এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  ইস্পেশাল

  • ছাতিমবাগান

    কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়
    গপ্পো | ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ২০ বার পঠিত
  • উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫ | বাঙালির লোকায়ত উৎসবঃ ঝুলনযাত্রা | ছাতিমবাগান

    ছবি: ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক




    নিয়মভঙ্গ পর্যন্ত সব নিয়মমতো চলেছিল। কেউই হলুদ হাওয়াই শার্ট বা লাল বেনারসি পরে চলে আসেনি, হা হা হাসেনি, কলকাতার অফবিট বনেদি বাড়ির শ্রাদ্ধের রিল বানায়নি। বেগুনি ব্যাপারটা যে ঠাণ্ডা হলে খাদ্য পেরিয়ে অখাদ্যের রাজ্যে যাত্রা করে পাশের লোকের সঙ্গে চর্চার ইচ্ছে চেগে থাকলেও চেপে দিয়েছে। ঐকমত্যে পৌঁছেছে, ভালোই হয়েছে একদিক থেকে। কষ্ট পাচ্ছিল। যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক।

    দরকার পড়লেই ফোন কোরো। বিপদের সময় নিজের লোকই তো পাশে থাকে। সকাল থেকে নিশ্চয় পেটে কিছু পড়েনি?

    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নাটক চলছে। রোল বদলায়। সব রোলের সব সংলাপ সবার মুখস্থ বলে অসুবিধে হয় না। আফটার অল, স্বাভাবিকত্ব রক্ষা একটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ প্রযোজিত ও পরিবেশিত একটি পূর্বনির্ধারিত পারফরম্যান্স। একসময় যৌবনদৃপ্ত ঔদ্ধত্যে এইসব পারফরম্যান্সকে মনে মনে নিচু চোখে দেখতেন সমর দত্ত। যখন নিজেকে মনে মনে বাকিদের থেকে বেটার মনে করতেন। পঞ্চাশ পেরিয়ে বুঝেছেন একটা মাছি যতটা অন্য মাছির মতো তার থেকেও বেশি তিনি তাঁর সহমানবদের মতো। কাজেই অস্বস্তির কান মুলে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছেন।

    কঠিন। তেরোদিন ধরে বডি ল্যাংগোয়েজে বিষাদের বাটখারা ঝুলিয়ে ঘোরা। সে ভারবহনের ক্রমবর্ধমান ক্লেশ এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্লেশমুক্ত হওয়ার আসন্ন আনন্দের টানটান দড়িতে হাঁটার স্ট্রেসেই সম্ভবতঃ দিনের অপ্রত্যাশিততম ঘটনাটা সমর দত্তের স্মৃতিতে চাপা পড়ে গেল। ভেসে উঠল যখন এই সব মুহূর্তরা সাধারণতঃ ভেসে ওঠে। রাত তিনটে সতেরোয়।

    অনেক কারণে তিনটে সতেরোয় ঘুম ভাঙে। বাথরুম পায়, গরম লাগে, কুকুর ডাকে, মাতাল চেঁচায়। সাতটা বোমা পরপর ফাটে, অন্তে তুবড়ির ঝিরঝির শুনে বোঝা যায় উদযাপন। সে রাতে ঘুম ভেঙে এই সব চেনা কোনও অনুঘটক সমর দত্ত চিহ্নিত করতে পারলেন না। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কড়িকাঠের ছকে ড্যাম্পের কাটাকুটি দেখতে দেখতে, এক দুই তিন গুনতে গুনতে, পনেরোতে পৌঁছে ঘটনাটা ঘটল। পাঁচহাজার পঞ্চান্নবার চর্বিত শোকের ধাক্কাধাক্কি থেকে উজ্জ্বল একাকীত্বে সরে দাঁড়াল তিনটে বাংলা শব্দ, একটা ইংরিজি শব্দ, একটা কমা, একটা দাঁড়ি, একটা মুচকি হাসি।

    অভিনন্দন, লাস্ট দত্ত স্ট্যান্ডিং।

    *


    বক্তব্যটি অপ্রত্যাশিত, উৎসটি নয়। পিসিমা আজীবন প্রত্যাশিতর পাশ কাটিয়ে চলেছেন। অতটাও দূর দিয়ে নয় যাতে লোকে ‘এইও বহিরাগত’ লাফিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে, ততটাও কাছ ঘেঁষে নয় যাতে পিসিমার রকমসকম সমাজের সামগ্রিক মূল্যবোধ মেন্টেন্যান্সে সহায়ক নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। পিসিমার বাঁজাত্ব ঈশ্বরের মার বলে উদারতার ভাণ্ড উপুড় করতে সবাই রেডি ছিল। পিসিমা এমন ভাব দেখালেন যেন ও সব উদারতাটুদারতা নয়, বেসিক শিক্ষাদীক্ষা। এককুচি কৃতজ্ঞতা দাঁতের ফাঁক দিয়ে বার করলেন না। পরের ছেলেপুলেকে নিজের মতো ঘোষণা করে টিফিন গোছাতে বসলেন না। দরজা দিয়ে পর্দা টেনে ফ্যান তিনে চালিয়ে বালিশ বুকে শার্লক হোমস পড়তে গেলেন। একফোঁটা অপরাধবোধ আঁচলের কোণায় লেগে থাকল না। সবাই বিরক্ত হল। অপরাধবোধের আঁচ না পোহানো গেলে অপরাধ মকুবের মজা কিরকিরা।

    হাসির কথায় পিসিমা সবার হাসি থামার পাঁচ সেকেন্ড পর হাসতেন, কাজেই কীসে হাসলেন অস্বস্তি থেকে যেত। আবার কোনও হাসির কথায় - যা কোনও দিক থেকেই হাসির নয়, কারওরই হাসি পায়নি, শুধু বক্তার পদমর্যাদারক্ষার্থে সবাই হেসেছে - হাসতেন না। হয় বিস্মিত নয় চিন্তিত মুখে বক্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ফস্‌ করে কিছু বলে বসে পাছে পরিস্থিতি অকওয়ার্ড করে ফেলেন সেই ভয়ে সবাই অল্প অল্প ঘামত।

    যাকে এত ভয় পেতে হয় তাকে ঠিক ভালোবাসা যায় না। ভালোবাসা মূলতঃ বলতে পারছি না, দেখা যাক, এখন হবে না। প্রতিদিন আগের দিনের থেকে একটু বেশি ঠেলে দেখা কতটা ঠেলা যায়। আশেপাশের সবার ভয়ে ও ভালোবাসাহীনতায় পিসিমা পঁচাশিরটি হয়েছেন। ময়দা ছাড়েননি। গুরু ধরেননি। স্থানীয় নার্সিংহোমের ডাক্তার ও নার্সরা বার্ষিক স্বাস্থ্যপরীক্ষায় পিসিমার ফলাফল দেখে চোখ গোল করে। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় প্রথম হওয়া বালিকার প্রসন্নতায় রিকশায় দুলে দুলে পিসিমা বাড়ি ফেরেন। লোকে আড়ালে বলে বুড়ি মাথা বাঁধিয়ে এসেছে। সমরের অন্য সন্দেহ হয়। বিশ্বসংসারের কাছে নিজের অস্তিত্বের অধিকার প্রমাণের জন্য ক্রমাগত ডিগবাজি না খেলে হয়তো বোন ডেনসিটি অটুট থাকে।

    সমর কাউকেই ঘাঁটান না, পিসিমাকে ঘাঁটানোর প্রশ্নই নেই, ঘাঁটানওনি। পিসিমাও সমরকে ঘাঁটাননি। স্বাভাবিক সৌজন্য বজায় থেকেছে দু’পক্ষেই। নিয়মভঙ্গের দিন পিসিমা এসে উপস্থিত দেননি, সমরও সুযোগ পাননি, দিনভর সামাজিকতার দাবি মেটাতে মেটাতে চোখের কোণ দিয়ে দেখেছেন পিসিমা খুরখুরিয়ে এদিক ওদিক ঘুরছেন। একবার মনে হল রান্নাবান্নার দিকটায় দেখলেন। একটা মোড়া জোগাড় করে বসে রাঁধুনির সঙ্গে গল্প করছেন আর ধোঁয়া-ওঠা বেগুনি ফুঁ দিয়ে খাচ্ছেন।

    সারাদিনে কে জানে ক’টা বেগুনি সাঁটিয়ে বাড়ি যাওয়ার আগে এসে দাঁড়ালেন পিসিমা। সমরের সামাজিকতার শক্তি তখন তলানিতে। অন্য কেউ হলে হয়তো তা সত্ত্বেও ‘আরে কোথায় ছিলে সারাদিন দেখাই হল না, ভালো করে খেয়েছ তো’ ইত্যাদির অ্যাটেম্পট নিতেন, এখানে সে সবে নম্বর বাড়বে না জেনে একবার শুধু ‘পিসিমা’ ডেকে পা ছুঁয়ে সোজা হলেন।

    পিসিমা মুচকি হাসলেন।

    অভিনন্দন। লাস্ট দত্ত স্ট্যান্ডিং।

    *


    পিসিমার কথা সমরের বিশ্বাস হল না। অবিশ্বাসের ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল। ছাতিমবাগানের দত্তরা প্রাচীন। কেউ বলে বংশের প্রথম প্রমিনেন্ট দত্ত কৃষ্ণরাম ছিলেন প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি। জাহাঙ্গিরের কুত্তা মান সিংহকে এমন ফাইট দিয়েছিলেন যে আর একটু হলেই মান সিংহ নিজের বাবার নাম ভুলে যাচ্ছিলেন। কেউ বলে জাহাঙ্গিরটা হবে অওরংজেব, প্রতাপাদিত্যটা শাইস্তা খান আর সেনাপতিটা খাজাঞ্চি। কৃষ্ণরাম দত্ত ছিলেন শাইস্তা খানের খাজাঞ্চি। আচ্ছা বাবা, কোষাধ্যক্ষ।

    তারপর এক দত্ত জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে এক বগলে ডিগ্রি এক বগলে দাস ক্যাপিটাল নিয়ে ফিরলেন। দত্তবংশে শ্রেণীচেতনা জাগ্রত হল। সে সব জাগ্রত দত্তরা রবীন্দ্রসংগীত চালালে সশব্দ হাই তুলবেন তবু নিজেদের উচ্চঘর স্বীকার করবেন না। বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে, ইনফিউশনে চুমুক দিতে দিতে তাঁরা বলতেন, আরে দূর, সেনাপতিফতি খাজাঞ্চিফাজাঞ্চি অওরংজেবফেব সব ঢপ। কেষ্টা দত্ত ছিল মুর্শিদকুলি খাঁয়ের রাজসভার ভট্ট। মুর্শিদ রাজসভায় ঢোকাবেরোনোর সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে গোল্লাপাকানো কাগজ খুলে ‘রাজা এই রাজা সেই’ গলা ফাটিয়ে রিডিং পড়ত। ভাট বকা কনসেপ্টের আক্ষরিক যেখান থেকে উৎপত্তি। নট দ্যাট এনিথিং ইজ রং উইথ দ্যাট।

    যে সত্যিটাই সত্যি হোক, কৃষ্ণরাম দত্ত যুদ্ধই করুন খাতাই লিখুন ভাটই বকুন, ছাতিমবাগানের দত্তরা অশ্লীল টাইপের পুরোনো। বাঙালির ইতিহাসের আরশোলা। মগ মন্বন্তর দাঙ্গা নকশাল হোপ এইটিসিক্স ডিমানিটাইজেশন কোভিড পেরিয়ে অবিচলিত। সেই আরশোলার দৌড় সমর দত্ত তার পঁয়ষট্টি কেজি পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির বডি দিয়ে ঠেকিয়ে দেবেন কেউই বিশ্বাস করত না, সমর দত্তও করলেন না। রাঙাপিসিমা, আফটার অল, মানুষ। আফটার অল, পঁচাশি। বোন ডেনসিটি অটুট বলে মাথার স্ক্রু-ও যে টাইট থাকবে তার মানে নেই। এ বাড়িতে হয়তো নেই, কলকাতা শহরেও হয়তো না, কিন্তু ক্যানবেরা বা ব্যাংগালোর বা সিয়াটলে কোনও না কোনও দত্ত থাকতেই হবে যে সমরের পরেও দত্তদের দৌড় বজায় রাখবে।

    *


    থুড়থুড়ে বাড়ির খুরখুরে তোরঙ্গের ভেতর থেকে ঝুরঝুরে বংশলতিকা বেরোল। ফার্সি অরিজিন্যাল, বাংলা ও ইংরিজি অনুবাদ। সে সব আলুভাজা দস্তাবেজ আঁতিপাঁতি ঘাঁটলেন সমর দত্ত, স্থানীয় ও জাতীয় লাইব্রেরি চষলেন, উইকিপিডিয়ায় চিরুনি চালালেন, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ইন্সট্যাগ্রামে পারিবারিক গ্রুপে ঢুকে ইন্ডিয়ানাপোলিস, হায়দেরাবাদ, ডাবলিন বঙ্গসম্মেলনে হাতকাঁপা রেকর্ডিং-এ ‘বঁধু কোন আলো লাগল চোখে’-র ফুটওয়ার্কহীন কোরিওগ্রাফি দেখলেন।

