এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৭

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ১৩ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫ | বাঙালির লোকায়ত উৎসবঃ ঝুলনযাত্রা | ছাতিমবাগান | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৬ | তাতানের পাসওয়ার্ড | ভালোবাসা | উত্তরাধিকার | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৭
    বাংলা অনুবাদ : সুশান্ত কর

    অলংকরণ: রমিত



    শিস দিয়ে ডাকে যে মানুষগুলো


    বার্নার্ড সাহেবের বাহিনী অল্প অল্প অন্ধকার নামতেই ননৈ নদীর পাড়ে পৌঁছাল। ননৈ নদীর পাড় থেকেই শুরু হয়েছে উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো বাগিচা—নাচনডুবি। চারদিকের ঘন অন্ধকারে নাচনডুবি বাগিচার এখানে-ওখানে আলো ঝিলমিল করছে। এক্কেবারে উঁচু চূড়ায় বার্নার্ড সাহেব ও তাঁর ভাই লিওনার্ড সাহেবের "বড়ো বাংলো' থেকে উজ্জ্বল আলো আসছে। লিওনার্ড সাহেব নদীর ওপারে জনা কয়েক লোক সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লিওনার্ড এক্কেবারে টগবগে তরুণ ছেলে; দুই ভাই-ই গাধার মতো খাটতে পারেন—তবু লিওনার্ডের কর্মদক্ষতা দেখে বাকি লোকজন অবাক! সমস্ত ব্যবস্থা নিখুঁত করে রেখেছেন লিওনার্ড। সবাই জানে—লিওনার্ডর কাজে কোনো ফাঁক থাকবার জো নেই; আজও তিনি সম্মানিত অতিথিদের জন্যে সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এতে কোনো খুঁত নেই।

    সকালে উঠেই "হানাটার' মানে বার্নার্ড সাহেব তাঁর বাঘের বাচ্চার মতো দুটো কুকুর লনে বের করে এনেছেন। হাতে তাঁর একটি বড়োসড়ো রিং; হাতের চাবুকে তিনি বাতাসেই সারৌপ করে জোরে একটা কোপ বসালেন। এক ঝাঁপ দিয়ে কুকুর দুটি রিং গলিয়ে পার করে গেল। দু-জন চাপরাশি বার্নার্ড সাহেবের সঙ্গে আছে; একজন দুটো বড়ো বড়ো বল মাটিতে রাখল।এবারে সাহেব একটা হুইসেল বাজালেন; কুকুর দুটো পায়ে ঠেলে ঠেলে বল দুটো এগিয়ে নিয়ে গেল। তারপর সুবিশাল মুক্তোমালার মতো ফুলগাছে সাজানো ঘাসে ঢাকা বাগিচায় সাহেব দৌড়াতে শুরু করলেন; কুকুর দুটিকে দৌড়াতে দৌড়াতে ডেকে গেলেন, ""কাম মেরি, কাম সিজার!'' কুকুর দুটোও তাঁর পেছন পেছন দৌড়াতে শুরু করল। ভুটান পর্বতমালার ফাঁক গলিয়ে কুয়াশা ভেদ করে সূর্য বেরিয়ে আসছে; রোদের কিরণ এসে "বড়ো বাংলো'-র ফুলবাগানে পড়েছে। লিওনার্ড ভালো স্থপতি; এই বাগানের "বড়ো বাংলো'-টা তিনিই ডিজাইন করেছেন। বাগিচাটি সাজিয়েছেন বার্নার্ড সাহেবের স্ত্রী এলিজা। ঘরটি তৈরি করবার সময় সেই জমির একটি গাছও কাটতে দেননি; প্রতিটি গাছের তলায় তলায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লাগানো মরশুমি ফুলগাছের আস্তরণ। সেগুলোতে ঝাঁক বেঁধে ফুল ফুটেছে। বীজগুলো বাইরে থেকে আনিয়েছেন; ভালো বীজ, পার্বত্য পরিবেশ আর সযত্ন হাতের ছোঁয়া—ফুলের হাসি চারদিকে উপচে পড়েছে! ডালিয়াগুলো থালার সমানে বড়ো হয়েছে, গাঁদাগুলো গায়ে গা লাগিয়ে কমলা-হলুদ রঙে ফুটেছে। প্রতিটি গাঁদা যেন এক-একটি ছোটোখাটো বল। ডালিয়ার বেডগুলোর পাশে অল্প সাদা সাদা, পেছনে হেলানো বেতের চেয়ার বসানো। চেয়ারগুলোর মাঝে একটি নিচু বেতের টেবিল। বাংলার বাটলার জনক মুণ্ডা সেই টেবিলে একটি টি-সেট এনে সাজাল। ইতিমধ্যে এডুইন আর ভিক্টর সাহেব উঠে এসে এই গার্ডেন চেয়ারে বসেছেন; খানিক পরে এলিজাও এসে বসলেন।লিওনার্ড এখনও অবিবাহিত; বড়ো বাংলোতে শ্বেতাঙ্গ নারী বলতে এই এলিজা। এলিজা গর্ভবতী; ধীরে ধীরে এসে তিনি অতিথি দু-জনকে অভিবাদন জানালেন। লিওনার্ড একটু দেরি করে ওঠেন; গত রাতে লিওনার্ডের শয্যাসঙ্গিনী ছিল একটি কচি বয়সের ওড়িয়া শ্রমিক কন্যা। ওকে এই ‘বড়ো বাংলো’-তে কাজ করবার জন্যে নিয়ে আসা হয়েছে; আসল কাজ—এই ছোটো সাহেবের রাতটা কোমল করে সকালের জন্যে আবার তরতাজা করে দেওয়া। রুক্মিণী বাকি শ্রমিক মেয়েদের থেকে খানিক ফর্সা আর লম্বা। লিওনার্ড এসে দুই অতিথিকে অভিবাদন জানিয়ে এক কাপ চা পান করলেন; কাজলা রঙের ঘোড়াটি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কামজারির ঘণ্টা বাজবে এখন।

    কুয়াশা, ফুলের রং, চায়ের ফুরফুরে গন্ধে ভরা সুন্দর সকালটি যেন হঠাৎ ছিঁড়ে চৌচির হয়ে গেল; ঝনঝন করে কাচের মতো ভেঙে গেল! বাংলোর লম্বা বারান্দার এক মাথাতে একটি পাকা খুঁটি আছে; তাতে একটি শিকল বাঁধা। সেই শিকলে বেঁধে রাখা আছে একটি মাঝবয়সী মজদুর। বড়ো বাংলোর পাঁচজন মালির একজন এই রাম কাওয়া। কুকুর দুটো লালন-পালন সাধারণত এই রামই করে থাকে। ব্যায়াম করবার পরে কুকুর দুটি তাদের নির্দিষ্ট বাটিতে দুই সের, দুই সের করে চার সের দুধ খায়; বাংলোতে পোষা গরুর দুধ। বার্নার্ড সাহেব নিজে কুকুরগুলোর খাবারের তদারকি করেন।

    কুকুরের দেখভালে কোনো গাফিলতি সাহেব সহ্য করেন না। বলতে গেলে—এই কুকুরগুলোই তাঁর ভরসা। এই ঘন জঙ্গলে একা বাস করা—কখন বা কী হয়! হাতি, বাঘ, সাপে চারপাশ গিজগিজ করে ঘিরে রেখেছে; আর বাগানজুড়ে যে এত লোক—কাকেই বা বিশ্বাস করা যাবে?জাহাজে করে বাচ্চা থাকতেই বিলেত থেকে আনিয়েছিলেন কুকুর দুটি; বার্নার্ড সাহেবের ঠাকুমার কুকুরের বংশে জন্মেছে সিজার আর মেরি। মেরির পেটে বাচ্চা আছে; এমন অবস্থাতে এমন গাফিলতি! রাগে বার্নার্ড সাহেব জ্বলছেন বলতে গেলে। তাঁর বিশ্বাস—এই সিজার আর মেরি যদি থাকত, তবে এলিজার প্রথম সন্তান প্রিন্সের মৃত্যু হত না।প্রথম সন্তানের কথা মনে পড়লেই বার্নার্ড সাহেবের বুক টনটন করে ওঠে; প্রায়ই হয়, প্রায়ই এমন হয়। কেমন সুন্দর ছেলে ছিল প্রিন্স! ছ-বছর বয়সেই কত কথা জানত, বুঝত; যেমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, তেমনই বোধশক্তি। অনেক প্রতিশ্রুতি নিয়ে বড়ো হচ্ছিল; ঠাকুরদা-ঠাকুরমা স্কটল্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন—ওকে সঙ্গে রেখে পড়াবেন বলে। ঠাকুরদা একটা ঘোড়ার বাচ্চাও কিনে রেখেছিলেন; আইভি লতায় বাড়ির বেড়াগুলো সবুজ করেছেন, উইন্ডোপেন বসিয়েছেন, জিরেনিয়াম ফুলের রঙে রাঙানো "এডওয়ার্ড ম্যানশন' প্রিন্সের জন্যে দিন গুনছিল!মাত্র আধা ঘণ্টা, আধা ঘণ্টাও লাগল না; সব ফুরিয়ে গেল। সুইট-পির বেডটিতে সাপটি ছিল; বলটা গিয়ে সেখানে পড়েছিল। পুরো নাচনডুবি জুড়ে প্রচুর দাঁড়াশ সাপ। বার্নার্ড সাহেব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—সিজার বা মেরি থাকলে আজ প্রিন্স ওভাবে বিদায় নিত না। মেরি তো একবার বাঘকেও তাড়িয়ে গিয়েছিল; ওর একটি কান নেই, বাঘে নিয়ে গিয়েছিল। কান-ছেঁড়া মেরি যদি রাতে ভৌ-ভৌ করতে থাকে, নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন বার্নার্ড সাহেব।আরও এক প্রিন্স আসার বেলা হচ্ছে; মেরি-সিজারের কিছু একটা হলে ক্রোধে ফেটে পড়বেন তিনি। সেই কুকুরের বাটিগুলো ভালো করে ধোয়নি রাম কাওয়া; নইলে কি এইমাত্র দুইয়ে আনা দুধ এভাবে ফাটতে পারে? সিজার খানিকটা চুমুক দিয়েছিল, মেরি তো গন্ধ শুনেই বসে রইল। কে বা জানে—কতদিন এভাবে বাটি না ধুয়ে দুধ দিয়েছে?বারান্দায় বেঁধে রাখা রামুকে খুব করে চাবকেছেন সাহেব; কয়েক কোপ মারবার পরেই রাম গড়িয়ে পড়েছিল। কেউ একজন এসে ওকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পুরো বাগানে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে; বাগানজুড়ে শোনা গিয়েছিল কিছু তীক্ষ্ণ দীর্ঘ শিস। ঠোঁটে ঠোঁটে গড়িয়ে শিসগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো নাচনডুবি বাগানে!

    কুয়াশায় কোমল সকালটা কাচের গ্লাস ভাঙার মতো ভেঙে পড়েছিল। একটু পরে জোর কদমে ঘোড়া চালিয়ে আবার লিওনার্ড বাংলোতে ফিরলেন; সিন্দুরে আমের মতো লাল হয়ে পড়েছেন মানুষটি। বারে বারে বলে যাচ্ছেন একটাই কথা, ""দিস গ্রুপ অব ডেভিলস, দিস গ্রুপ অব সাটানস...।''

    শয়তানের দলটি হচ্ছে এই রামের সঙ্গে আসা দলটি; দলটি বাগানে আসবার বেশি দিন হয়নি। বার্নার্ড সাহেব নিজে গিয়ে গুয়াহাটির উজানবাজারের কুলি ডিপো থেকে এই দু-শো কাওয়া শ্রমিক নিয়ে এসেছিলেন। শ্রমিকের সমস্যা নাচনডুবি বাগানকে বড়ো বেশি ভোগাচ্ছিল; এই শ্রমিকের দলটি আসবার পর অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছিল।

    লিওনার্ড এসে এডুইন আর ভিক্টর সাহেবের সঙ্গে বসেছিলেন। পোশাক পালটে বার্নার্ড সাহেবও এসে বসেছিলেন। লছমী বাই এলিজার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে; সে এসে হাতে একখানা ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ট্রেটিতে আছে মোমবাতি আর দিয়াশলাই। জনক মুণ্ডা ইতিমধ্যে ব্রেকফাস্টের ট্রেও নিয়ে এসেছে।সকালের খাবার খাবার আগে এলিজা প্রতিদিন বাগানের এক কোণের সমাধিবেদিতে মোমবাতি জ্বালান। দুটি সমাধিবেদি আছে; মোমবাতি জ্বালিয়ে এলিজা বাগিচার উত্তর দিকের সমাধি দুটির কাছে গেলেন। সমাধি দুটির কাছে শ্বেতগোলাপ গাছ ভরে ফুটে আছে। খানিক দূরে একটি গুলাচ ফুলের গাছ; ডাল একটা বাঁকা হয়ে সমাধির ক্রস দুটির ওপরে ঝুলে পড়েছে। গুলাচ ফুল ঝরে ক্রসগুলো আধা ঢেকে ফেলেছে সমাধিফলক দুটিতে দুটি নাম লেখা আছে—"বার্নার্ড জুনিয়র' (বন্ধনীতে "প্রিন্স'); আরটিতে "মরগান ্লংফেল'—একজন শিশু আর একজন তরুণ। দুজনের কেউ জীবনটি পুরো করতে পারেনি। এলিজা দুটি মোম দুই সমাধিতে জ্বালিয়ে দিলেন। লিওনার্ড, বার্নার্ড, ভিক্টর আর এডুইন সাহেব—চারজনেই বুকে ক্রস এঁকে নীরবে প্রার্থনা করলেন। এডুইন সাহেব বলে উঠলেন, "আমেন'।

    এলিজা মেম টি-পট থেকে চা ঢেলে দিতে যাচ্ছিলেন; ভিক্টর সাহেব হাত বাড়িয়ে নিজেই সবার কাপে চা ঢেলে দিলেন। সবাই এলিজা মেমকে আরামে চেয়ারে বসে থাকতে বললেন। নাচনডুবির চায়ের রং কমলা; সেই কমলা রঙের চায়ের গন্ধে চারপাশ মো-মো করে উঠল। এলিজা মেমের নির্দেশনায় তৈরি কেকের গন্ধ চায়ের গন্ধের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে গেল।কিছু আগে দুইয়ে আনা দুধে ভিজে কোমল হয়েছে বাগিচায় ফলানো মকাইয়ের গুঁড়ো; এগ-পটে সেদ্ধ ডিম সাজিয়ে রাখা আছে। দেশ থেকে এলিজা মেম নিয়ে এসেছিলেন একটি ওভেন; সেই ওভেনে তৈরি নরম ব্রেডে মাখামাখি হবার জন্যে তৈরি বড়ো বাংলোর বাগিচার পেয়ারার জেলি, আর তৈরি বাংলোর দুধ থেকে তোলা বরফের মতো সাদা মাখন।পাহাড়ের তলার বাগান নাচনডুবিতে খুব করে কুয়াশা পড়ে; আজও পাহাড়টি কুয়াশাতে ঢেকে আছে। রোদ ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। চরাচর জুড়ে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হল ধীরে ধীরে; বৃষ্টিবিন্দু যেন চালনি থেকে ঝরে পড়া চালের গুঁড়ো! পাহাড় থেকে মুখ বের করে রোদ সেই গুঁড়োগুলোর ভেতর দিয়ে আলোর কণাগুলোকে ছড়িয়ে দিল।সাহেবদের কয়েকজন উঠে বাংলোর পর্টিকোতে চলে গেলেন। প্রশস্ত ফুলবাগানের যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই ফুলের রং। জানালা-দরজাতে লাগানো আছে মশারোধক জালি; রোজ সেগুলো পরিষ্কার করা হয়। সেইসব জালির কাছে কাছে ঝোলানো টাব ভরে ফুটেছে রঙ-বেরঙের পিটুনিয়া ফুল।

    টি-ট্রলিতে চা এল। নাচনডুবিতে উৎপন্ন উৎকৃষ্ট চা পাতা আর গরুর সতেজ দুধে মেশানো গন্ধে ফুলবাগানটি ছেয়ে গিয়েছিল। বাগিচার কাছেই বৈঠকখানা; প্রকাণ্ড একজোড়া হাতির দাঁত, হাতির পা, বাঘের ছাল, হরিণের শিঙে সাজানো সেই ঘর। বার্নার্ড সাহেব উঠে গিয়ে সেই ঘরের রেডিওগ্রামটি চালিয়ে দিলেন।ফুলের রং, পাহাড়ি বৃষ্টির সোনালি গুঁড়ো আর সঙ্গীতের মূর্ছনা—এমন মুহূর্তে সাহেবদের কারোরই মনে ছিল না রাম কাওয়ার কথা! উঁচু টিলার ওপরে এই বড়ো বাংলোতে বসে সাহেবদের কারও কানেই গেল না সেই সুতীক্ষ্ণ শিসের ধ্বনিগুলো।

    শিসগুলো বাজছিল ঠিকই; এক মুখ থেকে আরেক মুখে গড়িয়ে যাচ্ছিল শিস। একটি শিস যদি বাজছিল ফ্যাক্টরিতে, আর-একটি বাজছিল পাতা তোলার জায়গাতে; পরেরটা শোনা যাচ্ছিল বস্তিতে। বস্তিতে রামের মৃতদেহ পড়ে ছিল।বুড়ো রামের শরীর এমনিতেও পড়ে আসছিল; নানারকম অসুখ-বিসুখ, ব্যথা-বেদনায় ধরেছিল। কিছুদিন থেকে চোখেও দেখতে সমস্যা হচ্ছিল; বিশ্বাসী মানুষটিকে হানাটার সাহেব বাংলোতে কাজের জন্যে নিয়োগ করেছিলেন। চোখে ছানি পড়া মানুষটি কাজকর্মে গোলমালও করছিল; আজ সবচাইতে বেশি চোখে পড়া ভুলটি করল। ক্রুদ্ধ হানাটার সাহেবের চাবুকের মার সহ্য করবার শক্তি রামের শরীরে ছিল না; বড়ো সহজে ওর প্রাণ বেরিয়ে গেল! সাহেবও ভাবেননি—বুড়ো এত সহজে মরে যাবে বলে।

    তীক্ষ্ণ শিস এক-একটিতে সমস্ত কাওয়া শ্রমিক তৎক্ষণাৎ জড়ো হয়ে গেল। প্রায় শ-দুয়েক কাওয়া শ্রমিক কাঁধে তির-ধনুক নিয়ে রামের মৃতদেহের পাশে জড়ো হয়ে গেল; এর পরে এক চাঙে মৃতদেহ তুলে এরা গিয়ে বড়ো বাংলোয় পৌঁছাল। কেউ বাধা দেয়নি; এদের ধনুকের নিশানা অব্যর্থ—সবাই এদের ভয় করে। ভয় পায় এদের একতাকে, ভয় পায় লম্বা লম্বা সুতীক্ষ্ণ শিসগুলোকে! যেখানে যেমন করেই থাকুক—কেউ দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে এদের বেঁধে ফেলে এই শিসে, বেঁধে ফেলা নলখাগড়ার আঁটির মতো দুর্ভেদ্য হয়ে পড়ে।

    বড়ো বাংলোর সামনের রাস্তা দিয়ে গেলে সবাইকে ছাতা বন্ধ করতে হয়; ঘোড়া বা হাতির পিঠে চড়ে কেউ যেতে পারবে না। সেই নিষিদ্ধ রাস্তাতে এসে দাঁড়াল তির-ধনুক হাতে আঁটসাঁটো শ্যামবর্ণের শরীরের মানুষগুলো! লিওনার্ড বন্দুক বের করেছিলেন; বার্নার্ড সাহেব ভাইকে বাংলোর ভেতরে থাকতে বললেন। তারপরে হাতে মোমবাতি আর ফুলের ট্রে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন; শার্টের তলায় প্যান্টের বেল্টের সঙ্গে বেঁধে নিলেন বন্দুকটি।

    ফুল, মোম, হাঁটু মুড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা, রামের ছেলেকে বাগানের চাকরি, পরিবারের জন্যে ক্ষতিপূরণের টাকা—এই সমস্ত দিয়ে মানুষগুলোকে সম্মত করবার চেষ্টা করে বার্নার্ড সাহেব আবার এসে বাংলোর কাছে পৌঁছালেন। এবারে সৎকারের জন্যে টাকাপয়সা নিয়ে লিওনার্ড গিয়ে পৌঁছালেন; লিওনার্ডের সঙ্গে গেলেন এডুইন সাহেব আর ভিক্টর সাহেব। এডুইন সাহেব হাতে তুলে নিলেন বাইবেল। মৃতদেহটি মাটিতে নামিয়ে মানুষগুলো ঘিরে রেখেছে।এডুইন সাহেব বুকে ক্রস করে হাতের বাইবেল মেলে ধরলেন; গম্ভীর গলায় তিনি বাইবেল পড়তে শুরু করলেন। তিনি ক্ষমার কথা পড়ছিলেন—জুডাসকে ক্ষমা করবার জন্যে যিশু পরম পিতার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। ইতিমধ্যে ক্রোধে জ্বলা মানুষগুলো মাটিতে বসে পড়েছিল; এরা কিছুই বুঝতে পারছিল না—কিন্তু একটি কথা বুঝতে পেরেছিল যে, সাহেব নিজের ভগবানের কথা বলছেন।

    এডুইন সাহেব যখন হাঁটু মুড়ে মৃতদেহের পাশে বসে "আমেন' শব্দটি উচ্চারণ করলেন—জঙ্গি মানুষগুলো ভেতরে ভেতরে নরম হয়ে এল। গর্ভবতী এলিজা মেম যখন বার্নার্ড সাহেবের হাত ধরে ধরে এসে মৃতদেহে একগুচ্ছ গুলাচ ফুল বিছিয়ে দিলেন, তখন মানুষগুলো এক্কেবারে শান্ত হয়ে গেল! স্ফীত উদর, সাদা লম্বা পোশাকে স্বর্ণকেশী মহিলাটির ম্লান করুণ মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল এরা; সবাই জানে—এই নারীর প্রথম সন্তানের মৃত্যু হয়েছে, সাপে কেটে নীল করে ফেলেছিল দেবদূতের মতো সেই শিশুকে। মৃতদেহ সৎকার করতে লোকগুলো চলে গেল।জানা লোকে জানে—এই শ্যামবর্ণের মানুষগুলো সেঁকে শুকিয়ে গুঁড়ো করা নাচনডুবি বাগানের চা-পাতার মতো। সামান্য স্নেহ-মমতার স্পর্শের উত্তাপ পেলেই ভেতরের লালচে মমতাগুলো বেরিয়ে আসে। লিওনার্ড সাহেবকে দু-বারে দু-জন শ্রমিক বাঁচিয়েছিল।একবার বাগানে কাজ করছিলেন; তখনই পেছন থেকে একটি চিতাবাঘ সাহেবের পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। চোখের পলকে একটি তির নির্ভুল নিশানাতে গিয়ে বাঘটিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলেছিল! আরও একবার সাহেব একটি বিষাক্ত সাপের ওপর পা ফেলে দিয়েছিলেন; সাপটি ফোঁশ করে ফণা তুলে দাঁড়িয়েছিল। এক শ্রমিক নেউলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সাপটিকে মেরে ফেলেছিল।

    বাংলোতে ফিরে এডুইন সাহেব বেশ গম্ভীর হয়ে পড়েন। তিনি খানিক পরে পরেই বার্নার্ড আর লিওনার্ড সাহেবকে কিছু প্রশ্ন করছেন; আইসিএস পাওয়া সাহেবের নিশ্ছিদ্র প্রশ্ন...
    ""হোয়াট ইজ দ্য এরিয়া... নাচনডুবির জমির মোট কালি কত?''
    ""চারশো হেক্টর।'' বার্নার্ড সাহেব গৌরবের সঙ্গে বাগানের সম্পর্কে আরও কিছু কথা বলতে চাইছিলেন।
    শান্ত আর দৃঢ় কণ্ঠে এডুইন সাহেব বললেন, ""জাস্ট আনসার... আমি যা প্রশ্ন করব শুধু তারই জবাব দেবে। দ্য টি গার্ডেন লেবারারস...'' বার্নার্ড সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন—শ্রমিকেরা জট বেঁধে একসঙ্গে কাজ করে, কি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে?

    লিওনার্ড জবাবে বুঝিয়ে দিলেন—শ্রমিকেরা কামজারির ঘণ্টা বাজতেই কাজে নেমে পড়ে। কে কোথায় কী কাজ করবে, আগে থেকে ঠিক করে রাখা থাকে; আলাদা আলাদা সেক্টরে আলাদা আলাদা মানুষ থাকে। কিছু লোক বাগানে পাতা তোলে, কেউ কোদাল মারে, কেউ কেউ ফ্যাক্টরিতে থাকে আর কিছু লোক কলঘরে থাকে—যেখানে পাতা শুকোনো হয়।এডুইন সাহেব যা জানতে চাইছিলেন, লিওনার্ডের থেকে বের করে নিলেন; কামজারির ঘণ্টার সঙ্গে শ্রমিকেরা চারশো হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে পড়ে।

    তারপর তিনি হিসাব করতে বসে পড়েন। তাঁরা ব্রেকফাস্ট করবার আগেই লিওনার্ড ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন; সবাই শুনেছিলেন কামজারির লম্বা সাইরেনের ধ্বনি। তখন সকাল ছটা বেজেছিল। তারপরেই বার্নার্ড লেবারটিকে চাবকেছিলেন; চার-পাঁচ কোপ পড়তেই মানুষটি ঢলে পড়েছিল। তারপর সাতটা বাজতে পনেরো মিনিট থাকতেই লেবারেরা এসে বড়ো বাংলো পেয়ে গিয়েছিল।

    এডুইন সাহেব টেবিল চাপড়ে জিজ্ঞেস করলেন, ""জাস্ট টেল মি... আমাকে বুঝিয়ে বল—এটা কী করে সম্ভব?'' একই প্রশ্ন ভিক্টর সাহেবও করলেন। বুড়ো শ্রমিক ঢলে পড়েছিল, ওকে বস্তিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; ওর জাতের সমস্ত শ্রমিক জড়ো হল, মৃতদেহ নিয়ে ওর বস্তির সবাই এসে বড়ো বাংলোয় পৌঁছে গেল। সময় লেগেছে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট!উত্তরটা দিলেন লিওনার্ড। এই দলটির মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—এদের জোট বেঁধে থাকার স্বভাবটি। এদের নিজেদের লোকের মধ্যে কিছু একটা সমস্যা হলেই এরা একরকমের দীর্ঘ শিস দেয়; এই দীর্ঘ শিসে এরা মুহূর্তে জোট বাঁধে। আজও হয়েছে। একবার বাগানের মুহুরি না কলঘরের একজন বাবু ওদের একটি মেয়েকে বাজে কিছু কথা বলেছিল; তির-ধনুক নিয়ে এরা মুহূর্তে বাবুটিকে ঘিরে ফেলেছিল। লিওনার্ড গিয়ে না পৌঁছালে এরা বাবুটিকে ছিঁড়ে ফেলত!

    এডুইন সাহেব দাঁড়ালেন আর বার্নার্ড সাহেবের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন, ""ডিপোর্ট দেম, এদের বাগান থেকে বের করে দাও।''

    বার্নার্ড সাহেবও দাঁড়ালেন; বলেন কী কমিশনার সাহেব! এই দু-শো শ্রমিককে তাড়িয়ে দেবার মানে বাগানের অনেক লোকসান। সমস্যাটির তো সমাধান হয়ে গেছে; এই সব বাগানের নিজের ভেতরের কথা, হতেই থাকে, আবার ঠিকও হয়ে যায়। কী এমন বড়ো কথা হল যে, সবচাইতে কাজের লোকগুলোকে তাড়িয়ে দিতে হবে? এমনিতেই লোক নেই!

    ""কিন্তু কেন?''
    ""আমি এই লোকগুলোর মধ্যে একটি বড়ো বিপদের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।''
    ""বিপদ!'' সবাই অবাক হল।
    ""এই মানুষগুলোর মানে একতা—এদের স্বভাবে আছে জোট বাঁধা; আমাদের সাম্রাজ্যের জন্যেই এদের জোট বাঁধার স্বভাব বিপজ্জনক! আমরা এই দেশ শাসন করতে এসেছি; আমরা শাসক—উই আর রুলার্স... আমাদের শাসন করতে হবে, উই হ্যাভ টু রুল।''

    বার্নার্ড সাহেব মুহুরিকে পাঠিয়ে দামোদর কলিতাকে ডেকে পাঠালেন; দায়িত্ব দিলেন। এই দু-শো শ্রমিককে বাগান থেকে বের করে এক্কেবারে খারুপেটিয়া ঘাটে নিয়ে গিয়ে জাহাজে তুলে গুয়াহাটি পৌঁছে দিতে হবে; সেখানে উজানবাজারের কুলি ডিপোতে রেখে এক্কেবারে জাহাজে তুলে চালান দিতে হবে। দরকারের চাইতে বেশি টাকাপয়সা দামোদর কলিতার হাতে দিলেন সাহেব। শিসগুলোর সঙ্গে মানুষগুলোও নাচনডুবি বাগান থেকে নেই হয়ে গেল!

    বেলা ডুবলেই যে মাটিতে নেমে অপ্সরা নাচে


    নাচনডুবি বাগান; একটি ঢেউ খেলানো সবুজ বাগান। পাহাড়তলার এই জায়গাটি বুঝি বড়ো ভয়ঙ্কর জায়গা—লোকে বলে অভিশপ্ত জায়গা; তাই নামটাও নাচনডুবি। বেলা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড় থেকে অপ্সরা কন্যারা নেমে এসে এই ঢেউ খেলানো ভূমিতে নেচে বেড়াত। সূর্য ডুবে গেলে পাহাড়তলার লোকজন এদিকে কক্ষনোই আসত না। যেই কিনা এই বেলা পড়বার সময়ে এখানে এসে কমলা রঙের আলোয় এই অপ্সরাদের নাচতে দেখেছে—সেই রক্তবমি করে মরত!গ্রামের বসতি আর নাচনডুবিকে আলগা করেছে মাঝের ননৈ নদী। ননৈ নদীতে বুঝি অপ্সরাদের স্নানের ঘাট রয়েছে; সেখানে এই কন্যাদের স্নানের জল যদি নদীতে পড়েছে, তবে বুঝি বান ডাকে! এই নদী পার করতেও লোকে ভয় পেত। নদীর ওপারে কেবল ঢেউ খেলানো অরণ্য—ভুটান পাহাড়ে গিয়ে মিলেছে।পাহাড়ের নিচে ঝাঁকে ঝাঁকে হাতি এসে জলকেলি করে; হাতির পালের আশপাশেই থাকে চিত্রল হরিণের ঝাঁক। ঝাঁকে ঝাঁকে ময়ূর নেচে থাকে; গাঁয়ের বয়স্করা বলে থাকেন—ময়ূরের ছদ্মবেশে বুঝি আসে আসলে অপ্সরা কন্যা। ননৈ পার করে কেউ নাচনডুবিতে যায় না; গেলেও ননৈতে পান-তাম্বুল দিয়ে পুজো দিয়ে যায়, নাচনডুবি গিয়ে কাঠ কাটে, জঙ্গলজুড়ে পড়ে থাকা ময়ূরের পালক গুটিয়ে আনে।

    নাচনডুবি পাহাড়ের নিচে গ্রামগুলো যদিও মিশ্র জনবসতির—মূল মানুষগুলো কিন্তু জনজাতি মূলের। তিব্বত পর্বত থেকে ভুটান পাহাড় হয়ে নাচনডুবি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এসে এরা ননৈ নদীর পাড়ে পাড়ে বসতি স্থাপন করেছিল। নেপাল থেকেও বহু মানুষ এসে এই জনজাতীয় মানুষগুলোর থেকে দূরে গরু-মহিষের খুঁটি পুঁতে বসেছিল। সহজ-সরল জনজাতীয় মানুষেরা ননৈ নদীর পুরো উর্বর পাড়কে খেত-খামারে সবুজ করে ফেলল; ননৈর এই পাড়ে বেশ কিছু গ্রাম ভালোরকম করেই বসে গেল। নিসিলামারি, রৌমারি, কাঐমারি গ্রামে লোক গিজগিজ করে; এর মধ্যে যারা খ্রিস্টধর্ম নিল—এদের গ্রাম হয়ে গেল আলাদা। গামিনী বুড়ার গ্রাম—মাঝখানে ননৈ নদী; এই পাড়ে গ্রাম-বসতি, খেত-খামার। অন্য পাড়ে উঁচু-নিচু এক বিস্তৃত ভূখণ্ড গিয়ে ভুটান পাহাড়ে মিলেছে। ধীরে ধীরে এই লোকগুলো ননৈর অন্য পাড়েও বন-অরণ্য খালি করে চাষাবাদ শুরু করেছিল।এই ননৈর পাড়ে পাড়ে গড়ে ওঠা গ্রামগুলোতে কেউ উত্তরমুখী চুলো বসায় না; লোকগুলোর সেই ভয় যায়ইনি! শ্বেত-সাহেবরা আসবার আগে পাহাড় থেকে নেমে আসা ডফলা বা "রাজালাগা'১ ভুটিয়ারা এসে একদিক থেকে টানা লুটপাট করে চলে যেত। সেই ভয়ে জনবিশ্বাস হল—পাহাড়ের দিকে চুলো বসাতে নেই, উত্তর দিকে আগুনের প্রতিষ্ঠা করলে অমঙ্গল হয়; আগুন দেখলে পাহাড় থেকে শত্রু নেমে আসবে বলে গ্রামের লোকে বিশ্বাস করত। ননৈর এপারের গ্রামের লোকজনের মধ্যে সেপারের নাচনডুবি অরণ্যের বহু কাহিনি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল।

    এবারে লোকে দেখল যে, শ্বেতাঙ্গ সাহেবেরা এসে নাচনডুবি অরণ্যে ঢুকল; মাটি জরিপ করতে এসেছিল। নদীর পাড়ে তাবু ফেলে সরকারি লোকে ননৈর এপারে-ওপারে মাটি মেপেছিল। লোকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখছিল—সরকারি লোকে কী বা করছে? মাটি-টাটি মেপে সরকারি লোকজন চলে গেল।এই দলটিতে এসেছিলেন মরগান ্লংফেল; তিনি স্কটল্যান্ডের মানুষ, ছিলেন মিলিটারিতে। তিনি মনে হয় জনাথন সাহেব থেকেই পেয়েছিলেন খবরটি। ননৈর এপারের মানুষের ম্যালেরিয়া হয় না; লোকে উঁচু-নিচু পাহাড়তলার নাচনডুবি অরণ্য থেকে একপ্রকার বুনো গাছের পাতা বৃষ্টি নামার পরে পরেই ছিঁড়ে আনে। বহু মানুষের বাড়িতেও এই গাছ ছিল; পাতাগুলো এনে মেঘলা দিন দেখে গ্রামের লোকে পাকতে দেয়, এর পরে শুকিয়ে গুঁড়ো করে চুঙাতে ভরিয়ে রাখে। এই কাছাড়ি লোকেরা শুকনো দেখে গাছের কাণ্ড এনে চুলোতে ভরিয়ে রাখে; কাঠের পুরু কাণ্ডগুলো খুব ধীরে ধীরে পুড়ে আংঠা হতে থাকে, তার ওপরে লোহার একটা শিকে কেটলি ঝুলিয়ে রাখে—সেই কেটলিতে পাতার গুঁড়ো সেদ্ধ হতে থাকে। যার যখন ইচ্ছে যায়—সামান্য নুন বা গুড় মিশিয়ে সেই পানীয় পান করে।জনাথন সাহেব থেকে খবরটি পেয়েই সাহেব সব ঠিক করে ফেলেন; সুযোগ বুঝে মাটি জরিপের দল একটির সঙ্গে গিয়ে সব কিছু নিজের চোখে দেখে এসেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন উজান অসমের একটি চা-বাগান থেকে নিয়ে আসা চিনা তরুণ এমংকে। এমঙের বাবা উজান অসমের একটি ইউরোপীয় বাগানের চা-কর্মী ছিল; তারই ছেলে এমংকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে, মাটি জরিপের দলটির সঙ্গে গিয়ে নাচনডুবি পৌঁছেছিলেন মরগান সাহেব। এমং পাতাগুলো দেখে রায় দিল—এগুলো চা-গাছই! মরগান সাহেব মন বেঁধে ফেললেন—নাচনডুবি অরণ্যতেই তিনি গড়ে তুলবেন "নাচনডুবি টি এস্টেট'। ফিরে এসেই সরকারের সঙ্গে কথা বলে কাগজপত্রের কাজও এগিয়ে ফেললেন। মরগান সাহেব বললেই তো হবে না, চা-কর্মী এমং সহস্র মুখে বললেও হবে না; এই নাচনডুবির অরণ্যে যে বুনো চা-গাছ জন্মায়—সেই কথার পাক্কা খবর নথিপত্রের সঙ্গে লাগবে। নাচনডুবির বুনো চা-পাতা পরীক্ষা করিয়ে প্রমাণপত্র দিতে হবে।

    মরগান সাহেব দ্বিতীয় আরও একবার নাচনডুবিতে এসেছিলেন; সঙ্গে এনেছিলেন জনাথন সাহেবের মিশন থেকে একটি ছেলেকে। দু-জনে গিয়ে নাচনডুবির অরণ্যে ঢুকে কুলগাছের সমান ওই ঝোপের মতো গাছগুলোর পাতা কাটলেন, বস্তাতে ভরালেন, ঘোড়ার পিঠে চাপালেন। তারপর সেই ঘোড়া নিয়ে গিয়ে ননৈতে নেমেছিলেন। ঠিক নদীর মাঝখানে আসতেই একদল লোক এসে সাহেবকে ঘিরে ফেলল; সঙ্গের কাছাড়ি ছেলেটি পালিয়ে গেল।ননৈ নদীতে কনকনে ঠান্ডা স্বচ্ছ জলের ধারা এদিকে-ওদিকে বয়ে যাচ্ছে। কোথাও পায়ের পাতা সমান জল, কোথাও হাঁটু সমান জল, কোথাও-বা কোমর সমান। চারদিকে আয়নার মতো জলে রোদের আলো পড়ে জল চিকমিক করছে; নুড়ি আর বালুকণাগুলো ঝিকমিক করছে। নদীর মাঝখানে ঘোড়ার পিঠে মরগান সাহেব।এ অঞ্চলে মরগান সাহেব অপরিচিত কেউ নন; লোকের বাগ-বাগিচায় তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজে বেড়াতে তাঁকে দেখেছে সবাই। লোকে লক্ষ করেছিল—এই সাহেব মাটি জরিপের কাজে লাগেন না; ঘোড়ার পেছনে একটি চিনা ছেলেকে বসিয়ে লোকের উঠোনে, বাগিচায়, কোণে-কানায় ঘুরে বেড়ান। সবাই না বুঝলেও কিছু মানুষ ঠিকই বুঝতে পারে যে, এই সাহেব খুব সরল মানুষ নন—কিছু একটা মতলব তো আছেই! এমনিতেও শ্বেত সাহেবদের প্রতি মানুষের রোষ বাড়ছে; বছর ঘুরতেই নতুন খাজনা, মানুষ সামাল দিয়ে উঠতে পারছে না। কিছু মানুষকে গ্রাম ছেড়ে, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে; কিন্তু চা-বাগান খুলবার জন্যে শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের থেকে একটা কড়িও না নিয়ে—সাহেবদের সরকার মাটি দিয়ে যাচ্ছে!

    মরগান সাহেব যখন দ্বিতীয় বার নাচনডুবিতে এলেন, পুরো এলাকাতে ত্রাসের সঞ্চার হল। চারদিকে রটে গেল—সাহেব দেখেই গেছে; এবারে সৈন্য-সামন্ত, বন্দুক-বারুদ নিয়ে আসবে গিয়ে, এসে গ্রামের মানুষকে তাড়াবে, গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে দেবে! চারা উঠবার আগেই বীজ পিষে মেরে ফেলবার কথা ঠিক করে মানুষগুলো করল কী—ননৈ পার করতে যাওয়া মরগান সাহেবকে এসে ঘিরে ধরল। বিপদ বুঝে সাহেবের সঙ্গে মিশন থেকে যে ছেলেটি এসেছিল, সে কই বা পালিয়ে গেল!সাহেবকে ধরে ঠিকমতো মার দেওয়া শুরু করতেই নদীতে জল নেমে আসতে শুরু করল; এটি যে ননৈ নদী—এভাবেই চোখের পলকে পাহাড় থেকে জল আসবে, আবার মিলিয়েও যাবে। সাহেবকে ওখানেই রেখে লোকগুলো চলে যাবার কথা ভাবল; যাবার আগে দু-একজনে সাহেবকে মার দিতে হাতও উঠাল, একজনে হাতের লাঠিতে সাহেবের মাথায় মারল জোর বাড়ি।এদিকে সাহেব মানুষটি চামড়ার পেটিতে ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছেন; বন্দুক বের করতে গিয়েও করলেন না। মানুষকে গুলি করে গেলে তিনি এদের চিরদিনের শত্রু হয়ে যাবেন; চারপাশে শত্রু নিয়ে বাগান খুলবেন কী করে? তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে শুরু করল। বিশ্বাসী ঘোড়া তাঁকে পিঠে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল—কিন্তু জল এসে গেল; আক্রমণ যারা করেছিল, তারা ছুটে পালিয়ে গেল। নাচনডুবির ওপরদিকে হয়তো অপ্সরা কন্যারা স্নান করছিল; জলের তোড়ে নদীতে যা পেল—সামনে সব ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল, সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ঘোড়ার সঙ্গে সওয়ার মরগান সাহেবকে!

    যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছেন—চেতনা ফিরতেই সাহেব দেখলেন, তিনি ঘোড়ার পিঠেই আছেন। আস্তে আস্তে ডাক দিলেন, ""আর্থার, মাই আর্থার!'' মাথা ঝাঁকাল ঘোড়া। সাহেব চারদিকে তাকালেন; হালকা অন্ধকারে চারপাশটা ঠাহর করা যাচ্ছে। একটি নদীর পাড়—নাচনডুবির নদীর মতো সংকীর্ণ নয়, পাড়গুলো বেশ উঁচু, খাড়া। নদীর পাড়ে পাড়ে অসংখ্য গাছ; গাছগুলো অনেক বড়ো বড়ো। হালকা আলোতে ধরা যায়—গাছগুলোর ডালে ডালে নানা আকৃতির থলে ঝুলে আছে।ধীরে ধীরে আলো ফুটল। মরগান সাহেব আস্তে আস্তে ঘোড়া থেকে নামলেন; গায়ের পোশাক প্রায় ছিঁড়েই গেছে। পুরো শরীর পাথরে আছাড় খেয়ে ছিলে-কেটে এক্কেবারে ক্ষতবিক্ষত ঘা! আর্থারের শরীরের এখানে-ওখানে থেকে রক্ত ঝরছে। একটা সমবেত গুনগুন স্বরে মরগান সাহেব মাথা তুলে তাকালেন; চতুর্দিকে অসংখ্য মৌমাছি উড়ছে। নদীপাড়ের গাছগুলোর ডালে ডালে ছোটো-বড়ো অজস্র মৌমাছির বাসা। সাহেব শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলেন; আস্তে আস্তে তিনি মাটিতে বসে পড়লেন।

    গ্রামের লোকজনেরা হাল বাইতে বেরিয়ে এসেছে। দু-একজন নদীর পাড়ে প্রাতঃকৃত্য করতেও এসেছে। নদী তীরে এক শ্বেত সাহেব পড়ে থাকবার কথাটি ক্রমে চারদিকে রটে গেল।গাঁওবুড়ো মঘাই রাজবংশী এসে জায়গাটিতে পৌঁছালেন; সাহেবকে ধরে তুলে গ্রামে নিয়ে গেলেন। রাজার বাড়ির লোক—কিছু একটা হলে রাজরোষে পড়তে হবে! মরগান সাহেব মঘাই গাঁওবুড়াকে একটি বিলাতি কলম দিয়েছিলেন; খুব আদরে-যত্নে সাহেবকে সুস্থ করে তুলেছিলেন মঘাই গাঁওবুড়া। সাহেবও গাঁওবুড়াকে ভোলেননি।

    গাছের পাতাগুলো পরীক্ষা করিয়ে মরগান সাহেব একবারে উঠেপড়ে লাগলেন। কোম্পানির থেকে নাচনডুবির চারশো হেক্টর জমি চা-বাগানের জন্যে অনুমোদন করিয়ে নিলেন; কেউ কিছু করতে পারল না। যার সম্পর্কে ভাবা হয়েছিল মারাই গেছেন—সেই মরগান সাহেব নাচনডুবি চা-বাগান বসিয়ে দিলেন। ভুটানের নিচের উঁচু-নিচু ভূখণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল নাচনডুবি চা-বাগিচা।নাচনডুবিতে আছে চা-গাছের জন্যে দরকারি ১৮০ সেন্টিমিটার বার্ষিক বৃষ্টিপাত, চা-গাছের জন্যে রোজকার দরকার চার ঘণ্টার রোদ; জল জমা হবার প্রশ্নই ওঠে না। মাটি খুব ভালো রকম আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে—উর্বর পাহাড়ের তলার ঝরঝরে মাটি। এখানে বুনো চা-গাছ জন্মানো কোনো অবাক করা কথা নয়। কুলগাছের সমান এই বুনো চা-গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে নতুন চা-গাছের চারা লাগানো হল; দেখতে দেখতে সেই চারাগুলোও ঝোপ বেঁধে বড়ো হয়ে এল।সেই চা-গাছের পাতা শুকিয়ে মরগান সাহেব নাচনডুবিতে উৎকৃষ্ট চা পাতা তৈরি করে ফেললেন। ‘Camellia Assamica’ কাগজের লেবেল লাগানো কাঠের বাক্সে চেপে, জাহাজে চড়ে সেগুলো লন্ডনে গিয়ে পৌঁছাল। এবার মরগান সাহেবও বাগানে নেই—ইংল্যান্ড চলে গিয়েছিলেন। গ্রামের লোকে ঠিক খবর পেয়ে গেল—সাহেব বাগানে নেই, দেশে গেছেন। এরা এসে রাতে রাতে চা-গাছগুলো কেটে নিশ্চিহ্ন করে দিল। এই মানুষগুলোর চা-বাগানটির প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ। এত মাটি বাগানটি নিয়ে নিয়েছে, আর ওদিকে গ্রামের মানুষ করের বোঝায় বাঁকা হয়ে পড়েছে; কিন্তু সাহেব বিনা করে এতগুলো মাটি পেয়ে গেছেন! চা-বাগান কাজ করবার জন্যে সাহেব নানা দেশের নানা জাতের লোক নিয়ে এসেছেন; এই মানুষগুলোকেও গাঁয়ের লোকেরা পছন্দ করে না।নাচনডুবি গ্রামে আর গাঁয়ের লোকে জঙ্গল কেটে চাষ করতে পারে না; এমনকি শুকিয়ে চা পাতা তৈরির জন্যে পাতা নিয়েও আসতে পারে না। এক বোঝা লাকড়ি কেটে নিয়ে আসবে যে, পেকে গন্ধে মো-মো করা চালতা একটা যে হাতে তুলে নিয়ে আসবে, পাহাড়ের সরু সরু দুটো বাঁশ কেটে যে নিয়ে আসবে, গাছে পেকে ওঠা মৌচাক ভেঙে যে নিয়ে আসবে, টক-মিষ্টি দুটো বুনো আম পেড়ে নিয়ে আসবে, শন দুটো কেটে যে নিয়ে আসবে হাতে করে, ফাঁদ পেতে দুটো হরিয়াল, রাজহরিয়াল পাখি ধরে নিয়ে আসবে যে, পাহাড়ি ঝরনা-নদী থেকে দুটি মাছ ধরে নিয়ে যে আসবে—এসব কিছুর জন্যেই নাচনডুবির ঢেউ খেলানো পাহাড়-অরণ্য এদের জন্যে নেই হয়ে গেল!কোথাকার কিছু মানুষ এসে লোহার জালি-বেড়া দিয়ে জায়গাটি নিজেদের করে ফেলল; এখন আর ননৈর পাড়ে পান-তাম্বুল দিয়ে যে কেউ অপ্সরার দেশে পাড়ি দেবে—তার দরকারটাই নেই হয়ে গেল। নাচনডুবি বাগানের চা-গাছগুলো উপড়ে ফেলে দিয়ে মানুষগুলো মুখে কুলুপ এঁটে দিল। এই সহজ-সরল অল্পবুদ্ধির লোকগুলোর ক্রোধ থাকে নাকের ডগায়; গাছগুলো উপড়ে ফেলতে ফেলতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বাগানের বস্তির কেউ কেউ টের পেলেও এসে যে বাধা দেবে—এর সাহস হল না কারও।

    মরগান সাহেব এসে কাউকে কিছু বললেন না। তিনি বাগানের চা-গাছের চারার নার্সারিতে বেশি করে মনোনিবেশ করলেন; শ্রমিকদেরও ওদিকটায় নিয়ে গিয়েই কাজ করাতে শুরু করলেন। নতুন চারা আনবারও ব্যবস্থা করলেন। চিনা প্রজাতির চা-গাছের চারা নার্সারিতে ছিলই; কাম্বোডিয়া থেকেও কিছু গুটি এনে রোপণ করলেন। "লতা চাপরি'২ চায়ের গুটিও আয়োজন করে রোপণ করলেন। নাচনডুবির রোদে-বাতাসে চা-চারাগুলো হু-হু করে বেড়ে চলল।মরগান সাহেবের না আছে সংসার, না আছে ব্যক্তিগত জীবন; মানুষটিকে চা-বাগান পত্তনের নেশায় পেয়েছিল। গরু-মহিষের মতো খেটেছিলেন। সেবারে নাচনডুবির আবহাওয়াটা খানিক ভিন্ন হয়েছিল—সকালে যদি বৃষ্টি, বিকেলে রোদ! চা চাষের জন্যে এর চাইতে ভালো আবহাওয়া আর কী বা চাই?রোদ-বৃষ্টিতে নাচনডুবির সেই কেটে ন্যাড়া করে ফেলা চা-গাছে যেন অপ্সরা কন্যার নৃত্যরতা পায়ের পরশ লেগেছে! কোমল নরম একটি কুঁড়ি, দুটি পাতায় অযত্নে পড়ে থাকা গাছগুলো ভরে উঠল। নাচনডুবি বাগিচার এই গাছ কেটে ন্যাড়া করা জায়গাটিতে বহু দিন তিনি যাননি।এমনিতে সাহেব কিছুতেই ভয় করেন না; করেন কেবল মনে যদি জুড়ে বসে নিরাশা। এমন ভয়াবহ অনুভূতিকে তিনি যথাসম্ভব কাছেই ঘেঁষতে দেন না। কেটে ফেলা গাছগুলোর দিকে তাকাতেই নাচনডুবি পাহাড়ের কালো ছায়াগুলো যেন তাঁর মনের গহীনে এসে ঢুকে পড়ল।তিনি শুধু দেখতে গিয়েছিলেন—কেটে ফেলা গাছের মুড়োগুলো কীভাবে তুলে ফেলবেন, আর সেই জায়গাতে কোন চা-চারা কীভাবে নতুন করে রুইবেন। গিয়ে দেখলেন—মরা গাছের গুঁড়ির বদলে সেখানে সবুজ গাছে ভরে গেছে! সেরকমই এক গাছের গুঁড়িতে বসে তিনি প্রার্থনা শুরু করলেন; নিজের প্রিয় ঘোড়া আর্থারকে জড়িয়ে ধরলেন। কাজলা রঙের ঘোড়াকে জড়িয়ে ধরে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ""মিরাকল, আর্থার! মাই আর্থার! মিরাকল!'' নাচনডুবির উঁচু-নিচু ভূখণ্ড জুড়ে উঠেছিল তাঁর প্রতিধ্বনি,""মিরাকল, মিরাকল... আর্থার!'' শ্রমিক লাগিয়ে তিনি চা-গাছগুলো সমান করে কাটালেন; দ্বিগুণ হয়ে গেল নাচনডুবির উৎপন্নের হার। ইংল্যান্ডের বাজারে ভালো দাম উঠেছিল নাচনডুবির চায়ের। পরের বছরে কলম দেওয়া চা-গাছে ভরে গিয়েছিল নাচনডুবির ঢেউ খেলানো পুরো ভূখণ্ড। মরগান সাহেব যখন চা-বাগান বসান—একটিও বড়ো গাছ কাটতে দেননি; বড়ো বড়ো গাছের ছায়ার নিচে নিচে সমান করে কলম করে লাগানো চা-গাছ এমনভাবে পুরো নাচনডুবির ঢেউ খেলানো মাটিতে ছড়িয়ে গেল যে, মনে হচ্ছিল—অপ্সরা কন্যার শরীর থেকে খুলে একটি সবুজ রেশমি কাপড় পুরো এলাকাতে মেলে ছড়িয়ে পড়েছে!হিসাবের খাতায় মরগান সাহেব লিখে রাখলেন, ""চা-গাছ কলম দেবার পরের বছরে নাচনডুবির আয় ৬.৫৪৯ পাউন্ড, আয়কর দিতে হল ১.৬৫০ পাউন্ড।'' নাচনডুবি চা-বাগান জমে এল। ইতিমধ্যে সোনাপুর থেকে নাচনডুবি পর্যন্ত একের পরে এক চা-বাগান বসতে শুরু করেছিল। মরগান সাহেবের নাচনডুবির সফলতার কাহিনি ব্রিটিশ চা-ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়াতে মরগান ্লংফেল এক প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়ে গেলেন।

    মরগান সাহেব প্রবাদ পুরুষ হয়ে পড়েছিলেন আশপাশের গ্রামগুলোতেও। ফুসফুস-ফিসফাস করে চারপাশের গ্রামের লোকের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে নানা রূপকথা-উপকথারও জন্ম হয়ে গেল আর বাগানগুলোরই মতো এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আঘাত পাওয়া অবস্থায় মরগান সাহেবকে জলে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল; পাথরের ফাঁকে ফাঁকে ঘষটে ঘষটে এত দূর গিয়ে মানুষ একজন বেঁচে থাকতে পারে না। শ্বেতাঙ্গ সাহেব হলেও তিনি মানুষই তো; সাহেবকে জল থেকে টেনে তুলে অপ্সরা কন্যারা এক্কেবারে নাগনদীর পাড়ে রেখে এসেছিল!সবাই দেখতে পায়—সাহেব বিকেল হলেই কালো ঘোড়ায় চেপে বেলা ডোবার দিকে যান। যেতে যেতে ননৈ নদী যেখানটায় বেরিয়েছে, সেখানে গিয়ে পৌঁছান।ভুটান পাহাড় থেকে বেরিয়ে সেখানে ননৈ নদী হু-হু করে নিচে নেমে এসেছে; নেমে আসা জলধারার শব্দে ওখানে আর কিছুই শোনা যায় না। সূর্যাস্তের সময় সেই জলধারা এক্কেবারে সোনালি হয়ে পড়ে। ওখানটায় একটা পাথরে মরগান সাহেব গিয়ে বসে থাকেন, অনেকেই দেখেছে।কীসব মাপজোখ করে থাকেন সাহেব; আসলে এসবই লোক-দেখানো। সূর্য পাটে ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার পাথরে অপ্সরারা চলে আসে, নৃত্য করে; বসে থাকেন মরগান সাহেব। নাচনডুবির এক্কেবারে ওপরে ননৈর মোহনাতে জ্যোৎস্নার আলোয় অপ্সরা কন্যারা এসে সাহেবের সঙ্গে পীরিত করে। অন্য সাহেবদের গায়ের রং থাকে ধবধবে সাদা; রোদে পুড়ে মরগান সাহেবের গায়ের রং এক্কেবারে আলাদা হয়ে পড়েছে। নীল চোখ, সাড়ে ছয় ফুট উঁচু, রোদে পোড়া সুস্বাস্থ্যবান শরীর তাঁর; তাঁর প্রেমে পড়েছে অপ্সরা কন্যা! সেই অপ্সরাদের স্নানের ঘাটের জল থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে উদ্ধার করেছিল যে অপ্সরা—সেই হচ্ছে মরগান সাহেবের প্রেমিকা। শুধু যে গ্রামের মানুষ—তাই না, চা-বাগানের লোকজনেও জানে এসব কথা।বিকেল হল কি হল না—মরগান সাহেবের ঘোড়া নাচনডুবির সেই উঁচু জায়গাটার দিকে জোরে পা ছোটাবেই ছোটাবে। বাগান থেকে ওই জায়গাটা অবধি একটি সরু পথ তৈরি হয়েই গেছে; মানুষজনও ওই পথে আসা-যাওয়া শুরু করেছে। বাগানের লোকে দেখেছে—সাহেব ওখানে জলের ধারায় স্নান করে খালি গায়ে পাথরে বসে থাকেন। অপ্সরা কন্যাকে আর কেউ দেখে না; কেউ কেউ কখনও-বা একটা ছায়া দেখতে পায়—একগাছা লম্বা চুলের ছায়া মরগান সাহেবের আশপাশে কাঁপতে থাকে!

    স্কটল্যাণ্ডের লেনার্ক শায়ারে লংফেল পরিবার একটি ভিলা কিনেছিল। মরগানের দুই ভাই বার্নার্ড আর লিওনার্ড উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেছিলেন। ভিলাটা কিনেছিলেন এক ক্ষয়িষ্ণু নাইটের থেকে। টাকা পয়সা সবই গিয়েছিল নাচনডুবি বাগান থেকে। লংফেল পরিবার সেই ভিলাটির নাম রাখেন ‘নাচন-ডুবি ম্যানসন’। রাখবেনই না কেন? নাচন-ডুবি চা বাগান ্লংফেল পরিবারকে নাইটের এলিজাবেথিও স্থাপত্যের ভিলার মালিক করেছে। কী দেয় নি ্লংফেল পরিবারকে এই বাগান? পড়াশোনা শেষ করে দুই ভাই দাদার কাজে হাত লাগাবেন বলে নাচনডুবি আসবার জাহাজে চড়ে বসেছিলেন। দাদা মরগানের জন্যে কনে দেখাও হয়ে গিয়েছিল। ভিলাটি কিনতে গিয়েই নাইটের মেয়ে এলিজার সঙ্গে মরগানের বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়ে যায়। দুই ভাইর সঙ্গে এলিজা এসেছিলেন, এসেছিলেন ্লংফেল দম্পতি, আর এলিজার মা।

    তাদের আগমন উপলক্ষে নাচনডুবিতে সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছিল। দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মরগান সাহেব নাচনডুবি চা-বাগানকে এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাবার কথা ভাবছিলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনার নিখুঁত আর সম্পূর্ণ খসড়া তৈরি করেছিলেন; এর জন্যে পুঁজির ব্যবস্থাও করেছিলেন।মরগান সাহেব ননৈ থেকে হু-হু করে নেমে আসা জলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমস্ত পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন; নদীটি যেহেতু ভুটান পাহাড় থেকে নেমে এসেছে—ভুটানের রাজার সঙ্গেও কথাবার্তা বলে নিয়েছিলেন। প্রচুর কর দিয়ে ভুটানের রাজার থেকে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলেন।বার্নার্ড, বিশেষ করে স্থাপত্যবিদ্যায় উঁচু ডিগ্রি নিয়ে আসা লিওনার্ডর জন্যে বড়ো আগ্রহ নিয়ে তিনি পথ দেখছিলেন। একবার নিজেদের উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ফেলতে পারলেই আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। লোক লাগিয়ে নাচনডুবিরই একটি টিলা ঠিক করে রেখেছিলেন—সেখানে একটি বাংলো তৈরি করবেন বলে; ডিজাইন করবেন লিওনার্ড। নিয়মানুবর্তিতায় দৃঢ় বার্নার্ড বাকি কাজকর্ম দেখাশোনা করবেন। তাঁর ওপর এলিজা আসবে; রেভারেন্ড জনাথন সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, বিয়ে সেখানেই হবে। অনেক পরিকল্পনা ছিল মরগান সাহেবের।

    এর কিছুই উপভোগ করে যেতে পারলেন না মরগান সাহেব। সবই গড়ে তুললেন—কিন্তু তাঁর নিজের ভাগ্য হল না সে-সব কিছু উপভোগ করবার; এক্কেবারে কম বয়সে মরগান সাহেব চলে গেলেন। প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল; ডাক্তার দেখে বললেন,""ব্রেন ফিভার।'' আসলে ম্যালেরিয়া গিয়ে মরগান সাহেবের মগজে ধরেছিল।ওদিকে জাহাজে আসছিলেন দুই ভাই, হবু স্ত্রী, হবু শাশুড়ি, মা-বাবা। সবাই এসে মরগান সাহেবকে পেলেন গুয়াহাটির ইউরোপীয় সিমেট্রিতে চিরদিনের জন্যে শুয়ে পড়া অবস্থায়! সবাই এসে যখন এই ইউরোপীয় সিমেট্রিতে মরগানের কবরে প্রার্থনা করছিলেন, তখন সেখানকার বকুল গাছটি থেকে ঝরে পড়া ফুলে কবরটি ঢেকে গিয়েছিল।

    এলিজাকে বার্নার্ডের হাতে সঁপে সবাই ফিরে গিয়েছিলেন। নাচনডুবির হাল ধরেছিলেন বার্নার্ড আর লিওনার্ড—দুই ভাই। লিওনার্ড নতুন বড়ো বাংলো সাজিয়ে তুললেন, সেই সঙ্গে সেখানে গুলঞ্চ গাছের নিচে দাদার একটি স্মৃতিস্তম্ভ। লিওনার্ড আর বার্নার্ড মিলে মরগান সাহেবের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও চালু করে ফেলেছিলেন; দাদা যেভাবে বন্দোবস্ত করে যান—সেভাবে ভুটান রাজাকে নিয়মিত জল-করও দিয়ে যাচ্ছিলেন। নাচনডুবি আরও সমৃদ্ধ হচ্ছিল, বড়ো হচ্ছিল।

    মরগান সাহেব মারা যাবার পরে গাঁয়ের লোকে আর বাগানের লোকে বলাবলি করছিল—মরগান সাহেবকে মেরেছে অপ্সরা কন্যা! এক বিকেলে সেই ভয়ঙ্কর জায়গাটিতে স্নান করে ফিরেছিলেন সাহেব। সবাই জানে—হুড়হুড় করে নেমে আসা জলধারাতে পিঠে দিয়ে স্নান করতে বড়ো ভালোবাসতেন সাহেব। শুধু কি স্নান করতেন? কখনও সঙ্গে গিয়েছিল এমন দু-একজনে বলেছিল—সাহেব খালি গায়ে ওখানে নেমে অদৃশ্য কন্যার সঙ্গে মিলিত হতেন; আন্দোলিত হত তাঁর শরীর। সেই শরীরের ভাষা যে দেখে, সে ঠিকই বোঝে—দেখে না কেবল সেই নারীকে, দেখে উড়ন্ত একগাছা চুলের ছায়া! সেই অপ্সরা কন্যা প্রতিশোধ নিয়েছে; মরগান সাহেব জীবনে এক মেম স্ত্রী নিয়ে আসতে চাইতেই সেই মায়াবী কন্যা মরগান সাহেবকে নিয়ে চলে গেল।যেদিন তিনি মারা যান—সেদিনই সবাই একজোড়া পেঁচাকে দেখেছিল পালকে আলোর চুমকি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে! রাতের কুচকুচে কালো অন্ধকারে পাখায় করে আলো নিয়ে উড়ে বেড়ানো এই পেঁচা-জোড়কে দেখে সবাই নিজের নিজের ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করেছিল; পেঁচার জোড়া বুঝি নাচনডুবির আকাশে চক্রাকারে উড়ে বেড়াচ্ছিল।

    মরগান সাহেবের ভাইয়েরা চরকা লাগিয়ে ননৈর জল আটকে পুরো বাগানে আলো ছড়িয়ে দিলেন; কত দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসে সেই আলো দেখে গেল। মরগান সাহেবের স্মৃতিস্তম্ভের কাছে এলিজা মেম একটি রেইন-ট্রি রোপণ করেন; খুব দ্রুত বেড়েছে সেই গাছটি, অনেকটা এলাকা জুড়ে ডালপালা মেলে ধরেছে।

    নাচনডুবির মরগান সাহেব বয়োবৃদ্ধদের মুখে মুখে এক নতুন উপকথায় রূপান্তরিত হলেন। বুড়োরা বলাবলি করে—মরগান সাহেবের সঙ্গে নাচনডুবির অপ্সরা কন্যারাও চলে গেছে। মরগান সাহেব তাঁর প্রেমিকা অপ্সরাকে স্কটল্যান্ডের "নাচনডুবি ম্যানসন'-এ নিয়ে গেলেন, না অপ্সরা কন্যা তাঁকে নিজের মেঘের দেশে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল—লোককাহিনি আর সেই সন্ধান দিতে পারল না, সেই অবধি গিয়ে পৌঁছাল না।

    মোদ্দা কথা—লোকে নাচনডুবির যে ঢেউ খেলানো অরণ্যে পান-তাম্বুল দিয়ে পুজো করে প্রবেশ করত, সেই অরণ্য আর অরণ্যের অপ্সরাও এই লোককাহিনির জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল। মরগান সাহেব এসে নাচনডুবিকে এক সোনার খনি করে ফেললেন; কোদাল দিয়ে টেনে টাকা কুড়িয়ে রাজার রাজকোষ ভরাবার জন্যে এক স্থায়ী বন্দোবস্তি গড়ে তুললেন।

    বড়ো বাংলোর রেইন-ট্রি একটা ছাতার মতো ছড়াচ্ছিল আর ছড়াচ্ছিল মরগান সাহেবের নাচনডুবি চা-বাগান। ছড়ানো সে রেইন-ট্রি আর নাচনডুবি চা-বাগান ক্রমেই ঢেকে ফেলল মরগান সাহেব আর অপ্সরা কন্যার রূপকথাও।


    টিকাঃ
    ১। রাজালাগা : আসামের প্রাকব্রিটিশ আহোম-দরঙী রাজাদের আমলে প্রজারা সেইসব ভুটিয়া বা ডফলা দস্যুদের "রাজালাগা' বলত, যাদের ভুটান পাহাড়ের দেবরাজা বা কোনো স্থানীয় পাহাড়ি জনজাতি প্রধান নিজের তদারকিতে "ফরমান' বা রাজকীয় ক্ষমতার সিলমোহর দিয়ে নিচে পাঠাতেন। অর্থাৎ, এরা সাধারণ বুনো চোর বা ডাকাত ছিল না; এরা ছিল কোনো রাজার লেঠেল বাহিনী, যারা সমতলে এসে খাজনা উসুল করত বা লুটপাট করে চলে যেত।
    ২। লতা চাপরি: স্থানীয় চায়ের বীজ।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫ | বাঙালির লোকায়ত উৎসবঃ ঝুলনযাত্রা | ছাতিমবাগান | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৬ | তাতানের পাসওয়ার্ড | ভালোবাসা | উত্তরাধিকার | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৭
  • ধারাবাহিক | ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ১৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন।