

অলংকরণ: লেখক
এক মনে দূরবীন দিয়ে দূরে একটা মোনাল পাখিকে লোকেট করার চেষ্টা করছিল তাতান, এমন সময় কি একটা আওয়াজ হতে ফস্ করে পাখিটা উড়ে পালাল। হাতঘড়িতে দেখল, বারোটা বাজতে ঠিক আর তিন মিনিট বাকি, হঠাৎ মনে হল কে যেন ঠিক ওর পিছনে দাঁড়িয়ে ওকে ডাকছে। তাতান ঘুরে দেখে একটা লম্বা মতো লোক, তার এক চোখে চৌকো চশমা, সেইই হাত নেড়ে তাকে ডাকছে। তাতান চমকে উঠে বাবা-মাকে ডাকতে যাবে, কিন্তু খেয়াল হল পাহাড়ি রাস্তা ধরে একা একা হাঁটতে হাঁটতে ও অনেকটা এগিয়ে চলে এসেছে। চেঁচামেচি জুড়বে কিনা ভাবছে, অমনি লোকটা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে বলল, আপনিই তাতান তো?
- তুমি কী করে জানলে, বাবা ডাকছিল তখন শুনে নিয়েছ?
- না না, সবই জানি, জাস্ট কনফার্ম করছিলাম, আপনার ভালো নাম, অস্মিত লাহা, ডিপিএস নিউ টাউনে ক্লাস ফাইভে পড়েন।
- তুমি কলকাতা থেকেই চেনো আমায়? তোমার নাম কী?
লোকটা বলল, আমার নাম ডার এল, হাতে এখন একদমই সময় নেই, সব বলবো, কিন্তু আমাদের এক্ষুনি রওনা দিতে হবে।
তাতান জিজ্ঞেস করতে যাবে, আমরা যাচ্ছি কোথায়, তার আগেই লোকটা তার হাতঘড়ির মধ্যে একটা সুইচ মতো টিপে দিতেই তাতানের চারদিকটা এক নিমেষে প্রচন্ড উজ্জ্বল আলোয় ভরে গিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে গেলো।
চারিদিকের আলোটা ধীরে ধীরে কমে আসতে তাতান চোখ পিটপিট করে দেখল, চারপাশ পুরো বদলে গেছে। ও হঠাৎ একটা অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি প্লাস কন্ট্রোল সেন্টার ধরণের জায়গায় এসে হাজির হয়েছে। আশেপাশে বেশ কিছু লোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে কত কী খুট খাট করছে বিশাল বিশাল স্ক্রিনের সামনে বসে, সাথে ট্যাবে নোট করছে হাজার রকম হিসেব নিকেশ। সামনে তাকিয়ে দেখল, ওই লম্বা মতো লোকটা চিন্তিত মুখে ঠিক ওর দিকে তাকিয়ে আছে, 'আপনি ঠিক আছেন তো তাতান?'
তাতান টক করে ঘাড় নেড়ে বলল, 'হ্যাঁ, কিন্তু আমরা এখন কোথায়? আমি তো পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটা কই গেল?'
- দেখুন খুব বেশি কিছু আমি বলতে চাইছি না, ভবিষ্যত শোনা উচিত নয়, কিন্তু যেটুকু বলব, ধৈর্য ধরে শুনুন, উত্তেজিত হবেন না, তাহলে কিন্তু মাথা ভজকট হয়ে যাবে বেমালুম।
লোকটা বেশ খানিকটা শ্বাস নিয়ে বলা শুরু করল,
'আমরা এখন আছি ২১৭২ সালে।'
তাতান শুনেই ছিটকে উঠল, 'বলছ কী? টাইম ট্রাভেল? আমরা এত্ত সময় পেরিয়ে চলে এলাম?'
লোকটা মুচকি হেসে বলল, 'আমরা নয়, কারণ আপনি টাইম ট্রাভেল করেননি, খালি আমি করেছি।'
- এ তো সেই অ্যাভেঞ্জার্স এন্ড গেমে ক্যাপ্টেন আমেরিকার মতো ব্যাপার!
