৪ চন্দনা
না, শৈলজা’র থেকে সুপ্রতীকের ঘটনা শুনেও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না।
এর মধ্যে ঘনশ্যাম স্যারকে অপমান করা কোথায়? ও তো ইন্টেলেকচুয়াল ডিবেটের কথা বলছিল।
--ধ্যাৎ, ডিবেট না ছাতার মাথা! ওর বন্ধু আগে গোটা ক্লাসের সামনে কিছু ছ্যাবলা কথা বলে পুরো ক্লাসটাকে হাসিয়ে বেদান্তের অন্ত করে দিল। স্যার ওকে বের করে দিয়ে পড়াতে লাগলেন। ঠিক করেছিলেন। ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট! স্যারের কাজ পড়ানো, সেটা উনি করছিলেন। হি ওয়াজ ডিসচার্জিং হিজ ডিউটিজ। সো?
এরমধ্যে তোর বাঙালি পাগলাটা-- পড়ে তো হিস্ট্রি, শুঁটকো চশমুদ্দীন—অন্যের ক্লাসে ঢুকে ফালতু বকোয়াস করে, ইন এ ওয়ে, স্যারের অথরিটিকে আন্ডারমাইন করল না?
প্রিন্সিপাল স্যার ডিড দ্য রাইট থিং। ইউজড্ হিজ অথরিটি টুঁ সিভিলাইজ দ্য মাংকি।
এবার আমার একটু রাগ হয়। যুক্তি হারিয়ে গেলেই লোকে খিস্তি করে।
--ও হো! তোর মাংকি শুনে খারাপ লাগছে? বেশ, বুল ইন এ চায়না শপ! ওকে?
-- এখনও বুঝলাম না স্যারের কিসে অপমান হল?
--আচ্ছা, তুই পড়াশোনায় ইন্টেলিজেন্ট, কিন্তু বাকি ব্যাপারে এত ডাম্ব কেন? যেটা সবাই বুঝতে পারে সেটাও ---
ইতিমধ্যে বন্দিতা এগিয়ে এসেছে। আমরা ছিলাম গার্লস কমন রুমের এককোণায়।
ও কাছাকাছি এসে খানিকটা শুনে আন্দাজ করে নিয়েছে। এবার মুচকি হেসে মুখ খুলল।
--আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল বন্ধুটি যে mundane ব্যাপারে dumb, সে নিয়ে কোন সন্দেহ আছে? যা সবাই দেখতে পায়, ও পায় না।
সেই ফোঁড়া বেরনোর গল্পটা মনে নেই?
ওদের সম্মিলিত হা-হা-হি-হি’র মাঝে পিরিয়ড শুরু হওয়ার বেল বেজে ওঠে। সবাই ক্লাসের দিকে পা চালাই।
আমি একটু জোরে। এত রাগ হয়েছে যে!
ওটা গত বছরের গল্প। সবে স্কুল থেকে পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছি। রোজ কমন রুমে মেয়েদের মুখে অবিরাম -ছি রে, হট রে শালী—শুনছি।
এমন করে আমাদের বাড়িতে বা পাড়ায় কোন মেয়ে কথা বলে না।
অবশ্য আমরা তো গ্রামে থাকি। শহরের মেয়েরা কি এমন করেই কথা বলে? কোলকাতায়? মুম্বাইয়ে? দিল্লিতে? কী জানি।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমিও কেমন ওদের মত ছি রে! হট রে এবং শালী অনায়াসে বলতে লাগলাম।
আমাদের বাড়িতে কেউ শালা বলে না।
একদিন কমন রুমে বন্দিতা সোনী বলে মেয়েটি একটা জোকস্, থুড়ি এখানে বলে চুটকুলে, শোনাচ্ছিল।
ও মুচকি হেসে শুরু করল ‘একটা চালু মেয়ের সিধেসাদা বেচারা গোছের ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে। সুহাগ রাতে যা হল’! ব্যস্, এইটুকু বলে ও চুপ মেরে গেল।
অমনি সব মেয়েরা ওর দিকে চেয়ার টেনে ঘনিয়ে এল।
-কী হল? থেমে গেলি কেন? সুহাগ রাতে—তারপর? জলদি বোল, জ্যাদা ভাও মত খা!
ও বোধহয় এটাই চাইছিল। একটু গম্ভীর মুখ করে বলতে শুরু করলঃ হুয়া ক্যা—চালু লড়কি একদম জামাকাপড় খুলে শুয়ে পড়ল, আর চোখ বুঁজে ঘুমের ভান করতে লাগল।
এদিকে গোবেচারা ছেলেটার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। ও আগে কখনও এমন কিছু দেখেনি।
অবাক হয়ে দেখছে, ভয়ে ভয়ে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করছে—তোমার বুকে বড়বড় ও দুটো কী?
মেয়েটি চোখ বোঁজা অবস্থায় বলল—ফোঁড়া বেরিয়েছে।
--এতবড় ফোঁড়া? কী ভয়ংকর!
--হুঁ-উঁ-উঁ।
-- আচ্ছা, বুকে ফোঁড়া বেরিয়েছে তো মুখ নীচে খুলছে কেন?
ব্যস, শুরু হল হা-হা-হি-হি। একজন বলল—যা শোনালি, তোর এক কাপ কফি পাওনা হল।
আর একজন বলল—ওই চালু মেয়েটা কি তুই? নিজের এক্সপিরিয়েন্স শোনাচ্ছিস?
--হট রে! আমার তো বিয়েই হয় নি।
--হবে, হবে। আজ নয় কাল হবে। আর ওইরকম হাবাগোবা ছেলের সংগে।
আবার একপ্রস্থ হাসি। আমি হাসি নি। বললাম—আচ্ছা। ফোঁড়া উপরে হলে মুখ নীচে হবে কেন? আর এতে হাসির কী হল?
সবাই খিঁচিয়ে উঠল।
তুই এখান থেকে যা! চুটকুলে কা মজা কিরকিরা কর দিয়া।
বুঝতে পারিস নি, নাকি ন্যাকামি করছিস?
--সত্যি বুঝি নি এতে হাসির কী হল?
বন্দিতা বলল—বাড়ি গিয়ে মাকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করে নিস।
রাত্তিরে মা রুটি বেলছিল, আমি সেঁকে দিচ্ছিলাম।
মাকে বললাম—আচ্ছা মা, একটা কথা।
--কী কথা?
--কলেজে এক মেয়ে একটা জোক শোনাচ্ছিল। আমি না হাসায় সবাই ভাগিয়ে দিল। বলল—বাড়িতে মাকে জিজ্ঞেস করিস।
তারপর আমি পুরো চুটকুলাটা মাকে শুনিয়ে জানতে চাইলাম—এর মধ্যে হাসির কী আছে?
মা ব্যাজার মুখে বলল—দ্যাখ চিনি; তোর হাসতে হয় হাস, কাঁদতে হয় কাঁদ। আমার মাথা খাস না। কাজ করতে দে।
তোর বাবাকে এখনই খেতে দিতে হবে।
পরের দিন কমনরুমে যেই বলেছি মা এটার উত্তর দেয় নি—সবার চোখ কপালে!
তুই কী রে! সত্যি আন্টিকে ওই জোক শোনালি? এমন ব্লকহেড! আরে আমরা তো এমনিই বলেছিলাম!
তুই একটি অরিজিনাল প্রোডাক্ট! হ্যাঁ হ্যাঁ—নন-বায়োলজিক্যাল।
ভগবান বোধহয় ছুটির দিনে ফ্রি পিরিয়ডে বসে তোকে ক্রিয়েট করেছিলেন।
আর একজন জানতে চাইল আমার নিয়মিত পিরিয়ড হয় কিনা।
শেষে শৈলজা আমায় আলাদা করে চুটকুলাটার মানে বুঝিয়ে দিল।
আমার তবু হাসি পেল না।
অবাক হয়ে বললাম—তোরা এত ফালতু গল্প শুনে হাসাহাসি করিস? খেয়েদেয়ে কাজ নেই?
বলে আফশোস হল; শৈলজার মুখ কালো হয়ে গেছে। সত্যিই তো, ওকে কেন কোন কাজ করতে হবে!
আমার বুকের কোথায় যেন একটা ধাক্কা লাগল। আমি ওর দু’হাত ধরে বললাম—সরি রে! কিছু না ভেবে বলে ফেলেছি। মিন করি নি।
প্লীজ, মাপ করে দে!
সেইদিন থেকে শৈলজা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেল।
ওর একটা ‘গ্ল্যাম বুক’ আছে। তাতে আমার নামের পাশে লিখেছে ‘Besty’!
সেইদিন বুঝতে পারলাম একটা ‘সরি’ শব্দের শক্তি! তবে বলাটা sincere হওয়া চাই।
ওদের ব্যঙ্গবিদ্রূপে আমার জেদ বেড়ে গেল। ভাবলাম সুপ্রতীকের সঙ্গে দেখা করে ওর পিকিউলিয়ার ব্যবহারের কারণ জেনে নেব।
না, না—কোন ব্যাখ্যা নয়, আমি কে যে explanation চাইব? কিন্তু মাথার মধ্যে একটা পোকা ঘুর ঘুর করছে, এই আর কি!
কিন্তু ও সাসপেড! এক সপ্তাহ ধরে কলেজে আসছে না। অপেক্ষা করা যাক।
বেশিদিন লাগল না। ঠিক দু’দিন পরে কলেজ থেকে ফিরছি শৈলজার স্কুটারের পেছনে বসে। ও আমাকে বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে দেবে।
সেখান থেকে বাসে করে আমাদের গাঁয়ের স্টপ আধঘন্টা।
কিন্তু হঠাৎ ও ব্রেক কষে রাস্তার একপাশে বাহন থামিয়ে দিল। কী হল?
ও বলল –নেমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখ। চায়ের দোকানের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে সিগ্রেট টানছে।
--কে?
--কে আবার! তোর হিরো। সাসপেন্ড হয়েও লজ্জা নেই। কলেজের আশেপাশে ছোঁক ছোঁক করছে। ও হো, ইউনিয়নের সেক্রেটারি বটে! ভুলে গিয়েছিলাম।
--স্কুটার থামালি কেন? আমায় বাস ধরতে হবে। তাড়াতাড়ি বাড়ি যাব, আজ রায়পুরের টিউশন নেই।
--এমন ঘুটনা দিমাগ!
যা, গিয়ে কথা বলে যা বলার জেনে নে, নইলে তো শান্তি হচ্ছে না। আমি নামিয়ে দিলাম। সেদিনের মত হিরোর মোটরবাইকে চড়ে বাসস্ট্যান্ড যাবি।
আর আমাকে থ্যাংক ইউ বল। আমি চললাম।
আমি বাধা দেবার আগেই ও স্টার্ট দেয় এবং গিয়ার বদলে হাওয়া হয়ে যায়।
কী করি? এখান থেকে বাসস্ট্যান্ড হেঁটে মেরে দেয়া যায়। এখন বেলা এগারোটা। সেদিন সকালের মত জুয়াড়ির দলের চক্করে ফেঁসে যাওয়ার ভয় নেই।
কিন্তু আমার ভেতরে একটা সাপ একটু একটু করে ফণা তুলছে যে!
কিছু না ভেবেই পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। সামান্য দুরত্ব রেখে। কী বলব? গলা শুকিয়ে গেছে।
যদি সাসপেন্ড হওয়ার ব্যাপারটা জানতে চাই আর ও বলে –আপ কো ইসসে মতলব?
মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়—শুনিয়ে!
কিন্তু একটা অস্পষ্ট শব্দ বেরোয়। রাস্তার হট্টগোল আর গাড়ির আওয়াজের মাঝখানে আমার কথা শোনা যায় না।
ওরা তিনজন কিছু একটা বিষয়ে কথা বলতে বলতে হাসছিল আর সুপ্রতীক সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে হাতের টুকরোটা ফুটপাথে ফেলে পা দিয়ে ঘষে নেভানোর সময় ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে আমাকে দেখে ফেলল। একটু অবাক হয়ে আমাকে দেখল।
তারপর বলল—কিছু বলবেন? ফের কোন সমস্যা? ওই ছেলেগুলো আর জ্বালায় নি তো?
--না না। আমি মানে, আপনাদের, মানে ওই সাসপেন্ড হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে চাইছিলাম।
ওদের মধ্যে চোখে চোখে কিছু কথা হয়।
--ও, সেতো সবাই জানে। নোটিস বোর্ড দেখেন নি?
--দেখেছি, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না। অন্যদের কাছে যা শুনেছি তাতে আরও –
--ঠিক আছে; কিন্তু এসব কথা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হয় না। কোথাও বসতে হবে। আমার বাইকে চলুন।
--না না; আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। বাস ধরব। না হয় আরেকদিন। কালকে--
ওর পাশের ঝাঁকড়াচুলো ছেলেটি হেসে শুনিয়ে দেয়ঃ
“কল কো কৌন দেখা হ্যায়,
আজ কা দিন খোয়ে কিঁউ?
জিস ঘড়িয়োঁ মেঁ হস সকতে হ্যায়
উস ঘড়িয়োঁ মেঁ রোয়ে কিঁউ”?
কাল কী হবে কে বলবে,
দিন চলে যায়, কেন যেতে দাও?
এই দুনিয়ায় মাত্র দু’দিন,
কান্না কিসের? নাও হেসে নাও।
ছেলেটি ঝুঁকে বাও করে বলে—ইস নাচিজ কা নাম ‘বিদ্রোহী’।
এ আবার কী? এরকম কারও নাম হয় নাকি? এরা কি আমার সংগে ইয়ার্কি দিচ্ছে!
সুপ্রতীক বুঝতে পেরে এগিয়ে এসে বলে—ভুল বুঝবেন না। ওর আসল নাম শ্যামসুন্দর ত্রিবেদী।
--নামের আবার আসল নকল হয় নাকি?
--‘বিদ্রোহী’ হল ওর পেন নেম। ও কবিতা লেখে। আমাদের দলের একমাত্র শায়র।
--দল?
--না মানে আমরা ক’জন।
--কী করেন আপনারা?
--বিশেষ কিছুই না। নানারকম বই পড়ি, চিন্তার আদান প্রদান করি। আর—
--আর?
--আর গরীব বস্তিতে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাই।
--কেন? সরকারের তরফ থেকে বাচ্চাদের জন্য ‘বাল বাড়ি’ আছে, অনেক গাঁয়ে।
তাতে যে সব মায়েরা বাড়ির বাইরে কাজ করতে যান তাঁদের বাচ্চাদের দেখাশুনো, খেলার ছলে অক্ষর পরিচয়, আর দুধ দেয়া –সব হয়। এক পয়সাও লাগে না।
আমি যে গ্রামে থাকি সেখানেও আছে। পঞ্চায়েত দেখাশুনো করে। আপনারা এসব করবেন কী করে?
--অত ছোট বাচ্চা না, ও তো ক্রেচ চালানো। আমরা আরও একটু বড় বাচ্চাদের পড়াই; পথশিশুদের, ঝুগগি ঝোপড়ির বাচ্চাদের।
--তার জন্যেও পাঠশালা আছে; বইপত্তর খাতা সব ফ্রি। দুপুরের খাওয়া, না হলে জলখাবার।
--আমাদের স্কুলে বই নেই, পিরিয়ড নেই, ব্ল্যাকবোর্ড নেই, নীল ডাউন নেই। ক্লাস হয় ফুটপাথে, রেলস্টেশনে, যেখানে বাচ্চারা বাবুদের জুতো পালিশ করে সেখানে।
আপনি তোতো-চান বলে কোন বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতির নাম শুনেছেন?
আমি বিমুঢ়, মাথা নাড়ি। কিন্তু এদেরই সবজান্তা ভাবটা আমার পছন্দ হচ্ছে না।
ওরা বেশ মজা পেয়েছে।
এতক্ষণ তিন নম্বর ছেলেটি চুপ করে ছিল। ওকে খুব একটা খেয়াল করি নি। প্যান্টের সংগে ঢোলা খাদির পাঞ্জাবি পরা ফর্সা ছেলেটার মুখে গোটা কয়েক বসন্তের গুটির দাগ।
সে মুখ খোলে—এত কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হয় না। আমার খিদে পেয়েছে। আপনারও পেয়েছে নিশ্চয়ই।
--না, না। আমি এখন বাড়ি যাব।
--লজ্জা না করে সুপ্রতীকের বাইকের পেছনে বসে পড়ুন। আমরাও অন্য বাইকে আসছি। কাছেই যাব, কমদামে চা কফি ও সামোসা জুটে যাবে। আর আপনার সব প্রশ্নের জবাব -- আমরা কী করি, কেন করি জানতে পারবেন।
সুপ্রতীক ওর পরিচয় দেয়—সাদিক, আমাদের ব্যাংক বা ক্যাশিয়ার। আমরা মাসের গোড়ায় ওর কাছে কিছু টাকা জমা দিই। ও খরচার হিসেব রাখে।
ফুরিয়ে আসার আগে জানিয়ে দেয়, এই সব।
বাসস্টান্ডের কাছেই কফি হাউসের দোতলা এ’সময়ে ফাঁকা।
কফি এল,ততক্ষণ টুকটাক কথা। সবার কৌতূহল আমার ব্যাপারে। কোথায় থাকি? বাবা কী করেন জাতীয় খেজুরে।
শ্রীমান শায়র সিগ্রেট বের করতেই আমার চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে, অজান্তেই।
--সেকী? বাঙালি মেয়েরা সিগ্রেট পছন্দ করে না? আপনার বাবা খান না?
--বাইরে খোলা বারান্দায় গিয়ে; বাথরুমে নয়, ঘরের মধ্যে নয়। আপনারা প্যাসিভ স্মোকিং এর কনসেপ্ট জানেন না, নাকি কেয়ার করেন না?
আমি একটু পরে চলে যাব, তখন না হয়--।
সিগ্রেট প্যাকেটে ঢুকে যায়।
সুপ্রতীক গলা খাঁকরে শুরু করে, “আপনার যখন আজ তাড়া আছে তখন শুধু আমার সাসপেনশন নিয়ে কথা হোক। আমরা কী করি, কেন করি, তোতোচান মডেল –এ নিয়ে না হয় আরেক দিন বসা যাবে। কারণ ওটা নিয়ে কথা বলতে গেলে সময় লাগে। ঠিক আছে”?
আমি মাথা হেলিয়ে সায় দিই।
শ্যামসুন্দর, থুড়ি দলের শায়র, বলে ওঠে, “আগে জানা দরকার সেদিনের ঘটনার আপনি কতটুকু জানেন”?
আমি যা শুনেছিলাম উগরে দিই, মায় দাঁড়ি-কমা শুদ্ধু। ওরা মুচকি হেসে সায় দেয়—ঠিকই জানেন।
সুপ্রতীক বলে—দেখুন, আমরা পড়ার বা পড়ানোর পুরনো মডেলটা বদলে দিতে চাই।
কেউ একজন এসে বছরের পর বছর একই নোটস পড়িয়ে যাবে, আর সবাই সেটা মুখস্থ করে খাতায় বমি করবে—এই মডেল আজকে অচল।
শিক্ষা ছাত্রকে প্রশ্ন করতে শেখায়। তাই আমাদের শায়র, দর্শনের ছাত্র, সেদিন ঘনশ্যাম স্যারকে প্রশ্ন করেছিল।
আমি বাধা দিই। “কিন্তু শায়রকে সাস্পেন্ড না করে আপনাকে করল কেন”?
--আমাকে করল ঠিক প্রশ্ন করার জন্যে নয়। ইতিহাসের ছাত্র হয়ে ফিলজফির ক্লাসে গিয়ে পড়ায় ডিস্টার্ব করার জন্যে। আর আমাদের শায়র কিন্তু স্নাতক স্তরে গোল্ড মেডেল পেয়েছিল, ক্লাসে টপার।
-- আরেকটা কারণ আছে।
এটুকু বলে সাদিক মিচকি হাসে।
আমি খেয়াল করলাম গুটি বসন্তের দাগ থাকলেও হাসলে সাদিকের মুখে একটা অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
--শায়র গত বছর পরীক্ষার হলে টুকতে গিয়ে ধরা পরা একটি মেয়েকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। ঘটনাচক্রে মেয়েটি ঘনশ্যাম স্যারের কন্যা বটেন।
--কেন? কেন অমন মেয়েকে বাঁচাতে গেলেন?
অন্যেরা কিছু বলার আগে শায়র কথা কেড়ে নেয়।
--দেখুন, শায়রকে কেউ বাঁধতে পারে না, আটকাতে পারে না। শায়র হল মুক্ত বিহঙ্গম।
আপনি ফক্কড় কবি বাবা নাগার্জুনের নাম শুনেছেন? ওনার কবিতা পড়েছেন?
আমি হাবার মত মাথা নাড়ি।
--বাবা নাগার্জুন হচ্ছেন আম জনতার কবি, প্রতিবাদের কবি। উনি হলেন ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে টাইপ, তাই লোকে ভালবেসে বলত—ফক্কড় কবি।
আরেকটা কারণ—ওনার কবিতায় লাগ-লপেট নেই, যা বলার সোজা সাপটা বলেন। আপনাকে ওনার “শাসন কী বন্দুক” বলে বিখ্যাত কবিতার শেষ দুটো পংক্তি শোনাচ্ছিঃ
“জলী ঠুঁঠ পর বৈঠী/ কর গয়ী কোকিলা কুক,
বাল ন বাঁকা কর সকী/ শাসন কী বন্দুক”।
শুকনো মরা ডালে বসে/ কোকিল দিচ্ছে কুক,
একগাছিও ছিঁড়তে ব্যর্থ/ ক্ষমতার বন্দুক।
ইমেজটা একটু ইয়ে মত, কিন্তু আমার হাসি পেল।
‘বিদ্রোহী’ বলে চলেছেঃ কবিতাটি নাগার্জুন লিখেছিলেন ১৯৬৬ সালে। তখন আপনি আমি কেউই জন্মাইনি।
তবে এটুকু জেনেছি সে বছর ইন্দিরা সরকারের দমন পীড়ন চরমে। পড়শি দুটো দেশের সংগে যুদ্ধের পর এল দুর্ভিক্ষ, র্যাশনেও চাল পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশ জুড়ে বিরাট খাদ্য আন্দোলন হল। গুলি চলল।
পরের বছরের নির্বাচনে অনেকগুলো রাজ্যে বিরোধী দলগুলোর মিলিজুলি সরকার হল, স্বাধীনতার পর এই প্রথম”।
--বুঝলাম। আপনার থেকে বাবা নাগার্জুনের কবিতার বই ধার নেব’খন। কিন্তু আপনি স্যারকে অমন ত্যাড়া প্রশ্ন করলেন কেন?
ওই যে, ভগবান কি এমন পাথর বানাতে পারেন যা তিনি নিজে তুলতে পারেন না?
কী ছেলেমানুষি!
ও হেসে ওঠে। --সব দোষ সুপ্রতীকের। আমার নয়। ওই উসকেছিল যে!
আমি অবাক হয়ে সুপ্রতীককে দেখি।
--বাজে কথা, আমি ওরকম কিছু করি নি।
আসলে ওকে বলেছিলামঃ -সত্তরের দশকে আব্দুল জব্বার বলে একজন লিখেছিলেন ‘বাংলার চালচিত্র’। বেশ মজার বই।
ভূমিকা লিখেছিলেন সুনীতিকুমার, ন্যাশনাল প্রফেসর, খুব বড় ভাষাবিদ।
বইটার এক অধ্যায়ে আছেঃ একজন বেয়াড়া গোছের পাগলা স্থানীয় মৌলবীকে সবার সামনে জিজ্ঞেস করেন—বল দেখি আল্লাহ্ কী কী কাজ পারেন না?
--বাজে কথা। ওনার অসাধ্য কিছুই নেই।
--পারলি না তো! আল্লাহ্ দুটো কাজ পারেন না।
এক, উনি দ্বিতীয় আল্লাহ্ সৃষ্টি করতে পারেন না।
দুই, আল্লাহ্ নিজেকে ধ্বংস করতে পারেন না।
মৌলবী অবাক; পাগলার কথাটা বেশ! কিন্তু ও পেল কোথায়? কোন কিতাবে লেখা আছে—সেটা বলুক।
--দূর! তুই হলি মূর্খের মৌলবী।
মৌলবী ঝাঁঝিয়ে উঠল—হ্যাঁ, আমি না হয় মূর্খের মৌলবী। তুমি কী? তুমি হলে লেখাপড়া জানা শয়তান।
দু’জনে খুব হেসেছিলাম। তারপর মনে হোল –হিন্দু দর্শনেও প্রশ্ন করার ঐতিহ্য আছে।
যেমন ন্যায়দর্শন বলে—ঈশ্বর আকাশ ও পরমাণু সৃষ্টি করেন নি। ওগুলো আগে থেকে ছিল। ঈশ্বরের মতই।
উনি খালি ওগুলো জুড়ে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন।
তাহলে ঘনশ্যাম স্যারকে প্রশ্ন করে দেখা যাক উনি কী উত্তর দেন।
হাতে নাতে ফল পেলাম—সাসপেনশন”!
ওর বলার ভঙ্গিতে সবাই হেসে ওঠে। ‘বিদ্রোহী’ শায়র আরেক রাউন্ড কফির অর্ডার দিচ্ছিল।
আমি বলি—আপনারা বসুন। আমি এবার যাব। পরের গলিতেই বাস স্ট্যান্ড। কাউকে ছাড়তে হবে না”।
একটা কথা পেটের মধ্যে ছটফট করছে। নাঃ, যাবার আগে এদের শুনিয়ে যাই।
“শুনুন, আমি হিন্দি কবিতা বিশেষ পড়ি নি। কিন্তু ওয়েস্টার্ন লিটারেচার কিছু পড়েছি, পড়তে হয়েছে। মনে পড়লঃ
ব্রাদার্স কারামাজোভ নভেলে দস্তয়েভস্কিও খানিকটা এই ধরনের প্রশ্ন করেছেন- - ঈশ্বর পৃথিবী বানানোর দু’দিন বাদে বললেন লেট দেয়ার বি লাইট !
তাহলে তিনি অন্ধকারে কাজ শুরু করেন”?
ক্ল্যাপ! ক্ল্যাপ! ক্ল্যাপ!
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।