

অলংকরণ: রমিত
বৃদ্ধ এখন স্মৃতির সাগরে পুরো ডুবে আছেন। বাইরের এই কলকাতার বর্ষা যেন ওঁর ভেতরের উত্তাপকে ভেজাতে পারছে না! ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের শোরুমে একবার যে লঙ্কাকাণ্ড ঘটেছিল, বৃদ্ধ সেই গল্প শুরু করলেন। সেবার বিলেত থেকে এক নতুন ইউরোপীয় চশমা-কর্মী এসে জুটল। ছোকরা নিজেকে ভারী ওস্তাদ মনে করত, কারণ সে নাকি বিলেত থেকে কাজ শিখে এসেছে! কারখানায় ঢুকে বাবার হাতের কাজ দেখেই তার নাসিকা কুঞ্চিত হয়ে উঠল। গায়ের চামড়ার রঙ দেখে তাচ্ছিল্যের সুরে সে নাকি মন্তব্য করে বসেছিল—‘কালোর বানানো লেন্স ছোঁয়াও পাপ!’
বৃদ্ধ বললেন, সেই সময় ওঁর গুড সাহেব ঘরে বসে এক খদ্দেরের চোখের চশমার মেজারমেন্ট নিচ্ছিলেন। কথাটা কানে যেতেই সাহেবের রক্ত মাথায় উঠে গেল! টেবিলের ওপর রাখা ছিল দামি মেহগনি কাঠ আর লোহার বার্নিশ করা ভারী একটা ফ্রেম। গুড সাহেব সেটিকে হাতে তুলে নিয়ে এক লাফে এগিয়ে এলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সোজা গিয়ে ধরলেন সেই বিলেতি ছোকরার জামার কলার! তারপর শূন্যে হাত উঁচিয়ে মারলেন ঠাস করে এক কড়া চড়! সাহেবের চোখমুখ তখন রাগে লাল। ছোকরাকে শোরুমের দরজার দিকে কলার ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে গমগমে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, "হাতের কাজ দেখার চোখ নেই, খালি গায়ের চামড়া দেখিস? গেট আউট! বের হ দোকান থেকে!"
শোরুমের ভেতরে তখন রীতিমতো ধুন্ধুমার কাণ্ড! সেই চড়ের পর থেকে আর কোনো ইউরোপীয় কর্মচারীর সাহস হয়নি দোকানে ঢুকে ওঁর বাবার সামনে গায়ের রঙ নিয়ে কোনো বাজে কথা বলার।
বৃদ্ধ একটু থামলেন। কাশি হচ্ছে। বললেন, এরকম হয়। ভয় নেই, টিবি নয়। এটা হয় আমাদের কাজের জন্য।
রূপসী বুঝতে পারছে বৃদ্ধ অনেক দিন পর কাউকে পেয়েছেন নিজের গল্প, অতীতের কথা বলার জন্য। তাই ও আর মাঝে কোন কথা না বলে চুপচাপ শুনতে লাগল। তখনকার দিনে সাধারণ সস্তা ইউরোপীয় কর্মচারীরা পথচলতি ভাড়াতে 'হ্যাকনি ক্যারেজে' চড়ে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু গুড ফাদারের দেমাগই ছিল আলাদা! শহরের রাস্তায় তখন লাটসাহেব, সুপ্রিম কোর্টের জজ কিংবা পথুরিয়াঘাটার নামজাদা জমিদারেরা যে লাল রঙের দু-ঘোড়ায় টানা মস্ত ফিটন গাড়িতে চড়তেন, গুড ফাদারও সেই গাড়িতে চড়েই দেমাগে যাতায়াত করতেন। পার্ক স্ট্রিটের শোরুমের প্রধান কারিগর হিসেবে ওঁর মাস গেলে আয় হত কম করে চল্লিশ থেকে ষাট টাকা! মানুষটার যেমন ছিল কাজের দাপট, তেমনই ছিল খাওয়ার সৌখিনতা। খাওয়ার টেবিলে ওঁর নিত্যদিনের পছন্দ ছিল ভিনেগার আর রসুন দেওয়া শুকরের মাংসের ‘ভিনডালু’ আর গোয়ানিজ কায়দায় সেঁকা পাউরুটি ‘পোই’। আর গোয়ানিজ পরবের দিনগুলোতে তো পুরো রিপন স্ট্রিট মেতে উঠত! চার্চের প্রার্থনা শেষে ঘরে ফিরে দোতলায় কঙ্কণী গানের আসর বসত। পরবের রাতে টেবিল ভরে যেত ফেনি সুরা, কেক আর নানা পদের মাছে। বিলেতি বাজার থেকে গুড ফাদার ওঁর জন্য কাঠের খেলনা চশমা, চকলেট, আর হাতির দাঁতের ছোট খাপ নিয়ে আসতেন। সাহেবের নিজের নাকে ঝুলত সোনা আর হাতির দাঁতের মস্ত একজোড়া ডিম্বাকৃতি চশমা, যার দুই কাচের মাঝে ছিল চমৎকার মেহগনি ব্রিজ। চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে উনি উপহারটা বাড়িয়ে দিয়ে ভারী বিলেতি টানে বলতেন, "লে, আমার ছোট্ট মিস্ত্রি, লেন্স বসাও এবার!"
কথাটা বলতে বলতে বৃদ্ধ শূন্যে নিজের হাত দুটো আলতো করে বাড়িয়ে দিলেন। ওঁর বুড়ো আঙুল দুটো বাতাসে যেন সেই কাল্পনিক চশমার কাচ স্পর্শ করছে। রূপসী অবাক হয়ে দেখল, বৃদ্ধের চোখে তখন এক অদ্ভুত দ্যুতি! ওঁর দৃষ্টি আর এই ঘরের ভেতরে নেই। যেন বহু যুগ পার করে ওঁর হাতদুটো আজও সেই বালক বয়সে গুড ফাদারের দেওয়া প্রথম চশমাটাকে হুবহু একইভাবে ধরে রয়েছে।
চশমার সেই অদৃশ্য কাচে হাত বুলাতে বুলাতেই বৃদ্ধের চোখ দুটো ভিজে এল। ওঁর গুড ফাদার ডি’সুজা এই সূক্ষ্ম কারিগরি বিদ্যাটা শুধু নিজের লোকজনের মধ্যে আটকে রাখতে চাননি। উনি খুব ভালোভাবে বুঝতেন, এদেশীয় মানুষদের হাতের কাজ চমৎকার নিখুঁত, মেধা প্রচুর। শুধু তো আর একটা নতুন প্রযুক্তির ধারা শূন্য থেকে এসে কোনও জাতির মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে না! তাই নিজের কাজের ডেরায় উনি বৃদ্ধের বাবাকে তো বটেই, ওঁর মতো আরও চার-পাঁচজন এদেশীয় তরুণকে সযত্নে কাছে টেনে নিয়েছিলেন কাজটা শেখানোর জন্য।
রূপসী নীরব হয়ে শুনছিল, আর বৃদ্ধ আবার ফিরে যাচ্ছিলেন সেই পুরোনো স্মৃতির দিনে। ওঁর মুখে ফুটে উঠেছিল ওঁর বাবার চশমার দোকান আর কারখানা গড়ে ওঠার ইতিহাস। গুড ফাদার দেখলেন ওঁর বাবার হাত পুরোপুরি পেকে উঠেছে। লেন্স কাটা থেকে শুরু করে ফ্রেম বাঁকানো, সব কাজই নিখুঁত আর স্বাধীনভাবে করার মতো দক্ষতা এসে গেছে। তখনই সাহেব নিজে উদ্যোগ নেন ওঁর বাবাকে একটা কারখানা করে দেওয়ার। বউবাজারের মূল রাস্তার পাশে একটা বেশ বড় জায়গা নিয়েছিলেন। যেটা গুড ফাদার নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই ওঁর বাবার জন্য কিনে দিয়েছিলেন। ওস্তাদ আর কারিগরের সম্পর্কটা সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে কখন যেন ভাইয়ের মতো হয়ে উঠেছিল! তাই অত বড় একটা জায়গা উপহার দেওয়ার সময় গুড ফাদার একবারও ইতস্তত করেননি। আর সেই জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল কোনও এদেশিয় মানুষের তৈরি প্রথম দিককার এক ঐতিহাসিক চশমার কারখানা আর শোরুম। তখন বৃদ্ধের বয়স মাত্র পাঁচ কিংবা ছয় বছর। ওঁর বাবার হাত ধরে সেই নতুন কারখানায় প্রথম পা দেওয়ার স্মৃতি এখনও ওঁর কাছে স্পষ্ট। ছবি দেখার মতো করে উনি বলছিলেন। রূপসী একমনে শুনে যাচ্ছিল। সেই সময়ের আবেগ আর এক গোয়ানিজ ওস্তাদের মহানুভবতার গল্প পুরো ঘরের আবহাওয়াটাই যেন বদলে দিয়েছিল।
"এত প্রসিদ্ধি, আমাদের এত সাফল্য—তা বেশি দিন সইল না মা..."
কথাটা উচ্চারণ করার পরেই বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর এক ধাক্কায় যেন অনেকটা নিচে নেমে গেল। গলায় এসে জমা হলো এক অদ্ভুত বিষাদের মেঘ। রূপসী ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল। ও স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, গল্পের সোনালি অধ্যায়টা শেষ হয়ে এবার হয়তো কোন গভীর কানাগলিতে বাঁক নিতে চলেছে অতীত। সত্যি তো, একটা মানুষের আস্ত জীবন তো কখনো শুধু আলো আর আনন্দের সরলরেখায় চলে না! সেখানে না চাইতেও নেমে আসে দুর্ঘটনা, অনাকাঙ্ক্ষিত মোড় আর সম্পর্কের বিচ্ছেদ।
বৃদ্ধ একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ওঁর দৃষ্টি জানালার বাইরে নেমে আসা সেই ঝাপসা বৃষ্টিতে স্থির। তারপর আবার শান্ত, কিন্তু ভারী গলায় জীবনের সেই পরের অধ্যায়ের গল্পটা বলতে শুরু করলেন।
"আমি কিন্তু বউবাজারে বাবার কাছে যাইনি মা..."
