এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  দর্শন

  • পশ্চিমা দর্শনের গপ্পোগাছা — প্লেটো-র ইউটোপিয়া

    প্যালারাম
    আলোচনা | দর্শন | ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭৪ বার পঠিত
  • Scuola di Atene, The School of Athens - Raphael, সূত্র


    তিন দার্শনিক

    প্লেটো-র ইউটোপিয়া

    আগের পর্ব: প্লেটোর মতামতের উৎসসন্ধানে


    প্লেটোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘কথোপকথন’, ‘প্রজাতন্ত্র’ (Republic)-কে মোটের ওপর তিনটে ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগটি (পঞ্চম পর্বের প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত) এক আদর্শ সাধারণতন্ত্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণের কথা বলে; ইউটোপিয়া-র (Utopia) প্রস্তাবের দীর্ঘ পরম্পরায় এটিই প্রাচীনতম। এই ভাগ যেসব সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, তার একটি হল – শাসকদের অবশ্যই দার্শনিক হতে হবে। ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্বে ‘দার্শনিক’ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস দেখা যায়। এই আলোচনাটি নিয়েই তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় ভাগ। তৃতীয় ভাগে রয়েছে বাস্তবে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের সংবিধান এবং সেগুলির গুণাগুণ ও ত্রুটিবিচ্যুতির আলোচনা।

    নামেমাত্র হলেও, ‘প্রজাতন্ত্র’-এর মূল লক্ষ্য ছিল ‘ন্যায়বিচার’ (justice)-কে সংজ্ঞায়িত করা। তবে আলোচনার গোড়ার দিকেই ঠিক করে নেওয়া হয়, যে, যেহেতু ছোট পরিধির চেয়ে বড় ক্যানভাসে সবকিছু স্পষ্টতর দেখা যায়, তাই কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ঠিক কেমন হয় – তা বোঝার চাইতে বরং একটি ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র ঠিক কী দিয়ে তৈরি—সেই অনুসন্ধান করাই শ্রেয়। আর যেহেতু কোনো আদর্শ, শ্রেষ্ঠ, কাল্পনিক রাষ্ট্রের গুণাবলীর মধ্যে ন্যায়বিচার-কে থাকতেই হবে, তাই প্রথমে তেমন এক রাষ্ট্রের রূপরেখা আঁকা হয়, আর তারপর স্থির করা হয় – তার কোন কোন নিখুঁত গুণকে ‘ন্যায়’ বা ‘সুবিচার’ বলা চলে।

    প্রথমে প্লেটোর ইউটোপিয়াকে মোটা দাগে চিনে নেওয়া যাক। পথ চলতে যেসব প্রসঙ্গ উঠে আসবে, সেগুলির ওপর তখন নজর দেওয়া যাবে’খন।

    শুরুতেই প্লেটোর সিদ্ধান্ত – নাগরিকদের তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হবে: সাধারণ মানুষ, সৈন্যবাহিনী এবং অভিভাবক বা রক্ষকদল (guardians)। রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকবে একমাত্র এই শেষ দলটির হাতেই। অন্য দুটি শ্রেণীর তুলনায় সংখ্যায় এরা হবে অনেক কম। প্রথম দফায় সম্ভবত আইনপ্রণেতাই এদের নির্বাচন করবেন; তারপর, এমনিতে, বংশপরম্পরাতেই তাদের উত্তরাধিকার চলবে, তবে তেমন ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে কোনো সম্ভাবনাময় শিশুকে নিম্ন শ্রেণী থেকে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে, আবার অভিভাবকগোষ্ঠী-সন্তানদের মধ্যে কোনো অযোগ্য বা অসন্তোষজনক শিশু বা তরুণকে পদাবনমিত করে নিচু শ্রেণীতে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে।

    প্লেটো ঠিকই আঁচ করেছিলেন, যে, আসল সমস্যা হল – এই রক্ষকদল যাতে আইনপ্রণেতার উদ্দেশ্য যথাযথ পালন করে—তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যে তাঁর নানা রকমের প্রস্তাব আছে – শিক্ষামূলক, অর্থনৈতিক, জৈবিক এবং ধর্মীয়। রক্ষক ছাড়া অন্য শ্রেণীর ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবগুলি ঠিক কতটা প্রযোজ্য – তা সবসময় স্পষ্ট নয়; এটুকু পরিষ্কার, যে, এর কিছু অংশ সৈন্যদের ক্ষেত্রেও খাটে, তবে প্লেটোর মূল মাথাব্যথা শুধুই এই রক্ষকদের নিয়ে। এরা হবে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শ্রেণী -– ঠিক যেমন ছিল প্রাচীন প্যারাগুয়ের জেসুইটরা [১], ১৮৭০ সাল পর্যন্ত (ইতালির) পোপ-শাসিত অঞ্চলের ধর্মযাজকমণ্ডলী, কিংবা বর্তমান সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি।

    প্রথমেই বিবেচ্য বিষয় হল শিক্ষা। একে দু-ভাগে ভাগ করা হয়েছে: মিউজ়িক (music) ও জিম্ন্যাস্টিক্স (gymnastics)। বর্তমানের তুলনায় এদের উভয়ের অর্থই তখন ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত: ‘মিউজ়’-দের আওতাধীন যা কিছু – তার সবই ছিল ‘মিউজ়িক’-এর অন্তর্ভুক্ত, আর শারীরিক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা সংক্রান্ত সবকিছুই ছিল ‘জিম্ন্যাস্টিক্স’। আমরা যাকে ‘সংস্কৃতি’ বলি, ‘মিউজ়িক’ ছিল প্রায় ততটাই ব্যাপক, আর যাকে আমরা শরীরচর্চা বা ক্রীড়া (athletics) বলি, ‘জিম্ন্যাস্টিক্স’-এর মানে তার চেয়ে কিছুটা বিস্তৃত ছিল।
    সংস্কৃতির উদ্দেশ্য হবে মানুষকে ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু’ (gentleman) বানিয়ে তোলা, যে অর্থে শব্দটি—বহুলাংশে প্লেটোর দৌলতেই—ইংল্যান্ডের মানুষের অতি পরিচিত। তাঁর সমসাময়িক এথেন্স একটি দিক থেকে ঊনবিংশ শতকের ইংল্যান্ডের মতো ছিল: দুই সমাজেই এক অভিজাত সম্প্রদায় বিত্ত ও সামাজিক মর্যাদা পুরোদমে উপভোগ করতো, যদিও রাজনৈতিক ক্ষমতায় তাদের কোনো একচেটিয়া অধিকার ছিল না; এবং উভয়ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে হলে নিজেদের চালচলন ও ব্যক্তিত্বের জৌলুশের ওপর নির্ভর করতো। প্লেটোর ইউটোপিয়ায় অবশ্য অভিজাতদের এই শাসনের ওপর কোনো রাশ টানা নেই।

    শিক্ষাব্যবস্থায় যে গুণগুলির সবচেয়ে বেশি চর্চা হওয়া দরকার, সেগুলি নাকি—গাম্ভীর্য, শিষ্টাচার এবং সাহস। একেবারে শিশুকাল থেকেই এমন এক কড়া নজরদারি থাকবে, যাতে তরুণরা কী সাহিত্য পড়বে আর কোন ধরনের সঙ্গীত শুনবে দেওয়া হবে – তার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ থাকে। মায়েরা এবং ধাত্রীরা সন্তানদের শুধু রাষ্ট্র-অনুমোদিত গল্পই শোনাবেন। হোমার আর হেসিওড-কে (Hesiod) কোনোমতেই বরদাস্ত করা চলবে না, এবং তার কারণও ভূরি ভূরি:

    প্রথমত, তাঁরা মাঝেমধ্যেই দেবতাদের নানা দুরাচারের ছবি আঁকেন, যা নীতিশিক্ষার পক্ষে মোটেই সুবিধের নয়; কমবয়সীদের শেখাতে হবে – অমঙ্গল কখনো ঈশ্বরের থেকে আসে না, কারণ ঈশ্বর সবকিছুর স্রষ্টা নন; যা কিছু মঙ্গলময় ও শুভ, তিনি তারই একমাত্র কারণ।
    দ্বিতীয়ত, হোমার ও হেসিওডের কাব্যে এমন বহু বিষয় রয়েছে যা পাঠকের মনে নিখাদ মৃত্যুভয় জাগিয়ে তুলতে সক্ষম; অথচ শিক্ষার যাবতীয় উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত যাতে যুবকেরা হাসিমুখে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে। আমাদের ছেলেদের শেখাতে হবে – দাসত্ব মৃত্যুর চেয়েও অধম; অতএব, এমন কোনো গল্পের ছোঁয়াও তাদের পাওয়া চলবে না, যেখানে কোনো ভালো মানুষকে বুক চাপড়ে কাঁদতে বা বিলাপ করতে দেখা যায়—এমনকি বন্ধুর মৃত্যুতেও না।
    তৃতীয়ত, শিষ্টাচারের দাবি হল – কখনোই বিকট অট্টহাস্য করা চলবে না; অথচ হোমার অবলীলায় বলছেন ‘পুণ্যবান দেবতাদের মধ্যে অনির্বাণ অট্টহাস্য’-র কথা। ছেলেরা যদি পাল্টা এই পঙক্তি আউড়ে দেয়, তবে কোন মুখে ইশকুলের মাস্টারমশাই তাদের আমোদ-আহ্লাদে বাগড়া দেবেন?
    চতুর্থত, হোমারের রচনায় ভূরিভোজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্তবক যেমন আছে, তেমনই আছে দেবতাদের কামনাবাসনার বিশদ বিবরণ; এই জাতীয় অংশ মিতাচার ও আত্মসংযমের (temperance) শিক্ষাকে সরাসরি নস্যাৎ করে (ডিন ইং—Dean Inge, যিনি মনেপ্রাণে খাঁটি প্লেটোপন্থী ছিলেন, স্বর্গসুখের বর্ণনায় এক সুপরিচিত স্তোত্রের একটি লাইনে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন: ‘বিজয়োল্লাসের গর্জন, ভোজনবিলাসীদের নিয়ে বাঁধা গান’)। তার ওপর, এমন কোনো গল্পের অস্তিত্বই থাকা চলবে না, যেখানে পাপী ব্যক্তি সুখে আছে কিংবা পুণ্যবান মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত; সুকুমার মনের ওপর এর নৈতিক প্রতিক্রিয়া বেজায় ক্ষতিকর হতে পারে। এই সব ক্ষেত্রেই, কবিদের কপালে তিরস্কার জোটা উচিত।

    নাটক সম্পর্কে প্লেটো এরপর অদ্ভুত এক যুক্তির অবতারণা করেন। তাঁর মতে, কোনো ভালো মানুষের পক্ষে খারাপ মানুষের অনুকরণ করতে চাওয়া অনুচিত; এদিকে অধিকাংশ নাটকেই খলনায়কদের উপস্থিতি অনিবার্য; অতএব, নাট্যকার এবং সেই খলনায়কের চরিত্রাভিনেতা – দু-জনকেই নানা-অপরাধে-লিপ্ত মানুষের অনুকরণ করতে হয়। শুধু অপরাধীই নয় – নারী, ক্রীতদাস এবং সামগ্রিকভাবে যেকোনো অধস্তন ব্যক্তিরই অনুকরণ কোনো উচ্চস্তরের পুরুষের পক্ষে অশোভন (এলিজাবেথীয় যুগের ইংল্যান্ডের মতোই, প্রাচীন গ্রিসেও মেয়েদের চরিত্রে পুরুষরাই অভিনয় করতো)। সুতরাং নাটক যদি আদৌ বরদাস্ত করতেই হয়, তবে তাতে বনেদি বংশে জন্মানো নিখুঁত পুরুষ-নায়ক ছাড়া অন্য কোনো চরিত্র থাকা চলবে না। এমন নাটক এতটাই অসম্ভব, যে প্লেটো শেষমেশ তাঁর আদর্শ নগরী থেকে সমস্ত নাট্যকারকেই নির্বাসনে পাঠানোর ফয়সালা করেন:

    “এইসব মূকাভিনেতা ও বহুরূপী ভদ্রলোকরা এতটাই চালাক, যে তাঁরা যেকোনো কিছুরই নিখুঁত নকল করতে পারেন। এঁদের কেউ যদি কখনো আমাদের কাছে এসে নিজের শরীর ও কাব্যকলা প্রদর্শনের প্রস্তাব দেন, তবে আমরা সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করে তাঁকে সুমধুর, পবিত্র এবং এক অদ্ভুত ঐশ্বরিক সত্তা-জ্ঞানে বন্দনা তো করবো অবশ্যই; তবে একইসঙ্গে তাঁকে এ কথাও জানিয়ে দেওয়া হবে, যে, আমাদের রাষ্ট্রে তাঁর মতো লোকের ঠাঁই হওয়া সম্ভব নয়; আইন তাঁদের কখনোই অনুমোদন দেয় না। অতঃপর, তাঁর অঙ্গে সুগন্ধী রজন (মাহ্‌ ; বানান: Myrrh; অনুবাদক: আরব ও আফ্রিকা অঞ্চলের ছোট কনিফেরা গোত্রের গুল্ম থেকে পাওয়া সুগন্ধী রজন) লেপে এবং মাথায় উলের মালা পরিয়ে দিয়ে, পরম সমাদরে তাঁকে অন্য কোনো নগরে বিদেয় করে দেওয়া হবে।“

    এরপরেই আসে সঙ্গীতের (শব্দটির আধুনিক অর্থে) ওপর চাপানো সেন্সরশিপের (বিবাচন) প্রসঙ্গ। লিডিয়ান (Lydian) ও আয়োনিয়ান (Ionian) ঠাটের গান একেবারেই নিষিদ্ধ করতে হবে – প্রথমটি বিষাদ-জাগানিয়া, আর দ্বিতীয়টি বড্ড আয়েসী, ঢিলেঢালা। কেবল ডোরিয়ান (Dorian; সাহস জাগানোর জন্যে) এবং ফ্রিজিয়ান (Phrygian; সংযম বা মিতাচারের উদ্দেশ্যে) সুরের মেলবন্ধনকেই অনুমতি দেওয়া চলবে। কেবল অনাড়ম্বর ও সরল ছন্দ বা তালই অনুমোদন পাবে—যাতে তারা এক নির্ভীক ও সুসমন্বিত জীবনের প্রকাশ করতে পারে। [২]

    শরীরচর্চার পাঠও হবে বেজায় কঠোর। মাছ খাওয়া তো দূরে থাক, আগুনে পোড়ানো ছাড়া অন্য কোনোভাবে রাঁধা মাংসও মুখে তোলা চলবে না; আর ঝোলঝাল-চাটনি কিংবা মিষ্টিমণ্ডা তো নৈব নৈব চ। প্লেটোর বক্তব্য – তাঁর এই খাদ্যবিধি ও শৃঙ্খলায় যারা মানুষ হবে, তাদের কোনো ডাক্তারবদ্যির প্রয়োজনই পড়বে না।

    এক নির্দিষ্ট বয়স অবধি তরুণেরা কোনো কদর্যতা বা পাপের ছায়াও দেখতে পাবে না। কিন্তু যথাসময়ে তাদের কিছু ‘কামিনীকাঞ্চন’ (enchantments)-এর মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে – একদিকে এমন সব আতঙ্ক, যা তাদের বিন্দুমাত্র টলাতে পারবে না; অন্যদিকে এমন সব বদ-সুখ, যা তাদের সংকল্পকে বশ করতে পারবে না। এই কঠিন পরীক্ষায় যারা টিকে থাকবে, কেবল তাদেরই ‘রক্ষক’ (guardians) হওয়ার উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হবে। সাবালক হওয়ার আগেই, যুদ্ধ কেমন হয় – তা কিশোরদের চাক্ষুষ করতে হবে, যদিও তারা নিজেরা লড়াইয়ের ময়দানে নামবে না।

    অর্থনীতি প্রসঙ্গে: রক্ষক আর সৈন্যদের (অন্তত আমার মনে হয়) জন্যে প্লেটো এক আমূল সাম্যবাদের (communism) প্রস্তাব দিচ্ছেন, যদিও ব্যাপারটা খুব একটা খোলসা নয়। রক্ষকদের ঘরদোর হবে নিতান্তই ছোট আর খাবারদাবার সাদামাটা, যেন তারা কোনো সেনাছাউনিতে আছে, একলপ্তে সকলে মিলে খাবে; আর একান্ত প্রয়োজনীয়টুকুর বাইরে তাদের নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তির বালাই থাকবে না। সোনা আর রুপোর ব্যবহার সটান নিষিদ্ধ। ধনী না হলেও, তাদের সুখী না হতে পারার কোনো কারণ নেই; তবে কোনো নগরী তো কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর সুখের উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না—উদ্দেশ্য, গোটা সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল সাধন। প্রাচুর্য আর দারিদ্র্য – দুই-ই ক্ষতিকর, আর প্লেটোর কল্পিত নগরে এর কোনোটিরই ঠাঁই হবে না। যুদ্ধের ব্যাপারে এক অদ্ভুত যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে – যেহেতু বিজয়ের পর লুটের মালের কোনো ভাগ আমাদের নগর দাবি করবে না, তাই অন্য মিত্রদের হাত করে নেওয়া নাকি খুব সহজ হবে!

    এরপর—যেন খানিক অনিচ্ছার ভান করেই—প্লেটোনিক সোক্রাতিস এবার পরিবারের ওপরেও তাঁর এই সাম্যবাদ প্রয়োগ করতে এগোলেন। তাঁর মতে, বন্ধুদের মধ্যে সব সম্পত্তিই সকলের হবে, এমনকি নারী আর সন্তানসন্ততিও। এতে যে বেজায় ঝক্কি পোয়াতে হবে – তা তিনি মানছেন, তবে তা নাকি অনতিক্রম্যও নয়। একদিকে, মেয়েরা ঠিক ছেলেদের সমান শিক্ষা পাবে—ছেলেদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা সঙ্গীত, শরীরচর্চা আর রণকৌশল শিখবে, তাই সমস্ত দিক থেকেই নারী-পুরুষের পূর্ণ সাম্য থাকবে। “যে শিক্ষা একজন পুরুষকে ভালো ‘রক্ষক’ করে তোলে, তা কোনো নারীকেও সমান উৎকর্ষের রক্ষক বানাবে; কারণ মূলে, উভয়ের প্রকৃতি অভিন্ন।” নারী আর পুরুষের মধ্যে ফারাক নিঃসন্দেহে আছে, কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু নারী দর্শনমনস্ক, এবং রক্ষক হওয়ার আদর্শ পাত্রী; কেউ কেউ যুদ্ধবাজ, তারা দিব্যি পোড়খাওয়া সৈনিক হতে পারে।

    অভিভাবকশ্রেণীকে (কিছু পুরুষ ও কিছু নারী) বেছে নেওয়ার পর আইনপ্রণেতা ফরমান জারি করবেন – তারা সকলে একই যৌথ আবাসে থাকবে, একই যৌথ ভোজনশালায় খাবে। বিবাহ বলতে আমরা যা বুঝি, তার চরিত্র আমূল বদলে যাবে [ক]। নির্দিষ্ট কিছু উৎসবে, জনসংখ্যা ঠিক এক মাপে রাখার প্রয়োজনে, মিলনের উদ্দেশ্যে বর ও কনের জোড়া বেছে নেওয় হবে লটারির মাধ্যমে—অন্তত নাগরিকদের তেমনই বিশ্বাস করতে শেখানো হবে—কিন্তু ভেতরে ভেতরে সুপ্রজননবিদ্যার (eugenics) নিয়ম কাজে লাগিয়ে নগরের শাসকেরাই কলকাঠি নেড়ে জোড়া বাছবেন। তাঁরা ব্যবস্থা করবেন, যাতে সেরা গোত্রের পুরুষদের ঔরসেই সর্বাধিক সন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পরেই সব শিশুকে বাবা-মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়া হবে, আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সতর্কতা রাখা হবে যাতে কোনো বাবা-মা জানতে না পারেন কোনটি তাঁদের সন্তান, আর কোনো সন্তানও যেন জানতে না পারে কারা তার জন্মদাতা। অপুষ্ট বা বিকলাঙ্গ শিশু, এবং নিম্নমানের বাবা-মায়ের সন্তানদের “কোনো এক রহস্যময় অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে দেওয়া হবে, যেমনটি হওয়ার কথা।” রাষ্ট্রের অনুমোদনহীন যৌনমিলনের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের জারজ বলে গণ্য করা হবে। মায়েদের বয়স হতে হবে কুড়ি থেকে চল্লিশের মধ্যে, আর বাবাদের পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন। এই নির্দিষ্ট বয়ঃসীমার বাইরে যে কেউ অবাধ যৌনমিলনে লিপ্ত হতে পারে, তবে গর্ভপাত কিংবা শিশুবধ বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রের আয়োজন করা এইসব “বিবাহ”-তে সংশ্লিষ্ট নরনারীর টুঁ শব্দটি করার অধিকার থাকবে না; রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যের তাগিদেই তারা পরিচালিত হবে – যেসব চেনা আবেগকে নির্বাসিত কবিরা একদা ঢাকঢোল পিটিয়ে বন্দনা করতেন, তার কোনোটিই এখানে ঠাঁই পাবে না।

    যেহেতু কেউই জানবে না কারা তার পিতা-মাতা, তাই যার বয়স তার পিতা হওয়ার মতো, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই সে ‘পিতা’ বলে ডাকবে; একইভাবে ‘মাতা’, ‘ভাই’ এবং ‘বোন’-এর বেলাতেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে (প্রান্তিক বুনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ধরনের ব্যাপার আজও দেখা যায়, যা এককালে খ্রিস্টান মিশনারিদের বেজায় ধাঁধায় ফেলত)। ‘পিতা’ ও ‘কন্যা’ কিংবা ‘মাতা’ ও ‘পুত্র’-র মধ্যে কোনো বিবাহ চলবে না; সাধারণভাবে—যদিও চূড়ান্ত কোনো কড়াকড়ি নয়—‘ভাই’ ও ‘বোন’-এর বিবাহও রদ করা হবে (আমার তো মনে হয়, প্লেটো যদি বিষয়টি নিয়ে আরেকটু খতিয়ে ভাবতেন, তবে দেখতে পেতেন যে তিনি প্রকারান্তরে সকল বিবাহকেই নিষিদ্ধ করে ফেলেছেন—কেবল সেই ‘ভাই-বোনের’ বিবাহ বাদে, যাকে তিনি বিরল ব্যতিক্রম বলে ধরেছেন)।

    ধরে নেওয়া হচ্ছে যে ‘পিতা’, ‘মাতা’, ‘পুত্র’ এবং ‘কন্যা’ শব্দগুলির সঙ্গে বর্তমানে যে সব আবেগ জড়ানো থাকে, প্লেটোর এই নতুন ব্যবস্থার মধ্যেও তা একইভাবে বজায় থাকবে; উদাহরণস্বরূপ, কোনো যুবক কোনো বয়স্ক মানুষকে প্রহার করবে না, কারণ – হতেই পারে সে অজান্তেই তার পিতাকে আঘাত করে বসছে!

    মোদ্দা ফায়দাটি নিঃসন্দেহে – ব্যক্তিগত দখলদারির আবেগকে যথাসম্ভব ছেঁটে ফেলা, যাতে একদিকে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় চেতনার নিরঙ্কুশ আধিপত্যের পথে কোনো অন্তরায় না থাকে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অনুপস্থিতিও সকলে নির্বিবাদে মেনে নেয়। অনেকটা এই একই উদ্দেশ্য থেকেই এককালে ধর্মযাজকদের চিরকৌমার্যের বিধান দেওয়া হয়েছিল [খ]।

    সবশেষে, এই কাঠামোর ধর্মতাত্ত্বিক দিকটি। চলতি গ্রিক দেবদেবীদের কথা নয়, আমি বলছি সেইসব পৌরাণিক গালগল্পের কথা – যা জনমানসে গেঁথে দেওয়ার কাজটা করবে সরকার। প্লেটোর সোজাসাপ্টা ঘোষণা – মিথ্যাভাষণের অধিকার একান্তই সরকারের নিজস্ব বিশেষ অধিকার (prerogative), ঠিক যেমন রোগীকে ওষুধ দেওয়ার অধিকার থাকে চিকিৎসকের। সরকার যে লটারির ভান করে বিবাহের আয়োজন করে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেবে, তা আমরা আগেই দেখেছি—তবে সে তো আর ধর্মীয় বিষয় নয়।

    একটি বিশেষ ‘রাজকীয় মিথ্যা’ (royal lie)-র কথা প্লেটো বলেছেন, যা—তাঁর আশা—হয়তো খোদ শাসকদের চোখেও ধুলো দিতে পারে, তবে নগরীর আমজনতাকে ভুলোবে নির্ঘাৎ। বেশ খুঁটিনাটি সহযোগেই এই ‘মিথ্যা’-টির রূপরেখা টানা হয়েছে। এর প্রধান অংশটি হল সেই শাস্ত্রীয় অনুশাসন (dogma) – ঈশ্বর তিন ধরনের মানুষ সৃষ্টি করেছেন: সর্বোৎকৃষ্টরা সোনা দিয়ে গড়া, দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষেরা রূপো দিয়ে তৈরি, আর বাদবাকি সাধারণ গড্ডল তামা ও লোহায় নির্মিত। যারা সোনা দিয়ে তৈরি, তারা ‘অভিভাবক’ (guardians) হওয়ার উপযুক্ত; রূপোর তৈরি মানুষেরা হবে সৈন্যসামন্ত; আর বাকিদের কাজ কায়িক শ্রম করা। সাধারণত—কোনোমতেই সর্বক্ষেত্রে নয়—সন্তানসন্ততি তাদের বাবা-মায়ের শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত হবে; যদি কদাচিৎ তা না হয়, তবে সেই অনুযায়ী তাদের পদোন্নতি বা অবনমন ঘটাতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের মানুষকে এই কল্পকথায় বিশ্বাস করানো অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম এবং তার পরের সমস্ত বংশধরদের এমন শিক্ষায় দীক্ষিত করা সম্ভব, যাতে তারা এ নিয়ে কোনো সন্দেহই না রাখে।

    মাত্র দু-প্রজন্মের মধ্যেই এইরকম এক রূপকথায় নিখাদ বিশ্বাস তৈরি করে ফেলা যে সম্ভব – প্লেটোর এ ভাবনা ভুল নয়। ১৮৬৮ সাল থেকে জাপানিদের যেমন শেখানো হয়েছিল – মিকাডো (সম্রাট) স্বয়ং সূর্যদেবীর বংশধর, আর বাকি গোটা দুনিয়া তৈরি হওয়ার আগেই জাপানের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপক যদি কোনো বিদগ্ধ গবেষণাপত্রেও এই অনুশাসনের ওপর বিন্দুমাত্র সংশয় প্রকাশ করেন, তবে ‘জাপান-বিরোধী কার্যকলাপ’-এর দায়ে তাঁর চাকরি যায়। প্লেটো যা ধরতে পারেননি বলে মনে হয়, তা হল – জোর করে এমনধারা কল্পকথা গিলিয়ে দেওয়া দর্শনের স্বভাবের পরিপন্থী, আর এর ফলে যে শিক্ষার জন্ম হয়, তা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশকেই পঙ্গু করে দেয়।

    ‘ন্যায়বিচার’ (justice)-এর সংজ্ঞা দেওয়া—এই গোটা আলোচনার যা ঘোষিত লক্ষ্য—চতুর্থ পর্বে এসে অবশেষে তার নাগাল পাওয়া যায়। আমাদের জানানো হয়, এর সারমর্ম হল – যার যার কাজ সে সে করবে, পরের ধানে মই দিতে বা অনধিকার চর্চায় যাবে না: একটি নগরী তখনই 'ন্যায়পরায়ণ', যখন বণিক, সাহায্যকারী সৈন্যদল এবং অভিভাবক – প্রত্যেকে অন্যের সীমানায় নাক না গলিয়ে নিজের নিজের দায়িত্বটুকু পালন করে চলে।

    প্রত্যেকেরই নিজের চরকায় তেল দেওয়া উচিত – এ নিঃসন্দেহে অতি উত্তম উপদেশ, কিন্তু একজন আধুনিক মানুষ যাকে সচরাচর ‘ন্যায়’ বা ‘ন্যায়বিচার’ বলে ভাবে, তার সঙ্গে এর মিল সামান্যই। যে গ্রিক শব্দটিকে এভাবে অনুবাদ করা হয়েছে, গ্রিক চিন্তনে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ধারণার দ্যোতক ছিল, অথচ আমাদের ভাষায় যার কোনো নিখুঁত প্রতিশব্দ নেই। আনাক্সিমান্দ্রোস কী বলেছিলেন, তা একবার মনে করা হয়তো এখানে প্রাসঙ্গিক হবে:

    যা থেকে বস্তুর উদ্ভব, তাতেই তার অনিবার্য লয়, কারণ, সময়ের আদেশ মেনে, তারা পরস্পরের প্রতি কৃত অন্যায়ের যথাক্রমে প্রতিশোধ ও প্রায়শ্চিত্ত (ন্যায়বিচার) সাধন করে।

    দর্শনের উন্মেষের আগে মহাবিশ্ব সম্পর্কে গ্রিকদের মনে যে তত্ত্ব বা উপলব্ধি ছিল, তাকে ধর্মীয় বা নৈতিক বলা যেতে পারে। এই তত্ত্বের সারকথা হল: প্রতিটি ব্যক্তি এবং প্রতিটি বস্তুরই একটি পূর্বনির্ধারিত স্থান আর নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এ নিয়ম জ়িউসের খেয়ালি হুকুমের মুখাপেক্ষী নয়, কারণ জ়িউস নিজেও সেই একই নিয়মের অধীন – যা বাকি সকলকে শাসন করে। এ তত্ত্বের যোগ আছে নিয়তি (fate) বা প্রয়োজন (necessity)-এর ধারণার সঙ্গে। জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম আরও বেশি জোরালোভাবে খাটে। কিন্তু যেখানেই তেজিয়ান ‘প্রাণ’-এর উপস্থিতি, সেখানেই এই নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করার এক স্বাভাবিক প্রবণতা দেখা দেয়; আর তার থেকেই বিবাদের সূত্রপাত। অলিম্পীয় দেবমণ্ডলীর ঊর্ধ্বে থাকা এক নৈর্ব্যক্তিক বিধান এই আত্মম্ভরিতা বা দম্ভ (hubris)-কে শাস্তি দেয় এবং সেই চিরন্তন শৃঙ্খলাকে ফিরিয়ে আনে যা সেই তেজিয়ান ভাঙতে চেয়েছিল। এই গোটা দৃষ্টিভঙ্গিটি—শুরুর দিকে হয়তো যা সম্পূর্ণ অবচেতন রূপেই—ধীরে ধীরে দর্শনের অন্দরে প্রবেশ করে; হেরাক্লিতোস বা এম্পেদোক্লিস-বর্ণিত দ্বন্দ্বমুখর সৃষ্টিতত্ত্বে যেমন, তেমনই পার্মেনিদিসের অদ্বৈতবাদী মতবাদের ভেতরেও এর দেখা মেলে। প্রাকৃতিক নিয়ম এবং মানবিক আইন – উভয়ের প্রতি বিশ্বাসের উৎস এটিই, আর প্লেটোর ‘ন্যায়’-এর ধারণার বুনিয়াদেও যে এই প্রত্যয়ই কাজ করছে, তা স্পষ্ট।

    রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চায় ‘ন্যায়’ বা ‘ন্যায়বিচার’ (justice) শব্দটি যেভাবে ব্যবহৃত হয়, তার তুলনায় আইন-আদালতে যেভাবে ব্যবহার হয়, তার সঙ্গে প্লেটোর ধারণাটি অনেক বেশি মেলে। গণতান্ত্রিক তত্ত্বের হাওয়া লেগে আমরা ‘ন্যায়’-এর সঙ্গে সাম্য-র ধারণাকে জুড়ে দিতে অভ্যস্ত হয়েছি, কিন্তু প্লেটোর কাছে এর এমন কোনো অর্থ ছিল না। যে অর্থে ‘ন্যায়’ শব্দটি প্রায় ‘আইন’-এর সমার্থক—যেমন, আমরা যখন বিচারালয়ের (courts of justice) কথা বলি—তা মূলত সম্পত্তির অধিকার নিয়েই কারবার করে, যার সঙ্গে সমতার কোনো সম্পর্কই নেই। ‘প্রজাতন্ত্র’ (Republic)-র গোড়াতেই ‘ন্যায়’-এর যে প্রথম সংজ্ঞার হদিস মেলে, তা হল – ধার-দেনা মেটানো। সংজ্ঞাটি নিতান্ত অকেজো বলে অচিরেই বাতিল করা হলেও, শেষ অবধি তার কিছু না কিছু ছিটেফোঁটা থেকেই যায়।

    প্লেটোর সংজ্ঞাটি নিয়ে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা দরকার।

    প্রথমত, এর ফলে ন্যায়ের আওতার বাইরেই ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার তারতম্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। অভিভাবক বা রক্ষকদের (guardians) হাতেই সর্বময় ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে, কারণ সমাজের মধ্যে তাঁদের প্রজ্ঞাই সবচেয়ে বেশি; প্লেটোর দেওয়া সংজ্ঞায় অবিচার কেবল তখনই ঘটবে, যদি অন্য কোনো শ্রেণীতে এমন কোনো মানুষের আবির্ভাব ঘটে যিনি কোনো এক রক্ষকের থেকেও বেশি জ্ঞানী। এই জন্যেই প্লেটো নাগরিকদের পদোন্নতি আর পদাবনতির ব্যবস্থা রেখেছেন, যদিও তাঁর বিশ্বাস ছিল – উচ্চ বংশমর্যাদা আর শিক্ষার জোড়া সুবিধার দৌলতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রক্ষকদের সন্তানরা অন্যদের টেক্কা দিয়ে যাবে। রাষ্ট্রশাসনের যদি আরও নিখুঁত কোনো বিজ্ঞান থাকতো, আর সেই বিজ্ঞানের কানুন মানুষ ঠিকঠাক মেনে চলবে এমন নিশ্চয়তা থাকতো, তবে প্লেটোর ব্যবস্থার সপক্ষে বিস্তর কথা বলা যেত। সেরা খেলোয়াড়দের দিয়ে ফুটবল দল বানানোকে কেউ অন্যায় বলে মনে করে না, যদিও তার ফলে তারা বাকিদের তুলনায় কয়েক যোজন এগিয়ে যায়। ফুটবল দলগুলোকেও যদি এথেন্স সরকারের মতো গণতান্ত্রিক কায়দায় চালানো হত, তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলতে নামা ছাত্রদের বাছা হত লটারির মাধ্যমে! কিন্তু সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে, কার ঝুলিতে কত এলেম লুকিয়ে আছে – তা ঠাহর করা দায়, আর কোনো রাজনীতিবিদ যে নিজের আখের না গুছিয়ে, কিংবা নিজের শ্রেণী, দল বা মতাদর্শের স্বার্থ না দেখে সেই দক্ষতাকে জনস্বার্থে কাজে লাগাবেন – সে কথা নিশ্চিত করে কিছুতেই বলা যায় না।

    দ্বিতীয়ত, প্লেটোর এই ‘ন্যায়’-এর সংজ্ঞায় এমন এক রাষ্ট্রের কথা আগেভাগেই ধরে নেওয়া হয়েছে, যা হয় চিরাচরিত ঐতিহ্যের ছাঁচে গড়া, নয়তো তাঁর নিজের কল্পিত রাষ্ট্রের মতো—আদ্যোপান্ত কোনো এক নৈতিক আদর্শ রূপায়ণের উদ্দেশ্যে নির্মিত। আমাদের বলা হল: প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজটুকু ঠিকমতো করলেই ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মানুষের সেই কাজটা আসলে কী? প্রাচীন মিশর কিংবা ইনকাদের দেশের মতো যেসব রাষ্ট্রে বংশপরম্পরায় কিছুই বদলায় না, সেখানে বাপের কাজই ব্যাটা করে—প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গাই সেখানে নেই। কিন্তু প্লেটোর রাষ্ট্রে কারুর কোনো আইনি পিতাই নেই। অতএব, কার কী কাজ হবে, তা ঠিক হতে পারে হয় তার নিজের পছন্দ দিয়ে, নয়তো তার মেধা-যোগ্যতা সম্পর্কে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে। নিশ্চিত এই শেষের বিকল্পটিই প্লেটোর মনের মতো হত। কিন্তু কিছু কিছু কাজ, যতই তাতে চূড়ান্ত মুনশিয়ানা থাকুক না কেন, বিপজ্জনক বলে সাব্যস্ত হতে পারে; কাব্যের ক্ষেত্রে প্লেটোর মনোভাব ঠিক এইরকমই ছিল, আর নেপোলিয়নের কীর্তিকলাপের ক্ষেত্রে আমার মতামত ঠিক একইরকম। কাজেই, একজন মানুষের আসল পেশা ঠিক কী হওয়া উচিত, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের মূল উদ্দেশ্যটি বোঝা একান্ত দরকার। যদিও সব শাসককেই দার্শনিক হতে হবে, কিন্তু কোনো নতুন উদ্ভাবন সেখানে বরদাস্ত করা হবে না: যে কোনো কালের নিরিখেই ‘দার্শনিক’ বলতে সেই মানুষটিকেই বোঝবে, যিনি প্লেটোকে বোঝেন এবং তেনার কথায় সায় দেন।

    প্লেটোর এই ‘প্রজাতন্ত্র’ শেষমেশ কী হাসিল করবে? -- এ প্রশ্নের উত্তর নেহাতই জোলো। মোটামুটি কাছাকাছি জনসংখ্যার কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এ সাফল্য এনে দেবে, আর গুটিকয়েক মানুষের জন্যে জীবিকার সংস্থানটুকু নিশ্চিত করবে। এর অনমনীয় চরিত্রের কারণে এ প্রায় নিশ্চিতভাবেই কোনো শিল্প বা বিজ্ঞানের জন্ম দেবে না; অন্যান্য বিষয়গুলোর মতোই এই ক্ষেত্রেও সমাজটি অবিকল স্পার্টার মতোই হবে। এত সব চটকদার বুলি আউড়ে আখেরে যা জুটবে—তা সাকুল্যে যুদ্ধকৌশল আর পেটভরে দু-মুঠো ভাত। প্লেটো নিজে এথেন্সে বসে দুর্ভিক্ষ আর পরাজয় প্রত্যক্ষ করেছিলেন; হয়তো নিজের অবচেতনেই তিনি ধরে নিয়েছিলেন—এইসব অমঙ্গল এড়াতে পারাই বুঝি রাষ্ট্রনায়কোচিত দক্ষতার সর্বোচ্চ দৌড়।

    কোনো ‘ইউটোপিয়া’ যদি নেহাত খামখেয়াল না হয়, তবে তার স্রষ্টার আদর্শ-কে রূপদান করবেই। একবার ভেবে দেখা যাক—এই ‘আদর্শ’ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি। প্রথমত, যাঁরা এতে বিশ্বাস করেন, তাঁরা এ জিনিস কামনাও করেন; কিন্তু অন্ন বা আশ্রয়ের মতো ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যেভাবে কাঙ্খিত, আদর্শের আকাঙ্ক্ষা ঠিক সে ধাঁচের নয়। একখানা ‘আদর্শ’ আর সাধারণ কোনো কাম্য বস্তুর মধ্যে তফাৎ গড়ে দেয় এই যে, আদর্শ জিনিসটি নৈর্ব্যক্তিক (impersonal); যে মানুষটি তার কামনা করছে, তার নিজের অহং (ego)-এর সঙ্গে এর (অন্তত বাহ্যত) কোনো বিশেষ যোগ নেই, আর তাই তত্ত্বগতভাবে, সকলেই এমনধারা কামনা করতেই পারে। সুতরাং ‘আদর্শ’-র সংজ্ঞা আমরা এভাবে দিতে পারি – এমন এক কাঙ্ক্ষিত বস্তু, যা আত্মকেন্দ্রিক নয় এবং যার আকাঙ্খা, সে চায় যেন বাদবাকি সকলেও একই কামনা করে। আমি হয়তো চাইতে পারি যে সকলে যেন পর্যাপ্ত খেতে পায়, প্রত্যেকে যেন অপরের প্রতি সদয় হয়, ইত্যাদি; আর এসবের সঙ্গে আমি এ-ও চাইবো, যেন বাকিরাও এমনটাই চায়। এইভাবে আমি আপাতদৃষ্টিতে এক নৈর্ব্যক্তিক নীতিমালা গড়ে তুলতে পারি, যদিও আদতে তার ভিত্তি আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত বাসনা—কারণ কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের সঙ্গে আমার নিজের কোনো স্যোফ না থাকলেও, কামনাটি কিন্তু একান্তই আমার। যেমন ধরুন, একজন হয়তো চাইলো – সকলে বিজ্ঞান বুঝুক, অন্য আরেকজন চাইলো – সবাই যেন শিল্পের সমঝদার হয়; এই দুই মানুষের নিজস্ব রুচির পার্থক্যের ফলেই তাদের বাসনার মধ্যেও ফারাক হয়।

    বিতর্ক বাধামাত্র এই ব্যক্তিগত উপাদানটি প্রকাশিত হয়। ধরা যাক, কেউ বললো: “সবার সুখ চেয়ে তুমি ভুল করছো; তোমার বরং উচিত শুধু জার্মানদের সুখ কামনা করা, আর বাকি তামাম দুনিয়ার দুর্ভাগ্য।” এখানে ‘উচিত’ শব্দটির মানে এভাবেই ধরা যেতে পারে – বক্তা নিজে চান, যেন আমিও ঠিক ওটাই কামনা করি। পাল্টা জবাবে আমি হয়তো বলতে পারি – জার্মান না হওয়ায়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমার পক্ষে সমস্ত অ-জার্মানদের দুর্দশা কামনা করা অসম্ভব; কিন্তু এই জবাবও যেন অসম্পূর্ণ।

    আবার, সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক দুটি আদর্শের মধ্যেও সংঘাত বাধতে পারে। নিচা (Nietzsche)-র ‘নায়ক’-এর সঙ্গে একজন খ্রিস্টান সন্তের কোনো মিলই নেই, অথচ দুজনেই নৈর্ব্যক্তিকভাবে পূজিত হ্রা প্রথমজন নিচাপন্থীদের কাছে, দ্বিতীয়জন খ্রিস্টানদের কাছে। নিজেদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কোন নিক্তিতে মেপে আমরা এই দুইয়ের মধ্যে কোনো একজনকে বাছবো? অথচ, এর বাইরে যদি অন্য কোনো উপায় না থাকে, তবে নীতিগত বিরোধের মীমাংসা হতে পারে কেবল ভাবাবেগের কাছে সওয়াল করে, গায়ের জোরে, নয়তো শেষ অস্ত্র হিসেবে যুদ্ধের মাধ্যমে। খাঁটি তথ্যের প্রশ্নে আমরা বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির দরবারে আপিল করতে পারি; কিন্তু নীতিশাস্ত্রের চরম প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে তেমন কোনো মানদণ্ড খুঁজে পাওয়া ভার। বাস্তবিকই যদি তা-ই হয়, তবে নীতি সংক্রান্ত যাবতীয় বিতর্ক শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয় ক্ষমতাদখলের নগ্ন প্রতিযোগিতায়—যার মধ্যে প্রচারের (propaganda) ক্ষমতাও পড়ে।

    এই দৃষ্টিভঙ্গিটির একটি স্থূল রূপ তুলে ধরা হয়েছে প্লেটোর ‘প্রজাতন্ত্র’ (Republic) গ্রন্থের প্রথম পর্বে থ্রাস্যুমাখোস (Θρασυμαχος, লাতিন Thrasymachus)-কে ব্যবহার করে; প্লেটোর কথোপকথনের অন্যান্য প্রায় সব চরিত্রের মতোই যিনি রক্তমাংসের এক বাস্তব ব্যক্তি ছিলেন। খালকেদোন (Χαλκηδών, লাতিন Chalcedon)-এর এই সফিস্ট ছিলেন অলঙ্কারশাস্ত্র ও বাগ্মিতার (rhetoric) এক নামজাদা শিক্ষক; ৪২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আরিস্তোফানেসের প্রথম নাটকেও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। সোক্রাতিস যখন কেফালোস (Κέφαλος, লাতিন Cephalus) নামের এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবং প্লেটোর দুই অগ্রজ – গ্লৌকন (Γλαύκων, লাতিন Glaucon) আর আদেইমান্তুস (Ἀδείμαντος, লাতিন Adeimantus)-এর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ খোশমেজাজে ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা চালিয়েছেন, তখন ক্রমবর্ধমান অধৈর্য নিয়ে এতক্ষণ শুনতে থাকা থ্রাস্যুমাখোস এমন ছেলেমানুষী প্রলাপের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানিয়ে ফেটে পড়েন। জোর গলায় তিনি ঘোষণা করেন, “সবলের স্বার্থ ছাড়া ন্যায়বিচার আদতে আর কিছুই নয়।”

    সোক্রাতিস এই মতটিকে কথার কিছু কুটতর্কে খণ্ডন করেছেন বটে, কিন্তু কখনোই সৎভাবে এর মুখোমুখি দাঁড়াননি। অথচ নীতিশাস্ত্র আর রাজনীতিতে এটি এক অতি মৌলিক প্রশ্নকে উসকে দেয় – যে মানুষটি ‘ভালো’ আর ‘মন্দ’ শব্দদুটি ব্যবহার করছে, তার নিজস্ব কামনার বাইরে কি এ দুয়ের কোনো সার্বিক মানদণ্ড আদৌ আছে? যদি না থাকে, তবে থ্রাস্যুমাখোস যেসব সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন, তার অনেকগুলি থেকেই রেহাই পাওয়ার পথ থাকে না। কীভাবে তবে বলি যে তেমন কোনো মানদণ্ড আদতে আছে?

    এই সন্ধিক্ষণে এসে, আপাতদৃষ্টিতে, ধর্মের হাতে এর একখান বড়ই সরল জবাব মজুত থাকে। ঈশ্বরই ঠিক করে দেন কোনটি শুভ আর কোনটি অশুভ; যাঁর ইচ্ছে ঈশ্বরের ইচ্ছার সাথে মিলেমিশে থাকে, তিনিই একজন সৎ মানুষ। অথচ এই উত্তরটিও পুরোপুরি সনাতনপন্থী নয়। ধর্মতাত্ত্বিকরা বলেন ঈশ্বর নিজে কল্যাণময়, যার স্পষ্ট অর্থ দাঁড়ায় – ঈশ্বরের ইচ্ছারও বাইরে স্বাধীনভাবে ‘শুভ’-র কোনো এক মানদণ্ড বিদ্যমান। অতএব আমাদের বাধ্য হয়েই এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়: ‘তুষার শুভ্র’ – এই বক্তব্যটি যে অর্থে সত্য বা মিথ্যা, ঠিক সেই অর্থেই কি ‘আনন্দই শুভ’ – এই বক্তব্যের মধ্যেও কোনো বস্তুনিষ্ঠ সত্য বা মিথ্যা নিহিত রয়েছে?

    এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে এক সুদীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। ব্যবহারিক সুবিধার খাতিরে কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন মূল বিষয়টিকে এভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়: “‘বস্তুনিষ্ঠ সত্য’ বলতে ঠিক কী বোঝায় তা আমার জানা নেই, তবে কোনো বিষয়কে খতিয়ে দেখার পর যদি প্রায় সকলেই তা স্বীকার করে নিতে একমত হন, তবে সেই বক্তব্যটিকে আমি ‘সত্য’ বলেই ধরে নেব।” এই অর্থে এ কথা ‘সত্য’, যে তুষার শুভ্র, জুলিয়াস সিজ়ার নিহত হয়েছিলেন, জল হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের মিলনে গঠিত, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তখন আমরা বাস্তব তথ্যের এক নতুন প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়াই: নীতিশাস্ত্রেও কি এমন সর্বসম্মত কোনো বক্তব্য আদৌ পাওয়া যায়? যদি যায়, তবে সেগুলিকে ব্যক্তিগত আচরণের অনুশাসন এবং রাজনৈতিক তত্ত্ব – উভয়েরই বুনিয়াদ বানানো সম্ভব। আর যদি না যায়, তবে দার্শনিক সত্য যা-ই হোক না কেন, ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে যখনই কোনো অমীমাংসিত নৈতিক সংঘাত বাঁধবে, বাস্তবে আমরা কেবল পেশীশক্তি বা প্রচারের (কিংবা দুয়েরই) লড়াইয়ের দিকে চালিত হতে বাধ্য হব।

    প্লেটোর কাছে এই প্রশ্নটির কোনো বাস্তবিক অস্তিত্বই ছিল না। নাটকের খাতিরে তিনি থ্রাস্যুমাখোসের অবস্থানকে বেশ জোরালোভাবেই উপস্থিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই যুক্তির অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞান, আর তাই এর বিপক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তিনি চরম পক্ষপাতদুষ্ট অবিচারের আশ্রয় নিয়েছেন। প্লেটোর অটল বিশ্বাস ছিল, যে ‘পরম কল্যাণ’ (the Good) বলে একটি বস্তু নিশ্চিতভাবেই রয়েছে এবং তার স্বরূপ নির্ধারণ করা সম্ভব; মানুষ যখন এ নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে, তখন অন্তত একটি পক্ষ নিশ্চিতভাবেই কোনো বৌদ্ধিক ভ্রান্তিতে ভুগছে—ঠিক যেমনটি ঘটে কোনো বাস্তব তথ্যের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক মতানৈক্যের বেলাতেও।

    প্লেটো ও থ্রাস্যুমাখোসের মধ্যকার এই ফারাকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দর্শনের ঐতিহাসিকের কাজ একে কেবল চিহ্নিত করা, কোনো ফয়সালা দেওয়া নয়। প্লেটোর বিশ্বাস – তাঁর কল্পিত আদর্শ ‘রিপাবলিক’ বা সাধারণতন্ত্রটি শুভ, একথা তিনি প্রমাণ করতে পারেন; ওদিকে নীতিশাস্ত্রের বস্তুনিষ্ঠায় আস্থাশীল কোনো গণতন্ত্রী হয়তো ভাববেন, যে তিনি রিপাবলিককে অশুভ বা মন্দ বলে প্রমাণ করে ছাড়বেন; কিন্তু থ্রাস্যুমাখোসের সঙ্গে যিনি একমত, তিনি সটান বলবেন: “প্রমাণ করা বা নাকচ করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না; আসল কথা হল, প্লেটো যে ধরনের রাষ্ট্র চেয়েছেন তা আপনার মনে ধরে কি না। যদি ধরে, তবে তা আপনার জন্য ভালো; যদি না ধরে, তবে মন্দ। আর যদি অনেকের মনে ধরে আবার অনেকের না ধরে, তবে যুক্তিতর্ক দিয়ে তার নিষ্পত্তি করা অসম্ভব—সে নিষ্পত্তি হতে পারে কেবল বলপ্রয়োগে, তা প্রত্যক্ষই হোক বা প্রচ্ছন্ন।” দর্শনের ময়দানে এটি এমন এক অমীমাংসিত প্রশ্ন, যা আজও খোলা পড়ে আছে; বিবদমান উভয় তরফেই এমন সব মানুষ আছেন যাঁরা গভীর শ্রদ্ধার পাত্র। তবে দীর্ঘকাল ধরে প্লেটোর সওয়াল করা মতামতটিই দুনিয়ায় প্রায় অবিসংবাদিত হয়ে আসন গেঁড়ে বসেছিল।

    তদুপরি এ কথাও খেয়াল করা দরকার – কোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের জায়গায় সর্বসম্মত মতামতকে (consensus of opinion) বসিয়ে দেওয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গির এমন কিছু পরিণতি আছে, যা খুব কম মানুষই মেনে নেবেন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গ্যালিলিওর মতো নতুন পথের সন্ধানীদের কথাই ধরা যাক—যাঁরা এমন এক মতের সপক্ষে দাঁড়ান, যার সঙ্গে শুরুতে প্রায় কেউই একমত হতে চান না, অথচ শেষমেশ যিনি প্রায় প্রত্যেকেরই সমর্থন আদায় করে ছাড়েন—তাঁদের সম্পর্কে আমরা কী বলব? তাঁরা তো এই সমর্থন অর্জন করেন নিখাদ যুক্তির জোরে; কোনো আবেগমথিত আবেদন, রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা বা পেশীশক্তি খাটিয়ে নয়। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় – জনমতের বাইরেও অন্য কোনো নিরপেক্ষ বিচার্য মাপকাঠি বর্তমান। নীতিশাস্ত্রের জগতেও মহান ধর্মগুরুদের ক্ষেত্রে এমন একটি সমান্তরাল দৃশ্য চোখে পড়ে। খ্রিস্ট যেমন শিখিয়েছিলেন – সাবাথ বা বিশ্রামের পবিত্র দিনে পেট ভরাতে শিষ থেকে শস্যদানা ছিঁড়ে খাওয়া পাপ নয়, কিন্তু নিজের শত্রুকে মনে মনে ঘৃণা করা মহাপাপ। নীতিশাস্ত্রের এই ধরনের বৈপ্লবিক সংস্কার নিশ্চিতভাবেই সংখ্যাগুরু মতামতের অতিরিক্ত কোনো ভিন্ন মানদণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে; তবে সে মানদণ্ডটি যা-ই হোক না কেন, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মতো কোনো বস্তুনিষ্ঠ পার্থিব তথ্য (objective fact) তো নয়। সমস্যাটি বাস্তবিকই প্যাঁচালো, আর এর সহজ সমাধান করে ফেলতে পারবো – এমন বড়াই আমি করছি না। আপাতত শুধু খাতায় নোট নিয়ে রাখাই ভালো।

    আধুনিক যুগের কল্পিত সব ইউটোপিয়াগুলির মতো নয় – প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-কে সম্ভবত রক্তমাংসের বুনিয়াদ দিয়ে সত্যিই বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প ছিল। আমাদের চোখে প্রস্তাবটি যতখানি আজগুবি বা অসম্ভব ঠেকে, ততটা কিন্তু তা ছিল না। এর বহু বিধিনিষেধই—এমনকি যার কয়েকটিকে আমাদের ঘোরতর অবাস্তব বলে মনে হতে পারে—স্পার্টায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল। দার্শনিকদের শাসন পত্তনের চেষ্টা ইতিপূর্বে পিথাগোরাস করেছিলেন; স্বয়ং প্লেটোর সময়েও, প্লেটো যখন সিসিলি ও দক্ষিণ ইতালিতে ভ্রমণ করতে যান, তারাস (আধুনিক তারান্তো) নগরীতে পিথাগোরীয় দার্শনিক আর্খ্যুতাস (Ἀρχύτας, লাতিন Archytas) রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে ভালোই প্রভাবশালী ছিলেন। কোনো মুনি-ঋষিকে ডেকে এনে রাষ্ট্রের আইনকানুন তৈরি করানো সে যুগে এক অতি পরিচিত দস্তুর ছিল—এথেন্সের হয়ে যেমনটি সোলন করেছিলেন, কিংবা থুরিয়াই নগরীর হয়ে প্রোতাগোরাস। তদুপরি, সেকালের উপনিবেশগুলি মাতৃনগরীর খবরদারি থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল; ফলে একদল প্লেটোপন্থীর পক্ষে স্পেন বা গলের উপকূলভাগে এই ‘রিপাবলিক’ গড়ে তোলা মোটেও অলীক কল্পনা ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত, ভাগ্যের পরিহাসে প্লেটো গিয়ে আছড়ে পড়লেন স্যুরাকিউজে—এক বিরাট বাণিজ্যনগরী, যা তখন কার্থেজের সঙ্গে প্রাণঘাতী যুদ্ধে মত্ত; এমন এক হিংসুটে ডামাডোলে কোনো দার্শনিকের পক্ষেই কিছু করে ওঠা সম্ভব ছিল না। আর ঠিক তার পরের প্রজন্মে ম্যাসিডোনিয়ার দাপুটে উত্থান সমস্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে এক লহমায় সেকেলে আর অপ্রাসঙ্গিক করে দিল, এবং অতিক্ষুদ্র মাপকাঠিতে রাজনীতির যে কোনো পরীক্ষানিরীক্ষাকে পরিণত করল স্রেফ অর্থহীন পণ্ডশ্রমে।


    পরের পর্ব: ধারণার তত্ত্ব


    — বার্ট্রান্ড রাসেল
    A History of Western Philosophy বইটির প্যালারাম-কৃত অনুবাদ



    টীকা-টিপ্পনীর ব্র্যাকেটের মধ্যে অক্ষর থাকলে তা রাসেলের আসল ফুটনোট, সংখ্যা থাকলে তা অনুবাদকের পাকামো। ফুটনোট কণ্টকিত লেখাটির জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী, তবে ছবি-ছাবা দিয়ে সেই দোষ স্খালনের একটা চেষ্টা করা হয়েছে।


     

    [ক] “এই সব নারীরা হবেন এই পুরুষদের যৌথ পত্নী—ব্যতিক্রমহীনভাবে, এবং কারুরই নিজস্ব কোনো স্ত্রী থাকবে না।”
    [খ] দ্রষ্টব্য: Henry C. Lea, A History of Sacerdotal Celibacy

     

    [১] ষোড়শ শতক নাগাদ, ইউরোপের বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের (সবই খ্রিস্টধর্মের নানা ভাগ) পুরুতঠাকুররা লাতিন আমেরিকার “অসভ্য, শিশুসুলভ, নির্বোধ” জনগড্ডলকে যিশুর এবং ‘সভ্যতার’ ছত্রছায়ায় আনার উদ্দেশ্যে দলে দলে অতলান্তিক পেরিয়েছিলেন। ১৫১৫ সালে স্পেনের কংক্যুইস্তাদর-রা আবিষ্কার করার পর ১৫৯০-এর মধ্যে যে অঞ্চলে প্রায় দশটি শহর আর চল্লিশটির ওপর কলোনি তৈরি হয়, সেইটেই আজকের প্যারাগুয়ে। ১৬০৯ সাল থেকে ১৭৬৭-তে উৎখাত হওয়া অবধি জেস্যুইটরা ছোট ছোট জনপদ গড়ে তোলে, যা চলতো আমাদের ‘গ্রাম-সমাজ’-এর ধাঁচে। খ্রিস্টান কম্যুনিজ়মের এ এক নামকরা উদাহরণ। এদের নাম ছিল রেদুক্‌থিওনেস (reducciones)। মূল জনগোষ্ঠী ছিল স্থানীয় গুয়ারানি সম্প্রদায়, কিন্তু তাদের ওপর সম্পূর্ণ ক্ষমতায় ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা রাখতেন মুষ্টিমেয় শিক্ষিত জেস্যুইট অভিজাতবর্গ, মূলত ধর্মযাজকরা।

    [২] রাসেল যদিও harmony শব্দটি ব্যবহার করেছেন—যা খুব ভুলও নয়—আসলে বোঝাতে চেয়েছেন scale। পশ্চিমা সঙ্গীতকলায় যাকে ‘স্কেল’ বলে, তার সঙ্গে আমাদের ‘ঠাট’-এর মিল সবচেয়ে বেশি। কোনো রাগ গাওয়ার সময় খাদ থেকে চড়ায় ওঠার সময় যে সুরগুলি লাগে, তাদের একসঙ্গে বলে স্কেল। তাহলে ‘আরোহ’ নয় কেন? কারণ আমাদের রাগের চলনে আরোহ-অবরোহতেও কিছু সুর-সমষ্টি এমনভাবে ব্যবহার হতে পারে, যাতে একই স্বর একাধিকবার লাগে (‘পকড়’ নিয়ে চাপান-উতোরে আর ঢুকছি না)। যে আপাত-সুরের ‘সলফেজ’ নিয়মে আমাদের সাত-সুর, তা মানুষের কানের গঠন আর তার হার্মোনিক্‌স-ধরতে পারার ভিত্তিতে তৈরি, নেহাতই জৈবসূত্রে প্রাপ্ত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাওয়া নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের ওপর একে ম্যাপ করলে, তখন এই একটি করে ‘স্কেল’ অনেকরকম ‘মোড’-এ ভেঙে যাবে। নীচের টেবিলে সহজে বোঝার জন্যে কিছু তুলনা দেওয়া হল, ঠিকই, কিন্তু মনে রাখা দরকার, এ সবই একই নামে আধুনিক সংস্করণ। প্রাচীন পৃথিবী রেলপথ আর ইন্টারনেট সিয়ে ত আর যুক্ত ছিল না – নানা অঞ্চলে নানা জিনিসকে একই নামে ডাকা হত।




    প্রাচীন মিউজিক স্কেলহিন্দুস্থানী ঠাটকর্ণাটক
    লিডিয়ানইমনকল্যাণী
    আয়োনিয়ানবিলাবলধীর শঙ্করবর্ণম (মেলাকার্টা ২৯)
    ডোরিয়ানকাফিখরহরপ্রিয়া
    ফ্রিজিয়ানভৈরবীহনুমাটোড়ী বা টোড়ী


     

    পরের পর্ব: ধারণার তত্ত্ব
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ৭৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন।