

ছবি: রমিত
পশ্চিমমুখো হাওয়াই জাহাজে ওঠা অবধি আমার ধারণা ছিল নানা দেশের এক সমষ্টি হলেও ইউরোপে সকলের গায়ের রঙ সাদা, তাঁরা ইংরেজি বলেন বোঝেন, রবিবারে গিরজেয় হাঁটু গেড়ে প্রভুর বন্দনা করেন, প্যান্টের ভেতরে শার্ট গুঁজে পরেন, ডিনারের সময় আটটা, টেবিলে বসে কাঁটা চামচ দিয়ে খান; সংস্কারি নন, তাঁরা জ্ঞানে বিজ্ঞানে পারদর্শী আধুনিক মনের মানুষ।
ইউরোপে এসে ইস্তক এ যাবৎ আমার জানা পশ্চিমি জীবন দর্শনের চালচিত্রটি ভেঙ্গে চুরমার হতে আরম্ভ করলো- সকলে ইংরেজি বলেন না, গড়পড়তা জার্মান একান্ত পথ ভুলে না হলে গিরজেয় যায় না, ডিনারের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই, দক্ষিণের চাষা প্যান্টের ভেতরে শার্ট গোঁজে না। রাত আটটার মধ্যে অসলোর জনগণের ডিনার শেষ, বার্সেলোনা, তাওরমিনা, কোত দা’ জুরে তখনো টেবিল সাজানো শুরু হয়নি।
বহিরঙ্গে তফাৎ যতোই থাকুক না কেন, আমার ধারণা ছিল ইউরোপ জ্ঞান বিজ্ঞানের মহাদেশ, এঁরা গ্রাম্য কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন না। পেছনে কেউ হাঁচলে কারুর যাত্রাভঙ্গ হয় না, ব্যাগে ডিম কলা নিয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়া সম্ভব। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখলাম সভ্য সমাজে আরমানি সুট পরে যতোই অতি আধুনিক জ্ঞানী ব্যক্তির মতন বাকতাল্লা মারুন না কেন, এঁরা তেরো তারিখকে ভয় পাবেন, কালো বেড়ালকে রাস্তা কাটতে দেখলে থেমে যাবেন সম্ভব হলে তিন পা পেছুবেন, ঘোড়ার ক্ষুর আকৃতিকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মানবেন, পারত পক্ষে মইয়ের তলা দিয়ে হাঁটবেন না। তবে সুযোগ পেলেই ভারতীয় তথা এশিয়ানদের কুসংস্কারের শাপশাপান্ত করবেন। অক্টোবর ফেস্টের তাঁবুতে বসে ‘মিউনিক রি’ নামক ইন্সিউরেন্স কোম্পানির মানফ্রেড বলেছিল, জানো তোমাদের দেশের লোকের সঙ্গে ব্যবসা করা কি রকমের ঝকমারি? একজনকে সবে বলেছি ধরুন আপনি যদি মারা যান, আমাকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বললেন আপনি আমার অমঙ্গল চাইছেন!

উরুকি বা ইভিল আই
পাঁজির আওতায় আবাল্য বাস করেছি; পি এম বাকচির পঞ্জিকার হালকা গোলাপি প্রচ্ছদ এখনো চোখের ওপরে ভাসে। বাবার কাছে গুপ্ত প্রেসের খাতির ছিল না, তাকে ব্যঙ্গ করে লুপ্ত প্রেস বলতে শুনেছি। পুরো ঘটনাটা যখন গ্রহ তারাদের গতিবিধি নিয়ে, তখন লুপ্ত বা সুপ্ত প্রেসের মধ্যে কোনো বিবাদের কারণ বুঝে উঠিনি। তবে জানতাম দশমীতে ঠাকুর বিসর্জনের পরের দিন, একাদশীতে পদুমার সংসার গুছিয়ে মায়ের ঝরিয়া বা কলকাতা ফেরা সম্ভব নয়, সময় লাগে। কিন্তু সেটি হবে ত্রয়োদশী বা তার পরে। কেন? দ্বাদশীর দিন যাত্রা নিষ্ফলা। যেমন মঘায় যাত্রার ফল নাকি আরও ভয়াবহ; সাতাশটি নক্ষত্রের মধ্যে মঘা দশম, তার গৃহপতি বৈরাগ্যের প্রতীক কেতু। সেদিন তুচ্ছ লৌকিক সংসারের কথা ভেবে যাত্রা করা বারণ।
গরমের, পুজোর এবং শীতের ছুটি মিলিয়ে বছরের অন্তত দুটো মাস পদুমা গ্রামে কাটতো যেখানে বিজলি বাতি এসেছে আমার স্কুলের শেষ বছর নাগাদ। বাড়ির দুটি হ্যারিকেনের আলো ভরসা, তার আলোকিত বৃত্তের বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে লুকনো ছিল গভীর রহস্য; ক্রমশ কালো বেড়াল, হাঁচি এবং পিছু ডাকের ক্ষতিকর ফলাফলের সঙ্গে যোগ হয়েছে নিশির ডাকের আশঙ্কা, জেনেছি সন্ধ্যে বা রাতে বাঁশ গাছের নিচ দিয়ে হাঁটতে নেই, কাঁধে বেম্মদত্যি চেপে বসে; মেয়েদের সন্ধ্যে বেলা চুল খোলা বারণ, রাত বাড়লে শাঁখের চকের পাড়ে আলেয়ার আলো দেখা যায়, সেদিকে যেতে নেই।
আটচালার দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে গোধূলির আলোয় বাবা আকাশের দিকে চেয়ে আছেন একমনে; বললেন গোলোক ঘোষের বাড়ির পেছনের তেঁতুল গাছের ওপরে একটা তারা দেখলাম, আর কোনখানে তারা ফুটেছে দ্যাখ তো। আমি খুঁজতে থাকি, জানি যতক্ষণ না দুটো তারা দেখছেন, ততক্ষণ আমার মুখ দেখবেন না! এই সব নিষেধের কথা শুনে বড়ো হয়েছি, তার কিছু পোঁটলায় পুরে ইউরোপ নিয়ে এসেছি। অবশ্যই সাধ্যমত আমার বাড়ির কাউকে পেছন থেকে ডাকিনি, ভুল করে ডাকলে বলেছি বাড়ির ভেতরে এসে একবার বসে তারপর যেখান যাবে যেও; হাঁচি পড়লেও সেই একই নিদান। বাঁ হাতে কিছু বা হাতে হাতে লঙ্কা দেওয়া যাবে না শুনে পুত্র কন্যা বিস্ময় প্রকাশ করলেও মেনে নিয়েছে। তাদের বলেছি অবাক হবার কারণ নেই, এই যে ইউরোপিয়ানদের সামনে কালো বেড়াল রাস্তা পেরুলে তারা গাড়ি থামায়? তার কি? ধরে নাও আন্তর্জাতিক কুসংস্কারের তালিকায় এটা বাঙালি সংযোজন।
পরে পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের একজনের সঙ্গে সংসার করতে গিয়ে বুঝেছি আমার চেনা বাঙালি তথা পশ্চিম ইউরোপীয় সংস্কারি বিচার ধারার পুরো ফর্দটা তাঁদের কাছে বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ভাগ মাত্র।