বৃদ্ধের এই আচমকা কথায় রূপসী একটু অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকাল।
বৃদ্ধ তখন যেন এই ভেজা ঘরের কার্নিশ ছাড়িয়ে সোজা পৌঁছে গেছেন রিপন স্ট্রিটের সেই পুরোনো দোতলা বাড়িতে। সময়টা উনিশশো সালের দিকের। উনি তখন ওঁর গুড ফাদার আর মেমসাহেবের সঙ্গেই থাকেন। সাহেবকে ফাদার আর মেমসাহেবকে ডাকেন ‘মাদার’ বলে। ফাদারের অত বড় কারখানায় কাজ শিখছে ওঁর এক খুদে শিল্পী! মেমসাহেব ওকে নিজের সন্তানের মতো পরম স্নেহে আগলে রাখতেন। ওঁর জন্য কিনে দিতেন মেমসাহেবি কোট, জুতো আর জামাকাপড়। কিন্তু সেই হাসিখুশি মানুষটা হঠাৎ এক রাতে নিঝুম ঘুমের মধ্যেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। সবাইকে একলা ফেলে চলে গেলেন। মাদার চলে যাওয়ার পর থেকে গুড ফাদারের জীবনটা যেন একরাতে একেবারে পাল্টে গেল। চোখে কোন জল ছিল না ওঁর, কিন্তু ওঁর সেই নিথর চুপ করে থাকাটা ছিল কান্নার চেয়েও হাজার গুণ সাংঘাতিক! ওঁর জীবন থেকে যেন সব আলো, সব রঙ মুছে গেল। ভালো পোশাক পরার আর খেয়াল রইল না, খাওয়াদাওয়ার হুঁশ থাকল না, লোকজনের সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ হয়ে গেল। ওঁর সেই উৎসবের আনন্দের দিনগুলো কোথায় যে হারিয়ে গেল! বাড়িতে ছিলেন গুড ফাদারের নিজের বোন, মেরি পিসি। এমনকি ওঁর নিজের বোনের পক্ষেও সম্ভব হত না ফাদারকে একমুঠো খাওয়ানো কিংবা ওঁর মুখ থেকে দুটো কথা বলানো।
বৃদ্ধ বলছিলেন, "আমি কেবল ছায়ার মতো ওঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম মা।"
কথাটা বলার সময় রূপসী গভীরভাবে খেয়াল করছিল—ইতিহাসে হয়তো একটা নিভে যাওয়া বয়স্ক মানুষের পাশে এমন কিশোর সঙ্গীর দেখা খুব কমই মেলে। কিন্তু সেই দুঃসময়ে ওই কিশোর ছেলেটি যেন নিজের বয়স ছাপিয়ে ওঁর গুড ফাদারের বয়সী এক পরম অভিভাবক, এক সুপুত্রের মতো হয়ে উঠেছিল! তাই ফাদার যেখানেই যেতেন, ছেলেটি আড়ালে ওঁর ছায়ার সঙ্গী হয়ে থাকত। কিন্তু কোন কোন দিন ফাদার একা একাই বেরিয়ে পড়তেন...
ফাদার কোন কোন দিন নয়, প্রায় দিনই নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়তেন। চলে যেতেন ওঁর মেমসাহেবের কাছে। মেমসাহেব তখন চিরনিদ্রায় শুয়ে গোরস্থানে। সিমেট্রিতে গিয়ে সেই পাথরের কবরের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একলা বসে থাকতেন ফাদার। আর এক কিশোর ছায়ার মতো সেই নির্জন গোরস্থানের নীরব আবহাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকত—দুই মানুষের মাঝখানে এক নিঃশব্দ তৃতীয় সাক্ষী হয়ে। রূপসী বুঝতে পারছিল, বৃদ্ধ ওঁর ফাদারের সেই অসীম দুঃখের পুরোটা হয়ত প্রকাশ করে উঠতে পারছেন না। কিন্তু ফাদারের অন্তরের সেই হাহাকার যেন বহু বছর পার করেও আজও বৃদ্ধ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। গল্পের সেই নিস্তব্ধতায় রূপসীও চুপ হয়ে গেল।
হঠাৎ বৃদ্ধ ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, "কিছু দুঃখ এমন থাকে মা, যা কখনো অন্যের সঙ্গে ভাগ করা যায় না। ছায়ার মতো শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সেসব দুঃখ কেবল দেখে যেতে হয়।"
কথাটা শুনে রূপসীর বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল। ও বুঝতে পারল, বৃদ্ধ আসলে তখন নিজের অপরাধবোধ কিংবা অক্ষমতার কথাই বলছিলেন। সেদিন কিশোর বয়সে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু গুড ফাদারের জীবনসঙ্গী হারানোর সেই অতল ব্যথা তো উনি কমিয়ে দিতে পারেননি! সন্ধে নামার আগেই অবশ্য কিশোর ফাদারকে বুঝিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনতেন। নিজের হাতে ওঁর জুতো-জামা ছাড়িয়ে দিয়ে অন্য প্রসঙ্গের গল্পে ফাদারের মন ঘোরানোর চেষ্টা করতেন। পুরোনো দিনের নানা কথা শুরু করতেন ওঁর সঙ্গে। ফাদার নিজে খুব একটা কথা বলতেন না তখন। কিন্তু এই কিশোরকে এতটাই ভালোবাসতেন যে ওঁর কথা বলার উৎসাহে কখনও বাধা দেননি। ওঁর নিজের বিষাদময় নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝেমধ্যে কেবল দু-একটা ‘হ্যাঁ’, ‘হুঁ’ কিংবা ‘না’ দিয়ে সাড়া দিতেন।
সেই কঠিন সময়ে কলকাতায় গুড ফাদারের অজস্র আত্মীয় আর বন্ধুবান্ধব থাকা সত্ত্বেও কেবল এই একটা কিশোরই ওঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে গিয়েছিল।
রূপসী মনের ভেতরে গভীর এক টান অনুভব করছিল। ওঁর নিজের জীবনেও যে প্রিয়জন হারানোর ঘটনা ঘটেনি, তা নয়। এত দিনে কাছের মানুষকে হারানোর সেই নিঃশব্দ যন্ত্রণাটা ও উপলব্ধি করতে পারছে। এটা কোনও গল্পের বইয়ের বানানো উপাখ্যান নয়। এ এক রক্তমাংসের চিরন্তন স্মৃতি, যেখানে কোন রক্তের সম্পর্ক নয়, আত্মিক টানই হয়ে ওঠে শেষ কথা।
বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা ছাদের স্যাঁতসেঁতে কড়ি-বরগা পেরিয়ে যেন বহু পুরোনো এক রাতের অন্ধকারের দিকে উড়ে গেল।
গলার স্বরটা আরও নিচু আর নরম করে উনি বলতে লাগলেন, "রাতের খাবার আমার ফাদার প্রায় দিনই খেতেন না মা। আর আমাদের সেই মেরি পিসি, ওঁর দুই মেয়েও বিয়ে করে ওই বাড়িতেই থাকত। কিন্তু তারা কখনো ফাদারকে জোর করে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করত না। আমিই মাঝে মধ্যে ফাদারের জন্য একটু গরম স্যুপ বানিয়ে ওঁর মুখে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এই বাংলায় থাকতে থাকতে সাহেব আর অত সাহেব ছিলেন না মা... আমার ফাদার শেষ দিকে আমার মতো ভাত খেতেন! একদম পাতলা, হালকা গালা ভাত। আমিও ওঁর পাশে বসে সেটাই মেখে খেতাম।"
গল্পের এই করুণ মোড়ে এসে রূপসীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। ও অত্যন্ত সহানুভূতি ভরা গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি ওনাকে সামলাতে পারতে দাদু?"
বৃদ্ধ মুখে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটিয়ে বললেন, "চেষ্টা করতাম মা। তবে ফাদারকে সামলানো কি আর অতটা সহজ কথা ছিল! ওঁর বুকের ভেতরের কান্না যেমন মোছানোর সাধ্য আমার ছিল না, তেমনই মানুষটাকে সেই অবস্থায় একা ফেলে রেখে যেতেও আমার মন সরত না। কিন্তু ঠিক সেই সময়, আচমকা খবর এল। আমার নিজের বাবা আর নেই..."
এক মুহূর্ত থামলেন বৃদ্ধ। ওঁর চোখে যেন সাগরের ওপার থেকে ভেসে আসা এক ভাঙা সময়ের ছায়া।
"খবরটা পেয়েই আমাকে এক মাসের জন্য গ্রামে, মানে আমাদের দেশে ফিরে যেতে হলো—আজকে যাকে তোমরা বাংলাদেশ বলো। পদ্মা পারের সেই ওপার বাংলায় গিয়ে বাবার শ্রাদ্ধশান্তির কাজে আটকা পড়ে গেলাম। আর ঠিক এক মাস পর যখন সব চুকিয়ে আবার এই কলকাতায় ফিরে এলাম..."
কথাটা শেষ করতে গিয়ে বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর যেন হঠাৎ থমকে গেল। রূপসী দেখল, বৃদ্ধের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেছে, যেন সেই কলকাতায় ফিরে এসে নতুন কোন ধাক্কা ওঁর জন্য অপেক্ষা করে ছিল!
"নিজের বাবাকে হারিয়ে ফিরে এলাম কলকাতায়। এসে দেখি গুড ফাদারের শরীরটাও আর ভালো নেই, একদম ভেঙে গেছে।"
বৃদ্ধের মুখের এই একটি বাক্যই যেন রূপসীর বুকে এসে বিঁধল। ও উপলব্ধি করল, মৃত্যু মানুষকে কীভাবে এক মুহূর্তে পাল্টে দেয়! একদিকে নিজের বাবা হারানোর গভীর শোক, অন্যদিকে আগলে রাখা অভিভাবকের এই চরম অসুস্থতা—এক কিশোর একা হাতে কীভাবে সামলাবে? সেদিন হয়ত সব আগল ভেঙে সেই কিশোর গুড ফাদারকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল। ফাদার তখন অসুস্থ। ওঁর পরম সন্তানের মতোই সেবা করতেন উনি। তাই ফাদারকে একলা ফেলে কোথাও যেতে মন সরত না, এমনকি কারখানাতেও না।
অসুস্থ ফাদার আকুল হয়ে বলতেন, "তুই কারখানায় যা, কাজ কর, নইলে সবাই খাবে কী?"
কিন্তু কিশোর জানত, সে চলে গেলে ফাদারের কাছে থাকার আর কেউ নেই। ওঁর সেবা করার মতো কেউ নেই। কিন্তু কঠিন সময় মানুষকে নানাবেশে পরীক্ষা নেয়। বউবাজারের কারখানার কাজ সামলাতে কিছু এদেশীয় লোক আসতে শুরু করল। আর তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করতে তৈরি হতে লাগল এই একলা কিশোর। কথা বলতে বলতে রূপসী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, বৃদ্ধ যেন এখন আর এই বয়সে নেই। ওঁর চোখেমুখে আর গলার স্বরে ফুটে উঠেছে সেই কিশোর বয়সেরই আবেগ। "এই সময়ে কাজ সামলাতে বউবাজারের কারখানায় আরও কিছু দেশি লোক কাজে এলো, তাদের হাতে কলমে সব শেখাতে লাগলাম।"
একজন নিঃসঙ্গ, দৃষ্টিহীন বৃদ্ধ আর এক উঠতি কিশোরের মধ্যে তৈরি হওয়া এই অসম বয়সের সম্পর্কটা সাধারণ সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। রিপন স্ট্রিটের শিকড় উপড়ে যখন বউবাজারের কারখানার ছোট্ট ঘরে দুজনে আশ্রয় নিলেন, তখন তাঁদের আর কেউ ছিল না—কেবল একে অপরের ভরসা ছাড়া।
"তারপর মেরি পিসির মেয়েরা একদিন হঠাৎ বলে বসল, বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে..."
বৃদ্ধের স্বর এবার ভীষণ ভারী হয়ে এল। রূপসী একমনে শুনছিল ওঁর সেই অতীত দিনের অলিখিত লড়াইয়ের ইতিহাস।
পিসির মেয়েদের সেই কঠোর সিদ্ধান্তে কিশোরের মাথা যেন একলহমায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সে নিজে চলে গেলে এই সম্পূর্ণ অন্ধ, অসহায় মানুষটাকে কে সামলাবে? কে সময়মতো মুখে খাবার তুলে দেবে? কিশোর বুঝেছিল, তার যা গতি হবে, ফাদারেরও তাই। জীবনের ভাঙা নৌকোয় দুজনকে একই সঙ্গে ভাসতে হবে।
তাই অন্ধ ফাদারকে বলেছিল, "চলো ফাদার, আমরা বউবাজারে গিয়ে থাকি। আমি তো আছি..."
সেই নিঃসঙ্গ, দৃষ্টিহীন মানুষটি বোধহয় সবটাই বুঝতে পেরেছিলেন। বয়সের এত তফাত,—সব মুছে গিয়ে সেদিন কেবল বেঁচে থাকার আকুতিটুকু পড়েছিল। কোনও প্রতিবাদ না করে, কোনও প্রশ্ন না তুলে, এক অবুঝ শিশুর মতো শান্ত হয়ে কিশোরের হাত ধরে উনি চলে এসেছিলেন বউবাজারের সেই সংকীর্ণ ডেরায়। মেরি পিসির মেয়েরা রিপন স্ট্রিটের সেই স্মৃতিঘেরা দোতলা বাড়িটা নিয়ে পরবর্তীতে কী করেছিল, বৃদ্ধ আর কখনও সেখানে ফিরে গিয়ে খোঁজ নেননি। ওখান থেকে তো কেবল একটা ইটের কাঠামো ছাড়তে হয়েছিল, ওঁর আসল ‘গুড ফাদার’ তো ওঁর সঙ্গেই রয়ে গিয়েছিলেন—জীবনের শেষ নিশ্বাসটুকু পর্যন্ত। বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললেন, "গুড ফাদারের কথা আর কত বলব বল মা? নিজের চোখের আলো হারিয়ে মানুষটা শুধু আমার এই দুটি কাঁচা হাতের ভরসাতেই টিকে রইলেন বাকি জীবনটা।" রূপসী নিস্পন্দ হয়ে শুনছিল। ঘরের কোণে জমে থাকা শ্রাবণের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ও অনুভব করল—পৃথিবীর সব সম্পর্কের নাম হয় না। এক আশি পার করা দৃষ্টিহীন গুরু, আর এক পনেরো-ষোলোর কিশোর... একজন হারিয়েছেন আলো, অন্যজন আশ্রয়। দুটি বিষণ্ণ নদী এসে যেখানে মিশেছিল, সেখানে রক্তের বন্ধনকে হার মানানো এক অলৌকিক আত্মিক টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
"সেদিনের মারাত্মক বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে ওঁর ধেড়ে জ্বর এল।"
কথাটা বলেই বৃদ্ধ থামলেন। রূপসী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর একলহমায় একদম পাল্টে গেছে। ও অনুভব করল, এত বছর পার করে আজও যদি বৃদ্ধের কণ্ঠে সেইদিনের ব্যাকুলতা এমন সজীব হয়ে ফোটে, তবে সেই কিশোর বয়সে তিনি নিশ্চয়ই চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন! তখন ওঁরই বা কতটুকু রোজগার, আর কতটুকুই বা বোঝা টানার সাধ্য? নিজের জন্মদাতা বাবা চলে গেছেন ঠিক একই সময়ে, আর অন্যদিকে পরম অভিভাবক গুড ফাদারের এই করুণ অবস্থা!
একটু শ্বাস নিয়ে বৃদ্ধ আবার বলতে লাগলেন, "বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর বউবাজারের কারখানাটা একদম বন্ধ হয়ে পড়েছিল। পুরোনো সব সাহেবি শহরের যোগাযোগ পেছনে ফেলে এসে আমরা তখন বউবাজার স্ট্রিটের এই বাড়িতে নিজেদের নতুন করে দাঁড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছি। কিন্তু কারখানা চালু করার চেয়েও তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল গুড ফাদারের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।"
রূপসী মনে মনে মেলাচ্ছিল সেই কিশোরের অমানুষিক লড়াইয়ের দিনগুলো। সামান্য কিছু জমানো পয়সা সম্বল করে এক কবিরাজ মশাইকে ডেকে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। দিনরাত এক করে নিঃস্বার্থভাবে চালিয়ে গিয়েছেন বৃদ্ধ ওস্তাদের সেবা। বৃদ্ধের বর্ণনা থেকে রূপসী চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল বউবাজারের সেই বিশাল বাড়িটাকে। এক দেশি সাহেবের পছন্দমতে তৈরি, তাই চওড়া খিলান আর আলো-বাতাসে ভরা। দোতলার একটা রোদ-ঝলমলে দক্ষিণ-খোলা ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল গুড সাহেবের জন্য। ইট-কাঠের সেই বিশাল ঘরগুলো বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি, কোনদিন তাদের আসল মালিককে তারা চোখের দেখা দেখতেই পাবে না!
হঠাৎ বৃদ্ধের চোখ দুটি আবেশে বুজে এলো। অস্ফুটে কোটেশন চিহ্নের মতো স্পষ্ট করে উনি বললেন—
"মনে পড়ে, কখনো একসময় ছোটবেলায় আমায় চার্চে নিয়ে গিয়ে বোধহয় জল ছিটিয়ে দিয়েছিল। দিয়ে দত্তক পুত্র করে নিয়েছিলেন ফাদার... আমার গুড ফাদার।"
রূপসী নীরব হয়ে শুনছিল। ও গভীরভাবে উপলব্ধি করল, এই পৃথিবীতে পালিত আর জন্মদাতার ফারাকটুকু কত সহজেই মুছে যায়! বৃদ্ধ যেভাবে প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করছিলেন, মনে হচ্ছিল দৃষ্টিহীন গুড ফাদার আজও যেন এই অদেখা ঘরে ওঁর পাশেই শুয়ে আছেন, আর সেই পনেরো বছরের কিশোরটি আজও এক মনে তার অসুস্থ বাবার শিহরে বসে সেবা করে চলেছে। রূপসী বুঝতে পারছিল, বউবাজারের সেই বিশাল বাড়িতে এসে ওঠার পর সেই একলা কিশোরকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই পুরোদমে ব্যবসায় মন দিতে হয়েছিল। আজ যিনি বৃদ্ধ, সেদিন তিনি ছিলেন এক দিশেহারা কিশোর। সেখানে শুধু পুরোনো কারিগররা ছিলেন না, ভিড় জমাচ্ছিলেন নতুন দলের এদেশীয় দক্ষ কারিগরেরা। সেই সময়ে গুড ফাদারের মতো সুদূর গোয়া বা পর্তুগাল থেকে আসা শিল্পীদের পাশাপাশি এদেশের কারিগরেরাও স্বাধীনভাবে কাজ করছিলেন—ঠিক যেমনটি ছিলেন সেই কিশোরের নিজের বাবা। উঠতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করা যে এক বিপুল চাহিদার কথা বলছিল, রূপসীর কাছে তা স্পষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ করেই যেন বাংলায় চশমার চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছিল। রূপসী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন দাদু? চশমার এত চাহিদা হঠাৎ বাড়ল কেন?"
"বাবু কালচারের শৌখিনতার জন্য তো বটেই মা," বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, "তবে হ্যাঁ, সেটাও যেমন ছিল, তাছাড়াও আরও অনেক কারণ ছিল। তবে তার আগে বলি, আমাদের বউবাজার স্ট্রিটের সেই দারুণ ইমারতের বাড়িটার নিচতলায় একটা গুমঘর করিয়েছিলেন আমার গুড ফাদার। আমরা সেখানে এসে উঠেছিলাম কেবল কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস রেখে দেওয়ার জন্য। সেসব যে পরে আবার কাজে চলে আসবে, তা তো ভাবিনি! কিন্তু এসে দেখলাম, এদেশের কারিগরেরা গুড ফাদারের শেখানো বিদ্যে বোধহয় খুব সুন্দর করে শিখে ফেলতে পেরেছিল। আর তাই জন্যই তো এই ব্যবসা আরও কতগুলো সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল।"
কথাটা বলতে বলতে বৃদ্ধের দৃষ্টি স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেল। তখন বউবাজারের এই পুরো এলাকাটাতেই চশমা নিয়ে কাজ করা মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছিল। কলকাতার চারপাশের চিত্রটা প্রতিদিন রূপ পাল্টাচ্ছিল। একদিকে ডালহৌসি আর ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের ঝাঁ-চকচকে বিলিতি শোরুমে বড় বড় গোয়ানিস আর ব্রিটিশ চশমা ব্যবসায়ীদের রমরমা, অন্যদিকে বউবাজারের এই নিভৃত ঘরের নিবু নিবু আলোয় আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল একদল এদেশীয় তরুণ কারিগর। বলা চলে, তাঁদের সেই লড়াই নিঃশব্দে এক শিল্প-বিপ্লবই আনছিল।
"আমাদের নতুন করে চালু হওয়া কারখানায় তখন একে একে দশ-বারোজন তরুণ কর্মচারী এসে খাটতে শুরু করেছে। কেউ চন্দননগর থেকে এসেছে, কেউ নদীয়া বা বরানগর থেকে।"
"ঠিক আজকের এই কমবয়সীদের মতো?" রূপসী বলল।
বৃদ্ধ বললেন, "হ্যাঁ, আরও কম বয়সেরও ছিল তারা। ছোকরাগুলো সারা দিন গামলার ভিজে কাদা আর বালুকণা দিয়ে কাঁপা হাতে কাচ ঘষত। তখন তো আর আজকের মতো বিদ্যুতের বড় বড় স্বয়ংক্রিয় লেন্স-কাটিং মেশিন ছিল না! কাচ কাটতে হত লোহার সূক্ষ্ম তার আর হিরের ডগা দেওয়া হাতে চালানো ফ্রেমে।"
"আর মেকিং চার্জ?" রূপসী জানতে চাইল।
বৃদ্ধ যা বললেন সেটাও একটা ইতিহাস। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের সাহেবি শোরুমে যেখানে একটা খাঁটি লেন্স বসানো আর সোনা বা হাতির দাঁতের রিম বাঁধাই করতে দশ থেকে বারো টাকা পর্যন্ত মেকিং চার্জ হাঁকানো হত। সেখানে বউবাজারের কারখানায় এদেশীয় কারিগরেরা খদ্দেরের মেজাজ ও সাধ্য বুঝে মাত্র আট আনা থেকে দেড় টাকায় সেই মেকিংয়ের কাজ নিখুঁতভাবে তুলে দিত। কাঁচামালের জোগাড়টাও ছিল এক দারুণ উপাখ্যান। লেন্সের শক্ত কাচের প্লেটগুলো আসত বোম্বে প্রেসিডেন্সির কারখানা থেকে, আর কোনো কোনো দামি 'ক্রাউন গ্লাস' বা স্বচ্ছ প্লেইন কাচের ছাঁচ আসত বিলেতের জাহাজ থেকে সরাসরি কাস্টমস হাউস হয়ে। কিন্তু ফ্রেম বানানোর পিতল, জার্মান সিলভার আর তামা সংগৃহীত হতো বড়বাজারের কাঁসারি পট্টি থেকে। মহাজনদের কাছ থেকে কম দামে সেই ধাতু কিনে এনে কারখানার আগুনে গলিয়ে হাতুড়ি পিটিয়ে ফ্রেমের তার বানানো হত। সেদিনও বাইরে ছিল এমনই এক ঝুম বৃষ্টির দুপুর। কারখানা তখন গুঞ্জরিত—একপাশে চাকার ঘরঘড় শব্দে লেন্সের ধার ঘষা হচ্ছে, অন্যপাশে ছোকরা মিস্ত্রিরা ছোট ছোট নিপুণ ছেনি আর বাটাল দিয়ে মহিষের শিং আর হাতির দাঁত কেটে চশমার নাক-প্যাড তৈরি করছে। শোরুমের সামনের ঘরে এসে দাঁড়াতে শুরু করেছে শহরের ভিজে ছাতা হাতে মধ্যবিত্তের ভিড়—যাঁরা সাহেবি দোকানের আকাশছোঁয়া দাম এড়িয়ে এই কমদামি অথচ মজবুত এদেশীয় চশমার কদর বুঝতে শিখেছেন। অন্ধ গুড ফাদার দোতলার বারান্দায় নিজের কাঠের আরামচেয়ারটায় শান্ত হয়ে বসে থাকতেন। হাওয়ায় যখন নিচে কাচ ঘষার আর বেলোর আগুনের চিরপরিচিত গন্ধ উঠত, ওঁর মুখে নেমে আসত এক অদ্ভুত প্রশান্তি। উনি জানতেন, নিজের চোখে আলো না থাকলেও, এদেশের একদল তরুণ কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় নতুন এক আলোর ভুবন তৈরি হয়ে গেছে বউবাজারের এই পুরোনো বাড়ির উঠোন জুড়ে।
..কিন্তু কারখানা চালু করার চেয়েও তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল গুড ফাদারের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। অল্প কিছু জমানো পয়সা সম্বল করে এক কবিরাজ মশাইকে ডেকে নিয়ে এসে দেখালাম। দিনরাত এক করে ওঁর সেবা করতাম। প্রথম কাজ হলো ব্যবসাটাকে দাঁড় করানো। না হলে জমানো পয়সা তো কদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যেত! কিন্তু কপাল ভালো, যেটুকু কাজ শিখেছিলাম, ঠিক সেইটুকুই কাজে লাগানোর মোক্ষম সুযোগ সামনে চলে এল। ততদিনে কলকাতার চশমা শিল্পের বাজারে লরেন্স অ্যান্ড মেয়োর মতো সাহেবি শোরুমগুলোর রমরমা। ডালহৌসি স্কয়ার আর ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের সেই সাহেবরাই তখন সবকিছুর কর্তা। ব্রিটিশ অপটিশিয়ানরা মাস গেলে ম্যানেজার বা হেড টেকনিশিয়ান হিসেবে পকেটস্থ করত প্রায় একশো থেকে দেড়শো টাকা। আজকের বাজারে যার দাম আকাশছোঁয়া! আর তাদের অধীনে কাজ করত গোয়া বা পর্তুগাল থেকে আসা কিছু গোয়ানিস কারিগর। তারা পেত মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি টাকা। রূপসী ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, "সে কী! গোয়ানিসরাই তো সাহেবদের হাত ধরে এই দেশে লেন্স কাটার টেকনিকটা শিখিয়েছিল, অথচ তাদের এত কম মাইনে কেন?"
বৃদ্ধ একটা শুকনো হাসি হাসলেন। "টেকনিক জানলে কী হবে মা? কোম্পানির মালিক তো ওই ব্রিটিশরাই ছিল! তাই বেতনের ফারাক তো আকাশ-পাতাল হবেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গোয়ানিসরাও অনেকেই নিজেদের মতো আলাদা হয়ে গেল। আর আমাদের এই বউবাজারের গলিগুলোয় তখন সবে দেশি মিস্ত্রিদের আনাগোনা শুরু হয়েছে।"
রূপসী কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, "তখন দেশি কারিগর কতজন ছিল দাদু?"
"আরে তখন আর আজকের মতো এত বড় চশমা পট্টি তৈরি হয়নি," বৃদ্ধ হাত নেড়ে বোঝালেন। "গোটা চত্বরে হাত দিয়ে গুনলে বড়জোর চার-পাঁচজন দেশি মিস্ত্রি পাওয়া যাবে। কেউ এসেছে এপার বাংলার এদিক-সেদিক থেকে, কেউ বা আবার দেশভাগের আগের উত্তাল সময়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকা, পাবনা বা নদীয়া থেকে পেটের টানে কলকাতা শহরে এসে জুটেছে। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা সেই মানুষগুলোর হাতের কাজে কী যে যাদু ছিল! কাচ ঘষা বা নিখুঁত মাপের কাজ তারা যেভাবে বুঝত, সাহেবরাও ভড়কে যেত। কিন্তু এত গুণী হওয়া সত্ত্বেও তাদের কপালে জুটত মাসে বড়জোর পাঁচ থেকে আট টাকা!"
ঠিক সেই সময়েই হাজির হলো সেই ভয়ংকর যুদ্ধ।
রূপসী অবাক হয়ে জানতে চাইল, "যুদ্ধ? মানে?"
বৃদ্ধ একটু হেসে তাকালেন। "হ্যাঁ শোনোনি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। ১৯৩৯-এ তো যুদ্ধ শুরু হয়েইছিল, কিন্তু ১৯৪২-এর দিকে এসে কলকাতার ওপর আসল আতঙ্কটা নেমে এল। শহরের রাজপথে আলো জ্বালানো বারণ—’ব্ল্যাকআউট’! সন্ধ্যা নামলেই কলকাতার সব রাস্তার গ্যাসের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হতো, জানালায় টাঙানো হতো কালো পর্দা। রাত বাড়লে হঠাৎ সায়রেন বেজে উঠত—'প্যাঁঁঁ-প্যাঁঁঁ' করে বিকট শব্দে। আকাশ কেঁপে উঠত।"
রূপসী শিউরে উঠে বলল, "জাপানি বোমারু বিমান?"
"ঠিক তাই," বৃদ্ধের গলার স্বর আরও নিচু হয়ে এল। "১৯৪২-এর ডিসেম্বরে যেদিন জাপানিরা প্রথম কলকাতায় বোমা ফেলল—ডালহৌসির জেটি, কিডারপুর ডক আর হাটের ওপর অগ্নিবৃষ্টি হলো। মানুষ প্রাণ ভয়ে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে, শিয়ালদহ আর হাওড়া স্টেশনে সে কী কিলবিলে ভিড়! কিন্তু জানো মা, আমরা পালাইনি। আমাদের পালাবার কোনো জায়গা ছিল না।"
বৃদ্ধ একটু ঝুঁকে রূপসীর আরও কাছে এলেন। "ওই যুদ্ধের সময় সাহেবদের আর মিলিটারির চশমার চাহিদা বেড়ে গেল বহুগুণ। রণক্ষেত্রে অফিসারদের জন্য বাইনোকুলার, গান-সাইট লেন্স আর মোটা পাওয়ারের গ্লাস জরুরি হয়ে উঠল। সাহেবরা যখন বোমার ভয়ে গঙ্গার ওপারে বা সিমলায় গিয়ে লুকিয়েছিল, তখন কলকাতার পেছনের সেই পুরোনো বাড়ির একতলার গুমঘরে—যেখানে হ্যারিকেনের আবছা আলোয় আমরা আর পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা গুটিকয় দেশি মিস্ত্রিরা একসঙ্গে কাজ চালিয়ে গেছি। দোতলায় তখন অন্ধ গুড ফাদার শুয়ে, আর নিচে আমরা হ্যারিকেনের আলোয় হিরের কলম দিয়ে নিঃশব্দে কাচ কেটে যাচ্ছি। সাহেবদের যুদ্ধের চোখগুলো তো আমাদের হাতেই তৈরি হচ্ছিল মা!
রূপসী অবাক হয়ে জানতে চাইল, "হিরের কলম?"
বৃদ্ধ একটু হাসলেন। "হিরের কলম মানে সোনা-গয়না লেখার কলম নয়! ওটা আসলে কাচ কাটার অস্ত্র। ডায়মন্ড গ্লাস কাটার! ওই কাটারটার মাথায় নিখুঁত একটা খাঁটি হিরের কুচি বসানো থাকে। কাচ তো আর সাধারণ লোহা দিয়ে কাটা যায় না! ওই হিরের ডগা দিয়ে একটু টান দিলেই মোটা কাচ মাখনের মতো কেটে দুভাগ হয়ে যেত। সাহেবরা বিলেত থেকে ওই কলমগুলো জাহাজে করে আনাত। আমাদের কারখানায় ওটা ছিল সবচেয়ে দামি জিনিস। একটু অসাবধান হয়ে হাত কেঁপে গেলেই হিরের মাথাটা ভেঙে যেত. আর অমনি মাথায় বাজ পড়ত। বেরিয়ে গিয়ে কিনে আনার তো অবস্থা নেই। সেসব না খেয়ে দিন গেছে। আমার গুড সাহেব একটুও শব্দ করেননি, বলেননি যে, খেতে দাও। তারপর, একসময় যুদ্ধ থামল। জাপান হারল।
আমাদের শহর আবার আলোয় ভরল। এটাই যে রুজিরুটির জায়গা। সেই ব্ল্যাকআউটের দিনরাতগুলোয় গুমঘরে কাজ করতাম। হ্যারিকেনের আলোয়। আমরা শহরের চোখগুলো জুগিয়ে গেলাম। আমাদের কথা তো কোনও ইতিহাসের বইতে লেখা হল না। বোমার ভয় আর কাচ কাটার সেই সূক্ষ্ম ধুলো। দুটোই আমাদের ফুসফুসে পাকাপাকিভাবে জমা হয়ে রইল। আজও যখন কাচের গন্ধ পাই, আমাদের বউবাজারের এই পুরনো ঘরে বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে মা...। আমার ছেলেটাও এই রোগে পড়েছে। শ্বাসের কষ্ট কি জিনিস যার হয় সেইই বুঝবে।
রূপসী বলল, তোমার কাশিটাও এই কাজ থেকেই।
হ্যাঁ, কিন্তু ছেড়ে দিলে কীভাবে পেট চলবে? আমার পরিবার আছে।
দাদু তুমি কাকে বিয়ে করেছিলে? মানে শহরের মেয়ে?
বৃদ্ধ হাসলেন। বললেন, আমার বিয়ে হয়নি। বউ পাওয়া যায়নি। আমার জাতে আমি খ্রেস্তান। আর আমার ফাদারের জাতে আমি কালো মানুষ। তাই।
কেউই মেয়ে দেয়নি? তাহলে ছেলে যে বললে?
আমার দত্তক ছেলে। দেখি, একটা অনাথ বাচ্চা। যুদ্ধের বাজারে এমন কত শিশু যে ঘর ছাড়া হয়েছিল। কে জানে...। এই ছেলে দুটো রাস্তায় কাঁদছিল। তুলে এনেছিলাম।
আমাকে ফাদার আশীর্বাদ করেছিলেন। তারপর, আমার ছেলেদের এই কাজ শিখিয়েছি। আর কিছুই জানি না যে।
ছেলেরা তোমাকে ভালবাসে দাদু?
খুবই। নইলে এই কাজে থাকে?
দাদু? তুমি তারমানে অনেক ঝড় পেরিয়েছ?
এখনও বাকী আছে দিদিভাই।
কি ঝড়? কি ঝড়?
সেটা শুনবে?
থাক না।
না, বল দাদু।
ছেলের মৃত্যু দেখাও তো কম ঝড় নয়। মরে যাবে জেনেও এই কাজটা ছাড়ছে না পাগলটা। বলেছে, বাপ-ছেলে একসঙ্গেই মরব নাহয়।
কি বলে সান্ত্বনা দেবে রূপসী এই বৃদ্ধকে। এখানে তো খেলো কথা চলে না। কতইবা মজুরি। এখানে এসে সময় কখনও কেন জিজ্ঞাসা করছে না, জীবনের কিবা মানে।