২
চন্দনার কথা
কলেজে ইংরেজি সাহিত্য কম্বিনেশন ছিল। ছত্তিশগড়ের অনার্স কোর্স নেই, যা আছে তা পাসকোর্সের চেয়ে বেশি, কিন্তু অনার্সের চেয়ে অনেক কম। সে যাকগে, আমার পছন্দ ছিল একটু পুরনো ধরণের। কবি জন মিল্টন।
হ্যাঁ, কবি হো তো অ্যায়সা! একাধারে বিদ্রোহী এবং চিন্তাবিদ। ওনার প্যারাডাইস লস্ট বা স্বর্গ হইতে বিদায় পড়ে মনে হত স্যাটান বা শয়তানকে প্রায় ঈশ্বরের সমান সমান করে গড়েছেন। টক্কর বরাবরি কে!
সুপ্রতীক বলত—আমাদের বাংলাভাষাতেও আছেন অমন একজন—মাইকেল। মাইকেল মধুসূদন।
আমি সন্দেহের চোখে দেখি। হচ্ছিল জন মিল্টন, নিয়ে এল মাইকেল মধুসূদন। তা উনি করেছেনটা কী?
বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন? গণতন্ত্রের পক্ষে কিছু বলেছেন?
‘অ্যারিওপ্যাজিটিকা’র মত বই লিখে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবি নিয়ে লড়েছেন?
চোখ হারিয়েও মুখে মুখে মহাকাব্য রচনা করেছেন?
সুপ্রতীক মিটিমিটি হাসে। বলে—এত রেগে যাচ্ছিস কেন? উনি দুটো জিনিস করেছেন।
বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট; আর যেমন বললি ওনার মেঘনাদ বধ কাব্যে রাম-লক্ষণের চেয়ে উজ্বল চরিত্র রাবণের ছেলে মেঘনাদ।
অ! উনি বাংলা সাহিত্যে মিল্টনের ক্লোন! এতই সোজা?
মিল্টনের শিরদাঁড়া শক্ত ছিল। তাই চোখ গেলেও ভগবানের কাছে কান্নাকাটি করেন নি।
বরং মুখে মুখে রচনা করে কপিরাইটার দিয়ে নিজের কাজ চালিয়েছেন।
আর তোমার মাইকেল? মাল খেয়ে টল্লি! বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আবার একগাদা লেন্ডিগেণ্ডি। ফোকটে নবাবি, বিদেশে দেউলে হয়ে জেলে যাবার হাল।
বিদ্যেসাগরের কাছে টাকা চাওয়া! শিট!
আর একজন হোল হেমচন্দ্র। তোমাদের বাংলা সাহিত্যের আর একজন!
বুড়ো বয়েসে চোখ হারিয়ে ‘বিভু কী দশা হবে আমার! প্রতিদিন অংশুমালী সহস্র কিরণ ঢালি—‘,
দূদ্দুর! বাঙালিরা বড্ড ছিঁচকাদুনে।
সুপ্রতীক হাসতে থাকে। --এত হ্যাটা করিস না। চোখ মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চোখ না থাকলে যে কী হত?
--কী হত?
--দূর বোকা! তুই কী বিচ্ছিরি দেখতে সেটা টের পেতাম না।
--আর নিজে কী? উত্তম কুমার?
--একবার চোখ বুঁজে দেখ। মনে হবে ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা। দুনিয়াটা আছে কী নেই সন্দেহ হবে।
একবার বুঁজে দেখ। বেশি না,এক মিনিট। ব্যস্।
আমিও মজা ভেবে চোখ বুঁজলাম। পাঁচ সেকেন্ড। সুপ্রতীকের গরম ঠোঁটের ছোঁয়াতে আমার চোখ খুলে গেল।
ও একটা মিটমিটে শয়তান। মিল্টনের স্যাটান কি?
আরে মিল্টন নিয়ে বলতে বলতে এসে গেছি সুপ্রতীকের কথায়।
ওর কথা পরে বলা যাবে, আগে মিল্টন। মম জীবন যৌবন।
যা বলছিলাম, মিল্টনের বর্ণনায় বাবা আদম ও মা ঈভ বড্ড ন্যাকাচৈতন টাইপ।
কীসে থেকে কী হয়-- কিছুই বোঝেন না।
না বুঝে আপেল খেয়ে কেলো?
আমাদের চপলা মাসির ভাষায় বলতে গেলে—‘নেকী মাগি তোর কয় ছেলে? ছোটটাকে ধরে নয় ছেলে’।
ও হো, চপলা মাসি! ও হল এই ছত্তিশগড়ের মরুভূমিতে মরুদ্যান—আমার মায়ের জন্যে।
মাসি রায়পুর শহর থেকে পনের কিলোমিটার দূরের মানা জনপদের রিফিউজি ক্যাম্প থেকে এসেছে। থাকে আমাদের পাড়ায়।
আর আমাদের মত তিন তিনটে বাড়িতে ঠিকে কাজ করে। তবে আমাদের বাড়িতে বেশি সার্ভিস দেয়।
আমার ছোটবেলা থেকে মাসিকে দেখে আসছি। মা ওকে চা দেয়, রুটি তরকারি দেয়। ও গুছিয়ে মেজেতে বসে খায়।
গান শোনায়, গল্প শোনায়। ওর জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প। বাবা ওকে বলে আনকাট ডায়মন্ড।
বাবা ডাক্তার, আয়ুর্বেদের। না, না—আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। বাবা ওই বিনা ছুরি কাঁচিতে অর্শ-ভগন্দর অপারেশন করা চাঁদশী ডাক্তার নয়।
বাবার চেম্বারে কোন সাপের ছবিওলা ‘নাগমাতা দাওয়াখানা’ লেখা সাইনবোর্ড ঝোলানো নেই।
রীতিমত রায়পুরের সরকারি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অফ আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি পাশ করেছে।
চার বছরের কোর্স, দেয়ালে সার্টিফিকেট টাঙানো আছে, রেজিস্ট্রেশন নম্বর আছে। অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ দেবার পারমিশন আছে।
পশার? মন্দ নয়।
আমরা থাকি রায়পুর শহরের উপকণ্ঠে একটি গ্রামে, ন্যাশনাল হাইওয়ের কাছে। সেখানে অন্য ডাক্তার নেই।
কিন্তু আনকা পাবলিক বাবা যে কীরকম ডাক্তার সেটা বোঝে না। ওদের কাছে বাবা হল চাঁদশী ডাক্তারের মতই বাঙালি ডাক্তার। গরীবের ডাক্তার।
পাবলিক চায় তাগদ কী সুজি –মানে শক্তি বাড়ানোর ইঞ্জেকশন, খারাপ রোগের চিকিৎসা আর বলে --বোতল চড়া দীজিয়ে। শুইয়ে দিয়ে গ্লুকোজের বোতল দিন।
এসব চাইলে বাবা আগে ভাগিয়ে দিত।
তখন ওরা পাশের গ্রামে পাসোয়ান ডাক্তারের কাছে যেত। বলত, যে ইঞ্জেকশন দেয় না, বোতল চড়াতে জানে না—সে আবার ডাক্তার!
বাবা ধীরে ধীরে লাইনে চলে এল। কিন্তু এসব করে খুব বেশি পয়সা নিত না। বোধহয় মাথায় কোন পোকা নড়ত।
বলছিলাম চপলা মাসির কথা।
আমার ছোটবেলায় বাবা নিয়ে এল ট্রানজিস্টর রেডিও। সে যে কী অবাক কাণ্ড, কী আনন্দ তা আজ টেলিভিশনের দিনে বলে বোঝাতে পারব না।
আমরা পাগল হয়ে গেলাম। বাবা শোনে খবর, মা আর আমি গান।
মাঝেমধ্যে চপলা মাসি গান শুনতে শুনতে বলে, ‘বৌদি, এর ভেতরে কোন ছোট বাচ্চা বসে গান গায়? কোন দিক দিয়ে ঢোকে’?
আমি আর মা হাসি। মা অনেক বোঝায়। মাসি বুঝভম্বুল হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। শেষে বলে—আমি বোকা তো, তাই বুঝতে পারি না।
মা ধমকে ওঠে—কে বলেছে তুমি বোকা?
--লিচ্চয় বোকা। হদ্দ বোকা। নইলে আমার মরদ আমাকে ছেড়ে যায়?
তারপর মাসির শুরু হয় পতিপুরাণ। ও ছিল মাসির দু’নম্বর। প্রথমটা ছিল বেকার। নানারকম ছোটখাটো কাজ করত। তারপর একদিন ভেজাল মদ খেয়ে মরে গেল।
না, কোলে কোন বাচ্চা দিয়ে যায় নি। মাসির তখন সোমত্ত বয়স।
এই ‘সোমত্ত’ কথাটা আমার কানে কেমন যেন সুরে বাজে নি। কিন্তু মানে যে কী—অভিধানে কী লেখা-- আজও জানি না।
তবে মাসির বলার ভাবে ভঙ্গিতে খানিকটা কাজ চালানোর মত বুঝে গেছি।
মাসির ‘পতি পুরাণ’ একেবারে পাঁচালি পড়ার মত। একবার শুরু হলে আর--। মা কথা ঘোরাতে চায়, বলে—চপলা, একটা গান শোনাও।
মাসি গলে যায়। মা ওর দিকে একখিলি পান এগিয়ে দেয়। মাসির মুখ তখন হাসি হাসি। মুখে পান রেখে গাইতে থাকেঃ
“মন চল যাই ভ্রমণে, কৃষ্ণ অনুরাগের বাগানে।
সেই বাগানের তিনজন মালি।
একজন উড়ে, একজন খোট্টা, আর জন বাঙালি।
তারা সবে মিলে যতন করে-এ-এ-এ,
(ভোলা মন! ও ভোলা মন!)
গাছ উঠে তাই আসমানে,
কৃষ্ণ অনুরাগের বাগানে”।
মা বলে -চপলা, তোমার গলায় সুর আছে। কিন্তু গানের কথাগুলো একটু এদিক ওদিক।
--কী করব বৌদি, বোকাসোকা মেয়েমানুষ; বিদ্যে চার কেলাস। তোমাদের মত লেখাপড়া শিখি নি।
আমাদের রেফুজি ক্যাম্পে একজন বৈরাগী খঞ্জনি বাজিয়ে ভিক্ষে করতে ঘরে ঘরে যেত।
ও যেমন গাইত তাই মনে আছে।
একবার হল কী জানো? আমার মানুষটা বাইরে থেকে এসে ভর দুপুরে দোরে খিল তুলে দিল। আমি তো ভয়ে কাঁটা।
তারপর যা হোল--।
বাকিটা আর শোনা হয় নি। মা হঠাৎ খেয়াল করল আমাকে।
--অ্যাই, এখান থেকে যা। ও ঘরে গিয়ে বইখাতা নিয়ে বোস। হোমটাস্ক কর। আমি এসে দেখব।
--কখন হয়ে গেছে।
--ঠিক আছে, বাইরে খেলতে যা!
--বড্ড রোদ মা।
মা এবার ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
--এখান থেকে যা বলছি, হাঁ করে বড়দের গল্প গিলতে হবে না।
ব্যাজার মুখে সরে যাই। গল্প তো শুনতে হয়, গিলতে হবে কেন? বড়রা একেক সময় এমন আনতাবড়ি কথা বলে না! কিন্তু কৌতূহল বেড়ে যায়।
পাশের ঘর থেকে কান পাতি। মাসির গলা বেশ খাদে নেমে গেছে। দুয়েকটা কথা কানে আসে।
--প্রথম প্রথম বড্ড কষ্ট হত বৌদি।-- যেন হাতুড়ির বাঁট, বড় ব্যথা। --- ওর যে রোজ চাই, আমার পোষাতো না। --মানা করলে মারত, চুলের মুঠি ধরে।
শুনতে শুনতে মুখটা হাঁ করে কখন যেন নিজের অজান্তে দেয়াল ঘেঁষে মায়ের কামরার দিকে এগিয়ে গেছি।
চপলা মাসির ফিসফিস কথা চলছে। মা বেড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে এসে আমার চুলের মুঠি ধরল।
কয়েকটা বছর কেটে যাবার পর আমি আর মা বন্ধু হয়ে গেলাম।
না হয়ে উপায় নেই। মাথায় মাকে ছাড়িয়ে গেছি। ক্লাসে ডিবেট আর মাঠে কাবাডি, খো খো এবং লং জাম্পে নাম হয়েছে।
আরও কিছু হয়েছে। ক্লাস টিচার আমাকে স্কার্ট ছেড়ে হয় শাড়ি, নয় সালোয়ার কামিজ পরে আসতে বললেন।
মায়ের বন্ধু না হয়ে আমার উপায় ছিল না।
আমার সঙ্গের মেয়েরা আমাকে চিমটি কেটে কথা বলতে লাগল। ছেলেরা নাকি যেচে আলাপ করতে চায়। আমি এসব খেয়াল করি নি।
একদিন আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল স্বস্তিকা আমায় বলল, ‘আপন মাংসে হরিণা বৈরী, খনক না ছোড়য়ে ভুসুকু আহেরি”। অন্যেরা হেসে উঠল।
আমি বিরক্ত হয়ে জানতে চাইলাম—হয়েছেটা কী? কার পাকা ধানে মই দিয়েছি?
কেউ ফুট কাটল—তোর কী ফিগার মাইরি! বাড়িতে কী খাস রে? কাজু-পেস্তা-কিসমিস?
মায়ের বন্ধু না হয়ে আমার উপায় ছিল না।
মায়েরও উপায় ছিল না। পাশের বাড়ি মিনু কাকিমা একদিন মায়ের সংগে গল্প করতে এলেন।
আমি তখন স্কুল থেকে ফিরে কিছু খেয়ে জামাকাপড় বদলে কোচিং যাব। সামনে উচ্চ মাধ্যমিক যে!
আমাকে ঢুকতে দেখে সবার কথা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি হেসে কেমন আছ কাকিমা বলে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলাম।
জামাকাপড় ছাড়ছি, কানে এল—এখনই পার করে দাও দিদি। আমার ভাসুরপো পুণে থেকে ক’দিনের জন্যে বাড়ি এসেছে। ওরা দূর থেকে দেখেছে।
ভাসুর ঠাকুর বলছেন—কোন পণ দিতে হবে না। এককাপড়ে আমাদের বাড়ি এসে উঠবে। বিয়ের পর সোজা পুণে।
সেখানে গিয়ে যত ইচ্ছে পড়াশুনো করুক। আমাদের কোন আপত্তি নেই। অমন লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে।
চপলা মাসির গলা— বৌদি, হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই। মেয়ে দিনদিন ধিঙ্গি হচ্ছ, ঘরে বাইরে কথা উঠছে।
মা’র গলা শুনলাম। মাসিকে ধমক দিয়ে বলছে—চুপ কর চপলা। যা বোঝ না তা নিয়ে—
মাসি কেমন মিইয়ে যায়। --ঘাট হয়েছে বৌদি। তোমার ভালর জন্যে বলছিলাম, নইলে আমার কি! হ্যাঁ, আমার বুদ্ধি নাই, আমি হদ্দ বোকা।
নইলে আজ আমার এই হাল! সেই যে বলে—‘ এতই তোর বুদ্ধি হলে, আজ কেন তোর ক্যাঁতা বগলে’?
--ফের শুরু করেছ? যাও, গিয়ে চা বানিয়ে আন।
বৌদি! আমার মাকে বলছে? নাকি মিনু কাকিমাকে? কে জানে কার কথা বলছে!
মিনু কাকিমা আমাদের পাড়ার পোস্ট অফিস। সবার হাঁড়ির খবর রাখেন।
কোচিং থেকে ফিরে দেখলাম মা একটু গম্ভীর। জিজ্ঞেস করায় কিছু বলল না। রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেল। বাবা আর মা চাপা গলায় ঝগড়া করছে।
এরকম আগে কখনও দেখি নি। ওরা কথা কাটাকাটি করে, কিন্তু খোলাখুলি। চাপা গলায় নয়।
বাবা বেশ উঁচু গলায় বলে, কিন্তু মা ঠিক মত ঝগড়া করতে পারে না। দু’একটা কথা বলে। তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদে।
অমনই বাবা গলে জল। বলে—কি এমন বলেছি খুকু?
বড় হতে হতে বুঝে গেছি খুকু হল বাবার মাকে দেয়া নিজস্ব নাম।
আমি কতবার মাকে খেপিয়েছি—‘ভোর হোল দোর খোল, খুকুমণি ওঠ রে”।
মা কপট রাগে আমাকে হাত পাখা দেখিয়ে হেসে ফেলত। কিন্তু আজকের ঝগড়া অন্যরকমের।
চাপা গলায় এবং মা বেশি বলছে, কড়া সুরে কেটে কেটে।
আমার কেমন ভয় করতে লাগল। সটান ওদের শোবার ঘরে ঢুকে বললাম—কী হয়েছে?
দুজনে থতমত খেয়ে চুপ করে যায়।
বাবা জোর করে হেসে বলে—আমাদের কথায় তোর ঘুম ভেঙেছে? ও কিছু না, যা! গিয়ে শুয়ে পড়।
আমি মাথা নাড়ি। হয়েছেটা কী? আমি জানতে চাই।
দুজনেই চুপ।
মা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা একবার আমাকে দেখে, ফের বিছানার চাদর হাত দিয়ে টান টান করতে লেগে যায়।
শেষে একটা সিদ্ধান্তে এসে বলে—বেশ, শুনে যা। আফটার অল, তোকে নিয়েই কথা যখন--।
আমি চমকে উঠি। আমাকে নিয়ে? মাঝ রাত্তিরে?
মা মুখ খোলে—শোন, চিনি। তোর একটা ভাল সম্বন্ধ এসেছে। কোন পণ দিতে হবে না। তোকে দেখে পছন্দ করেছে।
ভাল ঘর, শিক্ষিত লোক। জামাই বড় কাজ করে। মুম্বাইয়ের কাছে, পুণেতে। তোর পড়াশুনো আটকাবে না। ওখানে পড়বি।
--বিয়ের কথা? ওসব এখন আমার সিলেবাসে নেই। এখন উচ্চ মাধ্যমিক দিচ্ছি।
তারপর কলেজে যাব। গ্র্যাজুয়েট হব।
ফের পছন্দের সাবজেক্টে মাস্টার্স করে পিএইচডি করব। আর এই নিয়ে তোমরা মাঝরাত্তিরে ঝগড়া করছ?
--দেখ, তোর বাবা রাজি হচ্ছে না। বলছে একটিই মেয়ে। ও যতদূর চায় পড়বে। তারপর দেখা যাবে।
কিন্তু এখন নতুন নতুন অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার দোকান খুলে বসেছে। তোর বাবার পশার দিন দিন কমছে।
পরে কী হবে জানি না। তাই এমন সুযোগ--। কিন্তু তোর বাবার সেই এক কথা।
--একটা মাত্র মেয়ে। অত দূরে পাঠাতে পারব না।
--অ, এটাই আসল কথা? দিন দিন রোগী কমছে। লোকে বলে হাতুড়ে ডাক্তার। আর তুমি ফীস বাড়াবে না।
ক’দিন পরে পোস্ট অফিসে জমানো টাকাতে হাত পড়বে, সে খেয়াল আছে?
তখন মেয়ের বিয়ে দেবে কী করে?
বাবা খিঁচিয়ে ওঠে—হাতুড়ে ডাক্তার! কে বলেছে খুকু? আমি সরকারী আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে রীতিমত চারবছর পড়ে ডিগ্রি পেয়েছি।
জেলা হাসপাতালে আয়ুর্বেদ ডাক্তারের পোস্ট আছে। ডাক্তার মহাপাত্র আমার ব্যাচমেট।
--সে তুমি যাই বল। আজ মিনুদি এসেছিলেন। বললেন পাড়ায় তোমার নাম হাতুড়ে ডাক্তার।
--আচ্ছা, সে তোমার গুরুঠাকুর? ও নিজে কলেজেই যায় নি। খুকু, তুমি ওর কথা মেনে নিচ্ছ?
আমার চেম্বারে রীতিমত রেজিস্ট্রেশন আর ব্যাচেলর অফ আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি পাশ করার সার্টিফিকেট টাঙানো আছে।
সে’সব দেখার পরও?
--ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি কলেজে পড়া ডাক্তার, হাতুড়ে নও। এখন মেয়ের বিয়ের কথা।
কাল মিনুদি এলে কী বলব? যাবে ওদের বাড়ি? ওনার ভাসুরের সংগে কথা বলতে? তারপর হবু জামাইয়ের সংগে আমাদের চিনির একদিন দেখাসাক্ষাৎ করিয়ে দিতে?
ছেলেটা শিগ্রি পুণে ফিরে যাবে।
বাবা বিধ্বস্ত; বাবা এই নাটকে হেরে যাওয়া কাটা সৈনিক।
সেদিন যে কী হয়েছিল! না, না; দিন নয়--সেই রাতে, মাঝরাতে।
কী তিথি জানা নেই, তবে সেদিন আমার জিভে দেবী সরস্বতী ভর করেছিলেন।
আমি মাপা পায়ে বিছানায় গিয়ে বাবার পাশে বসি। বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। তারপর দাঁড়িয়ে উঠে মায়ের দিকে তাকাই।
আমার গলার স্বর শান্ত, যেন ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে জানা অংক কষে দেখাচ্ছি।
--এত চিন্তা করার কিছু নেই মা। আমাকে পাঁচটা বছর দাও। তারপর বাবাকে আর চেম্বারে বসতে হবে না।
আমিই সংসারের দায়িত্ব নেব। অনেক খেটেছে।
মায়ের গলা চড়ে।
--তুই? সেদিনের পুঁচকে মেয়ে! তুই আমাদের সংসার সামলাবি? যা, পুণেতে গিয়ে একবার নিজের সংসার কর। তখন দেখবি কত ধানে কত চাল!
ওটা হেলাফেলার কথা নয়।
--মা, এভাবে বোল না। এখন ইংরেজির বাজার। ভাল চাকরি পাব। কলেজে বা স্কুলে, ভাল মাইনে।
কলেজে ভর্তি হয়ে টিউশন করে সংসারে টাকা আনব। কোন টেনশন নিও না।
--আর বিয়ে?
--এখন তো নয়। পরে দেখব।
--হ্যাঁ, ততদিন পাড়ায় তোকে নিয়ে নানান কথা শুনে মুখ বুঁজে থাকতে হবে। কিল খেয়ে কিল হজম করতে হবে।
এটাই চাস?
--মিনু কাকিমা তোমার মাথা খেয়েছে। ওনাকে আর আশকারা দিও না।
ঘটকালি করতে চান তো অন্য বাড়ি দেখুন। তুমি নিজের মেয়েকে বিশ্বাস কর।
ফালতু চাপ নিচ্ছ কেন?
(চলবে)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।