এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • বেরিয়ে যাওয়ার আগে নক্সা লিখে রাখি

    স্বর্ণদীপ চট্টোপাধ্যায়
    ইস্পেশাল | উৎসব | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৯৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • ছবি: ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক



    গত ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, আমাদের বন্ধু দীপক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অনেকেই যায়। তেমন বড় কোন ব্যাপার নয়।

    গত মাসে দীপক আমার কাছে এক সপ্তাহের ছুটি চেয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারীতে আমাদের নতুন প্রোজেক্ট গো-লাইভ হবে। আর দীপককে ছাড়া প্রথম দুটো সপ্তাহ আমাদের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। অতএব,

    তবে দীপকের চলে যাওয়ার পর পুলিশ এটুকু জানতে পেরেছে যে, এই এক্সিট প্ল্যান আসলে পরিকল্পিত এবং স্বপ্রণোদিত। দীপক স্রেফ বেরিয়ে গেছে। ওর ঘরের শেষ কয়েকদিনের ডায়েরীর নোটগুলো অন্তত সেরকম কথাই বলে।


    ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
    রাত সাড়ে এগারোটা



    কলকাতায় শীত কমে আসছে। এমন বেমক্কা দিনে পার্ক স্ট্রিটে বেলুন‌ শুকিয়ে যায়। একটা এমন দোকানের কথা, রাস্তার কথা মনে পড়ে যেখানে মনে হয় আমরা কোনদিন একসাথে গেলে ভালো হত। যেমন, জীবনদীপের পাশে Fire and Ice Pizzeria ; যেমন, থিয়েটার রোড বা লিটল্‌ রাসেল‌ স্ট্রিট। তোমার অফিস পাশেই তো ছিল। আমিও কতবার এ পথে হাঁটব ভেবেও এখনও হাঁটিনি‌। ওই দোকানে ঢুকতে গিয়েও একদিন আমার দরজার কাছে পা পিছলেছে। বুঝেছি, এখনও হয়নি সময়। অন্য কোনদিন যাওয়া যাবে।

    এই অন্য কোনদিন, অন্য কখনও কোনদিন, হঠাৎ কিছু আকস্মিক হয়ে যাক - এসব ভেবে ভেবে আমার আর কোনদিন কিছুই করা হয়ে উঠলনা। আমাদের সাথেই কলকাতার শীতের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। রক্তের ঝাঁঝ কমছে। ওসব বিশ্ব উষ্ণায়ন বাজে কথা, জানো? তাহলে বেদুইনদের প্রেম শুকিয়ে যেত। Wind, Sand and Stars কিংবা The English Patient-র মত ক্রমাবর্তক বইগুলো কোনদিন লেখাই হত না। আমাদের ভেতর তীব্র থেকে তীব্রতর অসুখ ফুঁসে উঠছে রাসেল‌ স্ট্রিটের পার্কিং স্পেসে দাঁড়িয়ে থাকা মার্সিডিজ বেঞ্জের ফার্স্ট গিয়ারের আওয়াজে, অধিক গভীরগামী আলস্যে জারানো বিয়ার মাগে। আমরা দেখছি আমাদের চেনা‌ লোকেরা এখনও অফিস যেতে ভালোবাসে। Automation আর AI-র বাজারে ChatGPT-র‌ মত বিপ্লবের পরেও কী সাধ্যাতীত সাহসে ওরা চায়ের দোকানে সিঙাড়াকে ভুলে গিয়ে 'সামোসা' তুলে ‌আনে। বলা ভাল‌ সমস্যা ভোলার খুচরো ইচ্ছেগুলো তাদের এখনও বেশ টানে।

    এর মধ্যে তোমায় লিখছি। আচ্ছা, আমরা কি আর‌ কোনদিনও অ্যাকাডেমী ক্যান্টিনে ডিম-আলু রোল খেতে যাব? এর‌ পাশেই এক সময় নান্দীকারের জন্য, বহুরূপীর জন্য আলাদা পোশাকঘর ছিল, না? আজ জঙ্গল উপচিয়ে তবুও জানান‌ দেয় - আছি, আছি। তবে, অক্সফোর্ড বুকস্টোর এখনও বেঁচে আছে চা-বারের‌ রেভিনিউয়ে। শুধু পার্ক‌ স্ট্রিট নয়, বরং সমস্ত কলকাতা থেকেই সাহেব বাঙালি লোকগুলো আর কিছু দিনেই ডোডোপাখি হয়ে যাবে। ট্রামের মিউজিয়াম দেখে ও পাড়ার বাচ্চারা একটু চিপস্ ছড়াবে, কফি ফেলবে কার্পেটে। পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টগুলোতে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ, লাল‌ সোফা, বুড়ো বেয়ারাদের চোখে পঞ্চাশ বা একশোর নোটের চিকচিক, ক্যালকাটা বা বেঙ্গল‌ ক্লাবে যাওয়া আন্তর্জাতিক ভিক্টোরিয়ান বাঙালিকে টপকে আমাদের দামী ধাঁচের সস্তা কৃষ্টি আর অভদ্রতার উৎসব নিয়েই থেকে যাবে একুশ‌ শতকের সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। কলকাতা তখন, জানো, নিজের শহর নয়, একটা জান্তব tourist spot হবে। খুব শিগগিরই হবে।

    ভালো থেকো।


    ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
    দুপুর তিনটে



    কীভাবে ভালবাসি? অত বলে কয়ে নয়, জানান দিয়ে নয়। আড়ালে। অনেকটা নিজের মত করে। যখন ভালোবাসতে গেলেই ফেসবুক, ইনস্টায় জানান দেওয়া অপরিহার্য, প্রতি মুহূর্তে খবর নেওয়া অনিবার্য, ঘাড়ে ক্যামেরা ঝোলানো বা নিতান্ত একটা ফোনে নিখাদ ভালো ক্যামেরা থাকা একটা ন্যূনতম যোগ্যতার মাপকাঠি, তখনই তফাৎ-এ দাঁড়াব। রুমালে কপাল মুছে নেব গাড়ি কেনার মানসিক অযোগ্যতায়। হয়তো তুমি আজ কলামন্দিরে গাইবে। আমি জানাব না, যে আমি যাচ্ছি। কিন্তু যাব নিশ্চিত। এ সপ্তাহে নন্দন ৩-এ তোমার ছবির স্পেশাল স্ক্রিনিং ছিল। তুমি জানতেও পার নি; আমি কিন্তু এসেছিলাম। চরিত্রের রসায়নগুলো বেশ জমেছে, হ্যান্ডহেল্ড শটগুলো তো বেশ ভাল। অথচ ক্লাইম্যাক্স জমে নি কিন্তু। আমাদেরও জমত না কোনদিন।

    আসলে কী বলত, ছিটকে পড়ছি। ক্রমাগত ছিটকে পড়ছি- আমাদের শ্রদ্ধার পারম্পর্যের থেকে, ভিন্নতার অধিকার থেকে, 'স্বপ্নে পাওয়া আঙুলের' আকর্ষের থেকে। কবিতা সিংহের কবিতার মত কোন বাসই এখন তেপান্তর কেন, নিদেন পক্ষে ময়দানেও যায় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কোন লোকেরই কাছে পৌঁছে যাওয়া খুব সহজলভ্য। যে অভিনেতাকে বারো বছর আগেও দূর থেকে দেখতে, ভয় পেতে অটোগ্রাফ চাওয়ার আগে, এখন ঢুকে পড়ছ তারই অন্তরমহলে- শুধু একটা চার দেওয়ালে আবদ্ধ শূন্যতায় নয়, মনের প্রকোষ্ঠে। চেঁচিয়ে উঠেছ, "বয়কট, বয়কট"। সবাইকে বাতিলের দলে ফেলে আস্তে আস্তে নিজেই ছিটকে যাচ্ছ তুমি। নোংরারকম ছড়িয়ে ফেলছ! এখনও কি মনে পরে যাবে যে ভালবাসায় সম্মানের মত লেগে যায় সমান ব্যবধান?

    তাই মাঝে মাঝে এমন ভালোবাসার কাছে ফিরতে হয়। নিখাদ স্বরে গাইতে হয় 'সা'। প্ল্যাটফর্মে রাত হয়। একটু একটু করে লোক কমে আসে। মধ্যরাতের কলকাতা আর কেউ শাসন করে না। কিছু মাতাল ভদ্রলোকদের সারাদিনের লুম্পেন হতে দেখতে দেখতে বীভৎস হয়ে ওঠে। রাতের ল্যাম্পপোস্টে বাংলা মদ হলুদ বমির মত ছিটকে পড়ে। এক একটা ট্রেন একটু একটু করে খালি হতে হতে এক সময় রেললাইনের হাঁসফাঁসটুকু শোনা যায়। তখনই একটা স্বগতোক্তির মত কিছু স্বর বেজে ওঠে। কানের কাছে পরিচ্ছন্ন গলায় শুনতে পাই, এমন ভালবাসার কাছে ফিরবে বুঝি? তাহলে তো আগে নিজের ভালোবাসার কাছে ফিরতে হবে।


    ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
    সন্ধ্যে সাতটা



    তুমি নেই‌। ছিলেনা কখনও। তবু এরকম আকাশ‌ উৎসব হয়ে উঠলে কেন‌ জানি মনে হয়, এই মাত্র ছেড়ে চলে‌ গেছ। "ছিল, নেই - মাত্র‌ এই"। ব্যাস্, এটুকুই‌ তো‌ সুখ চলার পথ। অফিস টিমস্-এ লিখি, "সরি। নট অ্যাভলেবল্‌ ফর দ্য মোমেন্ট ডিউ‌ টু পাওয়ার কাট্।" সামাজিক ছেদ মেনে‌ নিই। আমাকে তুমি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট‌ করার‌ আগেই নিজের ঝলমলে ঘরের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করি। স্ট্রিং লাইট অফ্ হয়ে যায়। মনে হয়, বেঁচে গেছি এ যাত্রায়।

    কিন্তু, আরও অনেক খতরনাক, বিষ‌মাল তুমি। এভাবে মারবে যদি জানতাম! কলম হাতড়ে নিই ; খসে যায়। একটা বই? একটা বই? এই তো পেয়েছি। এক মিনিট, দু'মিনিট, তিন মিনিট ; খসে গেল চোখ। জ্বালা করছে। ডানদিক একটু ফুলেছে মনে হয়। ঘাড়ে ব্যথা। অফিস কেটেছি, তা হলে "দ্য হোয়েল" দেখে আসি। এবার ক্যারামেল পপকর্ণ নেব - মিডিয়ম। কোকটা তবে লার্জই চাই, দু'ঘন্টা চুমু, না‌ না, চুমুকে চালাব। সেই কফি কিস্, মনে আছে? "কী আজব নাম!" সেটা বোধনয় আইনক্স রাখেনা এখন‌ আর। স্নান করি। একটু নিম বেগুন, পালং ঘন্ট, তারপর? চোখ টেনে আসে। দুপুরে আজকে তবে ঘুম চাই। সিনেমা দেখার কথা বললে যে? তা হয় তো বলেছি এখুনি; তবে, এরকম হাওয়া আজ। উৎসব, উৎসব। শুয়ে থাকি বিছানা জাপটে। আর সিনেমা দেখতে যাওয়া? তোমার টিনএজ ড্রিম? সাউথ সিটিতে সারাদিন ঘোরা? সেসব ইচ্ছে খসে যায়।

    আমাকে খসিয়ে‌ তুমি পালিয়ে যাচ্ছ বারবার। তবে, তুমি ছিলেনা কখনও। কারা‌ চলে আসে তাহলে হঠাৎ এমন? কারা ঢুকে যায়, ইচ্ছেগাছ কুড়ে খায় সকাল-বিকেল? একদিন, প্রতিদিন, বিকল হয়ে আছি হাত-পা জড়িয়ে। মাঝে‌ মাঝে দুপুরের ঘুমে দেখি, সাধ্যাতীত ভালোবাসায় আমরা এখনও ময়দানে ঘুরি। বাগবাজারে সূর্য ডোবার আলো আমাদের এখনও শিশুর হাততালির মত লাগে। আর কখনও, ভুল‌ করে, মনে হয় - এসব এখনও করে, আরও ভুল করে গেছি। চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার ভয়ে অনিবার্যভাবে ঢেকে দিচ্ছি সূর্যের অবাধ যাতায়ত। ভিটামিন ডি কমে গেলে ব্যথা বাড়ে উত্তোরত্তর।

    কাট্!

    ল্যাপটপ অন করি। লিখি- "হ্যালো মেটস্। পাওয়ার ইস ব্যাক। অ্যাম অ্যাভলেবল্ নাও।"


    ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
    সকাল আটটা



    সমস্ত ভালোবাসাই যদি খাওয়ার মত বা এক কাপ চায়ের মত জিভেতে এমন এলিয়ে যেত! ভালোবাসার সাথে জিভের অবশ্য যোগাযোগ আছে। জিভে এলে ভালোবাসা ভিজে যায়, স্বাদু হয়, সতেজ হয়ে ওঠে। জেগে ওঠে শেষমেশ। খাওয়ারও তাই।

    আসলে, ভালোবাসার সাথে খাওয়ার আর খাওয়ানোর‌ নিশ্চয়ই যোগাযোগ আছে। এটা ততদিন বুঝিনি, যতদিন‌ না এক সম্পূর্ণ ছাড়াছাড়ি হল। যতদিন জিভে স্বাদ লেগে থেকে আমাদের বিবেকানন্দ পার্কে খাওয়া দই ফুচকার, যতদিন নিজামের পাশের আউটলেটে জানুয়ারি পড়লেই একা একা বিফ রোল, কিংবা হালিম খেতে যাব, যতবার পার্ক স্ট্রিট ফিরলেই ওয়েসিসে ঢুকে গিয়ে মনে হবে, (আনিসুল আছে কি আজও?) বলা‌ যাক চিজ-চেরী-পাইন্যাপল্ আর তিনটে বিয়ার, ততদিন কীভাবে পুরোপুরি ছেড়ে চলে যেতে পারি?

    এসব বুঝিনি। তবু আমার বাড়িতে এলেই তুমি আনতে পোস্ত চিকেন। হ্যাঁ, প্রথম তুমি। তোমাকেই বলছি। ওটাতেই সেরা ছিলে। ওহ্, না না! তোমার চকোলেট, অরগ্যানিক মধুর কেরামতি - সেসমস্ত মনে রেখেই আজ সসম্মানে স্বীকার করি, তোমার ঐ‌‌ পোস্ত চিকেনের কাছে এইসব কিছুই ছিল‌না। আমাদের কিচেনে ভাত করা, সেই, মনে‌ আছে?

    ছাড়ো।

    আর তুমি, অ-দ্বিতীয়, তোমার দ্বিতীয় হয়ে ওঠা হলই না আর। নিরামিষ হলে যা হয়! জেভিয়ার্স থেকে শেষে আশুতোষ অবধি হাঁটালে? স্যান্ডউইচের লোভে? হেঁটে নেব এরকম টোপ দিলে, এটা তুমি জানতে নির্ঘাত। বেড়ে লেগেছিল। ভাবছি এবার, আগত তৃতীয়কে তাই সামান্য ওখানেই নিয়ে যাব। তারপর হাজরা ক্যাফেতে বসা যাবে পুডিং সাঁটাতে। অপরাধ হবে?

    শোন, এরকম করতে নেই। কারণ, তাহলে একের ওপর এক অনিবার্য জড়িয়ে যেতেই থাকে। আমরা দোঁ-আশলা লোক। আমাদের কত আসা-যাওয়া; পথের বয়সই বাড়ে না। এভাবে জড়িয়ে জড়িয়ে ছড়িয়ে ফেলব শেষে।একসাথে হাঁটা আর খাওয়ার আদরে এভাবে আটকে নেবে‌ কাছেও না থেকে? জন্মদিনেতে ছুঁড়ে দেবে বেমক্কা বেনামী বই? ফেসবুকে ছবি দিয়ে এভাবে জানান‌ দেবে, কতটা ভাল আছ? মেয়ের হাতেখড়ি হল কাল। তা, কী দিয়ে লেখালে যেন? ওহ্ সেই Pierre Cardin। এখনও প্রযত্নে তবে ওকেও রেখেছ কাছে?

    এভাবে ভালোবাসতে আছে?


    ১৩ ফেব্রুয়ারী,২০২৩
    দুপুর বারোটা



    আজ সারা সকালটা ওঁকে বসে বসে দেখলাম। এই যে মানুষটি শীতের বিষণ্ণ গাছের মত তাকিয়ে দেখছেন তাঁর শেষের পৃথিবীকে, এও এক দেখার মত আলো।

    "কে রে, সন্তু না কি? এখন ভালো দূরের জিনিস দেখতে পাই না রে। কী হল, চিনতে পারছিস না?"

    আমি উত্তর দিই; সে উত্তর ওঁর কাছে পৌঁছোয় না। উনিও কিছু বলতে থাকেন আমার জন্য। সে কথা আমার কাছে আসতে পারে না আর। শব্দ শুকিয়ে যায়, শরীরের মতই। এই সমস্ত একমুখী সংলাপ নিয়ে জীবনযাপন করা ওঁকে কখনও কখনও দেখতে পাই। আজও পায়চারি করছেন এমন এক বাগানে, যা কোনদিনই সাজানো হয়নি তাঁর জীবদ্দশায়। কংক্রিটের বাগানকে পরিষ্কার রাখার জন্য যত্নে কুড়িয়ে নিচ্ছেন আসন্ন শীতের আগের শুকনো পাতা। অনেকেরই এমন একটা বাগান করার শখ থাকে। আমারও ছিল।

    শীত এলেই এখনও কলকাতার গলি, পথ, রাস্তাঘাটের সাথে 'আশ্চর্য নতুনভাবে দেখা' হয়ে যায়। যে দোকান পাড়ার গলির শেষে, পেরিয়ে বেড়িয়ে যাই প্রতিদিন, সেখানে বেড়িয়ে আসি। বেগুনি, আলু, ফুলকপির চপ, ঝালবড়া খুঁজি। সিকিম হাউসে মোমো খেতে না যাওয়ার আফসোস নিমেষে উড়িয়ে নেয় নেভি কাট। "তালপুকুর স্ট্যান্ডের পাশে খাবি,ভাই। কুঙ্গা-টুঙ্গা ফেল। চল্লিশ টাকায় ছ'টা।"

    বেশি দূরে যেতে নেই। বেঁধে বেঁধে থাকতে হয়। এসব কথা আসলে এক প্রবল আত্মশ্লাঘা থেকে নয়, বরং কল্পনা বাড়িয়ে সমস্ত জীবন নিংড়ে বাঁচার একটা আবশ্যিক প্রয়োজনীয়তা থেকে আসে। ওঁর মতো। "আমেরিকায় কাজ চলে যাচ্ছে কত, তবে কে যেন বলছিল আমাদের ভয় নেই। বাবুরা সব এদিকে চলে আসবে এবার। এখানেও বোধহয় টাকাপয়সা কম দেবেনা, না?"

    শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছি। উনি বিড়বিড় করছেন মনে হয়। "এই বাগানটা করা হয়ে উঠল না আর। তবে বাগানটা আছে। বাবু এলে বলব। থাকব তো, না রে?", হাসছেন এবার।

    ঐ তো, উনি দেখছেন মা-বুলবুলিকে -- বাচ্চাকে খাইয়ে দিচ্ছে মুড়ি আর বিস্কুটগুঁড়ো। কালকে বিড়ালটা আম গাছে উঠে কাকের বাচ্চা খেয়ে গেছে। এই শরীরে আর গাছে ওঠা যায়না, তাই পাহারা দিতে হবে। আবার আসতে পারে আজ। নাহ্, টগর গাছটা তবু আছে। বছর সাতেক আগে বাবু এসে শেষবার পুঁতে গেছে। সব পাথুরে গল্পকথা নাকি?


    ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
    সন্ধ্যে সাতটা



    কিছু কিছু ক্ষত মানুষকে এক দিব্য আলো দেয়। কাছের মানুষের ছেড়ে যাওয়া, অনিচ্ছাসত্বেও চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া, মেট্রো বা বাসে অপমানের কালশিটে একেকটা দিনের পর কবিতার কাছাকাছি নিয়ে আসে। "পরিবার আর কাজের মধ্যে বাছতে গিয়ে আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি, দীপক", স্যার বলছিলেন সেদিন, "আর তাছাড়া, আমিও কি আর আগের মত ভাষাটাকে স্বচ্ছন্দে বলতে পারি?"

    এরকমও হয় তবে? আমাদের কম বয়সের তারকারা কেউ সেলিব্রিটি ছিলেন না। অনেকে ছিলেন, তবে অঞ্জন দত্তের মতই কেউ কেউ সেভাবে চান নি রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে যেতে। তবে আমাদের তারকারা শিক্ষক ছিলেন, যারা একটা বিষয় শেখাতেন না; কীভাবে ভাবতে হয় সেটা শেখাতেন, ভালো - খারাপ দুটো সবসময় নৈর্ব্যক্তিক বিষয় নয় বরং অন্যের কথা ভেবে কিছু বড় সিদ্ধান্তের কাছে, ছোট সত্যি পেরিয়ে বৃহত্তর সত্যের কাছে নত হতে হয় এটা বোঝাতেন। তাই এরা সবাই যে প্রচারের প্রাচুর্য্যে অনেক এগোতে পেরেছেন তা নয়, কিন্তু কখনও অন্যের স্বাছন্দ্যে আজকের intelligentsia - র মত কর্পোরেটকে অথবা "সব অধঃপাতে গেল" বলে প্রতি মুহূর্তে আজকের সময়টাকে, প্রজন্মকে গালি দেননি। তারা ছোট একটা জিনিস বুঝতে পারেন - সবই থাকবে, তবে পাশাপাশি থাকতে হবে। সহাবস্থান জরুরী। আর অন্যটা? সে আমার পথ নয়। স্রেফ অন্য কারো। আমি আমার পথটাকে, মতটাকে মেনে নেব। আমার কাছে কেউ এলে তাকেও এটুকুই বলব যে, এটা শুধুমাত্র আমার দেখা, আমার বোধ। এটাই তাদের আলো- স্বাছন্দ্যের আলো, ঘৃণাকে এক লহমায় ফিরে যেতে বলার আলো (বুদ্ধ যেমন মারকে বলেছিলেন, তোমার এই ঘৃণা আমি ফিরিয়ে দিলাম), অথবা নিজের প্রয়োজনটুকু সমাজের শেখানো প্রয়োজন থেকে আলাদা করতে পারার আলো।

    এক একদিন সন্ধ্যেবেলা এদের কাছে বসি। এদের সাথে ফোনে ঘণ্টাখানেক কথা বলতে বেশ ইচ্ছে হয় অফিসের পর। এসব কথা-আলাপ দিয়ে নিজেকে সুস্থ রাখি। "কোথায় বসছি আমরা?" - "বাড়িতেই হতে পারে, স্যার।" - "সাউথ সিটি যাবে? তোমাকে অনেকদিন খাওয়ানো হয়নি। সত্যি বলতে, কোনদিনই খাওয়ানো হয়নি।"

    সেসব সন্ধ্যেবেলা যাদবপুরের একনম্বর গেট পেরিয়ে চার নম্বর দিয়ে বেরোতে বেরোতে দেখা হয় আমার ২০১২-২০১৪- র সাথে। গ্রীন জোন, একটা গোলপার্কে দুপুর বেলা পড়াতে যাওয়া, শেষে ওকে নিয়ে সাদার্ণ এভ্যিনিউ হয়ে কালীঘাট মেট্রো অবধি হাঁটা, মাঝে লায়ন্স পার্ক, সরোবরে চুমুর পর বিভোর কিছু কিছু বাস্তবিক আশ্বাসে নিজের সাথে কথা বলতে বলতে ফিরে আসা ফরাসী সংস্কৃতি বিষয়ক সেমিনারে কিছু অবিশ্বাস্য ফরাসী গান, কবিতায় সময় কাটাবো বলে, কিছুক্ষণ নিজেকে একুশ শতকের ত্রুবাদুর মনে হবে বলে - এসব নিয়ে সাউথ সিটির কফি ওয়ার্ল্ডে বসি। অনেক কথা হয় আমাদের - আমাদের নিজেদের সাথে আর একে অন্যের সাথে। আসলে যেসব কথা আগেও হয়েছে, 'আন্তরিক পর্যটনে', তার ওপর একটা নতুনের প্রলেপ দিই আমরা। বুঝে নিই যে, ২০১২ তে আমাদের যেটুকু কথা হয়েছিল সেটুকু এখনও আছে, বরং অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। স্কুলের চাকরি ছেড়ে কর্পোরেটে এসেছিলাম, একটা অবস্থাকে দিন দিন দেখতে পাচ্ছিলাম, আর নিজের ভেতরেই ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছিলাম বলে। এসব আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

    রাতে বাড়ি ফিরি। মনে পড়ে, কয়েকদিন আগেই আরেক স্কুলের স্যারের সাথে কথা হচ্ছিল ফোনে। তিনি আমাকে কোনদিন সরাসরি পড়ান নি। কিন্তু তবুও স্যার, কিছুটা অলক্ষ্যেই। আমার থেকে পরিষ্কার আর স্বচ্ছ দেখেন কি না? উনি আমাকে বলেন, "স্কুলের অ্যাডমিন নিশ্চয় এদের (বাবা-মায়েদের) ক্লায়েন্টই ভাবে কিন্তু মজা হচ্ছে, জান, এটা বোধহয় একমাত্র উদাহরণ যেখানে তোমার ক্লায়েন্টরাই ওঁদের দরকারী প্রোডাক্টের ব্যাপারে কিসসু জানেনা। তুমি এদের ক্লায়েন্ট বল, দীপক?"




    ডায়েরী এখানেই শেষ।

    জানেন, দীপক একবার আমাদের বলেছিল পঞ্চাশের পর বানপ্রস্থে যাবে। আমাদের ক্লায়েন্ট মিটেও একদিন ওর ব্যাগ থেকে স্বামী গম্ভীরানন্দ প্রণীত ‘উপনিষদ গ্রন্থাবলী’-র দ্বিতীয় খণ্ড উঁকি দিতে দেখেছি।

    অন্তত পঞ্চাশ হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে পারতনা?

    আপাতত একটা মিসিং ডায়েরী করেছি আমরা। ঘরে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি।

    তবে, দরজায় একটা তোয়ালে ঝুলছিল।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৯৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৩743070
  • বেশ ভালোলেখা এবং ঈপ্সিতা পাল ভৌমিকের আলোকচিত্র সত্যি অনবদ্য।
  • Aniruddha Banerjee | ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২৩743071
  • অত্যন্ত সময়োপযোগী লেখাটি
    খুবই ভালো লাগলো
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন।