শিশু
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এলাহাবাদ পাবলিক লাইব্রেরিটি একটু ঘুরে যাওয়ার ইচ্ছে। তার পোশাকি নাম
থর্ন হিল মেইন মেমোরিয়াল (Thornhill Mayne Memorial)। এই বাড়িটি ১৮৭০ এ শেষ হয়, যদিও লাইব্রেরীটি আরও আগেই স্থাপিত হয়েছিল -সেই ১৮৬৪ সালে। ১৮৭৯ থেকে এই বাড়িটিতেই লাইব্রেরি। ব্রিটিশ রাজের সময়ে এলাহাবাদের বিকাশে থর্ণহিল সাহেব আর মেইন সাহেবের অবদানকে মনে রেখে এর এমন নাম। গিয়ে দেখি সদর গেট বন্ধ। অগত্যা এপাশ থেকেই তার মধ্যযুগীয় দুর্গের মত গথিক স্থাপত্যটি উপভোগ করে খুশি থাকতে হয়। একটু একটু যেন গা ছম ছম করে এমন প্রাসাদের সামনে দাঁড়ালে! আলাদা আলাদা গম্বুজের মাথাগুলি যেন মেম সায়েব ডাইনিবুড়ির ছুঁচলো কালো টুপি! তবে ভিতরে ঢুকে আলোয় আলোয় বইয়ে বইয়ে নিশ্চই সব ভয় দূর হয়ে যায়!
এই পার্কেও একটি লাইম স্টোনের ছোট্ট ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল রয়েছে, তবে কোলকাতার সঙ্গে তার তুলনা চলেনা।
এবার একটি টোটো নিয়ে চলে যাবো আনন্দ ভবনের দিকে। সন্ধ্যে ছটায় বন্ধ হয়ে যায় সেটি। সেই পঞ্চাশ টাকার রিজার্ভ চুক্তিতেই বাচ্চা চালক নিয়ে যেতে থাকে কমলা নেহরু রোড ধরে। প্রায় আয়তাকার আজাদ পার্কের লম্বা বাহুটি আমাদের ডানদিকে চলতে থাকে,তারপর একটু ডাইনে মোচড় দিয়ে আমরা ধরবো থর্নহিল রোড, পার্কের ছোট বাহুটিকে ডানদিকে রেখে এগোবো। এ পথেই এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান বিভাগটি। এর পর বাম দিকের কোনে যখন ভরদ্বাজ পার্ক এসে যাবে আমরা বাঁয়ে মোচড় দেবো আর একটু এগিয়েই ভরদ্বাজ আশ্রম পেরিয়ে সামনে ডানদিকে পাবো আনন্দ ভবনের গেট।
এ আশ্রমও আমাদের প্রায় ইতিহাসের (Proto history)রসদ। কতবার শোনা গল্প! বনবাসে যাওয়ার পথে এ গুরুকুল আশ্রমে রাম লক্ষ্মণ ও সীতা দেখা করলেন ভরদ্বাজ মুনির সাথে। পরম স্নেহে তিনি তাঁদের আশ্রয় দিলেন। তাঁর পথ নির্দেশেই এখান থেকে তাঁরা চিত্রকূট চলে গেলেন। তারপর ভরত মন খারাপ করে রাম লক্ষ্মণ সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে ভরদ্বাজের আশ্রমে পৌঁছলেন। তিনি ভরতের আসল উদ্দেশ্য আগে যাচাই করে তারপর তার স্বচ্ছ, সৎ, ভক্তিভরা হৃদয়টির পরিচয় পেয়ে তাকে আশীর্বাদ করলেন। কতনা বন, পাহাড়, নদী সাগর আর তাদের জড়িয়ে মড়িয়ে থাকা ইতিহাস আর প্রায়-ইতিহাস! সাধারণ বোধশোধ আর নৈতিকতার সহজ পাঠ দিয়ে এসেছে তারা। আবার তর্ক করতেও শিখিয়েছে।
পেটে এখন ছুঁচোয় ডন মারছে। উল্টোদিকে রোমিনোস এ একটু সয়া চাংক পিৎজা খেয়ে নিলাম। দিব্যি। ৯৫ টাকা করে একেকটা। ডোমিনোস এর ভাই কি? কেউ বলতে পারবে?
আনন্দ ভবনের টিকিটের দামটা অদ্ভুত লাগলো একটু।আনন্দ ভবনের,স্বরাজ ভবন মিউজিয়াম সহ পুরো চত্বরটি জন্য মাথা পিছু ৪০টাকা। কিন্তু আনন্দ ভবনের দোতলায় যেতে চাইলেই সেটা ঝপ করে ১৪০টাকা! নেহরু তারামণ্ডলের আলাদা টিকিট। আমরা কিছুই ছাড়বোনা পণ করে এসেছি। তাই ১৪০টাকাতেই টিকিট কাটা গেলো। রোদ তখন কমলা হয়ে এসেছে।তাড়াতাড়ি করতে হবে।আগে দোতলা। সাদা ফরাস এর তাকিয়া পাতা কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ঘর,তার বিশাল বুক সেলফ সামনের বড় বারান্দা মুখী মাঝের ঘরটিতে।তার বাম দিকের পেছনে মহাত্মার ঘর ইন্দিরার ঘর।মহাত্মার পাশে বসা আলহাদী করা বালিকা ইন্দিরার সেই বিখ্যাত ছবি। ডান দিকের পেছনে পণ্ডিত পরিবারের, বিশেষ করে জওয়াহরলালের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসগুলি - জামা কাপড়, বিখ্যাত সেই জহর কোট,পা গরম করবার মেশিন থেকে ইলেকট্রিক রেজর। পেছনে জওয়াহরলাল এর ঘর।প্রতিটি ঘর ছিমছাম, বই ভর্তি তাক,লেখার টেবিল চেয়ার আর সাদামাঠা বিছানা। এমন ঘর আমারও পছন্দ। সিকিউরিটি বকা দিলো ছবি তুলতে গেলে। বারান্দার পেছনে একটু দূরে দেখা যায় স্বরাজ ভবনের ছড়ানো সাদা বাড়িটি যা পণ্ডিত পরিবারের আদি বাড়ী। মস্ত বড় তার উঠোন, তেমনি তার ছাদ।ইন্দিরার জন্ম সেখানেই। সে বাড়ি কংগ্রেস কে দান করে মতিলাল বানিয়েছিলেন এই অনবদ্য শৈল্পিক স্থাপত্যের আনন্দ ভবন। কত ইতিহাসের কত মানুষের আনাগোনার স্বাক্ষী এ বাড়ী!
নিচের তলায় মতিলালের বৈঠকখানা, শোবার ঘর, তাঁর অসুস্থতার টানা চেয়ার খানি। আনন্দ ভবনের পেছনে স্বরাজ ভবনের দিকে এগোতেই বাধা। সেটি নাকি পাঁচটাতে বন্ধ হয়ে যায়! আমাদের তো গেটে বলা হয়নি, টিকিট ও বিক্রি হয়েছে! আরও দু তিনটি দল এসেছিল। উষ্মা প্রকাশ করে তাঁরা। রয়ে বসেতো সবাই আসেনা এলাহাবাদ দেখতে! কিছুতেই আর ঢুকতে পারিনা। একটু মন মরা হয়ে বেরিয়ে আসি।
বাইরে ফুটপাথে চায়ের দোকানের ছোট্ট টুলে বসে চা খাই,পাশের ঝালমুড়ি ওয়ালার কাছ থেকে একটা ঝালমুড়ি কিনি। গপ্প চলে।রাস্তা দিয়ে মানুষের স্রোত।ঠাকুর যাচ্ছে বড় বড়। মা দুগ্গা,গণেশ, হনুমানজি।উল্টোদিকে পুজো প্যান্ডেলে আলো জ্বলে উঠছে।বেশ লাগে। তারপর মনে হয় কাটরা যাই। কী নেই সেখানে! তবে জাঙ্ক জুয়েলারি মূল লক্ষ্য। উল্টোদিকের ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়াই অটো টোটো কিছু একটার জন্য। কিন্তু কেউ আমাদের নিতে চায়না। ওদিকে বড্ড নাকি জ্যাম।তারপর ফরিস্তার মত এক অটো দাদা বাৎলে দেন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার পেছন দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে ওটা ধরে এঁকে বেঁকে হেঁটে হেঁটে চলে যেতে। কলোনেলগঞ্জ রোড।বারে বা! বুদ্ধি তো অনেকেরই থাকে,তবে
হ্যাঁ আর
না এর মধ্যে যে আরও অনেক রাস্তা থাকে সেগুলি কটা লোক আর চিনতে পারে? আর চিনে অন্যকে বলেই বা কটা লোক? অটোদাদাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সোজা হাঁটা মারি।
যেকোনো শহর গঞ্জের নিজস্ব রাস্তা,বাজার খুব টানে।বেশ লাগে সেই সন্ধ্যার পথ চলা। মুদি বাজার, মশলা,বিশুদ্ধ সর্ষের তেল ছাড়িয়ে সারি সারি ময়রার পট্টি, মন্দির খানিতে ধাক্কা খেয়ে ডান দিকে বেঁকে কুমোর পট্টি -- পিদিম গুলি- বড়,মেজো, ছোট, ঘট, পাত্র, রাশি রাশি। কুমোর পাড়ায় ভিজে মাটি, পোড়া মাটির মধ্যে বেড়ে উঠেছি। বড্ড আরাম লাগে। তাদের মাঝে বসে আছেন যিনি, তাঁকে দেখে চমকে উঠি! সেই এক হারা মুখ, টিকোলো নাক, রগের কাছে কিছু সাদা হয়ে যাওয়া চুল!কথা শুরু হয়
ক্যা চাহিয়ে থেকে, আর কথার প্রসঙ্গেঃ ইঁ
হা কৌন হ্যায় তেরা…। যদি বলি চুপ করে এখানটায় দাঁড়িয়ে থাকতে চাই? কেউ নেই আর এখানে আমার?
কোথায় যে কোন মাতৃমুখ এসে দেখা করে যায় চলতে চলতে!
আরও এগিয়ে আড়াআড়ি আরেক রাস্তা,আরও জমজমাট। সেটিই কাটরা রোড। জমে উঠেছে যাত্রা।রাস্তার ধারে স্ট্রিট ফুডের ছড়াছড়ি। তেমনি কিছু দোকান হাতে বেলা গরম রুটি, ডিমের কারি ঝকঝকে গামলায়।চালু দোকান। মন আর অভিজ্ঞতা বলেঃ নিয়ে নাও। চল্লিশ টাকায় ডিমের কারি প্লেট। দুটো ডিম। আলু নেই কিন্তু। রাতে ফিরে আবার নতুন করে খাবারের সন্ধান কে করে? আমাদের ডেরার চত্বরে দেখিনিতো তেমন কিছু ও। মিষ্টি আছে, চলমান মোমো আছে যদিও। কাটরা রোড ধরে এগোতে থাকি আর হাঁটতে হাঁটতে আড়াআড়ি কেটে যাওয়া ইউনিভার্সিটি রোড পেরোই। ওড়না,জুতো,কুর্তি,গয়না, কাঁচের চুড়ি। কাঁচের চুড়ির শব্দের মত হাসি নিয়ে মেয়েগুলি কেনাকাটা করছে। চুড়ির দোকানে ভিড়ে ঢুকতে পারিনা। বাইরে স্টলেও রং বেরঙের মেলা। চোখ টানে স্বচ্ছ সাদা কাঁচের বালা - ভিতরে ফুটে আছে লাল,গোলাপি ফুল। নিয়ে ফেলি দু জোড়া। রাখতে পারবো তো,ভেঙে যাবেনা তো? ভাবতে ভাবতেই ডিমের কারির ছ্যাঁকা খেয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাই আরও। এ রাস্তা আবার গিয়ে পড়েছে সেই ঘুরে আসা কমলা নেহরু রোডে। টোটো ধরে ফেলি। অলি গলি চলিরাম হয়ে আবার ব্রিটিশ কোঠি।
চুড়ি নেহি মেরা,দিল হ্যায়...
সে রাতে হালকা ডিমের ঝোল আর গরম রুটি ভারি শান্তিতে খেয়েছিলাম।রুটিটা এনেই কেটল এর মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম।
বলে রাখা ভালো, আমাদের এই সামগ্রিক খাদ্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আমরা বিশেষ কোনো বৈপ্লবিক ঘরানা জাহির করতে চাইনি নবরাত্রির সাজে সেজে ওঠা প্রয়াগরাজে। একটা মোটামুটি নিরীহ অভ্যস্ত পথে, খুব বেশী এডভেঞ্চার না করে, উদর পূর্তি ই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। এ পথে দুটি জিনিস এড়াতে চেয়েছি শুধুঃ অতিরিক্ত দুগ্ধজাত ও অতিরিক্ত ঝাল মশলা স্নেহ সিঞ্চিত কষানো ডাল বা সবজি। সাধারন ডাল সবজি আর সাদা ভাত ও অনেক সময় অমিল হয় বিশেষ জায়গায় বিশেষ পরিস্থিতিতে। পয়সা খরচ করলেও।
পথে নামলে পথই বলে দেয় কোন পথটি ধরলে মন্দের ভালো। ভুল ও হয় অনেক সময়। দলের সাথে থাকলে আলাদা নির্ভরতার আশ্বাস থাকে। এখানেতো তা ছিলনা!