পশ্চিমে আদ্রিয়াতিক, পুবে আইওনিক, দক্ষিণে ইজিয়ান সাগর ঘেরা যে উপদ্বীপ প্রায় পাঁচশ বছর অটোমান রাজাদের জমিদারি ছিল, তুর্কি ভাষায় তার নাম বলকান - গাছ পাথরে ভরা পাহাড় এবং উপত্যকা। এর সীমানা এবং পরিধি খানিকটা বিতর্কিত – কারো মতে বলকান বলতে বোঝায় এককালের ইউগোস্লাভিয়া (বসনিয়া হার্জেগোভিনা, মাসিদোনিয়া, মনটি নেগ্রো, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া), বুলগারিয়া, আলবানিয়া, গ্রিস, ইউরোপীয় তুরস্ক। আরও কিছু গুণীজনের মতে বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীতে সেই ডেফিনিশনের সঙ্গে যোগ হয়েছে রোমানিয়া, মলডোভা, কসোভো, এমনকি স্লোভেনিয়া এবং হাঙ্গেরি! আমার স্ত্রী নিজেকে যতোটা না বলকানিক (শব্দটা নিজে বানিয়েছি) বলে দাবি করেন, কন্যা মায়া সেটি আরও জোর গলায় জাহির করে থাকে। তার কিছু পূর্ব ইউরোপীয় বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে আমি নিঃসংশয় হয়েছি বলকান এক অতি বিষম বস্তু! যদিও দেশ এখন স্বতন্ত্র কিন্তু একদিন তুর্কি সুলতানরা এই বিস্তৃত অঞ্চলকে এক পতাকার তলায় এনেছিলেন, তাঁদের ছাপ রেখে গেছেন খাদ্যে, ভাষায়, বেশভূষায় এবং আচার আচরণে! সেটি পুব থেকে আসা মঙ্গোলদের আনা তুরকিক কালচার, বাকি ইউরোপের সঙ্গে কিছু মেলে, কিছু মেলে না।
রোমানিয়ান শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম তাদের অর্থোডক্স ক্যালেন্ডারে জামাই ষষ্ঠী নির্ধারিত না থাকলেও জামাই যেদিন বাড়ি আসে সেদিনই ষষ্ঠী বা সপ্তমী! ভাষাগত আড়ষ্টতার কারণে বাক বিনিময়ে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না কিন্তু ভালোবাসা ও আন্তরিকতাটুকু চিনে নিতে ডিকশনারি লাগেনি।
যতদিন বেঁচে ছিলেন, শাশুড়ি সপ্ত ব্যঞ্জন না হোক প্রতি আইটেমের জন্য নীল সাদা মিশ্রিত রঙের আলাদা পোরসেলান প্লেট হাজির করতেন, কখনো তার ব্যত্যয় হয়নি। ডাল ভাত চচ্চড়ি মিশিয়ে নয়, প্রতি খাদ্য বস্তুকে স্বতন্ত্র সম্মান দিয়ে ভোজনের জন্যই আলাদা প্লেটের এলাহি বন্দোবস্ত। শ্বশুর মশায় পেশায় ব্যাঙ্কার কিন্তু আঙ্গুরের চাষ ছিল, শখের। তাঁর স্পেশ্যাল প্রোডাক্ট জুইকা বা প্লাম ব্রান্ডি, ৪০% নীট তার শক্তি! আমার জন্য তাঁর প্রাচীনতম বোতলটি খুলতেন (সেলারে প্রতি বোতলে সন তারিখ লেখা থাকত; তিনি যাবার পরে ১৯৬৯ সালের বোতল আবিষ্কার করেছি)। টোস্ট করার নিয়ম - সকলের গ্লাসে জুইকা না হোক কোন না কোন অ্যালকহলিক ড্রিংক থাকতে হবে এবং খালি গ্লাস দিয়ে কোনমতেই টোস্ট করা যাবে না। গ্লাসে নন অ্যালকহলিক পানীয় থাকলে নরোক (রোমানিয়ান চিয়ার্স!) বলা নিষিদ্ধ। এটি নিয়ম, অন্যথায় ঘোর অমঙ্গল।
আমার আইরিশ সহকর্মী এডমানডের কাছে শুনেছি আয়ারল্যান্ডেও এটি প্রচলিত প্রথা। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও নরেন্দ্র মোদি দুজনেই টিটোটাল – স্টেট ডিনারে টোস্ট করার সময় বাইডেন বললেন তাঁর আইরিশ ঠাকুরদা বলেছিলেন দুজনেরই হাতে নন অ্যালকহলিক ড্রিংক থাকলে গেলাস বাঁ হাতে ধরতে হবে। মোদিজি কতটা বুঝলেন কে জানে, তাঁর বিভ্রান্ত হাসি দেখে বাইডেন বললেন, আই অ্যাম নট জোকিং!
শাশুড়ি একবার একটি চামড়ার ব্যাগ উপহার দিলে রোদিকা পাশ থেকে বললে, খুলে দেখো মা কত টাকা দিয়েছে! সে কি কথা, ব্যাগ দিলেন তাই যথেষ্ট নয়? না, চেন খুলে পেলাম হাজার লেউএর নোট! বেণীর সঙ্গে মাথা? ব্যাগের সঙ্গে টাকা কেন? রোদিকা বললে, রোমানিয়ানরা কাউকে কখনো কোন খালি ব্যাগ বা পাত্র দেয় না, নো এমটি ভেসেল! এমনকি একটা মূল্যবান রূপোর থালা উপহার দিলেও সেই থালার ওপরে কিছু না কিছু ধরে দিতে হবে, তা কোন মিষ্টি, ফুল হোক বা আরেকটা রূপোর চেন হোক। প্রতিবেশী যদি একটি প্লেটে করে আপনার বাড়িতে কেক বা সেদিনের রাঁধা কোন খাবার দিয়ে যান, পরের দিন সেটি খালি অবস্থায় ফেরত দেওয়া যায় না। নিদেন পক্ষে কিছু খাদ্যদ্রব্য বা চকোলেট সে প্লেটের ওপরে রেখে ফিরিয়ে দিতে হবে; শূন্য সে বুকে প্লেট কখনো ফেরে না।
রোদিকার আরেক চেতাবনি মনে আছে; আমাদের বাড়িতে যা করো তা করো কিন্তু এ বাড়িতে অন্তত হাত ব্যাগ, ওয়ালেট কখনো মেঝেতে রেখো না; আমাদের সব সময়ে বলা হয়েছে তাতে নাকি টাকা লিক করে।
আমাদের শুদ্ধ ভাষায় অর্থনাশ সমুৎপন্ন।
ক্রমশ শ্বশুর বাড়িতে আসা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোমানিয়ান সংস্কারি পদ্ধতির সঙ্গে আমার পরিচয় বেড়েছে।
একদিন শ্যালক শরবান ‘উরসুস’ (শ্রেষ্ঠ রোমানিয়ান ব্রান্ড) বিয়ারের বোতল খুলে দুটো গ্লাসে ঢেলেছে, আমরা দুই গেলাসের শরিক। আমাদের পাত্র ফুরুলে দেখি বোতল উলটে তার তলানি টুকু শরবান পান করলে! হেসে বললে, কিছু মনে করো না শেষটুকুর ভাগ তোমাকে দেওয়া গেলো না। ওটা আমাদের একটা বিচ্ছিরি সংস্কার, এটি না করলে আমি আমার কোন প্রিয় বস্তু হারানোর আশঙ্কা আছে।
শ্যালিকা ক্রিস্টিনাকে গল্পটা বললে সে হেসে বলে, প্রিয় জিনিস হারানোর ভয় থাকা ভালো! তবে খাবার টেবিলে একটা বিষয়ে কিন্তু সতর্ক থেকো, মা ভীষণভাবে বিশ্বাস করে, টেবিলে যদি ভুল করেও খানিক নুন ফেলো, কোন প্রিয়জন বা পারিবারিক বন্ধুর সঙ্গে তোমার বিবাদ হতে পারে।
আমার ভুলো মনের গল্প ক্রিস্টিনা অনেক শুনেছে তার বোনের কাছে। সেই প্রসঙ্গে একদিন বলেছে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনে পড়ল কিছু আনতে ভুলে গেছো? তা নেবার জন্য আবার বাড়িতে দ্বিরাগমন এক অলক্ষুণে কাণ্ড, নৈব নৈব চ। আমি বললাম, তাহলে? যদি মানি ব্যাগ ভুলে গিয়ে থাকি? ক্রিস্টিনা বললে বাড়ির দরোজায় দাঁড়িয়ে কাউকে বলতে হবে, আমার ব্যাগ বা ছাতাটি নিয়ে এসো দিকি। বাড়িতে তখন আর কেউ না থাকলে পাশের বাড়ির কাউকে ডেকে তার হাতে চাবি দিয়ে সেই অনুরোধ করবে; তুমি নিজে কদাচ বাড়ির দরোজা পার হবে না। আর হ্যাঁ ছাতা প্রসঙ্গে শুনে এসেছি বাড়ির ভেতরে ছাতা খোলা (আমরা যাকে বলি ছাতা ফোটানো) অত্যন্ত গর্হিত কর্ম, দুর্ভাগ্য ধেয়ে আসে।
মনে পড়ল বহু বছর আগের একদিন স্ট্র্যান্ড রোডের স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অফিস কেটে নিমাই বাবু আর আমি জর্জ টেলিগ্রাফের সঙ্গে মোহনবাগানের খেলা দেখতে যাবো; হাতে আছে দুপুর বেলা চৌরঙ্গি ব্রাঞ্চে গিয়ে চুনি গোস্বামীর কাছে চেয়ে চিনতে জোগাড় করা দুটি ডে স্লিপ। আকাশে মেঘ দেখে যেই বলেছি অফিস থেকে একটা ছাতা নিয়ে এলে হতো না? নিমাই বাবু বিনা বাক্যব্যয়ে অ্যাবাউট টার্ন করে হনহন করে অফিসের ছ’তলায় ফিরে এলেন, ছাগ শিশুর মতন আমিও তাঁর পেছনে পেছনে। অফিসে ঢুকে চেয়ারে একবার বসে নিয়েই বললেন এবার চলুন। মোহনবাগান মাঠে খেলা দেখতে গেলে কখনো ছাতা হাতে যাবেন না, ছাতার কথা বলবেন না। মোহনবাগানের পয়েন্ট লস হয়।
আমাদের মতন রোমানিয়াতেও বলে করতল চুলকুলে টাকা আসে, কিন্তু এখানে তার একটি ভ্যারিয়েশন আছে- দক্ষিণ করতল চুলকোলে অর্থাগম কিন্তু বাম করতল চুলকোলে অর্থ বিনাশ (সার্বিয়াতে ঠিক উলটো)। কেউ আমার কথা ভাবছে বলে আমার হেঁচকি ওঠে, কালো বেড়াল রাস্তা পার হলে তিন পা পিছিয়ে যাওয়া, শিশুর চোখে মুখে ভুষো কালি মাখিয়ে খারাপ নজর থেকে বাঁচানো ইত্যাকার প্রবাদ আমাদের দেশের মতন সম্যক প্রচলিত।
রোমানিয়া এবং গ্রিস বাদে এই বিশাল অঞ্চলের ডি এন এ মাফিক মোটামুটি স্লাভিক; প্রধান ধর্ম চারটে - প্রটেস্টান্ট, ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ক্রিস্টিয়ানিটি ও ইসলাম। বলকানের সংস্কার বা কুসংস্কারের সঙ্গে কোন প্রকারের ধার্মিক ধারণা জড়িত আছে বলে জানা যায় না বরং প্রাক ক্রিস্টিয়ান যুগের জন জীবনের আচার আচরণের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। মায়া তার ইস্ট ইউরোপিয়ান স্টাডিজের জ্ঞানের অহংকারে দাবি করে, রোমানিয়ার কিছু প্রথা, সংস্কার খানিকটা আলাদা; তারা নন স্লাভিক জাতি, তাদের ভাষাটি স্লাভিক বা তুরকিক অনুপ্রেরিত নয়, ল্যাটিন ভিত্তিক। আঞ্চলিক ঐক্যে দৃঢ় বিশ্বাসী মায়ার মতে কিছু খাস রোমানিয়ান কাস্টম বাদ দিলে যাবতীয় খাবারের মতন সকল রীতি, প্রথা ও কুসংস্কারের ব্যাপারে গোটা বলকান একেবারে এক প্রাণ, একতা!
যেমন
বাড়ির ভেতরে শিস দেওয়া মানে আপদকে ডেকে আনা
কাঠের ওপরে ঠোকা দিয়ে (নক অন উড), শব্দ করে ভূত প্রেত তাড়ানো
কোন বেঞ্চ বা টেবিলের কোণার স্থানটি অবিবাহিত ছেলে মেয়েদের সর্বথা পরিত্যাজ্য- সেখানে বসলে তাদের বিয়ে হবে না
শিশুর জন্মের আগে জামা কাপড় কেনা বারণ
পানীয় নিয়ে কারো সঙ্গে টোস্ট করার সময় সিধে চোখে চোখ না রাখলে শনির সাড়ে সাতি বা সাত বছরের দুঃখ
মঙ্গল এবং শুক্রবারে চুল নখ কাটা অলক্ষণ
নবজাত শিশুকে কুদর্শন বলা (আবার ওই বুরি নজরের বাহানা)
রাতের বেলা আয়নায় মুখ না দেখা (অনেক বাড়িতে আয়নাকে চাদরে ঢেকে রাখার রেওয়াজ আছে)
বাইরের জুতো খুলে বাড়িতে ঢোকা; অভ্যাগতের পায়ে গলিয়ে নেবার জন্য চপ্পল মজুত থাকে দোর গোড়ায় (রোমানিয়া, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়ায় খুবই চোখে পড়েছে- ফিনল্যান্ডেও দেখেছি সেটা। শুধু ফরাসি বা জার্মান বাইরের জুতো পরে আমাদের ঘরের কার্পেট কলঙ্কিত করে নির্দ্বিধায়)
মায়াকে বলেছি তোমরা আজকের জেড প্রজন্ম, আদ্যিকালের ঠাকুমার প্রবাদ প্রবচনে বিশ্বাস করো? মায়া বললে, কেউ কেউ করে। এই যেমন সারে হিলসে আমাদের ইউহার্স্ট হোস্টেলের কমন রুমে একটি বুলগারিয়ান মেয়ে একদিন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে। কাঁদো কেনে? জানা গেল তার ভালোবাসার মানুষ থাকে অনেক দূরে, জার্মানিতে। মেয়েটির জন্মদিনে ফুল পাঠাতে পারেনি, পাঠিয়েছে এক গোছা লাল গোলাপের উজ্জ্বল ছবি; মেয়েটি গুণে দেখে সেই তোড়ায় এক ডজন গোলাপ ফুল। জার্মান যুবকের মাথায় আসবার কথা নয় যে বলকান ভাবনায় পাঁচ সাত নয় এগারো ইত্যাদি বেজোড় সংখ্যা ভালোবাসা, মঙ্গলের প্রতীক, আট দশ বারো জোড় সংখ্যা, সে ফুলের গোছা মৃতের জন্য নির্দিষ্ট। অতএব বালিকাটি মনে করে জার্মান যুবক তাকে ভালোবাসা জানাচ্ছে না, সে তার মৃত্যু কামনা করছে।
প্রসঙ্গত, জোড় বেজোড় ফুল সমস্ত স্লাভিক দেশে একই অর্থ বহন করে থাকে, বলকানের বাইরে চেক পোল্যান্ড এমনকি রাশিয়াতেও। এক্স ওয়াই জেড সকল প্রজন্ম সেটি মেনে চলে।
আমাদের পরিচিত এবং বন্ধুজন লুচিয়ান ও রামোনা উওকিঙ্গে থাকেন, মাইল দেড়েকের দূরত্বে। লুচিয়ান আগ মার্কা রোমানিয়ান, আমার দেখা সে দেশের সবচেয়ে সুন্দর শহর তিমিসোয়ারায় তাঁর বাড়ি (হাঙ্গেরিয়ানে টেমেসভার, জার্মানে টেমেসবুর্গ)। রামোনার বাবা সারবিয়ান, মা রোমানিয়ান, জন্ম এবং স্কুল সার্বিয়ার ভয়ভোদা স্টেপায়, তারপরে চলে আসেন তিমিসোয়ারায়। অর্থোডক্স ক্রিস্টিয়ান; সিরিলিক ও ল্যাটিন হরফ এবং সারবিয়ান ও রোমানিয়ান দুই ভাষাতেই সমান দক্ষ। মায়া তার স্বল্প জ্ঞান নিয়ে রামোনার সঙ্গে সারবিয়ান ভাষা চর্চা করে থাকে।
এ বছরে ইউরোপে রেকর্ড ব্রেকিং গরম। বাগানে বসে গল্প গুজব করছি, সেখানে হাওয়া বইছে মন্দ মধুর। কিন্তু বাড়ির ভেতরে সে বাতাস স্বচ্ছন্দে আনাগোনা করতে পারে এমন দুটি মুখোমুখি গভীর দুখে দুঃখী জানলা নেই, এখানে থাকে না। শীতের দেশে বাইরের বাতাসকে ঘরের মধ্যে খেলা ধূলা করতে দেওয়াটা কোন স্বাস্থ্যকর প্রস্তাব নয়, ইংরেজ তাকে বলে ড্রাফট, সে খুব খারাপ। কিন্তু এই বেজায় গরমে মনে হয় না ঘরের মাঝে বয়ে যাক মলয় বাতাস?
রামোনা বললে সার্বিয়াতে এটি সর্বথা মানা, সারবিয়ানে এর নাম প্রোমায়া (বিপজ্জনক বাতাস)। বাড়িতে যদি এক জানলা দিয়ে ঢুকে অন্য জানলা দিয়ে হাওয়া বেরিয়ে যায় সেটি অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে পরিগণিত হয়। পরের তিরিশ বছরে কখনো আপনার সর্দি কাশি ঘাড়ে ব্যথা মাথায় যন্ত্রণা হলে, আপনার মা ঠাকুমা মাথা নেড়ে বলবেন, দেখেছো, ওই প্রোমায়ার জন্যে এটা হলো। বাড়ি বানানোর সময় আমাদের কথা শুনলে না, মুখোমুখি জানলা বানালে, খুলে রাখলে, এবার তার ফল ভোগ করো।
এহ বাহ্য? নাকি আগে কহিবার মতন আরও কিছু আছে?
আছে, অনেক আছে। এই যেমন শুভ কাজে, শিশুর স্কুলে যাওয়ার সময়ে বাড়ির সামনে উঠোনে, রাস্তায় জল ঢেলে দেন বুলগারিয়ান মাতা, তাদের যাত্রাপথ হোক জলের মতন সহজ। আলবানিয়ান মানুষ মাটিতে বা চেয়ারে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা মানুষকে ডিঙ্গিয়ে যাবেন না, তাতে সেই মানুষের অকল্যাণ হয়, মঙ্গলবারটা আলবানিয়ানের কাছে মোটে মঙ্গল নয়, ভীষণ অশুভ দিন। ক্রোয়েশিয়ানরা অন্তত হালকা একটা কুশন ছাড়া কংক্রিটের বা সিমেন্টের মেঝেতে বসবেন না, হাতে হাতে ছুরি বাড়িয়ে দেওয়া মানা, তাতে শত্রুতার সম্ভাবনা। গ্রিসে বেড়াতে গেলে যে কোন সুভেনির শপে ইভিল আই (উরোকি) দেখতে পাবেন, সেটি বাড়ির দরোজায় টাঙ্গিয়ে রাখলে কারো কুনজর লাগবে না। গ্রিস সহ আরও অনেক দেশ দুয়োরে রসুনের গুচ্ছ ঝুলিয়ে রাখায় বিশ্বাসী, সেটাও ওই যাবতীয় অমঙ্গল দূরে রাখার ও বুরি নজরওয়ালে তেরা মুহ কালা বলার বাসনায়। সারবিয়ানরা মনে করেন খাবার টেবিলে বসে গান গাইলে দম্পতির জীবনে দুর্ভাগ্য নেমে আসে। গ্রিক বিয়েতে প্লেট গেলাস ভাঙ্গার রেওয়াজটি সিমবলিক। পুরানোকে চুরচুর করে নতুন কিছু গড়া এবং সেই বিধ্বংসী শব্দের দ্বারা ভূত প্রেতের আপদ বিদেয় করা, দুটোই সাধিত হয় এই প্রক্রিয়ায় (আজকাল অবশ্য খাবার প্লেট নয়, সস্তার কিছু নকলি বাসন রাখা থাকে। অতিথিরা বীরদর্পে সেগুলি চুরমার করে প্রভূত আনন্দ উপভোগ করে থাকেন, উচ্চস্বরে বলেন ‘ওপা’, হুররে – সমুদ্রতীরে অ্যানটনি কুইনের ‘জোরবা দি গ্রিক’, সিরতাকি নৃত্য স্মরণ করুন)।

দুয়ারে রসুন, নোভি সাদ, সার্বিয়া
পদুমায় আমাদের শোবার ঘরের দেয়ালে এখনো ঝোলে সেই কতকাল আগে জয়দেব কেঁদুলির মেলায় মায়ের কেনা একটি পটচিত্র –সেখানে লেখা কোন কোন কর্ম করা উচিত, কোন বেয়াড়া কাজ করলে ইহ অথবা পর জগতে কি শাস্তি হবে তার সাবধানবানী, ছোট ছোট ছবি সমেত, যাকে আজকাল থামনেল বলে। বলকানের কিছু সামাজিক রীতি নীতি আচার বিচার দেখে শুনে মনে হয়েছে তাদের সংস্কার কুসংস্কারের গল্প গাছা খুব দূরের বাদ্যি নয়, কীভাবে যেন আমাদের সঙ্গে বেশ কিছু মিলেও যায়।
কোনো খানে।