিক দিচ্ছে। এর চলার মধ্যেও আছে এক সমীহ জাগানো গাম্ভীর্য—দেখলে এমনিই মাথা নুয়ে আসে। নীলচে চোখ জোড়াতে তাঁর চোখ পড়ল; এক সম্মোহিত অবস্থা!নদীর উজান ধরে বাঘটি এগোচ্ছিল; মাঝে মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে, আবার পা চালায়। হাতিকে "আগেত' বলে তিনিও এগোতে থাকলেন। সূর্য তখন ডুবছিল; ছোটো নদীটির পাড়ে পাড়ে নুয়ে পড়া বাঁশগাছের সারি। নাগনদী আর সুগরীজানের পাড়ে পাড়ে এই বাঁশবন; বাঁশের হেলে নুয়ে পড়া ডগার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে একেকবার দেখা দিয়ে বাঘটি এগিয়ে যাচ্ছে, আর সুগরীজানের পাড়ে পাড়ে হাতি চড়ে যাচ্ছেন একটি মানুষ। নদীর মাঝের একটা জায়গাতে গিয়ে বাঘটি দাঁড়িয়ে পড়ল; সেখানে একটা জলের কুণ্ড আছে। শীতে যখন সুগরীজান শুকিয়ে যায়, এই গর্তে তখনও জল থাকে—শুকোয় না। কুণ্ডের জল ঠান্ডা আর অত্যন্ত স্বচ্ছ; সেখানে দাঁড়িয়ে বাঘটি জল খেতে শুরু করল। নানান গাছ, বিশেষ করে বাঁশগাছের ফাঁক দিয়ে ওর গায়ে রোদের কমলা রং ঠিকরে পড়ছিল; বিশাল এই ডোরাকাটা বাঘটিকে দেখে মনে হচ্ছিল অপার্থিব কিছু! হাতির পিঠে বসে মানুষটি বাঘকে একটা নমস্কার জানালেন।শেষবারের জন্যে জলে চুমুক দিয়ে উঠে বাঘটি হাতি আর হাতি সওয়ারের দিকে তাকাল। বাঘটা যদি ঝাঁপ দেয়, তবে একেবারে হাতির মাথা অবধি উঠে আসবে; উলটে সে হঠাৎ এক গর্জন করে ঝাঁপ দিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। মানুষটি বহুক্ষণ হাতির পিঠে বসে রইলেন; বাঘটি কি ফিরে আসবে? এত দিনের অভিজ্ঞতার থেকে তিনি বুঝলেন—আর আসবে না। ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলেন তিনি; নদীর জল তাঁর হাঁটু অবধিই। গিয়ে তিনি কুণ্ডটির কাছে দাঁড়ালেন। এই কুণ্ড থেকে ভুরভুর করে জল বেরিয়ে নালার মতো অনবরত বয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে তাকিয়ে দেখলেন, নদী থেকে উপরের দিকে উঠে গেছে একটুকরো উর্বর উঁচু জমি; শিশু, ছাতিম, পাকুড়, গামারি আদি গাছে গিজগিজ করছে পুরো জায়গাটি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন—এখানেই তিনি বাড়ি করবেন।কুণ্ডের কাছের বালিতে একটি প্রকাণ্ড বাঘের পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে; ভক্তিভরে তিনি সেই দুটি পায়ের চিহ্নের বালি গামছাতে বেঁধে নিলেন। তারপরে হাঁটু মুড়ে সেই কুণ্ডের জল মাথায় নিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, এই অসম্ভব সুন্দর বাঘটিকে গুরুদেব শংকর পাঠিয়েছেন; গুরুর আদেশেই বাঘটি এসে তাঁকে বাড়ি তৈরির জমিটি দেখিয়ে গেল। মর্ত্যের জন্তুর এমন স্বর্গীয় জ্যোতি থাকতেই পারে না! হাঁটু মুড়ে আরও একবার বাঘের পায়ের চিহ্নে প্রণাম করলেন। বালি বাঁধা গামছা নিয়ে তিনি পাড়ের দিকে এগোলেন; সেখানে তাঁর সঙ্গে আসা লোকজন অপেক্ষা করছে, তাদের তিনি জানাবেন—এখানেই তিনি বাড়ি করবেন।