    এবং মেনে নিলেন পিসিমা ঠিক। পৃথিবীর যে কোণে যত দত্ত আছে - ডালপালা। কৃষ্ণরাম দত্ত থেকে সরলরেখা সোজা এসে ঠেকেছে শ্রীযুক্ত সমর কুমার দত্ত-তে। ঠেকেছে এবং থেমেছে। ছাতিমবাগানের দত্তদের চারশো বছরের রিলে রেসের শেষ রানার সমর দত্ত। লাস্ট ওয়ান স্ট্যান্ডিং।

    সমর দত্ত এতটাও বেঁটে ছিলেন না যে দড়িতে জামা শুকোতে দিতে আঙুলে দাঁড়াতে হয়, এতটাও লম্বা ছিলেন না যে যে দোকানবাজারে বেঁটে সুন্দরীরা ওপরের তাকের দিকে পেলব আঙুল তুলে, ‘সমরদা একটু পেড়ে দাও না গো,’ আবদার করে। সমর দত্তকে কেউ কখনও খ্যাংরাকাঠি বলে খেপায়নি, হাতি ডেকে হ্যা হ্যা হাসেনি। স্কুলকলেজে তিনি পুরস্কার ও তিরস্কার দুইয়ের থেকেই সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। প্রাপ্তবয়সে কতটা পাত্তা দিতে হবে মেপে নিতে যারা ‘আপনি কোথায় আছেন’ জানতে চেয়েছে, উত্তর শুনে ঠোঁটও বেঁকায়নি নুয়েও পড়েনি। কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নিয়ে সমরের কমেন্টারি শুনতে কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলোয়ার হয়নি, রাজনৈতিক অবস্থান বিপরীত বেরোনোয় বাড়ির মহিলাদের রেপ করে ছেড়ে দেওয়ার মনোবাসনা জানায়নি।

    অর্থাৎ, সমর দত্তের নামকরণ মাঝামাঝি দত্ত হলেও সার্থক হত। পঞ্চাশ বছর ধরে সমর দত্ত নর্ম্যাল ডিসট্রিবিউশনের মাঝখানে, ফার্স্ট স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের ঘেরাটোপে, আটষট্টি দশমিক দুই সাত শতাংশের সুরক্ষায় বেঁচেছেন। সংখ্যাগুরুর স্বস্তিতে, ঝাঁকের কইয়ের কনফিডেন্সে। পঞ্চাশ পেরিয়ে একটা মুচকি হাসি আর একটা চার শব্দের বাংরেজি বাক্য সমর দত্তের গা থেকে মধ্যবর্তিতার সে কবচকুণ্ডল টেনে খুলে নিয়ে তাঁকে নির্বাসন দিয়েছে স্বাভাবিকত্বের বন্টনের প্রান্তিকতায়, যেখানে সমর দত্ত একা দাঁড়িয়ে কাঁপছেন।

    *


    লাস্ট দত্ত স্ট্যান্ডিং।

    বাক্যটার তাৎপর্য আত্মস্থ করতে সমর দত্ত বার বার বললেন। শিকওয়ালা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বললেন। সিলিং ফ্যানের ঘর্ঘরের নিচে শুয়ে শুয়ে বললেন। মৃত আত্মীয়ার বিয়ের তত্ত্বে আসা ড্রেসিং টেবিলের টুলে বসে বসে বললেন, ফোল্ডিং আয়নার ওপার থেকে আরও তিনজন সমর দত্ত সঙ্গে সঙ্গে বলল। মগে করে মাথায় জল ঢালতে ঢালতে বললেন। ডালভাতের গ্রাস মুখে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন। জিভ ছুলতে ছুলতে বললেন, নাভি খুঁটতে খুঁটতে বললেন, কান খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন। চেঁচিয়ে বললেন, ফিসফিসিয়ে বললেন, ঠোঁট নেড়ে বললেন। দুয়ে দুয়ে চারের নিঃসংশয়তায় বললেন, কর্পদকের রেফ প-য়ে না দ-য়ের দ্বিধায় বললেন। কাহারবায় বললেন, আদ্ধায় বললেন, দীপচন্দীতে বললেন। ব্রাহ্মমুহূর্তে ললিতে, গোধূলিতে মারোয়া, মাঝরাতে দরবারিতে গাইলেন। ভোরের আলোয় মাখলেন, দুপুরের রোদে চাখলেন, মাঝরাতে উঠে চশমা পরে টেবিলল্যাম্পের নিচে ধরতে যাবেন - সন্দেহবাতিক দোকানি যেমন পাঁচশোর নোট ধরে - ‘ধুত্তেরি’ চেঁচিয়ে বাক্য সমরের হাত ছাড়িয়ে মাটিতে পড়ে ছত্রাকার হল।

    সমর দত্ত হায় যায় করে উঠে গুঁড়ি মেরে খাটের নিচ থেকে ল আর ন-কে বার করলেন, টুলে চড়ে আলমারির মাথা থেকে স্ট আর ন্ড-কে পাড়লেন, অনুস্বরের গোল্লা মেন দরজা খোলা পেয়ে রাস্তার দিকে গড়াচ্ছিল, গেট পেরিয়েই ড্রেন, শেষ মুহূর্তে কান ধরে ফেরত আনলেন। থেবড়ে বসে মন দিয়ে জুড়লেন। ল্যাং স্ট দ ণ্ডি ত্ত স্ট। ঘাঁটলেন, জুড়লেন। য়াং দ লা ণ্ডি ত্ত স্ট্যা ন্টি। আবার শুরু থেকে শুরু করলেন। স্ট স্ট্যা লা ন্ডি দং ত্ত। দ ত স ল আ স ট অ্যা ঙ ণ ড ই। ও স্নি ন্টি সং য়া ন্ড ন। সমর দত্ত মাথা ঝাঁকালেন, চুল খামচালেন, ঘুঁষি পাকিয়ে হতাশার হুংকার ছাড়লেন।

    কারখানার ভোঁ বাজল, ব্রিজ ঝাঁকিয়ে ফার্স্ট ট্রেন গেল, ভোর এসে জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখল কালো বর্ডার দেওয়া লাল মেঝেতে সমর দত্ত ঘুমোচ্ছেন, তাঁকে ঘিরে ফুলের মতো ফুটে আছে লাস্ট দত্ত স্ট্যান্ডিং।

    *


    ঘুম ভেঙে সমর দত্ত হাঁটতে বেরোলেন। ডাক্তার তাঁকে রোজ দশহাজার পা হাঁটতে বলেছেন। ওয়ার্কস লাইক ম্যাজিক। ম্যাজিক সমরের ছোটবেলাতেও পোষাত না। সবাই জানে ফাঁকি, জানা ফাঁকিকে ঘিরে চমকে দেওয়া আর চমকে যাওয়ার চেনা চিত্রনাট্য। সেই মিথস্ক্রিয়া। সেই আঁতাত। ম্যাজিকের থেকে জ্যোতিষ ভালো। এক পক্ষের বিশ্বাস অন্ততঃ সৎ।

    তবু সমর দত্ত ডাক্তারের উপদেশ মেনে রোজ দশহাজার পা হাঁটেন কারণ তিনি হাঁটতে ভালোবাসেন। হাঁটা তাঁর কাছে ম্যাজিকের থেকেও ম্যাজিকাল। টোটো স্ট্যান্ডে জটলা। প্রতিপক্ষের শক্তি আন্ডারএস্টিমেট করে একপক্ষ রাগ দেখিয়ে ফেলেছে, যে বখেড়া বেধেছে তা থেকে কেউই বেরোতে পারছে না, আরও অন্ততঃ বারো মিনিট পারবে না। পাশ কাটিয়ে যাবেন ভাবছেন এমন সময় ঘাড়ে ফিট করা শারীরবৃত্তীয় অ্যালার্ম, যাকে বাংলা অনার্সেরা ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে, বেজে উঠল।

    সমর দত্ত চারদিক দেখলেন। কোটি কোটি লোক, শত শত টোটো, শীর্ণ ভিখিরি, জীর্ণ কুকুর, টিউবওয়েল। সমরের ঠিক পাশেই টিউবওয়েল। চেনা। এদিকে একটা মাঠ ছিল সমরের ছোটবেলায়, রোজ বিকেলে খেলতে আসতেন। একদিন ক্রিকেট খেলতে খেলতে বল এসে দাঁতে লেগেছিল। খেলার সঙ্গী দাদারা এই টিউবওয়েলের হ্যান্ডল টিপে জল তুলে রক্ত ধুইয়েছিল।

    ভাঙা দাঁতের কোণে জিভ বোলাতে বোলাতে সমর দত্ত টিউবওয়েলটাকে দেখলেন। যেমন হয়। সলিড লোহার সিলিন্ড্রিক্যাল শরীর। সরু গলা। গলার ওপর এস বিস্কুটের মতো সুললিত হ্যান্ডেল। যেন ষণ্ডা এক গুণ্ডা নতমস্তকে নখ খুঁটছে। জীবনে অন্ততঃ হাজারখানেক টিউবওয়েল দেখেছেন সমর, এই অপরূপ অঙ্গসৌষ্ঠব খেয়াল করেননি? নাকি দেখার মতো করে দেখেননি? নাকি যখন দেখেছিলেন খেয়াল করেছিলেন, ইদানীং দেখেননি বলে ভুলে গেছেন? দশহাজার পদক্ষেপ পূর্ণ করতে পাড়া ছাড়িয়ে বেপাড়া যেতে হয় সমর দত্তকে। মাথার ভেতর গোটা রুট ঘুরে এলেন, একটাও টিউবওয়েল মনে করতে পারলেন না। কারণ, নেই। একসময় মোড়ে মোড়ে ছিল। আর নেই। তাদের জায়গায় প্লাস্টিকের পাইপ বসেছে। প্লাস্টিকের কল। আকাশি গোলাপি বেগুনি। গুনে গুনে দুশোবার ঘোরালেই ভেঙে যাওয়ার গ্যারান্টি। এ টিউবওয়েল এ পাড়ার, এ তল্লাটের, এ ব্লকের লাস্ট টিউবওয়েল স্ট্যান্ডিং।

    ঝামেলা মিটে টোটোস্ট্যান্ড খালি হয়ে গিয়েছিল তবু সমর দত্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন। সেই টিউবওয়েলটার দিকে তাকিয়ে যে টিউবওয়েলটা একটু আগে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। এই মুহূর্তে এমন ভাব যেন কিছু বোঝে না, আই কনট্যাক্টে অস্বস্তি। সমর দত্তের সন্দেহ হল এ সব অস্বস্তিটস্বস্তি আসলে অভিনয়। না তাকালে যে অনেক সময় দেখা যায় বেশি এ টিউবওয়েল সে বিরল ও গোপন জ্ঞানের জ্ঞানী।

    সমর দত্ত চোখ সরিয়ে নিলেন। ঘাড় আবার শিরশিরাল। শরীর সোজা, মাথা স্থির রেখে চোখের মণি যথাসম্ভব বাঁ কোণে নিয়ে এলেন। টিউবওয়েল তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।

    কান গরম হল। কলারের নিচে ঘাম। সমর দত্ত নিজেকে ধমকালেন। এ সব কৈশোরে মানাত, পঞ্চাশে রিডিকুলাস। তাঁর পক্ষে যতটা সপ্রতিভ হওয়া সম্ভব বা সপ্রতিভ বলতে সমর দত্ত যা বোঝেন হাবভাব তার কাছাকাছি নিয়ে টিউবওয়েলের দিকে সোজাসুজি তাকালেন। টিউবওয়েলের দৃষ্টি নিমেষে অদৃশ্য নখে স্থাপিত হল।

    এর পর সমর দত্ত যেটা করলেন, সেটা করার সাহস যে তাঁর হতে পারে পাঁচ মিনিট আগে কেউ বললে পকেটের টাকা দিয়ে তাকে রাঁচির টিকিট কেটে দিতেন তিনি। প্রকাশ্য দিবালোকে, শত শত চোখের সামনে টিউবওয়েলের উত্তলতায় হাত রাখলেন। রাখামাত্র, মসৃণতা ও কাঠিন্য ফুঁড়ে, অপ্রস্তুত অরক্ষিত সমর দত্তের রক্তস্রোতে ঝনঝনানি ছুটে গেল, যা একই সঙ্গে আদিম ও অনির্বচনীয়।

    *


    ঝনঝনানি তিনদিন তিনরাত ধরে চলল। সমর দত্ত কম্বলমুড়ি দিয়ে কাঁপলেন। চতুর্থদিন সকালে পরিস্থিতি বেটার মনে হতে বাড়ি থেকে বেরোলেন। ডানদিকে টোটো স্ট্যান্ড, বাঁদিকে ছাতিমবাগান চৌমাথা। চৌমাথার রাস্তা ঘিঞ্জি, ট্রাফিক উদ্ভ্রান্ত - তবু বাঁদিকেই বেঁকলেন। কারেন্টমারা টিউবওয়েলের থেকে সব ভালো।

    চৌমাথার সিগন্যালে দুই পা ফাঁক করে মহাকাল মাপছে লাল মানুষ। ঊনষাট আটান্ন সাতান্ন। সমর দত্ত এই ফুটে দাঁড়িয়ে আছেন, ওই ফুটে গাছটা। ইলেকট্রিকের খাম্বা, পানের দোকান, শনিমন্দিরের ভিড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা, ধুলোপড়া, র‍্যান্ডম গাছ। গোড়ায় জঞ্জাল। ইলেকট্রিকের লোক এসে ডাল ছেঁটে দিয়ে যাওয়ায় ডানেবাঁয়ে ভারসাম্য টলে গেছে। ছাতিমগাছ। স্বাভাবিক, ছাতিমবাগানে ছাতিমগাছ থাকা। কিন্তু ছাতিমবাগান যখন একটা ছাতিম কেন? একটা ছাতিমগাছ থাকলে ছাতিমতলা হতে পারে। ছাতিমের মোড়, ছাতিমের মাঠ, ছাতিমপল্লী, ছাতিমডাঙা, ছাতিমডিহি, ছাতিমবাজার, ছাতিমগঞ্জ। ছাতিমবাগান হতে হলে একাধিক ছাতিম আবশ্যক।

    তিন দুই এক। লালের জায়গায় গুণতি শুরু করেছে সবুজ মানুষ। উনিশ আঠেরো সতেরো। হর্নের হল্লার মাঝে অর্ধেক দখল হওয়া ফুটপাথের বাকি অর্ধেক আটকে সমর দত্ত দাঁড়িয়ে আছেন। সরুন দাদা, সাইড দাদা, এ সব মাল কোথা থেকে আসে ইত্যাদি সহযোগে বিরক্ত ভিড় পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। ঘেমো ধাক্কায় সমর দত্তের শরীর এপাশওপাশ টলছে। সমর দত্ত ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কারণ একটা শব্দ ততক্ষণে তাঁর মনোযোগের দখল নিয়েছে।

    খট্‌। ফট্‌ও হতে পারে। বা দুটোর মাঝামাঝি। নিচু, স্পষ্ট, রাগী। শব্দটা এসেছে সমর দত্তের পায়ের দিক থেকে। সমর দত্ত ঘাড় নিচু করলেন। বাটার চটির বাঁ পাটির নিচ থেকে চুলের মতো কী সব বেরিয়েছে। চটি ঘষে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝলেন চুল নয়, ফুটপাথের কংক্রিটে হেয়ারলাইন ক্র্যাক। সমরের চশমার নিচে সে সব কালো সরু ফাটল পাঁচটা থেকে দশটা হল, দশটা থেকে একশো থেকে হাজার থেকে লাখ থেকে কোটি। কংক্রিট ধরে ছুটে গেল, অনবহিত ভিড়ের চটির নিচে ঢুকে গেল, চওড়া হল, সমর ‘সাবধাআআআন!’ চিৎকার করে ওঠার মাইক্রোসেকেন্ড আগে নীরব বিস্ফোরণে পাতাল উন্মুক্ত হল। গিলে নিল অটো টোটো মানুষ মন্দির ফুটপাথ সিগন্যাল। গোটা শহর।

    সমরের চোখের সামনে।

    মথিত মেদিনী ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সাপের ছানারা। সবুজ শরীর, অন্ধ চোখ, বন্ধ মুখ। বুকে বাওয়ার বদলে তারা সমরের হাঁটু লক্ষ করে ধাইল, সমর লাফিয়ে সরলেন, পায়ের পাতা জমি স্পর্শ করার মুহূর্তে মাথা তুলল সাপের ছানা, লাফ মারল হাওয়ায়। সমরের বাঁচার উপায় নেই, পালানোর পথ বন্ধ, যেদিকে তাকান, যতদূরে তাকান সবুজ ফণা। লিকপিকে, রাগী, ঠ্যাঁটা। সমরের গোড়ালি পেরিয়ে, দেখতে দেখতে হাঁটু, শ্রোণি, কোমর পেরিয়ে বুক, এইবার চিবুক . . . বন্ধ হাঁ খুলে চারটে, পাঁচটা, ছ’টা, সাতটা ক্ষুধার্ত জিভ লকলকিয়ে বেরিয়ে এল। সমর চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

    যখন খুললেন, ছানারা সমরের মাথা ছাড়িয়ে বহুদূর। এক একটা এত লম্বা, পঁচিশটা সমরকে একটার ওপর একটা দাঁড় করালেও মাথা ছোঁয়া যাবে না। হিলহিলে সবুজ লতা এখন গাঢ় বাদামি কাণ্ড। যেগুলোকে জিভ ভেবেছিলেন, পাতা। তেলতেলে সবুজ শরীরে সাদা শিরাতন্ত্র। সে সব পাতার জড়াজড়িতে আকাশ অদৃশ্য। নেহাত সূর্য বলে পুরোটা আটকানো যায়নি, মেঘলা গোধূলি কাটিং আভা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। বাতাসে জুঁই ফুলের সঙ্গে কাফ সিরাপ পাঞ্চ করা চেনা গন্ধ। শিকড় বেয়ে উঠে আসা সোঁদা সুবাস।

    যেন লিজের ভিত্তিতে একটা আস্ত শহর তৈরি হয়েছিল, সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়ামাত্র জমির মালিকানা হস্তান্তরিত হয়েছে। এ ভূখণ্ড এখন আবার ছাতিমের জঙ্গল। ছাতিমারণ্য। ছাতিমবাগান।

    সমর দত্ত কেঁপে উঠলেন। তিনি শীতকাতুরে লোক। একবার দিল্লি বেড়াতে গিয়ে সবাই - ছ্যা ছ্যা এটা একটা ঠাণ্ডা হল? খবরে নির্ঘাত বাড়ায়চাড়ায় - ইত্যাদি বলে বগলকাটা গেঞ্জি পরে ঘুরছিল। সে সব বীর নারীপুরুষদের হাসাহাসি ও তাচ্ছিল্য অগ্রাহ্য করে সমর সোয়েটার পরে মাফলার পেঁচিয়ে কাঁপছিলেন। এ বাগানের ঠাণ্ডা অন্যরকম, ত্বক ফুঁড়ে গভীরে হাত রাখে। কোনও পরিত্যক্ত কুয়োর নিচে সম্ভবতঃ এমন ঠাণ্ডা লাগলেও লাগতে পারে। কুয়োর নিচে সমর কখনও নামেননি, অথচ এ ঠাণ্ডা তাঁর চেনা। মনে পড়ল। দক্ষিণ ভারতের এক প্রাচীন মন্দিরের অভ্যন্তরীণ চাতাল ঘেরা বারান্দার এদিকে দাঁড়িয়ে ওদিকের বারান্দায় ছ’ফুট বাই তিনফুট আয়তক্ষেত্র - কমপ্লিটলি কালো - সমরকে টেনেছিল। চাতাল পেরিয়ে উল্টোদিকের বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে উঠে অন্ধকারের চৌকাঠ টপকেছিলেন। পা ঘষটে ঘষটে পাঁচ পা এগিয়ে পেছনে ফিরেছিলেন। ও দিক থেকে যা ছ’ফুট বা তিন ফুট অন্ধকারের আবরণ ছিল, এদিক থেকে ছ’ফুট বাই তিন ফুট আলোর পর্দা। অন্ধকারের থেকেও অভেদ্য। কোথায় গেল, কোথায় যে যায়, বাস তো ছাড়বে - সে আলোকিত পর্দায় ফিল্টার হয়ে ঢুকছিল, সমরকে স্পর্শ করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে। চোখ সইতে, সেই ঘর বা গুহার পাথরের মেঝে দেওয়াল ও সিলিংময় নরনারী রাক্ষসরাক্ষসী যক্ষযক্ষীর লাম্পট্যময় বিভঙ্গ পরিবৃত হয়ে এই পার্টিকুলার ঠাণ্ডাটা অনুভব করেছিলেন সমর।

    কাছের ছাতিমগাছের গায়ে হাত রাখলেন সমর দত্ত। চ্যাটচেটে, থকথকে রসের চাপে স্ট্রেচ মার্কসময় বাকলে সে-ই পাথুরে শৈত্য। এ গাছ কি জ্যান্ত নাকি অলরেডি ফসিল? কান খাড়া করলেন। ঝিঁঝিঁর ডাক, শুকনো পাতায় কাঠবেড়ালির পদক্ষেপ, পাতা ও হাওয়ার সংঘর্ষের সরসর কিছুই নেই। সমর যেন একটা অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে বসে চারদিক দেখছেন।

    কিন্তু কী দেখছেন? এ যে ছাতিমবাগান সমর অলমোস্ট নিশ্চিত, কিন্তু এ বাগান তাঁর বাড়ি থেকে কত দূর? টিউবওয়েল থেকে কত দূর? কলকাতা শহরের কোন পাড়া থেকে কোন পিনকোড পর্যন্ত বিস্তৃত? কলকাতা বলে কি কিছু আছে আর? নাকি গোটা শহরটারই পাতালপ্রবেশ ঘটেছে? সেই রাগী খট প্রথম কানে আসার পর কত সময় কেটেছে? এক সেকেন্ড? দশ মিনিট? কত জন্ম? সমর এগিয়েছেন না পিছিয়েছেন? এটা ভবিষ্যৎ না অতীত? সব কিছু নিয়েই সমর অন্ধকারে। অন্ধকার কথার কথা, মেঘলা গোধূলি এখনও সমরকে ঘিরে রেখেছে, কিন্তু সমর জানেন না বাগানের বাইরে মেঘলা না গোধূলি, সকাল না বিকেল, আলো না অন্ধকার। এই বর্তমান মুহূর্তটির আগে পিছে ডাইনে বাঁয়ে ওপর নিচে সব কিছু নিয়েই সমর অনিশ্চিত। একেই বোধহয় কী যেন বলে, উল্লম্ব? উঁহু, অন্য একটা শব্দ . . . পেটে আসছে মুখে আসছে না . . . রাইট, ত্রিশঙ্কু। সশরীরে স্বর্গপ্রবেশের দাবির শাস্তিস্বরূপ দ্যাবাপৃথিবীর মাঝপথে অভিশপ্ত, ঝুলন্ত রাজার মতো সমরও ঝুলছেন। স্থানকালব্যতীত, কার্যকারণরহিত, প্রসঙ্গচ্যুত লাট খাচ্ছেন।

    বা খাচ্ছেন না। হয়তো কলকাতার সঙ্গে পাতাল সমরকেও গিলে নিয়েছে, সমর আর নেই কোথাও। না থাকাতে সমরের অসুবিধে নেই। থাকতে সমরের কোনওদিনই তেমন আরাম হচ্ছিল না, সর্বক্ষণ চৌকোর মধ্যে গোল বা গোলের মধ্যে রম্বস হয়ে গুঁজড়ে থাকার ফিলিং হচ্ছিল। ঘনঘন মনে হচ্ছিল থাকার থেকে হয়তো না ত্থাকাটাই ভালো ছিল। ভালোই হোক বা খারাপ, শিওর হওয়া দরকার। আছেন না গেছেন না ঝুলছেন। আশ্বাসের আশায় চারদিক দেখলেন সমর এবং হতাশ হলেন। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে নিজেকেই হতে হবে। আঙুল তুলে, দাদা আপনি আছেন, বলে দেওয়ার কেউ নেই।

    উঁহু, আছে। এই ছাতিমবাগান, বাগানের মৌন দৈত্যের দল। একমাত্র এরা জানে তিনি আছেন না গেছেন নাকি আসাযাওয়ার মাঝে ঝুলছেন। ঠিক যেমন এই ছাতিমবাগান যে একসময় ছিল, সবাই মরেঝরে ভূত হয়ে যাওয়ার পর আবারও যে এরাই থাকবে তারও একমাত্র সাক্ষী সমর দত্ত।

    ছাতিমের গায়ে আশ্বাসসূচক চাপ দিলেন সমর। খরখরে বাকল হাতের পাতায় বিঁধে গেল।

    *


    শুরু হল দা গ্রেট ব্যাটল অফ ছাতিমবাগান। কেন শুরু হল, যুদ্ধের আগে এক পক্ষের দূতের সঙ্গে অন্য পক্ষের রাজা দুর্ব্যবহার করেছিলেন কি না, যুদ্ধ এড়াতে কোনও রাষ্ট্রসঙ্ঘ মধ্যস্থতার গোল টেবিল বসিয়েছিল কি না, কোন পক্ষ কত অক্ষৌহিণী সেনা, কটা ব্যালিস্টিক মিসাইল কিছুই জানেন না সমর দত্ত। এ যুদ্ধের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি প্রথম অবগত হলেন যুদ্ধটার মধ্যে পড়ার পর। কারণ এই যুদ্ধের কথা কোনও ইতিহাস বইতে লেখা নেই। বা থাকলেও, যদ্দিনে সমর স্কুলে ভর্তি হয়েছেন চ্যাপ্টার বাদ পড়ে গেছে।

    বা বইতে এ চ্যাপ্টার কখনও ছিলই না কারণ এটা আদৌ যুদ্ধই নয়। মানবিকতা কমিশন ইত্যাদির সংজ্ঞা যদি সমর উপেক্ষাই করেন, সাধারণ বুদ্ধিই যদি খাটান - যে যুদ্ধে একপক্ষের জেতার কথাই ছিল না, তা কি যুদ্ধ হতে পারে? প্রত্যাঘাতের ক্ষমতা না থাক, আত্মরক্ষার ভঙ্গি তো থাকবে। অন্ততঃ ফ্রি উইল খাটিয়ে অন্য গাল বাড়ানোর ডিগনিটি? প্রতিরোধহীন আত্মসমর্পণ তো বীরত্বের গৌরব দাবি করতে পারে না। জয়ের চয়েসহীন পরাজয় তো ইতিহাসে ফুটেজ পেতে পারে না।

    হয়তো সে জন্যই এ যুদ্ধ নয়, প্রগতি। ধ্বংস নয়, গ্রোথ। সাম্রাজ্যবিস্তার নয়, সভ্যতাস্থাপন। যেটাই হোক, সমর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই আশ্চর্য যুদ্ধ দেখলেন। একপক্ষের হাতে কাস্তে, কূড়ুল, করাত - শুরুতে ম্যানুয়াল ক্রমে ইলেকট্রিক - অন্যপক্ষ ঠুঁটো জগন্নাথ। নিধিরাম সর্দার। ক্যাসাবিয়াংকা। প্রথমে তাদের কয়েকটাকে শুইয়ে দু’তিনটে টিমটিমে বাড়ি, দু’একটা মিটমিটে দোকানপাট বসল। তারপর রক্তগঙ্গা বইয়ে স্কুল কলেজ দোকানপাট, স্কুল, লাইব্রেরি, উপাসনাস্থল ও ভাগাড় প্রতিষ্ঠা হল।

    পাঁচ, চার, তিন দুই, এক। একটা আরবিট যুদ্ধ, আরবিট শুরু হয়ে আরবিট শেষ। লাল মানুষ আবার সবুজ। সমর দত্ত আবার নাগরিক শান্তি ও প্রগতির বাতাবরণে ফেরত। বাস ট্যাক্সিকে পিষে দিচ্ছে, ট্যাক্সি অটোকে চেপে দিচ্ছে, অটো টোটোর মা-মাসি এক করে দিচ্ছে। পথচারীরা একগ্লাস অমৃত খেয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর অকুতোভয়তায় রাস্তা পার হচ্ছে।

    হ্যালুসিনেশন নাকি? সমর চোখ পিটপিটালেন। উল্টোফুটে ছাতিম ফোকাসে এল। যে ছাতিম এই মহৎ, উপেক্ষিত, টেকনিক্যালি নন-যুদ্ধে লড়েছে, বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেরেছে, সহযোদ্ধাদের মুখ থুবড়ে পড়তে দেখেছে। যে ছাতিম দা গ্রেট ব্যাটল অফ ছাতিমবাগানের শেষ সাক্ষী ও সারভাইভার। কে জানে এ-ই সেই ছাতিম কি না, যার গায়ে হাত রেখে সমর দত্ত একে অপরের অস্তিত্বের সাক্ষ্যের শপথ করেছিলেন। হাতের পাতায় জ্বলুনির অনুভূতি হল। চশমার কাছে হাত তুলে আনলেন। ফর্সা, নরম চামড়া ফুলে উঠেছে, দু’তিনটে রক্তবিন্দু।

    ছাতিমের নুলো ডালের একটি কচি পাতা বিনা হাওয়ায় দুলে উঠল। বিনা রোদ্দুরে ছলকে উঠল। ছাতিমের ছায়ায় দাঁড়িয়ে একজন পনেরো মিনিট আগে পোস্ট করা মদির কটাক্ষের নিচে ক্রমশঃ উঁচু হওয়া ঢিপি ঘাঁটছিল। আর ক’টা আগুন ইমোজি জমলে পঞ্চাশ গ্রাম আত্মবিশ্বাস কিনে আনা যাবে গুণছিল। উল্টো ফুটে হাওয়ায় হাত তুলে হাসিহাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আধবুড়োটার ওপর চোখ পড়ে তার ঠোঁট বাঁকল। ফাকিং ক্রিপ।

    *


    কে জানে কত রাত পর্যন্ত চোখের ওপর কড়িকাঠ, পিঠের নিচে জাজিমের ঢিপি গুনে সমর দত্ত উঠে পড়লেন। বাড়ির পেছনে পুকুর। দত্তদেরই ছিল একসময়, এখন বেহাত। ও প্রান্তে পাঁচিল ভেঙে ঢুকে পড়া বস্তির বর্জ্যে পুকুরের সিকিভাগ ভর্তি। বাকি অর্ধেক কচুরিপানায়। ভাঙা ঘাটের কাছে শুধু জল দেখা যায়। আপাততঃ স্থির। ব্যাঙেরা ঘাই মারছে না, মাছেদের নিঃশ্বাস বুড়বুড়ি কাটছে না, ধ্যানস্থ চাঁদ ভেসে আছে। ফাটা ঘাট পেরিয়ে, শ্যাওলাছাওয়া পেছল সিঁড়ি সাবধানে দুটো নেমে সমর দত্ত বসলেন। এক সিঁড়ি নিচে কালো জল থমকে থাকল।

    এ পাড়ার সব পুকুর বুজিয়ে হাউসিং হয়েছে। সে সব মৃত পুকুরেরাই হয়তো পুনর্জন্ম নিয়ে হাউসিং-এর পুল হয়েছে। আজকাল আখড়া আর পুল থাকলে বাড়ির কদর। বাকি এই দত্তপুকুর। শেষ দত্ত অর্থাৎ সমর মরে গেলে এ বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে। এতটা জমিতে নিশ্চয় হাউসিং-এর বদলে গোটা গেটেড কমিউনিটি এঁটে যাবে। এ পুকুর সে কমিউনিটির পুল হবে হয়তো। পুকুরকে উদ্দেশ্য করে সমর মনে মনে বললেন, আর ক’দিন কষ্ট করে নাও, এই রকম এঁদো হয়ে আর বেশিদিন থাকতে হবে না। এ পাড়ার শ্রেষ্ঠ পুল হবে তুমি। বাকিরা লিমিটেড হয়েছে, তুমি ইনফিনিটি হবে। নিজের রসিকতায় নিজেই চোখ বুজে হাসছিলেন, পায়ের পাতা ভেজা ঠেকল। চোখ খুললেন। জল সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে পা ছুঁয়েছে। পায়ের পাতা ঘেরা অংশটুকুতে আলতো আন্দোলন। দু’হাত দূরে চাঁদ টোল পর্যন্ত খায়নি। পুকুর সমরের রসিকতা বুঝতে পেরেছে। হাসছে।

    একসময় দু’জনেরই হাসি থেমে গেল। জল ফিরে গেল না, সমর দত্ত পা সরিয়ে নিলেন না। মাছ ঘাই মারল না, ব্যাং বুড়বুড়ি কাটল না, ভারিক্কি চাঁদ ভেসে থাকল। ছাতিমগাছের থেকেও প্রাচীন, টিউবওয়েলের থেকেও রোমাঞ্চকর, পুকুরের থেকেও অতল এক সত্য সমরকে ছাপিয়ে গেল, ভাসিয়ে নিল, ডুবিয়ে দিল।

    *


    বেঁচে থাকতে কিছু সত্যি জানতে লাগে। সমরও জেনেছেন। সে সব সত্যির অধিকাংশই জানার থেকেও বেশি করে মানা। পূর্ব যে পূর্বই, পশ্চিম নয়, সূর্য যে চাঁদ নয়, দুই যে দুই, চার যে চার, যোগচিহ্ন যোগচিহ্নই ভাগচিহ্ন নয়, গোল কাকে বলে, পৃথিবী কারে কয় সে বাবদে মানবসভ্যতার মেজরিটির সঙ্গে আপোসে পৌঁছনো। না, অন্ধ আপোসের দাবি করেনি কেউ, লাইব্রেরির তাক ভর্তি করে সহস্রাব্দের জ্ঞানচর্চার সাক্ষ্য আছে, স্যাটেলাইট ইমেজের প্রমাণ আছে। পাবলিকলি অ্যাভেলেবল। রাইট টু ইনফরমেশনের আওতায়। সমর দত্তের এনার্জি থাকলে তিনি সে সব প্রমাণ মিলিয়ে দেখতে ওয়েলকাম।

    সমর দত্তের এনার্জি নেই, তিনি মেলাতে যাননি। তাঁর মতো অনুদ্যমীদের জন্য সত্যের সংসদীয় গণতন্ত্র চালু আছে। সর্বজনস্বীকৃত ও কার্যকরী। সে তন্ত্রে সত্যের হয়ে সত্যের প্রতিনিধিরা বছর বছর লড়ছেন। সাংখ্যপ্রমাণ, বিশেষজ্ঞ, লবি, সাইবার ক্যাম্পেন, শিক্ষাব্যবস্থা, বিনোদন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে স্ব স্ব সত্যের দলে লোক ভেড়ানোর জন্য উদয়াস্ত খাটছেন। টুপি তিলক ঝোলা ভাষা রুচি উচ্চারণ দিয়ে নিজেদের দাগিয়ে রেখেছেন, দেখেশুনে বেছে নিলেই হল। সত্য বাছতে মেলা খাটনি, তার থেকে প্রতিনিধি বাছা সহজ। পৃথিবীর যাবতীয় সত্যি, সত্যি, এই মুহূর্তে তার ব্যাংকে ভোট বেশি বলে, গণতন্ত্রে সিট বেশি বলে। ভোটে জেতার আগে তারাও সত্যি ছিল না, কেউ কেউ তো ডাহা মিথ্যে ছিল। মুখে উচ্চারণ করলেই হাতে হেমলক, গর্দান গিলোটিনে, টর্চারকক্ষের গাইডেড টুর - যাতে লোকে নিজের ভুল নিজেই শুধরে নিতে পারে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডালে ডালে পাতায় পাতায় সড়কাতে সড়কাতে, ছায়ায় আবছায়ায় সটকাতে সটকাতে অবশেষে তারা সিংহাসনে। রাতারাতি সাফল্য এমনকি ‘পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে’-র কপালেও জোটেনি কারণ রাতারাতি সাফল্য বলে কিছু হয় না। যেমন চিরকালীন সাফল্যও না। আজ জিতেছে বলেই যে কাল হারবে না কোথাও লেখা নেই। ধ্রুবসত্যদেরও কম্পিটিশন আছে, আড়ালে আবডালে সটকাচ্ছে, ফিসফিসাচ্ছে। জামানত জব্দ হচ্ছে প্রতিবার, আবার পরের বছর বইমেলার ধুলোয় চাদর পেতে চারটি চটি প্রোপাগান্ডা সাজিয়ে বসছে।

    পাড়ার পাঠাগারে এক ইংরিজি বিজ্ঞান পত্রিকায় এ রকম এক বিকল্প ও গেরিলা সত্যের প্রতিনিধিদের ছবিসহ সাক্ষাৎকার পড়েছিলেন সমর। সাক্ষাৎকারকের কৌতূহল কম ও কৌতুক বেশি ছিল কাজেই সাক্ষাৎকারের ছুতোয় অপমানটাই হয়ে উঠেছিল উদ্দেশ্য। সে অপমানের মুখে প্রতিনিধিদের প্রসন্নতা বজায় রাখার ক্ষমতা সমরের মধ্যে সম্ভ্রম জাগিয়েছিল। পাতা উল্টে ছবি দেখেছিলেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে দেওয়ালজোড়া সৌরজগতের মানচিত্র - গ্রহনক্ষত্র, কক্ষপথ, উল্কাপাত। ফোরগ্রাউন্ডে টেবিল, টেবিলে ধাতব স্ট্যান্ডের ওপর পনেরো ডিগ্রি কৌণিকতায় বসানো লং প্লেয়িং রেকর্ডের মতো একটা বস্তু - ওঁদের বানানো পৃথিবীর সঠিক মডেল। টেবিলের পেছনে দলবদ্ধ নারীপুরুষ। মাঝখানের লোকটাই নিশ্চয় দলের হোতা। হোতার পাশে বছরদশেকের এক বালক, হোতার হাত বালকের কাঁধ জড়িয়ে আছে।

    কাদের দেখবেন আশা করেছিলেন সমর? বেখাপ্পা কাপড়জামা পরে একা একা বিড়বিড় করতে করতে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা একদল লোককে? ছবি থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছিল যারা দিব্যি স্বাভাবিক, রাস্তাঘাটে দেখলে সমরের সঙ্গে তফাৎ করা যাবে না। ভালো করে দেখতে পত্রিকা চশমার কাছে তুলে এনেছিলেন সমর। ঘেঁষাঘেঁষিটা নজরে পড়েছিল। যেন এক সাংঘাতিক ঝড় সবাইকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে, বাকিরা প্রাণপণ ঘেঁষটে, একে অপরকে আঁকড়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা করছে। বাচ্চাটার কাঁধে হোতার সরু, লম্বা, হাড় বার করা আঙুল - সমরকে পাড়ার সাঁতারস্কুলে প্রথম দিনে জলে নামা, পুলের ধারের রড আঁকড়ানো ছাত্রের আঙুল মনে পড়িয়েছিল। পত্রিকা বন্ধ করে নামিয়ে রেখেছিলেন সমর। নাহ্‌, আপাততঃ দল পাল্টাচ্ছেন না। আপাততঃ পৃথিবীর আকৃতি কমলালেবুর মতোই থাকুক।

    গণতান্ত্রিক সত্যি ছাড়াও আর একরকমের সত্যি আছে। এদের প্রতীক নেই, প্রতিনিধি নেই, স্লোগ্যান নেই, টিকি টুপি জোব্বা তিলক নেই, প্যামফ্লেট নেই, প্রতিশ্রুতিও না। এরা ভোটে দাঁড়ায় না, ভোট দেয় না, ভোটের খবর দেখে না। পালে কত হাওয়া, দলে কত লোক কেয়ার করে না। এদের পার্টি অফিস বা হেডকোয়ার্টারস নেই কাজেই লোকেশন শেয়ার করে চারটে লোককে দলে টেনে এদের আরও বেশি সত্যি করে তোলা যায় না। এ সত্যিরা চরম অরাজনৈতিক, পরম ব্যক্তিগত। ভাঙা ঘাটের পেছল সিঁড়িতে লাস্ট স্ট্যান্ডিং পুকুরটির সঙ্গে হাসাহাসি থামার পর এই দ্বিতীয় গোত্রের একটি সত্যি সমর দত্তের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। পাঁচ ও ছ’নম্বর পাঁজরের ফাঁকে এমন গুছিয়ে বসল যে সমর দত্তকে ধ্বংস না করে ফেললে তাকে ধ্বংস করা অসম্ভব। সত্যিটা হচ্ছে এই পৃথিবীতে যাদের মতো আর কেউ বাকি নেই, ‘লাস্ট ওয়ান স্ট্যান্ডিং’ নামে তাদের একটা গুপ্ত ক্লাব আছে। সমর দত্ত এখন থেকে সে ক্লাবের আমরণ সভ্য।

    *


    একটা অবান্তর কথোপকথন অবশেষে পয়েন্টে পৌঁছল। চিঠির বন্ধ খামের আঠা খুলে গেল। হাতড়াতে হাতড়াতে সুইচবোর্ড হাতে ঠেকে গেল। ঠিক তালায় ঠিক চাবি ঢুকে গেল। খ্যারখ্যার করা রেডিওর কাঁটা স্টেশন ধরে ফেলল। অমনি আশা ভোঁসলে তাঁর আশাতীত কণ্ঠে বেজে উঠলেন -

    হয়তো ফিরেও দেখবে না এই ফেরারী মন
    ঘর ছেড়ে ওই শূন্যে ওড়া পাখির মতন
    যাব দেশেবিদেশে যেখানে স্বপ্ন মেশে,
    সে যদি সামনে এসে দু’হাত বাড়ায় . . .

    সমর দত্ত স্তব্ধ হয়ে থাকলেন। জন্মের পরের দশ বাদ দিলে চল্লিশ বছরে খুব কমিয়ে ধরলেও চারশো বার তিনি গানটা শুনেছেন। চার বারও অস্বস্তি হয়েছিল? কানে লেগেছিল? মনে হয়েছিল, এমন একটা উদ্ভট স্বপ্ন কেউ কেন দেখবে? দেখলেও সে নিয়ে গান কেন লিখবে? আশা ভোঁসলের মতো একজন হাইফাই গাইয়ে সে গান গাইতে রাজিই বা হবেন কেন?

    হবেন কারণ গানটা ‘শেয়ালের’ স্বপ্ন নিয়ে নয়। ‘সে আলোর’ স্বপ্ন নিয়ে।

    পরের গান শুরু হয়ে গিয়েছিল। রেডিও অফ করে ফোনে ইউটিউব খুললেন। অরিজিন্যাল গান পাঁচবার শুনলেন, কভার পাঁচবার, ফিরে গিয়ে অরিজিন্যাল আরও পাঁচ। শেয়ালের ছায়ামাত্র নেই কোথাও। ভুল হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই, ভুল শোনার কোনও অজুহাতই নেই। চল্লিশ বছর ধরে তিনি কি একাই ভুল শুনছিলেন, বাকি সবাই ঠিক শুনছিল? একদল চক্ষুষ্মানের মধ্যে একা অন্ধ হয়ে ঘোরার সম্ভাবনা সমর দত্তের মধ্যে প্যানিকের জন্ম দিল। প্যানিক তুঙ্গ ছুঁল যখন আর একবার ভুল শুনতে চাইলেন। পারলেন না। শ্রবণকে চাবুক মেরে, কল্পনাকে দুমড়েমুচড়েও সমর আর একটিবারও ‘শেয়াল’ শুনতে পেলেন না। এক ঘণ্টা আগে যা সত্য ও স্বাভাবিক, প্রত্যাশিত ও প্রশ্নাতীত ছিল, এক ঘণ্টা পরে উদ্ভট ও হাস্যকর হয়ে গেছে। পেনটেন কামড়ে মালটিপল চয়েসের একটি খোপে টিক মারামাত্র বাকি সব চয়েস উধাও। যেন কোনও চয়েস কোনওদিন ছিল না, বরাবর একটি ঠিক উত্তরই একা জ্বলজ্বল করছিল। গোলোকধাঁধায় ঘুরে ঘুরে ঘেমেনেয়ে পথ খুঁজে বেরিয়ে সমর দত্ত আবিষ্কার করলেন দিব্যি সোজা রাস্তা, তীরচিহ্নটিহ্ন আঁকা। কোথাও কোনও ধাঁধা নেই। কখনও ছিল না।

    সমাপ্তিরা সমরকে ঘিরে ধরল। অলিগলি ঘুলঘুলি থেকে উপসংহার উপচে পড়ল। শহর জুড়ে কত কিছু যে ফুরিয়ে গেছে, ফুরিয়ে যাচ্ছে, ফুরিয়ে যাবে যাবে করছে, আবিষ্কার করে সমর স্তম্ভিত হলেন। টের পেলেন অবসান ব্যাপারটা অক্সিজেনের মতো। অদৃশ্য অথচ অমনিপ্রেজেন্ট। তাদের অগ্রাহ্য করার অপশন সমর দত্তের আর থাকল না। দেওয়ালে লেগে থাকা গেঁয়ো বাংলা সিনেমার তস্য গেঁয়ো পোস্টারের ছিন্ন আধখান দেখে ধরে ফেলতেন এ পোস্টার এঁকেছেন শহরের শেষ হাতে পোস্টার আঁকা শিল্পী। মাস্তান পায়রা, গুণ্ডা কাকেদের কলরব ছাপিয়ে অশ্রুতপ্রায় কিচকিচ শুনে জেনে ফেলতেন একশো মিটারের মধ্যে পাইপের কোণায় খড়কুটোর ভেতর ছোট্ট ছোট্ট ডিমের ওপর বুক ফুলিয়ে বসে আছে পিনকোডের শেষ চড়াই-মা, পিনকোডের শেষ চড়াই-বাবা অফিসে গেছে। খিদের বোধ ততদিনে সমরের প্রায় লুপ্ত, তবু কোনও কোনও দুপুরের দিকে তালতলার এক কচুরির দোকানে যেতেন। কানাগলির নামহীন দোকান, নড়বড়ে বেঞ্চি, বেঞ্চির ওপর লোক। চশমার সুতোবাঁধা ডাঁটি, ঘোলা কাঁচ, গেঞ্জির ফুটোর ভেতর মাংসহীন বুক। সরু আঙুলে বাঁদিকের ঝুড়ি থেকে শালপাতা তুলে এক মোচড়ে চাঙারি বানিয়ে, খড়কে কাঠি গুঁজে, এদিকের ঝুড়িতে ফেলছে। আবার ফিরে যাচ্ছে বাঁদিকের ঝুড়িতে। শালপাতা, মোচড়, চাঙারি। শালপাতা, মোচড়, চাঙারি। পনেরো সেকেন্ডের আবর্তন। আবর্তনের ছন্দে, ফোকাসের তীব্রতায় দুলন্ত শরীর। সে দুলুনি দেখতে দেখতে সমরের দৃষ্টি স্থির, কচুরি ন্যাতা হত। লোকটা জানে কি না সমর জানতেন না, সমর জানতেন এ কলকাতার শেষ শালপাতা-ঠোঙাকার।

    পুজোর আগ দিয়ে একদিন কচুরি হাতে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে আছেন, বাঁদিকের ঝুড়ির সব শালপাতা ঠোঙা হয়ে ডান ঝুড়িতে এসে পড়ল। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে লুঙ্গি ঝেড়ে আড়মোড়া ভাঙছে, চোখ বন্ধ, মুখ হাঁ, শরীর কাস্তে, আকাশের ব্যাকড্রপে উত্থিত মুষ্টি, এমন সময় মুষ্টির কান ঘেঁষে সড়াৎ। একটা কাটা ঘুড়ি, জাগতিক সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করার আনন্দে আকাশের মাঝখান দিয়ে, মন্দাক্রান্তা চালে চলেছে।

    সমর দত্ত দেখামাত্র চিনে ফেললেন। এ সিজনের শেষ কাটা ঘুড়ি। কচুরিটচুরি ফেলে ছুট লাগালেন। মাত্থা উঁচু করে ঘুড়িকে নজরে রাখতে গিয়ে উল্টোদিক থেকে আসা সাইকেলের সঙ্গে লাস্ট মোমেন্টে কলিশন কান ঘেঁষে এড়ালেন, নর্দমা লাফ দিয়ে টপকে বড় রাস্তায় পড়লেন। ঘুড়িটা টের পেয়েছে নির্ঘাত কারণ চলন আর মন্দাক্রান্তা নেই পিক আপ নিয়েছে এক্ষুনি চোখের আড়ালে চলে যাবে কিছু একটা করা দরকার সমর এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন একটা বাস ফুল স্পিডে আসছে সমর হাত তুলেছেন বাস স্পিড কমাচ্ছে না ভাবার সময় নেই সমর হাত বাড়াচ্ছেন বাসের হাতল এই পিছলে যায় যায় কিন্তু গেল না।

    সমর বাসের পেছনের দরজার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলেন। দরজায় ঝোলার অভ্যেস নেই কিন্তু ভেতরে গেলে ঘুড়ি চোখের আড়ালে চলে যাবে আর ঘুড়িকে চোখে চোখে রাখা দরকার। কাজেই রড জোরসে চেপে আকাশের দিকে মুখ তুলে সমর দত্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন। ঘুড়ি বাসের সামনে সামনে, বাস ঘুড়ির পেছনে পেছনে চলল। কতক্ষণ চলবে গ্যারান্টি নেই, বাস বা ঘুড়ি যে কেউ যে কোনও সময় বাঁক নিতে পারে। নিলে কন্ডাকটরকে ‘ঘুড়িটাকে ফলো করুন ভাই,’ সমর মরে গেলেও বলতে পারবেন না কারণ বললে অদ্ভুত দেখাবে আর দেখানোশোনানো নিয়ে সমর সেনসিটিভ।

    একগাদা অনিশ্চয়তা বুকে নিয়ে সমর বাসের দরজায় ঝুলতে থাকলেন, দূষিত হাওয়ায় সমরের চুল উড়তে লাগল। ঘুড়ি বা বাস - কেউই পথ বদলাল না। বিপদ এল অন্য দিক থেকে, যে দিকটা সমর ভেবে দেখেননি, সিগন্যাল। শহরের প্রতি দুই সিগন্যালের মাঝে কেউ যেন একটা করে এক্সট্রা সিগন্যাল গুঁজে রেখে গেছে, তারা শেষ মুহূর্তে শলা করে লাল হয়ে যাচ্ছে। প্রতি সিগন্যালে বাস দাঁড়াল, প্রতি সিগন্যালে ঘুড়ি অদৃশ্য হল। বাসটাও বলিহারি। যেন জীবনে সিগন্যাল ভাঙেনি, সিগন্যাল ভাঙা কাকে বলে জানে না। সমর বাসের গা থাবড়ে হতাশা প্রকাশ করতে পারতেন, ‘সাইডে দাঁড় করিয়ে বাড়ি থেকে ডেকে আন’ জাতীয় শ্লেষাত্মক বাক্য ছুঁড়ে দিতে পারতেন, যা অনেককে অনেকবার দিতে শুনেছেন, হাসি না পেলেও হেসেছেন শুধু একটা কিছুর অংশ হবেন বলে। কিছুই করতে পারলেন না সমর, হৃদপিণ্ড হাতে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া। বছরের শেষ কাটা ঘুড়িকে হারিয়ে ফেলার আতংকও সমরকে সমরত্বের সীমানা অতিক্রম করতে দিল না।

    পাটুলিও পার হয়ে যায় দেখে বাস থেকে নেমে পড়লেন। বাস চলে গেল। ফিরতি বাস ধরার জন্য রাস্তা পেরোতেই পেরোতেই চোখ পড়ল। ল্যাম্পপোস্টের মাথায় ঘুড়িটা লাট খাচ্ছে। আনমনে। শুনতে না পেলেও সমর শিওর, গুনগুনাচ্ছেও। ল্যাম্পপোস্টের নিচে ঝুপড়িমতো মিষ্টির দোকান। ঘুড়িটার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে দোকানে ঢুকলেন। প্রায় ফাঁকা কাঁচের বাক্সে গাঢ় কমলা দানাদার। একটা কিনে খেতে খেতে ঘুড়িটার দিকে মাঝে মাঝে কড়া দৃষ্টি হানছেন, দড়িপাকানো দোকানদার জিজ্ঞাসা করল দাদা কোথায় যাবেন। গন্তব্য শুনে পরামর্শ দিল পরের স্টপে চলে যাওয়ার কারণ পরের স্টপে অন্যান্য রুটের বাসও আসে।

    সমর কী করবেন ভাবছেন, বাস এসে গেল। ফাঁকা। উঠে জানালার পাশে বসলেন। মগজে খচখচ। পরের স্টপ এল। দোকানি ঠিকই বলেছিল। বাসও বেশি, মানুষও। তারা পিলপিলিয়ে উঠে বাস ভরিয়ে ফেলল। ভাগ্যিস দোকানির বুদ্ধিতে পরের স্টপে . . . খচখচ কেটে গেল। পরের স্টপ! ওই দোকানদার সম্ভবতঃ কলকাতার শেষ বাঙালি যে আগে সঙ্গে পরে এখনও গুলিয়ে ফেলেনি। সেই থেকে সমর দত্ত বাংলা শুনতে মাঝে মাঝে তালতলার কচুরি ফেলে পাটুলি পেরিয়ে দানাদার খেতে যেতেন।

    *


    সারাদিন এত দৌড়োদৌড়ির পর স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হতে সময় নিত, সমর দত্ত ছাদে গিয়ে শুয়ে থাকতেন। তারাহীন আকাশ আলকাতরা-লেপা বাটির মতো উল্টে থাকত। ছোটবেলার ছাদ মনে পড়ত। আরও কত দত্তদের কলকলানিতে মুখরিত। জ্যোৎস্নাস্নাত। এমনকি চন্দ্রহীন রাতেও একরকমের আভা ছেয়ে থাকত। চোখ মাপমতো সরু করে, বই চশমার মাপমতো কাছে তুলে সে আভায় রেগুলার অরণ্যদেব ম্যানড্রেক পড়েছেন সমর। কলকলানি কবে থেমে গেছে। জ্যোৎস্না কবে নিভে গেছে। সমর খেয়াল করেননি, নিশ্চয় কোন রাজকার্যে ব্যস্ত ছিলেন।

    এক রাতে শুয়ে শুয়ে মৃত জ্যোৎস্নার কথা ভাবছেন, অন্ধকার নড়ে উঠল। যেন বাটির বুক থেকে ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল, অন্ধকার সসম্ভ্রমে সরে তাকে জায়গা দিল। একটি পথ তৈরি হল, বাকি অন্ধকারের থেকে গাঢ় ও জমাট।

    কয়েকদিন আগের পাতাল উন্মুক্ত হওয়ার স্মৃতি এখনও টাটকা, আজ আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ে নাকি আতংকে সমর স্থির হয়ে আছেন এমন সময় পথ বেয়ে একটি সরসর বা শনশন, এদিকওদিক দেখতে দেখতে দত্তদের দেড়শো বছরের পুরোনো ছাদে পা রাখল। সমরকে আবিষ্কার করে দু’সেকেন্ড থতমত খেল, তারপর সাঁ করে ভেসে এসে কানে কানে ফিসফিসাল, উওলেমিয়া।

    উওলেমিয়া! বিষুবরেখার অনেক নিচে নীল পাহাড়ের গভীর গিরিসংকটে একসারি পাইন। যাদের মণ্ড পাকানো, গিঁটপড়া ছালেবাকলে এমন এক গ্রহের স্মৃতি যার কল্পনাতেও মানুষ বলে কিছু কুলোয়নি। যে গ্রহে ডাইনোসররা তাদের গোদা পা ও নুলো হাত নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়। উওলেমিয়া সে পৃথিবীর শেষ জ্যান্ত সাক্ষী।

    সেই থেকে রাত হলেই সমর দত্ত মাদুর বগলে ছাদে চলে যান। উপুড় হওয়া কালো বাটির দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকেন। রাত গভীর হলে বাটি শ্রান্ত শ্বাস ছাড়ে, অন্ধকার সরে পথ করে দেয়। যে পথ - সমর ততদিনে উপলব্ধি করেছেন - একটি আন্তঃনাক্ষত্রিক প্লাজমা সুড়ঙ্গ। কোনও কোনও দিন সুড়ঙ্গ বেয়ে সমর এ শহরের পগার পেরোন, কোনও কোনও দিন অন্যরা এসে উপস্থিত হয়। এই অনর্গল গতায়াতের মাধ্যমে সমরের আলাপ হয় আর্কটিকের কালো জলে সাঁতরে বেড়ানো সাদা হাঙরের, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যার মতো আর কেউ বাকি নেই, সে মরলেই সব ফুরোল। দেখা হয় জলাজমির আনাচেকানাচে ঘাপটি মেরে ঘোরা একলা মথের যার ডান পাখায় পাঁচটি ফুটকি, বাঁ পাখাতেও একটা না সাতটা না গুনে গুনে সেই পাঁচটাই। সমরের হাঁ বন্ধ করতে সময় লাগে, এত সুন্দর কিছু তিনি আগে দেখেননি। মথ মুখ ভেচকে বলে, কেউই দেখেনি, উনিশশো সাতাশ থেকে। জ্য্যান্তই দেখতে হবে এমন গোঁ না থাকলে চলে যাও সংগ্রহশালায়, মুছে মুছে এমন জেল্লা যে কাঁচকে হাওয়া ভেবে লোকে সকালবিকেল গোঁত্তা খাচ্ছে, সে কাঁচের বাক্সের ভেতর আমাদের চোদ্দপুরুষ বেয়াল্লিশগুষ্টির ডেডবডি, ডানা টান করে আলপিন ঠুকে ডিসপ্লে-তে আছে। না না, খুদি খুদি, ট্রান্সপারেন্ট আলপিন যাতে ডানার সৌন্দর্যসুধা চোট না খায়। আমি আর আমার মতো ক’জন জলাজমিতে ঘাপটি মেরে ঘুরছি, রাতে ছাড়া বেরোচ্ছি না। পাছে সুন্দরের পূজারীদের চোখে পড়ে যাই।

    এক রাতে প্লাজমা সুড়ঙ্গের শেষ দেখতে সমরের রোখ চাপল, দুই হাত কানের পাশ দিয়ে সোজা তুলে দিলেন। আপ আপ অ্যাওয়েএএএএ। সুড়ঙ্গ সমরকে নিজের মধ্যে টেনে নিল। সমর শোঁ শোঁ করে টোপো, স্ট্র্যাটো, মেসো, থার্মো, এক্সোস্ফিয়ার পার হয়ে বায়ুমণ্ডলের বাইরে নিক্ষিপ্ত হুলেন। হাত বুলিয়ে দেখলেন জামাকাপড় ছেঁড়েনি, চামড়া পোড়েনি, নাকের ওপর চশমাটাও গ্যাঁট হয়ে আছে। সমরের সায়েন্স ছিল না কিন্তু এটুকু জানা আছে যে সাধারণ মানুষ হলে এতক্ষণে ঠাণ্ডায় নয় বায়ুহীনতায় নয়তো রেডিয়েশন বা কিছু একটাতে তাঁর মরে যাওয়ার কথা, অথচ সমর দিব্যি বেঁচে আছেন। থাকবেনই কারণ সমর তো আর সাধারণ নন, তিনি লাস্ট ওয়ান স্ট্যান্ডিং।

    মহানন্দে মহাশূন্যে ভাসছেন এমন ব্যস্তসমস্ত ধেয়ে এল একটা পাঁচ নম্বরের ধাতব ফুটবল। শরীর থেকে ছ’টা অ্যান্টেনা, উল্টো বেঁধা বর্শার মতো বিভিন্ন কৌণিকতায় বেরিয়ে আছে। প্রথমটা সমর ভেবেছিলেন গ্রহান্তরের প্রাণী, কিন্তু সমরের নামধাম উদ্দেশ্যবিধেয় জেরা করে সন্তুষ্ট হয়ে ধাতব ফুটবল জানাল যে সে সমরেরই গ্রহের লোক। এবং রীতিমত গণ্যমান্য একজন লোক। মানুষের মহাকাশে পোঁতা প্রথম ঝাণ্ডা, জ্ঞানবিজ্ঞানের ভ্যানগার্ড। আপাততঃ মহাকাশে ফেলে আসা মানুষের প্রথম জঞ্জালের সন্দেহজনক গরিমায় গরিমান্বিত। মিশন শেষ হয়ে গেছে বহুদিন, ট্রান্সমিটারের সংযোগ ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে কন্ট্রোল রুম থেকে কোনও রকম আলাপআলোচনা ছাড়াই। তাতে এই অবসরপ্রাপ্ত সেনাপতিকে দমানো যায়নি, সে এখনও ঘুরে ঘুরে তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে। অদূরে গ্রেভইয়ার্ড কক্ষপথে পাক খেতে খেতে বুড়োর কাণ্ড দেখে হাসাহাসি করছে শীতল যুদ্ধের স্যাটেলাইট সেনানীর দল, অন্তরীক্ষের গুপ্তচরবাহিনী। যুদ্ধ শেষ, সহস্রাব্দ বদলে গেছে, তবু তারা এখনও পরিস্থিতি চোখে চোখে রাখছে। কারণ তারা জানে সময় বদলালেও মানুষ বদলায় না। কাজেই যুদ্ধও থামে না। নতুন সহস্রাব্দের নতুন যুদ্ধে ডাক পড়ার আশায় তারা তৈরি।

    একদিন মহাকাশচারণ করতে করতে সমরের কানে এল কিছু অদ্ভুত ধ্বনি। বেশ কিছুদিন ধরেই আসছে। মর্মোদ্ধার না করতে পারলেও আত্মীয়তা টের পেয়েছেন সমর। যেন এদের পেছনে জিভ, আলজিভ, দাঁত, টাকরা, ল্যারিংক্স, ফ্যারিংক্স - মোটকথা সমরের চেনা স্বরব্যবস্থার হাত আছে। দুই হাত গোল পাকিয়ে বাইনোকুলার বানিয়ে চশমার সামনে ধরলেন। এদিক ওদিক ঘুরিয়ে তাক করলেন আন্দেস পর্বতমালার পাদদেশে, যেখানে পাহাড়ের কোলে সবুজ প্রান্তরে নড়ছেচড়ছে একটা কালো বিন্দু। চোখটোখ সরু করে দেখলেন একটা বুড়ো। ঘুরছেফিরছে আর নিজের মনে ফিসফিস করছে। অবোধ্য সব ধ্বনি। মাথামুণ্ডহীন প্রলাপ।

    পাগল নাকি? সমর জানতে চাইলেন, অদূরেই, মধ্য অ্যামেরিকার বৃষ্টিঅরণ্যের গভীরে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর মহার্ঘতম মেহগনির কাছে। মেহগনিকে ঘিরে শিফটে শিফটে সশস্ত্র পাহারা কারণ নিভৃত নিলামে তার যা দর উঠেছে - মেহগনি গর্বিত গলায় আগের সপ্তাহেই জানিয়েছে - সমরের কল্পনাকে কোটি দিয়ে গুণ করলেও ধারেকাছে পৌঁছবে না। আশি বছরের বিলিওনেয়াররা চেকে পেন ঠেকিয়ে বসে আছে, মেহগনিকে উপড়ে শিকড় বেটে খেলেই লকলকিয়ে উঠে মানবসমাজে নিজের জিনের ছররা ছেটাবে।

    মেহগনি বলল, পাগল কেন হবে? তুমি যাকে বোঝ না সে-ই পাগল, তোমার মাথায় যা ঢুকছে না তা-ই প্রলাপ, এ কনফিডেন্স শুধু তোমাদেরই সম্ভব। ওই শব্দগুলো একটা আস্ত ভাষা, যে ভাষায় এখন গোটা পৃথিবীতে একমাত্র ও কথা বলতে পারে। বাকি সবাই ফৌত। তাই বুড়ো একা একা নিজের সঙ্গে কথা বলে প্র্যাকটিস রাখছে।

    সমর বাইনোকুলার দিয়ে বুড়োটাকে দেখেন। কল্পনা করার চেষ্টা করেন, বুড়োর পলকা পিঠে বাঁধা গোটা একটা ভাষার বাস্তুতন্ত্র। সে ভাষার যত মানচিত্র ও মিথ, জোয়ারভাঁটার নির্ঘণ্ট, অরণ্যের যত প্রাচীন প্রবাদ, অ্যানাকোন্ডার হাই-কে এক কথায় প্রকাশ - বুড়োটার সঙ্গে সঙ্গে মরে যাবে। হিংস্র জন্তুকে বশ করার যাবতীয় বাটিচালাচালি, অতৃপ্ত আত্মাদের পোষ মানানোর যত জলপড়াপড়ি ঝেঁটিয়ে বিদায় হবে। প্রেমে পড়ে ও ল্যাং খেয়ে লেখা সব কবিতা উবে যাবে জঙ্গলের গভীরে নদীর ওপরে জমে থাকা কুয়াশা রোদ উঠলে যেমন যায়। ফিন, ফিনিতো, ফিনিশ। নো হরির লুট, নো গান স্যালুট, নো সংকীর্তন। পৃথিবীর অধিকাংশ জরুরি জিনিস যেভাবে মরে, র‍্যান্ডম সকাল বা দুপুরে, অগোচরে।

    *


    দত্তদের খেলানো, পরীর রেলিং দেওয়া ছাদ অপছন্দ হওয়ার কারণ নেই, সমরের নতুন ক্লাবের সতীর্থদেরও হল না। রোজই আসে কেউ না কেউ। একা বা দল বেঁধে। আসর জমায়। প্রথম প্রথম সমর আড়ষ্ট হয়ে থাকতেন। পাছে ইংরিজিতে কথা বলতে হয়, বাংলা মিডিয়াম ও ওষ্ঠবর্ণে প্রতিপালিত সমরের এফ ফ, ভি ভ হয়ে গেলে পাছে বিদেশী বন্ধুরা ঊরু চাপড়ে হেসে ওঠে সে আতংকে সমর সন্ত্রস্ত হয়ে থাকলেন।

    ইংরিজি ছাড়াও সমর দত্তের যোগাযোগসংক্রান্ত অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিছু কিছু শারীরবৃত্তীয়, চাইলেই সারিয়ে নেওয়া সম্ভব না। সমরের মাথা ও মুখ একটি সেতু দ্বারা যুক্ত ছিল এবং সেতুর মাঝপথে বসানো ছিল একটি একমুখী, নিশ্ছিদ্র গেট। মগজে ভাব জাগত, অবয়ব নিত, ভাবনা হত। মগজ পরীক্ষা করে ভাবনায় স্ট্যাম্প দিলে গেট খুলত এবং ভাবনা ভাষার সাহায্যে ভাষ্য হয়ে মুখ দিয়ে বেরোতে পারত। মগজের স্ট্যাম্প ছাড়া একটি হ্যাঁ, হুম্‌ম্‌ বা হসন্তও গলতে পেত না। এবং মগজ যখনতখন অনুমতি প্রত্যাহার করার ক্ষমতা রাখত। এমন হরদম ঘটত, সমরের ভাব দানা বেঁধে ভাবনায় পরিণত হয়ে, গেট পেরিয়ে মুখ থেকে বেরোতে শুরু করেছে, বাক্য মাঝপথে, এমন সময় মগজের মনে হল ভাবনায় খামতি আছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গেট বন্ধ হত, সমর হাঁ করে বসে আছেন, কথা বেরোচ্ছে না। অপ্রস্তুত সমর যতক্ষণে মুখ বন্ধ করতেন কথোপকথন এগিয়ে যেত। কারণ অধিকাংশ লোকেরই মাথা ও মুখ সংযোগহীন ও স্বাধীন এজেন্ট। মুখ চালাতে মাথা খাটাতেই হবে, মাথা না খাটলে মুখ চলবে না - এ প্রতিবন্ধকতা তাদের নেই। তারা ততক্ষণে ইজরায়েল প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ শেষ করে, কোভিড ভ্যাকসিনের মাধ্যমে বিল গেটসের মাইক্রোচিপস ঢুকিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র পেরিয়ে মেয়েদের মন্ত্র পড়া কেন উচিত না-তে পৌঁছে গেছেন। মন্ত্র পড়া সিরিয়াস কাজ বলে নাকি ওম্‌ উচ্চারণের ভাইব্রেশনে গর্ভাশয়ের লাইনিং ছিঁড়ে পুত্র, থুড়ি সন্তানধারণে - যা কি না আবার খুবই সিরিয়াস কাজ - বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে।

    শেষ যে সমস্যা সমরকে মানুষিক সংযোগের পক্ষে সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণ করেছিল তা হল সংশয়। সমরের সংশয়ে ‘দে ওমনিবুস দুবিতান্দুম’-এর কার্টেসিয়ান ভার বা ‘ডাউট এভরিথিং’-এর মার্ক্সিয়ান ধার ছিল না। সমরের সংশয় ছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোড় পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এসে দরজার চাবি খুলে ঢুকে গ্যাসের নবে হাত বুলিয়ে দেখার। চুটকি বলতে শুরু করে মাঝপথে থেমে, চুটকিটা যে ততটাও হাসির নয় ডিসক্লেমার দেওয়ার। যুদ্ধ জিনিসটা খারাপ সে পর্যন্ত সমর নিশ্চিত হতে পারতেন কিন্তু কোন পক্ষের দোষ বাছতে বসলে ঘণ্ট পাকিয়ে ফেলতেন। চৈতন্যদেবের মৃত্যু স্বাভাবিক না হোমিসাইড নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো দূর, সমর আগ্রহের ভানও করে উঠতে পারেননি। কাল চাকরি থাকবে কি না যাদের ঠিক নেই, তাদের এই সব বিষয়ে এই দ্রুততায় নিঃসংশয়তায় পৌঁছনো বরং সমরকে বিস্মিত করত। চাকরি না থাকার অনিশ্চয়তাই মহাপ্রভুর মৃত্যু নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার হাঁকপাঁকের জন্য দায়ী কি না এক একবার প্রশ্ন জেগেছিল - নিঃসংশয় হতে পারেননি।

    সমরের এ সব প্রতিবন্ধকতা লাস্ট ওয়ান স্ট্যান্ডিং ক্লাবের মেম্বাররা ধর্তব্যের মধ্যে আনল না। অশুদ্ধ ইংরিজি বা বিশুদ্ধ বাংলা - দুইয়ের প্রতিই তারা সমান উদাসীন। একা একা একটা গোটা ভাষা মগজে নিয়ে যে বুড়ো মরতে বসেছে সমরের সিন্ট্যাক্সের শুদ্ধতা নিয়ে তার কাঁচকলা। বুড়োহাবড়া স্যাটেলাইট জানেই না ণত্ব খায় না মাথায় দেয়, ষত্ব ধুয়েই বা সে কোন জল খাবে? সমরের সংশয় বা ঢিলেমোও সমস্যা হল না। যারা ফিনিশিং লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের কীসের তাড়া কীসের দেরি। সমর ভাবার জন্য যখন খুশি, যত খুশি সময় নিতে পারতেন। কথা শুরু করার আগে, শুরু করার পর থামিয়ে। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, আধঘণ্টা। এমনও হয়েছে বাক্যের মাঝপথে সমরের কথা বন্ধ হয়ে গেছে, সমর তিনদিন তিনরাত ভেবে ফিরে এসেছেন, কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে বা না পৌঁছে। যেখানে থেমেছিলেন সেখান থেকে আবার কথা শুরু করেছেন বা করেননি। তাতে কেউ সমরের সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি।

    *


    যে সমর এতদিন বলার কথা খুঁজে পেতেন না, তাঁর কথা উপচে পড়ল। যে সমরের এতদিন কথা বলার লোক ছিল না পৃথিবীর সমস্ত সময়জোন জূড়ে তাঁর বন্ধু হল, অষ্টপ্রহর ইথারে তাদের কথা ভাসে, অদৃশ্য ওয়াকিটকির বোতাম টিপে টিপে কাঁটা ঘুরিয়ে সমর কথা বলেন। সে অনর্গল, ভাষাবিবর্জিত, ব্যাকরণবহির্ভূত কথার স্রোতে সমরের ফুসফুস ফাটোফাটো, গলা কাঠ, ঠোঁট চৌচির ও শব্দনালী শ্রান্ত হল। বাকি শরীর যেন এ রকম একটা পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিল। পায়ের আঙুল দায়িত্ব নিল পুকুরের সঙ্গে মনের কথা দেওয়ানেওয়ার, আকাশের দিকে তাকালে চোখ স্যাটেলাইটের সংকেত নির্ভুল ডিকোড করার, আঙুলের ডগার টিউবওয়েলের সমস্ত খুনসুটি আক্ষরিক অনুবাদের - সমরের অনাগ্রহের অক্ষম অভিনয় সত্ত্বেও।

    অর্ধশতাব্দী ধরে সমর দত্ত একটা জামা পরে ঘুরেছেন যার বগলের কাছটা টাইট, পুট কাঁধের অল্প নিচে বা ওপরে, হাতা কবজির আধ ইঞ্চি আগে চোখে চোখ রেখে থমকে আছে। অর্ধশতাব্দী ধরে সমর ভেবে এসেছেন সমস্যাটা তাঁর মাপজোকের। তাঁর বেখাপ্পা শরীর আর বেতালা মনের। একবারও মনে হয়নি জামাটা তাঁর নয়, অন্য কারও মাপে বানানো। অর্ধশতাব্দী পার করে জীবনে এই প্রথম পুকুরধারে বসে, ছাদে চিৎপাত শুয়ে, ছাতিমের হাওয়া খেয়ে, ট্রামেবাসে কলকাতার এধার থেকে ওধার চোঁভোঁ চষতে চষতে সমর দত্ত দুই হাত ছড়িয়ে দিলেন, মাথা গলিয়ে দিলেন, আকাশবাতাসমহাকাশ রেওয়াজি দর্জির হাতের কাজের মতো সমরের শরীরে ফিট করে গেল। অর্ধশতাব্দী পার করে সমর দত্ত টের পেলেন নিজেকে ফিট করানোর এত মারামারির কোনও দরকারই ছিল না, ব্রহ্মাণ্ড ঠিক তাঁর মাপেই বানানো।

    ব্রহ্মাণ্ড অঙ্গে ধারণ করে সমর সারা শহর ছুটে বেড়াতে লাগলেন। অধিকাংশ লোকই, এমনকি চেনারাও আজকাল সমরকে দেখলে সরে যায়, প্রিয় মানুষের কনুই ধরে সরিয়ে নেয়। যাদের মন অতটাও কড়াপাক হয়ে যায়নি, হয়তো কবিতা পড়ে বা তেমন দুঃখ হলে লেখেও - থামে। সময় থাকলে, কখনও কখনও না থাকলেও। কী সমরদা কেমন আছেন, চেহারাটা এত খারাপ হয়ে গেছে, খাচ্ছেনদাচ্ছেন তো ঠিক করে। সমরের অদৃশ্য ওয়াকিটকি তখনই হয়তো জ্যান্ত হয়েছে, সমর ফুটপাথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভুরু কুঁচকে ঘাড় বেঁকিয়ে ছেঁড়াছেঁড়া স্ট্যাটিক বার্তায় মনোস্থাপন করেছেন, তার মধ্যেই চোখ তুলে হাসতেন। উল্টোদিকের লোকটা তো বোকা নয়, পরিষ্কার বুঝত, সে হাসি সিস্টেমে সামাজিক চুক্তির যেটুকু পলি এখনও পড়ে আছে তার প্রতিবর্ত ক্রিয়া, সমর আসলে কিছু শুনতে পাননি। পেলেও বুঝতে পারেননি। চশমার আড়ালে সমরের দু’চোখ পাঁকতোলা পুকুরের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেছে। সরে যাওয়ার আগে তাদের চোখেও এক ধরণের দৃষ্টি ফুটত। একজন সহমানবকে চোখের সামনে কক্ষচ্যুত হতে দেখলে যেমন ফোটার কথা। সমরও সে দৃষ্টি পড়তে পারতেন কারণ সমর তো পাগল নন। বোকা তো ননই। টের পেতেন তিনি একজন দ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছেন। একশো সাতচল্লিশ কোটির দেশে চোখ খুললেই কারও না কারও ওপর চোখ পড়তে বাধ্য, কিন্তু এ যত না চোখ পড়ে যাওয়া তার থেকে বেশি চোখে চোখে রাখা। গরমকালে সোয়েটার পরে ঘুরে বেড়ানো মানুষদের যে ভাবে চোখে চোখে রাখতে হয়। যে চোখে সতর্কতার সঙ্গে স্বল্প আহা মিশে থাকে। একটা আশ্বাসও, নিজের পরিণতি এই না হওয়ার।

    আগে হলে সমরের খারাপ লাগত। এখন লাগে না। কারণ চোখের মালিকদের দিকে তাকালে তিনি ধরে ফেলেন এরা অগণিতের অংশ। এ রকম আরও পিলপিল করছে। যারা পিলপিল, কিলবিল, যাদের কণ্ঠস্বর একে অপরের প্রতিধ্বনি, মতামত মণ্ড পাকিয়ে কালেক্টিভ চ্যান্টিং তাদের প্রতি সমর আগ্রহ হারিয়েছেন। সমরের মনোযোগে জাঁকিয়ে বসেছে যারা একক ও একাকী, যাদের মতো আর কেউ বাকি নেই, যারা চলে গেলে তাদের জায়গা কেউ ভরাট করবে না। সমর তাদের যাওয়া আটকাতে পারবেন না। কত কিছুই তো তাঁর চেতনার ফাঁক গলে অলরেডি পড়ে গেছে। সমর দত্ত জীবনের শেষ নাগরদোলা চড়ে ফেলেছেন, জীবনের শেষ পরীক্ষায় বসে ফেলেছেন, যে সব মানুষ সমরকে ক্ষণিকের জন্য জ্যান্ত করে তুলেছিল, শৈশবের জ্যোৎস্নার মতো তারা কখন চলে গেছে সমর খেয়াল করেননি। শেষবার কে তাঁর ডাকনাম ধরে কবে ডেকেছিল সমরের মনে নেই। সমরের মনে নেই জীবনের শেষ ফুচকাটা তিনি কবে খেয়েছিলেন, কার সঙ্গে খেয়েছিলেন, শেষ কবে ফুটবল খেলেছিলেন। যে মাঠে একদিন বিকেলে না যেতে পারার শোক সমর এখনও শরীরেমনে অনুভব করতে পারেন, সে মাঠের বুকের ওপর কবে একটা শপিং মল উঠে দাঁড়াল সেটুকু খেয়াল করার সময় সমর দিতে পারেননি।

    এই অমনোযোগের পুনরাবৃত্তি সমর করতে চান না। চলে যাওয়া তিনি আটকাতে পারবেন না, কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি শুধু সবার সঙ্গে একবার দেখা করতে চান। দুই হাত বুকের কাছে জড়ো করে বলতে চান, নমস্কার, আমি সমর দত্ত। আই অ্যাম দা লাস্ট ওয়ান স্ট্যান্ডিং। আপনার মতো। সে কাজ করতে গিয়ে যদি কিছু লোক তাঁর দিকে তাকায়, আহাউহু করে, সমরের কিছু এসে যায় না। কাজেই প্রতি সকালে সমর ছুটে বেরোন, শেষ চড়াইপাখিদের শেষ কিচকিচ শুনতে, শেষ শালপাতার চাঙারিতে কচুরি খেতে, শেষবারের মতো চেনা বাংলায় কথা বলতে। টোটোস্ট্যান্ডের দিকটা ঘুরে আসেন, টিউবওয়েলের গোড়ায় জঞ্জাল থাকলে সরান, গায়ে স্টিকার বা চিউয়িংগাম লেগে থাকলে টেনে তুলে জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করেন। অলিগলি ঢুঁড়ে এস টি ডি, আই এস ডি বুথ খুঁজে বার করেন। দরজা ঠেলে ঢুকে, বদ্ধ বাসি বাতাস বুক ভরে নেন, চিটেপড়া বোতাম টিপে টিপে কাল্পনিক নম্বর ডায়াল করেন। দোকানদার যাতে পাগল না ভাবে একতরফা কাল্পনিক কথোপকথন চালান। হ্যালো হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন, হ্যাঁ, হ্যালো, হ্যাঁ, কাল দেখা হচ্ছে তাহলে, আচ্ছা ছাড়ছি, বাই। দিনের শেষে ট্রাম ধরেন। পশ্চিমের জানালায় বসেন। হাইরাইজের মাথা ছুঁয়ে যেতে যেতে, ফাঁকফোকর পেলে সূর্য জানালায় রাখা সমরের মুখও ছুঁয়ে যায়। রুটে একটা জলামতো আসে। জলার ওপারে দশ সেকেন্ডের দিগন্ত। শহরের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখতে পাওয়া শেষ দিগন্ত। ট্রাম যতক্ষণ জলা পার হয়, সমর রুদ্ধশ্বাসে, নিষ্পলকে আরও একটা দিনের চিরতরে চলে যাওয়ার চেয়ে চেয়ে দেখেন। আড়াইশো এ কিউ আই হাওয়া সমরের চশমার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে চোখে জ্বালা ধরায়, ভিজিয়ে দেয়।

    সারাদিনে যার সঙ্গেই দেখা হোক না হোক, কথা হোক না হোক বাড়ি ফেরার আগে সমর একবার ছাতিমের কাছে যান। নতুন খবর থাকলে দেন, না হলে পুরোনো খবরই চালাচালি করেন। বা খবর না থাকার খবরটাই। কোনও দিন তারও দরকার পড়ে না। দুজনে দুজনের গায়ে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। ফাঁকহীন। ফাঁক ভরানোর দাবিহীন। শুধু তিনি যে আছেন, ছাতিমও যে আছে, দুজনে দুজনকে মনে করিয়ে দেন। প্রথমদিনের কথামতো।

    একদিন সন্ধের মুখে ছাতিমের ছায়ায় বসতে এসে সমর দেখলেন, ছাতিমের গায়ে পেরেক ঠোকা একটি নোটিস, আজকালকার সব নোটিসের মতোই, হিন্দিতে। ছাতিমবাগানের শেষ ছাতিমগাছ কেটে ফেলা হবে। কেটে ফেলে সে জায়গায় বিশ্বের বৃহত্তম বাঁদরমূর্তি প্রতিষ্ঠা হবে। ভূমিপূজন ও শিলান্যাস সমারোহ্‌র পুণ্য মহুরতের আশু নির্ঘণ্টও লেখা আছে। কাজ শুরু হবে কাল থেকেই।

    *


    বাঁশের ডগায় বাল্ব বেঁধে, নারকেল দড়ির গোল্লা কাঁধে গলিয়ে ছাদে উঠলেন সমর দত্ত। পিলারে পোঁতা খাটো লোহার রডে একসময় ফাঁকফাঁক ভারতীয় অ্যান্টেনা ও ঘেঁষাঘেঁষি বাংলাদেশী বুস্টার অ্যান্টেনা পাশাপাশি বাঁধা থাকত। কলসির কাঁখে পা রেখে রেলিং-এ উঠে উবু হয়ে বসে রডের সঙ্গে বাঁশ নারকেল দড়ি পেঁচিয়ে বেঁধে দিলেন। যথেষ্ট টাইট হয়েছে কিনা এক হাতে যথাসম্ভব পরীক্ষা করে, কলসির কাঁখে পা রেখে নেমে এলেন। কোমরে হাত দিয়ে, ঘাড় তুলে দেখলেন। বাল্ব জ্বলছে কি না দিনের আলোয় বোঝা যাচ্ছে না, রাত নামলে সম্ভবতঃ যাবে।

    মৃত পূর্বপুরুষদের পথ দেখানোর জন্য একসময় কার্তিক মাসে পাড়ায় পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে এ আলো জ্বালানো হত। ভাইবোনদের সঙ্গে মিলে সমরও টাঙিয়েছেন। আর একবার ঘাড় তুললেন সমর, কপালে হাত ঠেকিয়ে আলো জ্বলছে কি না বোঝার চেষ্টা করলেন। না জ্বললে আবার কত কাণ্ড করতে হবে। হোপফূলি জ্বলছে।

    এটা কার্তিক মাস নয়, ওটা আকাশপ্রদীপও নয়। একদিক থেকে পথনির্দেশ কিন্তু দত্তবাড়ির মৃত প্রেতাত্মাদের জন্য নয়। ঐতিহাসিক ব্যাটল অফ ছাতিমবাগান অবশেষে শেষ। সে ব্যাটল বা নন-ব্যাটলের শেষ শহীদ স্যার ছাতিমের উদ্দেশ্যে দত্তবাড়ির পুকুরঘাটে আজ পার্টি আয়োজন হয়েছে। পুকুরই বলেছিল নিমন্ত্রণপত্রে পথনির্দেশ রাখার কথা। রাখাই নিয়ম। সবাই রাখে। এমন নয় যে নিমন্ত্রিতদের পথনির্দেশ দরকার। এ বাড়িতে তারা সপ্তাহে অন্ততঃ পাঁচবার করে আসে। তবু আইডিয়াটা সমরের মনে ধরেছিল এবং নিমন্ত্রণপত্রে পথনির্দেশ হিসেবে নীল আলোর উল্লেখ করেছিলেন। পথনির্দেশ ধরলে পথনির্দেশ, লাইটিং ধরলে লাইটিং। লাইটিং না হলে পার্টি কীসের?

    দিন ফুরোল। রাত নামল। গভীর হল। সমরের সংশয় ঘুচিয়ে আকাশের কালোর বুকে বাল্বের নীল ঝলমলাল। অতিথিরা লাইন দিয়ে এল। সমর আপনি অথবা সবান্ধবের ছ্যাঁচড়ামোতে যাননি, সবাইকে সবান্ধবে আসার আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন। উপস্থিতি দেখে স্পষ্ট, সে অনুরোধ সবাই আন্তরিক ভাবে রক্ষার চেষ্টা করেছে।

    পার্টি শুরু হল। ঘাটের ফাটল চুঁইয়ে পাতাল থেকে উঠে এল থাম্প থাম্প থাম্প থাম্প, তাঁর হৃদস্পন্দনের সঙ্গে সিমলেস মিলে গেল দেখে সমর ধরে ফেললেন ওটা কার হৃদস্পন্দন। সে স্পন্দনের তালে তালে আর্কটিকের হাঙরের শরীরের ব্যাটারি ট্যাগ জ্বললনিভল, আশ্চর্য মথ তার আশ্চর্যতর ডানা মেললবুজল, মহার্ঘ মেহগনি হেডব্যাংগিং-এ মাতল। যে সব অতিথিদের ফ্যাশনেবলি লেটে আসার মতলব ছিল, আনন্দ মিস হয়ে যায় দেখে তারা শেষ পথটুকু দৌড়ে দুই হাত তুলে নাচতে নাচতে ঢুকল। ইন্ট্রোভার্টরা না দৌড়নোর ভান করতে করতে, এক্সট্রোভার্টদের সঙ্গে চোখাচোখি এড়াতে এড়াতে। না হলেই নাচতে নামার জন্য টানাটানি লাগাবে। পুকুরে ঢেউ উঠল, ভাঙল। সমরের পা ধরে টেনে নামাল ডান্স ফ্লোরে। সমর দত্ত, মানুষের পার্টিতে নাচার কল্পনাকে যিনি বন্যতম দুঃস্বপ্নেও জায়গা দেননি, দুই হাত তুলে নাচলেন। নাচলে নিজেকে যতটা হাস্যকর দেখানোর ভয় পেয়েছিলেন তার থেকেও একশোগুণ হাস্যকর দেখাল, কিন্তু সমর ভয় পেলেন না, কেউ হাসল না। দু’শো মিলিয়ন বছরের পাইনবনে নবীন বাতাস সিটি মারল, আন্দেসের কোল থেকে দুর্বোধ্য ফিসফাসের সঙ্গে মিশে ওহ্‌ সে কী পারত্রিক পারকাশন, আহ্‌ সে কী বিশ্বময় বিটবক্সিং। হল্লাগুল্লায় ধ্যান ভেঙে চাঁদ খানখান হল। ভ্যানগার্ড, বাকি স্যাটেলাইটদের জুটিয়ে ঠিক তক্ষুনি দত্তবাড়ির ছাদের ওপর পৌঁছেছে, তাদের বুড়ো হাড়ে ধাক্কা খেয়ে জ্যোৎস্নাকুচি ঝরে ফাটা ঘাটে, সাইকোডেলিক ডিস্কো বলের নকশা তৈরি করল। নকশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সব ভুলে, প্রাণ খুলে সমর দত্ত নাচলেন, সমরকে ঘিরে নাচল, গাইল, শিস দিল, মাথা ঝাঁকাল, ব্রহ্মাণ্ডের স্টেডিয়ামে মেক্সিক্যান তরঙ্গ তুলল তারা যাদের অতীত ফুরিয়েছে, ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই, ক্লাইম্যাক্সের কিনারায় যারা কাঁপছে। ক্রমে উত্তুঙ্গ উল্লাস শ্রবণ অতিক্রম করে মহৎ মৌনতায় পর্যবসিত হল, লাইটিং এত উজ্জ্বল যে রেটিনাতে আঁধার হয়ে ধরা দিল, উদযাপন এত উদ্দাম ও লাগামছেঁড়া যে রাতভোরে তার আর খোঁজ পাওয়া গেল না।

    হয়তো সে জন্যই সকালে যারা ও দিক দিয়ে গেল, যেতে যেতে ফোন থেকে চোখ তুলল, একরাশ নৈঃশব্দ্য, একরাশ নিঃসঙ্গতা ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। বাঁশের ডগায় একটা মৃত আকাশপ্রদীপ। একটা ফাটা পুকুরঘাট। একটা আধমজা পুকুর যার জল ততক্ষণে আবার শান্ত ও সমতল। বোর হয়ে তারা যে যার ফোনে ফেরত গেল, গত রাতের অসহনীয় আনন্দের এককণা আঁচও কারও কপালে জুটল না।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    উৎসব সংখ্যা ২০২৬ | আমার উৎসব পাচ্ছে না | ডড্ডামারা এবং... | বিস্মৃত পিটক | বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি | উৎসব আমাদের | ইঁদুর অথবা | পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলের রোদে | ধান তোলার মরশুম | ভাঙা ডানার আকাশ | সল্টলেক | জীমূতবাহন | কবিতাগুচ্ছ | অবাধ্য যত দুঃস্বপ্নরা | পুঁজিবাদী পেরেক আর ৩য় বিশ্বের যীশু | কবিতা লিখুন খিস্তি দিয়ে, জাটেল্লির মতো | সাঁতারখোকার গল্প | কবিতাগুচ্ছ | কাগজের নৌকা | রূপান্তর | যে মাটিতে দাঁড়িয়ে | আমিই সে | তিনটি অণুগল্প | বিগলিত সায়াহ্ন | নদী বিষয়ক | আশির আমি, আশির তুমি | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - শেষ পর্ব | ভাণ্ডান বিনতি | বাঁশি | খুলে যাও সিমসিম | মেয়েজন্ম, মেয়ে নয় শুধু... | আগুনে গড়া হাজার বছর ১ | তারকভস্কির ছাত্রজীবনের ছবি | বর্ষাপুরাণ | যে গল্পদের শোনা হয়নি | আগুনে গড়া হাজার বছর ২ | শখের কুলুঙ্গি | স্কারলেট পর্ব ১ | স্কারলেট পর্ব ২ | দুটি কবিতা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ১ | দাদির কবর | রিকশা নিয়ে সাতসতেরো | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ২ | মনলিপি | ধুলোর রাজপথ | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৩ | রাষ্ট্র বনাম নদী | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৪ | পসন্দ আপনা আপনা | চিরন্তনী সাহিত্য ও প্রেমের গল্পে শরৎচন্দ্র | বিজনের সাথে দেখা | বাবুই বাসার সোনার সূচ পর্ব ৫ | বাঙালির লোকায়ত উৎসবঃ ঝুলনযাত্রা | ছাতিমবাগান
  • গপ্পো | ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ২০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন।