

অলংকরণ: রমিত
রাজুকে সঙ্গে নিয়ে বানোয়ারী প্রথমেই গিয়েছিলো পলাশের শ্বশুরবাড়ি।
পলাশের সঙ্গে আগেও এখানে এসেছে সে। যখন মিঠু এসে একটানা থাকতো, তখন জিনিসপত্র দিতে একাও এসেছে দু একবার।কিন্তু আজ এইভাবে আসতে হবে কখনো আগে ভাবেনি।
আগে যতবার এসেছে পলাশের শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন। তিনি মারা গেছেন সে কথা জানতো বানোয়ারী।
দত্তবাড়ির পিছনের একটেরে আউট হাউসে একাই থাকেন পলাশের শ্বশুরমশাই।
পলাশের মুখে শুনেছিল বানোয়ারী, মিঠুর বাবা বাংলাদেশের উদ্বাস্তু। সেখান থেকে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এই দত্তদের বাড়িতে। এঁরা কোন লতায়পাতায় পূর্বপরিচিত। আশ্রয় জুটেছিল, খাবার জুটেছিল। এমন কি ক্ষুণ্ণিবৃত্তির জন্য কাজ আর গৃহস্থালির জন্য একটি স্ত্রীও জুটেছিল। এসব নিয়ে মনের সুখেই থাকা উচিত ছিল তাঁর। কিন্তু পৃথিবীর হাজার বিজ্ঞানী মিলেও যে বস্তুটির খোঁজ আজও পাননি তা হল মন। তাই পলাশের শ্বশুরমশাইয়ের মনে সুখের বদলে জমা হয়েছিল কিছুটা হতাশা। পলাশের মুখে শুনেছিল ভদ্রলোক ঐ দেশে অঙ্কের ভালো ছাত্র ছিলেন। কিন্তু কাগজপত্রের সমস্যায় অধীত জ্ঞানের সমান সম্মানজনক কাজ জোটেনি। অবশ্য বৃদ্ধ বাপ-মাকে নিয়ে সেসব তখন ভাবার সময় ছিলনা। দত্তদের বাড়ির কেয়ারটেকার কাম ড্রাইভার হয়ে গেছিলেন।
ধীরে ধীরে, দত্তদের কোন পরিচারিকার সঙ্গে বিয়ে, মিঠুর জন্ম হয়। এসবই পলাশের কাছে শুনেছে বানোয়ারী।
আগেও বানোয়ারী যখন আসতো দেখেছিল বৃদ্ধ খুবই চুপচাপ, শান্ত মানুষ। সাদা খাতায় পুরোনো অঙ্কের বই যোগাড় করে অবসর সময়ে অঙ্ক কষতেন, পলাশ বলেছিল।
দত্তরা নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কলকাতা চলে গেছে। সেই জনশূন্য, হলদে, ফাঁকা বাড়ির ছায়া পড়েছে এই আউট হাউসে থেকে যাওয়া বৃদ্ধের শরীরে। দত্তদের বাগানের নিড়েন না দেওয়া গাছতলার কালচে নিস্তব্ধতা গুঁড়ি মেরে যেন ওঁর চোখের তারায় এসে ঘাপটি মেরেছে। সেই নিভে যাওয়া চোখ তুলে তিনি বানোয়ারীকে বললেন, “তা আমাকে এখন কী করতে বলছ?”
বানোয়ারী রাজুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ ইয়ে, মানে ঠিক আমি বলছি না। পাড়ার সবাই মিলেই রাজুকে এখানে রেখে যেতে……।” কথা শেষ করেনা বানোয়ারী।
খানিক থেমে আবার বলল, “ বুঝতেই পারছেন বাড়ি, ব্যবসা কিছুই যখন নেই… মানে আমাকেও তো চলে যেতে হবে। রাজুকে তো তাহলে এখানেই রেখে যেতে হয়।”
রাজু হাত পা বেঁকিয়ে বসে আছে। কখনো কখনো আপনমনে হেসে উঠছে। ওর মুখের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালার এঁকাবেকা আলপনা। বানোয়ারী মুছিয়ে দিল একবার।
বৃদ্ধ চেয়ে থাকেন সামনের কেয়া ফুলের গাছের দিকে।
বললেন, “ সামনের কচুরির দোকানটায় সারাদিন বিক্রিবাটা হবার পর বেঁচে যাওয়া তরকারি দিয়ে যায়। ভাত ফুটিয়ে ঐ দিয়েই দুবেলা খেয়ে নিই। যেদিন দোকান খোলেনা সেদিন সামান্য ঘি নুন ছিটিয়ে ভাত খাই। বাজার, দোকান, রান্না কিছুই করার সামর্থ্য নেই আমার। চলতে গেলে পা কাঁপে। বাজারে গেলে হাত থেকে টাকা পয়সা পড়ে যায়।
জমানো টাকাপয়সা কিছু আছে। মিঠুকে বুঝে নিতে বলেছিলাম কিন্তু সে গা করেনি। ওর মা মরে যেতে আমার কাছে আসতও না সেরকম। এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার আগে দত্তবাবুর ছোট ছেলে টাকা ব্যাঙ্কে রেখে দিয়েছে। তিন মাস অন্তর সুদ তুলে ঐ কচুরির দোকানের ছেলেটার ফোনে পাঠিয়ে দেয়। ওষুধপত্র, জামাকাপড় ওই ছেলেটাই এনে দেয়। একদিন মরে পড়ে থাকবো, হয়তো দাহকার্যটাও এভাবেই করে দেবে। রাজুর মত ছেলে এখানে থাকলে বাঁচবে না। সুস্থ হলে তবু হাতের লাঠি হত। হয়তো রেখে দিতাম।”
বৃদ্ধ মাথায় আরও কিছু ক্ষণ ওখানে বসে থাকে বানোয়ারী আর রাজু। বড় গাছের ছায়ায় যেমন একটা শান্তি থাকে, বড় বাড়ির আওতাতেও তেমন একটা নিশ্চিন্ততা থাকে। আশেপাশে পাখিও ডাকছে বেশ জোরে।
বৃদ্ধ বললেন, “কোথায় গেছে জানো?” একটু যেন কেঁপে গেল গলা।
বানোয়ারী অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “ ঠিক জানিনা, তবে চিঠিতে লেখা ছিলো দুবাই। রাজুর পাশে রাখা ছিল। ঘুমোচ্ছিলো রাজু। কিন্তু পাড়ার কাউন্সিলার রেখে দিয়েছে। পরে নাকি কিছু কাজে আসতে পারে।”
কথা শেষ করে না বানোয়ারি, শ্বাস নিয়ে বলে, “যদি ফিরে আসে, তাহলে রাজুকে এখানেই খুঁজতে আসবে হয়তো।” রাজুকে বৃদ্ধের কাছে রাখার চেষ্টা করে বানোয়ারী।
কেয়া ঝাড় থেকে চোখ সরান না বৃদ্ধ। কিন্তু গলার স্বর আবার নিস্তরঙ্গ খাদে নামিয়ে বলেন, “ফিরবে না।”
বানোয়ারী বৃদ্ধর গলার স্বরে অবাক হয়ে যায়।
ওর গলা দিয়ে আপনাআপনি প্রশ্ন বেরিয়ে আসে, “কেন?”
রাজুর দাদু বলেন, “ মিঠু,পলাশ, মিঠুর মা কেউই যখন নেই তখন বলতে আর বাধা কি! মিঠুর মা কুচবিহারের যে গ্রাম থেকে এই দত্তবাড়িতে কাজ করতে এসেছিলো সেখানে আগে তার একটা বিয়ে ছিলো। আমাকে বলেছিল তারা রোজ বাপের বাড়ি থেকে পয়সা নিয়ে যেতে বলতো। মারধোর করতো। তাই শহরে কাজ করতে চলে এসেছিল। তখন মেয়েদের শহরে কাজ করতে নিয়ে আসতো আড়কাঠিরা। পাচার করেও দিত খারাপ জায়গায়। অজানা কিছু ছিল না, সব জেনেই আসতো লোকে। কিন্তু মিঠুর মা ভালো জায়গাতেই এসে পড়েছিল। দত্তরা লোক ভালো। এখানে কাজ পেলো, গিন্নিমা বিয়ের ব্যবস্থাও করলেন। তখন বড়বাবু খুব ব্যস্ত উকিল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। গিন্নিমা বললেন, শশী মেয়েটাকে বিয়ে কর। কাজে, কর্মে ভালো। তোর দেখাশুনো করবে। আগের বিয়ের বিষয়টা গিন্নিমা আমাকে জানিয়েছিলো। কিন্তু অনেক পরে জানতে পারি সেই বাড়িতে একটা ছেলেও ছেড়ে এসেছিল মিঠুর মা। কিন্তু কখনো ফিরে যায়নি। তার বিষয়ে কথাও বলতো না। আমি নিজেই দু একবার বলেছিলাম কুচবিহার গিয়ে দূর থেকে হলেও ছেলেকে দেখে আসতে। মিঠু হবার পরে সন্তানস্নেহ কাকে বলে নিজে বুঝেছিলাম। কিন্তু মিঠুর মা ছেলের কাছে যায়নি কখনো। বলেছিল গেলে হয়তো গোল বাঁধবে।আমি বুঝিনি সে কেমন গোলমাল যার ভয়ে নিজের সন্তানের মুখটাও দেখতে ইচ্ছে করেনা? কিন্তু মিঠুর মা নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল এখানেই। মনে হয় একবার ছেড়ে যখন যেতে পেরেছে মিঠুও হয়তো ফিরে আসবে না। অন্তত রাজুকে খুঁজতে আসবে না।”
এত কথা বলে চুপ করে বৃদ্ধ শুয়ে থাকলেন। তারপর বানোয়ারীদের সামনেই চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়লেন।
বানোয়ারী রাজুকে সঙ্গে নিয়ে সেই ঘুমন্ত বৃদ্ধের সামনে অপ্রস্তুতের মত বসে থাকে।
বাগানে ঘুঘু ডেকে যায়, শুকনো পাতা পড়ে ঘুরে ঘুরে উড়ে যায়। ওপরের অনেকগুলো বন্ধ ঘর নিয়ে হলদে বাড়িটা একটা মাথাভারী অপ্রকৃতিস্থ বাচ্চার মত জেগে ঘুমোয়।
সেই দীর্ঘ দগ্ধ দিনের তপ্ত দ্বিপ্রহরে মানসিক ভারসাম্যহীন বালকটির হাত ধরে নিমতাবেড়ে গ্রামে প্রবেশ করল বানোয়ারী।
আসলে ঘটনা হল, বানোয়ারী দুপুরের চড়া রোদ্দুরে হাবা রাজুকে নিয়ে নিমতাবেড়েতে যার বাড়ি উপস্থিত হল সে হল পলাশের পিসতুতো দিদি। পলাশের পিসির তিনমেয়ের মধ্যে এই দিদিই বেঁচে আছে, মেজদি।
পাড়ার কাউন্সিলার অশোকদা বলেছিল, “যদি রাজুর দাদু বেঁচে না থাকে তাহলে খানকির ছেলেটাকে নিমতাবেড়ে দিয়ে আসবি।”
বছরখানেক আগে, অশোকদা প্রায়ই যখন আসতো মিঠু বৌদির বাড়ি তখন রাজু খানকির ছেলে ছিল না। বৌদির শরীরের দিকে তাকাতে তাকাতে তখন অশোকদা খৈনীতে টকাটক আওয়াজ তুলে বলত, “ন্যালা খ্যাপা বলে ওকে যেন বকাবকি করবেনা। যাই হোক পলাশের শেষ চিহ্ন।”
পলাশদা মারা যাবার পর মিঠুবৌদির পেট, পাছা, বুকের দিকে তাকাতে তাকাতে রাজুকে ন্যাকাবোকা, অ্যালবেলে, হাদাভোঁদা বলে যেত কাউন্সিলার অশোক, মাছকাটা বুলবুল, মুদির দোকানের চানু ঘোষ। প্রত্যেকবারই বেঁটে বোমের মত শরীরে হিলহিলে ঢেউ তুলে হেসে উঠত মিঠুবৌদি।
তবে বৌদির শরীর যতই আঁটোসাঁটো হয়ে উঠতে থাকে বানোয়ারীর মনে হত মিঠুবৌদি বোমা নয় কোনদিন দোদমার মত ফেটে যাবে। প্রথমবারে এই লোকগুলো আর পরেরবারে সমাজটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। মাছকাটা বুলবুলের আঁশবটির আশেপাশে রক্ত মেখে পড়ে থাকবে সমাজের নাড়িভুঁড়ি।
কিন্তু এসব কিছুই হয়নি।
তিমি হয়ে প্রমোটার নেওটিয়া মিঠুবৌদিকে আস্ত গিলে খেয়েছে। সঙ্গে রাজুর নামের বাড়িটারও নাকি হিসেব নিকেশ হয়ে গেছে। পয়সা নিয়ে মিঠুবৌদি দুবাই চলে গেছে। এখন আঁশবটির পাশে মরা মাছের মাথার মত ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে কেবল পড়ে রয়েছে কেবল রাজু।
আর রাজুকে রাখার শেষ আশ্রয় এখন, মেজদি।
মেজদি আগে যখন পলাশের বাড়ি আসতো, স্পেশাল বাজার করে দিত বানোয়ারী।
তবে জামাইবাবু আসতেন নিয়ম করে প্রতিবছর একবার। মহালয়ার ভোরে নিজে চণ্ডীপাঠ করতেন। তারপর কাছের গঙ্গায় পিতৃপুরুষের তর্পণে যেতেন।গঙ্গা থেকে ফিরে এসে সাদা পাথরের থালায় ফল, পাথরের গেলাসে নারকেলের জল খেতেন। নিজের শ্বেতপাথরের থালা বাটি ব্যাগে করে নিয়ে আসতেন।
কী ভাবে যে মেজোজামাইবাবুর সামনে মিঠুবৌদির কথা বলবে ভাবে বানোয়ারী।
মেজদির বাড়িতে ঢোকার আগে বানোয়ারী একটু দাঁড়িয়ে রইলো। বাস রাস্তা থেকে রোদে বেশ খানিকটা হেঁটে এসেছে তারা।
রাজু বেশ কাতর হয়ে পড়েছে। দু’বার জল খেয়েছে। বাসে ওঠার আগে দোকানের কেক কিনে খাইয়েছে রাজুকে।
একবার ভেবেছিল রাস্তার পাশের কোন রেস্টূরেন্ট টাইপের দোকানে খেয়ে নেবে।
বানোয়ারীর নিজেরও খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু ভাতের হোটেল দেখতে পেয়েও শেষ পর্যন্ত ঢোকেনি। রাস্তার পাশের একটা মনিহারি দোকান থেকে কেক কিনে ছিল।
রাজুকে কেকও খুব ধৈর্যের সঙ্গে খাইয়ে দিতে হয়েছে। সে কিছুটা ফেলেছে মুখ থেকে, খানিকটা আঙ্গুলের ফাঁক গলে গড়িয়ে পড়েছে নিচে। এদিকে ওদিকে লালা মাখিয়েছে।
প্রথমে বানোয়ারী শুধু কেকটা ধরে খেতেই সাহায্য করছিল। কিন্তু অন্য খদ্দের আসতেই দোকানী কাঁচের জারের পেছন থেকে মিষ্টি সুরে বলল,
“দাদা আর কিছু নেবেন নাকি?”
বানোয়ারী মন দিয়ে রাজুকে খাওয়াচ্ছিল। সে একটু চমকে বলেছিল, “ন্, ন্, না।”
“তাইলে একটু ধারে সরে দাঁড়ান। অন্য খদ্দের আসার জা’গা দিন। লুলা, ল্যাংড়া নিয়ে একেবারে দোকানের ঘাড়ে উটে আসচেন গা।” এত মিষ্টি সুরে এত আঘাত করা কথা বলা যায়, এও এক আশ্চর্য ক্ষমতা।
এই কারণে আর কোন ভাতের হোটেলে ঢুকতে সাহস পায়নি বানোয়ারি।
ভাত, ডাল, তরকারি মেখে কতটা খাওয়াতে পারবে রাজুকে, কে জানে? গায়ে মুখে মেখে একশা কাণ্ড করবে হয়তো।
মেজদির বাড়ি গিয়ে কিছু খেতে পাবে সেই আশাও ছিল বটে।
মেজদির বাড়ির সামনে একটা আমগাছ ছিল। গাছটা বাজ পড়ে পুড়ে একটা উৎকট চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই ভর দুপুরবেলা যেনো গা শিরশিরিয়ে উঠছে।
দরজার কড়ায় আওয়াজ করতে একটা রোগা ফরসা মত বৌ এসে দরজা খুলল।
বানোয়ারীকে দেখে বৌটি চিনতে না পারলেও, সে রাজুকে দেখে ঢোকার রাস্তা দিলো। বানোয়ারীর দিকে তাকিয়ে রাজুকে প্রশ্ন করল, “তোর মা আসেনে?”
রাজু মাথা নেড়ে না বলল। হ্যাঁ, না, খিদে, জল, হিসি এগুলো বলতে পারে রাজু।
বৌটি ঘরে ঢুকে গেল, হয়তো মেজদিকেই ডাকতে গেল। সে বানোয়ারীদের ঢুকতে দিলেও দরজার সামনেই দাঁড় করিয়ে রেখে চলে গেছে। রাজু আর বানোয়ারী সদর দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে পাটকিলে রোদ, ভিতরে ঘটি, বাটি, আধখালি জলের ভাঙাচোরা বালতি, ছড়ানো ঘরকন্না।
“রাজু? বানোয়ারী? ঘরে আয়, আগে ঘরে আয়।” মেজদির গলা শুনে চোখ তুলে বানোয়ারী যেন আবারও সেই বাজে পোড়া গাছটাকে দেখতে পেল। বাইরে একটি আমগাছ আর ভিতরে সাদাটে ময়লা শাড়িতে মেজদি।
পলাশ মারা যাওয়ার পর এই বছর দুয়েক মেজদির আসা যাওয়া আর ছিলনা, মনে পড়ে বানোয়ারীর।
তাই মেজদি জামাইবাবুর যে মৃত্যুটাকে সাইনবোর্ডের মত চওড়া সাদা সিঁথিতে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে তার খবর জানতো না বানোয়ারী। বানোয়ারী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। জামাইবাবুর দুঃখে না রাজুর,তা নিজেই বুঝতে পারেনা।
ওদের দুপুরের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বৌটি চা, পাঁউরুটি দিল। মেজদিকে দেখে বানোয়ারী আর ভাত খাবার আশা রাখেনি।
মেজদির ছেলে বুড়ো বলল, “দুদিন রাজুকে নিয়ে এখানে থেকে যাও বানোয়ারীদা। তারপর দেখো পাড়ায় ফিরে গিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা হবে। হাবাগোবাদের কত রকম ঐ কিসব হোম হয়না? ঐ প্রোমোটারটাকে ছাড়বে না। পপাটি তো রাজুর, তাই না? ঐ মাগি সব খেয়ে নেবে তাই কি হয়? কিস্যু রেখে যায় নে?”
বানোয়ারী বলল, “হুম ঐ হাজার দশেক। তবে এর থেকে বেশি আর পাওয়া যাবে না। পার্টির লোকও ছিল তো। সবাই বলল, সব নিয়ম মেনেই বাড়ি বিক্রি করে গেছে। এখন রাজু কেবল বাড়তি।”
“পথ্থম থেকেই পলাশ মামার বৌটা ছেনাল ছিল। মাকে আগেও বলেছি”, বুড়ো বলে।
“আঃ বুড়ো, সে যাই হোক তোর মামী হয় না? ভদ্দ ভাবে কথা বল।” মেজদি বুড়োকে থামায়। কিন্তু বানোয়ারীর কে জিজ্ঞেস করে, “ভাই মরার পরেও দোকান তো চলছিল বানোয়ারী। ভাড়াও আসছিল। তাহলে হঠাৎ কী হল?”
“পলাশ দাদা মারা যাবার পরপরই বাড়ি কিনতে লোক আসছিল। ঘুর ঘুর করছিল প্রোমোটাররা। কিন্তু বৌদি তখন তাদের তাড়িয়ে দিল। তারপর সত্যিই কেউ আর আসতো না। দোকান তো আগের মতই চলছিল বরং লোক দিনে দিনে বাড়ছে। ইনকাম যা হচ্ছিল তাতে আমার মাইনে কেটেও বৌদি আর রাজুর চলে যাচ্ছিল ভালোই। মাঝে এই প্রোমোটারের সঙ্গে কী হল আমি আর জানিনা। এখন রাজুর কী হবে……।”
বানয়ারী যা বলতে পারেনা, তা হল এই লোকটা এখন প্রায়ই মদের আসর বসাতো। দু একটা বন্ধুও আসতো। সেই দিনগুলোতে বৌদি লো-কাটের ব্লাউজ পড়ে বানোয়ারীকে ফিস ফিঙ্গার আনাতে পাঠাচ্ছিলো। দরে দামে মিলে গিয়েছিলো হয়তো।
“ছেলেটাকে ফেলে দিয়ে চলে গেল, এতোটাও খারাপ মেয়ে মনে হয়নি মিঠুকে।”
মেজদির মুখের কথা শেষ না হতেই বুড়ো বলে, “লোক চিনে একেবারে উল্টে গেছো তুমি! নিজের ঘরের লোককেই চিনতে পারো নি তার আবার পর।”
মেজদি মাথা নিচু করে বসে থাকে। বুড়ো যা বলে, শুনে বানোয়ারী ভাবে জীবন সত্যি আশ্চর্য এক গোলকধাঁধা।
বুড়ো আর মেজদি একদিন বাড়ি ছিল না। ফিরে এসে দেখে, পাখি মারার বন্দুক দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছে জামাইবাবু।
শ্বেতপাথরের থালায় ফলভোজন করা জামাইবাবুর বাজারে নাকি মেয়েমানুষ পোষা ছিল। তার পয়সার খাঁই আর মেটাতে না পেরে মরে গেল। মরার পরেও সেই মহিলা হুজ্জৎ কম করেনি। তার মেয়ে নাকি জামাইবাবুরই। সে লোকজন নিয়ে এসে বুড়োর রক্তের সঙ্গে রক্ত মেলানোর টেস্ট করে প্রমাণ দেবে বলেছিল।
জমি বেচে টেচে পয়সা দিয়ে ‘সেটল’ করেছে, বলল বুড়ো।
“এইসব নষ্ট মেয়েমানুষেরই দুনিয়া এখন বুঝলে বানোয়ারীদা।” বুড়ো বলে।
দুনিয়া অবশ্য কম দেখেনি বানোয়ারীও।
বানোয়ারি নিজেও যখন পতিতপাবন জ্যেঠার সঙ্গে কাজের খোঁজে এই বাংলা ঘেঁষা উত্তর বিহারের জনপদ ছেড়ে বেরিয়েছিল, তখন বাতাস এত চঞ্চল হয়ে ওঠেনি। তখনও টিম টিম করে হলেও বেশ কয়েকটা জুটমিল চালু ছিল।
গঙ্গাপারের যে শান্ত শহরতলিতে এসে পৌঁছেছিল ও সেখানে জুটমিলের লেবাররা থাকত ধর্মডাঙ্গার বস্তিতে। সেখানেও তাদের মধ্যে আলাদা আলাদা পাড়া ছিল। ওরা বলতো ‘লাইন’। বিহারী লাইন, ওড়িয়া লাইন, ম্যাড্রাসী লাইন।
লাইনে সারাদিন মেয়েবৌদেরই রাজত্ব। জল তুলছে, আঁচ দিচ্ছে, কাপড় কাচছে। পুরুষেরা জুটমিলে যেত, মদ খেত আর মাঝে মধ্যে চেঁচামিচি করত।
পতিতপাবন জ্যেঠার সঙ্গে এই বিহারী লাইনের বস্তিতে এসে ওঠার কারণ ছিল জুটমিলের কোন একটা কাজে ঢুকে যাওয়া। কিন্তু জুটমিলে গিয়ে জোটার আগেই পতিতপাবন জেঠার মা পলাশের সাইকেলের দোকানে ওকে নিয়ে গিয়েছিল।
বুড়ি বলেছিল, “দ্যাখ বানোয়ারী, পলাশদাদা একটা ভুতে পাওয়া ছেলে, মাথা ঠাণ্ডা থাকলে ভালো আছে, কিন্তু খচে গেলে রাগ চণ্ডাল। কিন্তু ওর কাজে টিঁকে গেলে তোকে আর এই বস্তির ক্যাচরার মধ্যে ফিরে আসতে হবে না। আর কী ভালোই আছে এই জুটমিলের কাজে? হরমাসেই হরতালের ক্যাঁচাল। ম্যান্জার থেকে ইনিউন লিডার সব কটা খচ্চর। তোর পোতে জ্যাঠা ক’ ট্যাকা মাইনে আনতে পেরেচে গত ক মাসে?”
বনোয়ারী পরে ভেবেছে, একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, মাটির মানুষ যারা, তারা অনেক আগেই সমাজের কলকব্জা গুলোর হাল হকিকত জেনে ফেলে। তারা ক্ষয়ে যাওয়া বাড়ি ধসে যাবার আগেই পাড়ি জমায় নতুনতর সৃষ্টির দিকে।
জুটমিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবার গন্ধ আগেই পেয়েছিল পতিতপাবন জ্যেঠার বুড়ি-মা।
বানোয়ারীকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল পলাশের ব্যবসায়। পলাশ সত্যিই অন্যরকম মানুষ ছিলো।
ওদের বাড়ির নিচে এক তলা জুড়ে ছিল সাইকেল জমা রাখার দোকান। কাছের রেলস্টেশনের নিত্যযাত্রী, কলেজ, ইস্কুলের ছাত্র, মাস্টার কত লোকের কত রকমের সাইকেল। মোটর সাইকেল। একজন মেকানিকও ছিল। সারাইয়ের কাজও হত। বানোয়ারী ঐ দোকানেই বহাল হয়ে গেল। মাস গেলে মাইনে সঙ্গে খাওয়া থাকা ফ্রি।
বানোয়ারী আসার পর পলাশ দোকানটা প্রায় ওর ওপরেই ছেড়ে দিয়েছিলো। নিজে ক্যাটারারদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো। একটা ক্যাটারিঙের ব্যবসার খুব শখ ছিল পলাশের।
নিজে নানা রকম খাবার কিনে খেত, বানোয়ারীকেও কত খাইয়েছে।
বাজারে গেলে পরেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে কিছু না কিছু খাবার কিনত পলাশ।
- “পরেশদার এই মিষ্টির দোকানটা যে দেখছ এরকম মোটেই ছিলনা দোকানটা।” চশমার পিছনে চকচক করত পলাশের চোখ দুটো।
- “অ, তাই না কি।” ধরতাই দিত বানোয়ারী। সে পরেশের মিষ্টির দোকান যখন থেকে দেখছে তখন থেকেই দেখছে এরকম দ্বিতীয়ার চাঁদের মত ক্ষয়িষ্ণু। দোকানের মিষ্টি রাখার সেলফের কাঁচগুলো ঘসাটে। হলদে ডুমের আলো আর কিছু সস্তা মিষ্টি নিয়ে ঝলমলে বাজারের মাঝখানে দোকানটা যেন পৃথিবীর শেষ রেল ষ্টেশন।
“পরেশদা, প্রত্যেক চোত মাসে পরিষ্কার করত, কলি ফেরাতো বুঝলে? মিষ্টি সাজানোর ভালো সেলফগুলো তো বড় ছেলে নিয়ে গেল। নাহলে এ বাজারের সেরা ছিল দোকানটা। চন্দননগর থেকে কারিগর নিয়ে এসেছিলো পরেশদা নতুন মিষ্টি বানাবে বলে।”
সমস্ত বাংলা কথাই যে বুঝতো বানোয়ারী তা নয়। তবু শুনত মন দিয়ে। চোত মানে যে বর্ষ শেষের চৈত্র মাস বা কলি ফেরানোর অর্থ যে চুন সফেদি, তা সে বোঝেনি সেদিন। জিজ্ঞাসাও করেনি। কারণ যতই পলাশ তার সঙ্গে বন্ধুর মত মিশুক না কেন মালিকের মুখের ওপর সবসময় কথা বলা যায় না।
পলাশ চিকমিকে চোখে বলে যেত লাল চিত্রকূট, সাদা রসকদম্ব, কমলাভোগ, দানাদার, ক্ষীরমোহন, কালাকাঁদের দোকানের ট্রেতে সাজানো মাত্রই বিকিয়ে যাওয়ার গল্প। মনে হত সে পরেশের দোকানের শোকেসে সেগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। যেন এখুনি জিভের স্বাদকোরকে অনুভূত হচ্ছে সেইসব অতীত মিষ্টির অপূর্ব স্বাদ।
পরেশ ময়রা বেঁচে থাকতেই বড়ছেলে নতুন দোকান খুলে নিয়েছিল।
সেই নতুন দোকান এখন রমরমিয়ে চলে। ঝকঝকে সেলফের ওপরে লাল হলদে রসালো বোঁদের ওপর আলো পড়ে পিছলে যায় খদ্দেরের চোখে। অথচ পরেশের সাবেক দোকানে ওর শীর্ণ অবিবাহিত মেয়ে ম্যাটমেটে সন্দেশের থালার সামনে ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে বসে থাকে। পলাশদের মত পুরোনো খদ্দের ছাড়া এই দোকানে কেউ যায় না।
বানোয়ারী ভাবত, এ দোকান টিঁকবে না। উঠেই যাবে।
কিন্তু বানোয়ারীকে ভুল প্রমাণ করে হাট্টাকাট্টা পলাশ ঘুম থেকে না উঠে দুম করে মরে গেছিল। কিন্তু তারপর থেকে অনেক বছর কেটে গেলেও পরেশদার মেয়ে সেই একই শীর্ণ শরীরে জীর্ণ দোকানটায় বসে থাকে। দোকানটা এখন আরো অন্ধকার আর তার বিষণ্ণ মুখটায় আরও আঁধার জুগিয়েছে ধূসর হতে থাকা পাতলা চুল।
সে যাই হোক, এসবের মাঝে কোন একটা বিয়েবাড়ির ক্যাটারিঙে গিয়ে মিঠুর সঙ্গে প্রেম হয়ে গিয়েছিল পলাশের। বিয়েও হয়ে গিয়েছিল দু এক মাসের মধ্যে।
একটু বেঁটে, অপরূপ সুন্দরী মিঠুবৌদি।
রাজুর জন্মানোর বছর তিন চার পর্যন্ত সবই ছিল। কিন্তু যখনই বোঝা গেল রাজুর রোগটা সারার নয় দুজনের মধ্যে প্রায়ই রাগারাগি ঝগড়া হত।
ঝগড়ার আওয়াজ আসতো নিচের দোকান পর্যন্ত। তারপর তো পলাশ একদিন আর ঘুম থেকে উঠলো না।
তারপর বিভিন্ন ধরণের হাসির আওয়াজ ভেসে নিচের দোকান পর্যন্ত।
সন্ধ্যে থাকতেই ওরা মেজদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। টাউন মোড় ঘুরে পৌঁছাতে গেলে রাতের বাস ধরতে হবে ওদের।
গল্পটা ঠিক এই মোড়ে এসে ঠিক দু ভাগে ভাগ হয়ে গেলো।
একদল পাঠক দাঁড়িয়ে রইলো সেই বাসস্ট্যান্ডের মরা আলোয় মোড়া পেচ্ছাপখানার দোরগোড়ায়। তিনবার হর্ন দেবার পর এইসব দূরপাল্লার বাসগুলো ছেড়ে দেয়। কেউ বাস ছেড়ে দূরে গিয়ে থাকলে এই হর্নের মধ্যেই ফিরতে হবে তা বাস ছাড়ার সময় বলে দেওয়া হয়। কিন্তু বানোয়ারী ফেরেনা। প্রস্রাবের বেগ শেষ হবার পরেও সেই পূতিগন্ধময় ঘরটিতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
গাড়ি ছেড়ে দিলে, একটা ন্যালাখ্যাপা বছর দশেকের ছেলে হাতে নিজের ভবিষ্যত নিয়ে রাতের অন্ধকার চিরে ছুটে চলে। তাকে জন্ম থেকে চেনে এমন শেষ একজন দাঁড়িয়ে থাকে কোন এক অজানা প্রস্রাবাগারে।
বাস আড্ডায় সকালবেলা ছেলেটা কাকে যেন খোঁজে, লালা ফেলতে ফেলতে বলতে থাকে, “বানো, বানো”।
বাস কন্ডাক্টর, ড্রাইভাররা খানিক খোঁজাখুঁজির পর ছেলেটার হাতে একটা পাঁউরুটি ধরিয়ে সেই চৌ রাস্তার মোড়ে ছেড়ে দেয়।
কেউ বলেছিল, “থানায় জমা করে দে”।
আরেকজন বলল, “ছাড়তো। ও সব ফালতু লাফড়া কে নেবে রে সালা!” তারপর চোখ মেরে বলল, “মালটা ফর্সা আছে। রাতেও এখানে থাকলে গাঁড় মেরে দেব।” বলেই সুড়ুত করে লালা টেনে নেয়।
তখন পাশের দিকে ঝাড়ু দিচ্ছিল গেনু বুড়ি। তখন চুপচাপ থাকলেও ঝাড়ু, টাড়ু দিয়ে বাড়ি যাবার সময় রাজুকে সঙ্গে নিয়ে যায়।
গেনু বুড়ি খেতে দিত রাজুকে। মাঝে মাঝে চান করিয়ে দিত। এর ওর কাছ থেকে ছেঁড়া, ফাটা গেঞ্জি প্যান্ট এনে পড়িয়েছিল। কিন্তু রাজু বেশি দিন বাঁচে নি।
প্রবল জ্বরে একদিন মরে পড়ে ছিল গেনু বুড়ির খাটে।
বানোয়ারী ফিরে গিয়ে মণিহারি দোকান দিয়েছিল।রাজুদের পাড়ার বিমলকে ফোনে বলেছিল রাজুকে ওর দাদুর কাছে রেখে এসেছে রানাঘাটের দত্তবাড়িতে।
বছর তিনেক বাদে বানোয়ারীর কাছে একটা ফোন এসেছিল, দত্ত বাড়ির ছোটছেলের কাছ থেকে।
বানোয়ারী প্রথমবার এড়িয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু দ্বিতীয়বার তারা বলে, রাজুর দাদু রাজুর জন্য লাখ পাঁচেক টাকা রেখে মারা গেছেন। তারা সেই টাকা তাকে দিতে চায়। বানোয়ারী না গেলে তারা এসেও দিয়ে যেতে পারে।
এই কথা শুনে বানোয়ারী একটু ভয় পায়, আবার লোভও হয়।
বিমল এখনও ঐ অঞ্চলেই থাকে। ওর সঙ্গে খেজুরে আলাপে বানোয়ারী জানতে পারে রাজুদের বাড়ি এখন মস্ত বড় এপারট্মেন্ট। রাজুর বাড়ির খোপে খোপে প্রচুর মানুষ এসে জমা হয়েছে। মিঠুবৌদিকে কেউ আর তল্লাটে দেখেনি।
বানোয়ারী দত্তদের ছোট ছেলের অফিসে দেখা করতে গিয়েছিল।
পাড়ার একটা চোদ্দ পনের বছরের মানসিক রুগি কিশোরকে কলকাতা দেখানোর নাম করে সঙ্গে নিয়েও এসেছিল। তবে সেই ব্যস্ত অফিসে খুব সহজেই কাজ মিটে গেল।
সেদিন ছোটবাবু অফিসে ছিলেন না।
ফোনে ধরতে তিনি বললেন, “মিঠুদি আমাদের সঙ্গেই বড় হয়ে উঠেছিল। ওর ছেলেকে যদিও কখনো দেখিনি। তবু শশি কাকার শেষ ইচ্ছে ছিল তাঁর জমানো টাকা নাতিকেই দিয়ে যাবার। আমিই কাকার দেখাশোনা করতাম তাই টাকার নমিনি আমিই ছিলাম। আপনি যখন তার দেখাশোনা করেন টাকাটা নিয়ে যাবেন।”
বানোয়ারী অফিস থেকে একটা স্ট্যাম্প পেপারে সই করে লাখ পাঁচেক টাকা নিয়ে আসে। টাকা সরাসরি বানোয়ারীর নামেই দিয়ে দিল। রাজুর নাম কোথাও লেখা ছিল না।
বানোয়ারী টাকা নিয়ে এসে দোকান সাজিয়েছে বড় করে। এখন ওর দোকানে ভালো কেনা বেচা হয়।
আরে দাঁড়ান!
আরেকদল সেই কোন পেচ্ছাবখানার আলোআঁধারীতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই নাকে কাপড় চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
তারা সেই চাপা কাতরানি শুনতে পেয়েছে?
বাসের তিনটে হর্নের পরে প্যান্টের চেনটা টানতে গিয়ে ছেঁড়া জাঙ্গিয়ার ফুটো দিয়ে সেটা সজোরে লেগে যায় বানোয়ারীর মূত্রদণ্ডে। খোঁচা খাওয়া শুয়োরের মত সে গলা দিয়ে একটা ক্যোঁৎ শব্দ করে ফেলে।
বাইরে বিড়িতে শেষ টান দেওয়া কন্ডাক্টারটা বিড়ি ফেলে পা দিয়ে মাড়াতে মাড়াতে বলে, “ এখানে আবার কে বে’? তিনটে ভোঁ শুনতে পাওনি আবাল সব? চল জলদি।”
আঘাত পেয়ে বানোয়ারী যেন একটা ঘোর ভেঙে বাসে উঠে রাজুর পাশে বসে পড়ে। বানোয়ারীর মুত্রদন্ড জ্বলতে থাকে আর বাস চলতে থাকে রাতের অন্ধকার চিরে।
পরের ঘটনা অনেকটা একই রকম।
বানোয়ারী মনিহারীর দোকান দিয়েছে। তার সামনে একটা লম্বা বেঞ্চিতে রাজু বসে থাকে।
বানোয়ারীর মায়ের এক ভাই ছিল, রাজুর মত। সে যদিও মরে গেছে অনেকদিন আগেই। বানোয়ারীর মা যেন রাজুকে পেয়ে তার সেই ছোট্ট ভাইকেই ফেরত পেয়েছে।
রাজুর দাদুর টাকা পেয়েছে বানোয়ারী। কিছুটা দোকানের কাজে লাগিয়েছে, বাকিটা রাজুর নামে ব্যাঙ্কে জমা রেখেছে।
খদ্দেররা বেঞ্চে বসা রাজুর সঙ্গে খুনসুটি করে। হাবাগোবা ছেলেটা বেশ মানিয়ে গেছে এখানে।
লোকের মুখে দোকানটার নাম হয়েছে, “রাজার দোকান”।
এখন আপনি “রাজার দোকানে” যাবেন? নাকি গেনু বুড়ির বস্তিতে?
পসন্দ আপনা আপনা।