এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  ইস্পেশাল

  • বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪

    অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১০ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪
    বাংলা অনুবাদ : সুশান্ত কর

    অলংকরণ: রমিত



    ছারিলং সোনার বারি১


    মেয়েরা যেমন চুলে উকুন বাছাই করে, শ্বেতাঙ্গ সাহেবেরা সেরকম এসে পুরো এলাকাটাকে খুঁটে খুঁটে বেছে ফেলল। বাছতে গিয়ে ওদের হাতে জীবজন্তু আর গাছপালায় ঠাসা এই উত্তরাঞ্চলের অরণ্যখানা ঠিকই উঠেছিল। বিশেষ করে এই অরণ্যের হাতির কথা এখান থেকে ইংল্যান্ড অবধি গিয়ে পৌঁছেছিল; পৌঁছেছিল মানে জানানোই হয়েছিল। এই জঙ্গলে "খেদা' অভিযান শুরু করলে যে সরকার এখান থেকে ভালো কর-রাজস্ব পাবে, সেই কথাও মঙ্গলদৈর কমিশনার ওপরে ঠিকই লিখেছিলেন।ফরেস্টের বড়ো সাহেব মৌসরা গ্রাম থেকে ভুটান পাহাড় অবধি ছড়িয়ে থাকা এই পুরো অরণ্যের কথা বিস্তৃত রিপোর্ট তৈরি করে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সাহেব এই অরণ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতে হাতি খেদা অভিযান শুরু করেন। আগেও এখানে হাতি ধরা হত; যারই সামর্থ্য ছিল, তিনিই এখানকার হাতি ধরে পোষ মানাতেন। টাকা-পয়সার জোর থাকা লোকেই এইসব কাজ করতে পারে; সাধারণ লোক এইসব কল্পনাও করতে পারে না। মৌসরার চৌধুরি পরিবারের আগে থেকেই হাতি ছিল; এদের মতো পরিবারই পারে হাতি পুষতে। শ্বেতাঙ্গ সাহেবেরা এসে এই কাজটিকেই সরকারি করে ফেলল; জঙ্গলের হাতি ধরা কাজটাকে একটা সরকারি উপার্জনের পথ করে ফেলল।

    সোনাপুর থেকে ভুটান পাহাড়ের তলদেশের এই মৌসরা, সোনাপুর এলাকা থেকে নাচনডুবি বাগান অবধি জুড়ে থাকা বিশাল অরণ্যটি এই হাতির জন্যেই ওই সাহেবদের নজরে পড়েছিল। বেশ কিছু হাতি-ডিপোতে এই পুরো অরণ্যকে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল; মৌসরা মৌজার ভাগেও পড়েছিল একটি হাতির ডিপো। এমনিতেও অঞ্চলটি ছিলই পরিচিত শিকারের জন্যে; তার ওপরে সরকারিভাবে স্থাপিত হয় হাতি-ডিপো। পুরো এলাকাতে হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছিল।বড়োবাড়িতে ফান্দি-মাহুতের থাকার জন্যে আলাদা ঘর আছে; হাতি শিকারের সময় সেই ঘরে মাহুত-ফান্দিদের জায়গাতে ধরে না। মৌজাদারের বড়োবাড়ির বারান্দাতেও বহু মাহুত-ফান্দিকে শুতে হয়। হাতি-ডিপোর বা হাতি ধরার কাজ শুরু হবার আগে থেকেই কেবল যে মৌজাদারের এই বড়োবাড়িতে—তাই না, পুরো মৌসরা মৌজাতেই তোলপাড় লেগে যায়। বড়োবাড়ি একরকম বলতে গেলে হাতি ধরার কার্যালয় হয়ে পড়ে; হাতি-মহলদারেরা এসে এখানে মাহুত-ফান্দি নির্বাচন করে নেয়।কার বা লাগে না ধনিরামের মতো লৌহদৃঢ় বাহুর মাহুত, বা বড়োফান্দির মতো পাকা ফান্দি? সবাই চাইবে। ফান্দি-মাহুতেরাও চাইবে নারায়ণ বরুআর মতো বা বড়োফান্দির নামে মহলের ডাক দেওয়া মৌজাদার চৌধুরির মতো মহলদার; মৌসরার হাতি চারণভূমিও দেখবার মতো।

    জায়গাটা ভুটান পাহাড়ের পাদদেশ; চারদিকে ঘন জঙ্গল। পাহাড়ের ঘন জঙ্গলে বিচিত্র সব জন্তু-জানোয়ার, পাখি, সরীসৃপ। বিশেষ করে অঞ্চলটি হাতির বাসস্থান। দলে দলে হাতিরা এখানকার নদী, পাহাড়ের চড়াই-উতরাইতে ঘুরে বেড়ায়; পাহাড়ের গায়ে হাতির পরিবারগুলো বহু যুগ ধরে বাস করে আসছে। নিচের দিকে ক্রমাগত ঢাল খেয়ে নেমে আসা ভূখণ্ড হচ্ছে হাতিদের নিজেদের বাড়িঘর।এই মাটিতে প্রচুর আরণ্যক কলাগাছের ঝোপঝাড় আছে। ঘরোয়া কলাগাছের মতো এই কলাগাছগুলোর থোড় নিচের দিকে মুখ করে নুয়ে বেরোয় না—বেরোয় ঊর্ধ্বমুখী হয়ে। প্রায় লাল এই থোড়গুলোকে দূর থেকে এক-একটি ফুলের মতো দেখায়; আকাশের দিকে মাথা তুলে তাকিয়ে থাকা এই লাল লাল কলার থোড়গুলো পুরো এলাকাকে দৃষ্টিনন্দন করে রাখে। কলাগুলো হয় ছোটো ছোটো; পাকলে মিষ্টি হয় না, কষা কষা হয়। কিন্তু গাছগুলো রসে টইটুম্বুর হয়ে থাকে; চারদিকে ছড়িয়ে এরা বংশবৃদ্ধি করেই চলে। এক-একটি ঝোপে চল্লিশ-পঞ্চাশটা করে গাছ হয়; হস্তিকুল মনের আনন্দে এই খাবার খেয়ে থাকে।আর আছে আরণ্যক বাঁশের ঝাড়। নতুন কোড়ল গজায় যখন, হাতিরা সুস্বাদু কোড়লের স্বাদের সন্ধানে ফেরে। বিশেষ করে ওই পাহাড় থেকে নাগনদীর পাড়ে পাড়ে পুরো সবুজ রঙে সেজে উঠেছে এই বাঁশঝাড়গুলো। বহু জায়গাতে নদীর দুই পাড়ের বাঁশগাছগুলোর ডগা গায়ে গায়ে লেগে যেন একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করে রেখেছে। পাহাড়ি নদীর এই সুড়ঙ্গগুলোতেই প্রায়ই হাতির পালের দেখা মেলে; আসলে এই নদীর পাড়ে পাড়েই রয়েছে এদের যাতায়াতের আদিম রাস্তাটি।পাহাড়তলির গ্রামের লোকেরা এই হাতিদের দেখাই পায় না; জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেলে তবেই এই সবুজ সুড়ঙ্গগুলোতে দেখে হাতির দলকে জলকেলি করতে। ক্বচিৎই দু-একটি নিঃসঙ্গ হাতি গ্রামের দিকে আসে। ধান কাটবার বেলা কখনও হাতির পাল পাহাড় থেকে ধেনো মাঠে নেমে আসে।মৌসরা গ্রামের পাহাড়ের তলার জায়গাটিতেই বসেছে হাতির ডিপো। চারপাশ ঘিরে জঙ্গল; মাঝখানে একটি ফাঁকা জমি। জায়গাটি যেন একটি ছোটোখাটো গ্রাম। এক ঝাঁপ দিলেই এই নাগনদী; বড়ো বড়ো হিজল, মেহগনি, শিমুল, পাকুড় গাছে জায়গাটি ঘিরে রেখেছে। নিচটা পরিষ্কার; সার সার অস্থায়ী খড়-বাঁশের ঘর আর তাঁবু। তেরপাল আর বরুয়া বাঁশের খুঁটাতে তৈরি তাঁবুই বেশি। তাঁবুগুলোর ভেতরে একটা করে বাঁশের মাচা।পুরো জায়গাতে হাতি-হাতি গন্ধ! হাতির লাদ, কলাগাছ, লঙ্কা দিয়ে রাঁধা নাগনদীর জালে ধরা মাছের ঝোল, বকবক করে উতলে থাকা সেদ্ধ চালের ভাত—সব মিলেমিশে কড়া একটি গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে থাকে।

    এই হচ্ছে বিখ্যাত মৌসরা গ্রামের হাতি-মহল—অথবা হাতি-ডিপো বা হাতিশাল। অক্টোবরের শেষের দিকে এবারের হাতি-ডিপোতে তোলপাড় লেগে গেছে। গোয়ালপাড়া, ধুবড়ি, নলবাড়ি, গৌরীপুর, লখিমপুর—কোত্থেকে যে আসেনি হাতি-মহলদারদের দল! চারদিকের তাঁবুগুলোতে এঁরা আরম্ভ করেছেন অস্থায়ী সংসার; কারও দু-দণ্ড দাঁড়াবার সময় নেই।মহলদারেরা সঙ্গে এনেছেন বাছা বাছা মাহুত-ফান্দি; অধিকাংশই তরুণ ছেলে। হাতিশালে এসে ছেলেগুলোর মধ্যে এক নতুন উত্তেজনা! তার ওপরে মহলদারেরা ভাগে ভাগে নিজেদের হাতিও এনেছেন। শিকারি কুনকি হাতিগুলোর মানই আলাদা; বন্য হাতি ধরবার জন্যে এদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয়েছে। ঘন জঙ্গল থেকে বন্য হাতিকে ধরে আনবার কাজটা এরাই করে।ডিপোতেও আছে অনেকগুলো কুনকি হাতি; এই ডিপো-কুনকি হাতিগুলোর কাজ হল বন থেকে ধরে আনা হাতিগুলোর খাবারের জোগান দেওয়া। মোট কথা, হাতি আর মানুষে হাতিশাল উৎসবমুখর হয়ে পড়েছে। এখন শীতকাল; চারদিকে ঘন কুয়াশা। কুয়াশাতে এমনিতেই হাতি-চারণভূমি ঢাকা পড়ে থাকে; ধোঁয়া-ধোঁয়া রঙের হাতিগুলোকে এমনিতেই কাছ থেকেও দেখা যায় না। কেবল গলার আওয়াজেই পাশের দু-একজন মানুষ চমকে ওঠেন—গায়ের কাছেই দেখি হাতি!ওই পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে রোদ উঠছে। কুয়াশার ধোঁয়া-রঙের তাঁত একটিতে যেন কেউ সোনালি সুতোর মাকু একটা শানাতে ভরিয়ে চালিয়ে দিয়েছে; দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ধূসর আর সোনা মিলে রেশমের একটি কাপড় যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রোদ যতই ওপরে উঠে যাচ্ছিল, ততই নাগনদীর ওপরের কুয়াশা আকাশের মেঘ হয়ে পড়ল; ছড়ানো-ছিটানো মেঘের মতো আকাশে এলোমেলো ভাসতে থাকল। রোদের আলোর তাপ বাড়তে শুরু করল; মেঘের টুকরোতে রূপান্তরিত কুয়াশাগুলো তাড়াহুড়ো করে নিশ্চিহ্ন হতে শুরু করল। চোখের সামনে হাতি-চারণভূমি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে এল।হাতি-চারণভূমিতে সবাই আজ ঠান্ডা কুয়াশা উপেক্ষা করে নাগনদীতে ডুব দিয়ে এসেছে। আজ এখানকার বিশেষ দিন; আজ ডিপো আরম্ভের পূজা-অর্চনা হবে। ঘন অরণ্যে ঢুকে দিনকে রাত, রাতকে দিন করে বনে বিচরণ করে বেড়ানো বুনো হাতির সাহানের২ থেকে, স্বয়ং পরাক্রমশালী যূথপতি হাতির চোখের আড়ালে বেছে বের করে বাছুর ধরে আনাটা কি তামাশার কথা? সাধারণত মাহুত-ফান্দিদের লক্ষ্য থাকে একটা কচি মেয়ে-শাবক, মানে "চারিল'-- বেছে বের করা। মেয়ে-শাবক ধরে আনা মানে কপাল খুলল; অনেক অসুবিধের থেকে রেহাই মেলে। মেয়ে-শাবকেরা খুব তাড়াতাড়ি সব শিখে যায়।

    গেল রাতে চারণভূমিতে বেশ ক জায়গায় আগুন জ্বলেছিল। চারদিকে পড়ে থাকে শুকনো ডালপালাগুলো। কে এই জঙ্গলে লাকড়ির খোঁজে আসবে? গ্রামের লোকের বাড়ি বাড়ি এত গাছ-গাছালি—লাকড়ির জন্যে শুকনো ডালের অভাব কার বা আছে? হাতিশালের একপাশে শুকনো লাকড়ির স্তূপকে রাত্রিবেলা দেখে মনে হয় যেন ছোটোখাটো একখানা টিলাই। কেউ একটুকরো আগুনে ধুনো গাছের ডাল একটা দিয়ে দিয়েছিল; চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এক মিষ্টি সুবাস। মাহুত সোমেশ্বর গলা খুলে গান জুড়ল; বাকিরাও গলা মেলাল। আগুনের স্ফুলিঙ্গ উড়ছিল, আর উড়ছিল সোমেশ্বরের গানের সুর। গোয়ালপাড়ার জমিদারের লৌহদৃঢ় বাহুর মাহুত সোমেশ্বরের গানের সুরে যেন একটা কান্নার সুর মিশে আছে—

    ""আই ছারিলং বাপ ছারিলং
    ছারিলং সোনার বারি
    বিবাহ করি চারি আহিলুং
    অল্প বইসের নারীরে
    হায়, হায়রে
    কার ঘরনো রঙ্গাল বিলাই ওই…''


    সোমেশ্বর সত্যিই নতুন বউ ঘরে রেখে এসেছে। ওর গোয়ালপাড়ার গ্রামে মা-বাবা, ভাই-বোনদের নিয়ে খেত-খামারসহ ভরপুর বাড়ি আছে; ওখানে রেখে এসেছে মাস পাঁচেক আগে বিয়ে করা নতুন বউ সেউতিকে। বউ ওকে এই জঙ্গলে হাতি ধরতে আসতে খুব করে মানা করেছিল। হাতি আর মাহুতের সেই বহু পুরোনো সংঘাত—ঘর-গেরস্থালি, রান্নাঘর, গরম সুখকর বিছানা, আরাম-নিরাপত্তা একদিকে; আর-একদিকে জঙ্গল আর হাতি—এই দুয়ের মধ্যে সংঘাত।আসবার দিনে সেউতি কেমন যে করছিল! সোমেশ্বরের তরুণ দেহ জুড়ে একগুচ্ছ পিচ্ছিল চুলের শিহরণ; কেঁপে কেঁপে উঠেছিল এই হাতি-মাহুতের যৌবন। ফটফট করে শুকনো খড়ি ফুটছে; কালো চাপ-চাপ অন্ধকারকে বারে বারে লাল আগুনের বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে শিখাগুলো প্রত্যাহ্বান জানাচ্ছিল। ইতিমধ্যে কুয়াশার ভারে নেমে আসা বনের লতাপাতার গন্ধের সঙ্গে মিশে গেছে ধুনোর গন্ধ। হাতি-মহলকে ঘিরে রাখা অরণ্য থেকে ভেসে আসছে নিশাচর পাখি আর জন্তু-জানোয়ারদের ডাক; ঝিঁঝি কিছুতে হাতি-মহলের আশপাশে অনবরত ডেকেই চলেছে। সোমেশ্বরের কণ্ঠে কেঁদে উঠছিল তার নতুন বউ সেউতি।


    "ও মোর মাহুত বন্ধুরে
    তুই না যান হাতির বারি
    তুই মোর বান্ধব,
    মরিয়ে গেলে কী হইব মোর গতিরে…
    ও মোর মাহুত বন্ধুরে…''


    গান, আগুন আর কুয়াশার মাঝে মাঝে উঠে আসছিল জাতে জাতে কত কথা। হাতি-মহল মানেই যে অনেক কথা—কত রকম রূপকথা, অসংখ্য কাহিনি, সত্য-মিথ্যে আর রং লাগানো নানান গল্প।

    রাতে আগুন পোহাতে পোহাতে সবাই মিলে এইসব গল্প জুড়েছিল। আগুনে কাঠ গুঁজে দেবার মতো করে একটার সঙ্গে আরটা কাহিনি গুঁজে যাচ্ছিল। রাত যত বেড়ে যাচ্ছিল, ততই বেড়ে চলা আগুনের মতো নানা আকারে-প্রকারে গল্পগুলোও পাক খাচ্ছিল। পাহাড়তলার শীতের রাতটিতে দাউদাউ করে জ্বলা আগুনের মতো ক্রমেই বেড়ে আসা রূপকথার গল্প মানুষগুলোকে উত্তেজিত করে তুলছিল। কত যে কথা, কত যে কাহিনি!

    বড়োফান্দি বলছিলেন, অঙ্কুর শিকারের সময়ের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটির কথা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এই অঙ্কুর শিকার হয়ে থাকে। বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাগাছ, বা নলগাছ অথবা বিন্না ঘাস কিলবিল করে অঙ্কুর মেলে; বিশেষ করে এই নাগনদীর পাড়ে পাড়ে তারা আর নলগাছগুলো এমন অঙ্কুর মেলে যে, পুরো জায়গাটা সবুজ আর হলদে মিলে ঝিলিক দিতে থাকে। বৃষ্টি থামলে, রোদ উঠলে তারাবনকে দেখলে মনে হয় যেন রূপা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে। সেগুলো খাবে বলে তখন জঙ্গল থেকে হাতির পাল নিচে নেমে আসে; ফান্দিরা ঠিক সেই সময়ে অঙ্কুর শিকার করে। বড়োফান্দি গিয়েছিলেন, সঙ্গে এই মাহুত সোমেশ্বর; সেবারে অঙ্কুর শিকারে বড়োফান্দি দুটো মেয়ে-শাবক ধরেছিলেন। একান্ত মনে গল্পটা শোনাচ্ছিলেন বড়োফান্দি; সবাই একান্ত মনে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। এড়ি চাদরখানা শরীর থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন; আগুনের আলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল শক্ত-সমর্থ বলবান দেহটি। ঘটনার সময় বড়োফান্দি একেবারে নবযুবক ছিলেন—দাড়ি-গোঁফ উঠেছিল কি ওঠেনি; কিন্তু তখনই সবাই বুঝেছিল এই ছেলের মধ্যে ক্ষমতা আছে। ধীরে ধীরে বড়োফান্দি নিজেই একটি পাকানো-প্যাঁচানো রূপকথা হয়ে উঠলেন। পাহাড়ের নিচের এই ঘন অরণ্যে যে কথাগুলো বড়ো তাড়াতাড়ি লতা বাগিয়ে উঠবার মতো উঠে যায়, পুরো বন ছেয়ে যায়, ছড়িয়ে পড়ে; বরুয়া বাঁশের মতো ছেলেমানুষটি খুব কম সময়ে বড়োফান্দি হয়ে উঠলেন—লতায় প্যাঁচিয়ে ধরা একটি গাছের মতো।

    সোমেশ্বর সিধে সেই বাঘের কথা পাড়ল। কী প্রকাণ্ড ছিল বাঘটা! দাঁড়ালে গদাধরের দাঁত ছুঁয়ে ফেলতে পারে। উজ্জ্বল হলদে, তার উপরে কালো কালো দাগ; বনের ভেতর থেকে এক লাফে বেরিয়ে এসেছিল। সে কী তার গর্জন! পুরো বন কেঁপে উঠেছিল।

    বড়োফান্দি তাকে ধমকে দিয়েছিলেন। আগা নেই গুঁড়ি নেই; একটা কথা পাড়লে গুঁড়ি থেকে বলে যেতে হয়, তবেই না! শালিকের মতো লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে এভাবে কেউ বলে বুঝি? গায়ের থেকে এড়ি চাদরটা সরিয়ে সোমেশ্বর আগুনে দুটো কাঠ গুঁজে দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিল।কেউ একজন এক টুকরি কমলালেবু বের করেছিল; এই এলাকার কমলার স্বাদই আলাদা। হাতি-চারণভূমি দিয়ে আসবার পথে হাতির পিঠ থেকেই ছিঁড়ে এনেছে; সতেজ কমলার গন্ধ সবার নাকে লাগল। সবাই কমলার খোসা ছাড়িয়ে কোয়াগুলো মুখে পুরতে শুরু করল। কাল পুজো হবে, হাতি-মহলের কাজের শুভসূচনা হবে; এরপর কুনকি নিয়ে বনে যাত্রা করতে হবে। শ্বাস ফেলবার সময় থাকবে না এরপর—দিনভর শুধু কাজই কাজ। তখন আর কার এমন বসবার সময় হবে?তার ওপরে এত দিন পর মাহুত-ফান্দি-ঘাসি—সবাই একসঙ্গে দেখা হয়েছে, বসে আড্ডা দিচ্ছে। হাতির পিঠে চড়ে অরণ্য চষে বেড়ানো মানুষগুলোর আড্ডার বিষয়বস্তু আর কীই-বা হবে? ঘুরেফিরে সেই জঙ্গল, সেই হাতি, সেই হরিণের ঝাঁক আর সেই বাঘ।

    সেবারে বড়োফান্দির অঙ্কুর শিকারে যাবার সময়ের গল্প। গদাধরকে নিয়ে ফান্দি আর মাহুত সোমেশ্বর বনে গিয়েছিলেন। খুব সাবধানে এগোচ্ছিলেন হাতি-মাহুত আর ফান্দি। একটি মানুষখেকো চিতাবাঘ বেরিয়েছে—সেরকম কথা লোকের মুখে মুখে ফিরছিল। সেই মানুষখেকোর গল্প পেড়েছিলেন বড়োফান্দি। কী প্রকাণ্ড ছিল সেই বাঘ! গদাধরের মতো উঁচু হাতির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েও গোটা একটা মানুষকে থাবা বসিয়ে নিয়ে আসতে পারবে। অন্ধকার হলে ওর চোখ জোড়া অঙ্গারের মতো জ্বলে ওঠে; রাতের আঁধারে সে চোখে দুটো জ্বলন্ত লাল পাকা অঙ্গার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দিনের বেলা লোক যাতায়াত করা পথের পাশে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে; খুব নিঃশব্দে চালায় পা। সে বুঝে গিয়েছিল—এই দুপেয়ে জীবগুলোকে শিকার করাই সবচেয়ে সহজ। অঞ্চলজুড়ে ও ত্রাসের সঞ্চার করেছিল; সেই মানুষখেকো বাঘটিরই মুখোমুখি হয়েছিলেন বড়োফান্দি আর সোমেশ্বর। হাতির নিজের চলার পথ থাকে জঙ্গলে; সেই পথ ধরে হাতির পিঠে চড়ে যাচ্ছিলেন বড়োফান্দি আর সোমেশ্বর। বর্ষার অরণ্য—চারদিকে লতায় গাছে ঘিরে ফেলেছে। সোমেশ্বর তীক্ষ্ণ ডগার একটি দীর্ঘ দা দিয়ে সেই গাছের ডাল-লতা কেটে এগোচ্ছিল। হঠাৎ হাতি দাঁড়িয়ে পড়ল, ওপরে তুলে ধরল তার শুঁড়। বড়োফান্দি আর সোমেশ্বরের কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখেন—সামনে সেই চিতাবাঘ! সত্যিই এক প্রকাণ্ড বাঘ; বাঘটি অল্প খোঁড়াচ্ছিল। হাতি প্রস্তুত হয়ে পড়ল, শুঁড়ে বাতাস ভরে নিল; কোমল শুঁড়টাই হয়ে পড়ল এক অমোঘ অস্ত্র। বাঘ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল—কাছে এলেই হাতি আক্রমণ করে বসবে। বড়োফান্দি আর সোমেশ্বরের হাতেও তলোয়ারের মতো দীর্ঘ দা। বাঘটা ঝাঁপ মেরে হাতির পেছনে এসে পড়ল—এই ঝাঁপ মারে কি সেই মারে! সত্যিই বাঘটি হাতির পেছনে ঝাঁপ দিয়ে দিল; উদ্দেশ্য হাতির নিতম্বে বসা সোমেশ্বর। কী যে প্রকাণ্ড চিতাবাঘ—সামনের পায়ে হাতির নিতম্ব গিয়ে ছুঁতে পারে! চতুর হাতি গদাধর চোখের পলকে ঘুরে গেল—একবার সামনে পেলেই বাঘটিকে শুঁড় দিয়ে কোপাতে পারবে। কিন্তু বাঘ পায় কই? কিছুতেই বাঘ হাতির সামনে আর আসে না। হাতিও ঘুরছে, বাঘও ঘুরছে; বাঘ তার লক্ষ্য ত্যাগ করেনি। বাঘের আঁচড়ে গদাধরের পেছন থেকে রক্ত বেরিয়ে গেছে।

    হাতিশালার সবাই নিস্তব্ধ হয়ে শুনছে সেই মানুষখেকো বাঘের গল্প। হাতিও ঘুরছে, বাঘও ঘুরছে; ঘুরে ঘুরে হাতি অরণ্যের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। কাঁটা-লতাতে ফান্দি আর মাহুতকে জাপটে ধরছে, আঁচড়ে ফেলছে, গাছের ডালে আঘাতও পাচ্ছে। কোন সাহসে হাতের দা দিয়ে অন্য সময়ের মতো গাছ-লতা কেটে এগোতে পারে? যতটা পারে দু'জনে হাতিকে কেবল সাহায্যই করছিল। এক চক্করে গদাধর ক'পাক ঘুরে বাঘের মুখোমুখি হল শেষপর্যন্ত; হাতির আক্রমণে বাঘটি হুঙ্কার দিতে দিতে জঙ্গলের ভেতরে চলে গেল।

    "বাঘটার কী হল দাদা?''
    "গদাধর কি বেশি চোট পেয়েছিল?''
    "সেদিন আর পরে কি শিকারে গেছিলেন?''
    "ফিরে আসবার সময়ে আর বাঘটিকে দেখলেন?''

    একের পরে এক অনেকগুলো প্রশ্ন এসে গেল; একের পরে এক জবাবও দিয়ে গেলেন বড়োফান্দি আর সোমেশ্বর।

    গদাধরের নিতম্বের পেছনটায় আঁচড় পড়েছিল। সেদিনই হাতি হাতিশালে ফিরে এসেছিল। ঘুরে আসবার বেলা আর বাঘটির দেখা মেলেনি। সেই বাঘকে সাহেব শিকারি মিঃ স্কট গুলি করে মেরেছিলেন। মিঃ স্কট ছিলেন আমেরিকী সাহেব। বড়োফান্দি নিজের চোখে এই "ইসকট' সাহেবকে দেখেছেন, আর দেখেছিলেন মানুষখেকো সেই প্রকাণ্ড বাঘটিকে। বাঘটির একটি পায়ে সজারুর কাঁটা বিঁধে পেকে একেবারে ঘা হয়ে গিয়েছিল।

    আরও এক টুকরি কমলা বেরুলো। আর বেরিয়েছিল জুমাইর ৩ কলস। কেউ একজন বের করল কলাই ডাল পোড়াও। আগুনে পোড়া কলাই ডালের চিঁড়াগুলো জুমাইর সঙ্গে বেশ জমে উঠেছিল। আর একনাগাড়ে কথার পিঠে কথা বেরিয়ে যাচ্ছিল; এইবারে গল্প জুড়ল কাল্টু মাহুত। সে একবার শিকারে গিয়ে একটা পালছুট গুণ্ডা হাতির সামনে পড়েছিল। শৌচকর্ম করে গিয়েছিল নদীতে একটা ডুব দিয়ে উঠবে বলে। ফিরে আসবার সময়েই পড়ল না ঐ পালছুটটার সামনে। কী করে যে সেভাবে কাল্টু মাহুত নিজেকে রক্ষা করেছিল। এই প্রাণীটিকে হাতের মুঠিতে নিয়ে মাহুত ফান্দিদের পেটের ভাত জোটাতে হয়। এই কাজ করেই টিকে থাকে এক একটি পরিবার।

    কাল্টু দৌড়ে গিয়ে একটি গাছে চড়ে গেছিল। ওকে দেখতে না পেয়ে বনের হাতি বনে চলে গিয়েছিল। বড়োফান্দি বললেন, ""কাজটা তুই ভালো করিসনি কাল্টু। পালছুট হাতির সঙ্গে চলার নিয়ম আছে।'' সবাই এখন বড়োফান্দির কাছ চেপে এল; বড়োফান্দি এখন গুরু হবে। এভাবেই না মানুষগুলো মুখে মুখে শিখে এসেছে অরণ্যের নিয়ম-কানুন, বনের জীবজন্তুর সঙ্গে চলাফেরার আদবকায়দা, এমনতর জীবনেও বেঁচে থাকার রহস্য!

    বড়োফান্দিও পাড়লেন এক পালছুট হাতির গল্প। এমন হাতি বড়ো বিপজ্জনক হয়; এমন একলা হাতির মুখোমুখি পড়ে লোকে—যেমন পড়েছিল কাল্টু মাহুত। পালছুট হাতিতে আক্রমণ করলে প্রথমে বুঝে নিতে হবে হাতির মতলবটা কী? সে আক্রমণ করতে চাইছে, না চাইছে ভয় দেখাতে? বড়োফান্দি বললেন, হাতির কান দেখতে হয়। কান দুটি যদি যেমন থাকে সেরকমই থাকে, তবে বুঝতে হবে ভয় দেখাতেই চাইছে—সত্যিসত্যি আক্রমণ করতে নয়। আর যদি কান দুটি পেছনে নিয়ে গিয়ে টানটান করে রাখে, নাড়াচাড়া না করে—তবে বুঝতে হবে ভয় দেখাচ্ছে না, সত্যিই আক্রমণ করবে। এমন হলে শুঁড়টা শরীরের দিকে নিয়ে কুঁকড়ে রাখে; এই হাতির থেকে রক্ষা নেই, সে আক্রমণ করবেই করবে।

    এখানে জড়ো হওয়া প্রতিটি মাহুত-ফান্দির মনে পড়ল—নানান সময়ে এই পালছুট হাতি নিজেদের কত কাছের মানুষকে মেরেছে। বিশেষ করে হঠাৎ সবার মনে পড়ল লক্ষ্মীরাম মাহুতকে; গত বছরই সে শিপাঝাড়ের দিকের একটি গ্রাম থেকে এই মৌসরার হাতি-মহলে এসেছিল। ওকে হাতি পিষে পেটের নাড়িভুঁড়ি বের করে দিয়েছিল! বাড়িতে নতুন বউ রেখে এসেছিল সে মৌসরাতে। বড়োফান্দির দিকে এক বাটি জুমাই এগিয়ে দিল কাল্টু মাহুত; ও আবার এই বড়োফান্দির জুমাইয়ের বাটিতে নিংড়ে দিয়েছিল চার কোয়া কমলার রস। সোমেশ্বর এগিয়ে দিল আগুনে সেঁকে সেদ্ধ হয়ে যাওয়া কলাই ডালের গুঁড়ি।

    বড়োফান্দি বলছিলেন ভয় দেখাতে চায় যে পালছুট হাতি, তার লক্ষণগুলোর কথা। এমন হাতি সামনের মানুষটিকে ভয় দেখাবার জন্যে শুঁড় তুলে চিৎকার জুড়ে দেবে; পাগুলো এগিয়ে-পিছিয়ে গর্জন করে এমন ভাব করবে, যেন এইমাত্র এসেই আক্রমণ করে বসবে। আসলে কিন্তু সে ভয় দেখাবার নাটক করছে; এই অবস্থাতে যাকে তাড়া করছে, তাকে বুক টান করে হাতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। হাতির কান যেমন সচরাচর থাকে, সেরকম আছে কি নেই দেখে নিতে হয়; নিশ্চিত হওয়া যাবে হাতি আক্রমণ করবে না, সামনের জীবটিকে ভয় দেখিয়ে শুধু তাড়াতেই চাইছে। বহু সময় হাতির সামনে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে পারলে হাতি এমনিই চলে যায়; কখনওই দৌড়োতে নেই। কাল্টুর মতো ভয়ে দিশা হারিয়ে গাছে চড়লেও হাতি করে কি—গাছের ডাল ভেঙে মানুষটিকে নামিয়ে ভর্তা বানিয়ে ফেলে। এমন ভয়ানক রূপ ধরা হাতির সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে হলে কলজে শক্ত হতে হবে; এ হল ভয় দেখানো হাতির কথা।আর যদি কান টানটান শক্ত করে পেছনের দিকে নিয়ে শুঁড় কুঁকড়ে শরীরের দিকে নিয়ে তেড়ে আসে, তবে আর রক্ষা নেই—হাতি আক্রমণ করবেই করবে। এমন হলে তাড়া খাওয়া লোকটিকে কোনো একটা আড়াল দেখে লুকিয়ে পড়তেই হবে; না পারলে তেড়ে আসা হাতির সামনে আঁকাবাঁকা দৌড়োতে হয়। তাও যদি না পারে, তবে হাতির সামনে মরার ভান করে শুয়ে পড়তে হবে; সাবধান, হাতির চোখের দিকে তাকাতে নেই।

    বড়োফান্দি চোখ মুদে মাথা নুয়ে দিয়েছিলেন; ধ্যানরত মুনি যেন, সবার মনে একটা ভক্তিভাব জাগল। আগুনের তেজ কমে এসেছিল; কেউ কেউ তাঁবুর ভেতরে গেলেও বেশিরভাগই আগুনের পাশে পাথরের মতো স্থির বসেছিল। সকালে হাতি-মহলে আবারও একবার আগুন জ্বলল। কুয়াশা ঢাকা নাগনদীতে সবাই একবার করে ডুব দিয়ে দিয়ে আসছে; গতরাতের ভয়ঙ্কর উপকথাগুলো আর এখন কারও মনে নেই। হাতি-মহল আরম্ভের পূজা হবে এখন। আতাউর একটি লাল ঝুঠোর নীল-সাদা পালকের মোরগ এনেছে; সেই মোরগ বলি দেওয়া হবে। এ হচ্ছে অরণ্যের পূজা; অদ্ভুত এর পূজাপদ্ধতি। এই আরণ্যক পুজোয় নেই কোনো বিগ্রহ, নেই কোনো নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধান, ধর্মীয় অনুশাসন, প্রার্থনা-সংগীত, পুরোহিত অথবা প্রসাদ। অরণ্যের নামে একটি মোরগ বলি দেওয়া হবে। আতাউর আর ধনিরাম কোচ, সোমেশ্বর নাথ, নরেন মেধি বা বড়োফান্দি, সন্ধিরাম বরা—সবাই একসঙ্গে এই বলি দেওয়া মোরগের রক্তের ফোঁটা নেবে। সভক্তিতে সবাই কপালে এই বলি দেওয়া পাখিটির রক্তে তিলক আঁকল; হয়ে গেল এই আরণ্যক পূজা।



    টিকাঃ
    ১। ছারিলং সোনার বারি: ছাড়লাম সোনার বাড়ি। জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া গানটি মূলে ভেতরেও রেখে দেওয়া হয়েছে; উত্তরবঙ্গ ও অসমের পশ্চিম অঞ্চলের (রাজবংশী) গান এগুলো। বাংলা ও অসমিয়া দুই ভাষাতেই পরিচিত ভাষা ও গান; অনুবাদে প্রমিত করা হল না তাই, কেবল প্রয়োজনীয় বর্ণান্তর করা হয়েছে।
    ২। সাহান: বুনো হাতির পাল।
    ৩। জুমাই: মূলত বড়ো জনজাতিদের মধ্যে প্রচলিত ঘরোয়া মদ।




    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪
  • ধারাবাহিক | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন।