রিফাত চৌধুরী একজন অ-নাগরিক রিফাত চৌধুরীর সরকারি সহায়তা প্রত্যাখ্যানের বক্তব্যকে নিছক রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার তাৎপর্যকে সীমিত করে ফেলা হয়। বরং তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি আবর্তিত হয়েছে রাষ্ট্র, নাগরিক ও শ্রমের পারস্পরিক সম্পর্ককে ঘিরে। রাষ্ট্রীয় তহবিল নিজস্ব অধিকারে স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সম্পদ নয়; একটি আধুনিক রাষ্ট্র তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত কর এবং অন্যান্য গণসম্পদ ব্যবহার করে। ফলে, কোনো নাগরিককে রাষ্ট্রের ‘সহায়তা’ প্রদানকে কেবল দয়া বা অনুগ্রহের প্রকাশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই; একে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যেও অনুধাবন করা যায়। ঠিক এখানেই রিফাতের আপত্তি একটি নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: যে সমাজের মানুষের শ্রমের মধ্য দিয়ে সম্পদ সৃষ্টি হয়, সেই সমাজেরই একজন সাংস্কৃতিক শ্রমিকের প্রয়োজনকে কেন কেবল দয়া বা করুণার ভাষায় প্রকাশ করতে হবে?
প্রতি-সংস্কৃতি: বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তিব্যবস্থা
প্রতি-সংস্কৃতিকে (Counterculture) প্রায়শই আধিপত্যশীল সংস্কৃতির বিরোধিতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু নিছক বিরোধিতাই যথেষ্ট নয়। বরং আরও কার্যকর সংজ্ঞা হলো—প্রতি-সংস্কৃতি এমন এক বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তিব্যবস্থা নির্মাণের প্রচেষ্টা, যা মূল্যবোধ, পরিচয়, সম্প্রদায়, আচরণ ও অর্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন এক পদ্ধতির প্রস্তাব করে।
অতএব, প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে রিফাত চৌধুরী রাষ্ট্র, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ কিংবা আধিপত্যশীল সামাজিক ব্যবস্থার ‘বিরোধী’ কি না। এর চেয়ে অধিক অনুসন্ধানযোগ্য প্রশ্ন হলো, তাঁর জীবনযাপন ও বক্তব্যের মধ্যে ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক শ্রম, সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্ককে কল্পনা করার কোনো বিকল্প পদ্ধতি প্রতিফলিত হয় কি না।
এ প্রসঙ্গে সরকারি সহায়তা প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ—তবে এই কারণে নয় যে প্রত্যাখ্যানমাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি-সংস্কৃতির পরিচায়ক হয়ে ওঠে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলার আধা-গুপ্ত গূঢ় প্রতি-সংস্কৃতি বলতে বোঝানো হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভিত্তিক, সমন্বয়বাদী ও প্রচলিত ধর্মীয় মতাদর্শের বাইরে বিকশিত এক শক্তিশালী মরমি সম্প্রদায়-পরিমণ্ডল; যার সর্বাধিক পরিচিত ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাউল ও ফকির সম্প্রদায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এসব ধারা মূলধারার ধর্মীয় অনুশাসনের কঠোর কাঠামো, জাতপাতের স্তরবিন্যাস এবং সামাজিক গোঁড়ামিকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা: এক বিকল্প সামাজিক যুক্তিব্যবস্থা
প্রতি-সংস্কৃতি (Counterculture) শব্দটির উদ্ভব ঘটেছিল একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে; কিন্তু ধারণা হিসেবে এর ব্যাপ্তি কোনো একটি প্রজন্মের গণ্ডি বহুদূর অতিক্রম করেছে। পাশ্চাত্যের প্রচলিত ঐতিহাসিক বয়ানে প্রতি-সংস্কৃতি বিশেষত ষাট ও সত্তরের দশকের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ সময়ে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক রীতিনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব, ভোগবাদী পুঁজিবাদ, প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো এবং যুদ্ধোত্তর সমাজের সাংস্কৃতিক গোঁড়ামিকে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ওই সময়ের যুব আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী রাজনীতি, আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীতধারা, যৌনতা নিয়ে প্রচলিত বিধিনিষেধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা কিংবা মাদককেন্দ্রিক প্রতি-সংস্কৃতি—সবই আধিপত্যশীল ব্যবস্থাকে জীবনযাপনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করার বৃহত্তর প্রবণতার দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছিল।
বাংলা: লোকায়ত প্রতি-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক ধারা
বাংলায় প্রতি-সংস্কৃতির ইতিহাস ষাটের দশকের পাশ্চাত্য প্রতি-সংস্কৃতির আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিভাষায় ‘প্রতি-সংস্কৃতি’ শব্দটি প্রবেশ করার বহু আগে থেকেই বাংলায় এমন সব ভিন্নমতাবলম্বী ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠী এবং আন্দোলনের উদ্ভব ঘটেছে, যারা কর্তৃত্ব, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের আধিপত্যশীল কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব আন্দোলনের কোনো কোনোটি মূলধারার ধর্মীয় অনুশাসন—অভিজাত ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্তৃত্ব এবং প্রথাগত ইসলামী ধর্মীয় নেতৃত্বের অনুশাসন—উভয়েরই বিরোধিতা করেছে। পাশ্চাত্যে প্রতি-সংস্কৃতির ধারণাটি সুসংজ্ঞায়িত হওয়ার বহু আগেই এসব গোষ্ঠী নিজ নিজ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রতি-সংস্কৃতির ভূমিকা পালন করেছে।
প্রতি-সংস্কৃতির ইতিহাস এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার ধারাগুলো অনুসন্ধান করলে বাংলার গূঢ় ও অন্তঃসলিলা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে পরিশীলিত আধ্যাত্মিক প্রতি-সংস্কৃতিগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি উত্থাপন করে।
এই ইতিহাস কেবল হিন্দু ঐতিহ্যের নয়, এককভাবে মুসলিম ঐতিহ্যেরও নয়; একই ভাবে একে শুধু ব্রিটিশ রাজ কিংবা তার মধ্যস্থতাকারীদের—যাঁদের লেখক ‘ম্যাকলের সন্তান’ (Macaulay’s children) বলে অভিহিত করেছেন—ইতিহাসের মধ্যেও সীমাবদ্ধ করা যায় না। বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্বে বাংলার লোকায়ত আন্দোলনগুলো ব্রাহ্মণ্যবাদী স্তরবিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্তৃত্ব, জাতপাতভিত্তিক বিভাজন, প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামী শরিয়া কে পূঁজি করে (মুনাফেক / ফাসেক /তাগুদ ) দের অপশাসন এর বিরুদ্ধে এবং প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যবর্তী পরিসরে বিকশিত হয়েছে। নিকট অতীতে ( ব্রিটিশ রাজের অব্যবহিত সময় পূর্বে আর পরে ) লিখিত ইতিহাসে এতদসকল লোকায়ত প্রতি-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক ধারায় ( ভারতীয় গুরুমুখি বিদ্যার বেঙ্গলের সুফি অর্ডার ও গুরুবাদের একত্রে রূপান্তর) ‘পীরবাদের স্থান’-কে অস্বীকার করার আজ আর কোন উপায় নাই।
বাউল-ফকির ঐতিহ্য, নাথ ও সহজিয়া ধারা, কর্তাভজা, কিশোরীভজা, সাহেবধনী, মাদারিয়া, আপা পন্থী, খুশি বিশ্বাসী এবং পাগলপন্থী সম্প্রদায় ও আন্দোলনগুলো ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক, ধর্মতাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। অতএব, এসব ধারাকে কোনো একক মতাদর্শিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। তা সত্ত্বেও, এদের অনেকগুলোর মধ্যে একটি পুনরাবৃত্ত প্রবণতা লক্ষ করা যায়: আধিপত্যশীল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে আধ্যাত্মিক সাধনা, সম্প্রদায়গত সংহতি, জ্ঞানচর্চা ও আত্মপরিচয় নির্মাণের বিকল্প পরিসর গড়ে তোলা। এই প্রবণতাই বাংলার লোকায়ত প্রতি-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।
ঐতিহাসিক বাংলায় গোঁড়ামিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (Orthodox Control Mechanism) ছিল নিপীড়নমূলক এক ত্রিস্তরীয় ক্ষমতাকাঠামো, যা তিনটি প্রধান শক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত হতো:
১. ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপাতের ব্যবস্থা (The Brahminical Caste System): জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের শুদ্ধতা, পেশা এবং মানবিক মর্যাদা নির্ধারণকারী এক কঠোর স্তরবিন্যাস।
২. প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামী শরিয়াভিত্তিক শাসন (Institutional Islamic Sharia): বিভিন্ন নবাব ও শাসকের আমলে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিধিবিধান, যার মাধ্যমে নৈতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
৩. ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ (Colonial Capitalism): ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা, যা কর আদায় ও নীল চাষের স্বার্থে মানুষকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যন্ত্রাংশে পরিণত করেছিল।
গূঢ় সাধনানির্ভর সম্প্রদায়গুলো—বাউল, ফকির, কর্তাভজা ও বৈষ্ণব সহজিয়ারা—এই ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলে নেয়নি। পরিবর্তে, তারা চর্চা করেছিল আমূল ও অসমমিত প্রতিরোধকৌশল (Radical, Asymmetrical Subversion)—অর্থাৎ, প্রচলিত ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে, ভেতর থেকেই তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ও দুর্বল করার প্রচেষ্টা। এ লক্ষ্যে তারা অবলম্বন করেছিল পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কৌশল সাঁই চাইলে পরবর্তী কোন অধ্যায়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা সম্ভব হবে।
ঔপনিবেশিক আধুনিকতা বাংলার এই লোকায়ত সাংস্কৃতিক গঠনগুলোকে বিলুপ্ত করতে পারেনি।
এই অর্থে, এগুলোকে লোকায়ত প্রতি-সংস্কৃতি (Vernacular Countercultures) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর কারণ এই নয় যে, এসব ধারা আবশ্যিকভাবেই রাজনৈতিক প্রতিরোধের আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার করেছিল; বরং এদের কোনো কোনোটি এমন বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তিব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল, যার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি কর্তৃত্ব, জাতপাত, ধর্মীয় জ্ঞান, দেহ, লিঙ্গ, সম্প্রদায় ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ভিন্নতর সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিল।
এবার দেখা যাক, শাবাগে রিফাত চৌধুরীর সমকালীন ‘অ-নাগরিক’ চর্চা কীভাবে ব্রিটিশ রাজের আগে ও পরবর্তী সময়ের বাংলার গূঢ় সাধনাধারাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এই সংযোগের ভিত্তি মূলত কাঠামোগত, অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং অনেকটাই অজ্ঞাত বা অন্তরালে থাকা (Incognito)। বিশেষভাবে বলতে গেলে, বাংলার আধা-গুপ্ত গূঢ় সাধনানির্ভর সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে এই সম্পর্কটি প্রধানত কাঠামোগত—এমন এক সম্পর্ক, যা প্রচলিত জ্ঞানচর্চা কিংবা বৌদ্ধিক অনুধাবনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বাংলার ঐতিহাসিক ভিন্নমতাবলম্বী ধারাগুলো বারবার এমন একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে: আধিপত্যশীল কর্তৃত্বের ভাষা ও ব্যাকরণের বাইরে একজন মানুষ কীভাবে নিজের পরিচয় এবং আপনত্বের পরিসর নির্মাণ করতে পারে?
রিফাতের সমকালীন সংকট একই মৌলিক প্রশ্নের একটি ভিন্ন রূপ সামনে আনে: কোনো সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ যখন একজন মানুষের যাপিত সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারে না, তখন সেই সমাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অর্থ কী?
বাউল কিংবা ফকির আধুনিক আমলাতান্ত্রিক অর্থে ‘অ-নাগরিক’ হয়ে ওঠেননি। একইভাবে, রিফাতও আধুনিক যুগের কোনো বাউল বা ফকির নন। তাঁদের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি মৌলিকভাবেই ভিন্ন। রিফাতের নিজস্ব সংকট সমকালীন বাস্তবতায় মানুষের এক গভীর সংকটের রূপ ধারণ করেছে—পরিচয়ের সংকট এবং ব্যক্তি-অস্তিত্বের সংকট।
তবু প্রতি-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি স্ববিরোধিতা রয়েছে
প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধের সূচনা হয়, শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিরোধকেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা আত্মসাৎ করে নিতে পারে। বিদ্রোহী জীবনশৈলী একসময় ফ্যাশনে পরিণত হতে পারে; আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীত বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ নিতে পারে; সাইকেডেলিক চিত্রকল্প বিজ্ঞাপনের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে; এমনকি ভোগবাদবিরোধী নন্দনতত্ত্বও বাজারজাত পণ্যে পরিণত হতে পারে।
অতএব, প্রতি-সংস্কৃতি কেবল দমন-পীড়নের মাধ্যমেই পরাজিত হয় না; প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে তার সফল অন্তর্ভুক্তি ও আত্মসাৎকরণের মাধ্যমেও তার স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট হতে পারে।
এটি কি কোনো বিকল্প সামাজিক যুক্তিব্যবস্থার উন্মোচন করে?
রিফাতের অবস্থানকে যখন বাংলার লোকায়ত প্রতি-ঐতিহ্যগুলোর পাশে রেখে বিবেচনা করা হয়, তখন প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর কারণ এই নয় যে, বংশপরম্পরা বা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের সূত্রে তিনি বাউল, ফকির, কর্তাভজা, সাহেবধনী, মাদারিয়া কিংবা অন্য কোনো ভিন্নমতাবলম্বী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। বরং এর কারণ হলো, বাংলাও বারবার এমন সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টি করেছে, যেখানে কর্তৃত্ব, পরিচয় ও আপনত্বের আধিপত্যশীল কাঠামোগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে কিংবা নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
রিফাতের ভাষায়, “চিকিৎসা ব্যবস্থার চিকিৎসা দরকার।” (The healthcare system needs healing.)
এই বক্তব্য কৌতূহলী পাঠককে একটি উক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: “দরিদ্র দেশ বলে কিছু নেই; আছে কেবল ব্যর্থ সম্পদ-ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা।” অর্থাৎ, কোনো সমাজের সংকটকে কেবল সম্পদের অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; সেই সম্পদ কীভাবে পরিচালিত ও বণ্টিত হচ্ছে, তার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদ দারন আকেমোগলু এবং জেমস এ. রবিনসন তাঁদের বিখ্যাত বই "Why Nations Fail"-এ দেখিয়েছেন কীভাবে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে সম্পদশালী দেশগুলোও দরিদ্র থেকে যায়।
এই কারণেই প্রতি-সংস্কৃতিকে শুধু মূলধারার বিরোধিতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যথেষ্ট নয়। বরং আরও কার্যকর সংজ্ঞা হলো—একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তিব্যবস্থার নির্মাণ।
রিফাত চৌধুরীকে ঘিরে আলোচনার তাৎপর্যও ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়।
প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থে রিফাত প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ‘বিরোধী’ কি না, সেই প্রশ্ন তোলার চেয়ে অধিক ফলপ্রসূ হবে অনুসন্ধান করা—তাঁর জীবনযাপন, শিল্পচর্চা এবং সাম্প্রতিক জনসমক্ষে প্রকাশিত বক্তব্যগুলো সমকালীন সামাজিক অস্তিত্বকে সংগঠিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোনো বিকল্প সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয় কি না ?
যখন একজন শিল্পী নাগরিকত্বের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রীয় সহায়তাকে নিছক অনুগ্রহ হিসেবে দেখতে অস্বীকার করেন, নিজের সাংস্কৃতিক শ্রমের মূল্য ও মর্যাদার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গ্রহণের ধারণা অকুণ্ঠভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেকে ‘আনসিটিজেন’ বা ‘নন-সিটিজেন’—অর্থাৎ, ‘অ-নাগরিক’—হিসেবে অভিহিত করেন, তখন কী ঘটে?
প্রশ্নটি এই নয় যে, এমন অবস্থান বা আচরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে প্রতি-সংস্কৃতির প্রতিনিধি করে তোলে কি না। তা করে না। বরং আরও কার্যকর সংজ্ঞা হলো—একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তিব্যবস্থার নির্মাণ; পরিচয়, মূল্যবোধ, সম্প্রদায়, শ্রম, আকাঙ্ক্ষা ও মানব-অস্তিত্বকে নতুনভাবে কল্পনা করার একটি বিকল্প পদ্ধতি।
অতএব, পাশ্চাত্যের প্রতি-সংস্কৃতি থেকে বাংলার লোকায়ত ভিন্নমতাবলম্বী ঐতিহ্য এবং সেখান থেকে রিফাত চৌধুরীর সমকালীন সাংস্কৃতিক অবস্থান পর্যন্ত এই যাত্রা প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারের কোনো সরল ইতিহাস নয়।
এটি বরং একটি প্রশ্নের ইতিহাস:
প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা যখন দাবি করে যে, কীভাবে জীবনযাপন করতে হবে, সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে, কাজ করতে হবে এবং স্বীকৃতি পেতে হবে—তখন সেই ব্যবস্থার বাইরে কিংবা তার প্রান্তসীমায় কী ধরনের জীবন ও অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে?
এই ধারণার সাথে মিল রেখে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল প্যারেন্টি (Michael Parenti) একটি বিখ্যাত বক্তব্য দিয়েছিলেন: "The third world isn't poor. You don't go to poor countries to make money... Most countries are rich, only their people are poor." (তৃতীয় বিশ্ব দরিদ্র নয়। কেউ টাকা কামাতে দরিদ্র দেশে যায় না... বেশিরভাগ দেশই ধনী, কেবল তাদের জনগণ দরিদ্র)।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য থেকে আত্মগঠন
নিজের শ্রমের মূল্য কে নির্ধারণ করে?
(শ্রমের বিলোপ? নাকি পরিবার ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বক্তব্যটি ‘পরিবারের বিলোপ’-এর প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে? আর সেখান থেকে কি ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ’-এর প্রসঙ্গ উঠে আসে?)
এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে একটি বৃহত্তর সংশয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়: তারা কেউই মানুষের সুকুমার বৃত্তি—অর্থাৎ, সূক্ষ্ম অনুভূতিশক্তি (fine sensibility) কিংবা শিল্পসুলভ মানসপ্রবণতা (artistic bent of mind)—লালন ও বিকাশের প্রশ্নটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে আগ্রহী ছিল না।
এই পার্থক্যটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের (Individualism) অর্থকে নতুন করে বিবেচনা করারও সুযোগ করে দেয়।
আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক আত্মস্বার্থের মতাদর্শে পরিণত হতে পারে। চে গুয়েভারাও পুঁজিবাদী ‘স্বনির্মিত মানুষ’-এর (self-made man) মিথের সমালোচনা করেছিলেন এবং প্রকৃত আত্মগঠনকে ব্যক্তিগত উন্নতির একাকী প্রতিযোগিতার পথ থেকে পৃথক করে দেখেছিলেন।
কিন্তু এই ধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিপরীত অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তিসত্তাকেই বিলুপ্ত হতে হবে।
এর আরেকটি সম্ভাবনা রয়েছে: আত্মগঠন (Self-formation)।
এখানে ব্যক্তি নিছক বিচ্ছিন্ন ভোক্তা নন, আবার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার নিষ্ক্রিয় উৎপাদও নন। তিনি নিজের শিক্ষা, আত্মসমীক্ষা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিরন্তর আত্মপুনর্গঠনের জন্য দায়বদ্ধ থাকেন।
এখানেই আত্মশিক্ষা, বৌদ্ধিক অনুসন্ধান এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে আগত ইসলামের ইজতিহাদ (Ijtihad)-এর মতো ধারণাগুলো আলোচনায় প্রবেশ করতে পারে। তবে এগুলোকে সমার্থক ধারণা হিসেবে নয়, বরং এমন স্বতন্ত্র ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যেগুলোতে মানুষকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানকাঠামো ও কর্তৃত্বের সঙ্গে সচেতনভাবে সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়।
চে গুয়েভারা যে আত্মশিক্ষাকে সচেতন আত্মগঠনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেই প্রসঙ্গও এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
এ ধরনের তুলনা আমাদের ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য’ ও ‘সমষ্টিবাদ’-এর সরল দ্বৈতবিরোধ অতিক্রম করার সুযোগ দেয়।
গভীরতর প্রশ্নটি হলো কর্তৃত্বসম্পন্ন আত্মক্রিয়াশীলতা (Agency)।
ব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করে কে?
তাঁকে পরিচয় দেয় কে?
ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বর, ইস্যুকৃত পাসপোর্ট, হোল্ডিং নম্বর, ব্যাংক বিবরণী ও অন্যান্য নথিপত্র—এসবের মাধ্যমে? নাকি ফেসবুক, সংবাদপত্র কিংবা ইলেকট্রনিক সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারব্যবস্থা (Electronic News Gathering—ENG) তাঁর পরিচয় নির্মাণ করে? কে ‘ট্যালেন্ট’ কিংবা কে ইস্লামিস্ট ? (Talent বলতে সাধারণত ক্যামেরার সামনে উপস্থিত কোনো পারফর্মার বা ব্যক্তিত্বকে বোঝানো হয়—যেমন অনুষ্ঠান সঞ্চালক, অভিনেতা, উপস্থাপক, সংবাদ পাঠক কিংবা আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ। ) . Post truth, Internet Hoax - গুজব, AI mediated চিত্রবানি সম্বলিত ধাপ্পাবাজি আর Medial Trial এবং Social Trial ছাড়াও judecial opperession judecial supperession / বিচারিক নিপীড়ন ও ক্ষমতারশালীদের দমন প্রক্রিয়া - সাধারণ নাগরিক ছাড়াও লেখক শিল্পী - সাহিত্যিক, একটিভিস্ট ও বুদ্ধিবৃত্তিকদের আর্থিক, সামাজিক পেশাগত অধিকতর দলন আর নিগ্রহের মাঝে ফেলে দেয়।এদের প্রান সংশয় ঘটে। ( এঁরা প্রান হারালে এদের শুভানুধ্যায়ী বা ভক্তকুল সংবাদ করেন। লোকে জানতে পায়। কিন্তু, সাধারণ মানুষ, সামরিক – বেসামরিক আমলা, বিজ্ঞানি খুন হয়ে গেলে বা গুপ্ত ষড়যন্ত্রের স্বীকার হলে সে খবর ছাপাও হয় না – লোকে জানতেও পারে না। ) এরা ক্রমশ ক্ষমতার বলয় থেকে সরে যেতে থাকে এবং প্রান্তবাসি হিসেবে নিষ্ক্রিয় অবস্থানে চলে যায় বা তাদের ক্ষীণ দূরবর্তী ক্ষুরধার শব্দগুলো আর মানুষের শ্রবণ দৃষ্টিগোচর হতে দেয়া হয় না।
রিফাত চৌধুরী এগুলোর মধ্যবর্তী এক অবস্থানে থেকেই নিজেকে প্রতি উপস্থাপিত করার প্রয়াস পেয়েছেন একজন দলিত মানুষ হিসেবে, যেখানে ‘ ভালো মানুষকে ঝেটিয়ে বিদায় করা “ আর লোক ঠকানো সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় মানুষের সুকুমার বৃত্তির বিকাশকে স্থবির অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়। ঠগিদের দস্যুবৃত্তি অচলাবস্থা সৃষ্টি করলে সরকার বদল নামক রাজনিতিক দলের পরিবর্তন আর হেগিমনি লক্ষ ডলার ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে
সিস্টেমটাকে চালু রাখে। আর ঠগি দস্যুরা নতুন বাতাবরণে আবার ফুলেফেপে ওঠেন এবং পশ্চিমে স্ত্রী সন্তান সহ সে টাকা চালান করে দেন – সেখানে নতুন অস্থান নিয়ে এই লুম্পেন বুর্জুয়া সদর্পে ঘোষণা দেন ‘ I am not a Bangaldeshi”. সাংস্কৃতিক রূপক হিসেবে ‘অ-নাগরিক’ (Non-citizen) এবং বাংলার দেশজ প্রতি-ঐতিহ্যসমূহ এই প্রত্যাখ্যানকে কেবল রাষ্ট্র নামক এজেন্সিটাকে নয়, সার্বিক সিস্টেম বা ব্যবস্থাকেই নাকচ করে দিল।
এই প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, চৌধুরী যখন ‘অ-নাগরিক’ (uncitizen/non-citizen) শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে—বিশেষ করে বর্জন ও সামাজিক প্রান্তিকীকরণের অভিজ্ঞতাকে যেসব ঐতিহাসিক পরিস্থিতি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছে, তার প্রেক্ষাপটে বিচার করলে। বাংলায় প্রতি-সংস্কৃতির (counterculture) ইতিহাস কেবল ১৯৬০-এর দশকের পশ্চিমা প্রতি-সংস্কৃতি দিয়ে শুরু হয়নি। এই ইতিহাস একান্তভাবে হিন্দু বা একান্তভাবে মুসলিম—কোনোটিই নয়। ঔপনিবেশিক আধুনিকতা এই দেশজ ধারাগুলোকে মুছে ফেলতে পারেনি। বাংলার প্রেক্ষাপটে প্রতি-সংস্কৃতির এই বিষয়টি—বা এই বর্জনের বিষয়টি—হিন্দু বর্ণপ্রথায় নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিকভাবে যে নিচু অবস্থানে রাখা হয়েছিল, তার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে; অথবা এটি হতে পারে গোঁড়া ইসলামি ধর্মীয় শাসন এবং স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও জমিদারদের মাধ্যমে চালানো ব্রিটিশ নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ। ব্রিটিশ শাসনামলে স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও জমিদার শ্রেণির শিক্ষিত অংশকে প্রায়শই ‘ব্রিটিশ বণিকদের হাতের পুতুল’ (বেনিয়া পুতুল / বেনা পুতুল ) হিসেবে সমালোচনা করা হতো। এটি মনে রাখা জরুরি যে, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বাংলায় মধ্যবিত্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবী শ্রেণি (যাদের ‘ভদ্রলোক’ বলা হতো) এবং এই অঞ্চলের দেশজ ও মরমীবাদী প্রতি-সংস্কৃতিগুলোর (যেমন—বাউল, ফকির, সহজিয়া ও কর্তভজা সম্প্রদায়) মধ্যে এক গভীর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত বিদ্যমান ছিল। যেখানে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি ব্রিটিশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পরিমার্জিত ধর্মীয় সংস্কার এবং ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বা বৈধতা খুঁজত, সেখানে মরমীবাদী প্রতি-সংস্কৃতিগুলো সম্পূর্ণভাবে এক প্রান্তিক (subaltern) ও ধর্ম-নিরপেক্ষ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো। তারা স্পষ্টভাবে মূলধারার ব্রাহ্মণ্যবাদী গোঁড়ামি, কঠোর ইসলামি ধর্মীয় শাসন (শরিয়াহ) এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নিপীড়ন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা মানুষের হৃদয়কেই একমাত্র প্রকৃত পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করত। অথচ বংশানুক্রমিক সামাজিক স্তরবিন্যাস ও কুসংস্কারগুলো ব্যক্তির নিজস্ব সত্তাকে কলঙ্কিত করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সমষ্টিগত ধারণা গঠনে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এবং প্রায়শই ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘অস্পৃশ্য’ (tabooed) বলে বিবেচিত এই আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় উপাদানগুলো প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার সামাজিক ইতিহাসে বিভিন্ন রূপে প্রোথিত হয়ে আছে। বাংলায় যখন ইসলামের প্রসার ঘটে, তখন তা মূলত রাজদরবারের কঠোর আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ছড়ায়নি; বরং এর বিস্তার ঘটেছিল এমন সব সুফি পীরের মাধ্যমে যারা জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং স্থানীয় কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার সাথে মিশে গিয়েছিলেন। এর ফলে কঠোর শরিয়াহ বা ধর্মীয় রক্ষণশীলতার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সত্য পীর (বা সত্যনারায়ণ), বনবিবি, ওলা বিবি, শীতলা ও মনসার মতো লোকজ বিশ্বাস এবং ‘পীর’ কেন্দ্রিক মিশ্র সংস্কৃতির (syncretic culture) মধ্যে কঠোর ইসলামি একেশ্বরবাদ এবং স্থানীয় সর্বপ্রাণবাদী (animist) বা হিন্দু রীতিনীতির এক অস্পষ্ট সংমিশ্রণ দেখা যায়। লালন শাহের মতো চিন্তাবিদরা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডিকে স্পষ্টভাবে উপহাস করেছেন। বাউল ঐতিহ্য এবং বাংলার যাযাবর ফকির ও বাউলরা (যাদের মধ্যে হিন্দু বৈষ্ণব ও মুসলিম ফকির—উভয়ই অন্তর্ভুক্ত) বাঙালি প্রথা-বহির্ভূত বা ভিন্নধর্মী চিন্তাধারার (heterodoxy) সর্বোচ্চ নিদর্শন।
পাশ্চাত্যে ১৯৬০-এর দশকের ‘কাউন্টার-কালচার’ বা প্রথা-বিরোধী আন্দোলনের অনেক আগেই—যেখানে সাইকেডেলিকস, যৌন স্বাধীনতা ও লোকসংগীতকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে হাতিয়ার করা হয়েছিল—বাংলার প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলো ঠিক একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। তান্ত্রিক, সহজিয়া ও সুফি ধারায় গড়ে ওঠা এই সম্প্রদায়গুলো তাদের সময়ের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা—যেমন বর্ণপ্রথা, কঠোর ইসলামি শরিয়াহ এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ—ভেঙে ফেলার কাজে এসব হাতিয়ারকে কাজে লাগিয়েছিল।
ঐতিহাসিক বাংলায় রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটি ছিল একটি নিপীড়নমূলক ও ত্রিমুখী কাঠামো, যার উপাদানগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণপ্রথা: একটি কঠোর শ্রেণিবিন্যাস যা জন্মের মাধ্যমেই মানুষের পবিত্রতা, পেশা ও মানবিক মর্যাদা নির্ধারণ করত।
২. প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি শরিয়াহ: বিভিন্ন নবাব ও শাসকের অধীনে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক বিচারিক ও ধর্মীয় আইন, যা মানুষের নৈতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করত।
৩. ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ রাজ), যারা মানুষকে কেবল কর আদায় ও নীল চাষের কাজে ব্যবহৃত অর্থনৈতিক যন্ত্রের উপাদানে পরিণত করেছিল।
গূঢ় আধ্যাত্মিক সাধনায় বিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলো (যেমন—বাউল, ফকির, কর্তাভজা ও বৈষ্ণব সহজিয়া) এই কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে তলোয়ার তুলে নেয়নি। এর পরিবর্তে, তারা এক আমূল ও প্রথা-ভাঙা (asymmetrical) বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছিল—পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োগ করে তারা ভেতর থেকে সেই ব্যবস্থার কর্তৃত্বকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। এই অর্থে, এদেরকে স্থানীয় বা দেশজ ‘প্রতি-সংস্কৃতি’ (counterculture) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে—অবশ্যই এ কারণে নয় যে তারা রাজনৈতিক প্রতিরোধের আধুনিক ভাষা ব্যবহার করত, বরং এ কারণে যে, এগুলোর মধ্য দিয়ে মাঝে মাঝে এমন সব বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তি বা চিন্তাধারা তৈরি হতো, যা একজন ব্যক্তিকে কর্তৃত্ব, বর্ণ, ধর্মীয় জ্ঞান, শরীর, লিঙ্গ, সম্প্রদায় এবং প্রাত্যহিক জীবনের সাথে ভিন্নভাবে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ করে দিত।
বিরোধিতার ঊর্ধ্বে
যদি প্রতিসংস্কৃতি বলতে মূলধারার বিরোধিতা ছাড়া আর কিছুই না বোঝায়, তবে বিরোধিতা শোষিত হলেই তার ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু যদি প্রতিসংস্কৃতি বলতে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক যুক্তির সৃষ্টি বোঝায়, তবে প্রশ্নটি আরও কঠিন এবং আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। রিফাত চৌধুরীর তাৎপর্য হয়তো এই নয় যে তাঁকে কোনো পূর্বনির্ধারিত শ্রেণিতে নিখুঁতভাবে স্থাপন করা যায় কি না, বরং তাঁর জীবন ও বক্তব্য যে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো তৈরি করে, তার মধ্যেই নিহিত।
নাগরিকত্ব কী, যখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না? সাংস্কৃতিক শ্রমের মূল্যই বা কী, যখন তার সামাজিক অবদান বস্তুগত নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হয় না? ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অর্থই বা কী, যখন ব্যক্তি কাঠামোগতভাবে সমাজের ওপর নির্ভরশীল? ‘স্বনির্মিত মানুষ’-এর পুঁজিবাদী কল্পকাহিনীতে পরিণত না হয়েও কি আত্মগঠনের অস্তিত্ব থাকতে পারে? এবং একজন শিল্পী কি নিজের কণ্ঠের স্বায়ত্তশাসন বিসর্জন না দিয়ে সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকতে পারেন?
এই প্রশ্নগুলো রিফাতকে চে গুয়েভারার বিপ্লবী বয়ান এবং বাংলার দেশীয় প্রতি-ঐতিহ্য—উভয়ের সঙ্গেই এক অপ্রত্যাশিত আলোচনায় নিয়ে আসে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দুটি আমূল ভিন্ন; দার্শনিক শব্দভাণ্ডার বিনিময়যোগ্য নয়। তবুও এই তিনটি ক্ষেত্রই আমাদেরকে ব্যক্তি এবং তাকে সংজ্ঞায়িত করার দাবিদার কাঠামোগুলোর মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন করে দেখতে বাধ্য করে। সম্ভবত এখানেই প্রতিসংস্কৃতির অর্থ কম চমকপ্রদ এবং আরও গভীর হয়ে ওঠে। এটি অগত্যা সমাজের সবচেয়ে জোরালো প্রত্যাখ্যান নয়।
কখনও কখনও এটি সমাজ আপনার জন্য যে অর্থগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছে, তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করা।
কখনও কখনও এটি অন্তর্ভুক্তির অন্য একটি রূপ তৈরি করার প্রচেষ্টা।
এবং কখনও কখনও এটি কেবল এই জেদ যে, একজনের শ্রম, একজনের কণ্ঠস্বর এবং একজনের অস্তিত্বকে কোনো আমলাতান্ত্রিক শ্রেণি বা দাতব্য অঙ্গভঙ্গিতে নামিয়ে আনা যায় না।
‘প্রতি সংস্কৃতি - একজন প্রতিসংস্কৃতি চৌধুরী
…. "স্যাড জেনারেশন" ছিল ১৯৬০-এর দশকের ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান-বিরোধী সাহিত্য ও প্রতিসংস্কৃতি আন্দোলন। ১৯৬৩ সালে এর উত্থান ঘটে এবং এটি প্রতীকী "স্যাড জেনারেশন" "ছোট কাগজ" প্রকাশের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছিল।
"ছোট কাগজ"-এর স্ফুলিঙ্গ: আন্দোলনটি মূলধারার বাণিজ্যিক সাহিত্যের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ হিসাবে শুরু হয়েছিল। লেখকেরা স্যাড জেনারেশন (১৯৬৩)-এর মতো স্বাধীন, স্বল্প বাজেটের পত্রিকা ব্যবহার করে প্রচলিত সীমানাকে অতিক্রম করেছিলেন। বিট জেনারেশনের মতো পশ্চিমা প্রতি-সংস্কৃতির অনুকরণে ঢাকার অগ্রগামী তরুণরা গভীর শহুরে বিচ্ছিন্নতা, মোহভঙ্গ এবং প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল।
১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল প্রেক্ষাপটে কাজ করা এই লেখক ও চিন্তাবিদেরা শাসক সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং মূলধারার ভোগবাদী চাহিদার তীব্র সমালোচক ছিলেন। তাঁরা জনপ্রিয় প্রশংসার চেয়ে নিখাদ শৈল্পিক স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্যাড জেনারেশনের দ্বারা প্রজ্বলিত সৃজনশীল আগুন স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বরের মতো ১৯৬০-এর দশকের অন্যান্য আমূল পরিবর্তনকারী প্রকাশনার পথ প্রশস্ত করেছিল, যা বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন এবং নিম্নবর্গীয় প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছিল।
কবি রিফাত চৌধুরী ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর বাবা-মা ছিলেন শামসুজ্জামান চৌধুরী ও রাবেয়া খাতুন। তিনি পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় তাঁর শৈশব কাটান। তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলো পুরান ঢাকার বৈপরীত্যময় জগৎ—দেশভাগের পরবর্তী রূপান্তর ও স্বাধীনতার ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষা—এবং গ্রামীণ বাংলার ‘কলোনিবাড়ি’ ঘরবাড়ি, বিশেষত কিশোরগঞ্জের দ্বারা গঠিত হয়েছিল। রিফাত চৌধুরী ঢাকার বিলীয়মান যুগের একজন কবি, এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি একইসঙ্গে গ্রামীণ বাঙালি লোকসংস্কৃতির আঁতুড়ঘর এবং বাংলার অভিজাততন্ত্রের কেন্দ্রকে মূর্ত করে তোলেন।
রিফাতের ষাটের দশকে ঢাকার প্রতিসংস্কৃতি ও ছোট পত্রিকা আন্দোলন বাংলাদেশে পাকিস্তানের শাসনের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দিক, অর্থাৎ সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। পাকিস্তানে জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে বাঙালিরা ছিল সংখ্যালঘু। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে, প্রিটোরিয়ান গার্ডদের অধীনে, পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে পুঁজিবাদী আধুনিকীকরণের একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করছিল। পশ্চিমা দাতাদের বিপুল সাহায্য এবং মার্কিন প্রশাসন ও হার্ভার্ড-ভিত্তিক আমেরিকান উপদেষ্টাদের উৎসাহে, সামরিক শাসকেরা ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে একটি প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এই ধরনের প্রবৃদ্ধিমুখী কৌশলের সাথে সামাজিক সমতার প্রতি কোনো মনোযোগ ছিল না।
রিফাত দুটি ভিন্ন সময়ের সেই একই কঠোর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে কর্তৃত্বের ধরন ছিল একই রকম এবং কিছুটা কঠোর। এই আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট দুটি ভিন্ন যুগ জুড়ে বিস্তৃত। ষাটের দশকের বাংলাদেশে ‘স্যাড জেনারেশন’ (Sad Generation)—যা ছিল এক অগ্রগামী ও প্রথাবিরোধী আন্দোলন—জন্ম দিয়েছিল আমূল প্রথাবিরোধী ও শূন্যবাদী (nihilistic) এক ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর, যার নাম ছিল কেবল ‘না’ (Na)। কবি রিফাত চৌধুরী সেই ঢাকাইয়া পাল্টা-সংস্কৃতির (counterculture) ঐতিহ্যকেই ধারণ করেন। ক্ষুদ্র পরিসরে বা ব্যক্তিগত সত্তার বিচারে তিনি একজন ‘অ-নাগরিক’ (un-citizen)। তাঁর অস্তিত্বের সংকট কোনো সমষ্টিগত সংকট নয়; বরং এটি একজন নিঃসঙ্গ ব্যক্তির সংকট—অন্য সবার মতোই এক বিচ্ছিন্ন সত্তা। সামাজিক চেতনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদেরও সেই সমাজেরই অংশ হিসেবে দেখেন, যে সমাজ থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখতে চান।
রিফাত চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো রাখঢাক করেননি; আশির দশক ছিল ঢাকার ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর যুগ। ১৯৮৪ সালে তিনি কাজল শাহনেওয়াজের (আশির দশকের শুরুর দিকে উঠে আসা বিশিষ্ট বাংলাদেশি কবি, কথাসাহিত্যিক ও লিটল ম্যাগাজিন কর্মী) সাথে যৌথভাবে ‘ছাঁট কাগজের মলাট’ প্রকাশ করেন এবং একই নামের একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। সে সময় রিফাত, কাজল, আহমেদ মুজিব ও খায়রুল হাবিবকে নিয়ে একটি বলয় গড়ে উঠেছিল, যারা ‘জলপ্রপাত’ ও ‘ফ্রি’ (Free) পত্রিকাগুলোকে কেন্দ্র করে সক্রিয় ছিলেন। আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে তিনি কবি সরকার মাসুদের সাথে ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে ঘুরে বেড়াতেন; আড্ডার জায়গা হিসেবে তিনি বাবুপুরা বস্তিতে বাঁশের চাটাইয়ের দেয়ালযুক্ত একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি খুব কাছ থেকে ঢাকায় মাদক সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিস্তারের সাথে জড়িত অশুভ ও নির্মম সংঘাতগুলো প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
চিন্তা ও কর্মের জগতে আহমেদ ছফা এবং ‘লাল মিয়াঁ’ (শিল্পী এস. এম. সুলতান) তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। আশির দশকে তিনি ‘গণমুক্তি পার্টি’ নামের একটি বামপন্থী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগ পর্যন্ত, কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি এর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন।
লেখালেখিই ছিল তাঁর প্রকৃত সত্তা ও আগ্রহের জায়গা; অন্যদিকে অভিনয়ের জগতে তিনি এসেছিলেন কেবল অর্থের প্রয়োজনে। তাঁর অভিনয়-জীবনকে বিচার করতে হবে তাঁর নিজেরই করা একটি মন্তব্যের আলোকে: "কে কাকে বাঁচায়? দিনশেষে তো টিকে থাকার লড়াইটাই আসল।" তাঁর এই যাত্রার গল্পটি শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের চেয়ে বরং একজন দিনমজুরের উপার্জনের সংগ্রামের সাথেই বেশি সম্পর্কিত—এমনকি এই বিষয়টির জন্য তাঁকে অনেকের উপহাসেরও শিকার হতে হয়েছিল।
রিফাত চৌধুরীর ব্যক্তিগত অবস্থান, আধিপত্যবাদী কাঠামোর নানা অসঙ্গতি এবং ভোগবাদকে কেন্দ্র করে ঢাকায় গড়ে ওঠা পাল্টা-সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই এই কাজটির শিরোনাম রাখা হয়েছে কেবল ‘নো’ (No)।
‘কাউন্টার কালচার’ ও একজন — রিফাত চৌধুরী
ষাটের দশকের ঢাকায় ‘স্যাড জেনারেশন’ (Sad Generation) ছিল একটি প্রথা-বিরোধী সাহিত্য ও প্রতি-সংস্কৃতি আন্দোলন। ১৯৬৩ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ‘স্যাড জেনারেশন’ নামের সেই আইকনিক ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর প্রকাশনা।
‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর স্ফুলিঙ্গ: মূলধারার বাণিজ্যিক সাহিত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবেই এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। লেখকরা প্রথাগত গণ্ডি ভাঙার লক্ষ্যে ‘স্যাড জেনারেশন’ (১৯৬৩)-এর মতো স্বাধীন ও স্বল্প বাজেটের ম্যাগাজিনগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। পশ্চিমা বিশ্বের ‘বিট জেনারেশন’-এর মতো প্রতি-সংস্কৃতির আদলে, ঢাকার প্রগতিশীল ও অগ্রগামী তরুণরা তাদের গভীর নাগরিক বিচ্ছিন্নতাবোধ, মোহভঙ্গ এবং প্রথাগত সামাজিক রীতিনীতি ভেঙে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেন।
ষাটের দশকের উত্তাল পূর্ব পাকিস্তানে সক্রিয় এই লেখক ও চিন্তাবিদরা তৎকালীন ক্ষমতাসীন সামরিক শাসন এবং মূলধারার ভোগবাদী চাহিদার কঠোর সমালোচক ছিলেন। তাঁরা জনপ্রিয় স্বীকৃতির চেয়ে শৈল্পিক স্বাধীনতার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। ‘স্যাড জেনারেশন’-এর মাধ্যমে জ্বলে ওঠা সৃজনশীলতার সেই স্ফুলিঙ্গ ষাটের দশকের অন্যান্য প্রগতিশীল প্রকাশনা—যেমন ‘স্বাক্ষর’ ও ‘কণ্ঠস্বর’-এর পথ প্রশস্ত করেছিল; পাশাপাশি এটি বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছিল।
কবি রিফাত চৌধুরী ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর বাবা শামসুজ্জামান চৌধুরী এবং মা রাবেয়া খাতুন। তাঁর শৈশব কেটেছে পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায়। দেশভাগের পরবর্তী রূপান্তর ও স্বাধীনতার ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষায় মুখর পুরান ঢাকা এবং গ্রামীণ বাংলার—বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের—‘কলোনিবাড়ি’র আবাসন ব্যবস্থা—এই দুই বিপরীতধর্মী জগতের সংমিশ্রণেই তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলো গড়ে উঠেছিল। রিফাত চৌধুরী ঢাকার এক বিলীয়মান যুগের কবি; তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি গ্রামীণ বাঙালি লোকসংস্কৃতির আঁতুড়ঘর এবং বাংলার অভিজাত ঐতিহ্যের কেন্দ্র—উভয়েরই এক অনন্য মেলবন্ধন।
আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারা দে লা সের্না (১৪ মে ১৯২৮ – ৯ অক্টোবর ১৯৬৭) ছিলেন একাধারে আর্জেন্টাইন মার্কসবাদী বিপ্লবী, লেখক, গেরিলা নেতা, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ এবং সামরিক তাত্ত্বিক। কিউবান বিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব—যাঁর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মুখচ্ছবি বিশ্বজুড়ে বিদ্রোহের এক প্রতি-সাংস্কৃতিক প্রতীক ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে—… ষাটের দশকের তিনি ‘বৈশ্বিক ন্যায়বিচার’ (Global Justice) বিষয়ক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন। ‘জাস্টিসিয়া গ্লোবাল’ (Justicia Global) বা ‘বৈশ্বিক ন্যায়বিচার’ শীর্ষক পুস্তিকাটিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা ভাষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় সম্মেলনে চে গুয়েভারার ভাষণ, ‘কিউবায় সমাজতন্ত্র ও মানুষ’ (Socialism and Man in Cuba) এবং ‘দুই, তিন, বহু ভিয়েতনাম গড়ে তোলো—ট্রাইকন্টিনেন্টাল-এর প্রতি বার্তা’ (Create Two, Three, Many Vietnams – Message to the Tricontinental)। নির্দিষ্ট কিছু বিপ্লবী বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং চে—যিনি নিঃসন্দেহে তাঁর সময়ের চেয়েও অগ্রসর চিন্তার মানুষ ছিলেন—এ বিষয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “...আইএমএফ (IMF) পুঁজিবাদী বিশ্বে ডলারের রক্ষক হিসেবে কাজ করে; ‘আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও কৃষি ব্যাংক’ (International Reconstruction and Agricultural Bank) হলো অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশের একটি হাতিয়ার; এবং ‘আন্তঃ-আমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংক’ (Inter-American Development Bank) আমেরিকান মহাদেশে এক দুঃখজনক ভূমিকা পালন করে। ওপরের দৃষ্টিতে মনে হয়, যেসব সংস্থার মাধ্যমে এগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তারা যাদের সহায়তা করার কথা তাদের স্বার্থেই কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; কিন্তু বাস্তবে এগুলো শোষণ ও পশ্চাৎপদতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার এক সূক্ষ্ম কৌশল বা হাতিয়ার মাত্র।”
… ষাটের দশকের সেই সময়ে ষাটের দশকের ঢাকায় গড়ে ওঠা প্রতি-সংস্কৃতি ও ‘লিটল ম্যাগাজিন’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) পাকিস্তানি শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণ। পাকিস্তানে জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বাঙালিরা ছিল সংখ্যালঘু। ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে, সামরিক শাসনাধীন পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট বেঁধে পুঁজিবাদী আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া অনুসরণ করছিল। পশ্চিমা দাতাদের কাছ থেকে বিপুল সহায়তা এবং মার্কিন প্রশাসন ও হার্ভার্ড-ভিত্তিক মার্কিন উপদেষ্টাদের উৎসাহে, সামরিক শাসকরা ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছিল। অথচ, প্রবৃদ্ধি-কেন্দ্রিক এই কৌশলগুলোর পাশাপাশি সামাজিক সমতা বা ন্যায়বিচারের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে, এই প্রবন্ধের লেখক চে-র একটি উক্তি উদ্ধৃত করছেন: "...বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী আমাদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে—যা কেবল দুর্দশা ও ক্ষমতাহীনতাই বয়ে এনেছে; তারা ভুলে যাচ্ছে যে, এসব সমস্যার মুখে দাঁড়িয়ে অন্য কোনো অধিকতর মূল্যবান ও সর্বজনীন পথের সন্ধান করা হবে।"
চে উল্লেখ করেছিলেন যে, বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা এমন একটি 'সাংস্কৃতিক সাধারণ বাজার' (cultural common market) গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন—যা সুসংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে এবং যার মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার সমগ্র সংস্কৃতিকে সাম্রাজ্যবাদের প্রচারণার সেবায় নিয়োজিত করা হবে; এর লক্ষ্য হলো এটা প্রমাণ করা যে, আমাদের জনগণের ক্ষুধা আসলে কোনো ক্ষুধা নয়, বরং তা কেবলই অলসতা। এর জবাবে আমরা জানাই আমাদের পূর্ণাঙ্গ ও দ্ব্যর্থহীন প্রত্যাখ্যান; কারণ এটি হলো সেই একটি বিষয়কে—আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে—বশ মানানোর বা পোষ মানানোর অপচেষ্টা, যা আমাদের জনগণ সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করে এসেছে।
রিফাত দুটি ভিন্ন যুগের সেই একই কঠোর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—যেখানে কর্তৃত্বের ধরন একই এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেশ কঠোর। এই আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার দুটি স্বতন্ত্র যুগ জুড়ে বিস্তৃত। ষাটের দশকের বাংলাদেশে ‘স্যাড জেনারেশন’ (Sad Generation)—যা ছিল এক অগ্রগামী ও প্রথাবিরোধী আন্দোলন—জন্ম দিয়েছিল আমূল প্রথা-ভাঙা ও শূন্যবাদী (nihilistic) এক ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর, যার নাম ছিল কেবল ‘না’ (Na)। কবি রিফাত চৌধুরী সেই ঢাকাইয়া প্রতি-সংস্কৃতির (counterculture) ঐতিহ্যকেই ধারণ ও প্রকাশ করেন। ক্ষুদ্র পরিসরে বা ব্যক্তিগত সত্তার বিচারে তিনি একজন ‘অ-নাগরিক’ (un-citizen)। তাঁর অস্তিত্বের সংকট কোনো সমষ্টিগত সংকট নয়; বরং এটি একজন নিঃসঙ্গ ব্যক্তির—অন্য সবার মতোই এক বিচ্ছিন্ন সত্তার—সংকট। সামাজিক চেতনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তিনি এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যদেরও সেই সমাজেরই অংশ হিসেবে দেখেন, যে সমাজ থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখতে চান।
অথবা সেই সব সামাজিক আন্দোলন যা বিভাজন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দিকে ধাবমান নব্য-উদারবাদী প্রবণতাকে রুখে দাঁড়াতে চায়... জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পথকে সুদৃঢ় করার মাধ্যমে—এবং একই সাথে ভোগবাদের আধিপত্যবাদী বৃত্ত ভেঙে গভীরতর সাংস্কৃতিক চেতনা ও আমাদের বস্তুগত কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সম্পর্কের বিষয়ে সচেতনতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তাকে ভুলে না গিয়ে—আজকের সামাজিক আন্দোলনগুলো নব্য-উদারবাদ কর্তৃক সমগ্র বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিশাল সামাজিক বিপর্যয় সম্পর্কে আরও ভালো বোঝাপড়া গড়ে তুলতে পারবে।
এই প্রবন্ধগুলোতে নিম্নোক্ত শিরোনামের অধীনে গভীর আলোচনা রয়েছে—
(‘কিউবায় সমাজতন্ত্র ও মানুষ’ প্রবন্ধ থেকে) প্রথম বীরত্বপূর্ণ পর্যায়, জনগণের অংশগ্রহণ, পুঁজিবাদের অদৃশ্য নিয়মাবলি, ব্যক্তি ও সমাজতন্ত্র, নতুন চেতনা, আত্ম-শিক্ষণের সচেতন প্রক্রিয়া, বিপ্লবের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, কাজের নতুন মর্যাদা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, শৈল্পিক পরীক্ষার নতুন উদ্দীপনা, নতুন বিপ্লবী প্রজন্ম, ব্যক্তির ভূমিকা, জীবন্ত মানবতার প্রতি ভালোবাসা, গোঁড়ামির বিপদ।
রিফাত চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো রাখঢাক না করেই বলেছেন; আশির দশক ছিল ঢাকায় ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর যুগ। ১৯৮৪ সালে তিনি কাজল শাহনেওয়াজের (আশির দশকের শুরুর দিকে উঠে আসা বিশিষ্ট বাংলাদেশি কবি, কথাসাহিত্যিক ও লিটল ম্যাগাজিন কর্মী) সাথে যৌথভাবে *ছাত কাগজের মলাট* প্রকাশ করেন এবং একই নামের একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। সে সময় রিফাত, কাজল, আহমেদ মুজিব ও খাইরুল হাবিবকে নিয়ে একটি বলয় গড়ে ওঠে, যারা *জলপ্রপাত* ও *ফ্রি* (Free) পত্রিকা দুটির সাথে যুক্ত ছিলেন। আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে তিনি কবি সরকার মাসুদের সাথে ঢাকা শহরে প্রচুর ঘুরে বেড়াতেন; আড্ডার জায়গা হিসেবে তিনি বাবুপুরা বস্তিতে বাঁশের চাটাইয়ের দেয়ালঘেরা একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। এর ফলে ঢাকার শহুরে জীবনে মাদক সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিস্তারের সাথে জড়িত অশুভ ও নির্মম সংঘাতগুলো তিনি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
চিন্তা ও কর্মের জগতে আহমেদ ছফা এবং ‘লাল মিয়াঁ’ (শিল্পী এস এম সুলতান) তাঁকে নানাভাবে ঋদ্ধ করেছেন। আশির দশকে তিনি ‘গণমুক্তি পার্টি’ নামের একটি বামপন্থী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগ পর্যন্ত তিনি কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সংগঠনে আত্ম নিয়োগ করেছিলেন।
লেখালেখিই ছিল তাঁর প্রকৃত সত্তার ডাক। অথচ তিনি বলেওছেন যে, অভিনয়ের পথে তিনি পা বাড়িয়েছিলেন কেবল অর্থের প্রয়োজনে। তাঁর অভিনয়-জীবনকে বিচার করতে হবে তাঁর নিজেরই একটি স্বীকারোক্তির আলোকে: "কে কাকে বাঁচায়? শেষ পর্যন্ত তো টিকে থাকার লড়াইটাই আসল।" তাঁর এই যাত্রাপথ শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের চেয়ে বরং দিনমজুরের উপার্জনের সাথে বেশি সম্পর্কিত—এমনকি এ কারণে তাঁকে অনেকের উপহাসেরও শিকার হতে হয়েছিল।
রিফাত চৌধুরীর ব্যক্তিগত অবস্থান, আধিপত্যবাদী কাঠামোর নানা অসঙ্গতি এবং ভোগবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঢাকার পাল্টা সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই যেন এক অমোঘ ‘না’ (No)-এর উচ্চারণ।
(চলবে)
পুনশ্চঃ AI এর সহ্য নেয় হইয়াছে নানাভাবে . ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েন থাকলে। আরকি ? সামনে তো পূজা, ..ও সরি পুজো . উদ্মার মস্তির ..শুভেচ্ছা রইলো .
সজীব নজরুল
অনুলিখনঃ নাহিদ উল ইসলাম
২৯ রাবিউস থানি ১৪৪৮ ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ এবং ১০ অক্টোবর ২০২৬
গাঁও প্রডাক্সানস।
নিকেতন
দকা - বাংলা দেশ
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।