এলাহাবাদ-৩
https://ibb.co/QVpfZh6"><img src="

পুরোনো চিঠি পড়তে,তাদের গন্ধ শুঁকতে যেমন ভালো লাগে তেমনি ভালো লাগে পুরোনো পাণ্ডুলিপি দেখতে। মস্তিষ্ক,চোখ আর আঙুলের সিম্ফনিতে একটা একটা অক্ষর কেমন ভাবে ফুটে উঠছিল সেদিন তালপাতা, তুলট কাগজ বা সাধারণ কাগজের গায়ে? লেখকের সামনে পিছনের পরিবেশটি কেমন ছিল? কোথায় বসে লিখছিলেন তিনি? কারা ছিল ছায়ার মত চারপাশে? অন্য কোনো চিন্তা কি উঁকি মারছিল তাঁর সেই লিখে যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে? কত কিছুই না ভিড় করে দাঁড়ায় সেই পাণ্ডুলিপির চারপাশে! ছাপা লেখায় আমরা পাই সেই বিশেষ সৃষ্টিটির একটি পরিশীলিত যান্ত্রিক প্রকাশ। পাণ্ডুলিপি তে জড়িয়ে থাকে অন্য অনেক গন্ধ। তাই যে কোনো জাদুঘরে ই পাণ্ডুলিপির জায়গাটি এক অদ্ভূত আবেদন নিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকে,ফিস ফিস করে যেন বলতে চায় অক্ষর অতিরিক্ত আরও কত কথা! সুমিত্রানন্দন পন্থ গ্যালারিতে আমরা যাবো তারই সন্ধানে।
প্রাচীন, মধ্য আর আধুনিক যুগের নানান পাণ্ডুলিপি শুধু নয়,লেখকদের ব্যবহার করা চশমা,কলম, ব্যক্তিগত চিঠি সহ নানান সামগ্রী,কিছু বই এর প্রথম সংস্করণও দেখা যাবে এখানে। সংস্কৃত, ওড়িয়া,আরবি, ফারসি,উর্দু নানান ভাষার পাণ্ডুলিপিতে সমৃদ্ধ এ ঘর। হিন্দী সাহিত্যে ছায়াবাদের (post romanticism,misticism)দিকপাল সুমিত্রানন্দন, মহাদেবী ভার্মা,সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালা প্রভৃতির পাশাপাশি আমরা পাবো উত্তর ছায়াবাদী হরিবংশ রায় বচ্চনকে। আছেন হাজারী প্রসাদ দ্বিবেদী আর চিরকালীন প্রেমচন্দ।
ধনপত রাই শ্রীবাস্তব আর হরিবংশ রায় এর বয়সের ফারাক সাতাশ বছর। অর্থাৎ, একটা প্রজন্ম। কিন্তু দুজনেই কাছাকাছি এসে যান প্রথা, জাতপাত,সামাজিক শেকল গুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে। হরিবংশের প্রতিযোগিতায় দেওয়া হৃদয়ের চোখ গল্পটি প্রেমচন্দের এতই পছন্দ হয় যে ছাপিয়ে দেন সেটি হংস পত্রিকায়।দুজনেই বর্ণ পরিচয়ধারী পদবী মুছে ফেলেন নামের পেছনের থেকে। ধনপত রাই হয়ে ওঠেন মুন্সী প্রেমচন্দ। হরিবংশ রায় সাহিত্যে নিজের ডাক নাম বচ্চন ব্যবহার করতেন। পরে রায় সরিয়ে শুধুই হরিববংশ বচ্চন। সেটিই হয়ে গেলো তাঁর পারিবারিক উপাধি।প্রেমচন্দ নামটি অবশ্য নিজের দেওয়া নয়, উর্দু পত্রিকা জামানা- র প্রকাশক দয়ানারায়ন নিগম এর দেওয়া। এই পত্রিকাতেই প্রেমচন্দ এর প্রথম গল্পের প্রকাশ,এখানে নিয়মিত লিখতেনও তিনি। কিন্তু তাঁর সোঝ এ ওয়াতন নজরে পড়ল ব্রিটিশ পুলিশের,পাঁচশো কপি জ্বালিয়েও দেওয়া হলো। তখনই নতুন নামের পরামর্শ।উনিশশো চোদ্দ থেকে হিন্দিতে লিখতে শুরু করলেন তিনি,খানিকটা বুঝি আড়ালে থাকা আর খানিকটা উর্দু প্রকাশকের অভাবে। ততদিনে তাঁর লেখা হয়ে গেছে কাশীর গনিকা পল্লী নিয়ে বাজারে - হুসন যা হিন্দিতে পরে সেবাসদন নাম নিয়ে আসবে। প্রেমচন্দ এর শিক্ষার শুরু মাদ্রাসায় আর হরিবংশ এর উর্দু শিক্ষা শুরু মা সুরসতীর হাত ধরে।অফিসিয়াল হাতেখড়ির দিন মৌলভী সাহেব আর পণ্ডিত মশাই দুজনেই এসেছিলেন। স্লেটের টের দুই দিকে দুটি হরফের ধারায় হাতেখড়ি হলো তাঁর - দেবনাগরী আর উর্দু। উত্তর ভারতের কায়স্থ পরিবারগুলোতে হিন্দির পাশাপাশি উর্দু আর ফারসি ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। জীবিকা রক্ষার তাগিদেই।
দুটি ভাষা নয়,একটি ভাষার ই দুটি রূপ। গঙ্গা যমুনার মাঝের ভূমি এই দো-আব সত্যিই বুঝি অমৃত ভূমি। ক্ষীর সাগর মন্থনে ওঠা অমৃত ভাণ্ড থেকে ঝরে পড়া অমৃতকে যদি উপমা হিসেবে ধরি তাহলে তার বাস্তব রূপ এই উর্বর ভূমি, যা নানা ভাষা,ধর্ম, সংস্কৃতি, ও রন্ধনশৈলী র মিলনভূমি। বৈদেশিক শত্রুর হঠাৎ আক্রমণের ভয় থেকে সে খানিকটা হলেও নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে, শান্ত সমাহিত চিত্তে ঠাঁই দিয়েছে সবাইকে। দিল্লী অঞ্চলের সিপাহী ছাউনিতে মুখে মুখে তৈরি হওয়া খাড়িবলি হিন্দি,আরবি,ফারসি মিলে মিশে যে উর্দু, তা পরিপুষ্ট,বিকশিত হয়ে শিল্পের মাত্র পেয়েছে এই দো -আব এই। মূল হিন্দির ই বা কতই না রকম ফের! সবাই হেথায় বাস করে মিলেজুলে। দেবনাগরী হরফে লেখা পাণ্ডুলিপি তে হঠাৎ ই মনে হয় যেন পারসিক ক্যালিগ্রাফি র টান! লেখক হয়তো একটি হরফে সকালে লিখেছেন,আরেকটিতে তাঁর সন্ধ্যার সরস্বতী বন্দনা।
পাণ্ডুলিপির পাশে ভারী চশমার আড়ালে সুমিত্রানন্দনের শান্ত সমাহিত চোখ দুটি দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয় ওপাশ থেকে অন্য কোনো উদাসী চোখ বুঝি চেয়ে আছে। সে চোখ খুব একা। সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী নিরালা। জন্ম মেদিনীপুরের মহিষাদলে, সেখানেই খানিকটা বেড়ে ওঠা,পড়াশুনা।মা হারা শৈশব টি ভালো কাটেনি বদমেজাজি বাবার তত্ত্বাবধানে।বিয়ে হয় অল্প বয়সেই, বউ মনোহরার উৎসাহে হিন্দিতে পথ চলা শুরু। তাঁর নামটি আজও রয়ে গেছে ইস্কুলের রেকর্ডে। মহিষাদলের রাজ এস্টেটের চাকরি ছেড়ে কলকাতায় সমন্বয় পত্রিকা য় কাজ, তারপর লখনউ হয়ে এলাহাবাদ।স্প্যানিশ ফ্লু তে চলে গিয়েছে বউ আর মেয়ে। রইলো শুধু ছেলেটি।সেই থেকে বোহেমিয়ান জীবন শুরু। কেমন জানি অপু অপু ভাব! তাই না? পাতলা দাড়িওয়ালা লম্বাটে মুখটিতেও যেন অপরাজিতর ছাঁদ!
বহুমুখী তীব্র প্রতিভা বোধ হয় নিজেকে সংযত রাখতে পারেনা গৃহীত যাপনে। জীবদ্দশায় সাহিত্যে তেমন কোনো স্বীকৃতি মেলেনি তাঁর,কিছুদিন রাঁচির মানসিক চিৎসালয়ে ও কাটাতে হয়,মৃত্যু হয় এলাহাবাদে ই। রবীন্দ্রনাথ,রামকৃষ্ণ,বিবেকানন্দ প্রভাবিত করেছিল তাঁকে।
রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন সুমিত্রানন্দনও, ছায়াবাদী কবি হিসেবে। কিন্তু তাঁর জীবন বুঝি জন্মভূমি হিমাচলের হিম শান্ত ছায়া। এলাহাবাদের ভূমিতে তাঁরও শেকড় গাঁথা হয়ে গিয়েছিল,আবার তিনিও ঘুরে বেড়িয়েছেন জীবন কে দেখার শর্তে। কিছুটা আর্থিক অনটন থেকে মুক্তি পেতে আর কিছুটা নির্জনতার সাথে কাটাতে চলে গিয়ে রয়ে গিয়েছেন গঙ্গাতীরে কলকনকর এ, রাজা অবধেশ সিং এর আমন্ত্রণে। সেখানে নক্ষত্র কুটিরে রইলেন প্রায় ন বছর। সেখানে আবার দেখা হয়ে গেল এক অন্য ধারার মানুষের, তিনি পি সি জোশি।মার্কসবাদে আকৃষ্ট হলেন তাঁর প্রভাবেই। সামাজিক দৈনন্দিন সমস্যা গুলি যেমন লেখার বিষয় হিসেবে উঠে এলো,ভাষাও হয়ে উঠল অনেকটা লোকায়ত।
ওদিকে নিরালা ছন্দ মিলের শেকল থেকে কবিতাকে মুক্তি দিয়ে এসে দাঁড়ান খেটে খাওয়া মানুষের পাশে। উও হ্ তোড়তি পত্থর কবিতায় এলাহাবাদের জ্বালাপোড়া রোদ আর গরমের মধ্যে ছবি আঁকছেন এক পাথর ভাঙ্গা মেয়ের,অন্যদিকে তৎকালীন শখের আরামকেদারা-সমাজতন্ত্রীদের, প্রগতিবাদী লেখকদের এক হাত নিচ্ছেন ভারতের ভূমের নিজস্ব ধরনটি ভুলে অন্ধ সোভিয়েত প্রীতির কারণে। আবার খাদির আড়ালে এলিটিস্ট ভন্ডামির রূপটিও উঠে এসেছে তাঁর কলমে। নিজের ঢং এ দারিদ্র্যকে বরণ করে তিনি হাঁটতে চেয়েছেন প্রগতির পথে। তাঁর সাথে এলাহাবাদের ধুলোমাখা পথে বড্ড হাঁটতে ইচ্ছে করে।
অরবিন্দ ও গান্ধীর দ্বারা প্রভাবিত সুমিত্রানন্দন সমাজের উন্নতি সাধনে মার্কসীয় ভাবনা বেছে নিলেও ব্যক্তির উন্নতির স্বপক্ষে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের পথটি কেও গুরুত্ব দিয়েছেন। এই 'আধ্যাত্মিক' কারো কাছে শিশি বোতল আবার কারো কাছে নিজস্ব যাপন। তবে নানা জনের কাছে তা নানা রূপে ধরা পড়ে। মোটামুটিভাবে একটা আত্ম জিজ্ঞাসা, ভিতরে ভিতরে ভালো হয়ে ওঠার ইচ্ছে হিসেবে যদি এক ধরি, তাহলে নিজেকে প্রশ্ন করা, নিজের সমালোচনা করাও এর মধ্যে এসে পড়ে। যে কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মত বা পথের ক্ষেত্রেই এই আত্মজিজ্ঞাসা, আত্ম সমালোচনার প্রয়োজনটি এসে পড়ে। তা না হলে মানুষের উপকার করতে গিয়ে মানুষেরই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সে!
যাই হোক, সুমিত্রানন্দন তাঁর নির্জনতার সামাজিক ও সাহিত্যিক স্বীকৃতি আর নিরালা তাঁর অস্বীকৃত ক্ষুব্ধ একাকীত্ব নিয়ে এক পারস্পরিক অসহনীয়তার জায়গায় পৌঁছেছিলেন বলে জানা যায়। সুমিত্রানন্দনের পল্লব প্রকাশিত হলে নিরালা সেটিকে রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ বলে দাবী করেন। বচ্চনের বয়ান অনুযায়ী কোনো একদিন সুমিত্রানন্দনকে যথেষ্ট বকাবকি করে কুস্তিতেও আহ্বান জানান নিরালা! সুমিত্রানন্দন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কেটে পড়েন প্রথমে বন্ধুর বাড়ী, পরে সোজা আলমোড়া!
এখন এই শিরশিরে অবেলায় সব ভালোবাসা, অভিমান, বিরোধ স্থির হয়ে আছে এই জাদুঘরে!
একটি গ্রন্থাগার আছে এখানে।
গান্ধী গ্যালারি বন্ধ থাকলেও ভারী সদাশয় এক প্রৌঢ় কর্মচারী আমাদের বার বার করে অনুরোধ করলেন বাইরে মিউজিয়াম এর পেছনে রাখা মহাত্মার চিতা ভস্ম বহন করে নিয়ে আসা গাড়িটি দেখে যেতে। রোদ তখন পড়ে এসেছে,বাগানের গাছগুলোতে পাইপে করে জল দেওয়া শুরু হয়েছে। ভিজে মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ উঠছে শরতের শেষ বিকেলে। আর সেই গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে অস্তরাগের আলো মেখে। হে রাম!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।