    সেই বালিগুলো এখনও একটি ভোগজরাতে৩ রাখা আছে ঠাকুরঘরে; এই বালির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাঘের গল্পও এই বড়োবাড়িতে বহুবার হয়ে গেছে। মৌসরার বহু লোকেই গল্পটি জানেন; এই ঠাকুরঘর, এই বড়োবাড়ির প্রতি লোকের ভয় আছে, আছে ভক্তি। সেই বাঘটি এখন বনমালীর কাছে কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে; ভেতরে ভেতরে মদমত্ত মানুষটি বিব্রত বোধ করছেন। বাইরে কাজের লোকগুলোর মধ্যে উৎসাহ বেড়েই চলেছে; সুগরীজান এসে উঠোনে পৌঁছে গেছে।পেছনের উঠোনের হরিতকী গাছের নিচেই আছে সেই মাংস কাটার কাঠের গুঁড়িটি। মাংস কাটতে কাটতে মসৃণ ও ছোটো হয়ে গেলেও এখনও বেশ শক্তপোক্ত, শালকাঠে তৈরি; মানুষ একজন আয়েশ করে তাতে বসতে পারে। কত যে হরিণ-ছাগল এই গুঁড়িতে কুপিয়ে কুপিয়ে কাটা হয়েছে! বড়োবাড়ির কত উৎসব পার হল—পূজা-পার্বণ, ভোজ-উৎসবে সের-সের, মনের পর মন মাংস কাটা হল। গুঁড়িটির কাঠের রঙও লালচে হয়ে পড়েছে।

    শান্তিপ্রিয়া—সেই যে অকালে চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে, সারাক্ষণ আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকেন—মহিলাটি ছিলেন বা কই? হঠাৎ ছোঁ মেরে এসে এই গুঁড়িটির কাছে দুই হাত নেড়ে বিড়বিড় করতে শুরু করলেন। বোঝাই যাচ্ছে মানুষটির ভীষণ রাগ চড়েছে; কিছু একটা ভয়ঙ্কর শঙ্কার কথা জানিয়ে আপত্তি জানাতে চাইছেন। এই আধা পাগলি মানুষটির এখানে উপস্থিতির কিছু একটা অর্থ আছে; কেউ তাঁকে উপেক্ষা করতে পারে না। লোকগুলো কাজ বন্ধ করে তিনি কী বলতে চাইছেন বুঝবার চেষ্টা করল।মাংস কাটার গুঁড়িটার চারপাশে ঘুরতে শুরু করলেন শান্তিপ্রিয়া; বড়ো সন্তর্পণে ঘুরছেন তিনি। যেন কাঠটিতে আগুন আছে, অথবা ফণা তুলে একটি বিষধর সাপ, অথবা একগুচ্ছ গা-রি-রি করা বিছা! গায়ের কাপড় কুঁচকে ধরে যেন ভয়ঙ্কর কিছু থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, হাত নেড়ে নেড়ে কাঠের টুকরোর চারপাশে তিনি ঘুরছেন। লোকগুলো হতভম্ব হয়ে একবার তাঁর দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার তাকাচ্ছে মৌজাদার প্রভুর দিকে—কী বা আদেশ করেন তিনি!ওদিকে লোহার কোপে কাটা সুগরীজানের জল বয়ে এসে, খানিক মাটি ধসে যাওয়া কাঠের টুকরোটির পাশে এসেই পড়েছে। কেউ কিছু বুঝতেই পারেনি; কথাগুলো ধরতে পেরেছেন শুধু মৌজাদার নিজে। এই মহিলা চৌধুরির বাবার ছায়াসঙ্গী ছিলেন; সে সব জানে। ঠাকুরঘরের লোটাতে রাখা বালির রহস্যও জানে। সে সেই পবিত্র বলে গণ্য করে আসা কুণ্ডের জল এসে মাংস কাটার কাঠের গুঁড়িতে ছুঁবে—এটা চাইছেন না।

    "চট করে কাঠের গুঁড়িটা তুলে দে!'' কথাটা বলে যেন তাঁর বুকটা অল্প হালকা বোধ হল।

    "সুগরীজানের জলে ছোঁবার আগেই এই কাঠের গুঁড়ি তুলতে হবে!'' তাঁর বিব্রত দশা অনেকখানি কমে এল।

    বলাটা সহজ; মাটির গভীরে বসে যাওয়া কাঠের টুকরো, তোল বললেই কি তোলা সম্ভব? ইতিমধ্যে পেছনের উঠোনে বইয়ে আনা হয়েইছে সুগরীজানের জলের ধারা। তাড়াতাড়ি করে মাটি, বালি, পাথর—হাতের কাছে যা পাওয়া গেল তাই—দিয়ে জলের স্রোতে বাঁধ দেওয়া হল। মৌজাদারের কড়া হুকুম, কোনোভাবেই জলের ধারা গিয়ে এই মাংস কাটার গুঁড়িটা ছুঁতে পারবে না; ছোঁয়া তো দূর, জলের একটা ছিটেও ওই কাঠের টুকরোতে পড়তে পারবে না। হুলস্থুলের মধ্যে মহিলাটি নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন।

    মৌজাদার তাঁর গম্ভীর গলাতে সবাইকে বলে যাচ্ছেন, ""সুগরীজানের পবিত্র জল যেন কিছুতেই এই খাবার জন্যে কাটা জীবজন্তুর রক্তমাখা কাঠটা ছুঁতে না পারে, দেখবি!''

    তাঁর বিচার দেখে সবাই ধন্য ধন্য করতে থাকল।

    মাংস থ্যাঁতলা করতে করতে কাঠের গুঁড়িটা অনেক নিচে বসে গেছে; চারপাশে খুঁড়েও তোলা যাচ্ছিল না। ওদিকে বয়ে আসা সুগরীজানের জল বালির বাধাও মানছে না—এই ভাঙে কি সেই ভাঙে! ছোটো ছোটো ফাঁক দিয়ে জল চুইয়ে আসতে শুরু করেছে।

    একচুলও নাড়াতে পারেনি গুঁড়িটা; বেশ কজন মোটা-গাট্টা লোক গুঁড়িটাকে ঝাঁকিয়ে নড়াবার চেষ্টা করেও পারছে না। শেকড় বেরুল বুঝি কাঠটির? কী বলে মানুষটি—মরা কাঠের টুকরোতে আবার শেকড় গজায় বুঝি? এত এত জীবের রক্ত খাওয়া কাঠ, যে-সে কাঠই নয়; লোকগুলো যে যা পারে তাই বলে যাচ্ছে। বহু ঠেলাধাক্কা দিয়েও কাঠটি নাড়াতে পারেনি। বড়োফান্দি জলের স্রোতে বাঁধ দিচ্ছিলেন; তিনি এসে এই গুঁড়িটার পাশে দাঁড়ালেন। পরনের গামছাটি নিচ দিয়ে নিয়ে গিয়ে কোমরে আঁটসাঁট করে আটকালেন; আকারে গামছাটি যে-কোনো মানুষের গায়ে চাপানো চাদরের সমানই হবে। তাঁর স্ত্রী রূপেই আলাদা করে তাঁত বসিয়ে গামছাটি বুনেছেন। আঁটি কলার চারার মতো হাঁটু অবধি পা বেরিয়ে গেল; পা দুটো সামান্য ফাঁক করে দাঁড়ালেন। কাঠের গুঁড়ি যেন একটির জায়গাতে তিনটি হল! বড়োফান্দি গুঁড়ি ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন; চারপাশের মাটি নরম হয়েইছিল, এক টানে গুঁড়িটা মাটি ছেড়ে উঠে এল।

    "এটা ওই ওদিকে নিয়ে গিয়ে পুঁতে দে গে যা!'' চৌধুরি আদেশ দিলেন। লোহার মতো এত শক্ত হয়ে পড়া কাঠ আরও একটা পাওয়াই বা যাবে কই? তার ওপরে দু-দিন পর হাতি-মহলের কাজ শুরু হবে; কত মানুষ এসে এই বড়োবাড়িতে অন্ন গ্রহণ করবে, কত যে মাংস কাটা হবে!

    লোকে হৈ-হৈ করে বালির বাঁধ দিল ভেঙে। সুগরীজান মৌজাদারের বাড়ির সামনের উঠোন দিয়ে এসে ঠাকুরঘরের উত্তর দিকে গিয়ে পেছনের উঠোন হয়ে, আবার ঢালু জমি দিয়ে কুণ্ডের কাছে গিয়ে তাতেই মিলিয়ে গেল। সুগরীজান নদীভরা ছোটো ছোটো মাছের ঝাঁক নতুন জলের ধারা বেয়ে চলে এল; উঠোনে একঝাঁক রূপালি মাছ সাঁতার কাটছে। সবাই বড়ো মজা পেল।ইতিমধ্যে মাষকলাইয়ের ডাল, বাগিচা ভরে ফলানো ঢ্যাঁড়শ, সঙ্গে রাই-সর্ষে আর কাঁচালঙ্কা পিষে দিয়ে তৈরি তরকারি করা হয়েছে; ভাত তো হয়েই গেছে। সবাই নতুন স্রোতের জল মাথায় ছিটিয়ে খেতে বসল; কাজের লোকজনের সঙ্গে চৌধুরিও পুরো দিনের উপোস ভাঙলেন।

    ক্রমে ক্রমে চারদিকে রটে গেল—মুজাদার মশাই সুগরীজানকে এনে বড়োবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পুরো মৌজার মানুষজন এসে এই নতুন জলের ধারায় হাত-মুখ ধুয়ে তবেই বড়োবাড়িতে প্রবেশ করে দেখতে শুরু করল। হাতি-তোরণের পাশ দিয়ে নয়া সুগরীজান বাড়ির পেছন দিকে গিয়ে বইতে শুরু করেছে; কদিন পরেই হাতি-মহলের লোকজনও চলে আসবে। নয়া সুগরীজানে হাত-মুখ ধুয়েই এরা বড়োবাড়িতে প্রবেশ করবে।

    সত্যিই সেদিনই সুগরীজান এসে মৌজাদারের বাড়ি পৌঁছে গেল; বাড়ির উঠোনে এসে সে হয়ে গেল নয়া সুগরীজান।



    টিকাঃ
    ১। কপৌ: আসামের এক ঐতিহ্যবাহী বুনো অর্কিড (Rhynchostylis retusa), যা "কপৌ ফুল' নামে পরিচিত। অসমিয়া সংস্কৃতির এক অমোঘ অঙ্গ এবং বহাগ বিহুর সময় তরুণীরা খোপায় এই ফুলের থোকা গুঁজে নাচেন।
    ২। সাঁচিপাত: প্রাচীন আসামে পুথি লেখার কাজে ব্যবহৃত সাঁচি বা অগরু গাছের (Aquilaria malaccensis) বিশেষ পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা বাকল বা ছাল। এই ছাল অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ও পোকা-প্রতিরোধী হওয়ায় প্রাক-ব্রিটিশ কালের সমস্ত মূল্যবান পুথি-পাঁজি এই সাঁচিপাতেই খোদাই করে লেখা থাকত।
    ৩। ভোগজরা: আসামের বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও নামঘরের এক ঐতিহ্যবাহী পবিত্র কাঁসার বা পিতলের তৈরি জলপাত্র বা ঘটি, যার গায়ে চমৎকার নকশা ও দীর্ঘ সরু নল থাকে।






    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩
  • ধারাবাহিক | ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন।