এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব

  • মেমোরিয়াস দি ভিদ্রু - পর্ব ২

    মৌ চক্রবর্তী
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • অলংকরণ: রমিত



    ৩। । ওকুলুশ দি ভিদ্রু


    এখানে এত বড় ব্যবসা চলে, বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না। দিনে দিনে, বছরে বছরে, চোখের সামনে মানুষের চোখের জন্য কাজ হয়। কাচ আসে। কাচ কাটা হয়। ঘষা হয়। মাপ নেওয়া হয়। ফ্রেমে বসে। তারপর সেই চশমা চলে যায় শহরের বড় বড় দোকানে। যার দাম এখানে বসে কাজ করা মানুষটির দিনের মজুরির সঙ্গে মেলে না। কোনোভাবেই মেলে না।

    রূপসী বুঝল, এখন আর জায়গাটাকে শুধু নোংরা মেসবাড়ি বলা যাবে না। এটাই ইতিহাস। ঘরগুলোয় মানুষ বসে আছে। কেউ কাচ হাতে নিয়েছে। কেউ মেশিনের সামনে ঝুঁকে। কেউ আবার তৈরি লেন্স মিলিয়ে দেখছে। প্রত্যেকের চোখ আটকে আছে নিজের কাজে।

    বৃদ্ধ বললেন, “এই কাজটা কিন্তু একদিনে শেখা যায় না মা।”

    রূপসী তাকাল। “কতদিন লাগে?”

    বৃদ্ধ একটু হাসলেন। “কী শিখবে তার ওপর।”

    তিনি হাতের আঙুলগুলো নেড়ে দেখালেন। যেন এখনও তাঁর হাতে লেন্স আছে।

    “আগে ওস্তাদের কাছে বসতে হয়। শাগরেদ হয়ে। নিজের ইচ্ছেমতো কিছু করার উপায় ছিল না। ওস্তাদ যা বলবে, যা দেখাবে, তাই করতে হবে। প্রথমে শুধু দেখে যাও। তারপর হাত লাগাও। ভুল করো। আবার করো। কাচ নষ্ট হবে। গাল খাবে। তবু শিখবে।”

    রূপসী বলল, “কোনও ট্রেনিং ছিল না?”

    “ট্রেনিং?” বৃদ্ধ আবার হাসলেন। “এইটাই তো ট্রেনিং। ওস্তাদের পাশে বসে থাকা। শুধু পাশে বসে থাকলেই তো হতো না মা,” বৃদ্ধ বললেন। “ফাই ফরমাস খাটতে হতো।”

    রূপসী একটু থামল। “কী করতে হতো?”

    “এই যেমন চা এনে দেওয়া। ওস্তাদের ঘর পরিষ্কার করা। এই ছোট ছোট ঘরগুলো ঝাঁট দেওয়া। ওদের জামাকাপড় কেচে দেওয়া। বাসন ধুয়ে দেওয়া। যা যা দরকার।”

    বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন, “শাগরেদ মানে তখন শুধু কাজ শেখার লোক নয়। ওস্তাদের কাছে থাকতে হলে ওস্তাদের অনেক কাজও করতে হবে।”

    “তারপর?”

    “তারপর করতে করতে একদিন ওস্তাদ বলল, এইটা ধর। এইটা ঘষ। এইটা কেটে দেখ।”

    সেইভাবেই শুরু। প্রথম দিনেই কেউ লেন্স কাটতে বসত না। কতদিন শুধু ওস্তাদের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। কোন কাচটা কীভাবে ধরছে। কোথায় দাগ দিচ্ছে। কতটা কাটছে। কতটা রেখে দিচ্ছে। কখন থামছে। চোখ দিয়ে দেখা আর হাত দিয়ে করা যে এক জিনিস নয়, সেটা বুঝতেও সময় লাগত।

    আমার ফাদারকে, মানে আমার বাপকে, আমার গুড ফাদার এই কাজ হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন। আর শিখিয়েছিলেন আমাকে। লেন্সের বিষয়গুলো উনি এমন করে বোঝাতেন যে আমার কখনো অসুবিধা হত না। ওঁর কাছে আমি ছোটবেলা থেকে কাজ শিখছি। শিখছি যতদিন উনি বেঁচে ছিলেন। আমার গুড ফাদারের বাড়িতেও থেকেছি আমি।

    রূপসী ভাবছে, বৃদ্ধ বলেন কি। একটা বাবা, একটা ফাদার। এই হল কলকাতার ঝামেলা। একটা ভাষায় কেউই বলতে পারেন না?

    বৃদ্ধ বলছেন। বলচ্ছেন না যেন স্মৃতির পাতা উলটে নিচ্ছেন কত আদরে। বললেন, “আসলে তখন এগুলো পড়াশোনা করে শেখা হত না। এই বিদ্যা জানত যারা, তারা তখনও কলকাতায় আসেনি।”

    তারপর যা বললেন তা হল ইতিহাস। আসল চশমাগুলো আসত বিলেত থেকে। বাক্স খুব যত্ন করে প্যাকিং করে পাঠানো হত জাহাজে। আর সেই বাক্সের গায়ে খোদাই করা থাকত বিলেতের শহরের নাম, কোম্পানির নাম। লন্ডন, অমুক, প্যারিসের অমুক। চশমার দোকানের মোহরে ইংরেজিতে লেখা থাকত-- Dolls of London। সেটা লেখা নয়, সেটা ছিল একটা আভিজাত্যের ব্যাপার। কিংবা, Optician De Louis, Paris। প্যারিসের ছাপ মারা।

    অন্ধকার খাড়া কাঠের সিঁড়িটায় ভারী কিছুর শব্দ উঠল। একটা লোক হাতে ইয়া বড় ব্যাগ নিয়ে নামছেন পা টিপে টিপে। বৃদ্ধকে দেখে একটু দাঁড়ালেন। বললেন, "কী গো দাদু, ফেরে নাই ছেলে?"

    দাদু মাথা নাড়ল। ফেরে নাই আজও।

    লোকটা বললেন, "তোমার রসিদ আর হিসেব রেখে এসেছি ঘরে। এখানে এনে দেব নাকি?"

    ঘাড় নাড়লেন বৃদ্ধ। "না। এই দিদিমণির সঙ্গে বৃষ্টির দিনে একটু সুখদুঃখের গপ্প করছি। তুমি যাও বাপ। আমি এখানেই বসব আর কিছুক্ষণ।"

    "কেন তোমার দিদিমণিকে উপরে নিয়ে যাচ্ছ না? এখানে অন্ধকারে..."

    "সেখানে দিদি আমার বমি করছিল যে। আমাদের এখানটা ওর সহ্য হয়?"

    লোকটাও হাসল। "হ্যাঁ, সেটা তো বটেই। তোমরা এখানেই বসো। আমাকে মালটা ডেলিভারি দিতেই হবে। বেলা হয়ে গেছে। সব দোকান খুলেও গেছে।"

    লোকটা চলে গেল। রূপসী বলল, "বাব্বা, এত দায়িত্ব! এই বৃষ্টিতে উনি ছাতা সামলে পারবেন?"

    বৃদ্ধ বললেন, "হ্যাঁ, আমরা পারি। ও তো এখন ওস্তাদ হয়েছে। এখানের মার্কেট খুব খারাপ যাচ্ছে দিদিভাই।"

    "কেন?"

    "এই যে তোমাদের মতো দিদি-দাদারা, বাবুরা সবাই প্লাস্টিকের গ্লাস পরছেন যে। আমাদের কদর কমছে।"

    রূপসীর কিছু বলার নেই। ও বলল, "আমার দাদু আমাকে কাচের লেন্স পরান। উনি ডাক্তার কিনা। বলেন যে, এটাই নাকি আমার জন্য ভাল।"

    "হ্যাঁ, দিদিভাই। এখন ভালোর চেয়ে সস্তার দাম বেশি। আমরা সবাই সস্তা খুঁজি। আগে এরকম ছিল না।"

    রূপসী বলল, "হ্যাঁ দাদু তুমি সেই প্যারিসের কথা বলছিলে। সেসব দেখেছ?"

    মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। "হ্যাঁ, অনেককিছু দেখেছি। সবাই আমার গুড ফাদারের কল্যাণে। তখন আমিই ফাদারের ছেলে। সাহেবের একটা ছেলে ছিল। একটাই। মারা গেল। জ্বরে। মেমসাহেব পাগলের মতো। আমাকে সারাক্ষণ কাছে কাছে রাখতেন ওরা। আমার বাপ তো বলতেন, আমি জম্ম দিছি। আর পালছেন সাহেব। সাহেবের সঙ্গে আমি জাহাজ দেখতে যেতাম। মাল খালাস করা একটা বড় ব্যাপার ছিল। তখন অবশ্য এদেশেও দু-একজন এই কাজ করবে বলে তৈরি হচ্ছিল।"

    রূপসী জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু দাদু, যারা কাজ করবে বলে তৈরি হচ্ছিল, তারা কোথাকার লোক ছিল? তারা এখানকার, নাকি ইংল্যান্ডের?"

    বৃদ্ধের কণ্ঠে এক অদ্ভুত স্মৃতিমেদুরতা খেলে গেল। রূপসী খেয়াল করল। ওর চশমার মোটা ফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে তিনি। বৃদ্ধের চোখে চশমা নেই কিন্তু। হয়ত খুলে রেখেছেন। বৃদ্ধ বললেন, "আমার গুড ফাদার বলতেন, সেই উনিশ শতকের শেষ ভাগেও এই বাংলাদেশে লেন্স কাটার কথা ভাববে, এমন কেউ ছিল না। আর তখন চশমা করার কথা এদেশীয় কেউ ভাবতেই পারত না। চশমা মানেই বিলেত বা ফ্রান্সের কোথাও থেকে আসবে। সেসব কারখানা তো বিদেশে। দুষ্প্রাপ্য। দাম ছিল ভয়ংকর! সে সব ছিল বিলাসদ্রব্য। আর অর্ডার দেওয়া যেমন এক বড় ব্যাপার ছিল, তখন বাবুয়ানি ছিল, চশমা হাতে পাওয়াও তার থেকে কিছু কম ছিল না! জাহাজ দুলতে দুলতে কবে আসবে তবে না পাবে। সেও মনে করো আট মাস, এক বছরের ধাক্কা! বছর ঘুরেও যেত অনেক সময়।"

    রূপসী অবাক হয়ে বলল, "এক বছর, এতদিন?"

    "বাঃ, তা লাগবে না?" বৃদ্ধ বললেন। "বিলেত মানে কতদূর? তুমি তোমার গুগলকে জিজ্ঞেস করে দেখো দিদিভাই।“ বৃদ্ধ হাসলেন। রূপসী ফোন দেখল, নেটওয়ার্কের একটুও উন্নতি হয়নি। অথচ, ও শহরের মধ্যে কলকাতা ৭০০০১২ তে বসে। আশ্চর্য। ও বলল।

    বৃদ্ধ বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। সেটা তোমাদের কাছে ২০২৬ সালে। সেইসময় ওটা স্বভাবিক ছিল। তাও যদি জাহাজ এসে ভিড়ত এদেশে। সেই জাহাজ সমুদ্র থেকে ঝড়ঝাপটা সামলে আসবে কিনা? তখন তো কাঠের মার্চেন্ট শিপগুলো ছিল। আমার ফাদারের কাছে গল্প শোনা। জাহাজগুলো আসত উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে বঙ্গোপসাগর হয়ে। তারপর আমাদের গঙ্গার বুকে এসে ঢুকত। গঙ্গা থেকে কলকাতা বন্দরে আসত। আমরা জাহাজের থেকে নামছে দেখতাম সাহেবদের জন্য রেশমি পোশাক, তার বাক্স, আসবাবপত্র, আয়না, সুরা, আরও সব দামি দামি জিনিস।"
    দাদু বলে চললেন, "বাক্সগুলোকে এমন যত্নে নামিয়ে আনা হতো, মনে হতো কোলের শিশু। অত যত্ন করে বাক্সগুলো নিয়ে আসত। আমি দেখেছি, আমার গুড ফাদারের বাড়িতে সেই বড় বাক্স। তার থেকে বেরিয়ে আসত আরও ছোট ছোট বাক্স। তখন জানতাম না সেগুলোকে কী বলে। কিন্তু সেগুলো দেখতে ছিল খুব সুন্দর। একটা ইয়া বড় টেবিলে সেগুলো রাখা হত পরপর। খাপগুলো, কোনওটা তৈরি হত হরিণের খাঁটি চামড়া দিয়ে। কোনওটা হাতির দাঁত দিয়ে। আর কোনওটা আবলুস কাঠ দিয়ে। এসবের কথা সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারত না। এসব ছিল রূপকথার মতো। আর খাপটা খুললে তার ভেতরে থাকত ভেলভেট। অভিজাত সেই নরম ...! রং ছিল গাঢ় নীল বা লাল। সেই ভেলভেটের এমন একটা ব্যাপার ছিল যেটা দেখলেই বোঝা যেত, এটা খুব দামি জিনিসের জন্যই আনা হয়েছে। দেখবে, আমাদের দেশে গয়নাও ওইভাবে বিক্রি করা হয়।"

    রূপসী বলল, "হ্যাঁ দাদু, আমি জানি। আমরা যখন সোনার দোকানে যাই, আমাদের গয়না ডেলিভারি দেয় ওইরকম সিল্ক আর ভেলভেটের বক্সে।"

    দাদু বললেন, "না দিদিভাই, এই কাপড় তার চেয়ে অনেক দামি ছিল। সেই ভেলভেট এখন কি আর পাওয়া যায়? আর সেই বাক্স... তার উপরে সোনার জল দিয়ে ছাপা থাকত। এমনি সেমনি নয়।

    রূপসী জিজ্ঞেস করে, "দাদু, তুমি দেখেছ সেই বাক্সগুলো?"

    বৃদ্ধ হেসে বললেন, "হ্যাঁ, কত দেখেছি আমার গুড ফাদারের বাড়িতে। আমাদের দেশে মানুষ তখন চশমা ব্যবহার করতে শুরুই করেনি সেভাবে। ওখান থেকে, বিলেত থেকে আনা যত কিছু চশমা সব পরতেন ধনী, রাজা, জমিদারেরা। যেমন এখানকার অভিজাত পরিবারগুলি ছিল তাদের বাড়িতেই যেত চশমা। তখন ইংরেজরা পড়ত আর আভিজাত্য দেখাতে কিছু এদেশের মানুষও পড়ত। গুড ফাদার বলতেন, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের চশমাও নাকি আসত জাহাজে করে। হবে নাই বা কেন? তখন তিনি এখানকার তরুণ, যুবক, ব্যবসায়ী, তাঁর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি যিনি রানীর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন তার বাংলোয়, ইংল্যান্ড। তাঁর চশমা তো সেখান থেকে আসতেই পারে দিদিভাই। চশমা ছিল তখন প্রয়োজনীয়তা নয়, চশমা ছিল একটা আভিজাত্য ব্যাপার।"

    রূপসীর প্রশ্ন থেমে গেল। রূপসী বলল, "দ্বারকানাথ ঠাকুরকে তুমি দেখেছ?"

    "ও দিদিভাই, তুমি এই দাদুর বয়স কত ভাবছ? দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময়টা তুমি ভাবো। আমি বলছি তার গল্প আমি শুনেছি। শুধু কি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর? শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেব, মেদিনীপুর আর বর্ধমানের বড় বড় জমিদারেরা বিলেতে চিঠি পাঠিয়ে অর্ডারে চশমা আনাতেন। তারা কি আনাতেন? তারা তখন লিখে পাঠাতেন, তাদের কর্মচারীরা চিঠি পাঠিয়ে আনিয়ে নিden। বিলেত থেকে সেই চশমা জাহাজে চেপে অনেক মাস পর এসে পৌঁছাত। আর জাহাজে চেপে আসা সেই চশমার কাচ মোছা, সামুদ্রিক নোনা হাওয়ায় ঝাপসা হয়ে আসা লেন্স পরিষ্কার করা, কিংবা সোনার পিনের চিমটে সামান্য ঢিলে হলে তা ঠিকঠাক করার কাজটাই প্রথম শিখতে শুরু করেছিল সাহেবদের সাহায্যকারীরা। আর সেই সাহেবদের পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে কাজ শিখত আমার পরলোকগত বাপের মতো আরও অনেক দেশি-বিদেশি শাগরেদে।"

    রূপসী একটু নড়েচড়ে বসল। ঘরের ভেজা বাতাসে সেই কড়া গন্ধটা হঠাৎ যেন একটু তাজা হয়ে উঠল।

    বৃদ্ধ রূপসীর অস্বস্তিটা বুঝতে পারলেন। জীর্ণ হাতা দিয়ে মুখ মুছে মৃদু হেসে বললেন, "অসুবিধা হচ্ছে তো মা? এখন ভেতরে কাজ শুরু হয়েছে, তাই গন্ধটা ভেসে আসছে।"

    "কিসের গন্ধ দাদু এটা? একটু ঝাঁঝালো..." রূপসী আঁচল দিয়ে নাক আড়াল করল।

    "এটা হলো 'জুয়েলার্স রুগ'-এর গন্ধ মা," বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে ভেতরের অন্ধকারের দিকে নির্দেশ করলেন। "কাচ যখন কাটা হয়, তখন খসখসে থাকে। লেন্সের মুখ মসৃণ করার জন্য 'ফেরিক অক্সাইড'-এর লাল কাদা জলে গুলে চাকায় ঘষা হয়। তার সঙ্গে মেটাল ফ্রেমে হিট দেওয়ার কেমিক্যালের ধোঁয়া মেশে। এই গন্ধই আমাদের পেট চালায় মা, আবার এই গন্ধই ভেতরে গিয়ে ফুসফুসের আয়ু কমায়।"

    রূপসী চশমাটা খুলে হাত দিয়ে দেখল। কাচটা কত মসৃণ, কত স্বচ্ছ! কিন্তু এই স্বচ্ছতার পেছনে যে 'রুগ কাদার' ঝাঁঝালো গন্ধে ধোঁয়াটে হয়ে যাওয়া জীবনগুলো লুকিয়ে আছে, তা সে আজ অনুধাবন করল।

    সে চশমা পরে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা দাদু, তুমি যে পুরনো শহরের চশমার কথা বলছিলে... তখন তো আর এসব মেসবাড়ি ছিল না? তখন চশমা কেনা বা বানানোর ব্যাপারটা কেমন ছিল?"
    মেসবাড়ির আবছা আলোয় বৃদ্ধের চোখে পুরনো দিন ভেসে উঠল। বাইরে বৃষ্টির টিনের চালে একটানা ঝমঝম শব্দ।

    "না মা, আঠারো শ বিশ-ত্রিশের দশকে এসব মেসবাড়ির অস্তিত্বই ছিল না। তখন ডালহৌসি বা বড়বাজার জুড়ে শীলদের, মল্লিকদের কিংবা বাবুদের বড় বড় বাগানবাড়ি আর দেওয়ানখানা। সাধারণ মানুষের জন্য চশমার বাজার তৈরি হয়নি তখন।"

    প্যাসেজ দিয়ে একটা কেরোসিনের কুপি হাতে একজন কারিগর পার হয়ে গেল। সেই ক্ষণিক আলোয় বৃদ্ধের মুখের বলিরেখাগুলো স্পষ্ট দেখাল।

    "আঠারোশ সত্তরের দশকে যখন ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট আর গভর্মেন্ট প্লেসের কোণে 'লরেন্স অ্যান্ড মেয়ো'-র শোরুম খোলে, সে যেন দেখার মতো কাণ্ড! মেহগনি কাঠের দরজা, বেলজিয়ামের কাচ, ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। শো-কেসে চামড়ায় মোড়া চশমার খাপ, সোনার 'পিন্স-নে', আর পিতলের দূরবীণ। বাইরে মখমলের পাগড়ি পরা পাহারা।"

    "বাবু আর ধনী লোকেরা কি সেখানে গিয়ে চশমা কিনতেন?"

    "ধুর মা! শহরের রাজাবাবু বা জমিদাররা কি আর নিজে হেঁটে দোকানে চশমা কিনতে যাবেন? তাঁদের মর্যাদা তাতে ক্ষুণ্ণ হতো না?" বৃদ্ধ হাসলেন। "তাাঁদের জন্য চশমা কেনা হতো অন্য কায়দায়। বাবুদের দেওয়ানরা ক্যাটালগ দেখে পছন্দ করে আসত, কিংবা বিলেত থেকে জাহাজে আসা ক্যাটালগ পেলেই মেসার্স লরেন্স অ্যান্ড মেয়োর সাহেব বা প্রতিনিধিরা নিজে এসে রাজবাড়ির বৈঠকে নমুনা দেখিয়ে যেতেন। তবে সাধারণ মধ্যবিত্ত বা সাহেবদের আপিসের কম মাইনের কেরানিরা দূরের কথা, দেশি বাবুদেরও বুক কাঁপত সেই কাচের প্রাসাদে ঢোকার।"
    রূপসী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল।

    "তাহলে চশমা মেরামত বা ফ্রেম কাটিংয়ের কাজগুলো কোথায় হতো?" রূপসী প্রশ্ন করল।

    "ওই শোরুমের সামনের চকচকে দরজা দিয়ে ঢোকার অধিকার ছিল শুধু সাহেব আর বড় মানুষদের," বৃদ্ধ বলতে লাগলেন, "কিন্তু দোকানের ঠিক পেছনের সেঁতসেঁতে বেসমেন্টে, কিংবা বড়বাজারের রাজবাড়িগুলোর আস্তাবলের পাশের একচিলতে আঁধার কুঠুরিতে বসে থাকত আমাদের মতো মানুষের পূর্বসূরিরা। সাহেবরা বিলেত থেকে লেন্স আনাত ঠিকই, কিন্তু সেই নোনা হাওয়ায় ঝাপসা লেন্স পরিষ্কার করা, স্ক্রু টাইট করা কিংবা কাচ ঘষে পাওয়ার মেলানোর কাজটা সাহেবরা নিজে হাতে করত না।"

    তিনি রূপসীর দিকে চাইলেন, "সেই কাজটা জানত গোয়ানিস কারিগরেরা। মানুষে জানে না মা, কিন্তু এই লেন্স ঘষার বিদ্যাটা বিলেতি সাহেবদের চেয়েও আগে আয়ত্ত করেছিল ওই পর্তুগিজ রক্তের গোয়ানিসরা। গোয়ায় ওদের চার্চের ক্রুসিফিক্স তৈরি আর গির্জার কাচ কাটার পুরনো ঐতিহ্য ছিল। সেই বিদ্যা নিয়েই গোয়া থেকে জাহাজে চেপে ওরা কলকাতায় এসে সাহেবদের ওয়ার্কশপে কাজে ঢোকে। লেন্স কাটার হীরে-বসানো কলমকে উনি বলতেন Caneta de diamante, কাচের লেন্সকে বলতেন Óculos de vidro। কাচ কাটার সময় হাতের নিয়ন্ত্রণ শেখাতে গিয়ে আমাকে পিঠে হাত চাপড়ে বলতেন, ‘Menino... glass is like a woman. Treat it with respect, no extra pressure! Deu Boren Korum...’ অর্থাৎ ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। ওনারাই রাজবাড়ির আঁধার কুঠুরি থেকে এই শিল্পকে এনে কলকাতার বুকে বসিয়েছিলেন।"

    "দাদু, তুমি ১৮ ৩০-৪০ সালের কলকাতা দেখেছ?" রূপসী অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।

    বৃদ্ধ হেসে ফেললেন। বললেন, "ওরে দিদিমণি, তুমি আমাকে কত বছরের বুড়ো ঠাউরেছ? আমার এখন ৯৪ কি ৯৫, তাহলে বোঝো আমি কী দেখেছি?"

    রূপসী চুপ করে রইল।

    বৃদ্ধ বললেন, "কিন্তু আমি ওই সময়টার কথা জানি। সময়টার কথা জানতে গেলে কী লাগে? তোমাদের যেমন গুগল লাগে, আমাদের তো আর গুগল লাগে না! আচ্ছা, তুমি জানো তোমার গুগল কত সালে জন্মেছিল?"

    রূপসী হেসে বলল, "না দাদু, গুগল দেখে বলতে হবে। কিন্তু এখানে তো নেটওয়ার্ক..."

    রূপসী চারপাশটা দেখে নিল। নেটওয়ার্ক আসবে কী করে? এখনো ঘন কালো আকাশ, চারপাশটায় যেন একটা ভূতুড়ে অন্ধকার। মেসবাড়ির কোণের একটা পুরনো শ্যাওলা-ধরা পিলার দিয়ে এমনভাবে জল গড়িয়ে নামছে, মনে হচ্ছে যেন পিলারটা এক্ষুনি ভেঙে পড়তে পারে। অন্য সময় হলে ও হয়তো এই শ্যাওলা মাখা পিলারের একটা ভিডিও করত। কিন্তু এখন এই দাদু ওর কাছে খুব দামি একজন মানুষ। ওঁর গুরুত্ব কোনো নামজাদা হিস্টোরিয়ানের চেয়ে কম নয়—একজন জীবন্ত দলিল, যাঁর কাছে লুকিয়ে আছে কলকাতার এই বিস্মৃত চশমার ইতিহাস। অন্তত কলকাতার চশমার এই দিকটা তো রূপসীর জানাই ছিল না; ও তো কেবল পুরনো বাড়িঘর নিয়েই কাজ করে।

    তাই ও দাদুকে বলল, "দাদু, তোমার বয়স যদি এখন ৯৪-৯৫ হয়, তাহলে তোমার জন্ম ১৯৩২-৩৩ নাগাদই হবে, তাই তো?"

    দাদু বললেন, "হ্যাঁ মা, কিন্তু আমি যে আসল সময়টার কথা বলছিলাম, সেই আঠারো শ তিরিশ-চল্লিশের কলকাতা তো আমি দেখিনি। তা দেখেছিল আমার গডফাদার আর আমার ফাদার।"
    "আমার গুড ফাদারের বাড়ি ছিল রিপন স্ট্রিটে," বৃদ্ধ একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন। আবছা আলোয় ওঁর চোখ দুটো যেন অনেক দূরে চলে গেল।

    "১৮৩০-৪০ এর দশক থেকে ওই পাড়ায় গোয়ানিজ পরিবারগুলো এসে বসতি করেছিল। কী সুন্দর ছিল তখনকার রিপন স্ট্রিট! লাল ইটের চওড়া দেয়াল। সামনে সবুজ বাগান। কাচের বড় বড় টানা জানালা। একেবারে রাজপ্রাসাদের মতো বাংলো। ফ্রান্সিস ডি’সুজা সাহেব গোয়া থেকে পুরো পরিবার নিয়ে এসে সেই দোতলা বাড়িতে বাস করতেন। একতলায় ছিল ওঁর ফ্রেম গড়া আর লেন্স পালিশের নিজস্ব কারখানা।"

    বৃদ্ধ রূপসীর দিকে চাইলেন। ওঁর আবছা চোখ দুটোর কোণে ফুটে উঠল স্মৃতির আলো-ছায়া।

    "আমার বাপ প্রথম এই সাহেবের সাগরেদ হয়ে কাজ করতে ঢুকেছিল। আমি এসেছিলাম বাপের সাথে। তখনো আমার মুখে ভালো করে বুলি ফোটেনি। হাঁটু সমান এক ফোঁটা বাচ্চা। ফ্রান্সিস সাহেবের নিজের ছেলেটি ছোটবেলায় জ্বরে মারা গিয়েছিল। উনি আমাকে দেখে বুকে টেনে নিলেন। কিন্তু চার্চের নিয়ম ছিল কড়া। পর্তুগিজ পাড়ায় অ-খ্রিস্টান এদেশীয় কাউকে রাতে রাখার নিয়ম ছিল না। গুড ফাদার আমাকে সেন্ট টেরিজা চার্চে নিয়ে গেলেন। আমার মাথায় জল ছিটিয়ে দিলে ফাদার। আমাকে ওঁর মানসপুত্র করে নেওয়া হলো।"

    বৃদ্ধ চোখ বুজলেন। "রবিবার সকালে গুড ফাদারের হাত ধরে চার্চে যেতাম। গায়ে বিলেতি কোট। পায়ে চামড়ার জুতো। চার্চের মস্ত পিয়ানোর সুরে প্রার্থনা হতো। ফাদার লাল ওয়াইন আর রুটি মুখে তুলে দিতেন। আমার জন্মদাতা বাবা কাজ শেষে মেসবাড়িতে ফিরে যেত। কিন্তু আমি থেকে যেতাম সাহেবের দোতলায়। বাবা হেসে বলত, 'জন্মটা আমি দিয়েছি রে। কিন্তু ছেলেটা আমার সাহেব হয়ে গেল!'" রূপসী নিঃশব্দে শুনছিল।

    "সেই বাড়িতে গিয়ে বহু মানুষকে দেখেছি। গোয়া থেকে আসা মেকানিক, চশমার ব্যবসায়ী, চার্চের পাদ্রি। দোতলায় গুড ফাদারের সাথে থাকত ওঁর বোন মেরি ডি’সুজা। মেরি পিসির স্বামীও ছিলেন চশমার ওস্তাদ কারিগর। উনি ওয়ার্কশপ থেকে ডেকে বলতেন, ‘Hey Menino! Come here, look at this frame!’ আর মেরি পিসি কাজ শেষে আমাকে পিয়ানোর সামনে বসিয়ে কঙ্কণী গান শেখাতেন—‘Deu Boren Korum, child! Speak clearly, like a gentleman!’ উফ, কী সুন্দর দিন ছিল!"

    রূপসী বলল, "এতকিছু তুমি দেখেছ?"

    দাদু হেসে বললেন, " ও দিদিমণি! তুমি নাকি ভূতের সঙ্গে তুমি গপ্পো করছ। বৃদ্ধ হাসছেন নিজের কথাতেই। রূপসীও বোকার মতো বলে ফেলেছে। ও মজা পেল। বৃদ্ধ হলেও মানুষটা রসিক।
    বৃদ্ধ বললেন, আমার জন্ম কমপক্ষে এর একশো বছর পর। ১৯৩০-৩২ হবে। আর আমি যে সময়ের কথা বলছিলাম তখন আঠারোশ তিরিশ-চল্লিশ হবে। যেমন আমি শুনেছিলাম আমার গুড ফাদারের কাছে, সেই কলকাতার কথা বলছিলাম, তা তো আমি দেখিনি। আমার গুড ফাদার শুনেছিলেন তাঁর বাপ-দাদার কাছে, যারা আরও পুরোনো সাহেব।

    ফাদার বলতেন, সেই কলকাতায় শুধু কেবল এই ইউরোপীয় আর গোয়ানিস কারিগরেরাই ছিল। এদেশিয় কর্মীদের কোনও আমদানিই হয়নি তখন! আমরা, মানে আমার বাপ-কাকারা যখন কাজ শিখতে আর পেটের টানে কলকাতা এসেছিলেন, সে আরও পরে। ধরো সেটা ১৯৩৫-৩৬ সাল নাগাদ। তখন গুড ফাদারের সঙ্গে আমাদের আলাপ হল।

    আমি তখন মোটে পাঁচ-ছয় বছরের ছোকরা! তখন তো আর ওই পুরোনো আঠারোশ ত্রিশের কলকাতা ছিল না। কিন্তু সেই ছোটবেলার কলকাতাটা ছিল দারুণ! আমি আমার গুডফাদার, মানে ফ্রান্সিস ডি’সুজা সাহেবের সঙ্গে আসতাম এই পাড়ায়।

    আহা, কী চমৎকার সুঠাম চেহারা ওঁর! লম্বা-চওড়া, খাড়া শরীর, দেখে কেউ বলতেই পারবে না যে উনি বিলেতি সাহেব নন। উনি এদেশি সাহেব। গোয়ানিস সাহেব! তখন ওঁর বয়স ষাট-সত্তর, বেশ প্রবীণ মানুষ। কিন্তু রূপে উনি ছিলেন একবারে রাজপুত্তুরের মতো। কোনও রাজার চেয়ে কম ছিল না তাঁর চেহারা! আর ওঁর যে মেমসাহেব ছিলেন, তিনিও ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। দেকেহ মনেহবে পরী। মানবী নন। তাঁদের যে একটাই ছেলে ছিল। আর সে যে খুব ছোটবেলায় জ্বরে মারা গিয়েছিল, সেকথা তো তোমাকে আগেই বলেছি মা...।"

    "আমি যে সময়ের কলকাতার কথা বলছি, সেই সময় আমার 'গুড ফাদার' এখানে থাকতেন। আমাদের এই কলকাতার রিপন স্ট্রিট বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে গোয়ানিজ পরিবারগুলো এসে বাস করতে শুরু করেছিল। কবে ঠিক জানা নেই; কিন্তু বলে ১৮৩০, ৪০, ৫০ এরকম সাল হবে।

    আমি যখন আমার ফাদারের পাড়া দেখি, তখন সেখানে তাঁর বিশাল প্রতিপত্তি! ১০০ বছর ধরে তাঁরা এই কলকাতায় বাস করছেন। তাঁদের কত পুরুষের বাড়ি—কী সুন্দর লাল ইটের চওড়া দেওয়াল, সবুজ বাগান, কাঁচের বড় বড় টানা জানলা! ঠিক কী রং ছিল মনে নেই, কিন্তু দূর থেকে দেখে রাজপ্রাসাদের মতো মনে হতো।

    আমার ফাদার থাকতেন দোতলার ডানদিকের ঘরে। ওঁর ঘর থেকে জানলা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ঘন সবুজ দেখা যেত। আর একতলায় ছিল লেন্স পালিশের কারখানা এবং আরও কিছু কিছু কাজের জায়গা।"

    "আমি সেখানে যেতাম। সেখানে থাকতামও, বেশ মনে আছে।

    'জানো মা,' বৃদ্ধ রূপসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তখনকার সমাজের নিয়মটাই আলাদা ছিল। আমরা ফ্রান্সিস ডি’সুজা সাহেবের পরিবারের মায়ায় বাঁধা ছিলাম। তবু জাত আর পাড়ার সীমানা তখনকার কলকাতাও কড়াভাবে মানত!

    গোয়া থেকে অনেক ছোট ছোট গোয়ানিজ ছেলে কাজ শিখতে আসত। তারা লেন্সের কাদা ছাঁকা বা ফ্রেম বাঁকানোর কাজ করত। তারা থাকত সাহেবদের রিপন স্ট্রিটের বাংলোর একতলার কোয়ার্টারে। অথবা পাশের ‘গোয়ান ক্লাবের’ বোর্ডিংয়ে থাকত।

    কিন্তু আমার বাবার মতো যারা এদেশীয় সাগরেদ ছিল, তাদের জন্য সাহেবপাড়ার দরজা শুধু সন্ধ্যা পর্যন্তই খোলা থাকত!'

    শোনা যেত, কলকাতার তখন দুটো ভাগ ছিল।"

    "না," বৃদ্ধ বললেন। "সাদা আর কালো।"

    "সাহেবদের সাদা আর আমাদের কালো।"

    "সেটা কিরকম করে হলো?"

    পুরোনো কলকাতার নগর পরিকল্পনায় ব্রিটিশ সরকার খুব কঠোরভাবে এলাকা ভাগ করে রেখেছিল—‘হোয়াইট টাউন’ ও ‘ব্ল্যাক টাউন’। ‘হোয়াইট টাউন’-এর মধ্যে ছিল ডালহৌসি, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এবং রিপন স্ট্রিটের একাংশ। এখানে ইউরোপীয়, পর্তুগিজ-গোয়ান এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা বাস করতেন। অন্যদিকে ‘ব্ল্যাক টাউন’-এর মধ্যে ছিল বউবাজার, কলুটোলা, চিত্পুর, শিমলে ও শোভাবাজার। এখানে দেশীয় অধিবাসীরা থাকতেন। সেই সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী, 'ব্ল্যাক টাউন'-এর কোনো এদেশীয় শ্রমিক বা কারিগর 'হোয়াইট টাউন'-এর আবাসিক অঞ্চলে বা সাহেবদের বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পেতেন না। তাঁরা সকালে কাজের জন্য যেতেন। আর সূর্যাস্তের আগে বা কাজ শেষে নিজ পাড়ায় ফিরতে বাধ্য হতেন। রূপসী নীরব হয়ে শুনছিল।

    বৃদ্ধ যেন ফিরে গিয়েছিলেন সেই পুরনো কলকাতায়। যেখানে কাজ শেষ হলেই তাঁর বাবাকে ক্যানভাসের থলে গুটিয়ে ফিরে যেতে হতো 'কালো শহরে'—তাঁর নিজের আস্তানায়, যেখানে এদেশীয়দের ঠাঁই হতো। তবে বাবার একটাই শান্তি ছিল—ছেলের অন্তত একটা গতি হয়ে গেছে। তাঁর বাবা থাকতেন বউবাজারে। একসময় তাঁকে ধর্ম পাল্টে নেওয়ার জন্য বেশ চাপ দেওয়া হতো। বৃদ্ধের সেই ছেলেবেলাটা ছিল সত্যিই বড় অদ্ভুত! তিনি একটু থামলেন। তারপর বললেন, "ছেলেমানুষে কি তখন অত বোঝে? আমি আর আমার বাবা—আমরা যেন ছিলাম এই দুই কলকাতার মাঝামাঝি ঝুলন্ত দুজন মানুষ!" না, তাঁর এদেশীয় সাহেব বাবা (যাঁকে তিনি ‘গুড ফাদার’ বলে ডাকতেন) সেরকম ছিলেন না। ধর্ম বা জাতের কড়াকড়ি তিনি মোটেই মানতেন না। কখনো কখনো তিনি তো বাবার সঙ্গে বউবাজারেও আসতেন। বৃদ্ধ বাবাকে দেখতে পেতেন শুধু দিনের আলোয়। তারপরই সাহেবের সঙ্গে রেডি হয়ে বেরোতেন সাহেবি পোশাকে। বিলেতি চশমার সোনা আর কাঁচ দিয়ে কারিগরি করার জন্যই তাঁর বাবার ডাক পড়ত। গুড ফাদার সবসময় বাবাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। কিন্তু দোকানে কোনো দেশি লোকের ঢোকার উপায় ছিল না। তখন তো পায়ে জুতো ছিল না! আর জুতো না থাকলে দোকানের ভেতরে ঢুকতেই দিত না। তাছাড়া, ভারতবাসীদের তখন বেশ নিচু চোখে দেখা হতো। বৃদ্ধ যেন সেদিনের কষ্টগুলো আজকেও স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছেন। রূপসীর চোখে তখন জল এসে গেছে। সত্যি, মানুষ মানুষকে কত ছোট করে দেখে! আজকেও সমাজে মানুষকে ছোট করা কিংবা গায়ের চামড়ার রং নিয়ে যে বিভেদ—তা তো আজকের নয়! কত শতাব্দীর এক কঠিন ইতিহাস আমরা এখনও বয়ে চলেছি!

    ঠিক সেই সময়ে সিঁড়ি দিয়ে ভারী একজোড়া বুটের খটখট শব্দ কানে এল।

    রূপসী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। হাতে বড় একটা টর্চ আর চামড়ার ঢাউস ব্যাগ নিয়ে একজন লোক হুড়মুড় করে নিচে নেমে এল।

    তার পেছনে পেছনে এল আরেকজন ছোকরা। সে ছাতা সামলাতে সামলাতে আট-দশটা ক্যানভাসে বোনা ভারী ব্যাগ নিয়ে ঢুকল। তারপর মেঝের একপাশে থরে থরে সাজিয়ে বসিয়ে দিল।
    বাইরের বৃষ্টি আর কাচের ঝনঝন শব্দের সঙ্গে সঙ্গে একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে।

    বৃদ্ধ দেখলেন। তারপর হালকা হেসে বললেন, "দেখলে তো মা, মাল সব ঢুকে গেল! ওই কাচের কদর আজও আছে, শুধু রূপ বদলে গেছে।"

    রূপসী কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ আবার স্মৃতির সুতো টানলেন। ওঁর গলায় ফিরে এল সেই পুরনো শহরের দেমাগ আর রসিকতার ঢং।

    "তবে জানো তো দিদিভাই, এই সাদা-কালোর ভেদাভেদটা শুধুই গায়ের রঙের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না! এর পেছনে ছিল সাবেকি হিসেবনিকেশ আর ব্রিটিশদের মেকি দেমাগ।

    কোম্পানির সাহেবেরা চওড়া চওড়া বাগানঘেরা অট্টালিকা বানিয়ে নিজেদের খুব সেরা ভাবত। কিন্তু আসল মজা কী ছিল জানো? হোয়াইট টাউনের ওই চকচকে সাহেবদের অট্টালিকা তৈরি করার টাকা আসত ব্ল্যাক টাউনের ধনী বাঙালি 'বাবু'দের কাছ থেকেই!

    সুদে ঋণ নেওয়া বা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আসল মালিক তো দেশি বাবুরাই। সাহেবেরা আভিজাত্য দেখাত ঠিকই, কিন্তু মাসের শেষে বাড়িভাড়া শোধ করতে সেই ব্ল্যাক টাউনের বাবুদের দরজাতেই হাত কচলানো ছাড়া তাদের উপায় ছিল না!"

    রূপসী মুচকি হেসে বলল, "বলো কী দাদু!"

    "হ্যাঁ গো মা! এই দেশি বাবুদের মধ্যে কারা কারা ছিলেন জানো? তখন ছিলেন দেওয়ান রামদুলাল দে সরকার, যাকে বলা হতো কলকাতার প্রথম বাঙালি কোটিপতি। তিনি ছিলেন বড় শিপিং টাইকুন। মার্কিন আর ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছে ঋণ নিতেন। তাঁর আর্থিক প্রভাব এতটাই ছিল যে আমেরিকার ব্যবসায়ীরা তাঁদের জাহাজের নামও রেখেছিলেন এই দেওয়ানের নামে—'রামদত্ত'।

    তুমি পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের কথা নিশ্চয়ই শুনেছ? প্রসন্নকুমার ঠাকুর! ব্যাংক অফ বেঙ্গল আর ব্রিটিশ বাণিজ্যে এই পরিবারের বিশাল পুঁজি খাটত। ইংরেজ সাহেবরাও জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের থেকে বড় অঙ্কের টাকা সুদে ঋণ নিতেন।"

    রূপসী শুনে বলল, "হ্যাঁ দাদু, এটা আমি জানি। আমি যেহেতু ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করি, তাই এ বিষয়ে পড়েছি আর বইও পেয়েছি। কিন্তু দাদু, তুমি তো অনেক কিছু জানো!"

    তখন দাদু বললেন, "হ্যাঁ মা, আমি আমার গুড ফাদারের কাছে গল্প শুনেছি আশুতোষ দে বা আশু দে-র কথা, যাঁদের ছাতুবাবু-লাটুবাবু বলা হতো।

    আমি আমার গুড ফাদারের কাছে গল্প শুনেছি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের। ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ের অংশীদার ছিলেন তিনি। সেই সময় ভারতীয়দের মধ্যে তিনি এমন একটা জায়গা তৈরি করেছিলেন যে ব্রিটিশদের খুব কাছের লোক হয়ে উঠেছিলেন।

    তিনি 'কার, ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানি' নামে একটি কোম্পানিও গঠন করেছিলেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে তিনি নীলকুঠি, কয়লাখনি আর জাহাজ ব্যবসা চালাতেন। বহু ব্রিটিশ ফার্ম তাঁর টাকাতেই চলত। কাজেই বোঝো, এদের শুধু ব্যবসাতেই নয়, জীবনযাত্রাতেও দেশি বাবুদের টাকা লাগত।“

    রূপসী বলল, “তাও ব্রিটিশরা দেমাগ দেখাত? "

    “হ্যাঁ। আমার গুড ফাদারের কাছে শুনেছি এসব মজার গল্প।” গোয়া থেকে আসা মেকানিকেরা কিন্তু বেশ কেতাদুরস্ত! ধোপদুরস্ত পর্তুগিজ পোশাক পরে ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট বা পার্ক স্ট্রিটের শোরুমে বসত। মাস গেলে পনেরো-কুড়ি টাকা মাইনে—চলতও রাজকীয়ভাবে! কিন্তু গোল বাঁধাত বিলেত থেকে আসা সস্তা ইউরোপীয় কর্মচারীরা। তাদের দশা ছিল বড় করুণ! এদেশের কড়া গরম আর পেটের অসুখে ভুগে পকেটের সব টাকাকড়ি শেষ। শেষমেশ ঠাঁই হতো ব্ল্যাক টাউনের সস্তা মেসে। রাতে বাংলা মদ গিলে মাতলামি করা আর দিনে শোরুমে এসে বড় বড় বুলি ঝাড়া—এই ছিল কাজ! গুড ফাদার ডি’সুজা এদের চোখের বিষ দেখতেন। মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করতেন, 'Street vagabonds! কাজের কাজ কিচ্ছু চেনে না! বিলাতি ঢঙে খালি স্পেক-ট্যাকল্‌স্ বলে হাঁকডাক দেওয়া হচ্ছে!'"

    বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, "গোয়ানিজরা চশমাকে কী বলত জানো?"

    "না," রূপসী বলল।

    "তারা কঙ্কণী আর পর্তুগিজ মিশিয়ে বলত 'ওকুলোস'।

    আর তখন চশমার জন্য ভারী কাঁচ আসত বোম্বে প্রেসিডেন্সির ডেকান এলাকা আর সুরাট থেকে। ডেকানের কাঁচ ছিল খুব শক্ত আর খাঁটি। কিন্তু তাকে ঘষে চশমার লেন্স বানানো ছিল সাধ্যির বাইরে! গুড ফাদার একদিন পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ডেকান থেকে আসা কাঁচের এক টুকরো বাবার হাতে তুলে দিলেন। বাবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কাদার গামলায় হাত ডুবিয়ে এমন পালিশ করলেন যে কাঁচের গায়ে সামান্যতম দাগ বা ছোপ রইল না! ওস্তাদ কাঁচটা আলোর দিকে ধরে চমকে উঠলেন! তারপর বললেন, 'ডেকান থেকে আসা কাঁচের চেয়েও তোর হাতের কাজ ভালো রে!' ব্যস, সেই থেকে বাবা হয়ে উঠলেন ওঁর ডান হাত!"

    বাবার কাজের গল্পে একদম বুঁদ হয়ে গেছেন বৃদ্ধ। রূপসীও মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টিতে আটকা না পড়লে হয়তো এই ইতিহাসের খনিটার খোঁজই পেত না ও!
    বৃদ্ধ সেই দুষ্টুমির কথা বলছেন। তাঁর বাবা যত নিখুঁত লেন্সই বানান না কেন, ‘দেশি মিস্ত্রি বানিয়েছে’ শুনলেই তো সাহেবদের পিত্তি জ্বলে যেত! অর্ডার বাতিল করে খেঁকিয়ে উঠে বলত, ‘অসভ্য কালোর হাত পড়েছে এতে! ফেলে দাও!’ তাই গুড ফাদার এক দারুণ চতুরতা করতেন। বৃদ্ধের বাবা পেছনের অন্ধকার ঘরে বসে কাচ ঘষতেন। আর গুড ফাদার নিজের সই আর শোরুমের ধোপদুরস্ত পর্তুগিজ সিলমোহর লাগিয়ে চশমা শোরুমে রাখতেন। কলকাতার গুমোরি সাহেবেরা ভাবত—আহা! খোদ পর্তুগিজ ওস্তাদ ডি’সুজার নিজের হাতের বিলাতি কারিগরি! নকলটাও এতটাই আসলের মতো যে...। সাহেবরা ভাবতেন এসব বিলেতের কাজ। ধরতে পারতেন না কেউ। আর আড়ালে বসে বাবা আর গুড ফাদার মুচকি হাসতেন। একদিন হলো কী, ফোর্ট উইলিয়ামের —স্যার ফ্রাঙ্ক এভারার্ড—গজগজ করতে করতে শোরুমে ঢুকলেন! ওঁর লালমুখ আর তোড়জোড় দেখে দোকানের কর্মচারীদের বুক কাঁপছে। উনি নথিপত্র পড়ার জন্য এমন একজোড়া বিশেষ চশমা চান, যার কাচ হবে হীরার মতো শক্ত আর আয়নার মতো পরিষ্কার। বিলেতের রাজা বা রানি ছাড়া এমন কাচ নাকি কেউ চোখে দেখেনি!

    সাহেব টেবিলে থাবা মেরে হাঁকালেন, ‘এমন কাচ যদি বানিয়ে দিতে পারো, তবে তিনশো খাঁটি রুপোর টাকা মেপে দেব!’

    গুড ফাদার আড়ালে গিয়ে বাবাকে শুধু বললেন, 'দে তো একটা হাতসাফাই দেখিয়ে!'

    বাবা পেছনের ঘরে বসে বোম্বে প্রেসিডেন্সির সেই কঠিন ডেকানের কাচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদার গামলায় হাত ডুবিয়ে এমন পালিশ করলেন যে কাচের ভেতর দিয়ে বাইরের আলো ঠিকরে বেরোতে লাগল!

    তিনমাস পর অ্যাডভোকেট জেনারেল সাহেব এলেন। ডেলিভারির চশমাটা চোখে দিয়ে রাজকীয় দলিলের সূক্ষ্ম লেখাগুলো পড়লেন। তিনি তো আনন্দে আত্মহারা। সঙ্গে সঙ্গে থলি খুলে পুরো তিনশোটা খাঁটি রুপোর টাকা টেবিলে ঝনঝন করে ঢেলে দিয়ে চলে গেলেন।

    সাহেব শোরুমের দরজা পার হতেই গুড ফাদার দুইশো টাকার থলিটা সটান বাবার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বাবার তো হাত-পা কাঁপছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে!
    সেই সময়ে একজন সাধারণ দেশি মিস্ত্রি বা কারিগরের সারামাসের আয় হত খুব বেশি হলে মাত্র চার থেকে পাঁচ টাকা! কোনও কোনও কাজে বড়জোর ছ-সাত টাকা। সেখানে এক ধাক্কায় দুইশো রুপোর টাকা পাওয়া? মানে তো পুরো চার-পাঁচ বছরের রোজগার একলহমায় হাতে পাওয়া! এ তো রাজপ্রাসাদ কিনে ফেলার মতো ব্যাপার!

    বাবা হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, 'সাহেব, এত টাকা আমি কী করব? বিলেতি সাহেব জানতে পারলে তো আমায় জেলেই পুরে দেবে!'

    গুড ফাদার হা-হা করে হেসে উঠে বাবার কাঁধ চাপড়ে বললেন, 'আরে দূর বোকা! স্যার এভারার্ড ভেবে গেল খোদ বিলেতের ওস্তাদ মিস্ত্রি চশমা বানিয়েছে! তোর এই কালা হাতের জাদুতে বড় সাহেব বোকা বনে তিনশো টাকা ফেলে গেল। আর তুই কাঁদছিস? রাখ এগুলো, তোর যোগ্য হকের পাওনা!'

    সেদিন রাতে কাজের ব্যাগ গুটিয়ে বাবাকে নিয়ে সোজা চলে এলেন বউবাজারের দেশি গলিতে। সাহেবকে ঘোল খাইয়ে সেদিন দুই কলকাতার সীমানা ভেঙে দুজনে মিলে জমিয়ে ভুরিভোজ করেছিলেন! একজন দেশি, আরেকজন বিদেশি খানা খেয়েছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু কে কি যে খেয়েছিলেন, সেটা আমার স্মরণে নেই আর বৃদ্ধের। রূপসী বেশ মজা পেয়েছে এই গল্প শুনে। আসলে কি হয়েছিল কেইবা জানে। কিন্তু এরকম গল্প শুনতে মন্দ লাগে না ভারতীয়দের।

    কিন্তু রসে ভঙ্গ দিল বৃষ্টি!

    রেলিঙের ধার ঘেঁষে থাকা কয়েকটা পুরোনো আলগা ইট আচমকা খসে পড়ল নিচে। হঠাৎ শব্দে আঁতকে উঠে রূপসী একটু দূরে সরে বসল।

    চোখ তুলে ও ওপরে তাকাল। মাথার ওপরে ভারী কড়ি-বরগা আর লোহার মজবুত ফ্রেমগুলো যেন এই শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    বৃদ্ধ ওকে আশ্বস্ত করে শান্ত গলায় বললেন, "ও কিছু হবে না মা, এমনটা হয়েই থাকে! বড্ড পুরোনো বাড়ি তো... তবে এদিকটা বেশ মজবুত আছে, তাই ভয় নেই। এসো, তোমাকে আরেকটা গল্প শোনাই।"


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ফরিদা | ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:১৫743293
  • ভাল লাগল লেখাটা...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন।