
অলংকরণ: রমিত
আয়নার হাতল ধরা রোগা হাত কাঁপছিল থরথর। লছমির চোখের কোণায় কাকপক্ষীর পায়ের ছাপ, নাকের পাশেও লাঙ্গল টানার গভীর দাগ, আর হায় রাম, তার ঠোঁটের ওপর অবিকল গোঁফের রেখা। চিবুকে দুটো চারটে দাড়ি ! গালের পাশেও কয়েকটি। কাঁচা পাকা দুরকমই আছে। সে মেয়েছেলে না বেটাছেলে এই ধন্দে লছমির ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে গেল। মাসখানেক আগেও তো মেয়েই ছিল, হঠাত পুরুষ হয়ে যাচ্ছে কী করে! লজ্জা আর ভয়ে তার শীত করে, গায়ে কাঁটা দেয়।
কদিন খুব ব্যস্ততার মধ্যে ছিল লছমি, নিজের মুখটাও আয়নায় ভালো করে দেখা হয়নি। শুকদেবের শ্রাদ্ধশান্তি, হনুমান মন্দিরে মানত, জমিজিরেত, সুদের টাকা বুঝে নেওয়া, এতো সে কেমন করে পারে ! তবু তো বিশালবাবু তাকে ধৈর্য ধরে সব বোঝাচ্ছে, সাহায্য করছে। মনে হয় অল্প কিছুদিনেই লছমি বিষয় সম্পত্তির ব্যাপারে পোক্ত হয়ে যাবে। প্রাইমারি ক্লাসে মাস্টার যে বলত অঙ্কে তার মাথা খুব সাফ, সেটা তাহলে ঠিক ! একটু একটু খুশি হচ্ছিল লছমি, জীবনে প্রথম বার এক আজব খুশির আভা ঝিলমিল করছিল তার মনের মধ্যে, জলের ওপর পড়া রোদের মতো। বিশালবাবু রোজ দড়ির খাটিয়ায় বসে গুজুরগুজুর করছিল, হিসেব নিকেশ, এমনকি তার বেত্তমিজ ঘরওয়ালির নানা কান্ড কারখানার কথাও। লছমির ভালো লাগছিল ওর গা থেকে ভাঁপ-ওঠা বিড়ির গন্ধ, জটিল সব হিসেবের সঙ্গে মিলেমিশে যা আরও কড়া, আরও ঝাঁজালো !
আর তার মধ্যেই কিনা এই ঝামেলা ! লছমি কিনা হঠাত নারায়ণ হতে চলল! মেয়েছেলের কিনা দাড়িগোঁফ গজাচ্ছে ! রাম রাম !
দাড়ি আর গোঁফ হল গিয়ে পুরুষের শক্তি, পুরুষের সম্পদ! মেয়েদের মতো পালিশ করা চকচকে গাল তাদের মানায় না ! লোকে হিজড়ে বলে, কোতি বলে। আরও কতো কী ! পুরুষের শক্তি তার শরীরের কোষে কোষে যখন সাড়া জাগাতে থাকে, তখন প্রথমেই সে আদর ক'রে ভালবাসার মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে ঠেসে ধরে। অস্থির হাতে তাকে মাটি থেকে একটু তুলে ধরে গালে গাল ঘষে দেয়। সজারুর কাঁটার মতো বেরিয়ে থাকা খরখরে লোমের ছুঁচালো আগায় সে মেয়ের নরম গালে লাল টানা টানা রেখা ফুটে উঠবে পাশাপাশি, তবে না আদর ! সেই আদর তার মাথা থেকে আঙুলের নেলপালিশ অবদি চারিয়ে গিয়ে মেয়েকে কাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে দেবে, তবে না পুরুষ !
উল্টোটা আবার খুব সর্বনেশে। মেয়েছেলের নাকের নিচে কালো রেখা, চিবুকে ঝুলঝুলে চার পাঁচটি লম্বা চুল, হাতে পায়ে বড় বড় লোম, কী ভয়ংকর অমঙ্গুলে লক্ষণ ! পুরুষের আদরের যোগ্যই নয় সে। সাগাই অব্দি গড়িয়ে যাওয়া বিয়েও ভেস্তে যায় এই অপরাধে। কাপড় উঠিয়ে পাত্রীর পা দেখার রীত যে তাদের গ্রামে এখনও টিঁকে আছে সে তো এই কারণেই। শহরের বিউটি পার্লারে সুতো টেনে মোম ঘষে আরও কী কী ক'রে হাত পা মুখের লোম তোলা হয় লছমি শুনেছে, কিন্তু এ গ্রামের ভদ্র সভ্য লক্ষ্মী মেয়েরা ক'জনই বা শহরে যায়! যে গুটিকয়েক পড়তে বা কাজে যায়, তারা সেখানে সারাদিন ছম্মক ছল্লো গিরি করে কিনা কে জানে, কিন্তু গাঁয়ের সীমানায় ঢোকার আগে সবাই আবার ওড়নায় মাথা বুক ঢেকে লক্ষ্মী মেয়ে হয়েই ফেরে।
সে যাই হোক, লছমির ফর্সা মুখে এসব কী দাড়ি গোঁফ গজাল, কেন গজাল কে জানে ! আর কখন গজাল? যখন তার শরীর প্রত্যেক মাসের রক্তদর্শন বন্ধ করল আর ঘরওয়ালা শুকদেব সিং-এর হঠাত দেহান্ত হল।
প্রথমটা কিছু মন্দ নয়, চল্লিশ বছর ধরে এই ঝামেলা পোহান কি চাট্টিখানি কথা? শরীর মন দুইই বলে, বাপরে বাপ, এদ্দিনে বাঁচা গেল। আর শুকদেব সিং? সে ছিল পুরো বিষাক্ত লোক একটা। এই তল্লাটের গভীর জঙ্গলে গজান জহরাট্টা গাছের মতন, যার চারপাশে এমনকি আগাছাও জন্মায় না। পতঙ্গ কী পাখি, ভুল করে জহরাট্টার চার হাতের মধ্যে চলে গেছে কী মরেছে। কিছুক্ষণ ধড়ফড় করার পর চোখ আর ঠ্যাং উলটে অক্কা ! কোনো মানুষ কী পশু যদি ভুল করে ছুঁয়ে ফেলে তো তার হয়ে গেল। এসিডে পুড়ে যাবার মতো জ্বালা। অনেক ভুজুংভাজুং করে ঠিক হলেও দাগ রয়ে যাবে চিরজীবন। গরুগুলো ল্যাজ তুলে দিকবিদিকশুন্য হয়ে লাফাচ্ছে দেখলেই এ তল্লাটের লোক সন্দেহ করে জহরাট্টায় মুখ দিয়েছিল !
মানুষ বা পশুর চামড়া তো চামড়াই, কিন্তু ও গাছ যে মাটিতে গজায় কিছুদিন পর তারও রঙ হয়ে যায় সাদা ধবধবে, খারাপ পাড়ার মেয়েগুলোর সাদা পাউডার মাখা মুখ যেন ! ছট্টীমাঈ আর সূরজদেবের পুজো সেরে ভোর ভোর নদী থেকে ফেরার পথে লছমি কতো বার তাদের দেখেছে। পুণ্য কামানোর পর আলো আঁধারির সুযোগ নিয়ে ভেজা কাপড়েই যারা সুট করে ঐ মহল্লায় ঢুকে যাবে তাদের জন্য তখনও মিটমিটে আলো জ্বলা ল্যাম্পপোস্টের নীচে মেয়েগুলো দাঁড়িয়ে থাকত। বিড়ি খেত, আঁচল সরিয়ে বুক দেখাত। মাথার ঘোমটা সরে গিয়ে পাছে এইসব অস্বৈরন দৃশ্য দেখে ফেলতে হয়, তাই লছমি দাঁতে কামড়ে থাকত ভেজা ঘোমটার কোণা। ঘেন্নায় পিচিক করে থুথু ফেলবার ইচ্ছে হলে থুথু আর ইচ্ছে দুটোকেই কোঁৎ করে গিলে পেটের ভেতর পাঠিয়ে দিত।
স্বাভাবিক যে এই তল্লাটের লোকজন, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, ঝগড়া লাগলেই পরস্পরের গোপনাঙ্গে জহরাট্টা পাতা ঘষে দেবে বলে ভয় দেখায়। তাতে কখনও কখনও কাজও হয়। খুব কল্পনাপ্রবণ যারা, বা গরুর ছাগলের লাফালাফি দেখেছে এই রকম মানুষজন তার পরের অবস্থা কল্পনা করেই বিড়বিড় করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। অকুতোভয়েরা তবু চেঁচিয়ে বলে, হিম্মত থাকে তো নিয়ে আয়, তারপর দেখি কে কাকে কী ঘষাঘষি করে!
সে হিম্মত কারও নেই জেনেই বলে।
আসলে জঙ্গল এখন পাতলা হয়ে গেছে। এই গাছ এখনও হয় কিনা, হলে কোথায় হয়, কেউই ঠিক খবর রাখে না। গরু ছাগল তো কথা বলতে পারে না, ভিতর-জঙ্গলে ঢুকে প্রচুর মহুয়ার ফল খেয়ে যে তারা লাফাচ্ছে না, তাইই বা কে বলবে ! তবু অন্ধকারে পিঠের দিকে মাথা ঘোরানো চুরেইলেকে দেখার আতঙ্কের মতো, চান্দ সুরজ গ্রহণ কালে পিসাব চাপার ভয়ের মতো, জহরাট্টার স্মৃতি রয়ে গেছে পিঢ়ির পর পিঢ়ির মানুষের অবচেতনে। সেই বিষাক্ত স্মৃতির থেকেই বোধহয় মানুষের মনের মধ্যেই গজিয়ে উঠেছে জহরাট্টা। গভীর জঙ্গলে না গিয়ে শুকদেবের বাড়ির হাতায় চলে এলেই সে কথা মোক্ষম বোঝা যায়।
শুকদেব যে কতো বড় জহরিলা জীব, সে কথা ভাল বুঝেছিল গঙ্গুঠা চামার। অন্যদের সঙ্গে প্রায়ই যেমন করত, তেমন করে তার জমি কাড়েনি শুকদেব বা ঘরের মেয়েদের দিকেও নজর দেয়নি। কিন্তু একটা হলুদ ভেলভেটের টুকরোর মতো ঝলমলে আলো ঠিকরানো সকালে গঙ্গুঠা মকাই ক্ষেতের পাশে উঁচু গাছের নীচে বসে টিয়েপাখির ঝাঁক দেখছিল। পাখিগুলো দল বেঁধে কিচকিচ করতে করতে আকাশের এ কোণ থেকে ও কোণে যায়, গঙ্গুঠার চোখ তাদের ধাওয়া করে। ফসল বাঁচানো ছাড়াও ওদের তেকোনা উড়াল দেখে চামারের মনে রাবণ বধের সময়ে রামজীর ছোঁড়া তীরের ফলার কথা মনে আসে। ভক্তিতে ভয়ে তার হাতের পাখি তাড়াবার ক্যানেস্তারার শব্দ মোলায়েম হয়ে যায়।
কিন্তু রোদ যতই সোনালি হোক, মকাই খেতে যতই তাজা হাওয়া চলুক, রামজি যতই তীর চালান, ভবি তো ভোলবার নয়। তাই দূর থেকে পহেলবান পরিবৃত শুকদেবের ঠিক নজর পড়ে ভেবলে যাওয়া গঙ্গুঠার ওপর।
* কোন শালা রে, মকাই ক্ষেতের ধারে বসে আছে ! চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি ? আমি যাচ্ছি পাশের রাস্তা দিয়ে তবু উঠে দাঁড়াবি না গিদধরের বাচ্চা ! তোর মা-কে আমি…
ভয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে যায় গঙ্গুঠা, ধুতিতে পা জড়িয়ে জমির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে। মকাই গাছেরা তাকে সবুজ পাতার আড়াল দিলে কী হবে, সেই উপুড় হওয়া অবস্থাতেই শুকদেব ছুটে এসে তার পাছায় তিন তিনটে লাথি কষায়। তার দাদা পরদাদাদের কালে এই চামারদের পাগড়ি পরার হুকুম ছিল না। এমনকি মোচ রাখাও বারণ ছিল। এখন বেশি কিছু করতে গেলে জনজাতি আইনে ফ্যাসাদ বেঁধে যাবে। তার চেয়ে এই ভালো, মকাই ক্ষেতের ভেতর হাত পায়ের সুখ করে নেওয়া।
তারপর থেকে ক্ষেত পাহারা দিতে গেলে গঙ্গুঠার এক চোখ থাকে পাখির দিকে, আরেকটি রাস্তার দিকে। পাছে মালিক আবার দলবল নিয়ে হাজির হয় ! তার প্রতিবেশীদের মতে এই করে করে গঙ্গুঠা নাকি এমন ট্যারা হয়ে গেছে যে সে আদৌ কোনদিকে তাকিয়ে আছে তা বোঝার উপায় নেই। রামলীলার দিন সীতা-মাইয়ার পার্ট হারান গঙ্গুর কাছে তারপর থেকে শুকদেবের আর এক নাম জহরাট্টা।
তবে শুকদেবের মারের কথা বলতে গেলে বেপাড়ার পাউডার মাখা মেয়েগুলোর কথা প্রথমেই এসে যাবে। রোগের ডিপো রোগা রোগা মেয়েগুলোকে হাতের থাবায় লোফালুফি না করলে, ওদের খোলা পিঠে বেল্টের নীল দাগ ফুটে না বেরোলে, শুকদেবের লিঙ্গোত্থান হত না। এর জন্য টাকা খরচ করতে তার কার্পণ্য ছিল না। কিন্তু কোন কারণে তেমন সুবিধে না হলে সে রাতে লছমির কপালে দুঃখ ছিল। লাগাতার মার খেতে খেতে চোখ কপালে উঠে গেলেও, শুকদেব নিজে ক্লান্ত না হওয়া অব্দি তার নিস্তার নেই। যারা তাকে আড়ালে বাঁজা বলে গাল দিত, তারা কি হিসেব রাখতে গেছে মাজায় লাথি খেতে খেতে কবার তার দু পা বেয়ে গড়িয়ে নেমেছে কালচে রক্তের ধারা ?
সেই জহরাট্টা গাছের মতো বিষাক্ত পুরুষটিকে তার জীবন থেকে একটানে হঠাত উপড়ে দিলেন স্বয়ং রামজি, এ তার চোদ্দ পুরুষের পুণ্য ফল। এই আনন্দ ঢেকে রাখার চেষ্টায় স্বামীর শেষ যাত্রায় ভাড়া করা রুদালিদের থেকেও ঢের বেশি চিতকার করে কাঁদল লছমি। ঘোমটার আড়ালে কেই বা দেখতে গেছে যে তার চোখদুটো গ্রীষ্মকালের নহরের মতো রুখাশুখা। তখনও কী সে জানে এই পাপে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে আরও কত বড় বিপর্যয় !
তবে মা দাদির শেখান এই ঘোমটা লছমিকে কী বাঁচানই না বাঁচিয়ে দিচ্ছে বার বার। স্বামী মরার পর তার ঘোমটা আরও লম্বা হয়েছে এটা লক্ষ করলেও কিছু সন্দেহ করেনি শহর থেকে দিদিকে সান্ত্বনা দিতে আসা ছোট বোন। কিন্তু রাতে ঘুমন্ত দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে সে আঁতকে উঠল। ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলে থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে জিজ্ঞাসা করল,
– এগুলো কী?
* জানি না।
* তোর কি মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে?
* তার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মনে হয় তোর জিজাজি ভর করেছে আমার ওপর।
শুকদেবের দাড়িগোঁফওয়ালা চেহারাটা কল্পনা করে শিউরে ওঠে বোন। ফাঁকা গোয়ালঘরের গরু ছাগলের মুতের গন্ধওয়ালা ভেজা মেঝেতে তাকে চিত করে ফেলেছিল দশাসই লোকটা। যখন ছাড়া পেয়েছিল তখন সারা শরীরে কাটা ছেঁড়া আর জ্বলুনি, যেন কেউ এসিড ঢেলে দিয়েছে। জহরাট্টা জিজাজি ! এক মূহুর্ত চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকে সে। তারপর ঝাঁজিয়ে ওঠে,
* কে বলল সম্পর্ক নেই ! আমার পাশের ঘরে সরকারি হাস্পাতালের নার্সদিদি থাকে। তার মুখে শুনেছি এইসময় জেনানাদের দাড়িমুচ গজায়। এমনকি বুকে পিঠে চুল ভি গজাতে পারে। একদম মরদদের মতো। রোগের নামটাও বলেছিল। অতো কি মনে থাকে ! তুই শহরে চল আমার সঙ্গে, ডাক্তার দেখিয়ে সুঁই ফুটাতে হবে।
এই দাড়িমুচের হাত থেকে রেহাই পাবার মানত নিয়ে পরদিনই সকাল সকাল হনুমান মন্দিরে যাচ্ছিল লছমি, ঘোমটার মধ্য দিয়ে দেখতে পেল হন্তদন্ত হয়ে বিশালবাবু আসছে। চোখমুখে রাগের গনগনে আঁচ। আসলে শুকদেব মরার পর থেকেই এই তল্লাটে তলে তলে একটা খুশিয়াল বাতাস বইছে। গঙ্গুঠার চোখ ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হচ্ছিল, এ বছর সীতার পার্ট সে আবার করতে পারবে এইরকম আশা জাগছিল। গিলে ফেলা জমির দখল আবার ফিরে পাওয়া যায় কিনা সেই আবেদন নিয়ে অনেকে আমিনের শরণাপন্ন হবে ভাবছিল। সবচেয়ে খুশি ছিল বোধহয় নোংরা পাড়ার মেয়েগুলো। কাঁহাতক আর বেধড়ক মার খাওয়া যায়। খুশির চোটে তারা দু একটা করে নতুন চালা তুলছিল, গত দু সন প্রবল খরার পর এ লাইনে প্রচুর নতুন মেয়ে এসেছে। কে না জানে, যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরই হরপা বানের মতো মেয়ের সাপ্লাই ফুলে ফেঁপে ওঠে ! তা তারা কি এখন খদ্দের নিয়ে মহল্লার ঠিক মাঝখানে নিমগাছ তলায় শোবে? নিরুপায় হয়েই নদীর দিকে একটু একটু করে এগোচ্ছিল পল্লীটা, কিন্তু মুশকিল হল দখলি জায়গার সবটাই ছিল মৃত শুকদেবের বেনামী জমি।
বিশালবাবুর মুখে সবটা শুনে লছমির খুন খলবল করে ওঠে। মারুক আর যাই করুক, শুকদেব ছিল তার স্বামী, আর তাই নামে বেনামে রাখা সব জমির মালিকও এখন সে। এই সহজ হিসেবটা ত্যাঁদড় মাগিগুলোকে বোঝাবে বলে বিশালের আপত্তি অগ্রাহ্য করে মারমুখো দলবলের পেছন পেছন বিরাট নিমগাছটার তলে এসে দাঁড়াল লছমি। ঘোমটার নীচে তার নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
পহেলবানেরা লাফিয়ে পড়ে কাজে ব্যস্ত ঘরামিদের ওপর, কান্নার রোল তোলা মেয়েগুলোকে চড় চাপড় মারতেই তারা ছুটে গিয়ে ঘরে দোর দেয়। সাজ নেই সজ্জা নেই, শ্রীহীন মেয়েগুলো দরজার ওপাশ থেকে অনর্গল ভাসিয়ে দিতে থাকে অশ্রাব্য গালাগাল। সে সব ছাপিয়ে লছমির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে একটা বেঢপ শরীর আর প্রবল নাকী কন্ঠ। এ পাড়ার মালকিন ভুটকি মাসি।
বক্তব্য তার খুব চাঁছাছোলা, হুজুর ছিল তাদের মাইবাপ। তার আনন্দ বেদনার হিসেব এ পাড়ার মেয়েরা যতো জানত, তা হুজুরের আপনজনেরাও জানত না। আজকে তার স্বর্গলাভ হয়েছে বলেই তার ভালবাসার লোকেদের ওপর এই অত্যাচার হুজুরের আত্মাকে কষ্ট দেবে। বলতে বলতে লছমির পায়ের ওপর উবুড় হয়ে পড়ে ভুটকি, মায়ি, গোড় লাগি লছমি মায়ি।
প্রত্যেক বছর ছট্টী মাঈয়ের পুজো চড়িয়ে ফেরার পথে রঙ চড়ান মেয়েগুলোকে দেখে লছমি যত থুথু গিলেছে সব ফিরে এসে তার মুখ ভরিয়ে দিল। পায়ের ওপর ভুটকির হাত নয় তো যেন দুটো কেন্নোর চলাফেরা। সে ঝাঁকুনি দিয়ে পা সরিয়ে নেয়। এদের জন্যই সে কুত্তার মতো মার খেয়েছে শুকদেবের হাতে। পয়সা নেবে, কিন্তু কাজ হবে না, এটা কোন সাচ্চা মরদ সহ্য করবে? আর শুকদেবের পয়সা তো তারই পয়সা! ফালতু খরচের হাহাকারে লছমির সদ্য লোম-গজান বুক ভরে ওঠে।
এবার সে কিলবিলান কেন্নোটার মাথার ওপর মুখ থেকে দুর্গন্ধ থুথুর বন্যা ছিটিয়ে দেয়। ভুটকি চমকে ওপর দিকে তাকায়, পর মূহুর্তে ছিটকে সরে যায়। আই বাপ, ঘোমটার ভেতর থেকে তার দিকে তাকিয়ে কুলকুল হাসছে মালিক শুকদেব সিং, ঠিক সেই দাড়ি, সেই মুচ, চোখের দৃষ্টি ছুরির মতো ধারাল। তার মনে হয় পিঠের ওপর এখনই নেমে আসবে চামড়ার বেল্ট, মোটা হাতের থাবড়ানিতে দম বন্ধ হয়ে যাবে।
ভুটকির অবস্থা দেখে নিঃশব্দ হাসিতে ফুলে ফুলে উঠছিল লছমির শরীর। যা ইচ্ছে করবি ভেবেছিলি! মালিক মরেছে বলে মালকিনও সহমরণে গেছে নাকি! এতদিন জীবন তাকে যা যা থেকে বঞ্চিত করেছে, অর্থ, সম্মান, ক্ষমতা, সবের পাই পয়সার হিসেব বুঝে নেবে লছমি। ওসব ভর টর একদম বাজে কথা, নিজেই সে জানে। তাই হাসতে হাসতে নাকের নীচে মোচের ওপর হাত বোলায় লছমি। আসলে এগুলো সব জহরাট্টা গাছের শেকড়বাকর, দ্রুত ছড়ায় আর নিকেশ করে দেয় চারপাশের সবকিছুকে। লছমি ভাবে এখান থেকে বেরিয়ে প্রথমেই সে যাবে গঙ্গুঠা চামারের মকাই ক্ষেতে, তাকে সবক শেখাবার পর যারা আমিনের বাড়ি গেছিল বলে খবর এসেছে, এক এক করে তাদের প্রত্যেকের বাড়ি যেতে হবে তাকে।
এই একশ মজা ছেড়ে এখন সে শহরে যাবে ডাক্তার দেখাতে! তার বোন কী পাগল নাকি!
স্বাতী রায় | ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ১১:৫৬743757