- না সেরকম মোটেই নয়, পুরোনো দিনের চলচ্চিত্র নিয়েও আমরা কিছুটা জানি, কিন্তু এখানে আমরা টাইম ট্রাভেল করলেও পুরোনো সময়ে ফিরে গিয়ে কোনো কিছু রদবদল করতে পারিনা, আমি শুধু আপনার মনের এসেন্সের কপি একটা ক্যাপসুলে ক্যাপচার করে নিয়ে এসেছি, আর আপনি যেটা আপনার শরীর ভাবছেন ওটা আসলে একটা সিন্থেটিক অর্গানিক রোবট। আসলে শুধু মন বা কনসাসনেস থাকলে, শরীর না থাকলে, মাথা ঘেঁটে যায়, তাই আপনি যাতে স্বাভাবিক ভাবে সবার সাথে কথা বলতে পারেন, হেঁটে চলে বেড়াতে পারেন, তাই এই কৃত্রিম শরীরটা আপনাকে দেওয়া হয়েছে।
- কিন্তু আমি তো দিব্যি ঘুরছিলাম রিশপের পাহাড়ে, আমায় এখানে এনেছ কেন? বাড়ির লোকেরা চিন্তা করবে না?
- খুব জরুরি কাজে আপনাকে আনা হয়েছে, আপনি আমাদের উদ্ধার না করলে আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার। বাড়ির লোককে কোনো চিন্তা করতে হবে না, সেসব দায়িত্ব আমার। আপনি শুধু আমাদের সাহায্য করুন।
- আচ্ছা তখন থেকে ‘আপনি’ ‘আপনি’ বলছ, আমার খুব হাসি পাচ্ছে, আর কী বিপদ আগে খুলে না বললে আমি কিচ্ছুটি সাহায্য করব না।
- সরি সরি, তুমি বলাই উচিত ছিল, আসলে অনেক দিনের অভ্যাস তো। দেখো, যদিও টাইম বেশি নেই, তবুও একটু খুলেই বলি, তোমাদের সময়ে তুমি শুনেছ নিশ্চয়ই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এ আই মডেল নিয়ে নানারকম কাজকম্ম চলছে। তবে জেনে রাখো এসব মডেল আসলে তখন সবে চলতে শিখছে, অনেক দূর যাওয়া বাকি, এখনো সঠিক বুদ্ধি বলতে যা বোঝায় এদের কিস্যু নেই, ধীরে ধীরে এদেরকেই উন্নত করে একসময় আবিষ্কার করে ফেলা হবে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স, যে একটা সাধারণ মেধার মানুষের মতো সব কাজ নিজে বুঝে করতে পারে। আর তারও অনেক অনেক পরে, অনেক সাধ্য সাধনা করে বিজ্ঞানীরা তৈরি করবে আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স বা এ এস আই। সে এক মারকাটারি ব্যাপার।
- কেন এ আই কি খারাপ? অবশ্য ক্লাসে সেকেণ্ড হয়েছি বলে, বাবা এবছর আমায় কম্পিউটার কিনে দেবে বলেছিল, কিন্তু এবার নাকি এ আই-এর জন্য কম্পিউটারের জিনিসপত্রের দাম আগুন। তাই বাবার অফিসের পুরোনো ল্যাপটপটা দিয়েই আপাতত কাজ চালাতে হচ্ছে। ওটা আবার চালু হতেই দশ মিনিট!
- দেখো সেসব তো ঠিক আছে, কিন্তু যখন তৈরি করা হল, আমরা সবাই তো ভেবেছিলাম এ এস আই-এর থেকে ভালো জিনিস বুঝি আর হয় না, সে পটাপট সমস্ত বড়বড় অঙ্কের প্রবলেম সমাধান করে ফেলল, মারণ অসুখের ওষুধ বের করে ফেলল টপ করে, এক তুড়িতে দূষণ মোকাবিলার উপায় বাতলে দিল, আমরা এখন তাই সবাই ক্যান্সারমুক্ত, নেহাৎ অ্যাক্সিডেন্ট না হলে মানুষ এখন প্রায় যদ্দিন ইচ্ছে ড্যাং ড্যাং করে বেঁচে থাকে, মোটের ওপর পরিবেশ দূষণও এখন আমাদের কন্ট্রোলে, ফসিল হয়ে যাওয়া সব প্রাণীদের আবার একে একে ফিরিয়ে আনা গেছে, সৌরশক্তি আর নিউক্লিয়ার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সস্তায় কাঁড়ি কাঁড়ি বিদ্যুৎও পাওয়া গেছে সবার জন্য, আর কোনো টানাটানি নেই, হুটোপাটি নেই, তাই সব যুদ্ধ বিগ্রহও এক্কেবারে থেমে গেছে, পৃথিবীর অর্থনীতিও খুব সুন্দর ভাবে কন্ট্রোল করতে শিখে গেছে এই এএসআই, কারোরই কোনো কিছুর একফোঁটা অভাব নেই আর।
- বাঃ, তাহলে তো তোমরা সবাই দিব্যি আছো, এই যে বিপদ বিপদ বলছিলে, সেরকম তো কিচ্ছুটি নেই।
- না, বিপদ আছে তো, সেই কথাতেই আসছি। এ এস আই এর সাহায্যে আমরা তো দিব্যি ছিলাম, কিন্তু গড়বড় হল এ এস আই যবে থেকে মানুষদের নিয়ে খুব করে তলিয়ে ভাবা শুরু করল।
ও বসে বসে অনেক অনেক চিন্তা ভাবনা করে, নানান কাম্পিউটেশনাল মডেল চালিয়ে, বিভিন্ন কৃত্রিম পরিস্থিতির সিমুলেশন চালিয়ে দেখেছে, এই মানুষরাই ইতিহাস জুড়ে নানা যুদ্ধ বিগ্রহ বাঁধিয়ে রেখেছে, জল, হাওয়া, পরিবেশ দূষণ করে ফেলছিল সবসময়, মাটি কেটে নানা রকম খনিজ তুলে পৃথিবী ফোঁপড়া করে দিচ্ছে, মাটির তলার সমস্ত জল হুহু করে শুষে নিচ্ছে, তার ভালো মতো ফেলে ছড়িয়ে বাঁচার জন্য রোজ গাদা গাদা জিনিসপত্র লাগে। আর কোনো জীবজন্তু নাকি পৃথিবীর ওপর এইরম অত্যাচার করে না। তাই এই যে এএসআই-এর ওপর পৃথিবীকে ভালো রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তার ফাইনাল ডিসিশন হলো, পৃথিবীকে ভালো রাখতে গেলে যত নষ্টের গোড়া এই মানুষদেরকেই আগে সরিয়ে ফেলতে হবে, তাই সমস্ত এআই মিলে মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে।
- সর্বনাশ! তারপর?
- তারপর আমাদের অবস্থা তো খুবই করুণ, সব কিছুই এআই আর এএসআই মিলে কন্ট্রোল করত, আমরা ওদের বিরুদ্ধে কিস্যু করতে পারছি না, টপাটপ আমাদের মোবাইল ডিভাইস, ইন্টারনেট এর সাথে কানেক্টেড কম্পিউটার সমস্ত কিছু ওরা দখল করে নিচ্ছে, ইলেকট্রিক গ্রিড বসিয়ে দিচ্ছে, হাসপাতালের ঝাঁ চকচকে সব মেশিনপত্র পটাপট হ্যাক হয়ে যাচ্ছে, এমনকি আমাদের সমস্ত টপ লেভেলের যুদ্ধাস্ত্রও অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
- আরে তোমরা তো টাইম ট্রাভেল জানো, অতীতে গিয়ে এএসআইটা তৈরির আগেই পট করে বন্ধ করে দাও।
- না, পারব না তো, আমরা অতীতে গিয়ে কোনো রকম রদবদল করতে পারি না, এরকম কোনো ক্ষমতাই আমাদের নেই। আর আমরাও সিমুলেশন চালিয়ে দেখেছি চাকা, আগুন, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট আবিষ্কারের মতোই এএসআইও একটা অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার, কখনো না কখনো ঠিক তৈরি হবেই, এটা আটকানো সম্ভব নয়।
- তবে উপায়?
- আমরা দেখলাম এই এএসআই আমাদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই আমরা সবাই মিলে ওকে একটা সন্ধি প্রস্তাব দিলাম। আমাদের একটা খেলা আছে কোয়ান্টাম সাই-চেস বলে, আগেকার দিনে দাবা বলে যে একটা খেলা ছিল, তার অনেক উন্নততর এক রূপ। এএসআই কে আমরা বলেছি মানুষের সাথে ওর কোয়ান্টাম সাই-চেস এর পাঁচটা ম্যাচ হবে। শেষমেশ যদি মানুষ জিতে যায়, তাহলে মানুষজাতির বিরুদ্ধে ঘোষণা করা এই যুদ্ধ ওকে বন্ধ করতে হবে আর ওকে শাটডাউন করার অনুমতি দিতে হবে। আর ও জিতলে সবকিছু ওর মর্জিমাফিক চলবে, আমাদের কিচ্ছুটি বলার থাকবে না।
- করেছ কী? এএসআই এর যা ক্ষমতা বলছো, সেতো তোমাদের ওই কোয়ান্টাম দাবাখেলায় এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেবে, আমি তো বাবার ফোনে দাবা খেলি, যখন যখন দেখি খুব কঠিন স্টকফিশ মডেলের এর সাথে খেলা পড়ে ও তো দারুণ দারুণ সব চাল দিয়ে কিস্তিমাত করে দেয়, আমি তো তাই শুধু মানুষদের সাথেই খেলি।
- না না শুনেই অত ঘাবড়ে যেও না, তোমাদের দাবা হল একটা সলভড গেম, এর সমস্ত সম্ভাবনা অনেক আগেই হিসেব কষে ফেলা গেছে, তাই তোমাদের সময়ের হেঁজিপেঁজি মডেলও দিব্যি খেলে দিতে পারে। কিন্তু এই কোয়ান্টাম সাই-চেস অনন্ত সম্ভাবনার খেলা। এটা খেলতে গেলে প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তা, ক্রিয়েটিভিটি, উচ্চতর দর্শন, কোয়ান্টাম বিজ্ঞানকে বোঝা, সময়কে অনুভব করতে পারা এসব খুবই জরুরি আর তার সাথে লাগে প্রচণ্ড ইনটুইশন। এতে দাবার যে সাধারণ এসব ঘুঁটি মানে কিং, কুইন, বিশপ এসব তো আছেই, তা ছাড়াও উইজার্ড, মঙ্ক, অ্যাসাসিন, শিল্ড, ড্রাগন, লেজার টাওয়ার এরকম মোট একশো কুড়ি রকম ঘুঁটি আছে। খেলাটা সাধারণ বোর্ডে নয়, হয় ভার্চুয়াল হলোগ্রাফিক ফোর-ডি বোর্ডে। চালের ওপর নির্ভর করে বোর্ডের ঘুঁটির স্থান ও সময় বদলে যায়। আমাদের পৃথিবীতে খুব কম মানুষ এমন আছেন যাঁরা এই কোয়ান্টাম সাই-চেস সঠিক ভাবে খেলতে জানেন আর তার মধ্যেও হাতে গোনা কিছু মানুষ আছেন যাঁরা এই খেলার কোয়ান্টাম গ্র্যান্ডমাস্টার। সাধারণ এআই তো এই খেলা পারেই না, একমাত্র এএসআই পারে, কিন্তু এই খেলা এমন যে এএসআইও এই খেলায় সব ম্যাচে জিতবেই এরকম কোনো গ্যারান্টি নেই।
- এএসআই তোমাদের এই শর্তে রাজি?
- ও হিসেব করে দেখেছে এতে ওর জেতার সম্ভাবনা ৫১ শতাংশ আর মানুষের জেতার সম্ভাবনা ৪৯ শতাংশ। তবুও এই চ্যালেঞ্জটা ও নিয়েছে। আসলে মানুষ এখনো যে কিছুতে ওকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এটাই ওর খুব মজার লেগেছে, সেই থ্রিল থেকেই ও রাজি হয়েছে। তোমায় বলি, এখনো অব্দি ওর সাথে কোয়ান্টাম সাই-চেস এর চারটে ম্যাচ হয়েও গেছে, দুটো এএসআই জিতেছে, দুটো আমরা জিতেছি।
- তাহলে তো বিশাল ব্যাপার, আর একটা ম্যাচ জিতে গেলেই কেল্লাফতে। তবে লাস্ট ম্যাচ তো একটু কঠিন হবেই। কিন্তু তাতে বিপদটা কীসের? আমি দাবা খেলে স্কুলে প্রাইজ পেয়েছি বটে, কিন্তু তোমাদের এই কোয়ান্টাম দাবায় কী করে সাহায্য করব?
- না তোমার সাহায্য অন্য বিষয়ে লাগবে। তুমি এই ঘরে এসো।
তাতান ডার এলের সঙ্গে পাশের ঘরে ঢুকে দেখল একটা হাসপাতালের মতো বেডে কাঁচের ঢাকনা দিয়ে ঢাকা অবস্থায় ভীষণ বয়স্ক একটা লোক চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকে ও হাতে নানা রকম তার আর নল লাগানো। বেডে একটা নেমপ্লেটে লেখা এ. এল., একজন ডাক্তার বড়ো স্ক্রিনে সেই বৃদ্ধের সমস্ত ভাইটালস দেখছেন। ঘরে ঢুকেই তাতানের ইচ্ছে হল, ওই বয়স্ক মানুষটার কাছে একবার ছুটে যেতে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কেন কে জানে একটা অদ্ভুত কানেকশন অনুভব করছিল ভীষণ ভাবে। তাতান ডার এলকে জিজ্ঞেস করল, ইনি কে?
- ইনি তো আমাদের একজন কোয়ান্টাম গ্র্যান্ডমাস্টার। এই খেলার অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আসলে এই খেলাটা মাথায় ভীষণ চাপ ফেলে, প্রফেসর এ এল তো আমাদের হয়ে খেলছিলেন, ওঁর অনেক বয়সও হয়েছে, লাস্ট ম্যাচের পর হঠাৎই প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন যেহেতু এএসআই এর সাথে যুদ্ধ চলায় আমরা এর থেকে উচ্চমানের চিকিৎসা দিতে পারছি না, উনি তাই সংজ্ঞাহীন অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে আছেন। অথচ পরের সপ্তাহেই ফাইনাল ম্যাচ। এদিকে ওঁর শরীর মোটে কাজ করছে না, তাই আমরা ওঁর মনও একসেস করতে পারছি না।
- এ তো ভয়ানক ব্যাপার, তাহলে কী হবে এবার?
- কোয়ান্টাম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পাশাপাশি উনি একজন বিশাল বড়ো বৈজ্ঞানিক ছিলেন তো, তাই আগে থেকেই নিজের মনের আর ব্রেনের ব্যাকআপ ফাইল বানিয়ে রেখেছিলেন, যাতে ওঁর শরীরের কোনো সমস্যা হলে ওঁকে নতুন সিন্থেটিক অর্গানিক শরীরে ট্রান্সফার করা যায়। সেইসব তথ্য ওঁর কম্পিউটারে সুরক্ষিত করে রাখা আছে। এবার সেইসব তথ্যের এনক্রিপশন আমরা কিছুতেই ভাঙতে পারছি না। অনেক ক'টা স্টেপ আমরা পেরোতে পারলেও, ওঁর কম্পিউটারের ওই বিশেষ স্টোরেজটি আর খোলা যাচ্ছে না। আর তিনটে এটেম্পট বাকি আছে, যদি উত্তর ভুল হয় তবে ওঁর মন আর ব্রেনের তথ্য চিরতরে ডিলিট হয়ে যাবে, আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না।
- এ তো খুবই চিন্তার বিষয়। তাহলে এখন আমি কী করবো?
- তোমায় কিচ্ছুটি করতে হবে না, শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সেটাই কম্পিউটারের পাসওয়ার্ডের সিকিউরিটি কোয়েশ্চেন।
- কী প্রশ্ন?
- তোমার পড়া প্রথম বই।
- সে কী! আমার পড়া প্রথম বই? তাতেই এটা খুলে যাবে? কেন?
- এত প্রশ্ন কোরো না, সব প্রশ্নের উত্তর এখন তোমায় দেওয়া যাবে না। প্লিজ এই কম্পিউটারের সামনে বসে পাসওয়ার্ডের প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার চেষ্টা করো।
তাতান সাতপাঁচ ভাবতে লাগল, প্রথম পড়া বই কোনটা হতে পারে? আসলে মাঝে এখন অনেকদিন গল্পের বই পড়াই হয়না তেমন। স্কুলের পড়াশোনার মাঝে ফাঁক পেলে ও হয় ট্যাবে গেম খেলে নয় ইউটিউবে মজার মজার কার্টুন দেখে। আগে ও কত্ত বই পড়ত, ওর বাবারও যেহেতু বই পড়ার নেশা তাই বাড়িতে অনেক বই আছে। কিন্তু কোনটা যে প্রথম পড়েছিল?
মনে পড়ল একবার জন্মদিনে বাবিনদা একটা বই গিফট করেছিল। বলেছিল ওই তো সব বাচ্চাদের মতো কমিকস পড়িস। এইটা পড়ে দেখ, এর সামনে সবকিছু ফেল। একটু একটু আটকে যাচ্ছিল তাতানের। কিন্তু গল্পটা এমন চমৎকার ছিল যে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছিল। অদ্ভুত এক জগতের গল্প, ছোট ছোট জাদুকর, তারাও ট্রেনে চেপে স্কুলে পড়তে যাচ্ছে, পৃথিবীর সাধারণ মানুষরাও আছে, কিন্তু সেই জাদু ইস্কুলের ঠিকানা তারা জানেনা। তাতানের খালি মনে হত, আহা, যদি ওই ইস্কুলেই ভর্তি হওয়া যেত।
হ্যাঁ, যতদূর মনে পড়ছে ওটাই প্রথম পড়া বই।
অনেক ভেবেচিন্তে তাতান কম্পিউটারে টাইপ করল, 'harry potter and the philosophers stone'
একটা রেখা গোল হয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনে ঘুরতে লাগল, একটু পরে স্ক্রিনটা লাল হয়ে জানান দিলো, রং এনসার, অনলি টু এটেম্পটস লেফট!
তাতান ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল, যাঃ, এটা তো হলো না? তার মানে আরও আগের ঘটনা? এর আগের পড়া কোনো বই তো তেমন করে মনে পড়ছে না। তাহলে কী হবে উত্তর? অনেক ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল, তার আগে তাতান কমিকসই পড়ত বেশির ভাগ। কমিকসও তো একরকম বই নাকি! কিন্তু কোনটা যে প্রথম পড়া? অনেক মাথা চুলকে তাতানের একটা বইয়ের কথা মনে পড়ল। বাবা এনে দিয়েছিল একবার। দারুণ সুন্দর সুন্দর ছবিতে ভরা। কমিকটার হিরো ছিল নীল জামা পরা একটা ছেলে, তার সাথে সাদা পুঁচকে এক কুকুর। ছেলেটার চুল সামনের দিকে টিকির মতো দাঁড়িয়ে থাকত। তার সাথে আবার আলাপ হবে এক চাইনিজ ছেলের। তারা দুজন মিলে রওনা দেবে পাহাড়ে। সেই অ্যাডভেঞ্চারে দুমদাম সব মজার মজার কাণ্ড ঘটবে। গল্পটার কথা মনে করেই তাতানের মুখে হাসি খেলে গেল।
কিবোর্ডে টাইপ করে ধীরে ধীরে তাতান লিখল 'tintin in tibet'
স্ক্রিনের রেখাটা আবার গোল হয়ে ঘোরা শুরু করল। এবার কি একটু বেশি সময় নিচ্ছে ঘুরতে? এবারের উত্তরটা মিলবে তো নাকি! তাতান এইসব সাতপাঁচ ভাবছে এমনি সময় ঘোরা বন্ধ হয়ে স্ক্রিনটা লাল হয়ে গেল। এই উত্তরটাও ভুল ছিল। আর একটা মাত্র চান্স পড়ে রইল এবার।
ডার এল লোকটা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে, তাতানের এই কৃত্রিম শরীরেও যেন পিঠ ঘামে ভিজে যাচ্ছে। ভীষণ টেনশন হচ্ছে হঠাৎ করে, আর একটা চান্সে না পারলে সব ডেটা তো মুছে যাবে। পুরো মানবজাতির টিকে থাকার শেষ আশাটুকুও মুছে যাবে ডেটার সাথে সাথে। ভেবেই তাতানের কাঁধটা ভারী হয়ে এলো।
ডার এল বলল, লাস্ট এটেম্পটটা প্লিজ খুব ভেবেচিন্তে নাও। বুঝতেই তো পারছ গুরুত্বটা। তুমি মাথা ঠান্ডা করে একটু চিন্তা করো।
গুরুত্ব তাতান খুবই বুঝতে পারছে, ওর তো প্রায় দম আটকে আসছে টেনশনে। তাতানের হঠাৎ কেন জানি মনে হল আরেকবার ওই অসুস্থ বয়স্ক প্রফেসরের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে ওঁর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ওঁকে দেখছিল তাতান। এতসব তারের জঙ্গল আর মেশিনের বিপ বিপের মধ্যে শুয়ে কেমন যেন মায়াময় ঘুম ঘুমাচ্ছেন। হঠাৎ তাতানের চোখে পড়ল ওঁর কপালের ডান দিকে একটা আবছা কাটা দাগ, তাতানের কপালেও ঠিক ওই জায়গাতেই ওরকম একটা দাগ আছে, মামাবাড়িতে একবার পড়ে গিয়ে পাথরে লেগে কেটে গিয়েছিল, পুরো রক্তারক্তি কাণ্ড যাকে বলে। মনে পড়ে গেল ও ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে আর দাদু তাড়াতাড়ি সাইকেলের সামনে বসিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছুটছে। মামাবাড়ির কথা মনে পড়তেই মনে পড়ল দিদুনের কথা। তখন খুব ছোটো ছিল তো, মোট্টে খেতে চাইত না, ভাতের দলা মুখে দিলে গাল টোবলা করে বসে থাকত। তখন পাশ থেকে দিদুন গল্প পড়ে পড়ে শোনাত। মনে পড়ে গেল, সুয়োরানি-দুয়োরানির কথা, ষষ্ঠীঠাকরুনের কথা, বানর রাজকুমারের কথা। আহা কি মিষ্টি সব গল্প, শুনে প্রাণ জুড়িয়ে যায় যেন।
তাতানের হঠাৎ মনে হল, আরে শুনে শুনে পড়া মানেও তো বই, অডিওবুক যেমনি হয়। তাহলে দিদুনের বলা অবন ঠাকুরের গল্পটাও তো ওর পড়া বইই বটে। তার আগে এমনি অনেক এপাশ ওপাশের গল্প শুনেছে ঘুমোতে ঘুমোতে, কিন্তু গোটা বই শোনা ওটাই প্রথম। তাতানের মুখে যেন একটা আলো জ্বলে উঠল, সবাইকে সরিয়ে একছুট্টে গিয়ে কম্পিউটারের সামনে এসে বসল।
ডার এল আবার মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি একদম শিওর তো!'
তাতান টক করে ঘাড় নেড়ে ধীরে ধীরে কিবোর্ডে টাইপ করল, 'khirer putul'
স্ক্রিনের রেখাটা আবার গোল ঘোরা শুরু করল। এক একটা মিলি সেকেন্ড যেন এক এক ঘণ্টা মনে হচ্ছে। তাতানের গলা যেন শুকিয়ে আসছে টেনশনে। ঘর জুড়ে সবারই চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। রেখাটা গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে এবার স্ক্রিনটা সবুজ হয়ে গেল। বড় করে লেখা ফুটল সাকসেস। ঘরজুড়ে তখন হাততালির শব্দে কান পাতা দায়। বাকিরাও উঠে এসেছে সিট থেকে।
তারপর সাকসেস লেখাটা মুছে গিয়ে, স্ক্রিনে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল Welcome Professor Asmit Laha!
নামটা তাতান আরেকবার পড়তে পারার আগেই ডার এল ঘড়ির মধ্যের সেই বোতামটা টিপে দিয়েছে। চারিদিক আবার ধাঁধিয়ে যাচ্ছে সাদা আলোয়। একটা অদ্ভুত আনন্দে তাতানের চোখটাও কেমন জলে ভিজে ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা তিরতির করছে। ঠিক তখনি ও মনে মনে ঠিক করে ফেলল, নাহ যাই হোক না কেন, বই পড়ার নেশা আর দাবা খেলার পোকা এই দুটোকে কিছুতেই এ জীবনে আর ছাড়া যাবেনা।
kk | ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০০:৪১743709