

সঙ্গের ছবিগুলি : ফরিদা
আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় যে সব অনুভূতি আমাদের প্রত্যক্ষ করায়, সেই অবলোকন গুলি নিয়ে খেলনা-বাটি খেলার মতো যদি বেশ খানিকটা সময় তাকে দেওয়া যায়, তা কয়েকটি ক্ষেত্রে উতরে গেলে আমাদের ইচ্ছে হয় আরবেকটু এগোতে।
“নেই কাজ তো খই ভাজ” প্রবাদটি যদি একটু তলিয়ে দেখি, মানুষটি কোনও কারণে বাড়িতে রয়েছেন কোনও এক শরৎ সকালে। সম্বতসরের চাল মজুত রয়েছে ঘরে। তাও বেশ খানিকটা ধান পড়ে আছে গোলায়। কাঠ-কুটো জ্বালানি সমেত ধান সেদ্ধ করার আখাটিও ফাঁকা পড়ে আছে। উনি জানেন আর মাস তিনেক পর নতুন ধান উঠবে গোলায় তার আগের পুরনো ধান যথাসম্ভব কমিয়ে আনা বাঞ্ছনীয়, তাছাড়া সেবার ফলন ভালোই। তা ওই দিন ওই অতিরিক্ত ধান এবং সহজলভ্য জ্বালানি এবং উনুনের সাহচর্যে খই ভাজতে মনস্থ করছেন। সামনে উৎসব আসছে যে।
কিন্তু দেখার বিষয় এটাই ওই উৎসবের নৈবেদ্য-খই মানস চক্ষে দেখতে পাচ্ছিলেন ওই “কাজ না থাকা” মানুষটি এক অলস শরৎ সকালে।
এভাবেই অধীত পূর্ব অভিজ্ঞতা ও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ইচ্ছা আমাদের অলস অতিরিক্ত সময়টাকে বেশ উপভোগ্য করে তুলতে পারে। একটা সাধারণ দৃশ্যের মধ্যেও এক একটা ছোটোগল্প লুকিয়ে থাকতে পারে। আচমকা পাশাপাশি বসা তিনটে শব্দ হয়ত একটা আস্ত কবিতার খনি। হয়ত তা কালজয়ী কোনও ভাবেই নয়। তবে তা পছন্দ করেছিলেন মাত্র কয়েকজন তা এক তৃপ্তি। আর কবিতা সৃষ্টি হওয়ার সময়টা, অন্য কোন শব্দ আসবে যাবে, কোন লাইন কতটুকু, যতিচিহ্নরা কে কোথায় থাকবে — সে এক যজ্ঞিবাড়ির ফুর্তি।
তেমনই চমৎকার সব ঘটনা ঘটতে পারে অলস সময়ে ফ্রিজ হাঁটকালে। খোসা কালো হয়ে যাওয়া পাকা কলা (যা আর কেউ খাবে না) ফেলে দেওয়ার আগে কিছুটা সময় খরচে হয়ে উঠছে এক উপাদেয় মাফিন।
কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটালে এই নেশাগুলো হাতছানি দেয় বারংবার, যেমন স্বপ্নের মধ্যে তোমার সঙ্গে কতবার দেখা হয়েছে গেছে।
২
তাই শখের কুলুঙ্গি খুলি ফের। তার একটা খোপে থাকে ক্যামেরাটি। যেখানে শুধুই আলোর খেলা। কতটুকু আলো আসার জানলা, সেই জানলা দিয়ে কী দেখার আছে, কতটুকু দেখার বা কতটুকু অস্পষ্ট করা এই নিয়ে বেলা গড়ায়।
ছবি তোলার সময়ে ক্যামেরার অ্যপারচার ওই জানলার খোলা অংশটুকু। দিনের আলোয় জানলা অনেকটা খুলে দিলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। রাতে আবার অনেকটা জানলা খুলে রাখতে হয়। আলোর প্রাবল্য নিয়ন্ত্রণে সময়ও এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জানলা অল্প খুলেও যদি একটু বেশিক্ষণ তাকিয়েছ তো গেল সব মাটি হয়ে। আবার রাতে অনেকক্ষণ লাগে অল্প বিচ্ছুরিত আলো গুনে গেঁথে ছবিকে সাজাতে। আরও এক সূচক আছে যা কম আলোতেও দৃশ্যকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে স্পষ্টতা বাড়ায়। আইএসও। তবে তাকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় বৈ কি। নয়ত সে আবার নিজের ইচ্ছেমতো ছবির ভেতরে নিজস্ব দানা শস্য ফেলে রাখে।
এই অ্যাপারচার, সময় ও আইএসও এই তিন লাঠিতে ভর দিয়ে বামনের চাঁদ ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা, তারার গতিময় পথ দেখার উৎসাহ বা পূর্ণচন্দ্রগ্রহণের সময় লাল চাঁদের শিরা উপশিরা দেখার চেষ্টা।
নানান দৃশ্যের বনভোজনে তাই ক্যামেরা কাঁধে ছুটে যাই পাহাড়ের ঢালে। সামনের গাছে সকালের দিকে রঙিন বাহারি পাখিরা আসে একা ও সদলবলে। প্রায় শিকারীর একাগ্রতায় পাতার নাড়াচাড়া বা গাছের ডালের মৃদু আন্দোলন বুঝে ঠাহর করতে হয় তাকে। কখনও তার ডাকের শব্দে ঘুরে যেতে হয় অন্য গাছের দিকে। সে শব্দ তীক্ষ্ণ হলে বুঝতে হবে ছোট পাখি, আর তা যদি একটু মন্দ্র সুরে বাজে তো বড় শিকার।
তবু পাখি বড় ছটফটে। এক একটা সময় একটাও ছবি পাওয়া যায় না। মনে হয় ওই নির্জন উপত্যকায় যেখানে খেলতে গেছি তারাই আমার চোখ বেঁধে দিয়ে কানামাছি খেলে যাচ্ছে। মনে হয় যেদিকে আমি তাকাইনি আমার প্রিয় ইচ্ছে পাখিটা সেই দিক থেকে আমায় দেখে হাসছে।
মোবাইলেও চমৎকার ছবি ওঠে আজকাল। সবসময় হাতের নাগালে থাকে বলে আরও সুবিধা। সন্ধের মুখে মেঘের খেলা বা প্লেন ল্যান্ড করার আগে শহরের শিরা উপশিরা রাস্তা চমৎকার দেখায়। অফিসের ডে আউট টিম বিল্ডিঙে ক্যান্ডিড প্রোট্রেট পাওয়া যায় বড় কিট লেন্সেরই ওপরের সীমায়। আর যদি কেউ পোজ দিয়ে ছবি তোলাতে চাইলে তো পিজে বলে তাকে হাসাতে পারলে ছবি কথা বলে ওঠে।
এর চেয়ে নিঝুম রাত্রির ট্রাইপড ভালো। অবশ্য নিখাদ অন্ধকার দুস্প্রাপ্য আজকাল। তাও যদিও বা জোটে, তখন আবার হোটেল বা রিসোর্টর বেয়ারাদের হাত করে জেনে নিতে হয় সারারাত এখানে আলো জ্বলে কি না, যদি জ্বলে— তখন জানতে হয় সেসব বিচ্ছিরি আলোর স্যুইচ যেন কোন দিকে— এতে সে অবাক হতে পারে, চোর-ছ্যাঁচরও মনে করতে পারে, তাতে তো কারও হাত নেই। এসব যদি বা মেটে তখন দেখার কতটা আকাশ দেখা যাচ্ছে, কোন দিক সেটা, কোন তিথি যে সে দিন — কেন না মূর্তিমান চাঁদ কৃষ্ণপক্ষে মাঝরাতে হানা দেয়, আর শুক্লপক্ষে ভালো মানুষের মতো জলদি ঘুমোতে যায়। অবশ্য একবার কৃষ্ণপক্ষের মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠা চাঁদ আমায় এক অসম্ভব কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়েছিল। তা কী করে ভুলে যাই!

