এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • কৃষ্ণনগরে কাজী - পর্ব চার

    ইনাস উদ্দীন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  • অলংকরণ: রমিত



    ৭

    গোয়াড়ি বাজারের হইচই কমে এসেছে। রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মসুর ডাল, সর্ষের তেল ফুলকপির পাতা আর কাঁচা গোবর জড়াজড়ি করে ছড়িয়ে থাকা দেখেই বোঝা যায় সকাল থেকে কিরকম ভিড়ভাট্টা ছিল। কয়েকটা মোষের গাড়ি এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে। মোষগুলো চাকাতে বাঁধা, তাদের সামনে ফুলকপির পাতা জড়ো করা। 'বাজার তো বেশ জমজমাট দেখছি!'
    কিছুটা স্বগত ভাবেই যেন নজরুলের কন্ঠে বিস্ময় প্রকাশিত হলো।

    তারক দাস বললেন, 'এখন আর কী দেখছেন কাজীদা? সকালের দিকে এই রাস্তায় হাঁটাচলাই দায়। গরুর গাড়ি ঘোড়ার গাড়ি আর সারাক্ষণ ক্যাচর ম্যাচর ধাক্কাধাক্কি লেগেই আছে'।
    হেমন্ত সরকার কিছুটা আগে আগে হাঁটছিলেন। নজরুলের দিকে ফিরে কথায় যোগ দিলেন - গোয়াড়ির সেই রমরমা এখন তো বলতে গেলে কিছুই আর নেই। এদিকে বাঙালঝি, স্বর্ণখালি, বগুলা, ওদিকে ফুলিয়া, বেলপুকুর - সব জায়গা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখানে জড়ো হতো। বগুলা ছাড়া তো ট্রেন ছিল না, খ'ড়ে নদীতেই তখন বাণিজ্যের বহর চলত। পরে লালগোলা পর্যন্ত লাইন হলো, কৃষ্ণনগরে স্টেশন হলো, গোয়াড়ির জৌলুস হারিয়ে গেল।

    - বলেন কী দাদা! হারানো জৌলুসের যদি এই চেহারা হয় তাহলে যৌবনে কী চেহারা ছিল?

    - তুমি কবি মানুষ, নিজে কল্পনা করে নাও।

    বলতে বলতে হেমন্ত সরকার গোলাপট্টির রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে একটা গলির ভিতর ঢুকে পড়লেন। ভিতরে বললে ভুল হবে, একরকম গলির মুখেই একটা কাঠের ফটকওয়ালা বাড়ি। বাঁদিকের থামে একটা পিতলের ফলক, তাতে ইংরেজিতে লেখা 'ডা. নগেন্দ্রনাথ দে, এফ আর সি এস'।

    ফটক পেরিয়ে ছোট একটু উঠোন। বাঁদিকে পাশাপাশি দুটো দেবদারু গাছ, তাদের মাঝে ঢেউ খেলানো লম্বা একটা কাঠের বেঞ্চি, রোগীদের বসার জন্য নিশ্চয়। ডানদিকে কপিকল ঝোলানো একটা ইঁদারা। সবকিছুই বেশ পরিপাটি করে সাজানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এক লহমার মধ্যেই পাইকারি বাজারের হইচই, গাড়ি-ঘোড়া আর কটু গন্ধ - কোথায় যেন উধাও হয়ে গিয়েছে। শান্ত নিরিবিলি এক মনোরম পরিবেশ, ইঁটের লাল নকশা কাটা দেওয়াল - ডাক্তারের কাছে যাবার আগেই অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যাবার কথা। নজরুলের যেন ঘোর কাটে না। তবে বারান্দার কাছাকাছি যেতেই বৈঠকখানার ভেতর থেকে উচ্চকণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসছিল - পরিবেশের সাথে একেবারেই বেমানান। তারক দাস দ্রুত উচ্চকণ্ঠের অধিকারীর কাছে পৌঁছে গিয়ে বললেন, 'কাশীদা, আমরা এসে গিয়েছি।' চওড়া একটা কাঠের টেবিলে গুচ্ছের শিশি-বোতলের জঙ্গলের ভেতর ওষুধের দাগ নিয়ে কাউকে জোর বকাবকি করছিলেন ভদ্রলোক। সেসব রেখে সসব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন - 'মেজদাবাবু, আসুন আসুন। ডাক্তার বাবু আপনাদের কথাই বলছিলেন। একটুখানি বসুন, একটা রোগী আছে ভিতরে। এই এক্ষুনি হয়ে যাবে।'

    বিশিষ্ট রোগী বলে কথা। একটা বেঞ্চিতে অভ্যাগতদের বসিয়ে কাশীনাথ আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রোগা লম্বা শরীরে একটা তুষের চাদর জড়ানো। তবে তাকে দেখে মনে হচ্ছে না শীতের প্রাবল্য তেমন আছে। টেবিল জুড়ে ছড়ানো নানা আকৃতির বোতল আর পাউডারের কৌটো। গোটা তিনেক কাঠের আলমারি দিয়ে একটা পার্টিশন করা আছে। ভিতরে ডাক্তার বাবুর চেম্বার। প্রবেশপথে একটা নীল রঙের পর্দা ঝোলানো। সবকিছুর মধ্যেই একটা সম্ভ্রান্ত রুচির ছাপ স্পষ্ট।

    একটা শিশুকে নিয়ে দু'জন মহিলা বেরিয়ে আসতেই কাশীনাথ সবাইকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লেন। চেম্বারের ভেতরটাও যেন পরিপাটি পরিচ্ছন্ন। পিছনে মাথার উপর যীশু কোলে মাতা মেরীর ছবি। জানালার পাশে ফুলদানিতে টাটকা রজনীগন্ধা। রোগী শোওয়ার বেঞ্চিটাও মনে হলো তোষক দেওয়া, টানটান করা একটা আকাশী-নীল চাদরে ঢাকা। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানানোর ভঙ্গিতে মাথাটা ঈষৎ নিচু করে স্মিত হেসে বললেন - সেই দুপুর থেকে অপেক্ষায় আমার দাওয়াখানায় কখন বিদ্রোহী কবির আবির্ভাব হবে।

    কথার মধ্যেও একটা পারিপাট্যের আছে। এরকম একজন মিষ্ট-মেজাজী ডাক্তারের অমন তিরিক্ষি কম্পাউন্ডার হয় কী করে কে জানে।

    - না, নগেনদা, খুব দেরি কিন্তু হয় নি। শীতের বেলা, দুপুর হতেই বিকেল। ডাক্তারের সামনে বসতে বসতে হেমন্ত সরকার বললেন।
    - রাজনীতির নেতা-মানুষদের ক্ষেত্রে অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। তোমাদের সকাল মানে আমাদের বিকেল। তা তুমি তো শুনছি স্বদেশীর পালে নতুন হাওয়া লাগিয়ে দিয়েছ - জমিদাররা তো এবার কংগ্রেস ছেড়ে লাটসাহেবের দলে যোগ দেবে!
    - আপনি তো অনেক খবরই রাখেন দেখছি। সেই হাওয়াতে ঝড় তোলার জন্যই তো বিদ্রোহী কবিকে কেশনগরে নিয়ে আসা! কিন্তু ম্যালেরিয়া তো ওর পিছু ছাড়ছে না। এবার আপনার পালা, ওকে তাড়াতাড়ি চাঙ্গা করে দিতে হবে।
    - তা কবি-গৃহিণী সঙ্গে আসেননি? আমারও সাক্ষাৎ হয়ে যেতো!
    - সে নাহয় আরেক দিন হবে। সদ্য এসেছে, একটু গুছিয়ে উঠুক।
    - হেমন্ত, জানি এরকমই তুমি বলবে। নিজে তো এখনো সংসার করে উঠতে পারলে না! যে মানুষটা কবিতা লিখে দেশকে মাতায়, জেলের ভিতর চল্লিশ দিন না খেয়ে থাকে - সে কি আর নিজের শরীরের খবর রাখতে পারে? ঘরের মানুষই একমাত্র সে খবর রাখতে পারে।

    নজরুল আরেকপ্রস্থ বিস্মিত হলেন। দোলনের কথা মনে পড়ল। সেও কি এইরকম ভাবে? এইজন্যই কি সঙ্গে আসতে চেয়েছিল? স্বীকারোক্তির মতো বললেন - 'আপনি ঠিকই ধরেছেন ডাক্তার বাবু। তিনি আমার সঙ্গে আসতে চেয়েছিলেন, আমিই নিয়ে আসিনি'।

    'ঘোরতর অপরাধ' - বলে নজরুলের রোগের বিবরণ শুনলেন। বুকে পিঠে নানাবিধ পরীক্ষা করে দেখলেন। বললেন, 'টানা বিশ্রামের দরকার। প্রচুর ধকল গিয়েছে, শরীরের যন্ত্রপাতিকে এবার কিছুদিন শান্তিতে থাকতে দিতে হবে কবি সাহেব। হেমন্ত আপনাকে ঝড়ের মতো ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াবার যতই প্ল্যান করুক - মাসকয়েক আপনার দৌড়ঝাঁপ একেবারে বন্ধ করতে হবে।'

    - 'বলেন কী? মাসকয়েক? গৃহবন্দী?' নজরুল আঁতকে উঠলেন।
    - হাবিলদার সাহেব, আপনার সঙ্গে যতই গুলি-বন্দুক আর বোমা-বারুদ থাক, শরীর ঠিক না থাকলে তা চালাবেন কী করে? আপনি তো শুধু একজন বীর সৈনিক নন, আমি তো খবর রাখি - আপনি একজন অসীম সাহসী যোদ্ধা। শরীর ঠিক থাকলে আপনি খালি হাতেই অনেক শত্রু ঠেকিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তার আগে আপনাকে ঘরের শত্রুকে তাড়াতে হবে তো! শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। কুইনিন দিয়ে দিয়ে দু'চার দিন কোনমতে ওদের দাবিয়ে রাখা চলে। কিন্তু ওর ঘাঁটি ভাঙতে গেলে অন্তত মাস তিনেক আপনাকে বিশ্রাম নিতেই হবে। ঠিকমত ঘুম এবং নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া না হলে আমার ওষুধের গুলি-বারুদ সব ঠান্ডা মেরে যাবে।
    - এ তো সশ্রম কারাদণ্ড অপেক্ষা অধিক শাস্তি! মেয়াদ কিছু কমানো যাবে না?
    ডাক্তারের সঙ্গে সকলেই হেসে উঠলেন।
    - আপনি বিপ্লবী মানুষ। কত কঠিন জেল পার করে এসেছেন। আর মাত্র তিন মাসের মেয়াদকে ভয় পেয়ে গেলেন?
    - না ডাক্তার সাহেব। তিন মাস কেন, তিন বছরের মেয়াদ খাটতেও রাজি। কিন্তু বাড়িতে শুয়ে-বসে থাকা আরও কঠিন দন্ড!
    - না না, শুয়ে বসে থাকবেন কেন? আর কৃষ্ণনগরের লোক আপনাকে শুয়ে বসে থাকতে দিলে তো! আপনি আড্ডা দিন, ঘুরে বেড়ান, কিন্তু শহরেই থাকুন। খাওয়াতে অনিয়ম একেবারেই চলবে না৷ সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম আর নিয়মিত ওষুধ। বাইরে গেলে সেসব কিছুই হবে না সে আমি জানি।

    তারকদাস সাহস জোগান - আপনি চিন্তা করছেন কেন কাজীদা? ছোট বড়ো সব সম্মেলনই তো এবার কৃষ্ণনগরে আগামী ছয়মাস এখানেই আপনার অনেক কাজ, কোথাও যেতে হবে না।

    বাধ্য ছেলের মতো ডাক্তারের পরামর্শ শুনে হেমন্ত সরকারের সঙ্গে নজরুল বেরিয়ে এলেন। কাশীনাথের কাছ থেকে ওষুধ নেবার জন্য রয়ে গেলেন তারকদাস। মনটা অজান্তেই কেমন প্রফুল্ল হয়ে উঠেছে। বিলাতফেরত একজন ডাক্তারের আন্তরিকতা, আচরণের সারল্য, ভরসা যোগানো কথাবার্তা - বড়ো আপন করা। ফেরার পথে হেমন্তদার প্রতি আরও একবার কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে উঠল মন। দোলনের মুখটা আরেকবার ভেসে উঠল - ডাক্তারের চেম্বারে সঙ্গে আসতে চাওয়া - আগে তো কোনোদিন এভাবে বলে নি। পরক্ষণেই মনে হলো - স্বামীর সঙ্গে কোথাও একা যাওয়া যায়, যাবার কথা ভাবা যায়, তাও মায়ের সাথে কথা না বলেই - হুগলিতে এরকম পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি।

    হুগলি আর কৃষ্ণনগর - যেন অনেকটাই আলাদা।

    ৮

    হুগলি থেকে প্রাণতোষের চিঠি এসেছে। দু'চার দিনের মধ্যেই কৃষ্ণনগরে আসবে লিখেছে। মনটা ভালো হয়ে উঠলো নজরুলের। প্রাণতোষ এলে ওকে নিয়ে দু'দিন বেশ ঘোরাঘুরি করা যাবে। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা মেনে দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি বটে, কিন্তু শহরের ভেতরেই এ ক'দিন ঘোরাঘুরি খুব একটা কম হয়নি। আড্ডা, আলোচনা, সান্ধ্য মজলিস কিছু না কিছু আছেই। তারকদাস, মঘা, গোবিন্দ, বিজয়লাল --- সর্বক্ষণ কেউ না কেউ সঙ্গে আছে।

    হুগলিতে শেষের দিকে কেমন একটা দম বন্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। শরীরে ঘন ঘন জ্বরের তান্ডব তো ছিলই, তার মধ্যেই কমিউনিস্ট ভাবনা-চিন্তা নিয়ে নতুন দল গড়ে তোলার উত্তেজনা, পত্রিকা নিয়ে নানান পরিকল্পনা। সাইনবোর্ডের জায়গায় আস্ত একটা লাঙল জোগাড় করে হ্যারিসন রোডের পত্রিকা অফিসে ঝুলিয়ে দিলেন নজরুল। শিক্ষিত সৌখিন নেতাদের কথার ফুলঝুরি নয়, সাধারণ কৃষক দেখুক --- সত্যিকারের লাঙল নিয়ে পথে নেমেছে নব্য গঠিত শ্রমিক-কৃষক প্রজা পার্টি। হুগলির সেই সব চাপ থেকে কৃষ্ণনগরে এসে অনেকটাই হালকা বোধ করছেন নজরুল। আসার আগে 'লাঙল' পত্রিকাকে মোটামুটি একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে আসতে পেরেছেন --- সেটাও একটা স্বস্তির ব্যাপার। মনিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই করাচীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে পরিচয়, যথেষ্ট যোগ্য মানুষ। ঠিক চালিয়ে নেবেন। তাছাড়া একমাসও হয়নি, প্রকাশের সাথে সাথে বাংলা জুড়ে 'লাঙল'এর নাম ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে তাঁর 'সাম্যবাদী' কবিতা গুচ্ছ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। 'বিদ্রোহী'র পরে বোধহয় 'সাম্যবাদী'ই এতো দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একশো চার ডিগ্রি ছোঁয়া গা পুড়ে যাওয়া জ্বর, রাবণের দশটা মাথা একত্রিত হবার মতো যন্ত্রণা, তার ভিতরে সাম্যবাদী'র নামে ১১ খানা কবিতা --- কী করে একনাগাড়ে টানা লিখে ফেললেন নজরুল নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যান। সেই কবে থেকে লালিত স্বপ্ন --- বলশেভিক লাল-ফৌজের মতো এদেশের মাটিতে সর্বহারা দরিদ্র মানুষ জেগে উঠছে। মুজফফর আহমদ আর হেমন্তদার উৎসাহ --- যন্ত্রণাকাতর মাথার মধ্যেও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কাটছিল দিনগুলো।

    কৃষ্ণনগরে আসা ইস্তক অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন যে 'বিদ্রোহী' নয়, সব জায়গায় 'সাম্যবাদী' নিয়ে বেশি চর্চা, কথাবার্তা। কৃষক-শ্রমিক প্রজা সম্মিলনীর নিজস্ব একটা নেটওয়ার্ক তো আছেই। 'লাঙল'এর প্রথম সংখ্যা হাতে হাতে ছড়িয়েছেও কম নয়। তবু মনে হয় সংগঠনে সরাসরি যুক্ত না হয়েও পার্টির তরুণ ব্রিগেড অপেক্ষা বিজয়লালই যেন 'সাম্যবাদী'কে বেশি প্রচার করে দিয়েছে। ঝোলার ভিতর 'লাঙল'এর কপি নিয়ে ঘোরে, সুযোগ পেলেই শহরের সুধী সমাজে বলে বেড়ায় --- এই শোনো, আমাদের কাজীদার কবিতা! সেদিন হেমবাবুদের বাড়িতে মানী-গুণী মানুষের সান্ধ্য মজলিসে নিজেই উদাত্ত কণ্ঠে শুনিয়ে দিল --- গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান! সবাইকে শুনিয়েই বলল, 'কাজীদা, বিদ্রোহী কবিতা আপনার নিজের। কিন্তু সাম্যবাদী আপনার নিজের নয়, ও আমাদের কবিতা। আপামর সাধারণ মানুষের কবিতা 'বিদ্রোহী' পড়লে তার ভিতরে কবিকে দেখতে পাই --- তেজোদ্দীপ্ত, বীর, বিদ্রোহী নজরুল! কিন্তু 'সাম্যবাদী' পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার হাজার সর্বহারা নিপীড়িত মানুষের ছবি। ও কবিতা এখন জনতার। '

    বিজয়ের বলার ভঙ্গিটাও ভারি সুন্দর। রাজনীতি নয়, মানবিকতাও নয়, বলার মধ্যে একটা ব্যক্তিগত ভালোবাসার স্পন্দন, একটা উষ্ণতা অনুভব করেছিলেন নজরুল।বিজয়লালের রাজনীতির ধরনটাও কেমন একটা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। মনেপ্রাণে বিপ্লবী, জেলখাটা স্বদেশী। অনন্তহরি মিত্রকে নিজে কৃষ্ণনগরে ধরে নিয়ে এলো --- কিন্তু তাঁর সশস্ত্র বিপ্লবের পথকে বিজয় সমর্থন করেনি। ওর আশেপাশে গোবিন্দ, মঘার মতো তরুণ তুর্কি ছেলেরা আগুন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো উত্তপ্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ভিতরে সে গান্ধীর অহিংস পন্থায় অটল, স্থির, দৃঢ়প্রত্যয়ী।

    নজরুল নিজে কোনদিনই অহিংস চরকা-পন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না সেকথা বিজয় লাল ভালোই জানে। ইতিমধ্যে হেমন্ত সরকার, মুজফফর আহমদ, কুতুবউদ্দিনদের সঙ্গে জোট বেঁধে কমিউনিস্টপন্থী দল গঠন করেছেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন --- এসব কথাও তাঁর অজানা নয়। তবু প্রকাশ্য সভা সমিতিত নজরুলকে নিয়ে তাঁর অকৃত্রিম উচ্ছাস নজরুলকে খুবই মুগ্ধ করে, বুকের মধ্যে একটা নিকটজনের ছোঁয়া লাগে।

    হুগলিতে প্রাণতোষের মতো কৃষ্ণনগরে এখনো কেউ তেমন কাছের মানুষ হয়ে ওঠেনি বটে, তবু এই ক'দিনে এই শহরে আশেপাশে থাকা মানুষজনের বৈচিত্র্যা, তাদের কর্মকাণ্ড, ভাবনার গভীরতা নজরুলকে একটা মুগ্ধতা এনে দিয়েছে। এই শহর যেন শিল্পীর সামনে রাখা একটা খুলে রাখা ক্যানভাস, সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ --- শিল্পী খুশিমতো তাঁর কল্পনাকে ক্যানভাসে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

    গোলাপট্টির বাসায় স্থান সংকুলান নিয়ে কোনও সমস্যা নেই, যথেষ্ট পরিসর --- শুধু রোদের বড় অভাব। অবহেলা আর অযত্নে পড়ে থাকা উঠোনটি মাসিমার হাতের ছোঁয়া পেয়ে ঘরের মেঝের মতোই ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তার শেষ প্রান্তে দুপুরবেলা এক ফালি রোদ ঘন্টা দুয়েকের জন্য দেখা দিতে আসে। ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে চিঠিটা হাতে নিয়ে সেই রোদের আমেজ উপভোগ করছিলেন নজরুল। প্রায় দিনই তো দুপুরে খাওয়ার পর কারো না কারো ডাক আসে, বেরিয়ে যেতে হয়। আজ তেমন কোথাও যাবার নেই জেনে রৌদ্রে ইজি চেয়ারটা পেতে দিয়েছেন প্রমীলা দেবী। নিজেও পাশে ফোল্ডিং কাঠের চেয়ারখানা পেতে বসেছেন। শীতের দুপুরে এই রোদটুকু তাঁর একমাত্র প্রিয় মানুষটির জন্য মহামূল্যবান তো বটেই, তার চেয়ে বেশি মূল্যবান এই উষ্ণতাটুকু দুজনে পাশাপাশি ভাগ করে নিতে পারার সুযোগ পাওয়া।

    চিঠিখানা পত্নীর হাতে দিলেন নজরুল, 'দোলন, প্রাণতোষের চিঠি এসেছে। দু'চার দিনের মধ্যে আসবে লিখেছে'।

    - তাই? এই ক'দিনেই মনে হচ্ছে কতদিন ওকে দেখিনি। খুব করেছে আমাদের জন্য ছেলেটা। জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করে নৈহাটি পর্যন্ত এসে ট্রেনে তুলে দিয়ে গেল।
    - এখানে এসে ওর কাছ থেকেই প্রথম চিঠিটা এলো।

    প্রমীলা দেবী চিঠি থেকে চোখ ফিরিয়ে হাসলেন --- 'এবার তো চিঠি আসা শুরু হবে। বিজয়দা তো অমৃতবাজারে ছাপিয়ে দিয়েছেন --- 'কবি নজরুল অসুস্থ, বর্তমানে কৃষ্ণনগরে অবস্থান করিতেছেন। চাহিলে সেই ঠিকানায় যোগাযোগ করিতে হইবে!'

    দোলনের বলার ভঙ্গিতে নজরুলও হেসে উঠলেন। বললেন, তুমি দেখেছ?

    'হ্যাঁ, টেবিলেই তো রাখা ছিল কাগজটা। খুলতেই চোখে পড়ল।' দোলন চোখ নাচিয়ে উত্তর দিলেন।

    কিন্তু না, এই নিভৃত আরামে পাশাপাশি রোদ পোহানোর সুখটুকুও মহার্ঘ হয়ে উঠল। নৈঃশব্দের যাবতীয় রসভঙ্গ করে একটা আওয়াজ ভেসে এলো --- কাজীদা!

    ভিতরের বারান্দায় একটি দীর্ঘদেহী যুবক দাঁড়িয়ে। গিরিবালা দেবী নিশ্চয় ভিতরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলামের বাড়িতে ভিতর বাহির বলে কিছু থাকে না।

    - আয় গোবিন্দ! কী ব্যাপার?

    গোবিন্দপদ দত্ত। দোলনও আগে দেখেছে তাকে। কাছে এসে বলল -- কাজীদা, আজ সন্ধ্যাবেলা আপনার সংবর্ধনার একটা আয়োজন হচ্ছে, ছুতোরপাড়ার মাঠে।

    - সংবর্ধনা? আমাকে? কেন রে?
    - বারে, বিদ্রোহী কবি কৃষ্ণনগরে এসেছে, আর শহরবাসী তাঁকে সংবর্ধনা জানাবে না?
    - কিন্তু আমার সভা মানেই তো শুনছি পুলিশের টিকটিকি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোদের তো আরো ঝামেলা বাড়বে?
    - কোতোয়ালি থানার টিকটিকিগুলো আমাদের আগে থেকেই চেনে। ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি রেডি থাকবেন মঘা এসে আপনাকে নিয়ে যাবে। বৌদি যদি সঙ্গে আসেন তো খুবই ভালো হবে।

    প্রমীলা দেবী হেসে উঠে বললেন, 'না বাপু, তোমরা বিদ্রোহী কবিকে নিয়ে যাও। ঘর-সংসার নিয়ে থাকি, আমি তোমাদের বিদ্রোহী দলে নেই!





    (ক্রমশঃ)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন।