এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  রাজনীতি

  • পকেটমারি থেকে ভোটমারি

    উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
    আলোচনা | রাজনীতি | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৯ বার পঠিত
  • কলকাতার গৌরব নিয়ে কথা উঠলে রসগোল্লা, কফি ঘর আর বইপাড়ার নাম আসে। কিন্তু সেই তালিকা থেকে একটি নিজস্ব হাতের কাজকে ইচ্ছে করেই বাদ দেওয়া হয় — কলকাতার পকেটমার। শান্তিপুরের তাঁত বা কৃষ্ণনগরের পুতুলের মতো একসময় কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় এই বিদ্যার চাষ হত। এখন তা প্রায় লুপ্ত।

    অথচ বাংলা গল্পে এই চরিত্র কখনও হারায়নি। বরং আয়না হয়ে ফিরে এসেছে।

    প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা যখন ট্রামের ভিড়ে কলকাতার নানা ফন্দির কথা বলেন, সেখানে ভিড়ের মধ্যে হাত চালানোর কৌশল নিয়ে টিপ্পনী থাকে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা আর প্যালারামের কলকাতায় বাসে ট্রামে উঠলেই পকেট সামলানোর উপদেশ আসে, কারণ টেনিদার ভাষায় কলকাতায় দুই ধরনের মানুষ পকেটে হাত দেয়, প্রেমিক ভুল পকেটে, পকেটমার ঠিক পকেটে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ যখন পার্ক স্ট্রিট বা চৌরঙ্গীর ভিড়ে অপরাধের জাল খোঁজে, সেখানে পকেটমারকে দেখা যায় শহরের সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে চতুর অপরাধী হিসেবে, যে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে চলে যায়, কিন্তু সত্য গোপন করে না।

    বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটকে এই টাইপ আরও স্পষ্ট। সত্তর আশির দশকের কলকাতা-কেন্দ্রিক ছবিতে, মঞ্চের ভিড়ের দৃশ্যে পকেটমার একটি পরিচিত মুখ — রোগা, পাজামা পরা, চোখে ভয় আর বুদ্ধি একসঙ্গে। সে সমাজের তলার মানুষ, যার কাছে অপরাধ পেশা নয়, টিকে থাকার কৌশল। বনফুলের অণুগল্পের প্রান্তিক মানুষ, শিবরামের কলকাতার হালচাল, মুজতবা আলীর ভবঘুরে কথকতা আর সমরেশ বসুর শ্রমজীবী পাড়া — এই চার ধারাতেই সেই টিকে থাকার কৌশল নিয়ে লেখা হয়েছে, যার একটি চেহারা পকেটমার।

    এই প্রসঙ্গে একটি মুখে মুখে ফেরা কাহিনি মনে পড়ে। চৌরঙ্গীতে ছবির কাজ চলছে। যাঁকে সকলে মানিকদা বলেন, তিনি ক্যামেরায় ব্যস্ত। ভিড়, আলো, পাহারার ভিড়। কাজের শেষে দেখা গেল বুক পকেট থেকে কলমটি নেই, যে কলমে চিত্রনাট্যের খসড়া লেখা হত। খবর লালবাজারে পৌঁছালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এক মানুষকে ধরে আনা হয়। জানতে চাওয়া হয়েছিল, এত ভিড়, এত পাহারার মধ্যে কাজটি কীভাবে হল। বলা হয়েছিল, দুঃখের কথা হল, সকলে সত্যজিৎ রায়ের শিল্প দেখেন, এই হাতেরকাজ এর কদর কেউ করেন না।

    এই জনশ্রুত কথোপকথনের প্রমাণ মেলেনি, তবে এর ভেতরের বিষাদটি সত্য। এটি কেবল পকেটমারের বিষাদ নয়, প্রান্তিক কারিগরের বিষাদ। এই বিষাদ এখন নতুন প্রজন্মের গলায় শোনা যায়।

    একটি শব্দ নিয়ে বড় গোলমাল তৈরি হয়েছে। 'ফ্যাসিবাদ' শব্দটি এতবার, এত হালকাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে, যখন আসল চেহারাটি নখ, দাঁত, মুখ নিয়ে সামনে আসে, তখন তাকে চেনার ভাষা থাকে না। প্রতিটি লাঠি, প্রতিটি কারচুপিকে এক নামে ডাকার ফলে শব্দটি ফুলে গেছে। ফলে বাবরি থেকে গুজরাট থেকে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন পর্যন্ত যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় একটি সম্প্রদায়কে 'অপর' বানানো হচ্ছে, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, হিংসাকে উৎসব বানানো হচ্ছে, আর সেই উৎসবের আড়ালে বিপুল লুট চালানো হচ্ছে, তাকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না।

    আজকের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তিনটি কৌশলের জোড় হিসেবে দেখা যেতে পারে।

    প্রথমটি মনের কৌশল। বাস্তব ঘটনাকে ধোঁয়ায় ঢেকে দেওয়া হয়। একটি অংশকে বোঝানো হয়, আপাতত একটি শক্তি দিয়ে অন্য শক্তিকে ঠেকানো দরকার। মনের ভেতরে 'অপর' তৈরি হয়।

    দ্বিতীয়টি দেহের কৌশল। প্রায় আড়াই লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী, সাঁজোয়া গাড়ি, ভিন রাজ্য থেকে আনা বিশেষ বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোটকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে তোলা হয়। শরীরকে ভয় দেখানো হয়, যাতে সারিতে দাঁড়ানোর সাহস কমে যায়।

    তৃতীয়টি গণনার কৌশল। নব্বই লক্ষ নাম বাদ, পাঁচ লক্ষ নাম যোগ, ভবানীপুরের মতো কেন্দ্রে বাইশ শতাংশ ভোটার কমে যাওয়া। যে কেন্দ্রে একটি দল বাইশ শতাংশ পিছিয়ে ছিল, সেখানে তেত্রিশ শতাংশ এগিয়ে যাওয়া দেখানো হয়। অঙ্ক বলছে, এটি এলোমেলো ভুল নয়, বেছে বেছে বাদ দেওয়া, যা মুসলমান-প্রধান এলাকা, দলিত সমাজ ও মহিলা ভোটারের ওপর বেশি পড়েছে।

    এই তিনটি মিলে আজকের বড় পকেটমারি — প্রথমে মন ঘোরানো, তারপর দেহ চেপে ধরা, তারপর গুনতে গুনতে ফাঁকা করা।

    এই প্রক্রিয়াকে বোঝার জন্য কারাগারে বসে লেখা একটি বইয়ের কথা মনে রাখা দরকার। ইতালির এক চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি, মুসোলিনির জেলে বসে ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে যে খাতাগুলো লিখেছিলেন, সেখানে একটি কথা বলেছিলেন। ক্ষমতা কেবল লাঠি আর বন্দুক দিয়ে টেকে না। শাসক শ্রেণি পাঠশালা, ধর্ম, সংবাদ আর সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে মানুষের সম্মতি আদায় করে। মানুষ তখন নিজে থেকেই শাসকের ভাবনাকে নিজের ভাবনা বলে ভাবে। একে তিনি বলেছিলেন সাংস্কৃতিক আধিপত্য। আর এই আধিপত্য ভাঙতে দরকার পাল্টা আধিপত্য — নিপীড়িত মানুষের নিজস্ব ভাব, ভাষা, যুক্তি তৈরি করা।

    ভারতের বর্তমান সময় সেই মাঝের সময়।

    এখানেই পুরনো ও নতুন পকেটমারের তফাত। পুরনো ওস্তাদের অলিখিত নিয়ম ছিল — যার আছে তার থেকে নেওয়া, যার নেই তার থেকে নয়। এক ধরনের শ্রেণিবোধ। নতুন কর্পোরেট পকেটমারের নিয়ম উল্টো — যার থালায় কম ভাত, তার থালা থেকেই তুলে নেওয়া হয়, আর তাকে উন্নয়ন বলা হয়। আগে পার্স, ঘড়ি নেওয়া হত, এখন ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব, প্রশ্নপত্র নেওয়া হয়। আগে পুলিশ ধরত, এখন পুলিশ পাহারা দেয়।

    আগে পকেটমার ধরা পড়লে রাস্তায় মার পড়ত, এখন বড় পকেটমার ধরা পড়লে রাস্তায় ফুল পড়ে।

    প্রতিবাদের ধরনও বদলেছে। নতুন প্রজন্ম মিছিলের বদলে রসিকতা, স্লোগানের বদলে ব্যঙ্গকে অস্ত্র করেছে। দেওয়ালে 'পকেট সামলাও' লিখে দেওয়া গ্রামশির ভাষায় পাল্টা আধিপত্যের চেষ্টা — মনের দখল ভাঙার চেষ্টা।

    মাঝে মাঝে পকেটে হাত দিয়ে দেখা দরকার, মানিকদার দেওয়া সাহসের কলমটি এখনও আছে কিনা, যে কলমে প্রশ্ন লেখা যায়, আর ফ্যাসিবাদের নখ-দাঁতের ছবি আঁকা যায়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন।